Vision  ad on bangla Tribune

শামীম রেজা : স্মৃতি-নিসর্গের পরিব্রাজক

জফির সেতু২৩:৪৪, মার্চ ০৭, ২০১৭

শামীম রেজা, জন্ম ৮ মার্চ ১৯৭১
কবিতা তো নানা রকমই হয়, নানাভাবেই হয়ে ওঠে একটি কবিতা-ডালপালা মেলে লাভ করে বিশিষ্টতা। ২০০৬ সালে ‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়, কবি শামীম রেজার দিকে আমি নতুন করে ফিরে তাকাই। বইটি একরাতেই পড়ে শেষ করেছিলাম আমি এবং আমার তখন মনে হয়েছিল কবির স্বর বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে। যে-প্রস্তুতি চলছিল কবির মধ্যে ‘পাথরচিত্রে নদীকথা’ (২০০১) ও ‘নালন্দা দূরবিশ্বের মেয়ে’ (২০০৪)-তে সুবর্ণনগরে এসে কবি নির্মাণ করলেন কবিতার ‘সুবর্ণ প্রাসাদ’। আমি অনুভব করলাম একজন কবির কাব্যশক্তি ও ভাষা-ব্যবহারের জাদু-বাস্তব দক্ষতা। ভাষার এই কথ্যভঙ্গিটিও যে কবিতা হয়ে উঠতে পারে, এ-প্রতীতিও হয়ত কখনো হতো না আমার। বরিশালের একটি বিশেষ অঞ্চলের ভাষার এই ঢংটি কবি এমনভাবে কবিতার সঙ্গে সম্পৃক্ত ও অপরিহার্য করে তুললেন যে, মনে হলো বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষাভঙ্গির ভেতরে রয়েছে বাংলা কবিতার সমূহ সম্ভাবনা ও শক্তি। আর একজন কবি যখন কবিতা লিখতে এসে একটা নিজস্ব কবি-ভাষা নির্মাণ করেন কিংবা বিশেষ ভাষাকে কবিতার বাহন করে তোলেন কবি হিসেবে তার শক্তি-সামর্থ্য সেখানেই প্রতিফলিত হয়। সুবর্ণনগরে শামীম রেজা নিজেকে এভাবেই চিহ্নিত করেন পাঠকের কাছে। বাংলা কবিতাও যেন এই পথে একটা নতুন পথের ইশারা পায়; আর কবি হিসেবে শামীম রেজা এখানেই বিশিষ্ট হয়ে ওঠেন, তার কবিতাও হয়ে ওঠে ‘বিশেষ ধরনের কবিতা’।
‘বনলতা সেন’ লেখার আগে জীবনানন্দ দাশকে ‘ঝরা পালক’ ও ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ নামে লিখতে হয় আরও দুটি কাব্যগ্রন্থ। এর মধ্যে প্রথমটি এতটাই অর্বাচীন হাতের লেখা ছিল যে-সেখানে জীবনানন্দের আলাদা বলে কিছু ছিল না। ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’-তে জীবনানন্দকে আমরা আলাদা স্বর হিসেবে পাই আর ‘বনলতা সেন’-এ তিনি নির্মাণ করলেন নিজস্ব শৈল্পিক ইমারত—যার প্রভাব বাংলা কাব্যে কিংবদন্তিতুল্য। নানা কারণে ‘বনলতা সেন’ বিশিষ্টতা লাভ করে। এর মধ্যে প্রধান ছিল দুটি। এর একটি, চেতনাগত এবং অপরটি, এর ভাষা। চেতনাগত দিকটি ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদ, আর ভাষাগত দিক হচ্ছে লোকজ/মুখের ভাষার ব্যবহার বা গদ্যগন্ধী শব্দের ব্যবহার। কিন্তু জীবনানন্দ ভাষার ক্ষেত্রে যে খুব বড়ো ঝুঁকি নিয়েছিলেন তা কিন্তু নয়। মাইকেলের মতো বেশকিছু আঞ্চলিক ক্রিয়াপদ ও বিশেষ্যবাচক/সর্বনাম শব্দ ছাড়া মুখের ভাষার এতটা ব্যবহার করেননি তিনি। হয়ত সে-সময়ের বাংলা ভাষাপরিস্থিতি ও কাব্যভাষার বাস্তবতাও তার অনুকূলে ছিল না। তবু একটা বড়ো পরিবর্তন এনেছিলেন মাইকেলের মতো, নিজের প্রতিভাকে কাজে লাগিয়েই; এবং বাংলা কবিতা নতুন একটা পথেরও সন্ধান পায়—অন্তত কবিতার ভাষাগত প্রশ্নে। যদিও চেতনাগত দিক থেকে ‘বনলতা সেন’ ঔপনিবেশিকতা দ্বারা বড়ো বেশি আক্রান্ত। ওই অর্থে ‘বনলতা সেন’ বাংলা কবিতাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিতও করেছে। কিন্তু শামীম রেজার প্রশ্নে, এই কথাগুলো বলা এই জন্যে যে, ‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে’-তে যে কবি-চারিত্র্যের সন্ধান আমরা পাই তা একান্তই ভিন্ন এবং বিশিষ্ট। এবং তা জীবনানন্দের মতোই চেতনা ও ভাষাগত যে, জীবনানন্দের অনুপ্রেরণাজাত হয়েও ঠিক জীবনানন্দের উলটোপিঠের কবিতা। ‘পাথরচিত্রে নদীকথা’ ও ‘নালন্দা দূরবিশ্বের মেয়ে’-তে কবিকে খুব মন্থর গতিতে স্থির লক্ষ্যে হাঁটতে দেখি। অনেক ভেবেচিন্তে কবিতার ভাব ও ভাষানির্মাণের পথে অগ্রসর হয়েছিলেন কবি, আর শুরু থেকেই কবির চেতনা ও কবি-ভাষা যেন নির্ধারিত হয়ে পড়েছিল একটি বিশিষ্ট পথে। সে বিশিষ্ট পথ আমরা প্রত্যক্ষ করি সুবর্ণনগরে। ‘ব্রহ্মাণ্ডের ইসকুল’ (২০০৯)-এ এসে কবির ভাষা ও ভাষাবহিত চেতনা চলতে থাকে স্বখাত বেয়েই। কিন্তু কেন জানি মনে হয় কবি হিসেবে শামীম রেজা সকল শক্তিই যেন নিয়োগ করেছিলেন সুবর্ণনগর নির্মাণে।
‘পাথরচিত্রে নদীকথা’ নামের ভেতরেই একটা পরাবাস্তব আবহ বিদ্যমান রয়েছে, যেটা জীবনানন্দীয় বললে অত্যুক্তি হবার কথা নয়। এমনটা একজন নতুন কবির পক্ষে স্বাভাবিকও। কিন্তু কাব্যের প্রথম কবিতার প্রথম স্তবকেই আমরা প্রত্যক্ষ করি এক পরিণত কবিকে, অন্তত চিত্রকল্প নির্মাণের ক্ষেত্রে:

ও পরানি মথুরার মাঠে বসে তুমি নির্জন
এ পাড়ায় আমি কাদা ছানি
যুবককুমার
রাধার মূর্তি গড়ে পেতেছি খেলা।

‘রাধার মূর্তি গড়ে পেতেছি খেলা’র মধ্যে যে চিত্রকল্প এবং চিত্রকল্পটির চূড়ায় বসে যে কবি লীলায় মত্ত—তাতে তাকে আমরা অভিবাদন না-জানিয়ে পারি না। চিত্রকল্প বেয়ে কবি অনায়াসেই ঢুকে যান মিথ, রূপকথা, ঐতিহ্য ও লোককথার জগতে যেখানে কবির মূল চেতনা বিম্বিত হয়ে ওঠে। এমনকি মিথ, রূপকথা ও ঐতিহ্যের পথ ধরে দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘নালন্দা দূরবিশ্বের মেয়ে’-তে এসে কবি প্রবেশ করেন ইতিহাসের কল্পজগতে, যেটা কবির স্বপ্নেরই জগৎ।
যে-সময়টাতে শামীম রেজা কবিতা লিখতে আসেন তখন বাংলা কবিতা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হচ্ছিল। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলা কবিতাও বাঁকবদলের পথে এগিয়ে যায়। তাত্ত্বিক দিক থেকে উত্তরাধুনিকতা-তত্ত্ব বাংলা কবিতাকে প্রভাবিত করেছিল দারুণভাবে। আলোড়িত করেছিল অনেক কবিকেই। সমান্তরালভাবে কেউ-কেউ কবিতায় তা তাত্ত্বিকভাবে গ্রহণ না-করে শেকড়-সন্ধানী শিল্প-অন্বেষায় ব্রতী হন। মিথ-পুরাণে-ইতিহাসে-লোকভাবনার দিকে ধাবিত হন অনেকেই। লোকভাষা নতুন কবিতার ফর্ম তৈরিতে বড়ো ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে সকল অর্থেই সময়টা ছিল ভাংচুরের; রাষ্ট্রিক, সমাজতাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে। কবিরা সংবেদনশীল বলে আলোড়িত হন সবচেয়ে বেশি। আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মতো আমাদের রাষ্ট্রিক, ঐতিহাসিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা ছিল উপনিবেশ-উত্তর বাস্তবতা। ষাটের দশক থেকে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় উপনিবেশবাদী সাহিত্যতত্ত্ব ও আধুনিকতার বিপরীতে যে-সাহিত্যিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, যে-সব নবতর সাহিত্যিক ফর্ম ও ভাষাবোধ বাংলাদেশের তরুণদের আকৃষ্ট করেছিল আশির দশক থেকে। নব্বইয়ে এসে সেসব সাহিত্যিক-দার্শনিক তত্ত্ব ও আঙ্গিক বিস্তার করেছিল কবিতা ও কথাসাহিত্যে, এমনকি চিত্রকলা ও সঙ্গীতেও। শামীম রেজা এসব আন্দোলনে নিজেকে সক্রিয় রেখেছিলেন পত্রিকা সম্পাদনা ও গ্রন্থ-সম্পাদনা করে। তিনি যুক্ত ছিলেন বাংলা ভাষায় নব্যরীতির সাহিত্যিক নির্মাণে; যোগাযোগ ব্যাপৃত রেখেছিলেন আসাম, ত্রিপুরা, দার্জিলিংসহ কলকাতার নবীন-প্রবীণ অনেক কবি-সাহিত্যিকের সঙ্গে। এসব কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে শামীম রেজা তার কবিতার চেতনা ও শিল্পরীতির পথ নির্দিষ্ট করতে প্রয়াস পান বলে আমার ধারণা। তিনি ভালো করেই অনুভব করতে পেরেছিলেন উপনিবেশবাদী আধুনিকতা-তত্ত্ব আমাদের চেতনলোক ও শিল্পরুচিকে কীভাবে বিকৃত করে তুলেছিল। এমনকি সাংস্কৃতিক চেতনাকে ব্যাহত করে আত্মপরিচয়হীন-সত্তার মাধ্যমে আমাদের সাহিত্য কীভাবে অন্তঃসার হয়ে পড়েছে এটাও তার ভাবনাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে দেখি এই কবি শুরু থেকেই তার চেতনাকে অস্তিত্বমুখী করে কবিতায় নির্মাণে প্রয়াস পান। এবং ভাষিক শিল্পমাধ্যম হিসেবে কবিতার ভাষাশৈলীতে তিনি সমূহ অভিনিবেশ করেন। উপনিবেশবাদী সংস্কৃতি আমাদের ভাষাবোধকে পালটে দিয়েছিল, সেই ভাষাকেন্দ্রিক সংবেদন ও মনন পুনরুদ্ধারে শামীম রেজা উপনিবেশবাদী সমাজের ভাষাকে উপেক্ষা করে উপনিবেশের শিকার মানুষের ভাষাকে কবিতার ভাষায় রূপান্তরিত করে উত্তর-উপনিবেশবাদী শিল্প-আঙ্গিক বেছে নেন। বাংলাদেশের নতুন যুগের কবিতায় শামীম রেজার গুরুত্ব ও অভিনবত্ব এখানেই।
সময়টা ছিল ভাঙনের ও আত্মনির্মিতির। শামীম রেজার কবিতায় সেই ভাঙন ও নির্মিতির যুগপৎ প্রকাশ লক্ষ করা যায়। মানুষের মূল অস্তিত্ব তার ভূগোলে। তিরিশের আধুনিকতাবাদী কবিরা ভূগোল হারিয়েছিলেন। তারা হতে চেয়েছিলেন বিশ্বনাগরিক। তাদের একটা বড়ো ভ্রম ছিল তারা পৃথিবীর একটা বিশেষ অঞ্চলকেই সারা পৃথিবী ভেবেছিলেন। তারা আধুনিকতা বলে বুঝতেন ব্রিটেনকে বা বড়োজোর প্যারিসকে। কিন্তু ব্রিটেন বা প্যারিস মানেই গোটা পৃথিবী নয়। তারা ভাবেননি এর বাইরেও মানুষ আছেন, রয়েছে তাদের সাহিত্য ও শিল্প এবং তা আধুনিকতাকে সঙ্গে নিয়েই। বুদ্ধদেব ও তার সঙ্গীরা ভাবেননি গ্রামে থেকেও আধুনিক থাকা যায়, এবং আধুনিক সাহিত্য রচনা করার জন্য উপনিবেশককে বাহন না-করলেও চলে। উপনিবেশিত সমাজের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বড়ো ধরনের মহামারী ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে এতদিনে। কেননা উপনিবেশ টিকিয়ে রাখার জন্য দরকার উপনিবেশবাদী শ্রেণি ও তাদের মনন। কলকাতা নগরকে কেন্দ্র করে ততদিনে সে-শ্রেণি ও মনন তৈরি হয়ে গিয়েছিল, আর পিছিয়ে গিয়েছিল হাজার বছরের বাংলা কবিতার ঐতিহ্য ও বাঙালি শিল্পমনন। এই বিপরীত বাস্তবের কবি শামীম রেজা উপনিবেশ-উত্তর চেতনা ও উপনিবেশ-নির্ধারিত ভাষাকে চ্যালেঞ্জ করেন তার কবিতার বোধ ও ভাষিক নির্মিতিতে।
জীবনানন্দ-প্রমুখ কবিদের কবিতায়ও আমরা ইতিহাস-ঐতিহ্য-মিথ-পুরাণ দেখি, কিন্তু সে-দেখাটা একটু পরখ করলে আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, সে-সবই প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী ইউরোপীয় শিল্প ও দর্শনচেতনার সঙ্গে সংগতি ও সংহতি রেখেই। জীবনানন্দের ইতিহাসবোধ ইউরোপীয় রোমান্টিক চেতনার একটা রূপান্তর মাত্র; তার মিথ-পুরাণ বিশ্বযুদ্ধোত্তর সমাজের চেতনাবাহী ও অস্তিত্ব-সংকটের প্রতীক-প্রতিভূ। আমাদের সামষ্টিক জীবন ও চেতনার সঙ্গে তার সংযোগ খুবই কম। উত্তরকালের বাংলা কবিতা জীবনানন্দ নির্দেশিত পথেই চলছিল, আশি-নব্বইয়ের দশকে দেখা গেল পরিবর্তিত বিশ্ব ও জাতীয় পরিস্থিতিতে কবিরা আড়মোড়া ভেঙে উঠলেন অর্থাৎ কবিতায় বিশ্ব মিথাশ্রয়ীকতা থেকে পাশ ফিরে দেশীয় মিথ-পুরাণের দিকে কবিরা ঝুঁকলেন। শামীম রেজা মিথচেতনা সে-পথেই বাহিত হতে আমরা দেখি, এখানে তার একটা বিশেষত্ব পরিলক্ষিত হয়। এরূপ চেতনা তার কবিবন্ধুদের কবিতায়ও বিশিষ্ট হতে দেখি। কিন্তু শামীমের মিথ একটুও আরোপিত না-হয়ে তার অস্তিত্বের রূপক হয়েই যেন কাজ করে কবিতায়, যেখানে নিরন্তর প্রতিভাত হয় তার আত্মআবিষ্কার। এই আত্মআবিষ্কারে লেগে থাকে জল ও কাদা। একাকার হয় কল্পনা ও বাস্তব। আর এসবই ধারণ করে তার ভাষাবোধ ও নির্মিতি।
মিথ শুধু যে চেতনার অনুষঙ্গ হয়েই আসে তা নয়, বরং তার কবিতার পরতে পরতে আমরা দেখি মিথসঙ্গী ইতিহাসকেও; যে-ইতিহাস একান্তভাবেই গঙ্গাঋদ্ধি বাংলার। এক সময় শামীম তার প্রতি-উপনিবেশবাদী বয়ানে ইতিহাসকেই মিথ করে তুলেন। এবং এই মিথ হয়ে ওঠে নবজাগৃতির। এই যে, উপনিবেশ থেকে তিনি অনায়াসে আমাদের মুখ ফেরান দেশীয় প্রত্ন-ইতিহাসে, সে-ইতিহাস অভূতপূর্ব এক জাতিসত্তার। এমন এক জাতিসত্তার যার রয়েছে নিজস্ব কৃষ্টি, সাহিত্য এবং স্বতন্ত্র কাব্যরীতি। শামীমের কবিতায় তাই দেখি উপনিবেশবাদী কাব্যরীতির বিপরীতে ঐতিহ্যগন্ধী কাব্যরীতির নতুন এক নির্মাণ। তাই তার কবিতায় যখন শুঁড়ি বা শুঁড়িখানার প্রসঙ্গ আসে তখন আমরা চর্যার অসাধারণ দীপ্তির কথাই মনে আসে।
অন্যদিকে জীবনানন্দীয় যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের বিষণ্ন-রোমান্টিকতার বিপরীতে শামীম রেজার কবিতায় বৈষ্ণবীয় রোমান্টিকতার একটা আধুনিক রূপান্তর পরিলক্ষণ দৃষ্ট হয়, যেখানে শান্ত ও প্রেম-মধুর রস বাংলার ধূলিমাটির মানুষের অস্তিত্বতে নতুনভাবে উপলব্ধি করতে সহায়তা করে। বাংলার ধর্ম ও জীবনদর্শনে যে-সহজিয়া ভাব, সে-সহজিয়া ভাবধারার পলল তার কবিতার ‘নয়াবৃক্ষশাখা’র শ্যামলকে উজ্জ্বল করে তোলে। কিন্তু এর ভেতরেও একটা ক্রোধ আছে কবির। সে-ক্রোধ দস্যু-বেনিয়া-শোষকদের বিরুদ্ধে। মুকুন্দরাম কবির তালপত্রে যে-রক্তলেখা, যে-রক্তের দ্রোহ মোহাম্মদ রফিক ও আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কবিতায় দাঁড় ও রক্তজবার প্রতীকে এসেছে এবং সৈয়দ শামসুল হক ও সেলিম আল দীনের নাটকে প্রান্তিক মানুষের স্বর ও সুরে ধ্বনিত—শামীম রেজার নদীমাতৃক কবিতার ভূগোলে নদীর ছলাৎ-ছলাৎ ঢেউয়ে সে-একই ধ্বনি প্রতিধ্বনিত। বাংলার মানুষকে ঘুমপাড়াত যে-সব নদী, কবির কবিতায় আজ তাদের জাগিয়েও তোলে দ্রোহের আবেগে, এটাই তার উত্তর-উপনিবেশী মনোভঙ্গি।
আর এ যেন কবির মায়ার খেলা, এ-খেলা চলতে থাকে গোটা সুবর্ণনগরে। ‘ব্রহ্মাণ্ডের ইসকুল’-এ কবির রেশ কাটেনি যদিও। কাব্যের সেতুবন্ধ কবিতায়ও আমরা দেখতে পাই পিতৃপুরুষের আচ্ছন্ন মুখগুলো:

আচ্ছন্ন মুখগুলো পড়ন্ত রাতের মতো ঝিমায়
চাহুনিতে জঙলিগন্ধ, এ যে তাঁতীদের ধ্বস্ত বিহার।

কিংবা মুগ্ধতা কাটে না শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর রাইবালিকার কোমল স্মৃতির। আবারও কবি ইতিহাস-ভূমে উর্ধ্বমুখী, কাসান্ড্রার দিকে। কিন্তু নামকবিতায় ‘আমাদের চোখগুলা নিয়া যারা মার্বেল খেলেছে’ এই বয়ানে দস্যুবৃত্তি বা উপনিবেশের একটা ইঙ্গিত তো আছে, এমনকি ‘অন্তিম চাহুনি/ভাইসা গেছে স্বপ্নের জলের বহু আগে দুঃস্বপ্নের অন্তহীন রাতে’ এই বিবরণেও ইতিহাসের অশুভ লগ্নর স্থিরচিত্র মুদ্রিত আছে। সুবর্ণনগরের রক্তেভেজা উপকথার পরিণতি যেন গোটা কবিতাটি। দীর্ঘ আঙ্গিকের কবিতায় একটি জাতীয় রক্তঝরা ইতিহাস মানবজাতির ইতিহাসের পাটাতনে রূপান্তরিত হয়নি শুধু, কবির ব্যক্তিচেতনা সামষ্টিক চেতনার ব্যঞ্জনা পেয়েছে। প্রেম, ইতিহাস ও পুরাণের পটভূমিকায় পৃথিবী পরিভ্রমণ শেষে বঙ্গীয় ব-দ্বীপের স্মৃতি-নিসর্গে কবি ‘স্বপ্নহীন এই/রাত্তিকে মৃত ঘোষণা’ করে ‘বৃক্ষের পাঁজরে লেখা’ ‘আপন ঠিকানা’র সন্ধান খুঁজেছেন চলমান লোকজ ভাষা ও জাতীয় অথচ মননে। এ-ও হয়ত কবির আরেক যাত্রা। শামীম রেজার কবিতার নতুনত্ব বা স্বাতন্ত্র্য এখানেই।

samsung ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ