ইউল্যাবে ডিলান ডিবেট

Send
ইয়াসমিন ইতি
প্রকাশিত : ১৩:২৯, ডিসেম্বর ১১, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:৩১, ডিসেম্বর ১২, ২০১৬


সাহিত্যে নোবেল মুকুট কি বব ডিলানের মাথায় শোভা পায়? না, “দ্যা হাউজ বিলিভস বব ডিলান ডাজ নট ডিসার্ভ দ্যা নোবেল প্রাইজ ইন লিটারেচার।” সম্প্রতি এই প্রতিপাদ্যে 'ডিলান ডিবেট' নামে একটা চমৎকার বিতর্ক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল ইউল্যাবের ইংরেজি বিভাগ। বিতর্কে অংশ নেন দেশের জনপ্রিয় কবি, সাহিত্যিক, অধ্যাপক এমনকি গায়ক পর্যন্ত। প্রতিপাদ্যের পক্ষে ছিলেন কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, অধ্যাপক ফিরদৌস আজিম এবং ইউল্যাবের সহকারী অধ্যাপক হাসান আল জায়েদ। আর বিপক্ষ দলে ছিলেন কবি কায়সার হক, অধ্যাপক ফকরুল আলম এবং পপ গায়ক মাকসুদুল হক ম্যাক। বিতর্কে সঞ্চালক ও বিচারক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে সুইডিশ অ্যাম্বাসেডর জোহান ফ্রিসেল।

বব ডিলানের আর যাই হোক সাহিত্যে নোবেল পাওয়া মোটেও যুক্তিযুক্ত নয়- এমনটা দাবি করে পক্ষের প্রথম বক্তা হাসান আল জায়েদ উপস্থাপন করেন তিনটি পয়েন্ট:

প্রথমত, তিনি বিপক্ষের বক্তাদের প্রশ্ন করেন, কয়েক দশক আগে রচিত ডিলানের গানগুলি আজকের বিশ্বের জটিল রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, তিনি জানতে চান, ডিলানের গানের শব্দগুলি আদৌ প্রকৃত সাহিত্যের নান্দনিক মূল্য বহন করে কিনা। তাঁর তৃতীয়ত জিজ্ঞাসা, যেখানে শর্টলিস্টে ছিলেন সিরিয়ান কবি অ্যাডনিস, যার কবিতা সাম্প্রতিক ক্রাইসিসকে শক্তিশালীভাবে তুলে ধরে। আরও ছিলেন জাপানের গুরুত্বপূর্ণ লেখক হারুকি মুরাকামি, আফ্রিকান ন’গুগি ওয়া থিওঙ্গ কিংবা আমেরিকান ঔপন্যাসিক ফিলিপ মিল্টন রথ। সেখানে সাহিত্যে এনাদের অবদান আমলে না নিয়ে একজন পপ গায়ককে নোবেল দেয়া কতটা ন্যায্য।

পক্ষের দলতিনি আরও বলেন, বব ডিলানকে তুলনা করা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে। কারণ তিনিও গীতাঞ্জলীর জন্য নোবেল পেয়েছিলেন। এটা খুবই হাস্যকর কারণ রবি ঠাকুর প্রথমে ছিলেন একজন সাহিত্যিক তারপর গীতিকার। হাসান আল জায়েদকে সমর্থন করে অধ্যাপক ফিরদৌস আজিম তুলে আনেন সেই মূল প্রশ্ন যে, সাহিত্য আসলে কী। বব ডিলানের গান মানুষের হৃদয়ে নিঃসন্দেহে আঁচড় কেটে যায় তবে সেগুলো প্রকৃত সাহিত্যের মধ্যে পড়ে কি? ডিলানের সঙ্গীতকে বিবেচনা করা যায় কালচারাল স্টাডিজ দিয়ে, তাৎপর্যপূর্ণ পপুলার কালচার হিসেবে, তাই বলে শুদ্ধ সাহিত্য আর সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি নোবেল কোনভাবেই তার প্রাপ্য নয়।
তিনি আরও বলেন, রবীন্দ্রনাথ নোবেল পেয়েছিলেন ভুল রচনার জন্য, গীতাঞ্জলী নয় বরং নোবেল পাওয়া উচিত ছিল গোরা’র মতো কোনও উপন্যাসের জন্য। একটু রসিকতার ছলে ফিরদৌস আজিম বলেন, “রবি ঠাকুরের ভাষায় আমি বব ডিলানকে বলতে চাই- এই মণিহার তোমায়  নাহি সাজে!”

নিজের দলের বাকি দুজন বক্তার সাথে সুর মিলিয়ে অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বব ডিলানের কয়েকটি পপ গানের কথা পড়ে শোনান আর দাবিবিপক্ষের দল করেন যে ওগুলোতে যতই ছন্দ থাকুক তবু তা কবিতা নয়। তিনি বিপক্ষ দলের কায়সার হক এবং ফকরুল আলমকে প্রশ্ন করেন- যারা কিনা জাতীয় পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের সিলেবাস নির্ধারণ কমিটিতে আছেন- তাঁরা কেন সিলেবাসে বব ডিলানকে অন্তর্ভূক্ত করেননি।
বব ডিলান সাহিত্যে নোবেলের যোগ্য এটা দাবি করে বিপক্ষের প্রথম বক্তা বাংলাদেশি পপ গায়ক মাকসুদুল হক ম্যাক বলেন, ডিলানের গানের একাল কিংবা সেকাল কোনটার সঙ্গেই সময়োপযোগীতা খুঁজতে যাওয়া বোকামি। কারণ সময়ের ঊর্ধে গিয়ে ডিলানের গান কাজ করেছে একটা বাহনের মতো, যা বহন করছে মানুষের জন্য বার্তা। ফকরুল আলম বলেন, বব ডিলান এর আগেও বেশ কয়েকবার স্থান পেয়েছেন নোবেল বিবেচনার তালিকায়। তাই এবার শেষ পর্যন্ত তিনি নোবেল পাওয়াতে এত অবাক হওয়ার কিছু নেই। তিনি পক্ষের বক্তাদের ধন্যবাদ দেন এটা বোঝার জন্য যে, বব ডিলান কালচারাল স্টাডিজে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আর তাই ডিলানের সাহিত্যে নোবেল পাওয়া অযৌক্তিক নয়। কারণ কালচারাল স্টাডিজ বর্তমানে সাহিত্যেরই একটা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। তিনি আরও বলেন, ডিলানের সুর আর কথায় যে বৈচিত্র্য তা সাহিত্যের চেয়ে কম নয়। ডিলান যেমন গান লিখেছেন মানবতার জন্য, সমাজের হিতের জন্য তেমনি আবার চমৎকারভাবে গেয়েছেন প্রেম আর বিরহের গানও। তিনি সবাইকে আহ্বান জানান বব ডিলানের লিরিক মনোযোগ দিয়ে পড়া আর বোঝার জন্য।

শিল্পীরা বব ডিলানের গান গাইছেনবিপক্ষ দলের শেষ বক্তা কায়সার হক বলেন, নোবেল নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। আর যে ক্যাটাগরি সাহিত্য নিয়ে আমরা তর্ক করছি সেই সাহিত্যের সংজ্ঞাই তো পরিবর্তনশীল। যে রচনাগুলো একসময় মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে বেড়াত গীত হিসেবে যেমন বাউল গান বা আমাদের ময়মনসিংহ গীতিকা তা আজ পড়া হয় সাহিত্য হিসেবে। অনেক আগে যেসব ছিল কেবল গানে গানে ধর্মীয় কাহিনী, যেমন মঙ্গলকাব্য, তাও আজ সাহিত্য। সাহিত্যের ধর্মই তো এমন, যেকোনো কিছুকে নিজের ছাঁচে গড়ে নেয়া। তাহলে বব ডিলানের তাৎপর্যপূর্ণ গানকে কেন সাহিত্য বলা যাবে না? ইংরেজি বিভাগের অনেক থিসিস লেখা হয়েছে ডিলানের ওপর। ইতোমধ্যেই বব ডিলানের গান সংকলন করে প্রকাশিত হয়েছে বই। কায়সার হক সাহিত্যপ্রেমীদের আরও লিবারাল হওয়ার পরামর্শ দিয়ে শেষ করেন নিজের বক্তব্য।

ভিন্নধর্মী এই অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রধান প্রফেসর শামসাদ মর্তূজা। বিতর্কের বক্তা, প্রধান অতিথি এবং শিল্পীদের হাতে উপহার তুলে দেন ইউল্যাব বোর্ড অভ ট্রাস্টির সদস্য জুডিথা ওলমেকার।
এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা উত্তেজনাময় এই বিতর্ক শেষে বিচারক আর দর্শক উভয়ের রায়ে সিদ্ধান্ত হয় যে, বব ডিলান সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার যোগ্য। অসাধারণ এই বিতর্ক শেষে বব ডিলানের জনপ্রিয় কিছু গান গেয়ে দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করেন রেনাটার কায়সার কবির, ফিডব্যাকের ফুয়াদ নাসের বাবু, পিট গ্রিল এর বাপ্পী রহমান, ম্যাক ও ঢাকার মাকসুদ, ফ্রিল্যান্স মিউজিসিয়ান ইহসানুল হক এবং রেনেসাঁর শাহবাজ খান পিলু, রেজাউর রহমান ও প্রফেসর ইমরান রহমান, যিনি বর্তমানে ইউল্যাবের ভিসি।

ছবি : ফারজানা আক্তার

লাইভ

টপ