পাহাড়ের বৈসাবি উৎসব

Send
ঞ্যোহলা মং০১:০০, এপ্রিল ১৪, ২০১৭

বৈসাবি উৎসব
বৈচিত্র্যপূর্ণ পাহাড়ের নববর্ষ উৎসব। কেউ বলে বিঝু, কেউ বলে সাংগ্রাই, কেউ বলে বিহু, আবার কেউবা বৈসুক। তাই অনেকে একত্রে বৈসাবি বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। নববর্ষ এলে পাহাড়ের প্রাণ ফিরে পায়। চারদিকে নানা আয়োজন, রঙবেরঙের পোশাক, নানা ভাষার (প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর রয়েছে আলাদা আলাদা ভাষা) পাশাপাশি সমতল থেকেও প্রচুর পর্যটকের সমাগম ঘটে। পাহাড়ের লোকজন এই দিনের জন্য অপেক্ষায় থাকেন দলে দলে বিভক্ত হয়ে র‌্যালি বের হওয়ার জন্য। র‌্যালি বের করে মূলত তারা আনন্দ প্রকাশ করতে চায়। ভালোবাসা, সহভাগিতা, সহমর্মিতা জানাতে চায়।
পাহাড়ে এমনিতেই আন্তঃজনগোষ্ঠীর (ত্রিপুরা, চাকমা, মারমাসহ অন্য সব) মধ্যে এই যাবৎকালের কোনো দ্বন্দ্ব নেই। তাদের মধ্যে পোশাক ভিন্ন হতে পারে, ভাষা ভিন্ন হতে পারে কিন্তু যুগ যুগ ধরে একই অঞ্চলে একত্রে বসবাস করতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে গভীর বন্ধন তৈরি করেছে। যে বন্ধন তাদের ভাষায়, পোশাকে এমনকি ধর্মীয় বিশ্বাসে ভিন্নতা থাকলেও আলাদা ভাবতে শেখায়নি। এই তিন পার্বত্য জেলায় প্রায় ১৩টি ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর শান্তিপূর্ণ বসবাস, অনেক জনগোষ্ঠীর জন্য অনুকরণীয় হতে পারে।
পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী এই জনগোষ্ঠীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক অভিন্নতা, জীবনধারণ পদ্ধতি এবং বঞ্চনার ধরন একই হওয়ার কারণেই মূলত এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নানা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করেছে প্রাকৃতিকগতভাবে। এই জনগোষ্ঠীদের মধ্যে কমবেশি অনেকে এখনো জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল। আবার যারা এখন বিভিন্ন কারণে জুমচাষ আর করছেন না তারাও কিন্তু জুমের ফসলের জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকেন। জুমের কোনো ফলন বাজারে এলে সবার চেষ্টা থাকে আগে আগে সংগ্রহ করার। আমরা যারা এই পার্বত্য অঞ্চলে বসবাস করি, জুমের চাল আর জুমে উৎপাদিত কোনো ধরনের ফল মুখে পড়লে বুঝতে পারি। আমরা সহজে পার্থক্য নিরূপণ করতে পারি জুম আর লাঙল চাষের ফলনের স্বাদ ও গন্ধ দিয়ে।
তাইতো পার্বত্য অঞ্চলের নাচ-গান আর গল্প সব জুম কেন্দ্রিক। জুমকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে প্রেমকাহিনীসহ নানা হাসি-কান্নার গল্প। অনেক অনেক নাটক মঞ্চস্ত হয়েছে এই জুমকে নিয়ে। আর তাইতো জুমকে কেউ জেনে বা, না জেনে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন (জুম বন বিনাশ করে, পরিবেশবান্ধব নয় ইত্যাদি) করলে পাহাড়ের সাধারণ জুমিয়া থেকে শুরু করে এই অঞ্চলের গণমান্য ব্যক্তিরাও নড়েচড়ে বসেন। ফলে জুম পার্বত্য অঞ্চলের লোকজনদের একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তাদের নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ এনজিওগুলোর লোগোতে জুমের ছবি ব্যবহার লক্ষণীয়।
জুমের ফলন না হলে এখনো অনেক উপজেলায় প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে নীরবে দুর্ভিক্ষ হয়। নীরবে দেশান্তরিত হয়, যা আমরা অনেকে জানি না। যার পরিপ্রেক্ষিতে পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের জুমচাষিদের এই নববর্ষে একটি প্রধান চাওয়া থাকবে, জুমের ফলন যেন ভালো হয়। যাতে সারা বছরটা মোটামুটিভাবে কেটে যায়।
অন্যদিকে বৈসাবিতে পার্বত্য জেলা শহরের পাহাড়ি বাবুরা জুমকে নিয়ে নাচ, গান আর কবিতা আবৃতি করেন। জুমের নানা ফলন সংগ্রহ করে বছরের সেরা তরকারি পাচন রান্না করে প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন আর গণ্যমান্যদের খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। যাতে আগামী বছরটা সুন্দর কাটে, রোগমুক্ত থাকে।
যারা রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য শহরে বসবাস করার কারণে গ্রামে যেতে পারেন না তারাও এই জুমের ফসলাদি সংগ্রহ করে পাচন রান্না করতে চান। সবাই যে যার মতো করে চেষ্টায় থাকেন পাচনের উপকরণাদি বাড়াতে।
গ্রামে গ্রামে প্রতিবেশী নারীদের মাঝে পাচন উপকরণাদি বিনিময় হয়। চেষ্টা করে সবাই সবাইকে খুশি করাতে যতটুকু বাড়িতে বেড়ানো সম্ভব বেড়াতে।
স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের পরিকল্পনা থাকে নতুন কোনো গ্রামে বেড়াতে যাওয়ার, যে গ্রামগুলোতে তাদের আগে কখনো যাওয়া হয়নি।
গ্রামের বয়স্ব বুড়ো-বুড়িরা এই নববর্ষকে ঘিরে নানা আয়োজনের সামনে পেছনে থেকে নির্দেশনা দিয়ে আরো আকর্ষণীয় করার পাশাপাশি কারিগরি জ্ঞানের প্রজন্মভিত্তিক সুন্দর হস্তান্তরের চেষ্টা করে। গ্রামের মুরব্বিদের সবসময় চিন্তা থাকে তাদের অভিজ্ঞতায় অর্জিত জ্ঞান যাতে নতুন প্রজন্মরা ধারণ এবং পালন করে, সেই চেষ্টা করার।
মন্দিরে মন্দিরে নিজেদের গ্রাম, সমাজ আর দেশের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা সভা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামজুড়ে হাজার হাজার মোমবতি প্রজ্বলন করা হয় আগামীর মঙ্গলের জন্য, শান্তির জন্য, সমাজে সমাজে, মানুষে মানুষে ভালোবাসার জন্য। ফানুস উড়ানো হয় রাতের পার্বত্য আকাশের কাল মেঘ কেটে আগামীতে যাতে আলোয় আলোয় ভরে ওঠে।
সারাদেশের পত্র-পত্রিকাজুড়ে রঙিন ছবি সংবলিত নানা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পত্রিকায় আগাম প্রতিবেদন আর পূর্ব থেকে জানাশুনার সুবাদে হাজার হাজার পর্যটক পার্বত্যমুখী হন। যাদের অধিকাংশই উদ্দেশ্য হয় ছবি তোলা আর সোজাসাপ্টা আনন্দ করা।
আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, হাজার হাজার পর্যটকদের মধ্যে খুব কমই পাহাড়ের এই জনগোষ্ঠীদের বৈচিত্র্যপূর্ণ বৈসাবি উৎসবের তাৎপর্যতা অনুধাবনে সক্ষম হন। তারা এই জনগোষ্ঠীদের উৎসবকে অন্য দশটি উৎসবের মতোই ধরে নিয়ে আনন্দ করেন, ঘুরে বেড়ান, ছবি তোলে ফেসবুকে পোস্ট করেন মাত্র। এই সাধারণ পর্যটকদের পাশাপাশি দেশের নানা বিভাগে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাহাড়ি ছাত্রছাত্রীরা সমতলের বসবাসকারী বন্ধুদের নিয়ে যান পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতে। পাহাড়ের সংস্কৃতি দেখাতে। এই সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠের ছাত্রছাত্রীরাও বৈসাবির মূলমন্ত্র উপলব্ধি করতে পারেন কিনা জানি না। তবে আমাদের সবার প্রয়োজনে, বর্তমান বিশ্বের এই সংঘাতপূর্ণ সমাজে এই ডজনখানেক জনগোষ্ঠী কি করে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারে তা উপলব্ধি করা দরকার। এই উৎসব অন্য দশটি উৎসবের মতো নয়। এই উৎসব মানে শুধু মানুষে মানুষে ভালোবাসা বিনিময় নয়, শুধু গতানুগতিক মানুষের মঙ্গল কামনা করা নয় বরং এসবের পাশাপাশি বৈসাবি হলো প্রকৃতি, নদী আর পাহাড়কেও কৃতজ্ঞতা জানানো। তাইতো এই দিনে তারা নদীকে পূজা করে ফুল দিয়ে (জীবনে নদনদীর গুরুত্ব অনুধাবনের কথা বলে), বড় বড় গাছপালাকে পূজা (যত্ন করার শিক্ষা দেয়) করে, প্রকৃতির থেকে সহজলভ্য উপকরণাদি দিয়েই তারা বছরের সেরা তরকারি রান্না করে (প্রকৃতি প্রদত্ত পাঁচমিশালি খাবারের ঔষধি গুণের কথা বলা হয়)।
বর্তমান পৃথিবীতে দ্বন্দ্ব, সংঘাত আর প্রতিহিংসার সংস্কৃতিতে শান্তিপূর্ণ বসবাসের একটি প্রকৃত উদাহরণ হতে পারে এই বৈসাবি। এই বৈসাবি শুধু মানুষে মানুষে বন্ধন তৈরি করে না, আগামীর পৃথিবীকে বসবাসযোগ্য করে রাখতে আমাদের উৎসব কেমন হতে পারে তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে।
বৈসাবি মানে শুধু পাহাড়িদের মধ্যেই বন্ধন নয়। সেখানে আগে থেকে বসবাসকারী বাংলা ভাষাভাষী বাঙালি সম্প্রদায়ের সঙ্গে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীদের রয়েছে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। কারণ তারাও একসঙ্গে বসবাস করতে গিয়ে একে অপরকে চিনে, জানে এবং সম্মান করে। দেশের বৃহত্তম বড় ঈদ থেকে শুরু করে হিন্দুদের দুর্গাপূজা সবখানে পাহাড়িদের সরব উপস্থিতি দেখা যায়। পাহাড়ের খুব কম পূজামণ্ডপ জমবে যদি সেখানে পাহাড়িদের নিত্যদিন ঢল না নামে। বৈসাবিও সব সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য উন্মুক্ত। সবার পাহাড়িদের বাড়িতে বেড়ান। এটাই হলো বৈসাবির মূল সৌন্দর্য।
কিন্তু পাহাড়ের এই জনগোষ্ঠীদের নানা নামে পরিচয় দিয়ে (যেমন কখনো উপজাতি, কখনো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ইত্যাদি) রাষ্ট্র শুধু তাদের নানাভাবে ‘ছোট’ করেই চলেছে (দেখুন ত্রিপুরা ৫ আগস্ট ১৩)। তারা যা করছে সবকিছুতে সন্দেহ করা হয়। এনজিও কার্যক্রমে সন্দেহ হয়। তাই পার্বত্য এনজিওগুলোকে সময়ে সময়ে বিভিন্ন সরকারি অফিস থেকে বিভিন্ন ধরনের ফরম দিয়ে তথ্য যাচাই করা হয় যেমন, সুবিধাভোগী এবং কর্মীদের মধ্যে কতজন পাহাড়ি আর কতজন বাঙালি ইত্যাদি। তাদের জীবনধারণের উৎস জুমচাষেও সন্দেহ হয় (দেখুন ত্রিপুরা, নভেম্বর ২০০৩)। তারা একত্রে মিলেমিশে দ্বন্দ্বহীনভাবে বসবাস করতে জানে তাতেও রাষ্ট্রের মাথাব্যথা। তাই তাদের ভাগ করতে চায়। তাদের দিয়ে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে সংগঠন করানো হয় যাতে দ্বন্দ্ব তৈরি হয় (দেখুন এন, মং ১৬)। সমতলের নানা কারণে সমালোচিত সরকারি কর্মকর্তা আর কর্মচারীদের পোস্টিং করানো হয় এই পাহাড়ি অঞ্চলে (দেখুন ত্রিপুরা, ৪ জুন, ২০১৬ ও নাসরিন ১, জুন, ২০১৬)। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীদের নিয়ে নানা গুজব ছড়িয়ে নানা সুবিধাদি থেকে বঞ্চিত রাখার চেষ্টা করা হয় (পার্বত্য চট্টগ্রাম মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় আসে ২৭ মার্চ ২০০৮ সালে, দেখুন ২৮ মার্চ The daily star 2008)।
তবে আশার কথা হলো দেরিতে হলেও সরকার এই বৈসাবির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছে। তাইতো ১৩ এপ্রিল ২০১৫ সালে এই উৎসবের জন্য পাহাড়ি কর্মচারী আর কর্মকর্তাদের জন্য ঐচ্ছিক ছুটি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
অনেক বাধা-বিপত্তির পরও পাহাড়ের এই জনগোষ্ঠীরা একত্রে মিলেমিশে বসবাস করছে। অনেকের ধর্ম ভিন্ন হয়েও কিভাবে একত্রে বসবাস করতে পারে, তা পার্বত্য সমাজ থেকে দেশ ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের শেখার অনেক রয়েছে।
...
লেখক : উন্নয়নকর্মী ও ইউএন ইনডিজেনাস ফেলো।

লাইভ

টপ