রোকেয়ার পথ ধরে...

Send
ফিরোজ আহমেদ
প্রকাশিত : ২১:০০, মার্চ ০৯, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:০৯, মার্চ ০৯, ২০১৭



বন্ধু তাসলিমা আখতার তার সাম্প্রতিক একটি নিবন্ধে চমকে দেয়া এই পর্যবেক্ষণটি তুলে ধরলেন, সংক্ষেপে তার প্রশ্নটি এমন : সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের নারীদের সবচেয়ে সংগ্রামমুখর সময়ে নারী আন্দোলনের অধিকাংশ পরিচিত মুখগুলোকে পাশে পাশে পাননি কেনো? পোশাক শিল্পে এদেশের নারীদের সবচেয়ে বড় অংশটি যুক্ত, কিন্তু সেই নারী শ্রমিকরা এবারের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে তাদের পাশে কতটুকু পেয়েছেন মুখচেনা নারীনেত্রীদের?
প্রশ্নটি গুরুতর। প্রায়োগিক দিক দিয়ে যেমন, নারীবাদের তাত্ত্বিক গঠনকে পুনর্বিবেচনা এবং এর নানা পথ, উপপথের সন্ধান মিলবে এই প্রশ্ন ধরে এগুলে। সিমন দ্য ব্যুভয়া যেমন বলেছিলেন, নারীবাদ একই সাথে শ্রেণিসংগ্রামকে ধারণ করে, কিন্তু শ্রেণিসংগ্রাম নারীবাদকে নিজে থেকে ধারণ করে না। ব্যুভয়া নিশ্চিত ছিলেন : নারীবাদের মাঝেই অন্তর্নিহিতভাবে শ্রেণিও আছে। ইউরোপে, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও যে নারীবাদী আন্দোলনের উত্তুঙ্গ সময় তিনি দেখেছেন, তার বিশাল অর্জন সত্ত্বেও ‘নারীবাদ’ এবং ‘নারীর অধিকার’ এই দুটি ধারণা নিয়ে জনপ্রিয় চিন্তায় একটা পার্থক্য এখন আরও দৃঢ়তর হয়েছে। যেমন, কবছর আগের একটি সংবাদের শিরোনাম বলছে : ‘ফেমিনিজম হ্যাজ ফেইলড দ্যা ওয়ার্কিং ক্লাস।’ গার্ডিয়ানের এই সংবাদটি দাবি করছে, এই ব্যর্থতার কারণটি হলো নারীবাদ নারী-পুরুষ সমতা বিষয়ে অতিরিক্ত গুরুত্ব প্রদান করেছে সমাজের উঁচু তলায় নারীদের ভূমিকা রাখার বেলায় ।

সংবাদটিতে আরো জানানো হচ্ছে যে, ইংল্যান্ড সমাজের উপর তলায় নারী ও পুরুষের আয়ের বৈষম্য কমে এলেও এই বৈষম্য বিপুল হারে বর্তমান কর্মজীবী নারীদের মাঝে। গার্ডিয়ানের এই সংবাদটির মন্তব্য অংশে যেমন আছে নারীবাদ বিষয়ে উগড়ে দেয়া বিদ্বেষ ও পরিহাস, তেমনি খুবই বিবেচক মন্তব্য ও মতামতও প্রচুর আছে, যা জানিয়ে দিচ্ছে নারীবাদ বিষয়ে গভীর ভাবনা ও সচেতনতার অভাবও সেই সমাজে নেই। নারীবাদকে মোটাদাগে খারিজ করার প্রতিবাদে যেমন বক্তব্য সেখানে আছে, তেমনি আছে নিজেদের শ্রেণিগত সুবিধাকে রক্ষার জন্য নারীবাদকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার বিরুদ্ধে বিরক্তিও।

নারীবাদের এই কথিত ‘ব্যর্থতা’র একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে এই আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তির মাঝেই। নারীরা কেনো শেকসপিয়র হতে পারেন না, তার উত্তর অনুসন্ধান করে ভার্জিনিয়া উলফ দেখিয়েছিলেন, এর জন্য দায়ী নারীর প্রতিভার অনুপস্থিতি নয়, এর জন্য দায়ী সামাজিক গঠন, সাংস্কৃতিক নিয়ামকগুলো। তার প্রবাদতুল্য ‘নিজের একটি কামরা’ গ্রন্থটিতে তিনি সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন, শেকসপিয়রের সমান প্রতিভার অধিকারী হয়েও তার কল্পিত ভগ্নী জুডিথ সংসার জীবন ছেড়ে লন্ডন নগরীতে নাটকের জগতে প্রতিষ্ঠিত হতে চাইলে তাকে মর্মান্তিক পরিণতিই বরণ করতে হতো। নারী এতকাল কেনো শেকসপিয়র কিংবা নিউটন হতে পারেননি, তার ব্যাখ্যা তাই সোজা : সমাজের অনুমতি মেলেনি।

উলফ নতুন একটি যুগের আগমন বার্তারই সূচনা করেছিলেন, আনুষ্ঠানিক বুদ্ধিবৃত্তির জগতে নারীদের দলে দলে আগমনের। কিন্তু, উলফের গোটা প্রকল্পে শ্রমজীবী নারীদের উল্লেখ সামান্য। মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী পরিবার থেকে আসা উলফ মর্যাদাগত দিক দিয়ে সুবিধাজনক নারীদের অবস্থানে থাকলেও তার বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান তাকে সভ্রান্ত নারীর বাঁধা জীবনে আটকে রাখেনি, বরং এই নারীদের জন্য সৃজনশীল বিকাশের পথ তিনি সন্ধান করেছেন। কিন্তু সমকালীন শ্রমিক নারীর সংগ্রামের সাথে প্রায় কোনো সংযোগই তিনি বোধ করেননি। 

স্থুল শ্রেণিসংগ্রামবাদী এই প্রেক্ষিতে এই প্রশ্নটি তুলেই ফেলতে পারেন : ভার্জিনিয়া উলফের এই প্রকল্পে তবে শ্রমজীবী নারীর কী স্বার্থ? উপরন্তু, উলফ বরং জনসাধারণকে অপছন্দ করেন বলে মনে করেন কেউ কেউ, সুক্ষ্ম কলাশিল্পের অধঃপাতে তিনি বিমর্ষ এবং শ্রমিকের লেখার চেষ্টাতে বিরক্তও। এমনকি, ১৯১৩ সালে এক আয়োজনে শ্রমজীবী নারীদের মুখে বাড়তি মজুরি এবং কর্মঘণ্টা কমাবার দাবিতে বক্তৃতা শুনতে শুনতে সহানুভূতি নিয়েই ভেবেছেন, যন্ত্রের চাকা চালু রাখা, সন্তান জন্ম দেয়া, রান্না করা, বাজার করা এই নারীদের দাবি দাওয়া আর সংগ্রামের সাথে তার জীবনের কত সুদূর পার্থক্য।

উলফকে তার সময়-শ্রেণি-বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ভাবলে আমরা ইতিহাসের আরও অজস্র মহান ব্যক্তিদের এমনি সব সীমাবদ্ধতা খুঁজে পাবো, যা আমাদের আদৌ কোনো পথ দেখাবে না। যেমন, মার্কসও নারীশ্রমিকদের বিষয়ে অসতর্ক। বরং উলফ তার প্রেক্ষিত থেকে নারীর বুদ্ধিবৃত্তিক যে সম্ভাবনার কথা বলেছেন—যা প্রতিদিন কোরবানি হচ্ছিল সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের পুরুষতান্ত্রিকতায়, এমনকি পাঠাগারেও নারীর প্রবেশে বাধায়—তা একটা যুগান্তরই এনেছিল চিন্তায়। ভাষা, সাহিত্য ও জ্ঞানের ওপর যে শ্রেণিগত সুবিধাজনক সুযোগের ফলশ্রুতিতে উলফ তার প্রশ্নের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন, ইউরোপের ওই বিশেষ দশায় সেই সুবিধাটা তিনি পেয়েছিলেন নিজের একটা মধ্যবিত্তীয় ভিত্তি থাকার কারণেই। সময়টা কঠিন ছিল তখনও, বিশ শতকের এই সময়ের কথা বলতে গিয়েই তো সমারসেট মম তার প্রায় আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসে উল্লেখ করেছেন জার্মানিতে এক উদার-সজ্জন অধ্যাপকের কথা, যিনি ইবসেনের ‘পুতুলের সংসার’ নাটকটি তার কন্যারা দেখছেন এই দৃশ্য দেখার চেয়ে তাদের বরং তার পায়ের কাছে মৃত পরে থাকতে দেখতে বেশি পছন্দ করবেন বলে চিৎকার করছিলেন।

দুই.
সিমন দ্য ব্যুভয়াএর পরেরকার সময়টি ইউরোপ জুড়ে নারী শ্রমিকদের ‌উত্থানের যুগ। ভোটাধিকার, সম্পত্তির অধিকার, আইনী অধিকার, শিক্ষার অধিকার, সন্তান পালনের অধিকার... অজস্র বিষয়ে অজস্র ধারায় শক্তিশালী নারী আন্দোলন হয়েছে। এর সুফল শ্রমজীবী থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত, সকল নারীই পেয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেরকার দশকের নারী আন্দোলনের নতুন ঢেউয়ের নেত্রীদের সম্পর্কে ব্যুভয়া যেমন বলেছেন, “দ্বিতীয় লিঙ্গ  গ্রন্থটিতে ব্যাখ্যা করা যুক্তিগুলোই হয়তো এদের নারীবাদী বানিয়েছে; কিন্তু ওই যুক্তিগুলো তো তারা আমার বইয়ে নয়, আবিষ্কার করেছেন তাদের নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতায়।”

কিন্তু ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ লিখতে লিখতেই ব্যুভোয়া সচতন হন এই শ্রেণি প্রশ্নটিতেও। তিনি খেয়াল করে দেখেন যে, এই শ্রেণি ব্যবস্থার তিনি নিজেও একজন সুবিধাভোগী। তার নিরাপত্তা, তার মর্যাদার অনুভূতি তাকে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর মাঝেই আটকে রেখেছে। সবচেয়ে ভাল বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ, আর ভাবনার অবসর তাকে দিয়েছে পুরুষের মতই দর্শন, শিল্পকলা আর সাহিত্য বিষয়ে দ্যা সেকেন্ড সেক্স বইয়ের প্রচ্ছদপুরুষের সমকক্ষ হয়ে আলাপের ক্ষমতা। জীবনের প্রতিটি স্তরই তার স্বাধীনতা আর সমমর্যাদার অনুভূতিকে আরও পোক্ত করেছিল। নিজের জীবনের সাফল্য আর অর্জন তাকে এই ভ্রান্ত বিশ্বাসটি দিয়েছিল যে, যে কোনো নারীই চাইলেই এটা অর্জন করতে পারে। ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ লিখতে গিয়ে তিনি আবিষ্কার করেন, একজন কেরানী নারী সম্পত্তির অধিকারী হন না, পছন্দমত স্থানে তিনি বেড়াতে পারেন না, পাঠের সুযোগ বা অবসর তার একদম নেই এবং এই ব্যবস্থায় সবচেয়ে শোষিত নারীটির নারীমুক্তির সংগ্রামে নামার সম্ভাবনা থাকে সবার শেষে। কেননা, “সে জানে তার স্বামী সবচেয়ে বড় নারীবাদীর চাইতেও বেশি শোষিত, আর সে নিজে টিকে থাকার জন্য স্ত্রী ও মা হিসেবে তার ভূমিকার ওপর নির্ভরশীল।” তাই, নারীর প্রশ্নের তুলনায় বহুক্ষেত্রে শ্রেণিগত প্রশ্নটিই শ্রমজীবী নারীর কাছে অগ্রাধিকার পায়।
কিন্তু এটুকুই সব নয়। শ্রেণির লড়াই এবং ষাট দশকের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইও নতুন ওই নারীবাদের লড়াইকে আরও বিস্তৃত, জনপ্রিয় এবং জনসম্পৃক্তও করেছিল। সস্তা শ্রমের জ্বালানি হিসেবে নারীদের বিপুল নিয়োগ নতুন এই জনশক্তিকে ইতিহাসের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি হারে কারখানায় নিযুক্ত করেছিল। শ্রেণিসংগ্রাম এতে ঘনীভূত হলেও তারই ফল দাঁড়ালো এই অভূতপূর্ব প্রত্যয়টিও যে, ‘শ্রেণিসংগ্রাম নারী-পুরুষ বৈষম্য বিনাশের সংগ্রামকে বিলোপ করে না’। তাই শ্রমজীবীদের সংগঠনেও পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বাস্তব ক্ষেত্রে খুব জরুরি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ালো। বরং বিপুল নারীর শ্রেণি সংগ্রামে যুক্ততাই নারীর পৃথক এবং মৌলিক কিছু দাবিকে দৃঢ়তর শক্তি নিয়েই রাজনীতির মাঠে উপস্থাপন করার ভিত্তিটি নির্মাণ করেছিল। ফ্রান্সের বেলায় যেমন একটা খুবই উল্লেখযোগ্য লড়াই ছিল গর্ভপাতের অধিকার আইনসিদ্ধ করা।

তিন.

ভার্জিনিয়া উলফএমনিতে আমাদের সমকালীন প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তায় নারীর প্রশ্নটি একেবারে অনুপস্থিত তা বলা যাবে না। নারীমুক্তিকে লক্ষ্যে রেখে সাধারণ পাঠকের জন্য কমবেশি প্রকাশনাও হয়েছে। সহজেই উল্লেখ করা যায় আনু মুহাম্মদের ‘নারী-পুরুষ ও সমাজ’ গ্রন্থটির কথা। বৈশ্বিক নারীবাদী ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত একটি পর্যালোচনা, নারীবাদী বিতর্ক ও পন্থাগুলোর তুলনামূলক আলোচনার পাশাপাশি বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি এবং শক্তি ও সম্ভাবনার মূল্যায়ন মিলবে এখানে। বেশ চমৎকার আরেকটা বই ‘নারী পুরুষ বৈষম্য : জীবতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট।’ চিকিৎসাবিদ্যার অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম এখানে আলোচনা করেছেন জৈবিক দিক দিয়ে নারী-পুরুষের স্বাতন্ত্র ও সক্ষমতা বিষয়ে প্রচলিত ধারণাগুলোকে, তুলে ধরেছেন নতুন বৈজ্ঞানিক ও নৃতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাগুলো। একটা সংকলন আকারে প্রকাশ পেয়েছিল ‘কর্তার সংসার’ নামের আরেকটি নারীবাদী গ্রন্থ। তীব্রতার গুনে অনেকগুলো অনুবাদ ও মৌলিক লেখার এই গ্রন্থনাটি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছিল। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর শরৎচন্দ্র ও সামন্তবাদের কথাও বলা দরকার। নারীবাদী ঐতিহ্যে রচিত না হলেও শরৎসাহিত্যে নারীরা কেনো আধুনিকতা ত্যাগ করে পশ্চাদপদ সামাজিক সংস্কারেই বরাবর আত্মসমর্পণ করেন, তার নায়কেরা কেনো জমিদার কিংবা সামন্ত গ্রামীণ শ্রেণির, খলনায়ক কেনো ব্যরিস্টার কিংবা আধুনিক চিন্তার কেউ—এই দ্বন্দ্বের চিত্র উন্মোচন করতে গিয়ে যে পুরুষতান্ত্রিকতার উন্মোচন করেছেন, তাও নারীবাদী সমকালীন নারীবাদী সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। বলা যায় বেশ কয়েকটি সাময়িক পত্রিকার কথাও, নারীর প্রশ্নটি যেখানে মুখ্য বিষয়।

নিজের একটি কামরা’র প্রচ্ছদকিন্তু তাসলিমার আখতারের প্রশ্নটা দিয়েই শুরু শেষ করা যায় : বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি নারী যেখানে আছেন, সেই পোশাক শ্রমিকদের জীবনের সাথে নারী আন্দোলনের প্রথাগত নেতৃত্বের যোগাযোগ, সহমর্মিতা বা সমর্থন কতটুকু?
সম্ভবত খুবই কম। এই মুহূর্তে দেশের নারী আন্দোলনের একটা বড় অংশ বিশেষভাবে বেসরকারী সংস্থার অনুদান নির্ভর। এই অনুদান নির্ভরতার গুনে নারী আন্দোলনের এই বিশেষ ধরনটি সীমিত লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে, এবং প্রায় সর্বক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ নারী ও জনসাধারণকে আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়। বলা যায়, দরিদ্র ও শ্রমজীবী নারীদের প্রতি কিছু সহানুভূতি সমেতই আন্দোলনের এই অংশটি লক্ষ্যের দিক দিয়েও মধ্যবিত্তের একটা ছোট অংশের মাঝেই বন্দি। ৯০ দশকেও ‘সম্মিলিত নারী সমাজ’ আকারে এর যা তাৎপর্য ও প্রভাব ছিল, তা অদৃশ্য হয়েছে। তবে ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক পর্যায়ে অনেকেই সক্রিয় আছেন, এবং সাধ্যমত করছেন, এটা বলা যায়।

অন্যদিকে সম্ভবত, বাংলাদেশে শ্রমিক আন্দোলনেরও একটা বড় বিপর্যয় ঘটেছে এর ধারাবাহিকতার মাঝে বিরাট একটি ছেদ ঘটায়। যে শিল্পভিত্তির ওপর ষাটের দশক থেকে এদেশের শ্রমিক আন্দোলন দাঁড়িয়েছিল, ৯০ দশকের আগেই তা অদৃশ্য হয়েছে। ফলে নতুন যে একক বৃহৎ শ্রমিক জনগোষ্ঠী এদেশে তৈরি হয়েছে পোশাক শিল্পে, এই বিশাল বিচ্ছেদের কারণে সেটা সংগ্রামের অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব ও সংগঠনের দিক দিয়ে প্রায় শূন্য হাতেই মাঠে প্রবেশ করেছে। এই দীনতা একে একদিকে যেমন মালিক শ্রেণির অবিশ্বাস্য বিপুল শোষণের শিকার করেছে যার তুলনা সমকালীন পৃথিবীর শিল্পকারখানার ইতিহাসে বিরল, অন্যদিকে তাদেরকে দমনের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটই আমাদের সমাজে নারীকে আইনগত দিক দিয়ে, সামাজিক দিক দিয়ে এবং মর্যাদাগত দিক দিয়েও এত বেশি পিছিয়ে রাখার ভিত্তি হিসেবে ক্রিয়াশীল, যদিও তুলনামূলকভাবে অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ তার বিশাল।

চার.

বেগম রোকেয়াতবে অন্য একটা প্রবণতাও খেয়াল রাখা দরকার। পশ্চিমে শিল্পসাহিত্যের অভিজ্ঞতাতে সম্ভবত একটা ধীর বদল আমরা দেখছি। পুরুষ (মারকুটে) নায়ক আর (ধীমান) নায়িকাই সাহিত্যের স্বাভাবিক বিষয় ছিল কয়েক দশক আগেও। খুব অস্বস্তি নিয়েই ভাবতাম আতোয়ান দা সাৎ একজুপেরির ক্ষুদে রাজপুত্রের চরিত্রগুলো পুরুষ, কেবল যে গোলাপ ফুলের ওপর অভিমান করে সে তার গ্রহাণুটি ছেড়েছিল, সেটিই একটিমাত্র নারী চরিত্রের আভাস। আশ্চর্য যে, এর সর্বশেষ চলচ্চিত্রায়নটিতে প্রধান চরিত্র একটি মেয়ে, যে নাকি খুঁজে বের করে রাজপুত্রকে, আত্মভোলা হয়ে যে চিমনি পরিষ্কার করছে। ভূমিকার এই বদল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। সন্ত্রাসবাদ নিয়ে অতিসাম্প্রতিক জুটোপিয়া নামের চলচ্চিত্রটিতেও মারকুটে ভূমিকাতে নারী খরগোশটি, ধীমান, শান্তশিষ্ট ভূমিকার নায়ক পুরুষ শেয়ালটি। মূখ্য ভূমিকার এই পরিবর্তন সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষিত শূন্য নয়।
গার্ডিয়ানের ওই সংবাদটি আবার দেখা যাক। ২০১৩ সালের সংবাদটিকে অন্য একটি দৃষ্টিকোণ থেকে পড়লে বোঝা যাবে, এই সর্বজনীন অর্থে ‘নারীর অধিকারের লড়াইয়ের’ সাথে এদের সীমিত অর্থে ব্যবহৃত ‘নারীবাদের’ এই বিচ্ছিন্নতা ছিল সাময়িক। ট্রাম্পের আগমন এবং ঠিক এই মুহূর্তের বৈশ্বিক পরিস্থিতি পশ্চিমের নারীদের সচকিত করেছে, পথে নামিয়েছে। বোর্ড রুমে নারীদের উপস্থিতি এত কেনো কম, এই প্রশ্নের উত্তর সাধাণত এটাই দেয়া হয় যে, পুঁজিবাদে এর অবসানের সম্ভাবনা কম। কিন্তু উদারনৈতিক পুঁজিবাদ নারী সমাজের যতটুকু অংশকে যতদূর মুক্তি দিতে পারে, একই সাথে তার চূড়ান্ত পণ্যায়ন করে তাকে কতদূর বিক্রির বস্তুতে পরিণত করতে পারে, তার চিত্রটাও আমরা দেখেছি। কিন্তু তাই বলে কি নারী মুক্তির কোনো বাস্তব অগ্রগতি ঘটেনি? এটা তো আমাদের মানতেই হবে, বিপুল অগ্রগতি আগের দেড়শ বছরে নারীর ঘটেছে। ভিক্টর হুগো ১৮৬২ সালে সেই কারখানা শ্রমিক নারীটিকে(নারীদেরকেও) এঁকেছিলেন, আইনী স্বীকৃতিহীন সন্তানের জননী প্রমাণিত হবার পর যাকে পতিতাবৃত্তিই বেছে নিতে হয়েছিল। প্রতিবাদী হবার সুযোগ যার ছিল না কখনো। তাদের দুঃখের অবসান ঘটাতে প্যারিসের রাস্তায় ব্যারিকেডগুলোতে তাই পুরুষ নায়েকরাই ছিলেন একচেটিয়া। এমনকি মিশেল ফুকোর সূত্রে আমরা জানতে পাই প্রায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মতো আবদ্ধ ও পুরুষবিচ্ছিন্ন কর্মপরিবেশে ওই শতকের ফরাসী কারখানাগুলোতে কাজ করা নারী শ্রমিকদের কথা। আজকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে, সাম্রাজ্যবাদী ও বর্ণবাদী নীতির বিরুদ্ধে কিন্তু এই নারীরাই অগ্রসরতম অংশ। বোর্ড রুম হয়তো পুঁজিবাদী পুরুষতন্ত্রের দখলে, সড়কগুলোর নেতৃত্বে কিন্তু পুরুষের সেই একচেটিয়াত্ব আর নেই।

ইতিহাসের এই এক অদ্ভুদ দায়, আজ মধ্যবিত্ত সমাজ যে অধিকারগুলো ভোগ করেন, তার বৃহদাংশই এসেছে শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামের ফল হিসেবে। নারীদের বেলায় এই কথাটি আরও সত্য। ইউরোপে ভোটাধিকার, সম্পত্তির অধিকার, চলাফেরার অধিকার, শিক্ষার অধিকার, নিজ দেহের ওপর অধিকারের সংগ্রামের দাবির ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সামাজিক ও যৌথ বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকাই তারা রাখেননি কেবল, শক্তিসমাবেশের বড় অংশটিই তার কল্যাণেই সম্ভব হয়েছে। দিবাযত্ন কেন্দ্র কিংবা নিরাপত্তার মতো যে যে প্রশ্নগুলো আজকে মধ্যবিত্ত নারীর প্রধান আরাধ্য বাংলাদেশে, তার সবচে বড় অভাব বোধ শ্রমজীবী নারীরাই করেন। এবং, সকল সমাজেই দেখা যায় অধিকাংশ নারীদের গড় অবস্থাই সমাজে সাধারণভাবে নারীর মর্যাদা ও তার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকে নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু এই বিষয়ে বাংলাদেশে শ্রমজীবী নারীদের যে সংহতি ও সমর্থনের অধিকারী হবার কথা, তার অভাব সমাজে, চিন্তায় প্রবল। নিশ্চয়ই, আমাদের মনে রাখতে হবে তাজরিন গার্মেন্টের পোড়া শ্রমিকদের নিয়ে, কিংবা রানা প্লাজার শ্রমিকদের ধারাবাহিক সংগ্রাম জারি আছে, আছে সার্বিকভাবে পোশাক শ্রমিকদেরও সংগ্রাম। তাদের জীবনের সাথে সংহতি জানিয়ে অল্প দুয়েকটা হলেও শিল্পমানসম্পন্ন নাটক হয়েছে। কিন্তু এর যে ছাপ আমাদের সামগ্রিক শিল্প সাহিত্যে থাকার কথা ছিল, সেখানে আছে এক নির্বিকার নীরবতা। আশির দশকে এই ঢাকা নগরীতে আড়াইশ টাকার মজুরিতে মাস কাটানো নারী শ্রমিকটি সাহিত্যে তার জীবনের কোনো প্রতিফলন না ঘটিয়েই অন্তর্হিত হয়েছেন, তিরিশ বছর পরে আজ তার বেতন ৫৬০০ টাকা নিয়েও তিনি একইভাবে বিদায় নেবেন।

পাঁচ.

গার্মেন্টস শ্রমিকদের একটি দৃশ্যসাম্প্রতিক কালের নানান প্রতিকূলতা সত্ত্বেও পশ্চিমে পুরুষের একক বা প্রাধান্যশীল ভূমিকা গুরুতর প্রশ্নের মাঝে পড়েছে। প্রাচীন দুনিয়ায় নারীর ঐতিহাসিক পতনে ‘সমরবাদ’ একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। আজকের সভ্যতা সেই সমরবাদ আর আগ্রাসনের ওপর প্রতিষ্ঠিত বলেই অস্থিরতা থেকে তার মুক্তি নেই। এই সমরতন্ত্র কেবল জাতিতে জাতিতে বা রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে যুদ্ধে সীমিত নয়, এর ছাপ সমাজের নৈরাজ্যেও। এই সমরবাদই পুরুষতন্ত্রেরই ভিত্তি হিসেবে টিকে আছে। কিন্তু সম্ভবত সকলের আগে একজন, বেগম রোকেয়া কল্পনা করেছিলেন অন্য একটি সমাজের সম্ভাবনার কথা, মহা একটি যুদ্ধের অবসানের পর, যেখানে এই বলপ্রয়োগের ওপর, জবরদস্তির ওপর নির্ভর করা ক্ষমতার ভিত্তির অবসান ঘটবে। ব্যুভোয়া ভরসা দেন, এর মানে পুরুষের অধস্তনতা নয়। কিন্তু, মার্কস যেমন ভেবেছিলেন শ্রমিক মানবজাতিকে মুক্ত না করে নিজেকে মুক্ত করতে পারে না, কেননা তার নিচে শোষণ করার কেউ নেই—তার সীমাবদ্ধতাটা দেখিয়ে আধুনিক শ্রেণিসংগ্রামবাদী নারী অধিকার কর্মীরা বিকল্প প্রস্তাব হিসেবে দেখিয়েছেন নারীরা একই কারণে আরও বেশি প্রগতিশীল ও সাম্যের সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ।

বাংলাদেশে যদিও এখনও এই শ্রমজীবী নারীদের শঙ্খধ্বনি বেজে ওঠেনি, ক্ষণে ক্ষণে তা কেবল তাৎক্ষণিক আলোড়ন হিসেবে দেখা যায়। তার পরিমাণগত বিপুলত্ব আর জমাটবদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কি নতুন কালের রোকেয়াদের নতুন ভাবনায় রঞ্জিত করবে না, আমাদের জলবায়ুতে নিজস্ব ধরনের নারীবাদী চিন্তা, মতাদর্শ আর তত্ত্বের জন্ম দেবে না?


 

ফিরোজ আহমেদ, সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন। কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য, গণসংহতি আন্দোলন।

লাইভ

টপ