Vision  ad on bangla Tribune

নারীবাদীর পুত্রসন্তান যেভাবে গড়ে তুলবেন

মূল : ক্লেয়ার কেইন মিলার || ভাষান্তর : মাইনুল ইসলাম মানিক১৪:৫৭, জুন ২০, ২০১৭


খুব সম্ভবত আমরা এখন আমাদের মেয়েসন্তানদেরকে বলে থাকি, তারা যা হতে চায় তারা তা-ই হতে পারবে- চাই সেটা একজন নভোচারী হোক কিংবা একজন মা-ই হোক, একজন গেছো মেয়েই হোক কিংবা মেয়েলি স্বভাবের মেয়েই হোক। কিন্তু এই একই কাজটি আমরা আমাদের পুত্রসন্তানদের ক্ষেত্রে করি না।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, আমরা মেয়েসন্তানদেরকে তাদের ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রগুলো বাছাইয়ে যতোটা সুযোগ দিয়ে আসছি, পুত্রসন্তানদের ক্ষেত্র ততোটাই সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। মেয়েদের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত বিষয়গুলোতে তাদের আগ্রহে অনুৎসাহিত করা হয়। তাদেরকে যে কোনো মূল্যে কঠোর হতে বলা হয়, নইলে তাদের তথাকথিত বালকসুলভ শক্তিকে অবদমিত করতে বলা হয়।

আমরা যদি সমতাভিত্তিক সমাজ গড়তে চাই, এমন একটি সমাজ যেখানে সবাই সাফল্য পেতে পারে, সেক্ষেত্রে ছেলেদেরকে অবশ্যই অধিক ক্ষেত্র বাছাইয়ের সুযোগ দিতে হবে। গ্লোরিয়া স্টেইনেম যেমনটা বলেন, ‘আমি আনন্দিত যে, আমরা আমাদের মেয়েদেরকে পুত্রসন্তানদের মতো অধিকতর বাড়িয়ে তুলতে শুরু করেছি এটি কখনোই ফলপ্রসূ হবে না যে পর্যন্ত আমরা আমাদের পুত্রসন্তানদেরকে তাদের মতো করে বাড়িয়ে না তুলি।'

এটি এই কারণে যে, নারীর ভূমিকায়ণ সম্প্রসারিত হতে পারে না, যদি পুরুষের ভূমিকায়ণ সম্প্রসারিত না হয়। পুরুষেরা শিক্ষালয়ে ও কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে কারণ আমরা পুত্রসন্তানদেরকে নতুনতম গোলাপী সংস্কৃতিতে সাফল্যের পথে বাড়িয়ে তুলছি না। সহযোগিতা, সহমর্মিতা, অধ্যবসায়ের মতো দক্ষতাগুলোকে সবসময় মেয়েলী হিসেবে বিবেচনা করা হয়- সেগুলো আধুনিক-যুগীয় কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাক্ষেত্রে ক্রমাগত মূল্যায়িত হচ্ছে এবং যে সকল চাকুরির ক্ষেত্রে এই গুণগুলি প্রয়োজন সেগুলোও দ্রুতবর্ধনশীল।

নাইজেরিয়ান লেখক চিমামান্দা নগুগি তার নতুন বইয়ে নারীবাদী কণ্যাসন্তান গড়ে তোলার নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু আমরা নারীবাদী পুত্রসন্তান কিভাবে গড়ে তুলতে পারি?

আমি স্নায়ুবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, মনোবিদ অন্যান্যদের কাছে সাম্প্রতিক গবেষণা ও আমাদের কাছে থাকা লিঙ্গ সম্পর্কিত তথ্যের উপর ভিত্তি করে এই প্রশ্নটির উত্তর জানতে চেয়েছিলাম। আমি সাদামাটাভাবে নারীবাদ ব্যাখ্যা করেছিলাম, যেমনটা নারী-পুরুষেরর পরিপূর্ণ সমান অধিকারে বিশ্বাসী কেউ করে থাকেন। তাদের উপদেশগুলো ঐ সকল ব্যক্তিদের উপর ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হয় যারা তাদের সদয়, আত্মবিশ্বাসী এবং স্বপ্ন পূরণে উদ্যমী সন্তানদেরকে বাড়িয়ে তোলেন।

তাকে কাঁদতে দিন

গবেষণায় দেখা যায়, পুত্রসন্তান ও কণ্যাসন্তানরা যখন নবজাতক বা ছোট শিশু থাকে, তারা প্রায় সমপরিমাণ কান্না করে থাকে। একটি শিক্ষা ও প্রচারণা বিষয়ক সংগঠণ  ‘অ্যা কল টু মাইন্ড’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা টনি পোর্টার বলেন, পাঁচ বছরের কাছাকাছি বয়সেই তারা এই বার্তা পেয়ে যায় যে, ক্রোধ গ্রহণযোগ্য কিন্তু তারা অন্যান্য অনুভূতি প্রদর্শনপ্রবণ নয়।

তিনি বলেন, ‘আমাদের মেয়েদেরকে মানুষ হিসেবে অনুমোদন করা হয়েছে, আর আমাদের ছেলেদেরকে রোবটিক হতে শেখানো হচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘তাকে শেখান, তার পূর্ণমাত্রায় আবেগ আছে; তাকে থামতে ও বলতে, ‘আমি’ক্রোধান্বিত নই; আমি শঙ্কিত অথবা আমার অনুভূতিগুলো বেদনাহত, আমার সাহায্য প্রয়োজন।’

তাকে রোল মডেল দিন

গবেষণায় দেখা যায়, ছেলেরা বিশেষ করে রোল মডেলদের সাথে সময় কাটানোর ক্ষেত্রে মেয়েদের চেয়েও বেশি সংবেদনশীল। ক্রমবর্ধমান নজির রয়েছে যে, যেসব ছেলেরা দায়িত্বশীল পিতাহীন পরিবারে বেড়ে ওঠে, তারা চায় একাডেমিকই হোক কিংবা উপার্জনগত দিকই হোক আচরণের দিক থেকে নিকৃষ্টতর হয়। অর্থনীতিবিদ ডেভিড অটার ও ম্যালানি ওয়েজারম্যানের মতে এর একটি কারণ হচ্ছে, তারা কোনো পুরুষকে কখনো অন্যের জীবনের দায়িত্ব নিতে দেখেনি। মি. পোর্টার বলেন, ‘দায়িত্বশীল ভালো মানুষকে আপনার ছেলের সংস্পর্শে রাখুন।’

তাদেরকে শক্তিমান নারী রোল মডেলের সংস্পর্শও দিন। আপনার জানা নারীদের কৃতিত্ব সম্পর্কে, খেলাধুলা, রাজনীতি ও গণমাধ্যমের পরিচিত নারীদের সম্পর্কে তাকে ধারণা দিন। আরবান প্রেপ অ্যাকাডেমিজ ফর লো-ইনকাম, আফ্রিকান-আমেরিকান বয়েজ-এর প্রতিষ্ঠাতা টিম কিং বলেন, একক মাতৃত্বের পরিবারের সন্তানেরা তাদের সঙ্গীদের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল হয়ে থাকে। এধরনের ছেলেরা অন্যদেরকেও উৎসাহিত করে যাতে তারাও অন্য নারীগণকে একই উপায়ে দেখে।

তাকে নিজের মতো হতে দিন

এমনকি পূর্ণবয়স্কদের ক্ষেত্রেও লৈঙ্গিক ভূমিকায়ণ একীভূত হয়ে গেছে, কিন্তু শিশুদের পণ্যের ক্ষেত্রে লৈঙ্গিক কারণে অনেক ভিন্নতা এসেছে গত পঞ্চাশ বছরের তুলনায়, গবেষণায় দেখা গেছে: বড় থেকে খুটিনাটি পণ্য পর্যন্ত, করিডোরের খেলনা হতে বাসনকোসন ও প্রসাধনী সামগ্রীতেও এসেছে ভিন্নতা। এটা মোটেও আশ্চর্য ব্যাপার নয় যে, এই পৃথকীকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই শিশুদের আগ্রহ উবে যায়।

কিন্তু স্নায়ুবিজ্ঞানীরা বলেন, শিশুরা এরকম পক্ষপাতপূর্ণ আসক্তি নিয়ে জন্মায় না। এমনকি পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত গোলাপী ছিলো ছেলেদের রঙ এবং নীল ছিলো মেয়েদের রঙ। গবেষণায় শিশুদের জোরালো খেলনাপ্রীতি দেখানো হয়নি। অর্থাৎ গবেষণা অনুযায়ী, শিশুদের খেলনার প্রতি আকর্ষণ খুব জোরালো নয়। গবেষকদের মতে, এই পার্থক্য মূলত শিশুরা যে সময়ে তাদের লৈঙ্গিক পরিচয় সম্পর্কে সচেতন হয় তখন থেকেই উদ্ভুত হয়। এটি সচরাচর দুই থেকে তিন বছর বয়সের মধ্যেই হয়ে থাকে যে সময়ে সামাজিক প্রত্যাশাবোধ তার সহজাত আকাঙ্খাকে অবদমিত করে। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ক্যাম্পবেল লিপারের মতে, দীর্ঘকালীন গবেষণায় দেখা যায় অ্যাকাডেমিক, স্থানিক দক্ষতা ও সামাজিক দক্ষতায় লৈঙ্গিক দুরত্বের উপর খেলনার পৃথকীকরণ বা ভিন্নতার সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে।

শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশের ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব আগ্রহকে অনুসরণ করা উচিৎ সেটা প্রথাগত হোক বা না হোক। সুতরাং, তাদের নিজেদের আগ্রহের দিকে ঝুঁকতে দিন। এই ধারণা দ্বারা এটিই মেনে নিতে বলা হচ্ছে না যে, শিশুরা একই রকম কাজ করতে চায়, বরং এটি নিশ্চিত করার জন্য যে, তারা সংকীর্ণ নয়।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, হাঁড়িকাঠ বা মাটির খেলনা দিয়ে খেলার মতো উন্মুক্ত কার্যকলাপের সুযোগ দিন এবং ছেলেদেরকে পোশাকের সাজ-সজ্জা অথবা চিত্রাঙ্কণ ক্লাসের প্রতি উৎসাহিত করুন এমনকি তারা যদি এসব ব্যাপারগুলো খুঁজে না বের করে তবুও। নির্দ্বিধায় এসব করতে বলুন। (এটি খুবই খারাপ বিষয় যে, খেলনার বাক্সগুলোতে সব মেয়েপুতুল থাকে কারণ আমি জানি ছেলেরাও পুতুলের বাড়ি খেলতে পছন্দ করে।) এটা নারীর মর্যাদাও বৃদ্ধি করতে পারে। গবেষকরা এর কারণ হিসেবে বলেন, বাবা-মায়েরা মেয়েদেরকে ফুটবল খেলতে বা ডাক্তার হতে উৎসাহিত করলেও ছেলেদেরকে ব্যালে নৃত্য বা নার্স হতে নিরুৎসাহিত করে কারণ নারীদের কর্মসমূহ তাদের কাছে কম মর্যাদাসম্পন্ন।

নিজের প্রতি যত্ন নিতে শেখান

কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের শিক্ষাদান বিষয়ক প্রতিষ্ঠানের লেকচারার ও লেখক যাওয়ানজা কুনযুফু বলেন, ‘কিছু মা মেয়েদেরকে লালনপালন করেন, কিন্তু ভালোবাসেন ছেলেদের। তিনি আরো বলেন, তারা মেয়েদেরকে পড়াশোনা করান, গৃহস্থালির কাজ করান আর চার্চে পাঠান, কিন্তু ছেলেদের ক্ষেত্রে সেটি করেন না।’

মিশিগান ইউনিভার্সিটির গবেষণায় প্রাপ্ত উপাত্তে এই পার্থক্য দেখা গেছে : আমেরিকান ১০ থেকে ১৭ বছরের মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় সপ্তাহে দুই ঘণ্টা বেশি গৃহস্থালির কাজ করে এবং সম্ভবত ১৫ ভাগ ছেলেরাই এই গৃহস্থালি কাজের পারিশ্রমিক পেয়ে থাকে।

নিউ আমেরিকা'র প্রধান নির্বাহী ও বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী অ্যান মেরি স্লটার বলেন, ‘আপনার ছেলেকে রান্না, পরিচ্ছন্নতা ও দেখাশোনা করা শেখান- মেয়েদেরকে যেমন অফিসে যোগ্য হিসেবে দেখতে চান, তেমনভাবে পুত্রসন্তানকেও ঘরের কাজে প্রতিযোগিতার জন্যে যোগ্য করে তুলুন।’

অন্যদের প্রতি যত্মশীল হতে শেখান

গবেষণায় দেখা যায়, এখনো শিশু ও বৃদ্ধদের পরিচর্যার কাজগুলো ও গৃহস্থালির কাজগুলো নারীরাই বেশি করে থাকেন এমনকি যখন বাবা-মা উভয়ই ফুলটাইম বাইরে কাজ করে থাকেন তখনও এটা হয়ে থাকে। অথচ পরিচর্যাবিষয়ক চাকুরির পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। সুতরাং ছেলেকে অন্যদের প্রতি যত্নশীল হতে শেখান।

মিসেস স্লটার বলেন, আপনার ছেলেকে পুরুষদের কর্মস্থল ও ঘরের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার উপায় সম্পর্কে বলুন আরও বলুন, শুধুমাত্র কণ্যাসন্তানই নয়, পুত্রসন্তানদের কাছ থেকেও বাবা-মা ও পরিজনদের বৃদ্ধাবস্থায় কী ধরণের পরিচর্যা প্রত্যাশা করা হয়। অসুস্থ বন্ধুর জন্য স্যুপ বানানো অথবা অসুস্থ আত্মীয়কে হাসপাতালে দেখতে যাওয়ার ক্ষেত্রে ছেলেদেন সাহায্যকে অনুপ্রাণিত করুণ। পোষা প্রাণী এবং বড় ভাইবোনদের ব্যাপারে তাকে যত্নশীল হবার দায়িত্ব দিন। তাদেরকে শিশুর আসনে, কোচে অথবা টিউটরের দিকে উৎসাহিত করুন। একটি কর্মসূচী শিশুকে প্রাথমিক শ্রেণীকক্ষে নিয়ে আসে যাতে দেখা গেছে, শিশুদের মধ্যে সহমর্মিতা বৃদ্ধি পায় এবং সহিংসতা কমে।

কাজ ভাগাভাগি করে নিন

যখনই সম্ভব হয়, গৃহস্থালির কাজ বা শিশুর পরিচর্যার ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের মধ্যে বিরাজমান লৈঙ্গিক আচরণগুলো বন্ধ করতে হবে। ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসেচুয়েসটস-এর সমাজবাদী ড্যান ক্লসন বলেন, কথার চেয়ে কাজের প্রভাব বেশি। তিনি আরো বলেন, ‘যদি মা খাবার রান্না করেন, ঘরদোর পরিষ্কার করেন, আর বাবা ঘর হতে বেরিয়ে যান, তৃণভূমি সাফ করেন; তাতেই শিক্ষার কাজটা সম্পন্ন হয়ে যায়।’

উপার্জনের কিছু অংশ তার সাথে ভাগাভাগি করে নিন। এক গবেষণায় দেখা যায়, যে সকল পুরুষেরা তাদের কৈশোরকালীন সময়ে মাকে কমপক্ষে একবছর কাজ করতে দেখেছে, তারা সম্ভবত কর্মজীবী নারীদেরকে বিয়ে করার ব্যাপারে খুব বেশি আগ্রহী। আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, যে সকল নারীরা ছেলেদের বয়স ১৪ হওয়ার আগ পর্যন্ত যে কোনো পরিমাণ সময় বাইরে কাজ করেন, তাদের সন্তানেরা পূর্ণবয়সে ঘরের কাজ ও শিশুর পরিচর্যায় অধিক সময় ব্যয় করে। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক ক্যাথলিন ম্যাকগেইন বলেন, ‘যে সকল পুরুষ কর্মজীবী মায়ের কাছে বেড়ে উঠেছেন, তারা লৈঙ্গিক আচরণের ক্ষেত্রে  উল্লেখযোগ্যভাবে সমমাত্রিক।’

মেয়েদের সাথে বন্ধুত্বে উৎসাহিত করুন

অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলপূর্ব বয়স সমাপ্ত হতে না হতেই শিশুরা লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার হতে শুরু করে, আর এতে লৈঙ্গিক অসমতা আরো প্রকট হয়ে ওঠে। যে সকল শিশুদেরকে বিপরীত লিঙ্গের শিশুদের সাথে খেলাধুলায় উৎসাহী করা হয়, তারা ভালোভাবে সমস্যা সমাধান ও যোগাযোগ স্থাপন করতে শেখে।

লিঙ্গ ও শিক্ষা নিয়ে নিয়ে কাজ করা ইউনিভার্সিটিজ সানফোর্ড স্কুলের পরিচালক রিচার্ড ফ্যাবস বলেন, ‘দল বা কার্যক্ষেত্রে বিভাজনের ক্ষেত্রে যতবেশি লৈঙ্গিক ব্যবহার সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে, খুব সসম্ভবতই ততবেশি লৈঙ্গিক প্রভেদ ও পক্ষপাতমূলক প্রবণতা জোরদার হবে।’

ইউনিভার্সিটি অব ক্যান্টাকি’র উন্নয়নমূলক মনস্তাত্ত্বিক খ্রিস্টিয়া ব্রাউন বলেন, শিশুদের জন্য এমনভাবে জন্মদিনের পার্টি, খেলাধুলার আয়োজন করুন যাতে এটা তার কাছে বিশ্বাসযোগ্য না হয়, লিঙ্গবৈষম্যের কারণে কোনো একটি দল অগ্রাহ্য হতে পারে। ভাষার ব্যবহারে প্রভেদ তৈরীতে বিরত থাকুন। এক গবেষণায় দেখা গেছে, যখন প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষকরা ‘শিশুরা’না বলে ‘বালক-বালিকারা’বলে থাকেন, শিক্ষার্থীরা নারী-পুরুষের ভূমিকায়ণ বিষয়ে আরো বেশি বিভেদমূলক বিশ্বাস ধারণ করে এবং একত্রে খেলাধুলায় খুবই কম সময় ব্যয় করে।

মি. পোর্টার বলেন, মেয়েদের সাথে যে সকল ছেলেদের বন্ধুত্ব থাকে, তারা নারীদেরকে যৌনতার উপকরণ হিসেবে খুব কমই ভেবে থাকে।

‘না’ কে ‘না’ বলতে শেখান

শ্রদ্ধা ও সহমত শেখানোর অন্য উপায় : প্রাক-প্রাথমিকের শুরুতেই শিশুকে একে অপরের শরীরে স্পর্শের পূর্বে অনুমতি নিতে শেখান। তাদেরকে ‘না’শব্দটির শক্তি কতটুকু, সেটি শেখান এবং তারা যখন এটা বলে থাকে, তাদেরকে উত্যক্ত করা বা শক্তির প্রয়োগ বন্ধ করতে শেখান।

ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার ন্যাশনাল ম্যারেজ প্রজেক্টের পরিচালক ও সমাজবিদ ডব্লিউ ব্রাডফোর্ড বলেন, সবচাইতে আদর্শিক হচ্ছে, ঘরে সমস্যার সমাধান করা। শিশুদের অপব্যবহার খুঁজে বের করার দৃষ্টিভঙ্গির সাথে ভবিষ্যতের রোমাঞ্চকর সম্পর্কের ক্ষেত্রে দ্বান্ধিক বিভাজনের যোগসূত্র স্থাপন করে।

অন্যরা অসহিষ্ণু হলে প্রতিবাদ করুন

মিস ব্রাউন বলেন, যখন উত্যক্ত বা হয়রানি করতে দেখেন, প্রতিবাদ করুন এবং বালকদেকে ভূমিকা রাখতে দিন যাতে তারাও এধরণের কর্মকাণ্ড দেখামাত্রই হস্তক্ষেপ করতে পারে।

তিনি আরো বলেন, তারা অসঙ্গত হলেও উচ্চকিত হোন। খারাপ আচরণের ক্ষেত্রেও ‘ছেলেরা ছেলেদের পক্ষেই থাকবে’ এমনটা যেন না হয়। তাদের কাছে আরো বেশি ভালো কিছু প্রত্যাশা করুন। মি. কিং বলেন, ‘অবমাননাকর, অসহিষ্ণু, অশ্রদ্ধাপূর্ণ ও আক্রামণাত্মক আচরণের ক্ষেত্রে পূনঃনির্দেশনার ক্ষেত্রে সতর্ক হোন।’

অবমাননাকর শব্দ হিসেবে ‘মেয়ে’ শব্দটি ব্যবহার করবেন না

নিজে কখনো বলবেন না, আপনার পুত্রকেও কখনো বলতে দেবেন না, কেউ মেয়েদের মতো দৌড়ায়, মেয়েদের মতো কিছু ছোড়ে। কখনো মেয়েদেরকে ‘মনিমুখো লোক’অথবা এই জাতীয় সমার্থক শব্দ ব্যবহার করবেন না। এই জাতীয় কৌতুকও করবেন না।

নোংরা ভাষার ক্ষেত্রেও সতর্ক হোন। ব্যাটস কলেজের সমাজবাদি গবেষক এমিলি কান-এর গবেষণায় দেখা যায়, বাবা-মায়েরা সামাজিক অবজ্ঞার ভয়ে সন্তানদেরকে প্রথাগত লৈঙ্গিক ভূমিকায়ণ শিক্ষা দিয়ে থাকে। তিনি বলেন, ‘লৈঙ্গিক ভিত্তিতে একটা শিশু কি উপভোগ করবে, কোনটা তার জন্য ভালো হবে এই ধরণের দৈনন্দিন ছোটখাটো স্বতঃসিদ্ধতা পরিহার করতে হবে, আমরা এই ধরণের বিচারবিবেচনা পরিহারের মধ্য দিয়ে তাদের সহায়ক হতে পারি।’ রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন ইউনিভার্সিটির স্নায়ুবিজ্ঞানী লিসে এলিয়ট বলেন, উত্যক্ত হওয়া ছেলেরা বলে থাকে, ‘না, আমার সাথে কেউ গুটিচাল দিতে পারে না।’ অথবা ‘আমি মেয়ে নই, কিন্তু আপনি কি মনে করেন, কারা ছেলেদের চেয়েও খারাপ?’

মেয়ে ও নারী সংক্রান্ত প্রসঙ্গ নিয়ে প্রচুর পড়ুন

আপনি হয়তো শুনে থাকবেন, ছেলেরা বিজ্ঞানে ও গণিতে সেরা আর মেয়েরা ভাষা ও সাধারণ পঠনে সেরা। ছকবাঁধা অগ্রগতির প্রবণতা আত্মতৃপ্তিতে পরিণত হতে পারে। মি. লিপারের এক মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা যায়, মায়েরা ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সাথে বেশি পরিমাণ কথা বলে থাকেন। ছেলেদের কাছে কথনের মাধ্যমে, তাদেরকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে এই প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়াই করুন।

বিচিত্র রকমের মানুষ সম্পর্কে পড়ুন, সেসব গল্প পড়ুন যেগুলো এই ভিত্তিমূল নাড়িয়ে দেয় যে, ছেলেরা শুধু পৃথিবীকে রক্ষা করবে আর মেয়েরা ছেলেদের সাহায্য নিয়ে নিরাপদ থাকবে। যখনই একটি বই বা একটি সংবাদ এই ভিত্তিমূলকে প্রতিষ্ঠা করে, এটা সম্পর্কে উচ্চকিত হোন: ‘রেনস্টেইন বিয়ার্স’-এর মা চরিত্রটি কেন সবসময় একটি হাউসকোট পরিহিত অবস্থায় থাকে আর কেনইবা তিনি কদাচিৎ ঘর হতে বের হন? কেন একটি নতুন ছবিতে সব শেতাঙ্গদের দেখানো হয়?

মিস ব্রাউন বলেন, ‘এটি তৃতীয় পর্যায়ে শুরু হওয়া উচিৎ, যখন তারা প্রবণতাগুলো তুলে আনে, এবং সেগুলোর প্রতি দৃষ্টি দেয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘আপনি যদি তাদেরকে কাদের এই প্রবণতাগুলোকে লেবেল লাগিয়ে না দেন, তবে তারা মেনে নেয় যে, এটি এরকমই হবার কথা ছিলো।’

বাল্যকাল উদযাপন করুন

মিস এলিয়ট বলেন, একজন ছেলেসন্তানকে এভাবে বাড়িয়ে উঠানো মানেই শুধুমাত্র এই নয় যে, কোনটি তার করণীয় নয় সে সম্পর্কে তাকে বলা কিংবা সম্পূর্ণরূপে লৈঙ্গিক বিভেদ কমিয়ে আনা সম্পর্কে বলা।

অতএব, হাতে হাত রাখুন, কৌতুক করুন, খেলাধুলা উপভোগ করুন, গাছে উঠুন, ক্যাম্প ফায়ার তৈরী করুন। ছেলেদেরকে শক্তিমত্তা প্রদর্শন করতে বলুন- এমন শক্তিমত্তা যা তার আবেগ সংবরণ করতে সাহায্য করে। উপার্জনের মাধ্যমে পরিবারকে কিছু উপহার দিতে শেখান। তাদেরকে কঠোর হতে শেখান- শেখান কিভাবে অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে কঠোরভাবে দাঁড়াতে হয়। তাদেরকে আত্মবিশ্বাস দিন- অনুধাবন করতে দিন তারা যেসব বিষয়ে আবেগতাড়িত।

নিউ ইয়র্ক টাইমস


আরো পড়ুন-

বৃক্ষধর্মের ঋষি, ভালোপাহাড়ে

 

samsung ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ