behind the news
Vision  ad on bangla Tribune

সাযযাদ কাদির: এক বাংলা-সাধকের প্রস্থান

জাকির তালুকদার১৮:০২, এপ্রিল ০৭, ২০১৭

সাযযাদ কাদির‘বাংলা-সাধক’। এই অভিধাটিই তাঁর ক্ষেত্রে সবচাইতে ভালো মানায় বলে আমি মনে করি। তিনি কবি ছিলেন। গল্প লিখেছেন। অসংখ্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন। বিবিধ বিষয়ের রচনা লিখেছেন। সাইন্স ফিকশনও বাদ যায়নি। রেনেসাঁ-মানবের লক্ষণ ছিল তাঁর মধ্যে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব শাখা সম্পর্কে আগ্রহ। জ্ঞানের প্রতি অপরিসিীম তৃষ্ণাই তো রেনেসাঁর সর্বপ্রধান লক্ষণ। সেটি সাযযাদ কাদিরের মধ্যে প্রকট ভাবেই ছিল। কিন্তু তাঁর বিশেষ যে পরিচয়ের কথা আমি উল্লেখ করেছি- ‘বাংলা-সাধক’ তার কারণ হচ্ছে বাংলা সম্পর্কিত সবকিছুর প্রতি তাঁর অশেষ যত্নশীল মনোভাব।

তিনি খুব নিষ্ঠার সাথে সব বাংলাশব্দ নিয়ে কাজ করতেন। কবিরাই যে ভাষার রক্ষক- সেকথা তাঁর মধ্যে মূর্ত হয়ে উঠেছিল। অমন শব্দজ্ঞান আমি খুব অল্প মানুষের মধ্যে দেখেছি। বাংলাসাহিত্যের ইতিহাস তাঁর কাছে জীবন্ত ছিল। খুব অখ্যাত ও অধূনাবিস্মৃত কবি-লেখকের নাম ও রচনার কথা তিনি বলতে পারতেন তাৎক্ষণিক আলোচনার মধ্যেই। বাংলা কবিতা বা যে কোনো বাংলা রচনাই তিনি পাঠ করতেন গভীর মনোযোগের সাথে। কারণ তিনি বাংলাকে ভালোবাসতেন। বাংলাকে নিখুঁত করতে চাইতেন। বানান চর্চা করতেন, বাগধারা চর্চা করতেন, শব্দের সবচাইতে সঠিক রূপটিকে তুলে ধরতে চাইতেন। বাংলাচর্চাই ছিল তাঁর কাছে সবচাইতে বড় আরাধনা।

তবে বাংলাচর্চার পাশাপাশি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, বিশেষ করে ধর্মীয় রাজনীতি এবং জঙ্গিবাদের অভিঘাত নিয়েও তিনি চিন্তিত ছিলেন। তাঁর সাথে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বৃহস্পতিবারের আড্ডায় আমরা এ বিষয়ে দীর্ঘ আলাপ করেছি। তিনি নিজে যে কোনো সমস্যা উপরিতল থেকে বিচার করেই সন্তুষ্ট থাকার মানুষ ছিলেন না। তাই তাঁর সাথে ধর্ম, ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মনিরপেক্ষতার ভবিষ্যৎ, ধর্মীয় রাজনীতির কাছে বামপন্থীদের পিছিয়ে পড়া- এসব নিয়ে আলোচনা হতো নিয়মিত। এই আলোচনার গুরুত্ব এখানেই যে, ধর্মীয় মৌলবাদকে তিনি বাংলাসাহিত্যের এক বড় শত্রু বলে মনে করতেন ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের সূত্রেই।

তিনি মনে করিয়ে দিতেন যে- আমরা ভাবতে পছন্দ করি এই উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়, ইংরেজ আমলেই তার আমদানী। আমরা এই ভেবেও নিজেদের প্রবোধ দিয়ে থাকি যে সাম্প্রদায়িকতা নিতান্তই সমাজের ওপরের বা রাষ্ট্রীয় স্তরের ব্যাপার, এবং আমাদের দেশের বা পার্শ্ববর্তী দেশের মাধারণ মানুষ, যাদের আমরা জনগণ বলে থাকি, তারা সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প থেকে মুক্ত। কিন্তু এখনকার বাস্তবতা জানাচ্ছে যে সাধারণ মানুষ, সমাজের সবচাইতে নিম্নস্তরের মানুষও বিভিন্ন মাত্রার সাম্প্রদায়িকতায় আচ্ছন্ন। আর ইতিহাসপাঠ জানাচ্ছে যে ইংরেজ আগমণের অনেক আগে থেকেই সাম্প্রদায়িকতা এই উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে, তার শিকড় ইতিহাসের অনেক গভীরে প্রোথিত। ইতিহাস অনেক গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যা হওয়ার কথা ছিল শ্রেণিদ্বন্দ্বের ইতিহাস, তা এই উপমহাদেশে পরিণত হয়েছে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বন্দ্বের ইতিহাসে।

এই উপমহাদেশে বস্তুত সাম্প্রদায়িকতার শুরু সেই আর্য-অনার্যের দ্বন্দ্বের সময় থেকেই। বহিরাগত, আগ্রাসী, এবং বিজয়ী আর্যরা প্রথমেই আর্যাবর্তকে বেঁধে ফেলেছিল বর্ণাশ্রম নামের সাম্প্রদায়িকতায়। এই মাটির সর্বপ্রাণবাদী ধর্মসমূহ আর্যদের বৈদিক ব্রাহ্মণ্য ধর্মের তুলনায় অনুন্নত বলে ঘোষিত হলো। বিজয়ী আর্যদের কাছে এই মাটির সন্তানরা ছিল দাস এবং দস্যু। আর্যদের আগমণের পূর্বে এই উপমহাদেশে ‘দাস’ শব্দটি ছিল অচেনা। ঋগ্বেদে এসে দেখা যাচ্ছে রাজা ‘গরু ঘোড়া ও দাস বিতরণ করছেন’। এমনকি ঋগ্বেদে পশু শব্দটি মানুষের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হতে দেখা যাচ্ছে, যেখানে দ্বিপদ এবং চতুষ্পদ জন্তুর কথা বলা হচ্ছে। আর একবার দাস তো চিরকালীন দাস। ব্রাহ্মণ ঘোষণা দিচ্ছেন- ‘স্বীয় প্রভু যদি শূদ্রকে দাসত্ব হইতে মুক্তি দেন তাহা হইলেও শূদ্র দাসত্ব হইতে মুক্ত হয় না; কারণ দাসত্ব তাহার স্বভাবজাত, কে তাহা লঙ্ঘন করিতে পারে?’

বর্ণাশ্রমকে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ছাড়া অন্য কিছু আখ্যা দেওয়া সম্ভবই নয়, কারণ বর্ণাশ্রমের বিধানসমূহ আসছে ধর্মগ্রন্থ থেকে। চতুর্বর্ণেরও বাইরে যে চণ্ডাল, তার সম্পর্কে বলা হচ্ছে- ‘কোনো চণ্ডালকে স্পর্শ করা, তার সঙ্গে কথা বলা বা তার দিকে তাকানোও পাপ। তাকে স্পর্শ করলে শুদ্ধ হওয়ার জন্য  সারা শরীর ডুবিয়ে স্নান করতে হবে। তার সঙ্গে কথা বললে (পবিত্র) ব্রাহ্মণের সাথে কথা বলতে হবে; আর তার দিকে তাকালে সূর্যরশ্মির দিকে তাকিয়ে থেকে চোখের পাপ স্খালন করতে হবে।’ এমনকি ‘কোনো শ্রাদ্ধের উৎসর্গীকৃত সামগ্রী যদি চণ্ডাল ও অন্য অন্ত্যজরা দেখে ফেলে তাহলে তা অপবিত্র হবে।’

ব্রাহ্মণ্যবাদ ‘আর্য’ শব্দের অর্থ নির্ধারণ করেছিল- সুন্দর, সভ্য, কৃষ্টিবান। অন্যদিকে ভূমিপুত্র অনার্য মানেই- দাস এবং দস্যু। অধ্যাপক কোশাম্বি যাদের বলেছেন উদ্বৃত্ত বা সারপ্লাস সৃষ্টিকারী শ্রেণি। তাদের শ্রম নিয়োজিত হচ্ছিল জমিতে, কিন্তু ফসল ভোগের অধিকার ছিল কেবলমাত্র ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের।

এই আর্য সাম্প্রদায়িকতার পাল্টা প্রতিবাদ হিসাবে প্রথম আবির্ভূত হয়েছিল লোকায়ত দর্শন।  লোকেষু আয়তোঃ- জনসাধারণের মধ্যে পরিব্যাপ্ত বলেই এই দর্শনের নাম লোকায়ত। এই লোকায়ত বিপ্লবীরা প্রচার করলেন- ‘অজ্ঞ পৌরুষহীন অকর্মণ্য পুরোহিত সম্প্রদায়ের জীবিকার উপায় করে দেওয়ার জন্যই তৈরি হয়েছে অগ্নিহোত্র যজ্ঞের মন্ত্র, তিন তিনটি বেদ’। তারা আরো বলতে শুরু করলেন যে- ‘আসলে স্বর্গ পারলৌকিক আত্মা বলে কিছু নেই’।

স্বভাবতই ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় অক্ষশক্তি এদের দমন করেছিল নির্মমভাবে।

পরবর্তী বিদ্রোহ এসেছিল অনেক শত বৎসরের পরে বৌদ্ধধর্মের হাত ধরে। শিবনাথ শাস্ত্রীর ভাষায়- ‘প্রাচীন আর্য সমাজে ব্রাহ্মণদিগের প্রবল প্রতাপে হীন জাতি সকল যখন কাঁপিতে লাগিল, রাজাদের শক্তি পর্যন্ত যখন নামেমাত্র পরিণত হইল, আধ্যাত্মিক দাসত্বে প্রজাকুলের মনুষ্যত্ব যখন বিলীন হইল, মানব যখন পশুপ্রায় হইয়া পড়িল..’ সেই সময় বৌদ্ধধর্মের আবির্ভাব।

আদি বৌদ্ধধর্ম ক্ষত্রিয়দের দ্বারা প্রবর্তিত হলেও তার প্রধান ঝোঁক ছিল জনসাধারণের দিকেই। বস্তুবাদ এবং সাম্যের প্রবণতা ছিল অনেকখানিই। ব্রাহ্মণ্যবাদের অনেক মনগড়া তত্ত্বের সরাসরি বিরোধিতা করেছিল বৌদ্ধধর্ম। প্রাণিহত্যার বিরোধিতা করা ছিল বৌদ্ধধর্মের প্রধান স্তম্ভ। ‘তাহারা বলে ছাগল আদি পশুকে মন্ত্র দ্বারা পবিত্র করিয়া যজ্ঞে বধ করিলে তাহারা স্বর্গে যায়। যদি স্বর্গে যাইবার পথ ইহাই হয়, তবে তাহারা তাহাদের বাপ-মা-ভগিনীদের সেই উত্তম পথে স্বর্গে পাঠাইয়া দেয় না কেন?’

প্রথম পর্বের নির্ভেজাল বৌদ্ধ ও জৈনধর্মে ব্রাহ্মণ্য পূজা-অর্চনা সম্পূর্ণই বর্জিত হয়েছিল। ব্যাপক জনতার প্রিয় উৎসবগুলিই স্বীকৃতি পেয়েছিল গৌতম বুদ্ধের প্রচারিত ধর্মে। এই দুই ধর্মকে দুটি শ্রেণির মানুষ বরণ করেছিল সাগ্রহে। শূদ্র তো বটেই, তাদের সঙ্গে বৈশ্যরাও।

হিন্দু ধর্মের তাত্ত্বিকরা বলে থাকেন যে বৌদ্ধধর্মকে গ্রাস করে নিয়েছে হিন্দুধর্ম। যেমন ‘ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু’ গ্রন্থের লেখক প্রফুল্ল সরকার লিখেছেন- ‘তীক্ষ্মবুদ্ধি ধীরমস্তিষ্ক ব্রাহ্মণ মনীষী ও ধর্ম্মাচার্যেরা অপূর্ব কৌশলে বৌদ্ধ ধর্মকে হিন্দু ধর্মের মধ্যে আত্মসাৎ করিয়া ফেলিতে লাগিলেন।’

কিন্তু বাস্তবে সেটি ছিল রাষ্ট্রীয় প্রত্যক্ষ মদদে সাম্প্রদায়িক উচ্ছেদের দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার ফসল।  সেই ‘অপূর্ব কৌশলে’র একটি উদাহরণ কর্ণসুবর্ণের রাজা শশাঙ্ক। তিনি সেতুবন্ধ থেকে হিমগিরি পর্যন্ত বালক-বৃদ্ধ নির্বিশেষে সমস্ত হত্যার আদেশ দিয়েছিলেন। এমনকি এই আদেশ প্রতিপালনে যে শৈথিল্য দেখাবে, তার জন্যও মৃত্যুদণ্ডের বিধান ঘোষণা করেছিলেন। ইতিহাসে রাজা শশাঙ্কের অনেক কৃতিত্বের মধ্যে বুদ্ধগয়ার বোধিদ্রুম ধ্বংসের সার্বিক চেষ্টা এবং মগধের বৌদ্ধদের ওপর ‘অগ্নি ও তরবারি’ দ্বারা ভীষণ অত্যাচারের কথাও যথাযোগ্য মর্যাদার সাথেই লিপিবদ্ধ হয়েছে।

এরপর অষ্টম শতকে হিন্দুত্বের পুনরুত্থানকালে কুমারিল ভট্ট তো রীতিমতো বৌদ্ধ নিপীড়নের যাথার্থ্য দান করেছিলেন শাস্ত্র উল্লেখ করে। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে- ‘বৌদ্ধ মাত্রই বধ্য।’ মাদুরার রাজা শূলে চড়িয়েছিলেন আট হাজার জৈন পণ্ডিতকে। সপ্তম শতকে কুমায়ুনে সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল বৌদ্ধধর্ম। অথচ শঙ্করাচার্যের আন্দোলন সেখানে একটি বৌদ্ধ মন্দিরকেও অবশিষ্ট রাখেনি। ‘বৌদ্ধধর্ম বিনাশ’ করার পরে অন্য অঞ্চল থেকে ব্রাহ্মণদের নিয়ে এসে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল প্রধান প্রধান মন্দিরের ভার।

এই সাম্প্রতিক অতীতেও হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বিচলিত বোধ করেছেন এই কথা ভেবে যে, যে-পূর্ববঙ্গে এক কোটিরও বেশি বৌদ্ধধর্মের অনুসারী ছিলেন, এবং বাস করতেন ১১৫০০ বৌদ্ধভিক্ষু, সেই পূর্ববঙ্গে তিনি ৩০ বছর অনুসন্ধান চালিয়ে বৌদ্ধধর্মের একটি পুস্তিকার সন্ধান পর্যন্ত পাননি।

ইসলাম এই উপমহাদেশে এসেছিল সেই খেলাফতের যুগেই আরব-মুসলিম বণিক এবং সুফি ধর্মপ্রচারকদের হাত ধরে। তবে রাষ্ট্রক্ষমতায় ইসলামের আবির্ভাব মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের মাধ্যমে। আর বাংলায় এলো ইখতিয়ারউদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির অশ্বারোহী বাহিনীর পিঠে চেপে। তার আগে বল্লাল সেন চতুর্বর্ণ সমাজকে আরো বেশি বিভক্ত করেছেন। চার বর্ণে কুলাচ্ছিল না। করা হলো ছত্রিশ বর্ণ। ষোড়শ শতকে স্মার্ত রঘুনন্দন সেই ছত্রিশকে পরিণত করেছিলেন ২৩৬-এ।

সুদীর্ঘকাল মুসলিম শাসকরা এই উপমহাদেশে শাসন পরিচালনা করেছেন। কোনো কোনো ঐতিহাসিক এটা প্রমাণ করতে ব্যস্ত যে, মুসলমান শাসকরা ছিলেন পুরোপুরি হিন্দুবিদ্বেষী এবং সাম্প্রদায়িক। এই দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন রমেশচন্দ্র মজুমদার এবং যদুনাথ সরকার। রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে- ‘সকল ধর্ম সম্পর্কে শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার যে উদার চেতনা হিন্দুরা প্রচার ও প্রয়োগ করে এসেছে তা এখনও সভ্য মানব সমাজের কাছে একটি আদর্শ।’ আরেকজন, আচার্য স্যার যদুনাথ সরকারের মতামত হচ্ছে- ‘যে ধর্ম (ইসলাম) তার অনুগামীদের ধর্মীয় কর্তব্য হিসাবে শেখায় লুঠতরাজ ও হত্যা সেই ধর্ম মানব সমাজের প্রগতি বা বিশ্বশান্তি- দুয়েরই পরিপন্থি।’

এই দলের মতামত এবং সিদ্ধান্তগুলির সারসংক্ষেপ করলে দাঁড়ায়- ১. হিন্দুধর্ম উদার ও পরমতসহিষ্ণু। ২. ইসলাম ঠিক তার বিপরীত। ৩. হিন্দুধর্মের উদার আহ্বান উপেক্ষা করে দুই সম্প্রদায় চিরকাল বিচ্ছিন্ন থেকেছে ইসলামের অনুদারতার কারণেই। ৪. হিন্দু-মুসলমানের মধ্যকার সম্পর্ক বরাবরই ছিল তিক্ততার সম্পর্ক। ৫. মুসলমান শাসকরা ছিলেন সাম্প্রদায়িক। অস্ত্র হাতে স্বধর্ম প্রতিষ্ঠা ও বিধর্মী বিনাশই ছিল তাদের ব্রত।

আরেকদলের মতে, মুসলমান সম্রাটরা মোটেই সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যতটুকু প্রয়োজন, তার বেশি কিছুই করেননি তারা হিন্দুদের বিরুদ্ধে। এই মত পোষণকারী দলের মধ্যে রয়েছেন মানবেন্দ্রনাথ রায়, মুহম্মদ হাবিব ও ইরফান হাবিব প্রমুখ।

প্রথমোক্ত দলের সপক্ষে যথেষ্টই যুক্তি রয়েছে। সুলতান মাহমুদের বর্বর বিধ্বংসী আক্রমণ- মথুরা, থানেশ্বর, কনৌজ, এবং সর্বোপরি সোমনাথের জগৎ-বিখ্যাত মন্দির লুঠ ও ধ্বংসের কথা তাদের জানা। তারা জানেন ইসলামে আছে তরবারির মুখে ধর্ম প্রচারের কথা, দার-উল-ইসলাম এবং দার-উল-হারব এর তত্ত্ব। তারা জানেন তথাকথিত ওলামাদের হিন্দুবিদ্বেষের কথা, তাদের জেহাদি কার্যকলাপের কথা, কাফি খান, বারানি প্রমুখ ঐতিহাসিকদের সঙ্কীর্ণতার কথা, ধর্মান্ধ ফিরোজ তুঘলক কিংবা আলমগীরের বহুবিধ কার্যকলাপ এবং অন্য ধর্মীয়দের ওপর জিজিয়া কর আরোপের কথা।

কিন্তু অনেক প্রশ্নেরই আবার কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। যেমন মুহম্মদ বিন কাশিম সিন্ধুজয়ের পরে যে মন্দিরগুলি ভেঙেছিলেন, সেগুলি তাকে আবার গড়ে দিতে হয়েছিল কেন? যে আলমগীরকে চরম হিন্দুবিদ্বেষী বলে জানা যায়, সেই আলমগীর উমানন্দের মন্দির তৈরির জন্য জমি দান করছেন কেন? আবার ধর্মবোধই যদি মূল চালিকাশক্তি হয়ে থাকে, তাহলে সিকান্দার লোদীই বা কেন জৈনপুরে হিন্দু মন্দিরের ওপর গড়ে ওঠা সকল মসজিদ ধ্বংসের আদেশ দিলেন? যে সুলতান মাহমুদ হিন্দুবিদ্বেষী হিসাবে ঘৃণিত, সেই মাহমুদের হিন্দু সৈন্যরা কেন তার হয়ে মধ্য এশিয়ায় লড়াই করেছে? মাহমুদের বিরুদ্ধে তার প্রধান সেনাপতি নিয়ন্তিজিন বিদ্রোহ করেছিলেন। সেই বিদ্রোহ দমনে সুলতান মাহমুদ যে সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন, তার সেনাপতি ছিলেন হিন্দু ধর্মের অনুসারী তিলক। এটি কীভাবে ঘটল? বাবর মৃত্যুর সময় পুত্র হুমায়ুনের জন্য ৬টি আদেশ রেখে যান। সেগুলির সার কথা হচ্ছে- ‘বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বাস করে ভারতে। এই দেশের সরকারের গুরুদায়িত্ব তোমার ওপর ন্যস্ত হচ্ছে এর জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে। কখনো ধর্মীয় সংস্কার যেন তোমার মনকে প্রভাবিত না করে। সমস্ত সম্প্রদায়ের দেশবাসীর ধর্মীয় স্পর্শকাতরতা ও ধর্মীয় আচার আচরণের প্রতি প্রয়োজনীয় শ্রদ্ধার ভাব রেখে নিরপেক্ষ বিচার করবে।’ মুসলমানিত্বের নাম করে ভারত দখল করার পরে এই রকম পরধর্মসহিষ্ণুতার উপদেশ কেন? সমাজের নিচের তলায় বসবাসকারী মানুষ ইসলামের সাম্যের বাণীর কারণে নাহয় ধর্মান্তরিত হয়েছিল? কিন্তু সিংহাসন দখলে রাখার জন্য রাজা গণেশের ছেলে যদুর জালালউদ্দিনে পরিণত হওয়া কিসের ইঙ্গিত করে? বেরিলির ধরম রায় ফৌজদারকে চিঠি লিখে জানাচ্ছেন যে তার কাকাকে দেওয়া জমিদারি তাকে দিলে তিনি মুসলমান হতে রাজি। জমিদারি এবং মনসবদারি পেলে রাজা কাল সিং, দেবী খাত্রী, মাত্রুক, কেশরী, শিউ দত্ত, জ্বালানাথ, ভগবান দাসের পুত্র রামানন্দ- এরা সবাই মুসলমান হয়েছিলেন মনসবদারির বিনিময়ে। ঘোড়াঘাট দুর্গের অধ্যক্ষ ভান্দসী রায়ের অভিযোগে বারবাক শাহ নিজের প্রিয় পাত্র ইসমাইলকে মৃত্যুদ- দিলেন কেন? ১৫৯৪-৯৫ সালে ১২টি আঞ্চলিক অর্থমন্ত্রীর মধ্যে ৮ জনই হিন্দু ছিলেন কেন? জাহাঙ্গীরের সিংহাসনে আরোহনের তৃতীয় বছর থেকেই অমুসলিম মোহন দাস সম্রাটের দেওয়ান হিসাবে দায়িত্ব পেলেন কেন? শাহজাহানের রাজত্বকালে রায় চন্দ্রভান সচিবালয়ের প্রধান ছিলেন  কেন?

এইসব প্রশ্নের উত্তর এককথায় দেওয়া সম্ভব নয়। তবে এমন হতে পারে যে, সাম্রাজ্য পরিচালনার প্রয়োজনে যোগ্য অমুসলিমদের নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন তারা। আবার একই সাথে এই সিদ্ধান্তেও আসা যেতে পারে যে ভেতরে ভেতরে সাম্প্রদায়িক হলেও বাইরে একটি সম্প্রীতির বাতাবরণ, অন্তত দেখানোর জন্য হলেও, প্রয়োজন ছিল মুসলমান সম্রাটদের।

তবে একটা ব্যাপারে সবাই একমত যে, শ্রমজীবী কোটি কোটি প্রজাদের শোষণ করার ব্যাপারে প্রত্যেকেই ছিলেন সিদ্ধহস্ত। সম্রাটের অনুগ্রহভাজন আমির খসরুকেও তাই বলতে হয়েছিল যে- ‘সম্রাটের মুকুটের প্রতিটি মুক্তা আসলে দরিদ্র মানুষের জমাট বাঁধা রক্ত এবং কান্না দিয়ে তৈরি।’

কিন্তু শেষ পর্যন্ত উপমহাদেশের ইতিহাস শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস না হয়ে পরিণত হয়েছে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতারই ইতিহাস।

এই বেদনা বুকে নিয়েই তিনি চলে গেলেন।

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ