শান্তনু স্যারের স্মৃতি

Send
মুহম্মদ মুহসিন
প্রকাশিত : ১৮:৫৪, এপ্রিল ১৫, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৫৯, এপ্রিল ১৫, ২০১৭

শান্তনু কায়সার। জন্ম: ৩০ ডিসেম্বর ১৯৫০, মৃত্যু: ১১ এপ্রিল ২০১৭

শান্তনু স্যারের নাম শান্তনু কায়সার তখন পত্রপত্রিকার লেখালেখির বরাতে দুয়েকবার শুনে থাকলেও তখন অবধি মনে হয়েছিল তিনি আমাদের বয়সী কোনও ছেলে-ছোকড়া হবেন হয়তো। বিশেষ করে নামের ধ্বনিবিন্যাসটা আমাকে বুঝতেই দেয়নি যে উনি মুরুব্বি গোছের কেউ হতে পারেন। তাঁকে নিয়ে আমার এই ধারণা প্রথম ধাক্কা খেলো একদিন আমার পিএইচডি সুপারভাইজার প্রফেসর আবু তাহের মজুমদারের এক কথায়। মজুমদার স্যার আমাকে প্রবন্ধ লেখায় কাঠামোবদ্ধতা ও বক্তব্যের সুসংবদ্ধতা বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে শান্তনু কায়সারের প্রবন্ধ ‘অভিনিবেশ সহকারে’ পড়তে উপদেশ দিয়েছিলেন। তখন মজুমদার স্যারের কাছ থেকেই জানলাম শান্তনু কায়সার পেশায় ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক এবং বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে সমসাময়িকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠজন না হলেও শীর্ষজনদের একজন।

এর অল্পদিন পরে কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুল বিষয়ক এক সেমিনারে প্রবন্ধকার হিসেবে আসলেন শান্তনু কায়সার। প্রবন্ধের বিষয় ছিল ‘থিওরি জগতের সাম্প্রতিক সংযোজন সাবঅল্টার্ন স্টাডিজের আলোকে নজরুলের কথাসাহিত্যের নির্ধারিত দুয়েকটি টেক্সট বিশ্লেষণ’। ততদিনে আমি জানি শান্তনু কায়সার ইংরেজি-বাংলা উভয় সাহিত্যের জগতে বিদগ্ধ জন। খুব জমে বসেছিলাম তাঁর প্রবন্ধ শুনতে। দেখলাম ইতিহাস বিশ্লেষণের কর্মকাণ্ড থেকে জন্ম নেওয়া এই ভাবনাপ্রপঞ্চকে তথা সাবঅল্টার্ন স্টাডিজকে তিনি সাহিত্য বিশ্লেষণের তত্ত্বরূপে ব্যবহারের যোগ্য করেই বুঝেছেন। নিছক নিম্নবর্গীয় কিছু চরিত্র খোঁজার হাস্যকর কর্মরূপে তিনি প্রবন্ধটি লেখেননি। অথচ ওই প্রবন্ধের পরে এমনকি সাবঅল্টার্ন স্টাডিজের আলোকে সাহিত্য বিশ্লেষণ বিষয়ক পিএইচডি সেমিনারে পর্যন্ত দেখেছি গবেষক নিম্নবর্গীয় কিছু চরিত্রের কর্মকাণ্ডের বর্ণনা দিয়ে তাঁর গবেষণা কাজ শেষ করেছেন। তখন বুঝলাম প্রফেসর আবু তাহের মজুমদার কেন বলেছিলেন- ‘ভালো প্রবন্ধ লিখতে হলে শান্তনু কায়সারকে পড়’।

মজুমদার স্যারের উপদেশ অনুযায়ী শান্তনু কায়সারকে তখন আমি অনেকটা খুঁজে খুঁজেই পড়ছি। পড়লাম রূপম প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত তাঁর গ্রন্থ ‘বঙ্কিমচন্দ্র’। দেখলাম একজন বিশ্লেষকের দৃষ্টি কতটা নির্মোহ ও কতটা অনুসন্ধানী হতে হয়। পড়লাম  বাংলা একাডেমী থেকে ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত ‘তৃতীয় মীর’। দেখলাম এক আনুপুঙ্খিক বিশ্লেষণে তিনি উপস্থাপন করেছেন প্রথম থেকে শেষ অবধি মীরের জীবনাভিজ্ঞতা কিভাবে তাঁর লেখায়, সাহিত্যকর্মে এক অন্তঃসলিলা ঐক্য-প্রবাহে ধৃত ও রূপান্তরিত। জীবনযাপন-মন-মনন-শিল্প সব মিলিয়ে যে তৃতীয় মীরের সন্ধান শান্তনু কায়সার করেছেন তাতে সম্পূর্ণ এক নতুন পরিপ্রেক্ষিতে মীর মশাররফ হোসেন আবিষ্কৃত হয়েছেন। পড়লাম  ‘নয়া উদ্যোগ’, কলকাতা থেকে ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত ‘অদ্বৈত মল্লবর্মণ: জীবন সাহিত্য ও অন্যান্য’। এ বইয়ের বিস্তারিত আলোচনা থেকে দেখলাম এক গভীর ভালোবাসায় চারপাশের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তথ্য আবেগে ও অধ্যবসায়ে জোড়া দিয়ে দিয়ে শান্তনু কায়সার সূত্রপাত করেছেন এক অভিনিবিষ্ট অদ্বৈতচর্চা।

হয়তো এই পড়া বইগুলোই কায়দা করে আমাকে একদিন পৌঁছে দিলো তাদের মালিকের নিকট। তবে তাদের এ আয়োজন সম্পর্কে আমি একটুও ওয়াকিবহাল ছিলাম না। ২০১১ সালে আমি যোগদান করলাম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। জানলাম সেখানে আব্দুর রাজ্জাক নামে একজন মুরুব্বি অধ্যাপকের কয়েকটি ক্লাস রয়েছে। ক্লাস নিতে আসা সেই অধ্যাপকের দিকে তাকিয়ে তো আমার চক্ষু ছানাবড়া। এ যে আমার অনেক শ্রদ্ধেয় লেখক শান্তনু কায়সার। তিনিই তাহলে তলে তলে প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক! শান্তনু কায়সারের সহকর্মী হতে পেরে নিজেকে অনেক গর্বিত ও সৌভাগ্যবান মনে হলো।

তবে সে সৌভাগ্য বেশিদিন স্থায়ী হলো না। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. আমির হোসেন খানের আহ্বানে শান্তনু কায়সার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন অধ্যাপনা ছেড়ে কুমিল্লায় এসেছিলেন যেহেতু কুমিল্লাকে তিনি নিজ এলাকা বলে মনে করতেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এমন একজন পণ্ডিতকে তার নিজের মানুষ ভাবতে পারলো না। খণ্ডকালীন হিসেবে তাঁর চুক্তি নবায়নের সময় এলো। আমরা বিভাগীয় একাডেমিক কমিটি থেকে জোরালোভাবে তাঁর চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির সুপারিশ করে কাগজপত্র পাঠালাম। কিন্তু কর্তৃপক্ষ চুক্তি আর নবায়ন করলো না। শুনলাম সিন্ডিকেটের কোনও একজন দুরাত্মা সদস্য তার ব্যক্তিগত ঈর্ষা বা বিদ্বেষের জায়গা থেকে বিরোধিতা করায় এই নবায়ন সম্ভব হয়নি। দুই বাংলার সাহিত্য জগতে যে মানুষটি পণ্ডিত হিসেবে অভিনন্দিত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর সেবাকে পায়ে ঠেলে বিদায় দিলো শুনে সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। এই খবর ক্যাম্পাসে পৌঁছার পর ইংরেজি বিভাগের ছেলেমেয়েদের যে করুণ শুষ্ক মুখ দেখেছিলাম তা দেখে আমাদের অর্থাৎ বিভাগের শিক্ষকদের চোখও ঝাপসা হয়ে উঠেছিল। আরও অনেক পরে শান্তনু কায়সার বাংলা একাডেমী পুরস্কার ২০১৪- তে ভূষিত হলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ পরিকল্পনা করেছিল সাবেক শিক্ষক হিসেবে তাঁকে একটি সংবর্ধনা প্রদানের। প্রস্তাবটি কর্তৃপক্ষীয় অনুমোদন লাভের জন্য উপস্থাপিত হলে এবারও নাকি সেই একই দুরাত্মার পরোক্ষ বিরোধিতার কারণে তা বাতিল করতে হয়েছিল। অবশ্য এটাই স্বাভাবিক যে, এই দুরাত্মারা অনেক পদ-পদবি পাওয়ার পরেও এমন দুরাত্মাই থেকে যাবে। ইবলিশ হাজার বছর এবাদাতের পরেও ইবলিশই থেকে গেছে।

অবশ্য শান্তনু কায়সারকে এই নিয়ে ওই ইবলিশ সম্পর্কে একটি মন্দ কথা কোথাও বলতে শুনিনি। হয়তো তিনি ‘লা-হাওলা’ পড়েছেন, তবে তা মনে মনে। আসলে শান্তনু কায়সারের সাহিত্যবৃত্তি তাঁর মনোবৃত্তিকে অনেক বড় উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছিল। নিরীহ, নিরিবিলি এবং সর্বতো সুকুমার বৃত্তির ধারক এই মানুষটির ব্যক্তিত্ব ও আত্মসম্মানবোধ ছিল এতখানি প্রখর যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি খণ্ডকালীন চাকুরির জন্য তিনি উমেদারি করবেন এমন ভাবনা তাঁর মনোবৃত্তিকে স্পর্শ করার প্রশ্নই আসে না। আত্মসম্মানের প্রশ্নে তাঁর কর্মজীবনে ছিল এর চেয়ে ঢের বড়মাপের অনেক ঘটনা।

তিনি যখন কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ তখন সেখানে একটি অনুষ্ঠানে মন্ত্রী আকবর হোসেন এসেছিলেন প্রধান অতিথি হয়ে। আমাদের রাজনৈতিক নেতারা তাঁদের বড়ত্ব বোঝাতে এখন সর্বত্র যেমনটা করছেন যে তাঁরা একই সাথে প্রধান অতিথিও হচ্ছেন আবার সভাপতিও হচ্ছেন অর্থাৎ তাঁরা প্রধান অতিথির বক্তৃতাও করবেন এবং সেটিই সভার সমাপনী বক্তৃতাও হতে হবে যার মানে হলো সভাপতির বক্তৃতা বলতে কিছু থাকবে না; সভাপতি অন্যসবের মতো বক্তৃতা একখানা দিতে পারেন তবে তিনি সমাপনী টানতে পারবেন না- এমনটাই স্বাভাবিকভাবে জনাব আকবর হোসেনেরও হয়তো খাহেশ ছিল। স্থানীয় নেতারা সেই খাহেশ মোতাবেক অথবা নিজেদের উৎসাহে চাইলেন যে, মন্ত্রী আকবর হোসেন হবেন অনুষ্ঠানের শেষ বক্তা আর সভাপতির ভাষণ হবে অসভাপতির কায়দায় মন্ত্রীর আগে। স্থানীয় নেতাদের এই প্রস্তাব শান্তনু কায়সার সরাসরি নাকচ করে দিলেন। তিনি বললেন, তাহলে তিনি সভাপতিত্ব করবেন না, অন্য কাউকে সভাপতি বানানো হোক। শান্তনু কায়সারের এই দৃঢ়চেতা অবস্থান দেখে শেষ পর্যন্ত আকবর হোসেন মেনে নিয়েছিলেন যে সভাপতিই সভার সমাপনী ভাষণ দিবেন। একজন সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ শান্তনু কায়সার এই বুকের পাটা ধারণ করতেন, অথচ তিনি সম্যক জানতেন যে, একজন মন্ত্রীর গোস্বার শিকার হলে বাংলাদেশে তাঁর মতো একজন কলেজ অধ্যক্ষকে চাকরির বাকি কালটুকুতে কত নাজেহালই না হতে হবে। সেসব জেনেও তিনি তাঁর ব্যক্তিত্বের পরাভব মেনে নেননি। নৈতিকতায় ও ব্যক্তিত্বে এমনই ছিলেন শান্তনু কায়সার।

ব্যক্তিত্বের এই দোষের জন্যই হয়তো তাঁর মৃত্যুর পরে অনেকটা শোকবাণীরূপ মন্তব্যে মঈনুল আহসান সাবের তাঁর ফেসবুকের টাইমলাইনে লিখেছেন- ‘শান্তনু কায়সার ঋদ্ধ ও ঋজু ছিলেন। অধিকাংশ মানুষ ও মিডিয়া এ ধরনের কাউকে পছন্দ করে না।’ এ ধরনের মানুষকে মানুষ ও মিডিয়া পছন্দ করে না বলেই শান্তনু কায়সারকে বাংলা একাডেমী পুরস্কারটি পর্যন্ত পেতে হয়েছে এই বৃদ্ধ বয়সে এসে, মৃত্যুর দুবছর আগে। অবশ্য বাংলা একাডেমী পুরস্কার পেতে শান্তনু কায়সারের এই অভাবনীয় বিলম্বের ঘটনাটি আমাদের জন্য বিশেষভাবে শাপে বর হয়েছিল। আমরা বরিশালে ‘ধানসিড়ি সাহিত্য সৈকত’ নামে একটি সাহিত্য সংগঠন থেকে জীবনানন্দ পুরস্কার নামে একটি সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করে থাকি যা একই সাথে একজনকে গদ্যসাহিত্যে এবং আরেকজন কাব্যসাহিত্যে প্রদান করা হয়। ২০০৭ সাল থেকে দ্বিবার্ষিকভাবে এটি চলছে। এই পুরস্কার প্রদান বিষয়ে আমরা যে-সকল নিয়ম-কানুন অনুসরণ করে থাকি তার মধ্যে একটি হলো বাংলা একাডেমী বা এ রকম কোনও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিক আমাদের এই পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হন না। শান্তনু কায়সার তখন পর্যন্ত বাংলা একাডেমী পুরস্কার লাভ করেছিলেন না বলেই ২০১৩ সালে আমরা তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করে পুরস্কারের জন্য প্রণীত আমাদের শর্টলিস্টটি পুরস্কারের নির্বাচনকারী ভোটারদের কাছে প্রেরণ করতে পেরেছিলাম, এবং বলা বাহুল্য সর্বোচ্চ ভোটে শান্তনু কায়সার সে বছর জীবনানন্দ পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ওই বছর কাব্যসাহিত্যে এই পুরস্কার লাভ করেছিলেন খোন্দকার আশরাফ হোসেন। বরাবরের মতো আমরা পুরস্কার ঘোষণা করেছিলাম জীবনানন্দের জন্মদিন ১৮ ফেব্রুয়ারি এবং পুরস্কার প্রদানের তারিখ ছিল জীবনানন্দের মৃত্যু দিবস ২২ অক্টোবর। আমরা এই দীর্ঘ সময় নিয়ে থাকি পুরস্কারটির সাথে জীবনানন্দের জন্ম ও মৃত্যু উভয় দিনকে আঁকড়ে রাখার জন্য এবং একই সাথে এই দীর্ঘ সময় ধরে পুরস্কারের সাথে সংশ্লিষ্ট আমাদের পত্রিকা ‘ধানসিড়ি’তে পুরস্কারপ্রাপ্তদের উপরে যথাযোগ্য লেখা সংগ্রহের জন্য। এই লেখা সংগ্রহের কার্যক্রমের প্রয়োজনেই এই সময় ধরে পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি বা লেখকের সাথে আমাদের একটি আন্তরিক যোগাযোগ ঘটে এবং তাঁরা না চাইলেও আমরা তাঁদের খুব কাছাকাছি হয়ে যাই, আমাদের আলাপনে এক গভীর অন্তরঙ্গতা চলে আসে। এমন অন্তরঙ্গতার এক ক্ষণেই আমরা সে বছর হারালাম খোন্দকার আশরাফ হোসেনকে। ১৬ জুন ২০১৩ তারিখে তিনি আমাদেরকে চিরকালের জন্য ছেড়ে গেলেন। এই মৃত্যুতে শান্তনু কায়সারও খুব মুষড়ে পড়েছিলেন। একদিন অনেকটা কৃত্রিম মজার ভঙ্গিতে তিনি বলেই ফেললেন- ‘মুহসিন, আপনারা এবার যাদেরকে পুরস্কার দিয়েছেন, আপনাদের অনুষ্ঠানের দিন তাদের কাউকেই পাবেন বলে মনে হচ্ছে না। আশরাফ ভাই তো চলেই গেলেন, আমারও শরীরটা ভালো ঠেকছে না।’ মজার ভঙ্গির মধ্যে এই বাক্যের লুকিয়ে থাকা কষ্টবোধ সে বছর চতুর্দিক অন্ধকার করে নাজিল হয়েছিল না ঠিকই, কিন্তু আজ তিন বছর পরের এই দিনে দাঁড়িয়ে দেখছি সেই অন্ধকারকে আমরা রোধ করতে পারিনি। ২০০৭ সাল থেকে শুরু করা আমাদের এই পুরস্কার যাঁরা পেয়েছেন তাঁদের সকলেই আমাদের মাঝে দিব্যি আছেন, দীর্ঘ জীবনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আছেন, নেই শুধু ২০১৩ সালের দুজন- খোন্দকার আশরাফ হোসেন ও শান্তনু কায়সার।   

অথচ এ বছর কিন্তু শান্তনু স্যারের কণ্ঠে ২০১৩ সালের সেই উদ্বেগ ও বিচলিতবোধ দেখিনি। বরং অনেকদিন পুত্রদের কাছে অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় কাটিয়ে আসা শান্তনু কায়সারকে এ বছর অনেক উজ্জীবিত ও কর্মতৎপর মনে হয়েছে। জানুয়ারির মাঝামাঝি সম্ভবত আমি তাঁকে ফোন করে জানালাম যে মার্চের শুরুতে আমরা আহসান হাবীবের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে একটি সেমিনার আয়োজন করতে চাই এবং সেখানে আমরা তাঁকে পেতে চাই। শান্তনু স্যার সরাসরি রাজি হয়ে গেলেন। বললেন, আহসান হাবীবের সাথে তাঁর অনেক দিনের স্মৃতি রয়েছে এবং সেগুলো কোনও একাডেমিক মজমায় বলতে তাঁর সাধ রয়েছে। আরও জানালেন যে, ২০১৩ সালে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিকের যে ছাত্রছাত্রীদের সাথে তাঁর আলাপ হয়েছিল ওদেরকে তাঁর খুব ভালো লেগেছিল, তাই ওদের সাথে একটি বা দুটি দিন কাটানোর বাসনায়ও তিনি বরিশালে আসতে চান। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকটায় সম্ভবত দিনক্ষণ ও পথ-পরিবহণের পুরো বিষয়টা ঠিক করে নিতে ফোন দিলাম। আমাদের আশা ও ভাবনাকে বেশ দুঃখ-ভারাক্রান্ত করে দিয়ে তিনি জানালেন যে তাঁর প্রোস্টেট গ্লান্ডে একটি সমস্যা ধরা পড়েছে যেটি বিলম্ব না করে অপারেশনের জন্য ডাক্তার পরামর্শ দিয়েছে এবং এ কারণে তিনি আসতে পারছেন না। তবে সাথে সাথে প্রতিশ্রুতি দিলেন যে অপারেশনের পরে সুস্থ হয়ে তিনি বরিশালে আসবেন। অপারেশন সফল হলো। কিন্তু এর মধ্যেই তিনি অসুস্থ হলেন হৃদরোগে। তাঁর আর আসা হলো না বরিশালে।

আমরা তাঁর আসতে না পারার কারণ আমাদের আহসান হাবীব বিষয়ক সেমিনারের দর্শকশ্রোতাদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জানালাম এবং তাঁর জন্য সকলের কাছে দোয়া চাইলাম। সেই দোয়া চাইলাম তাঁর সুস্থতা কামনার জন্য। আর মাত্র এক দেড়মাসের মাথায় সামনের আড্ডায় আমরা আমাদের আড্ডারুদের কাছে দোয়া চাইবো তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায়। তাঁর প্রতিশ্রুত আড্ডায় তাঁকে সেদিন না পেয়ে আমাদের অনুভূত সকল কষ্টের মাঝেও হয়তো আমাদের একটা সান্ত্বনার জায়গা থাকবে আর তা হলো শান্তনু কায়সারের জীবন ও সাহিত্যকর্ম বিষয়ে এ যাবৎকালে সবচেয়ে ঋদ্ধ লেখার ভাণ্ডারটি সম্ভবত আমাদেরই আড্ডার পত্রিকা ‘ধানসিড়ি’র ৫ম সংখ্যা। ২০১৩ সাল পর্যন্ত তাঁর লিখিত অধিকাংশ গ্রন্থের ওপরে সেখানে রয়েছে আলোচনা প্রবন্ধ। এছাড়াও রয়েছে শান্তনু কায়সারের সংক্ষিপ্ত জীবনপরিচিতি এবং রয়েছে সকল গ্রন্থের একত্র-সন্নিবেশিত সংক্ষিপ্ত পরিচিতি। সেখান থেকে শান্তনু কায়সারের ৩২টি গ্রন্থের নামের একটি তালিকা নিম্নে বিন্যাস করে এ নিবন্ধের সমাপ্তি টানছি। 

কাব্যগ্রন্থ

১। রাখালের আত্মচরিত, দ্রাবিড়, ঢাকা, ১৯৮২।

২। শুভ সুবর্ণ জয়ন্তী, শ্রাবণ, ঢাকা ২০০৩।

 

ছোটগল্প

২। শ্রীনাথ পণ্ডিতের প্রাণপাখি, মুক্তধারা, ঢাকা ১৯৮৭।

৩। ফুল হাসে পাখি ডাকে, রেকটো, ঢাকা ২০০১।

৪। অর্ধ শতাব্দী, পাটসূত্র, ঢাকা ২০১০।

 

উপন্যাস

৫। ঐ নূতনের কেতন ওড়ে, প্যাপিরাস, ঢাকা ২০০৬।

৬। ত্রয়ী, পাটসূত্র, ঢাকা ২০০৮।

 

শিশুসাহিত্য

৭। ছোট্ট বন্ধুরা, ঐতিহ্য, ঢাকা ২০০২।

 

নাটক

৮। তিতাস একটি নদীর নাম, (অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস অবলম্বনে), বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, ঢাকা।

৯। তুমি, সন্দেশ, ঢাকা, ২০০৭।     

১০। নাট্টত্রয়ী, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ২০১২।

 

অনুবাদ

১১। বিদ্রোহী নাট্যতত্ত্ব: ত্রয়ী নাট্যকার, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ১৯৮৭।

১২। ফুয়েন্তে অভিজুনা, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ১৯৯৭।

 

সম্পাদনা

১৩। মতিউল ইসলাম স্মারকগ্রন্থ, শিল্পকলা একাডেমী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ১৯৮৫।  

১৪। খান মোহাম্মদ ফারাবী রচনা সমগ্র, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ১৯৯২।

১৫। তিতাস একটি নদীর নাম অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস, বুক ক্লাব, ঢাকা ১৯৯০

১৬। শিক্ষা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্যাপিরাস, ঢাকা।

 

জীবনী ও সাহিত্য

১৭। অদ্বৈত মল্লবর্মণ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ১৯৮৭।

১৮। অদ্বৈত মল্লবর্মণ: জীবন সাহিত্য ও অন্যান্য, নয়া উদ্যোগ, কলকাতা, ১৯৯৮।

১৯। রাজিয়া খাতুন চৌধুরাণী, বাংলা একাডেমী, ১৯৯৯।

২০। নাজমা জেসমিন চৌধুরী, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ২০১১।

২১। আরজ আলী মাতুব্বর, কথাপ্রকাশ, ঢাকা।

 

গবেষণাগ্রন্থ

২২। বঙ্কিমচন্দ্র, রূপম প্রকাশনী, ঢাকা।

২৩। সুকান্ত ভট্টাচার্য, সাহিত্য একাডেমী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ১৯৮৫।

২৪। কাব্যনাটক, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ১৯৮৫।

২৫। তৃতীয় মীর, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ১৯৯৪।

২৬। গভীর গভীরতর অসুখ: গদ্যসত্তার জীবনানন্দ, বাংলা একাডেমী, ১৯৯৭।

২৭। বাংলা কথাসাহিত্য: ভিন্ন মাত্রা, ঐতিহ্য, ঢাকা ২০০১।

২৮। ফুল ও নজরুল, নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা ২০০১।

২৯। স্বর্ণ ও শুভ, জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, ঢাকা ২০০৪।

৩০। সার্ধশতবর্ষে রবীন্দ্রনাথ: না নিন্দা না স্তুতি না দুষণ, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা ২০১৩।

৩১। রবীন্দ্রনাথ: চার অধ্যায়, মূর্ধণ্য, ২০১১।

৩২। নজরুল কেন নজরুল, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা ২০১৩।

লাইভ

টপ