behind the news
Vision  ad on bangla Tribune

তামাশার শহরে আমি এবং মোহনা

শেরিফ আল সায়ার১৫:১৭, মার্চ ০২, ২০১৭


মোহনার জন্য শাড়ি কিনলাম। সঙ্গে দুই ডজন কাঁচের চুড়ি। এক ডজনের রঙ সবুজ, বাকিগুলো লাল। শাড়ির সঙ্গে কাঁচের চুড়ি মোহনার খুব পছন্দ। আমাদের যখন প্রেম ছিল, যখন এই শহরে রিকসা দিয়ে ঘুরে বেড়াতাম তখন রাস্তায় চুড়ি বিক্রি করতে দেখলেই মোহনা নেমে যেত। বলতো, ‘আমাকে চুড়ি কিনে দেবে?’
মোহনাকে চুড়ি কিনে দেয়ার মধ্যে আমি কেন যেন তৃপ্তি অনুভব করতাম। চুড়ির সঙ্গে চুড়ির ঘর্ষণে টুংটাং একটা শব্দ হয়। শব্দটা আমার খুব পছন্দ। বড্ড রোমান্টিক মিউজিক মনে মতো। মনে হতো যখনই শব্দটা হবে ঠিক তখনই মোহনা অনুভব করবে চুড়িগুলো আমার দেয়া। সারাক্ষণ ওই শব্দের সঙ্গে আমার প্রেম মোহনার সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যাবে। মাঝে মাঝে মোহনা যখন আমার হাত ধরতো তখন কাঁচের চুড়িগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি বাড়ি খেয়ে শব্দটা হতো। তখন আমি মজা করে বলতাম, ‘দেখেছো? আমাদের প্রেমের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক!’ মোহনা হাসতো, ওই হাসির মধ্যে আমার ডুব দিতে মন চাইতো। যাইহোক, বলছিলাম আজ মোহনার জন্য শাড়ি কিনেছি, সঙ্গে দুই ডজন চুড়ি।
খুব সাবধানে শাড়ির ব্যাগটা ধরে রিকসায় বসে আছি। রিকসা চলছে। ধানমন্ডি থেকে রিকসা নিয়ে যাচ্ছি ফার্মগেট আনন্দ সিনেমা হলের দিকে। খুব ভয় লাগে এই শহরে চলাফেরা করতে। কখন পাশে একটা বাইক এসে দাঁড়াবে আর টান দিয়ে চলে যাবে কিংবা ছুরি বা বন্দুক নিয়ে হাজির হবে—বলবে, ‘যা আছে সব দে।'
কখন আমার মোহানার জন্য কেনা সুন্দর লাল শাড়িটা নিয়ে যাবে, তা কী বলা যায়? তবে এখন তো আমি শক্ত মানুষ। মোটরসাইকেলে আসুক আর হেঁটে আসুক—ঘুরে আমি দাঁড়াবই। এসব ছ্যাচড়া চোর কিংবা ছিনতাইকারীরা শহরটাকে তামাশা বানিয়ে রেখেছে। তার চেয়েও বড় তামাশা তো আমরা নিজে। পাশের কারও ছিনতাই হচ্ছে আর সেই তামাশা দেখছি সবাই, কারও কোনও সহযোগিতা নেই। কেউ এগিয়ে আসে না। কেউ বাঁচাতে আসে না। অথচ কেউ বোঝে না—এক-দুইবার যদি কেউ ঘুরে দাঁড়ায় তবে আর তাদের সাহস হবে না।
একবার কী হয়েছে শুনবেন? আমি আর মোহনা রিকসা দিয়ে যাচ্ছি। দুজন দুজনের হাত ধরে বসে আছি, গল্প করছি। হুট করেই দেখি মোহনা চিৎকার দিয়ে উঠলো। আমি খেয়াল করলাম একদম কিশোর বয়সী ৪ জন ছেলে মোটরসাইকেলে করে রিকসার পাশে আস্তে ব্রেক কষে মোহনার ব্যাগটা ধরে দিল টান। আমি চিৎকার করলাম, মোহনাও করলো কিন্তু কেউ এগিয়ে এলো না। এগিয়ে আসা তো অনেক দূরের কথা। কেউ তাকিয়েও দেখেনি। তাই বলেছি এটা একটা তামাশার শহর। তামাশা হবে এবং সেই তামাশা মানুষ দেখবে। তামাশা দেখাটাও একটা তামাশায় রূপ নিয়েছে।
যাইহোক, রিকসা আমার চলছে। মার্কেট থেকে শাড়ি কিনেছি, ফুটপাথ থেকে চুড়ি কিনেছি। এখন রিকসাটা গ্রীন রোডের সিগনালে দাঁড়িয়ে। হুট করেই এক হিজড়া আমার হাঁটুতে তার হাত ঘষা শুরু করলো। ওহ! হিজড়া বলা তো ঠিক না। বলতে হবে ‘তৃতীয় লিঙ্গ।' তাদের প্রতি আমাদের অনেক সহমর্মিতা, সহানুভূতি। সব লিখিত রূপে, বাস্তবে সহানুভূতিও নেই, তাদের পুনর্বাসনও নেই। ঠিকই রাস্তা রাস্তায় এভাবেই সাধারণ মানুষকে হেনস্তা করে। সে যখন আমার হাঁটুতে হাত বোলাচ্ছিল ঠিক তখন আমি ভয়ে আঁতকে উঠলাম! একি! আমি শাড়ির ব্যাগটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। সে বলছে, ‘সাহায্য করেন স্যার।'
আমি বললাম, ‘সেটা ঠিক আছে। আপনি আমার গায়ে হাত দিচ্ছেন কেন?’
সে বাঁকা হাসি দিয়ে বলে, ‘এতো লজ্জা পান কেন স্যার? ট্যাকা দেন।'
আমার খুব রাগ হচ্ছিল। চোখ দুটি বড় করে আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি। সে আবার আমার হাঁটুতে হাত বুলাতে বুলাতে বলে, ‘চোখ গরম কেন সোনা?’
আমি তার হাত সরিয়ে চিৎকার দিয়ে বলে উঠলাম, ‘এই—এই সরে দাঁড়াও। এক টাকাও দিব না। কাজ করে খাও। মানুষকে বিরক্ত করো কেন তোমরা?’
এটা বলার সঙ্গে সঙ্গে দেখি তার পাশে আরও দুজন এসে দাঁড়ালো। সঙ্গে আরেকটা উঠতি বয়স্ক ছেলেও এসেছে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাফিককে ডাকা শুরু করলাম। ইতিমধ্যে তারা আমাকে গালাগালি করছে। একজন বলছে, ‘শালায় কয় কাম কইরা খাও, কেডা কাম দিবো? দিবা তুমি? কাম তো দিবা না।’ আর যে হিজড়া আমার গায়ে হাত দিচ্ছিল সে বলা শুরু করলো, ‘ডাক তোর কোন বাপরে ডাকবি।' ট্রাফিক দূর থেকে আমাকে দেখেছে কিন্তু এগিয়ে আসছে না। আশেপাশে এতোগুলো গাড়িতে লোকজন। তারা কেউ আমার দিকে এগিয়ে আসছেন না।
পাশের রিকসায় যাত্রীকে বললাম, ‘ভাই দেখছেন? কিছু বলেন আপনারাও।’ ওই যাত্রী বলে উঠলো, ‘ভাই দিয়া দেন কিছু। দশ-বিশ টাকার জন্য এদের সঙ্গে ঝামেলায় জড়ানো কি দরকার?’
আশেপাশে তখন অনেকেই একই কথা বলে উঠলো। ট্রাফিকও এসে হাজির। সে মিটিমিটি হাসি দিয়ে বলল, ‘কি হইছে?’
আমি তাকে ঘটনাটা বললাম, সেও আমাকে ছবক দিল। বলল, ‘ভাই এই জ্যাম নিয়া আছি ঝামেলায়, আপনি এমনভাবে চিল্লাইতেছেন মনে হইতেছে ছিনতাইকারী ধরছে।’
আমি অবাক হয়ে সবাইকে দেখলাম। কেউ এগিয়ে আসলো না? আমি ম্যানিব্যাগ যখন বের করছি তখন কুৎসিৎ ভাষায় তারা আমাকে গালি দিচ্ছে। আমি কী বলবো? কিছুই বলার নেই। সহ্য করছি। এই শহরে বাস করার সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হলো সহ্য করে যাওয়া।
ঠিক এমনই এক ঘটনা ঘটেছিল ধানমন্ডি লেকের একটু কাছে। ঘটনাটা মোহনার কাছ থেকে শোনা। মোহনা একবার আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। আমি আসলেই একসঙ্গে ঘুরতে যাবো। তখন নাকি কিছু মহিলা তার কাছে এসে বলল, ‘আমার রাণির বিয়ে, টাকা দাও।'
মোহনা প্রথমে রাণিটা কে বুঝতে পারেনি। সরল বিশ্বাসে প্রশ্ন করলো, ‘রাণি কে?।' তখন তাদের মধ্যে এক মহিলা একটা পিতলের কৌটা দেখিয়ে বলল, ‘এইডার মধ্যে রাণি আছে, দেখবি মাগী? গায়েত ছাইড়া দিমু। তাড়াতাড়ি ট্যাকা দে।'
ঘটনার আকস্মিকতায় মোহনা ভেবাচ্যাকা খেয়ে ব্যাগ বের করলো টাকা দেওয়ার জন্য। তখন হাতের ছোট্ট ব্যাগটা ওই মহিলা টান দিয়ে নিয়ে গেল। তারা সবাই মিলে ব্যাগের ভেতরের সব টাকা নিয়ে মোহনার হাতে খালি ব্যাগটা দিয়ে গেল। মোহনা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিল। আশেপাশে তখনও অনেক মানুষ ছিল। সবাই দেখেছিল। তবুও হুট করেই নাকি একটা ছেলে এগিয়ে এসেছিল। সে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশকে গিয়ে বলল, ‘ভাই দেখে যান একজন মেয়ের কাছ থেকে জোর করে টাকা নিয়ে যাচ্ছে।' কিছুক্ষণ নির্বাক থেকে তারা ছেলেটিকে প্রশ্ন করলো, ‘আপনার কী হয়?’ ছেলেটিও বিস্মিত! সে তবুও বলল, ‘ভাই তিনি কেউ হন না। কিন্তু জোর করে তার ব্যাগ থেকে টাকা নিচ্ছে আপনারা একটু আসুন।'
পুলিশ আসেনি তখনও। তারা ছেলেটিকে বলে দিল, ‘ওটা দেখা আমাদের ডিউটি না। আমাদের ডিউটি এখানে।’ ছেলেটি আর কথা বাড়ায়নি। চলে গেল। শুধু মোহনার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আপু আমি আপনাকে কিছু টাকা দিতে চাই। আপনি বাসায় যান।’
মোহনার ছলছল চোখ নাকি সেদিন ভালোবাসায় ভরে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ আগে সে মানুষরূপে দানব দেখেছিল, এখন যেন সে সত্যি-সত্যি মানুষ দেখতে পেল।
এভাবেই তো এই শহর নষ্ট হয়ে গেল। ক্রমাগত ছিনতাই হওয়া জাতিকে প্রশ্ন করা হয়, আপনার কি ছিনতাই হয়েছে? এমন ছিনতাইয়ের তো ব্যাখ্যা নেই।
গ্রীন-রোডের সিগনাল পেরিয়ে রিকসা যাচ্ছে ফার্মগেটের দিকে। তখন এক বন্ধু ফোন দিলো, বলল—‘দোস্তো, তুমি কোথায়?’
আমি বললাম, ‘বাসায় যাচ্ছি।' তারপর সে জিজ্ঞেস করলো, ‘ঘটনা শুনেছিস?’
আমি তো অবাক! আবার কার কি হলো? আবার কার জীবনে অন্ধকার নেমে এলো? আমি বললাম, কি হয়েছে রে?' বন্ধু আমাকে জানালো, ‘ঘটনা শুনিসনি? বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কোটি ডলার হ্যাকাররা লোপাট করেছে।’
আমি স্বস্তি পেলাম। যাক বাবা! কারও কোনও ক্ষতি হয়নি। আমার এই বন্ধুর নাম রুস্তম। দেশ নিয়ে সে মহা চিন্তিত। দেশের চিন্তায় তার ঘুম হয় না। সারাদিন শুধু ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেবে আর বিভিন্ন নিউজের লিঙ্ক শেয়ার দেবে। আমি ওতো চিন্তিত না। বাংলাদেশ ব্যাংকে কি হয়েছে তা দিয়ে আমার কি হবে? আমি খুব একটা আগ্রহ দেখালাম না। রুস্তম বিষয়টা খেয়াল করেই বলল, ‘তুই এই বিষয়টা নিয়ে একটুও চিন্তিত হবি না?'
আমি বললাম, ‘কিছুক্ষণ আগে কয়েকজন হিজড়া সবার সামনে জোর করে আমার মানিব্যাগ থেকে টাকা লুট করে নিয়ে গেল। কেউ তো চিন্তিত হলো না। বরং দিলে এমন কি-ই বা হয় সেই প্রশ্ন করলো। তো বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ে কি ভাববো?’
রুস্তম মহা খেপে বলল, ‘শালার পুওর মিডলক্লাস। তুই আর গোটা রাষ্ট্র কি এক হলো?’ রুস্তম আরও বলল, ‘তোদের মতো পুওর মিডলক্লাসরা ১০ টাকার চোরকে মেরে রক্তাক্ত করতে পারিস কিন্তু বড় চোরদের নিয়ে কথা বলা তো দূরের কথা সেসব নিয়ে ভাবিসও না।’ আমি হাসলাম। রুস্তম রাগ করে ফোনের লাইন কেটে দিল। রুস্তম অনেক ভাবে। রাষ্ট্র নিয়ে অনেক ভাবে। আমি স্বার্থপর। তাই ভাবি না। আমি নিজের স্বার্থ নিয়েই ভাবি।
যাইহোক, আমি আনন্দ সিনেমা হলের সামনে নেমে হাঁটা শুরু করলাম। বাসার দিকে। বাসায় মোহনা একা। ঘড়িতে তখন রাত ৮টা বেজে গেছে। ঘরের বুয়ার সময় ৮টা পর্যন্ত। সে তার চলে যাওয়ার সময়টা খুব মেনে চলে। ঠিক আটটা বাজলেই বাইরে থেকে তালা মেরে চলে যাবে। মোহনা তো বিছানায়। তাকে এখন আর বলেও যেতে হয় না।

দুই
দুঃখিত প্রিয় পাঠক, গল্পের শুরু থেকেই আমার স্ত্রীর নাম বলছি। কিন্তু তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো না। আমার স্ত্রীর নাম মোহনা হক। বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। আমাদের প্রেম হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতেই। ওই প্রেম পরিণতিতে পৌঁছায় আমার চাকরি হওয়ার পর। আমার চেয়েও ভালো চাকরি পেয়েছিল মোহনা। মাইনে ছিল ত্রিশ হাজারের বেশি। দুজনের টাকায় সুন্দর সংসার গোছাবো বলেই পরিবারিকভাবে বিয়েও হলো। তারপর একদিন বিয়ের আনন্দযাপন করতে যাই কক্সবাজার। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে আমাদের প্রেমও যে উত্তাল হয়েছিল। বিশেষ করে গভীর রাতে সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ, আর উপরে খোলা আকাশের দিকে তাকালে মিটিমিটি জ্বলতে থাকা তারাগুলো যখন দেখছিলাম তখন আমার বুকে মাথা রেখেছিল মোহনা। প্রশ্ন করেছিল, ‘কখনও ছেড়ে যাবে না তো?’ আমি শুধু বলেছিলাম, ‘যাবো না।'
আমি তো সত্যিই যাইনি। কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম রেলস্টেশন আসলাম। সেখান থেকে ট্রেনে চড়ে কমলাপুর আসলাম। দুজন তখন বিভোর স্বপ্নে ডুবে আছি। এবার তো সংসার গুছাতে হবে। টোনা-টুনির সংসারটাকে দাঁড় করিয়ে নিজেদের একটা বাড়ি করার দিকে নজর দিতে হবে, কত কি!
কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে যখন বের হলাম তখন সকাল হয়েছে কেবল। ঢাকা মাত্র জেগে উঠতে শুরু করেছে। আমরা সিএনজি অটোরিকসা খুঁজছিলাম। সেটাও পাচ্ছিলাম না। মোহনা আগে ওর বড় আপার বাসায় যাবে। মালিবাগ। তারপর নিজেদের বাসায় উঠবো। পরে ভাবলাম কমলাপুর থেকে রিকসায় চড়েই মালিবাগ রওনা দেই। রিকসা পেলাম। দুজনে দুটি ব্যাগ পায়ের নিচে রেখে গল্প করতে করতে যাচ্ছি। হুট করেই মোহনার চিৎকার। এমন ঘটনার শিকার আগেও আমরা হয়েছি। তবে এবার ব্যতিক্রম। হ্যান্ডব্যাগটা মোহনার কাঁধের সঙ্গে ঝোলানো ছিল। ব্যাগটা যখন টান দিল তখন মোহনাও প্রথমে শূন্যে তারপর রাস্তায় পড়ে চলতে থাকলো। মোহনা গিয়ে বাড়ি খেলো আইল্যান্ডের সঙ্গে। রক্তাক্ত মোহনা অজ্ঞান হওয়ার আগে বলল, ‘ওখানে ক্যামেরাটা ছিল... সব স্মৃতি ছিনতাই হয়ে গেলো।’
মোহনা বেঁচে তো রইলো। এও কি বাঁচা হলো? শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকা, কোনো বোধ নেই, কোনো শক্তি নেই, কোনো আওয়াজ নেই। দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকার পর ডাক্তাররা বলেছিল, ‘মানুষটা বেঁচে আছে। দোয়া করুন যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে যায়।’
এই ঘটনাটা ঘটেছে ৩ বছর হয়ে গেল। মোহনা এখনও নির্বাক, নিঃপ্রাণ। নল দিয়ে খাওয়ানো হয়, মাঝে মাঝে দম বন্ধ হয়ে আসে। তখন তার নিশ্বাস নিতেও পাইপ লাগে। এভাবেই চলছে।
মাঝে মাঝে ভাবি, মাথায় যখন সে তীব্র আঘাত পেয়েছিল তখন মোহনা ভাবছিল ব্যাগের সঙ্গে ছবিগুলোও তো ছিনতাই হয়ে গেল। মোহনা তখনও নিশ্চয়ই ভাবেনি, তার স্বপ্ন, তার সংসারও ছিনতাই হয়ে গেল রাষ্ট্রের অবহেলায়।
তবে মোহনা জানতো—এই শহরের মানুষের বিবেকও ছিনতাই হয়ে গেছে বহু আগেই। তাই এসব ছোটখাটো তামাশার শহরে আমার মোহনার মতো মানুষের কিঞ্চিৎ ক্ষতি কাউকে বিচলিত করে না। ছোট্ট ওই ব্যাগে ছিল ক্যামেরা, মোবাইল এবং কিছু টাকা। আর তো কিছু খোয়া যায়নি, মোহনা মরে যেতে পারতো। সে তো মরেনি। বেঁচে আছে। এটার মাঝেই বিকৃত এক সুখ আমাকে খুঁজে বেড়াতে বলে সবাই।
যাইহোক। বাসায় ঢুকছি। আমার হাতে শাড়ি এবং দুই ডজন চুড়ি। মোহনার খুব পছন্দ। জানি মোহনা বুঝবে না। জানি মোহনার ভালো কিংবা খারাপ কিছুই লাগবে না। কারণ ওর বোধ তো ছিনতাই হয়ে গেছে। তবুও মোহনাকে আমি শাড়ি পরাবো কষ্ট করে। মোহনার হাতে চুড়ি পড়াবো। তারপর ক্যামেরায় ছবি তুলে রাখবো। আমার অপেক্ষার পালা শেষ করে যেদিন মোহনা বোধ ফিরে পাবে। সেদিন মোহনার হাতটা শক্ত করে ধরে বলবো, ‘দেখেছো? বলেছিলাম না... যাবো না...।'

অলঙ্করণ : সঞ্জয় দে রিপন

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

IPDC  ad on bangla Tribune
টপ