বৈশাখ আমাদের জাতিসত্তার উৎসব

Send
শামসুজ্জামান খান
প্রকাশিত : ০১:০৮, এপ্রিল ১৪, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ০১:৩৩, এপ্রিল ১৪, ২০১৭

মঙ্গল শোভাযাত্রা
আমাদের নববর্ষ উৎসব পালনের প্রধান বিষয় রমনার বটমূলে বৈশাখ উৎযাপন। ভোরে সূর্য উঠার সঙ্গে সঙ্গে তাদের বৈশাখ-বরণ। ঢাকা শহরে এটাই প্রধান উৎসব। এই উৎসবের সঙ্গে ১৯৮৯ সাল থেকে আরো একটি আকর্ষণীয় উৎসব যুক্ত হয়েছে। মূলত, এরশাদের স্বৈরশাসনের প্রতিবাদে চারুকলার শিক্ষার্থীরা এই আয়োজন করে। তখন এটার নাম ছিল মঙ্গল শোভাযাত্রা। এখন এটি আনন্দ শোভাযাত্রা নামে হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রা এবং আনন্দ শোভাযাত্রা দুটিই বলা হয়। তবে মঙ্গল শোভাযাত্রা বলাটাই ভালো বলে আমার কাছে মনে হয়। ঢাকা শহরে ১৯৮৯ সাল থেকে এই উৎসব শুরু হলেও এটি এখন বিশাল থেকে বিশালতর হয়েছে। বিভাগীয় শহরগুলো যেমন: রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ইত্যাদি ছাড়াও জেলা শহরগুলোতে অনেক বড় আকারে এখন আয়োজন করা হয় কোথাও শোভাযাত্রা, কোথাও উৎসবযাত্রা, আনন্দযাত্রা ইত্যাদি নানা নামে। বৈশাখী মেলা হয় শহরে গঞ্জে প্রায় সবখানেই।
বাঙালির জাতিসত্তাকে নব বৈশাখের আলোকে, চেতনায় এবং অসাম্প্রদায়িক মানবিকতায় উদ্বুদ্ধ করছে। এটি আমাদের জন্য খুবই আনন্দের কথা। আমরা একটি নৃ-তাত্ত্বিক জাতি। জাতিসত্তার দিক থেকে অসাম্প্রদায়িক, শংকর। মূলত মঙ্গল শোভাযাত্রা এই জাতিগোষ্ঠির প্রতীক হিসেবে উঠে আসে। শোভাযাত্রায় গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী টেপা পুতুল, মাটির পাত্র, চিরায়ত বাংলার প্রাকৃতিক শোভার প্রতীক হিসেবে ফুল, পাখির পাশাপাশি অশুভ, অমঙ্গলের প্রতীকগুলো স্থান পায়। এবারের নববর্ষ বাঙালি চেতনাকে সমৃদ্ধ করবে, ধর্ম, জাতি ও জাতপাত ভুলে সবাইকে আরো ঐক্যবদ্ধ করবে এটাই প্রত্যাশা।
গত বছর বৈশাখের শুরুতেই ইলিশ মাছ খাওয়াটা সমালোচনার দৃষ্টিতে আমাদের সামনে এসেছে। ইলিশ মাছ নিয়ে এতটা আগ্রহ, কৌতুহল- বলা যায় একেবারে ক্রেজি হয়ে উঠেছে কেউ কেউ। এর ফলে গোটা দেশে ইলিশ মাছের দাম ব্যবসায়ীরা এমনভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে যে, সেটা সমস্ত হিসেব-নিকেশ, পরিকল্পনার বাইরে চলে গেছে। এটি কোনোভাবেই শুভলক্ষণ নয়। পান্তা-ইলিশের সংস্কৃতি এরশাদের স্বৈরাচারি আমলের শেষ দিক থেকে কেউ কেউ চালু করতে চাইল। তারা সে সময়ে গড়ে ওঠা তথাকথিত উঠতি ধনিক শ্রেণি, যারা প্রধানত চোরাকারবারি, জোচ্চুরি, ফটকাবাজি ইত্যাদির মধ্য দিয়ে তাদের সম্পদ গড়ে তুলেছে। এই ধনিক সম্প্রদায় পান্তা-ইলিশ সংস্কৃতির একটা রেওয়াজ চালু করতে চাইল। যদিও পান্তা ইলিশের সঙ্গে বৈশাখের কোনো সর্ম্পক নেই। এর কারণ: প্রথমত, বৈশাখ মাসে ইলিশ থাকে জাটকা। সেই জাটকা ধরা নিষিদ্ধ। ইলিশ প্রজনন কালে এখন একটি নিদৃষ্ট সময়ে জাটকা ধরা নিষিদ্ধ করা হয়। সুতরাং ছোট ইলিশ দিয়ে কোনোভাবে উৎসব হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, আমাদের গ্রাম বাংলার বিশেষ করে পূর্ব বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতি কৃষকের সংস্কৃতি। বিশেষ করে দরিদ্র কৃষকের দেশ আমরা। তারা উৎসব করত খুবই সামান্য আয়োজনে। সকালবেলা কৃষকরা বাড়ি থেকে বের হতো পান্তা ভাত খেয়ে, কখনও কখনও ‘আমানের পানি’ এবং ভেজানো চাল খেয়ে। ‘আমানি’ বলে মহিলারা এক ধরণের উৎসব করত। যাতে সারা বছর পরিবারের মঙ্গল কামনা করা হত। এটা এক ধরনের লোকবিশ্বাস। শত্রুর হাত থেকে পরিবারকে রক্ষা, নানা অসুখ বিসুখের হাত থেকে রক্ষা- মূলত সারা বছর যেন সবাই শান্তিতে, সমৃদ্ধিতে থাকে এটাই ছিল কামনা। কৃষকরা মাঠে যাবার পর পান্তা খেত। সেই পান্তা ভাত বেশিরভাগ সময় পোড়া মরিচ, আলু ভর্তা বা বেগুন ভর্তা ইত্যাদি দিয়ে খাওয়া হত। এটাই আমাদের স্বাভাবিক ধারা।

গত বছর থেকে ইলিশ বর্জনের একটি ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। আমার ইলিশের মৌসুমে প্রচুর ইলিশ মাছ পেয়েছি। ধনী-গরিব সবাই খেতে পেরেছে। আশা করছি এবছরও আমারা অনেক বেশি সচেতন হয়েছি। ইলিশের স্বাদ জাটকায় নয়, উৎসবের নামে জাটকা নিধন বন্ধ করতেই হবে।

আমাদের অর্থনীতি এখন ব্যাপক বিস্তৃত। শুধু বিস্তার নয় অনেকক্ষেত্রে গভীরতাও বেড়েছে। গোটা বিশ্বের পুঁজিবাদী অর্থনীতির সঙ্গে আমাদের অর্থনীতি তাল মিলিয়ে চলছে। মানুষের হাতে টাকা পয়সা এসেছে। মানুষের হাতে টাকা আসলে কিন্তু দুটো বিষয় কাজ হয়; প্রথমত, উৎসব করবার প্রবণতা বাড়ে। দ্বিতীয়ত, উৎসব বাণিজ্যিক রূপ পায়। এখন মানুষের হাতে টাকা এসেছে এটা খুবই ইতিবাচক দিক। কিন্তু শুধুমাত্র অর্থ আছে আর একটা উৎসব হলো- এখন এই উৎসবকে সৃষ্টিশীলভাবে করব নাকি একেবারে যে ধরণের অনুষ্ঠান করা উচিত না তাই করব? তার ভাবনা থাকতে হবে। সৃষ্টিশীলভাবে উৎসব করবার লক্ষ্য হলো– এই যে এখন আমরা যেভাবে করছি– রমনার বটমূলে সূর্যদয়ের সঙ্গে অনুষ্ঠান, চারুকলায় মঙ্গল শোভাযাত্রা, বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠান হচ্ছে, ঋষিজ-এর অনুষ্ঠান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে এসব অনুষ্ঠান হচ্ছে, শুধু তাই নয় সারা দেশব্যাপি উৎসব হচ্ছে। এগুলো খুবই ইতিবাচক উৎসব। আর যারা এই দিনে ঢাকা শহরে সানকিতে ভাত খায়, আদতে তারা কোনোদিনই সানকিতে ভাত খায়নি। তারা তো বাসি ভাতই খায় না। তারা গরম ভাত ঠাণ্ডা পানিতে ভিজিয়ে সেদিন খায়। এটা আমাদের কৃষিভিত্তিক সম্প্রদায়ের প্রতি ঠাট্টা বিদ্রুপের মতো। এই জায়গাটা আমাদের পরিষ্কার করা দরকার। আমরা একটি আনন্দঘন উৎসব করতে চাই। যাতে হিন্দু মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই যেন আমরা বাঙালি এই চেতনাকে উর্দ্ধে তুলে ধরতে পারি। বৈশাখ আমাদের জাতিসত্তার উৎসব। এই বোধে যেন আমরা জাগ্রত হতে পারি।

সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও রায় কার্যকর করছে। তাদের কয়েকজনের ফাঁসি হয়েছে। যাদের ফাঁসি হয়েছে তাদের পক্ষ থেকে অর্থাৎ তারা কোনো কিছুই করতে পারছে না। এই না করতে পারাটাকেই তারা এমনভাবে ব্যবহার করছে। এটি পাকিস্তান আমলের প্রপাগান্ডা। পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকেও ১৯৫৫ সালে বিশেষভাবে এই ধরনের কথা বলা হয়েছিল যে, পহেলা বৈশাখ মুসলমানদের সংস্কৃতি নয়। তখন তার প্রতিবাদ করেছিলেন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী মোতাহের হোসেন সহ সেসময়ে আমাদের অনেক জ্ঞানী, গুণিজন। তখনই তারা সবাই মিলে পাকিস্তান সরকারের কথার বিরোধীতার পাশাপাশি উৎসব পালনের পরিকল্পনা করেন এবং নতুনভাবে পঞ্জিকা করে। নতুনভাবে পঞ্জিকা সংস্করণের কাজ করেছিলেন তখন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। পাকিস্তানের সেই কথার প্রতিবাদেই আমরা উৎসব করেছি। পরবর্তীতে ১৯৬১ সালে আমরা পেলাম ছায়ানট। ১৯৬৬ সাল থেকেই রমনার বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠান এখন গোটা জাতির মানস কল্পনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে।

যারা স্বাধীনতাবিরোধী, যারা তথাকথিত ধর্মান্ধ এবং যারা বাঙালির চেতনায় কখনই উদ্বুদ্ধ নয় তারাই এই কথাগুলো বলে। বাঙালির যে একটি গৌরব আছে, একটি স্বতন্ত্র ইতিহাস আছে- সেটা তারা জানেই না। এই কথাগুলোই তার আদতে বলে অপ্রচার করতে। তাদের জানা উচিত বাঙালিত্বই গড়ে উঠেছে মুসলমানদের থেকে, মুসলমানদের উদ্যোগে। চতুর্দশ শতকে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ও পরে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ- এই দুই সুলতান স্বাধীন বাংলার সুলতান ছিলেন। শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ নিজেকে ‘শাহ এ বাঙালিয়ান’ বলে ঘোষণা করেছিলেন। শাহ এ বাঙালিয়ান মানে বাঙালিদের বাদশা। তিনি নিজেকে বাঙালিদের বাদশা বলে গৌরববোধ করতেন। তারাই কিন্তু বাঙালি সংস্কৃতির উদ্ভব, বিকাশ, প্রচার, প্রসার ঘটিয়েছেন। এতএব হিন্দু সংস্কৃতি বলে বৈশাখ পালনের বিরোধীতা যারা করে তারা মূর্খ, তারা কিছুই জানে না। তারা হিন্দুত্ব বোঝে না, মুসলমানিত্বও বোঝে না– তারা প্রকৃত অর্থে মুসলমান নয়।

...

শ্রুতিলিখন : নার্গিস আক্তার

লাইভ

টপ