সাহিত্যে পুলিৎজার পেলেন যারা

Send
দুলাল আল মনসুর১৯:২২, এপ্রিল ১৩, ২০১৭


কিনতে পারো যা তুমি গানের বিনিময়ে সে-ই হলো মুক্তি; তবে গানটা তোমার ফুসফুসে ঝালাই করে নেয়ার পরে, গানটা তোমার স্বপ্নের ভেতর পথ বাধানোর পরে, গানটা তোমার বিছানায় চুপিচুপি ঢুকে পড়ার পরে, গানটা তোমায় পুরোপুরি পেয়ে বসার পরে, গানটা পচে গেলে, প্রস্ফুটিত হলে, এরপর আবার পচে গেলে, গানটা তোমার আঙুলগুলো চুরি করে নিলে, তোমার কণ্ঠ কেড়ে নিলে, এ সবকিছুর পরে তুমি চাও গানটা বেচে দিতে; আসলে সে গানটা তো কখনও যায় না বেচা। শেষে শুধু হাত বাড়াতেই পারো- যে শব্দগুলো মুক্তি বানায় সেগুলোর অপেক্ষাতেই থাকো।


অন্যান্য বছরের মতো এবারও সাংবাদিকতার বিভিন্ন শাখার সঙ্গে পুলিৎজার পুরস্কার দেয়া হয়েছে কবিতা, নাটক ও কথাসাহিত্যে। ওপরের পঙক্তিগুলো বারের পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়া মার্কিন কবি তায়েহিমবা জেসের ‘মুক্তি’ কবিতা থেকে নেয়া হয়েছে। এ বছর তিনি পুলিৎজার পুরস্কার পেলেন তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ওলাইও’র জন্য। আমেরিকার গৃহযুদ্ধ আর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়ের আফ্রিকান-আমেরিকান শিল্পীদের সম্পর্কে লেখা। আফ্রিকান-আমেরিকান সুরকার ও পিয়ানো বাদক স্কট জোপলিনের বিশেষ প্রভাব রয়েছে জেসের এ কাব্যগ্রন্থে। এছাড়া আরো অনেক অখ্যাত অজানা গায়কের ভূমিকাও আছে তাঁর এ গ্রন্থের কবিতাগুলোয়। তায়েহিমবা জেসের মতে, আমেরিকার সংগীত মূলত আফ্রিকান-আমেরিকান অভিজ্ঞতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমেরিকায় দাসত্বের হাতিয়ারে ওই মানুষগুলোকে পড়াশোনার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। নিজেদের সংগীতের মাধ্যমেই তারা নিজেদের সংস্কৃতি তৈরি করে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
ওপরের কবিতার পঙক্তিগুলো পড়লেই আমেরিকার হারলেম রেনেসাঁর কবি ল্যাংস্টন হিউজের কবিতার সুর মনে পড়ে যায়। ল্যাংস্টন হিউজের মতোই নিগ্রো সংস্কৃতির কথা, তাদের গানের কথা প্রাধান্য পেয়েছে তায়েহিমবা জেসের কাছেও। জ্যাজ কবিতার ধারার অগ্রপথিক হিউজেরই উত্তরসূরী জেস। পুরস্কার পাওয়ার লড়াইয়ে তায়েহিমবা জেসের কাব্যগ্রন্থের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল প্রয়াত অড্রিয়েন রিচের কাব্যগ্রন্থ ‘কালেক্টেড পোয়েমস’।
এ বছর নাট্যকার লিন নোটেজ পেয়েছেন নাটকের পুলিৎজার। এবার তিনি দ্বিতীয়বারের মতো পেলেন এ পুরস্কার। ২০০৯ সালে পেয়েছিলেন তাঁর নাটক ‘রুইনড’-এর জন্য। তাঁর এবারের পুলিৎজার পাওয়া নাটকটির নাম ‘সোয়েট’। নাটকটির পটভূমিতে আনা হয়েছে শিল্পসংকোচনের শিকার হওয়া এক শহর। সেখানকার শ্রমজীবী শ্রেণির বিচ্ছিন্নতার কথা তুলে ধরা হয়েছে এ নাটকে। সুক্ষ্ম দ্যোতনাপূর্ণ শক্তিশালী নাটকটি দর্শকদের মনে করিয়ে দেয় আমেরিকার স্বপ্নসন্ধানী শ্রমিকদের কথা। নোটেজ বলেন, অর্থনৈতিক স্থবিরতা কীভাবে আমেরিকার সাংস্কৃতিক জীবনের কথকতার আকার নির্ধারণ করে দিচ্ছে সেটাই বোঝার চেষ্টা করেছেন এ নাটকে। তৃণমূল পর্যায়ের মানুষদের জীবনের গল্পই সত্যবাদী, আবেগী এবং কৈফিয়তহীন ভঙ্গিতে বলার চেষ্টা করেছেন তিনি। পুরস্কারের জন্য মনোনীত হতে গিয়ে ‘সোয়েট’কে লড়তে হয়েছে সারা ডেলাপের ‘দ্য উলভস’ এবং টেলর ম্যাকের ‘এ ২৪- ডিকেইড হিস্ট্রি অব পপিউলার মিউজিক’-এর সঙ্গে।
এবার কথাসাহিত্যে পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছেন কোলসন হোয়াইটহেড। তাঁর পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাসের নাম ‘দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড রেইলরড’। এ উপন্যাসটি ছাড়াও তিনি আরো লিখেছেন ‘দ্য নোবল হাসল’, ‘জোন ওয়ান’, ‘দি ইনটুইশনিস্ট’, ‘জন হেনরি ডেইজ’, এবং ‘অ্যাপেক্স হাইডস দ্য হার্ট’ নামের উপন্যাস।
এ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র কোরা গালিবারের মতো একের পর এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলতে থাকে। আফ্রিকা থেকে আমেরিকায় নিয়ে আসার সেই শুরু থেকে বর্তমান সময়ের কৃষ্ণাঙ্গদের জীবনের কষ্টের কথা বলা হয়েছে এখানে। ঔপন্যাসিক আমেরিকার গৃহযুদ্ধপূর্ব সময়ের কৃষ্ণাঙ্গদের ভীতির চিত্র পুনরায় তৈরি করেছেন এ উপন্যাসে। দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তির চেষ্টায় একজন নারী যে অদম্য মনোবলের পরিচয় দিতে পারে তার গতিশীল গল্প হলো এ উপন্যাস। অন্যদিকে সবার জানা ইতিহাসের ভেতরে গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপের প্রচেষ্টাও আছে এখানে।
কোরা জর্জিয়ার এক তুলার খেতে কাজ করা কৃতদাসী। তার মতো সব কৃতদাসের জীবনই অশেষ কষ্ট আর গ্লানির। তবে তার জীবনটা আরো খারাপ। তার সমগোত্রীয়দের মাঝেও সে অনাকাঙ্খিত। নারীত্বের আবির্ভাবে তার জন্য তৈরি হয় আরো বড় যন্ত্রণা। ভার্জিনিয়া থেকে আসা সিজার যখন তাকে আন্ডারগ্রাউন্ড রেইলরডের কথা জানায়, তারা দুজনে সিদ্ধান্ত নেয়, প্রচণ্ড ঝুঁকি থাকলেও তারা পালাবে। পরিস্থিতি তাদের পরিকল্পনার মতো করে এগোয় না। তাকে ধরতে আসা এক শ্বেতাঙ্গ যুবককে মেরে ফেলে কোরা। যদিও তারা একটা স্টেশন পেয়ে যায় এবং উত্তর দিকে যাওয়ার চেষ্টা চালায় তাদেরকে পাকড়াও করার চেষ্টায় থাকে অন্যরা।
তাদের প্রথম বিরতি সাউথ ক্যারোলাইনা; প্রথমত তাদের কাছে আশ্রয়ের মতো মনে হলেও, ওপরে ওপরে নিরুপদ্রব মনে হলেও এই নগরী এখানকার কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে কুচক্র পাকাতে থাকে। এখানে রিজওয়ে নামের একজন বেপরোয়া চেষ্টায় কৃতদাস ধরে বেড়ায়। সে কোরা এবং সিজারের নাগাল প্রায় ধরেই ফেলে। কোরা বাধ্য হয়েই মুক্তির অন্বেষণে ছুটে বেড়ায় এক রাষ্ট্র থেকে আরেক রাষ্ট্রে।
হোয়াইটহেড এ উপন্যাস লেখার সময় উৎসাহ পেয়েছেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস এবং টনি মরিসনের লেখা পড়ে। হোয়াইটহেডের এ উপন্যাসকে শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়েছে অ্যাডাম হাসলেটের ‘ইমাজিন মি গন’ এবং সি ই মরগানের ‘দ্য স্পোর্ট অব কিংস’ উপন্যাসের সঙ্গে।

 

 

 

 

 

লাইভ

টপ