ভালো লেখক নিজেই তার বড় সম্পাদক : রাজু আলাউদ্দিন

Send
.
প্রকাশিত : ১৫:০২, জানুয়ারি ০৯, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১৭, জানুয়ারি ০৯, ২০১৭

রাজু আলাউদ্দিনরাজু আলাউদ্দিন কবি ও অনুবাদক। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা বিশের অধিক। তিনি বিডিনিউজ২৪-এ কর্মরত। ফেসবুক যুগে সহিত্য সম্পাদনার নানা বিষয় নিয়ে জাহিদ সোহাগের লিখিত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন তিনি। আগামীকাল ছাপা হবে প্রথম আলোর সাহিত্য সম্পাদক আলতাফ শাহনেওয়াজের সাক্ষাৎকার।


বাংলা ট্রিবিউন : ফেসবুকের কারণে দৈনিক বা অনলাইনের সাহিত্য কি কোনো সঙ্কটে পড়েছে?
রাজু আলাউদ্দিন : আমার তা মনে হয় না। কাগজ-নির্ভর দৈনিক পত্রিকা সঙ্কটে পরলেও পরতে পারে, তবে অনলাইনের সাহিত্য সঙ্কটে পরছে বলে মনে হয় না। এর কারণ অনলাইনের পাঠক সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।

বাংলা ট্রিবিউন : ‘দেশ’-এ কবিতা ছাপা হলেও ছবি তুলে স্ট্যাটাস দিতে হয়। ফেসবুকের সঙ্গে কি প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্য দৌড়ে পারছে না?
রাজু আলাউদ্দিন : ‘দেশ’-এ কবিতা ছাপা হলে তা যদি ছবি তুলে স্ট্যাটাস হিসেবে দিতে হয় তাতে করে ফেসবুকের সাথে প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতা নয়, বরং একে আমি সহায়ক হিসেবেই দেখতে চাই। এখানে ঠিক প্রতিযোগিতার প্রশ্ন নয়, এটা মূলত প্রচারমুখিতার একটা ধরন মাত্র। আর এতে আমি দোষেরও কিছু দেখি না। তবে দোষের হতে পারে সেটাই যদি কেউ মনে করেন ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশ পাওয়াটাকেই কবি চূড়ান্ত অর্জন বলে ভাবেন। ‘দেশ’ আগে ভালো ছিল, এখন এটি বাজে লেখার গার্বেজে পরিণত হয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউন : গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, অনুবাদ—এ নিয়েই তো আমাদের সাহিত্য সাময়িকী, এবং লেখকরাও প্রায় ঘুরে ফিরে নির্ধারিত। আপনি কি মনে করেন, দৈনিক/অনলাইনের সাহিত্য সমকালীনতা বুঝতে পারছে না, বা কেমন হওয়া উচিৎ তার সাহিত্য?
রাজু আলাউদ্দিন : যেমনটা বলেছেন, ‘গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, অনুবাদ’—মূলত এগুলোই তো সাহিত্য সাময়িকীর মূল উপজীব্য, কিন্তু নতুন সংবেদে, নতুন ভাবনায়, নতুন সজ্জায় পাঠককে আলোড়িত করার মতো প্রতিভার স্ফূরণ ঘটতে দেখি কম, তাই প্রতি সপ্তাহে পত্রিকাগুলোয় যা বের হয় তা একুরিয়ামে মৃত মাছের নিষ্প্রাণ প্রদর্শনীর মতো মনে হয়। তাছাড়া, গোত্র ও গোষ্ঠী, স্বার্থ ও অন্ধত্ব, অসততা ও অজ্ঞতার চতুর বন্ধনে এগুলো এত শৃঙ্খলিত যে আপনি এখান থেকে ভিন্ন রকম কিছু আশা করতে পারেন না। সুতরাং ‘দৈনিক/অনলাইনের সাহিত্য সমকালীনতা বুঝতে’ পারাটাতো আরও দূরের কথা। কেমন হওয়া উচিৎ? সেটার খানিকটা ইশারা আপনি দেখতে পাবেন অনলাইন সাহিত্যসাময়িকীগুলোর দিকে তাকালেই। কাগজ-নির্ভর সাহিত্য সাময়িকীগুলোর চেয়ে অনলাইন সাহিত্য সাময়িকীগুলো বরং অনেক বেশি আকর্ষণীয় ও বৈচিত্রপূর্ণ, কিন্তু তার মূল সমস্যাটা সম্পাদনা বোধের অভাব। যিনি এখানে লেখেন তার নিজের মধ্যে যেমন, তেমনি সম্পাদকরাও এই একই অভাবে সমৃদ্ধ। কিন্তু এই অভাবকে তারা পুষিয়ে দেন খানিকটা নতুন নতুন ভাবনা ও চিন্তার দুঃসাহসের মাধ্যমে।

বাংলা ট্রিবিউন : সাহিত্য সম্পাদনার ক্ষেত্রে আপনি কি প্রাতিষ্ঠানিক রুচি বা ইচ্ছা দ্বারা প্ররোচিত হন?
রাজু আলাউদ্দিন : হই এবং হই না—দুটোই সত্য। গোটা প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক রুচির বাইরে গিয়ে আপনি কিছু করতে পারবেন—এটা ভাবা বোকামি এবং অবাস্তবও বটে। তবে সত্যিকারের একজন সাহিত্যরুচিসম্পন্ন ও মর্যাদাসম্পন্ন সম্পাদক এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই অনেক কিছু করতে পারেন ইচ্ছে করলে। তিনি পুরোপুরি দাসমনোবৃত্তি সম্পন্ন হলে প্রতিষ্ঠানের বেনিয়া ধানের খই-ই ফোটাতে থাকবেন—তাতে কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু তিনি যদি নিজের সংস্কৃতির বিকাশে ও সৃষ্টিশীলতার প্রতি দায়বদ্ধ থাকেন তাহলে প্রতিভাবান তরুণদের গুরুত্বপূর্ণ লেখা প্রকাশের এবং নতুন নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করার দায়িত্বটিও পালন করতে পারেন। সম্পাদক যেমন প্রতিষ্ঠানের রুচির পরিচর্যা করবেন, তেমনি প্রতিষ্ঠানের রুচি ও মর্যাদা নির্মাণেও ভূমিকা রাখতে পারেন। এই ভূমিকা পালনে প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য ও বাধ্য করার দায়িত্বও তার থাকতে হবে।

বাংলা ট্রিবিউন : একদিকের বক্তব্য, ফেসবুকের সাহিত্য ‘অসম্পাদিত এবং অনির্বাচিত’—লেখক তার উৎকর্ষ কোথায় তা বুঝতে পারেন না। অপরদিকে, সাহিত্য সম্পাদকরা তাদের লেখক তালিকার মধ্যেই থাকতে বেশি পছন্দ করেন—এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।
রাজু আলাউদ্দিন : ফেসবুকের সাহিত্য ‘অসম্পাদিত এবং অনির্বাচিত’—এতে কোন সন্দেহ নেই। যেহেতু এখানে দ্বিতীয় চোখের (মানে সম্পাদক) অভাব। তবে আমি এতে শঙ্কিত বোধ করি না এই জন্য যে, ফেসবুক এখনও পর্যন্ত একটি নতুন মাধ্যম। যে-তরুণ লেখক হিসেবে প্রতিভাবান তিনি নিজেই বুঝতে পারবেন কোন লেখাটি কতটুকু সম্পাদনার পর তা প্রকাশ করা উচিৎ। ভালো লেখক নিজেই তার বড় সম্পাদক, তিনি লেখাটির উৎকৃষ্ট রূপটি ঠিকই বুঝতে পারেন। এটা ঠিক যে, ফেসবুকে এখনও পর্যন্ত প্রতিভাবান লেখকদের তুলনায় অলেখকদের প্রাদুর্ভাবই বেশি আর এটাই স্বাভাবিক, কারণ আপনি এটাকে সাহিত্য মাধ্যম হিসেবে দেখলেও, ফেসবুকতো সাহিত্য মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়নি, হয়েছে সামাজিক যোগাযোগের একটি মাধ্যম হিসেবে। সুতরাং আপনি যে এটাকে সাহিত্যের একটি মাধ্যমে হিসেবে ব্যবহার করতে পারছেন—এটা একটা বাড়তি প্রাপ্তি নয় কি?

বাংলা ট্রিবিউন : সংবাদমাধ্যমে কেমন সাহিত্য হওয়া উচিৎ বলে মনে করেন?
রাজু আলাউদ্দিন : ঐতিহ্যবাহী ধারণার বাইরে গিয়ে নতুন করে ভাবা উচিৎ যদি নতুন প্রজন্মকে তারা এর সাথে যুক্ত করতে চায়। তাহলেই তারা বুঝতে পারবে কেমন সাহিত্য হওয়া উচিৎ। নতুনদেরকে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য সম্পর্কে যেমন ওয়াকিবহাল করতে হবে, তেমনি সৃষ্টির মাধ্যমে এই ঐতিহ্যের আয়তনও বৃদ্ধি করতে হবে। এই দুই দিকে নজর রাখলেই একজন সম্পাদক বুঝতে পারবেন সংবাদমাধ্যমে সাহিত্য কেমন হওয়া উচিৎ।

 

লাইভ

টপ