behind the news
Vision  ad on bangla Tribune

সাযযাদ কাদির : যথেচ্ছ ধ্রুপদী এবং উইকিপিডিয়া-ব্রেন

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল০৭:৫৯, এপ্রিল ০৭, ২০১৭

সাযযাদ কাদির । জন্ম: ১৪ এপ্রিল, ১৯৪৭ মৃত্যু: ৬ এপ্রিল ২০১৭
শাহ নূর মোহাম্মদ ওরফে বাবর মানে সাযযাদ কাদির। তাঁঁর কাছে আমরা অনেকই ঋণী। যদ্দূর মনে পড়ে, সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ১৯৭৮ সালে তিনিই আমার প্রথম কবিতা ছাপেন। তার পরপরই তিনি চীনে চলে যান, রেডিও বেইজিং-এ যোগ দেন।

সাযযাদ কাদির যত বড় সব্যসাচী লেখক ছিলেন, তার চেয়েও অনেক বেশি পণ্ডিত ছিলেন, ছিলেন সর্বভোগী বোদ্ধা পাঠক। আমার জানা মতে, খুব কম লেখকই আছেন, যাঁরা প্রচুর বই পড়েন। আমার আজিজের পাঠশালা থেকেও নিয়মিত বই কিনতেন। না পেলে অর্ডার দিয়ে যেতেন।

শাহবাগে আমি নেই। কিন্তু আমার সেই প্রতিষ্ঠানটাকে তিনি খুব আপন ভাবতেন। এসেই বলতেন, ‘চা খাওয়াও’। আর আগে পাঠশালায় এসেই আমাকে কল দিয়ে বলতেন, নিচে নেমে আসো। শরীর ভালো না। আমি উপরে উঠতে পারি না। এখন নিচে যাবার সময়!

আমি আজিজ মার্কেটের তিন তালা থেকে নেমে পাঠশালায় যেতাম। শুরু হতো আড্ডা। পুরনো দিনের সিনেমা, পুরনো দিনের সজ্ঞীত, দেশি-বিদেশি সাহিত্য থেকে শুরু করে সব। বেশির ভাগ সময়ই আমি মুগ্ধ শ্রোতার ভূমিকায় থাকতাম। কারণ, এই ব্যস্ত জীবনে তিনি ভালো শ্রোতা পেতেন না।

হাসতে হাসতে বলতেন, প্রথম জীবনে মাস্টারি করেছি তো। তাই সেই ‘বদ’অভ্যাসটা রয়ে গেছে।

সাযযাদ ভাইয়ের অনেকটাই বর্ণাঢ্য জীবন। শিক্ষকতায়, সাংবাদিকতায় তাঁর জীবন সমৃদ্ধ। কিন্তু শিক্ষকতাটাকে তিনি খুব পছন্দ করতেন। গর্ব করতেন তাঁর ছাত্রদের নিয়ে। তাঁর কাছ থেকে শোনা একটি ঘটনা:

একবার কোন এক হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়েছেন। অনেক বিল এলো। তা পুরোটাই দিয়ে দিলো তাঁর এক ডাক্তার-ছাত্র। যিনি বলেছেন, ‘স্যার, আপনার কাছ থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করে আমি ডাক্তার হয়েছি। আপনার ঋণ তো শোধ হবে না। তবু এটা আমার সামান্য সান্ত্বনা’। এই কথা শোনে সাযযাদ ভাই আবেগে কেঁদেছিলেন।

প্রথা বিরোধী কবিতা ছাড়াও গল্প, গদ্য, গবেষণা, অনুবাদ, রবীন্দ্রনাথ নিয়ে কাজ। যেমন, 'রবীন্দ্রনাথ : শান্তিনিকেতন', 'রবীন্দ্রনাথ : মানুষটি'। বানান, বাক্য, ব্যাকরণ, ভাষা শৈলীতে তাঁর কি অসাধারণ দখল! আহ! আর তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘যথেচ্ছ ধ্রুপদ’ (১৯৭০)-তেই নামকরণ এবং কবিতায় তিনি প্রমাণ করেন আবেগতাড়িত আর প্রথা বিরোধী ধারার।

দুঃখ হয়, কত আজে বাজে কবি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। কিন্তু আবু হেনা মোস্তফা কামাল, আহমদ ছফা, ফরহাদ মজহার, সাযযাদ কাদিরেরা পান না।

এ সম্পর্কে এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন, ‘লেখালেখির সঙ্গে পুরস্কারের তেমন সম্পর্ক আছে বলে মনে করি না। লেখার সময় পুরস্কারের কথা কেউ ভাবেন বলে জানি না, আমিও ভাবি না। এ ছাড়া আমি বরাবরই প্রতিষ্ঠানবিরোধী, তাই কোনও নামী প্রতিষ্ঠানের তকমা আমার জন্য নয়। তবে পুরস্কার সম্পর্কে শুনেছি, ওগুলো নাকি দেয়া হয় না, নেয়া হয়। তাহলে বলতেই হয়, নেয়ার ক্ষেত্রে কোনও যোগ্যতাই নেই আমার।’

‘অযোগ্য’ সাযযাদ ভাইয়ের সাথে শেষ দেখা, ২০১৫ সালের বইমেলায়। মুখ ভর্তি দাড়ি, হাতে লাঠি, গায়ে চাঁদর জড়ানো। প্রথমে চিনতেই পারিনি। দূর থেকে ডাক দিলেন, 'দুলাল, আমাকে ভুলে গেলে? দাড়ি দেখে চমকে গেলে! আমি তো তোমাদের ভাষায়- 'মৌলবাদী। চৈনিক প্রগতিশীল থেকে এখন মৌলবাদী প্রতিক্রিয়াশীল! হা হা হা...’

অথচ ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে বিশেষ সাংগঠনিক ভূমিকা, ৭১-এ ছিলেন টাঙ্গাইলে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, পাকিস্তানী দ্বারা নির্যাতিত এক মানুষটি নিজের সম্পর্কে বলেন, ‘আমার বাল্যবন্ধু কাদের সিদ্দিকীর মতো আমিও নাকি বিতর্কিত!’

বিতর্কিত দ্বিতীয় বিবাহের কারণে। কিন্তু তা বলতে সাহস পেলাম না! এবং আরো একটি প্রশ্ন ছিলো তাঁর কাছে, ফেইস বুকে তিনি বেশ কজন প্রবাসী নারী লেখকদের ভক্ত হয়ে উঠেন। যা তার ব্যক্তিত্ব এবং রুচির সাথে যায় না। একজন শুভার্থী হিসেবে তা নিয়ে মৃদু প্রতিবাদ করায় আমাকে তিনি আনফ্রেন্ড করেছিলেন। কেনো? এই বিষয়টা বারবার তুলতে গিয়ে বারবার বিরত থেকে গেছি।

তারপর দু'জনে হেঁটে হেঁটে শাহবাগ পর্যন্ত এলাম। আমি মিরপুর যাবার জন্য সিএনজি নিলাম। তিনি রিকশা পাচ্ছিলেন না। তাই তাঁকে নামিয়ে দিয়ে গেলাম গ্রিন রোডে! আজ তিনি জীবন থেকেই নেমে গেলেন।  

সেদিন যাবার পথে পুরনো দিনের কথা, হারানো দিনের স্মৃতিচারণ করলেন। মনে পড়লো, ঢাকায় লেখালেখির শুরুতে রফিক আজাদ, আল মুজাহিদী, আফলাতুন আমাদের ‘ডাক নাম’ আসল নামের সাথে যুক্ত করায় খুব ঝামেলা করেন। নামের খতনা নাম পাল্টিয়ে দেন অথবা লেখা ছাপেন না।  তখন সচিত্র সন্ধানীতে বেলাল চৌধুরীর পরামর্শে লেখকদের ছদ্মনাম নিয়ে একটা কভার স্টরি করি। তখন সাযযাদ ভাই অনেক হেল্প করেন।

জানালেন, এখন মানবজমিন ছাড়াও বাংলাদেশের প্রকাশকদের পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেন। কলকাতা থেকে খ্যাতিমান বন্ধু লেখকদের পাণ্ডুলিপি এনে দেয়। এক পর্যায়ে প্রকাশ করলেন নিজেকে। আহ, ভেতরে কত নীরব ক্ষোভ আর যন্ত্রণা, কত বেদনা আর অভিমান!

প্রখর স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন সাযযাদ ভাইয়ের ব্রেন একটি তথ্যব্যাংক যেনো উইকিপিডিয়া। সব ধরনের নাড়ি ও নারীর খবর, হাড়ির এবং শাড়ির খবর ছিলো তাঁর নখদর্পণে!

কিন্তু আমরা তাঁর খবর রাখিনি!


আরো পড়ুন-

সাযযাদ কাদির ভাই : স্মৃতি ও সৃষ্টিতে

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ