মার্কেসের প্রেম

তপন শাহেদ১৩:৩৭, মার্চ ০৬, ২০১৭

রাস্তার দিকে দরজাঅলা একটা ঘরের আধ-খোলা দরজার কাছ পর্যন্ত আমি গেলাম। সেই বাড়িতে একটা মহিলাকে দেখলাম একটা এয়ার ম্যাট্রেসে ঘুমাচ্ছে; পা খালি আর পরনে একটা স্লিপ যেটা তার উরু পর্যন্ত ঢাকেনি। আমি কথা বলার আগেই সে ম্যাট্রেসে উঠে বসল, অর্ধঘুমন্ত চোখে আমার দিকে তাকাল, তারপর জিজ্ঞেস করল আমি কী চাই। আমি তাকে বললাম, আমি আমার বাবার কাছ থেকে বাড়ির মালিক দন এলিহিও মলিনার জন্য একটা খবর নিয়ে এসেছি। কিন্তু সন্ধান দেবার বদলে সে আমাকে ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিতে বলল। তারপর তার বাক্সময় তর্জনি দিয়ে আমাকে ইশারা করল :

“কাছে এসো।”
আমি গেলাম, এবং কাছে যেতেই তার ভারি নিশ্বাস বন্যাপ্লাবিত নদীর মতো ঘরটা ভরে ফেলল। তারপর ডান হাতে আমার বাহু আঁকড়ে ধরে বাম হাতটা আমার প্যান্টের সামনে দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। আমার এক সুখানুভূতিময় আতঙ্কের অনুভূতি হল।
“তাহলে তুমি ছোট ছোট ফোঁটাঅলা সেই ডাক্তারের ছেলে,” সে বলল। সেই সাথে তার দ্রুত পাঁচ আঙুলে, মনে হচ্ছিল যেন দশটি, আমার ট্রাউজারের ভেতরে হাতাচ্ছিল। সে আমার ট্রাউজার খুলে ফেলল, আর তার স্লিপটা মাথার ওপর তুলতে তুলতে কানে তপ্ত সব কথা ফিসফিস করে বলতে লাগল এবং চিত হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল, পরনে কেবল লাল ফুলআঁকা প্যান্টিটা। “এটা তোমাকেই খুলতে হবে,” সে আমাকে বলল। “পুরুষ হিসেবে এটা তোমার কর্তব্য।”
আমি জিপারটা টেনে খুলে ফেললাম, কিন্তু তাড়াতাড়িতে তার প্যান্টি খুলতে পারছিলাম না। পা লম্বা করে সাঁতারুর মত শরীর নাড়িয়ে আমাকে তার সাহায্য করতে হল। তারপর সে আমার বগলে ধরে আমাকে তুলে তার উপরে অ্যাকাডেমিক মিশনারি আসনে বসিয়ে দিল। বাকি কাজ সে নিজেই করল যতক্ষণ না আমি তার ঘোটকীর মত উরুর ওপর উপর পিঁয়াজের স্যুপ ছিটিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়লাম।
সে আমার চোখের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে নীরবে শুয়ে রইল, আর আমি আবার শুরু করার আশায় তার দিকে তাকালাম―এবার নির্ভয়ে এবং আরো বেশি সময়ের জন্য। আচমকা সে আমাকে বলল যে সে তার সেবার জন্য পাওনা দুই পেসো নেবে না, কারণ আমি প্রস্তুতি নিয়ে আসিনি। তারপর সে চিত হয়ে শুয়ে আমার মুখ খুঁটিয়ে দেখতে লাগল।
“তাছাড়া,” সে বলল, “তুমি লুইস এনরিকের বড় ভাই, ঠিক না? তোমাদের দুজনের গলার স্বর একই রকম।”
আমি নিরীহভাবে তাকে জিজ্ঞেস করলাম সে কীভাবে তাকে চেনে।
সে হেসে বলল, “বোকার মতো কথা বোলো না, শেষবার তার প্যান্টটা আমাকে ধুতে হয়েছিল, সেটা এখানেই আছে।”
আমার ভাইয়ের বয়সের কথা চিন্তা করে ভাবলাম সে বাড়িয়ে বলছে। কিন্তু যখন সে প্যান্টটা আমাকে দেখাল, তখন বুঝলাম ব্যাপারটা সত্যি। তারপর সে নগ্ন অবস্থায় বিছানা থেকে ব্যালের মতো সুন্দর ভঙ্গিতে লাফ দিয়ে উঠে পড়ল। কাপড় পরতে পরতে জানাল, দন এলিহিও মলিনা থাকে এই দালানেই পাশের ঘরে, বামে। শেষে জিজ্ঞেস করল:
“এটা তোমার প্রথমবার, ঠিক না?”
আমার হৃৎস্পন্দন মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
আমি মিথ্যা বললাম, “কী বলছ, আমি অন্তত সাতবার করেছি।”
সে একটা শ্লেষাত্মক ভঙ্গি করে বলল, “যাই হোক, তোমার উচিত তোমার ভাইকে বলা, যেন সে দুয়েকটা জিনিস তোমাকে শিখিয়ে দেয়।”
এই আরম্ভ আমার মধ্যে একটা প্রাণশক্তি সঞ্চার করল। ছুটি চলবে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। আমি ভাবছিলাম ওর কাছে আবার আসার জন্য প্রয়োজনীয় দুই পেসো আমি কতবার সংগ্রহ করতে পারব। ওদিকে, দুজন লোকে একসঙ্গে করে এবং তাতে দুজনই সুখ পায় এমন কিছুর জন্য আমাদের বয়সের কাউকে টাকা দিতে হয়, এমনতর কথা শুনে শরীর সম্বন্ধে ইতিমধ্যেই বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠা আমার ভাই লুইস এনরিক ভয়ানকভাবে হেসে উঠল।
কী বলা যায় একে? প্রেম তো একেবারেই নয়। তাহলে নারীসঙ্গ? নাকি আরো প্রত্যক্ষভাবে, যৌনসঙ্গম? ঠিক, এই হলো বিশ্বসাহিত্যের সদ্যপ্রয়াত দিকপাল গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের প্রথম যৌনসঙ্গমের অভিজ্ঞতা। সদ্য কিশোর মার্কেস তখন পরিবারের সাথে সুক্রে-তে থাকেন। টেলিগ্রাফ অপারেটর থেকে হোমিওপ্যাথি ডাক্তার বনে যাওয়া বাবার নির্দেশে এক পতিতালয়ে পাওনা আদায়ের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য গিয়ে এই অভিজ্ঞতা নিয়ে ফেরেন মার্কেস। তবে নারীশরীরের রোমাঞ্চকর রহস্যময় আলো-আঁধারি বালক মার্কেসকে ডেকেছিল আরো আগে:
“কার্যত যে-মেয়ে আমার কৌমার্য হরণ করেছিল, সে আসলে তা করতে চায়নি, আর সে কখনোই জানতে পারেনি যে সে তা করেছে। তার নাম ছিল ত্রিনিদাদ, আমাদের বাড়িতে কাজ করত এমন কারো মেয়ে ছিল সে, এবং এক প্রাণঘাতী বসন্তকালে সে বিকশিত হতে শুরু করলো। তার বয়স তখন তের, কিন্তু তখনো সে তার নয় বছর বয়সের কাপড়গুলো পড়ত। আর ওগুলো এত আঁটসাট হত যে, ন্যাংটো থাকার চেয়েও তাকে নগ্ন মনে হত। এক রাতে সে আর আমি উঠানে একা, সামনের বাড়ি থেকে আচমকা ব্যান্ড বেজে উঠল, আর ত্রিনিদাদ আমার সাথে নাচতে আরম্ভ করলো। আমাকে সে এমন শক্ত করে ধরেছিল যে আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। তার কী হয়েছিল আমি জানিনা, কিন্তু আজও সেই উন্মত্ততা মাঝরাতে কাঁপিয়ে আমার ঘুম ভেঙে দেয়, এবং আমি জানি, তার শরীরের প্রত্যেক ইঞ্চি স্পর্শ করে এবং তার শরীরের জান্তব গন্ধে আমি অন্ধকারেও তাকে চিনতে পারব। সেই মুহূর্তে আমি আমার শরীর সম্বন্ধে সচেতন হয়েছিলাম সহজাতবোধের এমন এক ঝলকানির সাথে, যা আমি আর কখনোই অনুভব করিনি। আর সে ঘটনাকে আমি এক পরম সুন্দর মৃত্যু হিসেবে স্মরণ করি। সেই ঘটনার পরে আমি এক অনিশ্চিত ও বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে জানলাম যে, এক উদঘাটন-অযোগ্য রহস্য আছে যা আমি জানি না, কিন্তু তা আমাকে এমন নাড়িয়ে দিয়েছিল যে মনে হয়েছিল আমি সেটা জানি। তবে পরিবারের মেয়েরা সবসময় আমাকে কৌমার্যের শুকনো পথে চালিয়েছে।
কৌমার্য হারানোর ঘটনা একই সাথে আমাকে শিখিয়েছিল যে, ক্রিসমাসে যে আমাদের খেলনা এনে দেয় সে শিশু যিশু নয়, কিন্তু আমি যাতে সেটা বলে না ফেলি সে ব্যাপারে সতর্ক ছিলাম। যখন আমার বয়স দশ, তখন আমার বাবা বড়দের ঐ গোপন রহস্য আমার কাছে প্রকাশ করেছিলেন, কারণ তিনি আন্দাজ করেছিলেন যে আমি সেটা জেনে গেছি। তিনি আমাকে আমার ভাই-বোনদের খেলনা নির্বাচনের জন্য ক্রিসমাস উৎসব উপলক্ষে বসা দোকানগুলোতে নিয়ে গিয়েছিলেন। একই ব্যাপার ঘটেছিল শিশুজন্মের রহস্যের ব্যাপারেও, এমনকি মাতিলদা আরমেনতার ঘটনা [বাড়ির এক কাজের মহিলা, শিশু মার্কেস যার বাচ্চা হওয়ার দৃশ্য দেখে ফেলেছিলেন] দেখার আগেই। লোকেরা যখন বলত যে একটা বক প্যারিস থেকে বাচ্চাদের নিয়ে আসে, হাসতে হাসতে আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যেত। তবে আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে, তখন যেমন পারিনি, তেমনি এখনো আমি যৌনসঙ্গম আর শিশুজন্মের মধ্যে সম্পর্কের ব্যাপারটা বুঝতে পারি না। ব্যাপার যা-ই হোক, আমার মনে হয়, মহিলাদের সাথে আমার যে-গোপন যোগাযোগ আছে বলে আমি বিশ্বাস করি তার রহস্যসূত্রের একটি উৎস হতে পারে বাড়ির কাজের মহিলাদের সাথে আমার সেই ঘনিষ্ঠতা, এবং সে ব্যাপারটাই আমার সমস্ত জীবন ধরে আমাকে পুরুষদের চেয়ে মেয়েদের সাথেই বেশি সহজ ও নিশ্চিতভাবে মিশতে দিয়েছে। এটা আমার এই দাবিরও উৎস হতে পারে যে, তারাই পৃথিবীকে রক্ষা করে, আর আমরা পুরুষেরা আমাদের ঐতিহাসিক পাশবিকতা দিয়ে একে নৈরাজ্যে নিক্ষেপ করি।”

সুতরাং, দেখা যাচ্ছে, এবং স্বাভাবিকভাবেই, মার্কেসের―যিনি কিনা শিগগিরই হয়ে উঠবেন মানবজীবনের অন্যতম ব্যাখ্যাতা, বলবেন যে, যাপিত জীবন নয়, স্মৃতিতে বেঁচে-থাকা জীবন আর তার বয়ানই হলো প্রকৃত জীবন―নারী-অভিজ্ঞতা নিছক যৌনসঙ্গম হয়ে থাকেনি, আর মার্কেসের জীবনে, অন্তত প্রথম জীবনে, এই অভিজ্ঞতা প্রচুর। সেই অভিজ্ঞতার বয়ান তাঁর জবানিতেই চিরকালিনতা পেয়েছে তাঁর আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ডে (পরিকল্পিত ২য় ও ৩য় খণ্ড আর লেখা হয়নি স্মৃতি―যে স্মৃতিই ছিল তাঁর কাছে জীবন―হারানোয়)। স্পষ্টতই মার্কেসের বাল্য-কৈশোর আর রবীন্দ্রনাথের বাল্য-কৈশোরে বিস্তর ফারাক; বাংলা সাহিত্যের পাঠকের পক্ষে তা একই সাথে বর্ণময় আকর্ষক, অ-সাধারণ, বি-দেশীয়, এমনকি মনের গভীরে অগৌরবজনক বলে রায় পাবে নিঃসন্দেহে, অন্তত নারী-অভিজ্ঞতা কিংবা তার বয়ানের ব্যাপারে। তাই শিল্প-আভরণবিহীন নগ্ন বর্ণনার ঝুঁকি না নিয়ে মার্কেসেরই মায়াবি স্মৃতিচারণে সেই অভিজ্ঞতা শোনা ভাল। এই লেখকের কাজ শুধু সূত্রধরের।

পারিবারিক পরিবেশেই যৌন স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থেই অ-সাধারণ দৃষ্টান্ত মার্কেসের কৈশোর-যৌবন। পরিবারের কাছ থেকে দূরে স্কুলে পড়ার সময় মার্কেস মানসিক অবসাদে আক্রান্ত হন এবং তাঁকে ডাক্তারের কাছে যেতে হয়। কিন্তু ডাক্তার নন, তাঁর রোগের নিরাময় করেন তাঁর দর্জি ভাই আবেলার্দো:
“ফোল্ডিং পার্টিশান দিয়ে দুভাগ করা একটা দোকানঘরে সে থাকত। দর্জি হিসেবে তার দিন ভালই কাটছিল, তবে একজন সতর্ক রমণদক্ষ পুরুষ হিসেবে যতটা, ততটা নয়। কারণ একাকি ক্লান্তিকর সেলাই মেশিনের চেয়ে উপযুক্ত সঙ্গিনীসহ পার্টিশানের পিছনের ঘরের বিছানাতেই সে বেশি সময় কাটাত।
...
আমার ভাই আবেলার্দোর জন্য বিছানায় সমাধান করা যায় না জীবনে এমন কোনো সমস্যা ছিল না। আমার বোনেরা যখন সমবেদনার সাথে আমাকে দেখত, তখন তার দোকানে আমাকে দেখা মাত্রই সে আমাকে যাদুকরী ব্যবস্থাপত্র দিল:
“তোমার কেবল দরকার একটা ভাল মেয়ে।”
সে ব্যাপারে সে এত আন্তরিক ছিল যে, আমাকে তার দোকানের পার্টিশানের পেছনে রেখে প্রায় প্রতিদিন আধঘণ্টার জন্য সে কোণার দিকে বিলিয়ার্ড পার্লারে যেত। সাথে রেখে যেত তার হরেক রকম মেয়েবন্ধুদের, প্রতিবার নতুন একজন। সেটা ছিল এক সৃজনশীল আনন্দের কাল। দৃশ্যত সেটা আবেলার্দোর রোগনির্ণয়ের যাথার্থ্য নিশ্চিত করেছিল, কারণ পরের বছর আমি সুস্থ মনে স্কুলে ফিরে গেলাম।”
এরকম যৌন অভিজ্ঞতা মার্কেসকে লেখক হিসেবে বেড়ে উঠতে শুধু সাহায্যই করেছিল বলে প্রতীয়মান হয়, তাঁকে নিঃশেষ করেনি। তাই শুধুমাত্র লেখক হবার উন্মাদনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট-চুকানো মার্কেসকে যখন তাঁর মা খুঁজে বের করে বাবার ইচ্ছে অনুযায়ী শিক্ষিত হয়ে চাকরিজীবী হবার কথা বোঝাচ্ছেন তখন মার্কেসের অবস্থা দেখি এমন:
“পরের মাসেই আমার বয়স হবে তেইশ; ছয় সেমিস্টারের পর কেবলই আইন পড়া ছেড়ে দিয়ে হাতের কাছে যা পাই তা-ই পড়ায় সম্পূর্ণভাবে মন দিয়েছি, আর ছিল স্প্যানিশ স্বর্ণযুগের অননুকরণীয় কবিতা স্মৃতি থেকে আবৃত্তি করা। ততদিনে অনুবাদে আর রূপান্তরিত সংস্করণে উপন্যাসের রচনাকৌশল সম্বন্ধে সম্ভাব্য প্রয়োজনীয় সব বই আমার পড়া হয়ে গেছে। খবরের কাগজের সাহিত্য-সাময়িকীতে বেরিয়েছে ছয়টি গল্প, যেগুলো বন্ধুদের উদ্দীপনা আর অল্প ক’জন সমালোচকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। সেনাবাহিনীতে চাকরি করার বয়স পেরিয়ে গেছে, দু-দফা গনোরিয়ার আক্রমণ সামাল দিয়েছি, আর অসুখের তোয়াক্কা না করে প্রতিদিন সবচেয়ে কড়া তামাকে তৈরি ষাটটি সিগারেট খাই। অবসর কাটাই পালা করে বারান্কিয়া আর কলম্বিয়ার ক্যারিবীয় উপকূলে কার্তাহেনা দে ইন্ডিয়াস-এ। এল হেরাল্দো খবরের কাগজ থেকে প্রতিদিনের লেখার জন্য যৎসামান্য যা পাই তাই দিয়ে রাজার মতো জীবনযাপন করি, ঘুমাই যেখানে রাত হয় সেখানেই―সম্ভাব্য সেরা সঙ্গিনীর সাথে।”
এমনকি কখনো কখনো পতিতাপল্লীতে গিয়ে যৌনকর্মের বদলে সাহিত্যিক পাগলামিতেই রাত পার হয়:
“একবার এল গাটো নেগ্রোর এক সুদর্শনা বেশ্যা একদিন সম্পূর্ণ বিনি পয়সায় রাতভর বিতর্ক শুনে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে চিৎকার করে আমাদের বলেছিল:
‘তোমরা শালা যতখানি চেঁচিয়েছ ততখানি যৌনকর্ম করলে আমরা মেয়েরা সোনায় গোসল করতাম।’”
এই অবস্থা যে মার্কেসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে অনন্য তা বোঝা যায় এই বর্ণনায়:
“ভ্রাতৃসঙ্ঘের [অর্থাৎ লেখক বন্ধুদলের] মধ্যে আমি ছিলাম সবচেয়ে নিরাশ্রয়, এবং আমি প্রায়ই কাফে রোমা-য় এক বিচ্ছিন্ন কোণায় বসে ভোর পর্যন্ত লেখার জন্য আশ্রয় নিতাম। কারণ আমার দুই চাকরি একসঙ্গে গুরুত্বের বিচারে ছিল আপাত-স্ববিরোধী, আর সম্মানীও ছিল সামান্য। নির্দয়ভাবে পাঠরত অবস্থায় ভোর সেখানে আমাকে পেত, আর যখন ক্ষুধা আমাকে পেয়ে বসতো আমি ঘন গরম চকলেট আর ভাল স্প্যানিশ শূয়োরের মাংসের স্যান্ডউইচ খেতাম এবং ভোরের প্রথম আলোয় পাসেও বলিভারের তীরে ফুলে ভরা মাতারাতন গাছের নিচে ঘুরে বেড়াতাম। প্রথম সপ্তাহগুলোয় আমি নিউজরুমে বসে অনেক রাত পর্যন্ত লিখতাম, এবং শূন্য অফিসে কিংবা নিউজপ্রিন্টের রোলের উপর অল্প কয়েক ঘণ্টা ঘুমাতাম, তবে পরে আমি দেখলাম আমাকে একটা অপেক্ষাকৃত কম অস্বাভাবিক জায়গা খুঁজতেই হচ্ছে।
সমাধান, ভবিষ্যতে আরো বহুবার যেমনটা পেয়েছি, পাওয়া গেল সজ্জন পাসেও বলিভারের ধারের ট্যাক্সি-চালকদের কাছ থেকে: ক্যাথেড্রাল থেকে এক ব্লক দূরে এক অস্থায়ী হোটেল, যেখানে একা বা একজন সঙ্গিনী নিয়ে দেড় পেসোর বিনিময়ে ঘুমানো যায়। দালানটা ছিল খুব পুরনো তবে গম্ভীর ছোট ছোট বেশ্যাদের খরচে খুব যত্নে রক্ষিত, যারা সন্ধ্যা ছয়টার পর পাসেও বলিভার দখল করে নিতো, বিপথগামী ভালবাসার অপেক্ষায় শুয়ে থেকে।”

এ পর্যন্ত মার্কেসের জীবনে প্রেমের হদিস মিলছে না; অন্তত শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত প্রেম বলতে যা বোঝেন, তেমন প্রেম তাঁর জীবনে আসতে এখনো ঢের দেরি। তবে এর মধ্যেও নানান নারীরা আসছে, মার্কেস তৈরি হয়ে উঠছেন, আর তারা চলে যাচ্ছে চিরদিনের মতো। তারও আগে নারীসঙ্গ বা যৌনকর্ম প্রসঙ্গেই ঘটছে নানা ঘটনা, তার মধ্যে বেশি কিছু রীতিমতো বিপজ্জনক এবং অগৌরবজনক। এক কালো পুলিশ অফিসারের বউয়ের সাথে অভিসার তেমনই এক অভিজ্ঞতা। মেয়েটা তাকে বলেছিলো সপ্তাহে তিন দিন রাস্তার দিকের দরজাটা সে হুড়কো না দিয়ে রাখবে যাতে প্রেমিকপ্রবর (তথা আমাদের হবু মহান লেখক) শব্দ না করে ঢুকতে পারেন; তার স্বামী তখন সেখানে থাকবে না।
“তার প্রথম নাম ও পারিবারিক নাম আমার মনে আছে, তবে আমি তখন তাকে যে নামে ডাকতাম সেই নামেই ডাকতে চাইব: নিগ্রোমান্তা, অথবা নেক্রোমানসের। সেই ক্রিসমাসে সে বিশে পড়বে। তার মুখের ভঙ্গি ছিল আবিসিনীয় মেয়েদের মতো, আর চামড়া কোকোয়ার মতো। তার বিছানা ছিল আনন্দময় এবং চরম পুলক ছিল কাতর ও কম্পমান। আর তার ছিল ভালবাসবার সহজাত বেগ যাকে মানুষের চেয়ে বেশি মনে হত খরস্রোতা এক নদীর মতো। প্রথম আক্রমণে আরম্ভ করেই আমরা বিছানায় পাগল হয়ে যেতাম। তার স্বামীর ছিল দৈত্যাকার শরীর, আর কণ্ঠস্বর একটা বাচ্চা মেয়ের―হুয়ান ব্রেভা-র মতো। দক্ষিণাঞ্চলের এক পুলিশ অফিসার ছিল সে, এবং নিছক বন্দুকের নিশানা ঠিক রাখার জন্য লিবেরালদের মারার কুখ্যাতি ছিল তার। কার্ডবোর্ডের পার্টিশান দিয়ে ভাগ করা একটা ঘরে তারা থাকত; তার একটা দরজা ছিল রাস্তার দিকে, অন্যটা গোরস্তানের দিকে। তার প্রতিবেশিদের অভিযোগ ছিল, সে মেয়ে সুখি কুকুরের মতো আর্তনাদ করে মৃতদের শান্তি নষ্ট করে। তবে যেরকমভাবে সে চিৎকার করত, নিশ্চিতভাবে মৃতরা তাতে বিরক্ত না হয়ে বরং খুশিই হত।
প্রথম সপ্তাহে আমাকে ভোর চারটায় তার ঘর থেকে পালাতে হল কারণ আমরা তারিখ গুলিয়ে ফেলেছিলাম। অফিসার যে-কোনো মুহূর্তে চলে আসতে পারত। আমি আলেয়ার আলো আর মৃতসহবাসপ্রিয় কুকুরদের চিৎকারের মধ্যে গোরস্তানের দিকের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলাম। খালের ওপরের দ্বিতীয় ব্রিজটার ওপর দেখলাম একটা বিশাল কাঠামো আমার দিকে আসছে; পরস্পরকে অতিক্রম করার আগে আমি তাকে চিনতে পারিনি। লোকটা স্বয়ং সার্জেন্ট; আমি আর পাঁচ মিনিট দেরি করলে সে আমাকে তার বাড়িতে পেয়ে যেত।
“সুপ্রভাত, সাদা ছেলে,” সে আন্তরিক সুরে বলল।
আমি নিষ্পাপ মুখে বললাম:
“ঈশ্বর আপনাকে রক্ষা করুন, সার্জেন্ট।”
তখন সে আমাকে থামিয়ে আগুন চাইল। আমি তাকে সেটা দিলাম, ভোরের বাতাসের থেকে দেশলাইয়ের কাঠিটা বাঁচানোর জন্য ওর খুব কাছে দাঁড়িয়ে। সিগারেটটা জ্বালিয়ে চলে যেতে যেতে সে মজা করে বলল:
“তোমার গায়ে বেশ্যার যে দুর্গন্ধটা সেটা সত্যি জঘন্য।”
যতটা আমি আশঙ্কা করেছিলাম তার চেয়ে কম সময় আমার ভয়টা টিকে থাকল, কারণ পরের বুধবার আমি আবার তার ঘরে ঘুমিয়ে পড়লাম এবং যখন আমি চোখ খুললাম, দেখি আমার আহত প্রতিদ্বন্দ্বী বিছানার পায়ের কাছ থেকে আমার দিকে নীরবে তাকিয়ে আছে। আমি এমন সাংঘাতিক ভয় পেলাম যে, শ্বাস নেয়া আমার জন্য কঠিন হয়ে পড়ল। মেয়েটা, আমার মতোই নগ্ন, আমাদের দুজনের মধ্যে চলে আসতে চেষ্টা করল, কিন্তু তার স্বামী তাকে তার রিভলভারের নল দিয়ে সরিয়ে দিল।
“তুমি এর বাইরে থাক,” সে বলল। “বিছানার ঠকানো, সীসা দিয়ে হয় চুকানো।”
সে রিভলভারটা টেবিলের ওপর রাখল, আখের তৈরি রামের একটা বোতল খুলল, সেটা রিভলভারের পাশে রাখল, এবং আমরা কোনো কথা না বলে পরস্পরের মুখোমুখি হয়ে মদ খেতে বসলাম। আমি ভাবতে পারছিলাম না আমরা কী করতে যাচ্ছি। তবে আমি ভাবলাম, যদি সে আমাকে মারতে চাইত, তা হলে এইসব ভণিতা না করে এর মধ্যেই তা পারত। অল্পক্ষণ পরে নিগ্রোমান্তা দেখা দিল, গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে এবং একটা আনন্দের ভাব ফুটিয়ে, কিন্তু সে রিভলভারটা তার দিকে তাক করল।
“এটা পুরুষদের ব্যাপার,” সে ওকে বলল।
সে একটা লাফ দিয়ে পার্টিশানের আড়ালে লুকালো।
ঝড় যখন ভেঙে পড়বে তখন প্রথম বোতলটা শেষ হয়ে গেছে। সে দ্বিতীয়টা খুলল, রিভলভারের নলটা নিজের কপালের এক পাশে চেপে ধরল, এবং আমার দিকে বরফশীতল চোখে তাকিয়ে থাকল। তারপর জোরে ট্রিগারটা চেপে ধরল, কিন্তু সেটা ক্লিক শব্দ করে উঠল। আমাকে রিভলভারটা দেবার সময় সে নিজের হাতের কাঁপুনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না।
“এবার তোমার পালা,” সে বলল।
সেই প্রথম আমি রিভলভার ধরলাম, এবং আমি আশ্চর্য হলাম যে সেটা ভীষণ ভারি ও গরম। আমি কী করব বুঝতে পারছিলাম না। বরফশীতল ঘামে আমি ভিজে গিয়েছিলাম, আর আমার পেট জ্বলন্ত ফেনায় ভরে গিয়েছিল। আমি কিছু বলতে চাইলাম কিন্তু কণ্ঠ সাড়া দিল না। তাকে গুলি করার কথা আমার মনে আসে নি, তবে সেটাই আমার একমাত্র সুযোগ ছিল, তা না বুঝেই আমি রিভলভারটা ওকে ফেরত দিলাম।
“কী, ভয়ে পায়খানা করে দিলে?” উল্লসিত ঘৃণার সাথে সে বলল। “এখানে আসার আগে তোমার ব্যাপারটা ভাবা উচিত ছিল।”
আমি তাকে বলতে পারতাম যে, কঠিন পুরুষেরাও পায়খানা করে, তবে আমি বুঝলাম প্রাণঘাতী কৌতুক করার মতো পৌরুষ আমার নেই। তারপর সে রিভলভারের সিলিন্ডার খুলে একমাত্র কার্তুজটা বের করল, এবং টেবিলের ওপর ছুঁড়ে দিল। ওটা খালি। তাতে আমি যা বোধ করলাম তা মুক্তি নয়, বরং এক ভয়ানক অপমান।
চারটার আগে ঝড়বৃষ্টি থেমে গেল। আমরা দুজনেই উত্তেজনায় এত ক্লান্ত ছিলাম যে আমার মনে নেই কোন মুহূর্তে সে আমাকে কাপড় পড়তে নির্দেশ দিয়েছে, এবং আমি নিশ্চিত শোকার্ত নীরবতায় তা পালন করেছি। যখন সে আবার বসেছে তখনই কেবল আমি বুঝতে পারলাম যে, সে কাঁদছে। অঝোরে, লজ্জাহীনভাবে, যেন সে তার চোখের জল দেখাচ্ছে। শেষে হাতের পিঠ দিয়ে সে সেটা মুছে, আঙুল দিয়ে নাক ঝেড়ে উঠে দাঁড়াল।
“জান কেন এখান থেকে জ্যান্ত ফিরতে পারছ?” সে জিজ্ঞেস করল। তারপর নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর দিল: “কারণ তোমার বাবা আমাকে জিভের একটা অসুখ থেকে সারিয়ে তুলেছিল। তিন বছর ধরে সেটার কোনো সমাধান আর কেউ দিতে পারেনি।”
পিঠে একটা পুরুষালি চাপড় দিয়ে সে আমাকে রাস্তায় ঠেলে দিল। তখনো বৃষ্টি হচ্ছে, এবং শহর ভেসে গেছে, সুতরাং আমাকে হাঁটুপানি বেয়ে হাঁটতে হল, বিশ্বাস হচ্ছিল না বেঁচে আছি।”

অনুরূপ অবমাননাকর অভিজ্ঞতা হয়েছিল বোগোটার আরেক পতিতালয়ে―
“আমি জানি না, কোন দুষ্ট উদাহরণ দেখে আমাদের এলাকায় এই বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছিল যে, বোগোটার মেয়েরা সাগরতীরের ছেলেদের প্রতি একেবারে দুর্বল এবং তারা বিছানায় আমাদের জন্য ফাঁদ পাতে যাতে আমরা তাদের বিয়ে করতে বাধ্য হই। আর সেটা ভালবাসার কারণে নয়, বরং এই আশায় যে তারা সমুদ্রের দিকে জানলাঅলা বাড়িতে থাকতে পারবে। আমার কখনো সেটা বিশ্বাস হয় নি। বরং উল্টো। আমার জীবনের তেমন স্মৃতি হলো বোগোটার শহরতলির শয়তান বেশ্যালয়গুলো, যেখানে আমরা যেতাম বিষণ্ন মাতলামির ঘোর কাটিয়ে আসার জন্য। সে সব স্মৃতির মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য হলো, যেবার আমি আমার ক্ষুদ্র প্রাণটা প্রায় হারাতে বসেছিলাম। সেদিন, খানিক আগেই যে-মেয়ের সাথে ছিলাম, সে ন্যাংটো হয়ে করিডোরে উদয় হয়ে চিৎকার করতে লাগলো, আমি নাকি তার ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে বারো পেসো চুরি করেছি। বাড়িটা থেকে দুটি গুণ্ডা বেরিয়ে এসে আমাকে পেড়ে ফেলল। ঐ সর্বনাশা যৌনকর্মের পর আমার কাছে অবশিষ্ট যে দুই পেসো ছিল, পকেট খালি করে তা নিয়েই তারা সন্তুষ্ট হলো না, জুতোসমেত আমার সব কাপড়-চোপড় খুলে ফেলে চুরি-যাওয়া টাকার খোঁজে আমার শরীরের প্রত্যেক ইঞ্চিতে তল্লাশি চালালো। যাই হোক, তারা ঠিক করেছিল আমাকে মেরে না ফেলে পুলিশের হাতে তুলে দেবে। আর তখনই মেয়েটার মনে পড়ল, আগের দিন সে টাকা লুকানোর জায়গাটা পাল্টেছে, টাকাটা ঠিকঠাকই আছে।”

কিংবা আরেক শহরের অভিজ্ঞতা―
“এল সিসনে-তে আমার গোপন প্রেমিকার ঘরে আমার করুণ মৃত্যু হতে পারত। ঘটনাটা আমার মনে আছে যেন গতকালই ওটা ঘটেছে। মেয়েটার এক প্রাক্তন প্রেমিক, যাকে সে এক বছরের বেশি সময় ধরে মৃত ভেবে আসছে, পাগলের মতো চিৎকার করে গালি দিতে দিতে তার ঘরের দরজা লাথি মেরে ভেঙে ফেলল। আমি তৎক্ষণাৎ তাকে চিনলাম। আরাকাতাকার প্রাথমিক স্কুলে সে আমার সহপাঠী ছিল এবং এখন তার বিছানার দখল নেবার জন্য সরোষে ফিরে এসেছে। সেই বাল্যকালের পর থেকে আমরা দুজন দুজনকে আর দেখিনি, এবং সে-ও আমাকে চিনতে পেরেও না চেনার ভান করে বেশ বুদ্ধির পরিচয় দিল। আমি তখন বিছানায় ভয়ে জড়োসড়ো, নগ্ন।”

তবে নিছক বিছানার সঙ্গিনী হয়ে নয়, মার্কেসের জীবনে কোনো কোনো নারী এসেছে সত্যিকারের প্রেরণা, শৃঙ্খলাবোধ, মানসিক পরিপক্বতা আর জীবন নির্মাণের শিক্ষা নিয়ে―
“একদিন আমি সিজার দেল ভায়ে-র জন্য তার বাড়িতে বসার ঘরে অপেক্ষা করছিলাম, আর সময় কাটানোর জন্য পড়ছিলাম। একটি আশ্চর্য মেয়ে তার কাছে এল। মেয়েটার নাম মার্টিনা ফনসেকা; মেধাবী স্বাধীন বর্ণসঙ্করের ছাঁচে-ঢালা এক সাদা মেয়ে, খুব সম্ভবত কবির প্রেমিকা। সিজার আসা পর্যন্ত দুই-তিন ঘণ্টা পরিপূর্ণ আনন্দের সাথে তার সঙ্গে আলাপ করে কাটল। শেষে ওরা দুজনে একসাথে চলে গেল, জানি না কোথায়। সেই বছর অ্যাশ ওয়েন্সডের আগে পর্যন্ত আমি তার সম্বন্ধে আর কিছু শুনিনি। হাই ম্যাস থেকে বেরিয়ে আমি আবিষ্কার করলাম সে পার্কে একটা বেঞ্চে বসে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। তার উপস্থিতি আমার কাছে মনে হল একটা আবির্ভাব। নকশা আঁকা লিনেনের একটা একটা পোশাক পরেছে; সেটা তার সৌন্দর্যকে আরো নিখুঁত করে তুলেছে। সাথে পরেছে পুঁতির একটা মালা আর নিচু করে ছাঁটা জামার কাঁধের কাছে জ্বলন্ত আগুনের একটা ফুল। আজো সেই স্মৃতি মনে হলে আমার সবচেয়ে যেটা ভাল লাগে তা হল, যে ভাবে সে আমাকে তার বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। পূর্বপরিকল্পনার চিহ্নমাত্র তাতে ছিল না, আর দুজনের কপালে-পরা ছাইয়ের ক্রস-এর পবিত্র চিহ্নের কথাও আমাদের মনে আসেনি। তার স্বামী ছিল মাগদালেনা নদীতে চলাচলকারী একটি জাহাজের চালক, তখন সে তার নিয়মিত বারো দিনের সফরে। হঠাৎ এক শনিবারে আমাকে তার স্ত্রীর হট চকলেট আর ক্রুলার-এর নিমন্ত্রণ দেয়ার মধ্যে আশ্চর্যের কী আছে ? বছরের বাকি সময় জুড়ে এই নিয়ম চলল। ব্যাপারটা ঘটত যখন তার স্বামী জাহাজে, আর সবসময় বিকেল চারটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত, সেই সময়টাতে রেক্স থিয়েটার-এ বাচ্চাদের অনুষ্ঠান হত, আর সেটা আঙ্কেল এলিয়েসার-এর বাড়িতে আমার অনুপস্থিতির অজুহাত হিসেবে কাজ করত।
তার পেশা ছিল প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকদের পদোন্নতির জন্য তৈরি করা। অবসর সময়ে সে সবচেয়ে যোগ্যদের হট চকলেট আর ক্রুলার দিয়ে আপ্যায়ন করত, যাতে প্রতি শনিবারে নতুন ছাত্রটি তার বাচাল প্রতিবেশিদের মনোযোগ আকর্ষণ না করে। মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত জ্বলন্ত আগুনের ওপর পুড়তে থাকা সেই গোপন প্রেমের চপলতা ছিল আশ্চর্যজনক। প্রথম দুই শনিবারের পর আমার মনে হল তার চিরকালের সঙ্গী হবার জন্য আমার উন্মত্ত কামনা আমার পক্ষে সহ্য করা আর সম্ভব নয়।
আমাদের বিপদের কোনো সম্ভাবনা ছিল না, কারণ তার স্বামী একটি সংকেতের মাধ্যমে শহরে তার পৌঁছানোর কথা জানিয়ে দিত, যাতে সে জানে সে বন্দরে আসছে। ঘটনা ঘটল আমাদের অভিসারের তৃতীয় শনিবারে, আমরা তখন বিছানায়; দূর থেকে গর্জন শোনা গেল। সে উদ্বিগ্ন হল।
আমাকে সে বলল, “চুপ করে থাক”, তারপর আরো দুটো গর্জনের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। সে বিছানা থেকে লাফিয়ে নামল না, আমার নিজের ভয়ের কারণে আমি যেমনটা ভেবেছিলাম, বরং ভড়কে না গিয়ে সে বলল: “আমাদের জীবনের এখনো তিন ঘণ্টার বেশি বাকি আছে।”
সে আমার কাছে তার স্বামীর বর্ণনা দিয়েছিল এরকম: “বিশালদেহী, কালো, দুই মিটারের বেশি লম্বা, আর কামানের মতো একটা শিশ্ন।” আমি ঈর্ষায় আক্রান্ত হয়ে খেলার নিয়ম প্রায় ভাঙতে যাচ্ছিলাম, আর সেটা সাধারণভাবে নয়―আমার তাকে খুন করার ইচ্ছা হল। আমার প্রেমিকার মানসিক পরিপক্বতা সবকিছুর সমাধান করল। আর তখন থেকে সে আমাকে লাগাম ধরে বাস্তব জীবনের লুকনো বিপদ-আপদ পার করে চালিয়ে নিয়ে গেছে, আমি যেন ভেড়ার চামড়া পরা নেকড়ের একটা বাচ্চা।
আমি স্কুলে খুবই খারাপ করছিলাম, আর সেটা নিয়ে কোনো কথা শুনতে চাইতাম না। কিন্তু মার্টিনা আমার ছাত্রত্বের ক্রুশ কাঁধে নিল। জীবনের এক অপ্রতিরোধ্য প্রেরণার শয়তানকে আস্কারা দেবার জন্য আমার ক্লাস অবহেলা করার বালখিল্যতা দেখে সে অবাক হল। আমি তাকে বললাম, “দেখ, যদি এই বিছানা স্কুল হত আর তুমি তার শিক্ষক হতে, তাহলে আমি শুধু ক্লাসেই নয়, পুরো স্কুলেই এক নাম্বার হতাম।” সে এটাকে একটা ভাল উদাহরণ হিসেবে নিল।
“ঠিক সেটাই আমরা করতে যাচ্ছি,” সে বলল।
খুব বেশি ত্যাগ স্বীকার না করে একটা নির্দিষ্ট সময়সূচি দিয়ে সে আমার পুনর্বাসনের দায়িত্ব নিল। বিছানায় গড়াগড়ি আর মায়ের মতো বকুনির মাঝে মাঝে সে আমার জন্য কাজ ঠিক করে দিত আর পরের সপ্তাহের জন্য তৈরি করে দিত। যদি আমি সময়মতো এবং ঠিকঠাকমতো বাড়ির কাজ না করতাম, প্রতি তিনবার ভুলের জন্য এক শনিবারের নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সে আমাকে শাস্তি দিত। আমি কখনোই দুটোর বেশি ভুল করতাম না। পরিবর্তনটা স্কুলে খেয়াল করা আরম্ভ হল।
যাাই হোক, বাস্তবে আমাকে সে যা শিখিয়েছিল তা হল একটা অব্যর্থ সূত্র, যা আমার ক্ষেত্রে কাজে লেগেছিল, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কেবল আমার মাধ্যমিক স্কুলের শেষ বর্ষে গিয়ে। তা হলো: যদি আমি ক্লাসে মনোযোগী হই, আর সহপাঠীদের থেকে নকল করার বদলে নিজেই অ্যাসাইনমেন্ট করি, আমি ভাল গ্রেড পাব, আর অবসর সময়ে যত খুশি পড়ার সুযোগ পাব। তাতে সারারাত ধরে ক্লান্তিকর পড়াশোনা আর অর্থহীন ভয় এড়িয়ে নিজের মতো করে জীবন যাপন করতে পারব। সেই যাদুকরী ব্যবস্থাপত্রের বদৌলতে ১৯৪২ সালে আমি ক্লাসে প্রথম হলাম, এবং অসাধারণ ফলাফলের জন্য একটা পদক পেলাম আর পেলাম রাজ্যের প্রশংসা। তবে আমার গোপন কৃতজ্ঞতা গেল আমার ডাক্তারদের দিকে, কারণ কী দারুণভাবেই না তারা আমাকে পাগলামি থেকে সুস্থ করে তুলেছিল।”

এরপর স্কুলের ছুটিতে মার্কেসকে বাড়ি চলে যেতে হয়। এই সাময়িক বিচ্ছেদ যেমন মার্টিনার সাথে তাঁর সারাজীবনের বিচ্ছেদ হয়ে উঠেছিলো, তেমনি অন্যদিকে তা তাঁকে নেহাত বালক থেকে পূর্ণবয়স্ক পুরুষ হবার পথে সবচেয়ে কঠিন ধাপটা পার করে দিয়েছিল।
“সুক্রেতে মার্টিনা ফনসেকাকে ছাড়া আমার প্রথম ছুটিটা ভাল কাটেনি, কিন্তু ছুটি কাটাতে সে আমার সাথে নিজের বাড়ির বাইরে যাবে, তার সামান্যতম সম্ভাবনাও ছিল না। দুই মাস তাকে দেখব না, এটা চিন্তা করাটাই আমার কাছে অবাস্তব ঠেকছিল, কিন্তু তার কাছে নয়। বরং আমি যখন বিষয়টা তুললাম, অন্য সময়ের মতোই সে ততক্ষণে আমার থেকে তিন পা এগিয়ে গেছে।
সে কোনো রহস্য না করেই বলল, “আমি তোমার সাথে বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে চাইছিলাম। আমাদের দুজনের জন্য সবচেয়ে ভাল হয় যদি তুমি অন্য কোথাও পড়তে যাও, কারণ আমরা উন্মত্ত হয়ে উঠেছি। তখন তুমি বুঝতে পারবে যে, এর মধ্যেই আমরা যা পেয়েছি তার থেকে বেশি কিছু পাবার নেই।”
আমি ভাবলাম সে ঠাট্টা করছে।
“আমি কাল বাড়ি চলে যাব, এবং তিন মাস পর ফিরে এসে তোমার সাথে থাকব।”
সে ট্যাঙ্গো সঙ্গীতের ভঙ্গিতে উত্তর দিল:
“হা, হা, হা, হা!”
তখন আমি বুঝলাম, মার্টিনাকে সহজেই পটানো যায় যখন সে ‘হ্যাঁ’ বলে, কিন্তু ‘না’ বললে কখনোই নয়। আর তাই আমি কেঁদে বুক ভাসিয়ে চ্যালেঞ্জটা নিলাম, এবং বললাম যে, আমার জন্য সে যে-জীবনের পরিকল্পনা করেছে তার বদলে আমি অন্য জীবন বেছে নেব: অন্য শহর, অন্য স্কুল, অন্য এক দল বন্ধু, এমনকি অন্য এক ধরনের জীবন-যাপন। আমি এটা নিয়ে সামান্যই ভেবেছি। আমার মেডেলগুলোর জোরে আমি আমার বাবাকে স্পষ্ট গাম্ভীর্যের সাথে প্রথম যে কথাটা বললাম তা হল, আমি কলেজিও সান হোসেতে আর ফিরে যাব না। কিংবা বারানকিয়ায়।”

মার্টিনা ফনসেকার সাথে মার্কেসের আবার দেখা হয় অনেককাল পরে:
“আমার মনে আছে, যেন গতকালের ঘটনা, আমি যখন সিরিজটার শেষ কিস্তিটা লিখছিলাম আমার ডেস্কের টেলিফোনটা বেজে উঠল এবং আমি মার্টিনা ফনসেকার উজ্জ্বল কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম:
“হ্যালো?”
পৃষ্ঠার মাঝখানেই আমি আর্টিকেলটা লেখা বন্ধ করলাম, কারণ আমার হৃৎপি- লাফাচ্ছিল। রাস্তা পেরিয়ে আমি হোটেল কন্টিনেন্টাল-এ তার সাথে দেখা করতে গেলাম, বারো বছরের অদর্শনের পর। খাবার ঘরের দরজা থেকে দুপুরের খাবার খেতে-আসা অন্য মহিলাদের ভিড়ে তাকে চিনতে পারছিলাম না। হাতের দস্তানা নেড়ে সে ইশারা করল। সে তার নিজের চিরাচরিত স্টাইলে পোশাক পরেছিল; সোয়েড কোট, কাঁধের ওপর শিয়ালের লোমের একটা পুরনো চাদর আর মাথায় শিকারীদের হ্যাট। কালের চিহ্ন তার কোঁচকানো এবং রোদ-ঝলসানো চামড়ায় খুব বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করেছে, আর চোখ জ্যোতিহীন―অন্যায় বার্ধক্যের প্রথম চিহ্নগুলো ওর সবকিছুই লুপ্ত করে দিয়েছে। আমরা দুজনেই নিশ্চয়ই বুঝতে পারছিলাম, তার বয়সের হিসেবে বারো বছর দীর্ঘ এক সময়, তবে আমরা সেটার সাথে ভালভাবেই মানিয়ে নিলাম। বারানকিয়ায় প্রথম এসেই আমি তার খোঁজ পাবার চেষ্টা করেছিলাম, তবে শুনলাম সে তখন পানামায় থাকে, তার নাবিক স্বামী তখন পানামা খালের একটা জাহাজের ক্যাপ্টেন। তারপরও, গর্ব নয়, বরং ভীরুতার কারণেই আমি বিষয়টা তার সামনে আর তুললাম না।
আমার বিশ্বাস, কারো সাথে সে কেবলই খাওয়া শেষ করেছে এবং আমি আসব বলে সে লোক সরে গেছে। কথা বলার একটা উপায় হাতড়াতে হাতড়াতে আমরা নীরবে তিন কাপ করে কড়া কফি এবং আধা প্যাকেট কড়া সিগারেট খেলাম। শেষে সে আমাকে সাহস করে জিজ্ঞেস করল, তার কথা আমার কখনো মনে পড়েছে কিনা। কেবল তখনই আমি তাকে সত্যি কথাটা বললাম: আমি কোনোদিন তাকে ভুলতে পারিনি, কিন্তু সে এত নিষ্ঠুরভাবে বিদায় নিয়েছিল যে সেটা আমার জীবনের পথ পাল্টে দিয়েছিল। আমার চেয়ে সে বেশি আবেগাক্রান্ত হল:
“আমি কখনো ভুলতে পারিনা যে তুমি আমার ছেলের মতো।”
আমার খবরের কাগজের আর্টিকেল, ছোটগল্প এবং একমাত্র উপন্যাসটা সে পড়েছে। আর সেগুলো নিয়ে সে এমন নির্মম স্পষ্টতার সাথে কথা বলছিল, যা কেবল সম্ভব ভালবাসা কিংবা ঘৃণা থাকলেই। তবুও আমি স্মৃতিকাতরতার ফাঁদ এড়ানো ছাড়া আর কিছুই করলাম না, আর তা এমন হীন কাপুরুষতা দিয়ে, যা কেবল পুরুষদের পক্ষেই সম্ভব। অবশেষে আমি যখন আমার উত্তেজনা প্রশমিত করতে পারলাম, ওকে জিজ্ঞেস করলাম ওর সেই বহুকাক্সিক্ষত ছেলেটা জন্মেছে কিনা।
“হ্যাঁ, জন্মেছে,” সে সানন্দে জানাল, “এবং প্রাইমারি স্কুল শেষ করছে।”
“বাবার মতো কালো?” আমার প্রশ্নে সেই সংকীর্ণচিত্ততা যাকে ঈর্ষা বলা যায়।
সে তার স্বভাবসুলভ সুবিবেচনার পরিচয় দিল। “মায়ের মতো সাদা,” সে বলল। “তবে আমি যেমনটা ভয় পেয়েছিলাম, ওর বাবা চলে যায়নি, বরং আরো বেশি করে আমার কাছে এসেছে।” আমার মুখের ভঙ্গিতে সুস্পষ্ট সংশয় দেখে সে একটা প্রাণান্তক হাসি দিয়ে নিশ্চিত করল:
“ভয় পেয়ো না, ছেলেটা তারই। এবং দুটো মেয়েও হয়েছে। তাদের চেহারায় এত মিল যে দেখলে মনে হয় একজনই।”
আসতে পেরে সে খুশি হয়েছিল। সে সেদিন এমন কিছু পুরনো স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে আমাকে আনন্দ দিয়েছিল যার সাথে আমার কোনো সম্পর্কই ছিল না। সে আমার কাছ থেকে আরো অন্তরঙ্গ প্রতিক্রিয়া আশা করছে এটা ভেবে বেশ গর্ব হচ্ছিল। কিন্তু আর-সব পুরুষের মতোই, স্থান-কাল বিচার করতে আমি ভুল করলাম। আমি যখন চতুর্থ কফি এবং আরেক প্যাকেট সিগারেটের অর্ডার দিলাম, সে আচমকা উঠে দাঁড়াল।
“ঠিক আছে সোনা, তোমাকে দেখলাম, সেজন্য আমার ভাল লাগছে”, সে বলল। শেষে বলল: “ব্যাপারটা আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না―এই যে তোমার এত এত লেখা পড়ছিলাম, কিন্তু জানতে পারছিলাম না তুমি কেমন হয়েছ।”
“তো, আমি কেমন হয়েছি?” আমি সাহস করে জিজ্ঞাসা করলাম।
“আহ, না!” সে পরম আন্তরিক হাসল। “সেটা তুমি কোনোদিন জানবে না।!”
টাইপরাইটারের সামনে রুদ্ধশ্বাস বসে থাকতে থাকতে আমি ওকে দেখার ব্যাকুলতাটা টের পেলাম, যা আমার মধ্যে সবসময়ই ছিল। সেই সাথে অনুভব করলাম সেই আতঙ্ক, যা আমাকে ওর সারাজীবনের সঙ্গী হতে দেয়নি। সেই বিষণ্ন ভীতি পরে বহুবার আমি অনুভব করেছি, যখনই ফোনটা বেজেছে।”

তবে এবার মার্কেজের বেড়ে-ওঠা সম্পূর্ণ হয়েছে। এবার দেখা হবে সেই নারীর সাথে, তাঁর ৮৭ বছরের জীবনের বাকিটা যাঁর সাথে কাটবে। যিনি হবেন তাঁর দুটি পুত্রসন্তানের মা (তবে কোনো কন্যাসন্তান না হওয়ায় আক্ষেপ থাকবে আমৃত্যু)।
“মার্চ মাসটায় বরফশীতল বাতাস বইতে লাগল এবং ধুলোর মতো ঝিরঝিরে বৃষ্টি আমার কষ্টের বোঝা বাড়িয়ে দিচ্ছিল। সম্পূর্ণ পরাজিত হয়ে নিউজরুমের মুখোমুখি হবার আগে আমি কাছের হোটেল কন্টিনেন্টালে আশ্রয় নিলাম এবং জনহীন বারে একটা ডাবল-এর অর্ডার দিলাম। মদটায় আমি আস্তে আস্তে চুমুক দিচ্ছিলাম, গায়ে তখনো মন্ত্রিসুলভ ভারি ওভারকোটটা। একেবারে কানের কাছে ভীষণ মিষ্টি একটা কণ্ঠ শুনলাম:
“যে লোক একা একা মদ খায়, সে একা মারা যায়।”
“তোমার ঠোঁট থেকে ঈশ্বরের কানে, সুন্দরী,” ভীষণ ভয়ে আমি উত্তর দিলাম, ভেবেছি ওটা মার্টিনা ফনসেকা।
কণ্ঠস্বরটা বাতাসে গ্রীষ্মকালীন গার্ডেনিয়ার সুগন্ধের একটা রেখা রেখে গেল, কিন্তু ওটা মার্টিনা ছিল না। আমি দেখলাম সে তার অবিস্মরণীয় ছাতাটা নিয়ে ঘুরন্ত দরজা ঠেলে বেরিয়ে গিয়ে বৃষ্টিভেজা রাস্তায় অদৃশ্য হয়ে গেল।”
এই হলো স্ত্রী মেরসেদেস বার্কা-র সাথে মার্কেসের প্রথম সাক্ষাৎ। বার্কার তখনও স্কুল গ্রাজুয়েশন শেষ হয়নি আর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে মার্কেস কাজ করছেন এল এসপেকতাদোর-র পত্রিকায়। সাথে সাথে চলছে লেখালেখি। নৌবাহিনীর এক জাহাজডুবি নিয়ে এ সময় ঐ জাহাজের এক নাবিকের জবানিতে মার্কেসের লেখা একটা ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সামরিক শাসকের সম্ভাব্য রোষানল থেকে আত্মরক্ষার জন্য কাগজ কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে মার্কেসকে দেশ ছাড়তে হয় সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে। বিচ্ছেদটা ছিল অপ্রত্যাশিত এবং বেদনাতুর―
“কয়েক ঘণ্টা পর ট্যাক্সিতে করে বারানকিয়ার বিমানবন্দরে যাচ্ছিলাম। অকৃতজ্ঞ আকাশ ছিল পৃথিবীর যে-কোনো প্রান্তের চেয়ে পরিষ্কার। ট্যাক্সিতে বসে আমি বুঝলাম, আমি আভেনিদা ভেইনতে দ্য হুলিও দিয়ে যাচ্ছি। গত পাঁচ বছরে আমার জীবনের অংশ হয়ে ওঠা স্নায়বিক প্রতিক্রিয়ার বশে আমি মেরসেদেস বার্কা-র বাড়ির দিকে তাকালাম। আর সে ছিল ওখানে―ক্ষীণ ও দূর, দরজায় মূর্তির মতো বসে আছে, সে-বছরের স্টাইল অনুযায়ী সোনালি ঝালরঅলা সবুজ একটা পোশাক পারে আছে, চুল সোয়ালোর ডানার আকৃতিতে কাটা, আসবে-না-এমন একজনের জন্য প্রতীক্ষারত উৎকণ্ঠিত স্থিরতা নিয়ে। জুলাইয়ের এক বৃহস্পতিবারে অত সকালে তাকে চিরতরে হারাতে চলেছি, এই ভয়ানক অশুভ আশঙ্কা আমি এড়াতে পারলাম না, এবং এক মুহূর্তের জন্য আমি ভাবলাম ট্যাক্সিটা থামিয়ে ওকে বিদায় জানিয়ে যাই, কিন্তু শেষ অব্দি ঠিক করলাম নিজের অমন অনিশ্চিত ও নাছোড় নিয়তির বিরুদ্ধে যাব না।
প্লেনে তখনো অনুশোচনার পেট-খিচুনি আমাকে পীড়া দিচ্ছিল। তখনকার দিনে সামনের আসনের পিছন দিকে কিছু জিনিস রাখার চমৎকার রেওয়াজ ছিল, যাকে তখনো সহজ ভাষায় বলা হতো লেখার উপকরণ। সোনালি প্রান্তঅলা নোট-কাগজের একটা পাতা, আর তার সাথে মিলিয়ে একই লিনেন কাগজের গোলাপি, ক্রিম কিংবা নীল খাম, কখনো কখনো সুগন্ধি-দেয়া। আগের অল্প কয়েকটি যাত্রায় আমি সেগুলো ব্যবহার করেছিলাম বিদায়ী কবিতা লিখতে, এবং সেগুলোকে আমি কাগজের ছোট ছোট ঘুঘু বানিয়ে প্লেন থেকে নামার সময় উড়িয়ে দিতাম। আমি আকাশ-নীলটা পছন্দ করলাম এবং সকাল সাতটায় বাড়ির দরজায় ভালবাসার মানুষ ছাড়াই কনের সবুজ পোশাক পরে এবং অনির্দিষ্ট এক সোয়ালোর মতো চুল নিয়ে―জানেও-না-কার-জন্যে সেই ভোরে সেজেছে―বসে-থাকা মার্সেদেস বার্কাকে প্রথম আনুষ্ঠানিক চিঠিটা লিখলাম। এর আগে, যখনই হঠাৎ করে দুজনে দুজনের মুখোমুখি হয়েছি, তাকে আমি কিছু মজার কথা তাৎক্ষণিকভাবে বানিয়ে লিখেছি এবং বিনিময়ে পেয়েছি কেবল মৌখিক আর পলাতক উত্তর। এই লেখাটা পাঁচ লাইনের বেশি হবে না বলে ভেবেছিলাম, উদ্দেশ্য ছিল আমার ভ্রমণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে জানানো। কিন্তু ওটার শেষে আমি একটা পুনশ্চ যোগ করলাম, স্বাক্ষর করবার মুহূর্তেই সেটা মধ্যদিনে বিদ্যুচ্চমকের মতো আমার চোখ ধাঁধিয়ে দিল: “যদি আমি এক মাসের মধ্যে এই চিঠির কোনো জবাব না পাই, আমি সারাজীবনের জন্য ইউরোপে থেকে যাব।” ভোর দুটোয় মন্টেগো বে-র জনহীন বিমানবন্দরে ডাকবাক্সে সেটার ফেলার আগে চিঠিটা নিয়ে নিজেকে ভাববার সময় দিলাম না। ততক্ষণে শুক্রবার শুরু হয়ে গেছে। পরের সপ্তাহের বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক মতভেদের আরেকটি অর্থহীন দিনের শেষে আমি যখন জেনেভায় হোটেলে ঢুকলাম, দেখলাম তার জবাব এসে পৌঁছেছে।”

মেরসেদেস বার্কা-র সাথে মার্কেসের বিয়ে হয় বার্কা-র গ্রাজুয়েশনের পর, মার্কেস দেশে ফিরে এলে, বারানকিয়ায়। বার্কার সাথে বিয়ের পর মার্কেসের আর কোনো দৃশ্যমান প্রেমিকার দেখা মেলে না। আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ডে উল্লেখিত যে-নারীদের পরিচয় পাওয়া গেল, তাঁদের সবার আগমন মার্কেসের আঠাশ বছর বয়সের মধ্যে। অনেক পরে জীবনের শেষ পর্বে আরব বংশোদ্ভূত লাতিন গায়িকা শাকিরার সাথে গভীর বন্ধুত্ব হয় মার্কেসের। দৃশ্যত তা পারস্পরিক সমীহ আর সৌহার্দের। শাকিরাকে নিয়ে মার্কেস লিখেছেনও। শাকিরার গানের মুগ্ধ ভক্ত ছিলেন মার্কেস, ভক্ত ছিলেন তাঁর মানবিক গুণাবলিরও। কিন্তু প্রেম কি সম্ভব ছিল তাঁদের? হয়তো, হয়তো নয়। তবে জীবনপিপাসু মার্কেসের শেষ জীবনে এই বন্ধুত্ব প্রেমের সমান জীবনরস নিয়ে এসেছিল অনুমান করা যায়।
২০১০ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া পেরুভিয়ান লেখক-রাজনীতিক মারিও ভার্গাস য়োসা, যিনি ছিলেন মার্কেসের বন্ধু, অভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্বাসের অংশিদার, ১৯৬৭ সালে এক সিনেমার প্রিমিয়ার-এর মার্কেসকে ঘুষি মারেন। বহুকাল এর কারণ ছিলো রহস্যাবৃত। কানাঘুষা ছিল এর পেছনে আছে সাহিত্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, কিংবা রাজনৈতিক মতবিরোধ, অথবা ত্রিভুজ প্রেম। পরে জানা গেছে তা য়োসার স্ত্রী ও মামাতো বোন পাত্রিসিয়ার সাথে সম্পর্কিত। য়োসা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ালে পাত্রিসিয়া বন্ধু মার্কেস পরিবারের পরামর্শ চান। তখন তাঁকে মার্কেস পরামর্শ দেন য়োসাকে পরিত্যাগের। এই ক্ষোভ থেকে ঐ বিস্ফোরণ। এবং বন্ধুত্বের সমাপ্তি।
এটাই মার্কেসের লাতিন আমেরিকা, কিংবা লাতিন আমেরিকান মার্কেস―অন্তহীন যুদ্ধ, রক্তপাত, ঔপনিবেশিক শোষণ-পীড়ন-দখলদারিত্ব, দারিদ্র্যের মধ্যেও জীবন, বাস্তবতা, এক অমর লাতিন আমেরিকান জাতীয়তাবোধ। প্রেম আর যৌনতা এসবেরই বর্ণময় অংশ।


উদ্ধৃত অংশগুলো সবই মার্কেসের আত্মজীবনীর এডিথ গ্রসমান-কৃত ইংরেজি অনুবাদ লিভিং টু টেল দ্য টেল-এর বর্তমান লেখককৃত বাংলা অনুবাদ বেঁচে আছি গল্পটা বলবো বলে থেকে নেয়া।

লাইভ

টপ