ওয়ালকট এবং রবীন্দ্রনাথ : গ্রন্থিত দুই মহাদেশের কথক

Send
মোজাফফর হোসেন
প্রকাশিত : ১৬:৪৭, মার্চ ১৮, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৮, মার্চ ১৮, ২০১৭

 

১৯৯২ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী ক্যারিবীয় কবি, নাট্যকার ডেরেক ওয়ালকটের বর্ণিল জীবনের অবসান ঘটলো ১৭ মার্চ, ২০১৭। ১৯৩০ সালের ২৩ জানুয়ারি সেন্ট লুসিয়ায় এক শিল্পী পরিবারে জন্ম তাঁর। বাবা ছিলেন কবি ও চিত্রশিল্পী। মায়ের গর্ভে থাকাকালীন বাবাকে হারান ওয়ালকট। তাই বাবার স্মৃতি না থাকলেও পৈত্রিকসূত্রে তিনি ও তাঁর যমজ ভাই রডারিক ওয়ালকট বাসায় পেয়েছিলেন সমৃদ্ধ এক লাইব্রেরি। আর শিল্পী বাবার রক্ত তো শরীরে ছিলই। ফলে দুভাই-ই বেড়ে উঠলেন বহুমুখী সৃজনশীল প্রতিভার অধিকারী হয়ে। রডারিক ওয়ালকট আত্মপ্রকাশ করলেন বিখ্যাত নাট্যকার, চিত্রনাট্যকার, সাহিত্যসমালোচক, গীতিকার, সম্পাদক ও চিত্রকর হিসেবে। ওয়ালকট শুরুতে চিত্রশিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রশিক্ষিত করে তুললেও চূড়ান্তভাবে কবি ও প্রাবন্ধিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন। ওয়ালকট এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, পিতার শিল্পকর্ম তাঁর জন্যে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করেছে। এবং তাঁর কাজ সেই কাজেরই বিস্তৃতি মাত্র। ওয়ালকটের শিক্ষা জীবন শেষ করেন ক্যাসট্রাইসের সেন্ট মেরিস কলেজ থেকে। ছাত্র হিসেবে মেধাবী ওয়ালকট 'ঔপনিবেশিক উন্নয়ন ও কল্যাণ' শীর্ষক বৃত্তি পেয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জ্যামাইকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। সেখানে তিনি ফরাসি, লাতিন ও স্প্যানিশ ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করেন। ত্রিনিদাদ থিয়েটার ওয়ার্কশপ সরে এসে শিক্ষকতার জন্য আমেরিকায় পাড়ি জমান। ১৯৮১ সাল থেকে তিনি বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়েটিভ রাইটিং কোর্সের শিক্ষক ছিলেন। মাঝে মধ্যে চলে আসতেন ক্যারিবিয়ায়। শেষ জীবনে পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে পাঠদান করে গেছেন। ২০০৯ সালে তিনি আলবের্তা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন বছরের জন্যে আবাসিক অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্তি ছিলেন। এরপর ২০১০ সালে এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে কবিতার অধ্যাপক পদে অভিষিক্ত হন।
নোবেলজয়ী ক্যারিবীয় কবি, নাট্যকার ডেরেক ওয়ালকট (২৩ জানুয়ারি, ১৯৩০-১৭ মার্চ, ২০১৭)আফ্রিকান এবং ইংলিশ বংশসূত্রের উল্লেখ করে ওয়ালকট নিজের শৈশবকে ‘সিজোফ্রেনিক’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর স্বদেশীয় আরেক নোবেলজয়ী লেখক ভিএস নাইপল নিজের আফ্রো-এশীয় বংশসূত্র এবং ইউরোপীয় জীবনবাসের কথা উল্লেখ করে নিজেকে বহুজাতিসত্তার (Many-Sided Background) মানুষ হিসেবে আখ্যা দেন। ওয়ালকটের ক্ষেত্রেও এই আখ্যা ভীষণভাবে খাটে।
কবিতা লেখার শুরুতে ওয়ালকট সচেতনভাবে ডব্লিউএইচ অডেন, টিএস এলিয়েট এবং ডিলান টমাসকে অনুসরণ করলেও নোবেলজয়ী বাঙালি কবি-কথাসাহিত্যিক-নাট্যকার-প্রাবন্ধিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর মিলটা যেন আরো বেশি প্রতীয়মান হয়ে ওঠে। দুজনেই দুই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক অঞ্চলের লেখক। পেয়েছেন দীর্ঘজীবন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ওয়ালকটও প্রধানতম বহুমাত্রিক মেধার কবি। প্রবন্ধ সাহিত্যেও খ্যাতি লাভ করেছেন। লোকনাট্য লিখেছেন। চিত্রশিল্পীও ছিলেন তাঁরা। রবীন্দ্রনাথ বিশেষভাবে এগিয়ে সংগীত বা গীতিকবিতায়। তবে রবীন্দ্রনাথের প্রার্থনা প্রধান গানের মতো অনেকগুলো গীতিময় কবিতা লিখেছেন ওয়ালকট। কবিতায় সুরবাঁধার রীতি ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিংবা ইউরোপীয় সংস্কৃতিতে জনপ্রিয় হলে ওয়ালকটের অনেক কবিতা সংগীতে রূপান্তরিত হতে পারতো। স্পিরিচুয়ালিটি রবীন্দ্রনাথের মতো ওয়ালকটের কবিতার প্রধান অনুষঙ্গ। ওয়ালকট নিজেও বলেছেন, ‘I have never separated the writing of poetry from prayer. I have grown up believing it is a vocation, a religious vocation.’ রবীন্দ্রনাথ কথাটা একটু অন্যভাবে বলেছেন- ‘আমার কাব্যসাধনার একটিমাত্র পালা। সে পালার নাম সীমার মধ্যে অসীমের মিলন সাধনের পালা।’ অর্থাৎ দুজনের অধ্যাত্মসাধনা সর্বজনীন চেতনা দ্বারা পরিশুদ্ধ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর গীতিকবিতার সংকলন ‘গীতাঞ্জলি’র জন্য নোবেল প্রাপ্তির কারণ হিসেবে নোবেল কমিটি উল্লেখ করেছেন, ‘...because of his profoundly sensitive, fresh and beautiful verse, by which, with consummate skill, he has made his poetic thought, expressed in his own English words, a part of the literature of the West.’ অন্যদিকে হোমারের মহাকাব্য ‘ওডিসি’ প্রাণিত কাহিনিকাব্য ‘ওমেরস’-এর জন্য ওয়ালকটকে সাহিত্যে নোবেল প্রদানের কারণ হিসেবে নোবেল কমিটি জানান, ‘...for a poetic oeuvre of great luminosity, sustained by a historical vision, the outcome of a multicultural commitment.’
দুজনই ভূদৃশ্য এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনাকারী হলেও সমাজের নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনকথা তুলে ধরেছেন দরদ মিশিয়ে। এজন্যে তাঁরা যেমন রিয়েলিস্ট তেমন রোম্যান্টিকও। দুজনই দুই মহাদেশীয় ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ ইতিহাস তুলে ধরেছেন তাঁদের লেখায়। উল্লেখ্য যে, রবীন্দ্রনাথ ও ওয়ালকট বহুভাষী পণ্ডিত ছিলেন। এক অর্থে ভাষাবিদও। ‘ভাষাপ্রধান’ কবি হিসেবেও তাঁদের আখ্যায়িত করা চলে। শিমাস হিনি ওয়ালকটের ‘Schooner Flight’ কবিতা প্রসঙ্গে যে বলেছেন, ‘Walcot has discovered a language woven out of dialect and literature neither folksy nor condescending… evolved out of one man’s inherited divisions and obsessions.’—তা রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও ভীষণভাবে খাটে।
নোবেলজয়ী বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ই মে, ১৮৬১-৭ই আগস্ট, ১৯৪১)রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি ভাষাজ্ঞান ও চর্চাকে অনেকে তাঁর সমালোচকরা ‘ঔপনিবেশিক মানসিকতার পরিচয়’ বলে কটাক্ষ করেছেন। তাঁর উত্তর তিনি নানাভাবে দিয়েছেনও। পরোক্ষভাবে এক জায়গায় বলেছেন, ‘এ কথা মানি না। যা সত্য তার জিওগ্রাফি নেই। ভারতবর্ষও একদিন যে সত্যের দ্বীপ জ্বালিয়েছে তা পশ্চিম মহাদেশেকেও উজ্জ্বল করিবে, এ যদি না হয় তবে ওটা আলোই নয়। বস্তুত যদি এমন কোনো ভালো থাকে যা একমাত্র ভারতবর্ষেরই ভালো তবে তা ভালোই নয়, এ কথা জোর করিয়া বলিব। যদি ভারতের দেবতা ভারতেরই হন তবে তিনি আমাদের স্বর্গের পথ বন্ধ করিবেন, কারণ স্বর্গ বিশ্বদেবতার।’ এর আরো সরাসরি উত্তরটা আমরা পেয়ে যাই ডেরেট ওয়ালকটের উক্তিতে। কারণ ক্যারিবীয় অঞ্চলে ওয়ালকটের ইংরেজি ভাষায় সাহিত্যচর্চা নিয়ে সমালোচনা কম হয়নি। তিনি তাঁর ইংরেজি চর্চা প্রসঙ্গে বলেন, ‘The English language is nobody’s special property. It is the property of the imagination; it is the property of the language itself.’ তবে ইংরেজিকে জ্ঞানচর্চার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করলেও দুজনেই ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের নিজ নিজ সংস্কৃতির গ্রাসকে নিন্দা করতে ছাড়েননি। মাতৃভাষা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ যেমন তাঁর ‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘কোন শিক্ষাকে স্থায়ী করিতে চাইলে, গভীর করিতে হইলে, ব্যাপক করিতে হইলে তাহাকে চিরপরিচিত মাতৃভাষায় বিগলিত করিয়া দিতে হয়।’ ওয়ালকট তেমন ক্যারিবীয় আদি ভাষাগুলোর জন্যে আকুতি জানিয়ে তাঁর ‘St. Lucia’ কবিতায় বলেছেন : ‘Come back to me/ my language/ Come back/ cacao/ grigri/ solitaire/ oiseau.’ তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনদর্শনের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে জার্মান মহাকবি গ্যেতের মতো তথাকথিত জাতীয়তাবাদী পরিচয় থেকে ‘মুক্তি’ নিয়ে নিজেকে বিশ্ব নাগরিক হিসেবে ভেবেছেন। একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় ওয়ালকটের ভেতরেও। ওয়ালকট নিজেকে বিশ্ব নাগরিক ঘোষণা দিয়ে ‘The light of the world’ কবিতায় বলছেন, ‘There was nothing they wanted, nothing I could give/ but this thing I have called ‘The Light of the World.’

লাইভ

টপ