একাত্তরের ঈদ

Send
বাশার খান
প্রকাশিত : ১৫:৪২, জুন ২০, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:১২, জুন ২০, ২০১৭


১৯৭১ সাল। মুক্তিযুদ্ধ চলছে। বর্ষপঞ্জির স্বাভাবিক নিয়মে সেবছরও বাঙালি মুসলমানের জীবনে এসেছিল পবিত্র রমজান মাস। মুসলিম বিশ্বে মাসটি যথারীতি পালিত হচ্ছিল ইবাদত-বন্দেগির মাস হিসেবে। কিন্তু বাঙালি মুসলমানরা মাসটি পার করেছে ভয়-উৎকণ্ঠা আর বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। যথারীতি দীর্ঘ একমাস রোজা শেষে ১৯ নভেম্বর সন্ধ্যায় ঈদের চাঁদ (শাওয়ালের চাঁদ) উঠেছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পশ্চিমাকাশে। পরদিন ২০ নভেম্বর, শনিবার পবিত্র ঈদুল ফিতর; এমন বিবর্ণ, নিরানন্দ-বেদনা বিধুর ঈদ বাঙালি জীবনে আর কখনোই আসেনি। পাকিস্তানি হানাদারদের হত্যাযজ্ঞ, নীপিড়ন-নির্যাতনে বিপর্যস্থ পুরো বাংলা। রণাঙ্গন, শরণার্থী শিবির ও দেশের ভেতরে থেকে যাওয়া মানুষেরা ছিল আতঙ্ক এবং জীবনের চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে। বীর বাঙালি মাতৃভূমিকে দখলদার বাহিনির কবল থেকে মুক্ত করতে লড়াই লিপ্ত।

পবিত্র ঈদের দিনেও পাকিস্তানি হানারদাররা এই বাংলায় হত্যা, বাড়িঘরে লুণ্ঠন ও আগুন দেয়। অনেক জায়গায় মা-বোনেরা পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়। যে দেশের জন্মই পবিত্র ইসলাম ধর্মের ভিত্তিতে, সেই দেশেরই কেন্দ্রীয় সরকার বাহিনি স্বাধীনতাকামী নিরীহ মানুষদের উপর বর্বরতা চালায় পবিত্র ঈদের দিনেও। মুসলমান সম্প্রদায়ের পবিত্র দিনে এমন নিন্দিত ঘটনার নজির মুসলিম বিশ্বে আর কোথাও নেই।

পাকিস্তানি হানাদারদের দখলে থাকা বাংলার আকাশে ঈদের চাঁদ মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী বাঙালির মুখে হাসি ফুটায়নি সেবছর। স্বাধীন দেশের মুক্ত আকাশে হাসবে ঈদের চাঁদ, ঈদুল ফতেহ (বিজয়ের ঈদ)- সেই ঈদে সত্যিকারের আনন্দ উপভোগের প্রত্যাশায় ছিল স্বাধীনতাকামী বাঙালিরা।

ঢাকায় ঈদ :

পাকিস্তানিদের সবচেয়ে শক্ত ঘাঁটিই ছিল ঢাকা শহরে। একাত্তরে অবরুদ্ধ ঢাকাবাসীর ঈদে আনন্দ তো ছিলই না, পুরোদিনটিই ছিল বিষাদের ছায়ায় ঢাকা। বিশিষ্টজনের স্মৃতিকথায় স্পষ্টই উঠে এসেছে একাত্তরের অবরুদ্ধ ঢাকা নগরীর নিরানন্দ ঈদের কথা।

২০ নভেম্বর কলকাতায় অস্থায়ী সরকারের ঈদের জামাত। সামনে সারিতে ঈদের নামাজরত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানী এবং অন্যান্য।বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম নারী ডেপুটি গভর্নর (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) নাজনীন সুলতানা নিনা যুদ্ধকালীন ৯ মাস ছিলেন ঢাকায়। অগ্নিঝরা মার্চের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের সশস্ত্র মহড়ার যে ছবি বিভিন্ন আর্কাইভ ও জাদুঘরে দেখা যায়, তাঁদের মধ্যে নেতৃত্বস্থানীয় ছিলেন তিনি। ঢাকায় একাত্তরের নিরানন্দ ঈদের বর্ণনা পাওয়া যায় নাজনীন সুলতানার লেখা একাত্তরের ডায়েরিতে। তিনি লিখেন-
‘১৬ নভেম্বর। আর তিন দিন আছে ঈদের। এবার ঈদে কারো মুখে আনন্দ নেই। কাপড় (নতুন) কেউ নিইনি।  তবে ছোটো আপা নাজনুদের ও আমাদের সবার জন্য খদ্দরের কাপড় কিনে দিয়েছেন। পারুল দুই দিন হলো এসেছে। পারুল আর তিথির জন্য জামা বানিয়ে দিয়েছি। আজ দিপুর জামা সেলাই করলাম।  ... শেষ রাতে সেহরি খেতে উঠেছিলাম। আব্বা আবার সেদিনই কেন যেন রেডিও চালিয়েছিলেন।  একটি বিশেষ ঘোষণা ভোর সাড়ে ৪টায় প্রচার করা হবে বলল।  ছোট দুলাভাই বলছিলেন, বোধহয় শেখ মুজিবকে ছেড়ে দিবে। কিন্তু পাঁচটার সময় ঘোষণা করা হল- যে ঢাকা শহরে কারফিউ (সান্ধ্য আইন) জারি করা হয়েছে। প্রত্যেক এলাকা অনুসন্ধান করা হবে।’ [১]
একাত্তরে শহিদ জননী জাহানারা ইমামের ঈদ ছিল নিষ্প্রাণ। ঈদের দিনের আনন্দের সকালটি ছিল বেদনার- যা তাঁর স্মৃতিকথায় অনেকটাই স্পষ্ট। তিনি লিখেন-

‘২০ নভেম্বর, শনিবার ১৯৭১। আজ ঈদ। ঈদের কোনো আয়োজন নেই আমাদের বাসায়। কারো জামা-কাপড় কেনা হয়নি। দরজা-জানালা পর্দা কাঁচা হয়নি। ঘরের ঝুল ঝাড়– হয়নি। বসার ঘরের টেবিলে রাখা হয়নি আতরদান। শরীফ, জামী ঈদের নামাজও পড়তে যায়নি।’ [২]

অবশ্য ঈদের দিনে রান্নাবান্না করেছিলেন শহিদ জননী। সে রান্নাও ছিল মুক্তিযুদ্ধের অংশ। কিন্তু কিভাবে? তাঁর কথাতেই জানা যাক। তিনি লিখেন-

... আমি ভোরে উঠে ঈদের সেমাই, জর্দা রেঁধেছি। যদি রুমীর সহযোদ্ধা কেউ আজ আসে এ বাড়িতে? বাবা-মা-ভাই-বোন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন কোন গেরিলা যদি রাতের অন্ধকারে আসে এ বাড়িতে? তাদেরকে খাওয়ানোর জন্য আমি রেঁধেছি পোলাও, কোর্মা, কোপ্তা, কাবাব। তারা কেউ এলে আমি চুপিচুপি নিজের হাতে বেড়ে খাওয়াবো। তাদের জামায় লাগিয়ে দেবার জন্য একশিশি আতরও আমি কিনে লুকিয়ে রেখেছি। [৩]

যেকোনো উৎসবে পুরান ঢাকার আয়োজন তো দেশ সেরা। কিন্তু একাত্তরের ২০ নভেম্বরের ঈদে পুরান ঢাকায় উৎসব-আনন্দের রেশ মাত্র ছিল না। দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত আমিরুল ইসলামের স্মৃতিকথায় তার বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি লিখেন-

‘পুরোনো ঢাকায় ঈদের দিন খুব জাঁকজমক হয়। কিন্তু একাত্তরের ঈদে তার ছিঁটেফোঁটা চিহ্নও ছিল না। ছেলেপুলেরা রং-বেরঙের জামাকাপড় পরে ঘুরে বেড়িয়েছে ঠিকই কিন্তু কোথাও আনন্দ ছিল না।

যুদ্ধ কবে শেষ হবে, কবে আবার স্বাভাবিক হবে সবকিছু সবার মনে এই একই চিন্তা। আমার আব্বা ছিলেন ঘোরতর যুদ্ধবিরোধী মানুষ। তিনি ঘরে বসে হঠাৎ হঠাৎ আপন মনে চিৎকার করে উঠতেন। ... সেবার ঈদের দিনেও আব্বা সকালের দিকে চিৎকার শুরু করলেন একা একা। কেন যুদ্ধ চলছে? এই যুদ্ধের শেষ কোথায়? কতদিন এই যুদ্ধ চলবে? আব্বা নিজে নিজেই প্রশ্ন করছেন। নিজেই উত্তর দিচ্ছেন। আর যুদ্ধের কারণে তার যে ব্যক্তিগত ক্ষতি হচ্ছে, অর্থনৈতিক বিপর্যয় হচ্ছে- সেই বিষয়টাই তিনি হাহাকার করে চিৎকার করছেন। একাত্তরের বিবর্ণ, বিষণ্ন ঈদের স্মৃতি বলতে নামাজ পড়া, পোলাও খাওয়া আর বড়দের পায়ে ধরে সালাম করা- এসব কিছুটা মনে আছে।’ [৪]

আমিরুল ইসলামের বাবা কেন মুক্তিযুদ্ধকে শুধু যুদ্ধ হিসেবেই দেখলেন সে ব্যাখ্যা দেননি তিনি। এটা শুধু যুদ্ধই ছিল না, বাঙালির দীর্ঘদিনের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের অনিবার্য গন্তব্যও ছিল এই যুদ্ধ। আর নভেম্বর মাসে এসে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই বাঙালিদের হাতে চলে এসেছিল। একাত্তরে রমজান ও ঈদে বিজয়ের আকাঙ্ক্ষায় আত্মবিশ্বাসী ছিল পুরো মুক্তিফৌজ।

ঈদের নামাজের পর বঙ্গবন্ধু পুত্র শেখ কামালের সঙ্গে কোলাকুলি করছেন তাজউদ্দীন আহমেদকমিউনিস্ট নেতা আব্দুল গফুরের মেয়ে ও পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক উপ-প্রধান জেবুননেছা জুবি একাত্তরের রোজার ঈদের দিন ছিলেন অবরুদ্ধ ঢাকায়। কখনো সোবহানবাগের বাসায় আবার কখনো বেইলী রোডের আত্মীয়ের বাসায় আতঙ্কিত জীবন-যাপন করেছিলেন তারা। বেশ কয়েকবছর আগে তিনি ‘গৌরবের একাত্তর এবং’নামে স্মৃতিকথা লিখেছেন। সেখানে ২০ নভেম্বরের ঈদের দিনের স্মৃতিচারণে লিখেন-
৩ অগ্রহায়ণ (২০ নভেম্বর)। পবিত্র রমজান শেষে আজ ঈদ। তখনো বিছানা ছেড়ে উঠিনি। অন্ধকার তখনো পরিস্কার হয়নি। এমনই সময় প্রচণ্ড কামানের শব্দ শোনা গেল।  প্রথমে ভাবলাম, আজ ঈদ তাই হয়তো সংকেত দিচ্ছে। দ্রুতই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখলাম, কোথাও লোকজনের কোনো সাড়া নেই। প্রতিবারের মত এবারের ঈদ স্বাভাবিকভাবে আসেনি। তাই মনে হচ্ছে না আজ ঈদ। চারদিকে যেন করুণ সুর বাজছে। আজ কত সন্তানহারা মা চোকের জল ফেলছে নীরবে। মাতৃহারা বোন কাঁদছে। স্বামী-পুত্র-কন্যাহারা নারীর করুণ আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভরে উঠছে। এমন দিনে কী ঈদ করা যায় ? তাই পণ করেছি ঈদ করবো না। সেদিন আমরা স্বাধীনতা পাবো সেদিন ঈদ করবো। [৫কিন্তু সত্যি কি সব মানুষ ঈদ করা থেকে বিরত ছিলো? না ছিলো না। হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার এবারে যেন বেশি আনন্দ করছে। ঈদের নতুন শাড়ি আর গহনা পড়ে বের হয়েছে বেড়াতে। ওরা কি বাঙালি! ওদের কি মনুষত্ব আছে!
জেবুননেছা ২০ নভেম্বরের ঈদে ঢাকার বেশ কিছু লোক ‘আনন্দ-ফুতির্র করেছে’ উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি তারা কারা? সেই প্রশ্নও তুলেছেন। এরা স্বাধীনতাবিরোধী ছিল কিনা যদিও তিনি স্পষ্ট করে কিছু বলেননি তবে ইঙ্গিত করেছেন সেদিকেই। স্বাধীনতাবিরোধীরা শুধু অবরুদ্ধ ঢাকা নয়, সারা বাংলাদেশেই যুদ্ধকালীন নয় মাসে মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের বাড়ি-ঘরে লুটপাট করেছে অনায়াসেই। তাদের পকেট গরম থাকার কথা। তাই তাদের কাছে একাত্তরের ঈদ ছিল অন্য ঈদের মতই।

ঢাকায় ঈদের মোনাজাতে পাকিস্তান ও হানাদারদের কল্যাণ কামনা :

ঈদের দিন শিল্পী হাশেম খান ছিলেন ঢাকার আরামবাগে। ভয় আর উৎকণ্ঠা নিয়েই আরামবাগ এলাকার একটি মসজিদে ঈদের জামাত আদায় করেছিলেন তিনি। তাঁর ‘গুলিবিদ্ধ একাত্তর’গ্রন্থেও উঠে এসেছে ঢাকার অপ্রত্যাশিত বিষাদময় ঈদের বিবরণ। সেখানে পাওয়া যায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। আর তা হল- ঈদের জামাত শেষে পাকিস্তানের কল্যাণ কামনা ও হানাদার বাহিনির জন্য মোনাজাত। অবরুদ্ধ ঢাকায়  ঈদের অন্যান্য জামাতের মোনাজাতেও ইমাম ও এদেশিয় দোসরদের কর্তৃক পাকিস্তানিদের জন্য দোয়া চাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তবে ঢাকার ঈদস্মৃতি বর্ণনায় অন্য কারো লেখায় এই প্রঙ্গটি চোখে পড়েনি। শিল্পী হাশেম খান লিখেন-

... আজ ঈদ। আনন্দের দিন। উৎসবের দিন, আনন্দের দিন।  কিন্তু কী আনন্দ করবো এবার আমরা? নতুন জামা কাপড় বা পোশাক কেনাকাটার আগ্রহ নেই! শিশু-কিশোরদের কোনো আবদার নেই। চাওয়া-পাওয়া নেই। বাড়িতে বাড়িতে কি পোলাও কোমরা ফিরনী রান্না হবে? আমার বাড়িতে তো এসবের কোনো আয়োজন হয়নি। প্রতিটি বাঙালির বাড়িতে এরকমই তো অবস্থা।

... তিনতলার বারান্দা থেকে আরামবাগের শুরু ও ফকিরাপুল বাজারের মাঝামাঝি অবস্থানে মসজিদটি দেখা যায়; সকাল ৮ থেকে মাইকে ঘোষণা দিচ্ছে সাড়ে ৯ টায় নামাজ হবে। যথাসময়ে মসজিদে গিয়ে হাজির হলাম। নামাজ হলো, খুৎবা হলো, মোনাজাতও হলো। খুৎবা ও মোনাজাতে ইমাম সাহেব পাকিস্তানের কল্যাণ কামনা করে এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গুণকীর্তন করে দোয়া চাইলেন খোদার কাছে।

ইমাম সাহেব হয়তো রাজাকার ও পাকিসেনাদের দালালদের শোনানোর জন্যই অত জোরে শব্দ করে মোনাজাত জানাচ্ছেন, আল্লাহর কাছে কাঁদছেন, তাতে তার অন্তরে সায় কতখানি ছিল জানি না। তবে বাঙালি মুসল্লি কেউই যে ইমামের মোনাজাত কর্ণপাতও করেনি তা আমার দৃঢ় বিশ্বাস। [৬]

সাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দীনের স্মৃতিকথায় একাত্তরের ঢাকায় ঈদের বর্ণনা আরও ডিটেইল। তিনি লিখেন-

... শুনলাম, ঈদের বড় বড় জামাতে সেনাবাহিনী নিযুক্ত লোকরাই বোমা মারবে। উদ্দেশ্য, মুক্তিবাহিনীকে ট Unpopular করা। কী চমৎকার বু্দ্ধি! মানুষও ওয়ার্নিং পেয়ে গেছে। বোরকা ছাড়া ঈদের বড় বড় জামাতে কেউ যাবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া জুমা ও ঈদের নামাজ পড়া এখন এ দেশে জায়েজও নয়।

... ঈদের দিন শনিবার। যুদ্ধকালে কোনো জামাত জায়েজ নয়। নামাজে যাইনি। কনিষ্ঠ পুত্র কায়েসকে সঙ্গে নিয়ে সকাল ৯টায় সিদ্দিক বাজারের উদ্দেশ্যে বেরোলাম। রিকশায় চড়ে দেখি, সড়ক জনমানবশূন্য। টেলিভিশন অফিসের (ডি.আই.টি. বিল্ডিং) সম্মুখে যেতে রিকশা ফিরিয়ে দিল। ট্রাকে ট্রাকে টহল ও পাহারায়ও মিলিটারি।

স্টেডিয়ামে আবদুর রহমান বেখদের ইমামতিতে অনুষ্ঠিত জামাতে বোধকরি ৫/৭ শ লোক হয়েছিল- অধিকাংশ বিহারী। ওরা দু’চারজন করে ঘরে ফিরে যাচ্ছিল।

...যাওয়ার সময় দেখলাম বায়তুল মোকাররম মসজিদে মিলিটারি পাহারায় ঈদের জামাত হচ্ছে। এ মসজিদেও বোধকরি হাজেরখানেক লোকের বেশি হয়নি। সিদ্দিক বাজার থেকে ফেরত আসার সময় দেখলাম, সড়ক তেমনি জনমানবহীন। কদাচিৎ দু’একটি মোটর গাড়ি দেখা যায়। দুঃসাহসী ব্যক্তিরা বোধকরি ঈদের মোলাকাত করতে যাচ্ছে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে। বেলা তিনটা পর্যন্ত শহর এমনি জনশূন্য ছিল। ২৭ মার্চ শহরে যেরকম জনশূন্য ছিল, আজকের অবস্থাও তাই। তিনটার পর কিছু কিছু লোক সড়কে বেরোয়।

...আসলে শহরের অর্ধেক লোক নামাজে যায়নি। বাকীরা মসজিদে বা পাড়ায় পড়েছে। বহু বাড়িতে সাধারণ ভাত সালুন পাক হয়। বহু বাড়িতে সেমাই কেনা হয়নি।  আমি নিজে ছেলেমেয়েদের জন্য নতুন জামাকাপড় ক্রয় করিনি। ...। আমার জীবনে এই প্রথম ঈদের জামাতে শরিক হইনি। [৭]

প্রবাসী সরকারের ঈদ :

ঈদের জামাতের পর জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে কোলাকুলি করছে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনযে দেশের সরকারই উদ্বাস্তু, অন্য দেশে আশ্রিত, সে সরকারের কেমন হবে ঈদ উদযাপন- তাতো বুঝাই যায়। তবে যেহেতু সরকার- তাই ঈদ উদযাপন না হোক, একটি আনুষ্ঠানিকতা থাকাটা স্বাভাবিক। ঈদ পালনে কিছু আনুষ্ঠানিকতার উদ্যোগ নিয়েছিল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারও। সে আনুষ্ঠানিকতা ছিল খুবই সাদামাটা। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের কাছে দিনটি ছিল সরকারের অন্য সদস্যদের তুলনায় আরও বেশি করুণ-বিষাদময়।
মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম ঈদের দিনটিতে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের সঙ্গে ছিলেন। স্মৃতিকথায় তিনি লিখেন-
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সেদিন মুজিবনগর সরকারের পক্ষ থেকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। মুজিবনগর সরকারের সকল দপ্তরও সেদিন বন্ধ ছিল। সেদিন যুদ্ধবিরতিও ঘোষিত ছিল।
...মুজিবনগর সরকারের সদর দপ্তরে ছোটো মাঠে এক অনাড়ম্বর পরিবেশে ঈদুল ফিতরের জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়। স্বাধীন বাংলা সরকারের পক্ষ থেকে মুজিবনগরে খুব ঘটা করে ঈদুল ফিতর উদযাপনের ব্যাপক প্রচার করা হয়েছিল- স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয় সম্পর্কে মুসলিম দেশগুলোর কাছে ফ্যাসিস্ট পাকিস্তানিদের অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি দূর করার জন্য। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার অপপ্রচারে বিভ্রান্ত মুসলিম দেশগুলোর বিভ্রান্তি ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সৃষ্ট ভুল ধারণা মোচন করে তাদেরকে জানিয়ে দেয়া যে, বাংলাদেশের এই মুক্তিযুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে নয়।  এজন্য আগে থেকেই স্বাধীন বাংলা সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের দখলকৃত মুক্ত এলাকায় ঘটা করে ঈদুল ফিতর উদযাপনের ব্যাপক আয়োজনের খবর ফলাওভাবে প্রচার করা হয়েছিল।
ঈদুল ফিতরের জামাত পরিচালনা করেছিলেন মওলানা দেলোয়ার হোসেন। বাংলাদেশের ভোলা নিবাসী এই মওলানা আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদের খুব ভক্ত ছিলেন। তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে কুরআন পাঠ ও কুরআনের তাফসির করতেন।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, সরকারিভাবে আয়োজিত ঈদুল ফিতরের এই জামাতে কেবল প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ ও মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানী ছাড়া ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খোন্দকার মোশতাক আহমেদ, অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলী কিংবা কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় অন্য কোনো নেতা যোগদান করেননি।

ঈদুল ফিতরের নামাজা আদায়ের পর যথারীতি ঈদের কোলাকুলি হলো। ঈদ মোবারক বিনিময় হলো। সব আনুষ্ঠানিকতাই হলো। কিন্তু সেমাই, পোলাও, গোশত খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এজন্য আমরা সবাই মনমরা হয়ে গিয়েছিলাম। বিশেষ করে আমার জীবনে এমন নিরানন্দ ঈদ হয়নি। তবে সকালের দিকে আমাদের ব্যারাকে নিম্নমানের সেমাই রান্না করা হয়েছিল। [৮]

অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম কলকাতায় ঈদের নামাজ পড়েননি- বিষয়টি অনেকটা অভিযোগের মত করেই নজরুল ইসলাম তাঁর স্মৃতিকথায় বর্ণনা করেছেন। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ঈদের নামাজ আদায় করেছেন আগরতলায়। লেখক ফজলুল বারী তাঁর ‘একাত্তরের আগরতলা’ গ্রন্থে লিখেন-

২০ নভেম্বর আগরতলা মসজিদে ঈদের জামাতে অংশগ্রহণ করেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমরা আগামী ঈদ করবো বাংলাদেশে’। [৯]

স্বাধীনতা স্বপ্নে বিভোর যুদ্ধরত বাঙালির বিজয় যে আর বেশি দূরে নয়, বক্তৃতায় তারই ইঙ্গিত দিয়েছেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। কারণ জুলাই-আগস্টের বর্ষায় গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের সফল আক্রমণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনি বিপর্যস্ত। নভেম্বরের শীতেকালে হানাদাররা আরও কোণঠাসা।

বঙ্গবন্ধু, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী :

পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম জাতির উদ্দেশ্যে বাণী দেন। এই বাণী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রচার করে। জয় বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ২৬ নভেম্বর।বাণীতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বলেন- পবিত্র রমজান মাসেও হানাদার বাহিনির বর্বরতায় বাংলাদেশের মুসলমান, হিন্দু নির্বিশেষে অসংখ্য নরনারী নিহত হচ্ছে। গত বছর আমরা বারোই নভেম্বর প্রলয়ঙ্কারী ঝড়ে নিহত দশ লাখ মানুষের শোকে মুহ্যমান অবস্থায় ঈদ পালন করতে পারিনি। এবারও আমরা ইয়াহিয়ার সৈন্যদের বর্বরতায় নিহত দশ লাখ ভাইবোনের বিয়োগ বেদনা বুকে নিয়ে ঈদের জামাতে শামিল হয়েছি। কিন্তু দুঃখ-কষ্ট যাই হোক, ত্যাগের মন্ত্রে আমর উদ্বুদ্ধ এবং যেকোনো ত্যাগের মূল্যে স্বাধীনতার ঘোষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে বদ্ধপরিকর। দেশকে শত্রুর কবল থেকে মুক্তি করার পর মাত্রই ঈদুল ফতেহ বা বিজয়ের ঈদ উৎসব পালন করবো এবং  সেদিন খুব দূরে নয়, এই প্রতিশ্রুতি আমি আপনাদের দিতে পারি। [১০]

ঈদের আগের দিন ১৯ নভেম্বর  ‘এই ঈদে আমাদের প্রার্থনা হোক’ শিরোনামে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের বাণী প্রকাশ করে জয়বাংলা পত্রিকা।

বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন- ‘আমাদের দেশে এবার ঈদ এসেছে অত্যন্ত মর্মান্তিক পরিবেশে। দখলীকৃত এলাকায় শত্রুসৈন্যের তাণ্ডব চলছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেকে বিচ্যুত হয়ে শরণার্থী হয়েছেন, মুক্ত এলাকায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি চলছে শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য, রক্তের বিনিময়ে মানুষ মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম করছে। এবার ঈদে আনন্দ মুছে গেছে আমাদের জীবন থেকে, আছে শুধু স্বজন হারানোর শোক, দুর্জয় সংগ্রামের প্রতিজ্ঞা ও আত্মত্যাগের প্রবল সংকল্প।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং আমার নিজের পক্ষ থেকে ‘বাংলাদেশের জনসাধারণকে ঈদ উপলক্ষে আমি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। ঈদের যে আনন্দ আজ আমরা হারিয়েছি, তা আমাদের জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে সেদিনই, যেদিন আমরা দেশকে সম্পূর্ণরূপে শত্রুমুক্ত করব। আমি আপনাদের আশ্বাস দিচ্ছি যে, যথাসর্বস্ব পণ করে যে স্বাধীনতা সংগ্রামে আমরা লিপ্ত, তার চূড়ান্ত সাফল্যের দিনটি নিকটতর হয়ে এসেছে। সেই মুহূর্তটিকে এগিয়ে আনার সংগ্রামে আমরা সকলে যেন নিঃস্বার্থভাবে নিজেদের নিয়োগ করতে পারি, এই ঈদে তাই হোক আমাদের প্রার্থনা। [১১]
ঈদের আগের দিনে (১৯/১১/১৯৭১) সাপ্তাহিক জয় বাংলার ২৮তম সংখ্যায় সম্পাদকীয় কলামে ‘উৎসবের ঈদ নয়, ত্যাগের ঈদ' শিরোনামে উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাণীও প্রকাশ করে। যদিও বঙ্গবন্ধু তখন পাকিস্তানের জেলে বন্দি।

বঙ্গবন্ধুর বাণীতে বলা হয়-
আমি নিজেকে বাঙালি ভাবতে গর্ববোধ করি। বহতা নদীর মতো আমাদের সংস্কৃতির ধারাও বেগবতী ও প্রাণাবেগপূর্ণ। আত্মশক্তিতে উদ্বুদ্ধ হলে বাঙালি আবার বিশ্বসভায় মাথা তুলে দাঁড়াবে। বাঙালী হওয়ার সঙ্গে ধর্মে মুসলমান থাকার কোন বিরোধ নেই। একটি আমার ধর্ম। অন্যটি জাতি পরিচয়। ধর্ম আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আচার। জাতি পরিচয় আমার সমষ্ঠিগত ঐতিহ্য। একজন হিন্দু বাঙালি ও মুসলমান বাঙালী অথবা বৌদ্ধ বা খিস্টান বাঙালি মধ্যে পার্থক্য এটুকুই যে, তাদের ধর্মমত শুধু আলাদা কিন্তু খাদ্য, রুচি, ভৌগোলিক পরিবেশ, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, বর্ণ ও রাজনৈতিক লক্ষ্যের দিক থেকে তারা অভিন্ন...। [১২]
‘চাঁদ তুমি ফিরে যাও’
(স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আয়োজন)

১৯ নভেম্বর ১৯৭১, জয় বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাণী।রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ যোগানোর ক্ষেত্রে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনবদ্য ভূমিকার কথা কম বেশি সবারই জানা। ২০ নভেম্বরের ঈদে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে। অনুষ্ঠানমালার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও আলোড়িত ছিল ‘চাঁদ তুমি ফিরে যাও.../ দেখো মানুষের খুনে খুনে রক্তিম বাংলা/ রূপসী আঁচল কোথায় রাখবো বলো?’ শীর্ষক অমর এই গানটি। ঈদের চাঁদকে ফিরে যেতে বলার মত ঘটনা- একাত্তরের আগে এবং পরে শুধু বাঙালি মুসলমানদের জন্য নয়, মুসলিম বিশ্বের আর কোথাও হয়েছে বলে জানা নেই। একাত্তরের ঈদ যে য্দ্ধুবিধ্বস্ত  বাঙালির কতটা অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল- এই গানটির মাধ্যমে তা খুবই প্রাসঙ্গিক হয়ে ফুটে উঠে সে সময়। গানটির আবেগঘন আবেদন এত তীব্র ছিল যে- শুধু মুক্তিযোদ্ধারাই নয়, সাধারণ মানুষ ঈদের দিন এই গান শুনে কেঁদে বুক ভাসিয়েছে। স্মৃতিকথায় মুক্তিযোদ্ধা ফারুক ওয়াহিদ লিখেন-চাঁদ রাতে ঈদুল ফিতরের দিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সারাদিন বেজেছিল অত্যন্ত আবেগময় অশ্রুসিক্ত এই গানটি। যা শুনে সেদিন চোখে পানি ধরে রাখতে পারিনি। কেঁদেছি শুধু কেঁদেছি। সেই অগ্রহায়ণের হেমন্তের ঈদুল ফিতরের দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর শনিবার। যখন পাকিস্তানি হানাদারদের অত্যাচার আর নিপীড়নে বিপর্যস্ত সারা বাংলা। [১৩]

গানটির কথা লিখেছেন শহীদুল ইসলাম, সুর করেছেন অজিত রায়, কোরাসে গেয়েছিলেন শিল্পী রূপা ফরহাদসহ আরও অনেকে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে সংবাদ বিভাগের দায়িত্বে থাকা বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী গানটির তৈরি ও প্রচারের ইতিহাস জানান তাঁর স্মৃতিকথায়-

... ঈদের দুদিন আগেই গানটি রেকর্ড করলাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। কিন্তু ঠিক হলো চাঁদ উঠলে এই গানটি প্রচারিত হবে। হলোও তাই। উঠল ঈদের চাঁদ আকাশে। স্বাধীন বাংলা বেতারে গেয়ে উঠল সমবেত কণ্ঠে- ‘চাঁদ তুমি ফিলে যাও, ফিরে যাও।’ শহীদুল ইসলাম আজ কয়েক বছর হলো মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু তাঁর সেদিনের এই ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন সকল মুক্তিযোদ্ধার হয়ে। ওরা (পাকিস্তানি) সেদিন অবরুদ্ধ বাংলার ভাই-বোন, মা ও বাবার মনেও স্বস্তি দেয়নি। ওদের ভয়ার্ত জীবনের একটাই চিন্তা ছিল- কি করে শত্রুর কবল থেকে এই দেশকে বাঁচাবো। আর ভাবছিলেন আমাদের কথা, যারা যুদ্ধে ছিলাম। [১৪]

ঈদের দিন স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে প্রচারিত কথিকাগুলোও ছিল হৃদয় ছোঁয়া। একটি কথিকার ঘোষণায় বলা হয়-

অফুরন্ত আনন্দের বন্যা নিয়ে ঈদ আসে আমাদের দ্বারপ্রান্তে। রমজান শেষেও এবার এসেছে ঈদুল ফিতর। কিন্তু এবারের ঈদ বয় আনেনি সেই আনন্দ বন্যা। পাকিস্তানি জঙ্গি শাসনে নৃশংস হত্যাকাণ্ডে বাংলার মাটি, বাংলা আকাশ আজ রক্তরাঙা। এখন শুনবেন ‘রমজানের ওই রোজার শেষে’একটি স্মৃতি আলেখ্য।

‘রমজানের ওই রোযার শেষে’

পুরুষ কণ্ঠ : বাংলার আকাশে আবার শাওয়ালের চাঁদ উদিত। অঘ্রাণের কুয়াশামাখা দিগন্তে এক ফালি খণ্ড চাঁদে কত আলো আর আনন্দের প্রত্যাশা। কিন্তু আলো আর আনন্দ আজ এমনভাবে নিভে গেল কেন? আঁকা যেন চাঁদ নয়, চাঁদের করোটি। ঈদের আহত চাঁদের গা বেয়ে যেন ঝরছে চাপ চাপ রক্ত। বাংলার আকাশ আজ লাল, মাটি আজ লাল। হেমন্তে পাখি গান গায় না। নবান্নের ধান কুমারী মেয়ের মত বাতাসের প্রথম সোহাগের আর আন্দোলিত হয় না বাংলাদেশের সবুজ ক্ষেত। শাওয়ালের চাঁদ ... এসেছো রক্তাক্ত দেহে। এসেছো নিহত শিশুর আর নারীর লাশের ছবি বুকে গেঁথে।

নারী কণ্ঠ :

‘ওরে বাংলার মুসলিম তোরা কাঁদ

এনেছে এজিদ বাংলার বুকে মোহাররমের চাঁদ।

এসেছে কাশেম এসেছে সখিনা সারা দেহে হায় তপ্ত খুন

আজ নয় ঈদ, আজ কোটি কোটি মুখে ইন্না লিল্লাহি... রাজিউন।’

পুরুষ কণ্ঠ :

... এজিদ বলেছিল, আরবের মুসলমানকে খেলাফত দেবো না। আমি চাই সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে। ইয়াহিয়া বলছে, বাংলার মুসলমানকে আমি গণতন্ত্র ও স্বাধিকার দেবো না। আমি চাই মিলিটারি ফ্যাসিজম কায়েম রাখতে। আলোচনার নামে এজিদের বন্ধু কুফার বিশ্বাসঘাতক মুসলামানেরা মহানবীর নয়নমণি ইমাম হোসেনকে পথ ভুলিয়ে নিয়ে গিয়েছিল কারাবালায়। তার পিপাসার্ত স্ত্রী, পুত্র, শিশুকে একফোটা পানি পর্যন্ত দেয়নি খেতে। এ যুগে ইয়াহিয়া আলোচনার নামে বাংলার নয়নমণি বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করেছে। আজ তিনি কোথায় কেউ জানে না। কেউ জানে না।

নেপথ্যে সমবেত কণ্ঠে :

তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব

বাংলাদেশের প্রাণে গানে চিরঞ্জীব

শেখ মুজি শেখ মুজিব।। [১৫]

ব্রিটেনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্যোগ :

একাত্তরের আগস্ট মাসের পর থেকে পাকিস্তান আন্তর্জাতিকভাবে দ্রুত পরাজিত হওয়ার ক্ষেত্রে বৃটেন-আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাঙালিরা বিশেষ ভূমিকা রাখে। এক্ষেত্রে প্রবাসীদের উদ্যোগে বাংলাদেশের স্বাধিকারের কথা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কথা এবং পাকিস্তান বাহিনির নির্মম অত্যাচারের কথা শক্তিশালীভাবে তুলে ধরা হয় বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে । যা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ব্রিটেনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংগৃহীত তহবিল ছিল যুদ্ধে চালিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে বড় আর্থিক যোগান।  এ কর্মসূচিতে অংশ নেয় যুক্তরাজ্যস্থ বাংলাদেশ ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ও বাংলাদেশ মহিলা সমিতিসহ কয়েকটি সংগঠন। ১৬ নভেম্বর বাংলাদেশ মহিলা সমিতির একটি আবেদন পত্রে প্রবাসীদের ফেতরা টাকা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রদান করার আহ্বান জানানো হয়। আবেদনপত্রটি নিম্নরূপ-

BANGLADESH WOMEN’S ASSICIATION IN GREAT BRATAIN

 

103, Ledbury Road, London, W. II

Telephone : 01 727 6578

Ref : 2/R.

Date : ১৬ নভেম্বর, ১৯৭১।

সুধী,

পবিত্র ঈদ সমাগমে প্রতিটি দেশপ্রাণ বাঙালির মন স্বভাবতই ভারাক্রান্ত। দেশ ও জাতি আজ ঘোরতর দুর্যোগের সম্মুখীন।  ইয়াহিয়ার নীতি ও ধর্মজ্ঞান বিবর্জিত নৃশংস সেনাবাহিনীর অত্যাচারে জর্জরিত। অত্যাচারী এজিদ বাহিনি বাঙালি জাতির নাম পৃথিবী থেকে মুছে ফেলতে বদ্ধপরিকর। দেশের এই সংকটে আমাদের একমাত্র ভরসাস্থল মরণজয়ী জেহাদেরত মুক্তিবাহিনী ভাইরা। বাংলা ও বাঙালিকে তারা বাঁচাবেই- প্রয়োজন হলে তাঁদের জীবনের বিনিময়ে। আমাদর ঈদ ব্যর্থ হবে যদি এই পবিত্র দিনে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য ভুলে যাই।

তাই যুক্তরাজ্যস্থ বাংলাদেশ মহিলা সমিতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবারের ফেতরার পয়সা সংগ্রহ করে মুক্তিবাহিনীর কাপড়-চোপড় ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিস খরিদ করার জন্য পাঠিয়ে দেবে। এ ব্যাপারে আমরা অনুরোধ করছি আপনাদের আন্তরিক সহযোগিতা।

আসুন ভাই ও বোনেরা, এবারের ফেতরার পয়সা মুক্তিবাহিনীর নামে বাংলাদেশ মহিলা সমিতির কাছে পাঠিয়ে দিয়ে জিহাদে শরিক হই। দানের দ্বারা দেশের প্রতি আপনার গুরুদায়িত্বের ভার কিছুটা লাঘব করুন। আপনার ঈদ সার্থক ও পবিত্রতর হোক।

জয় বাংলা।

নিবেদিকা

মিসেস বখশ

(কনভেনর) [১৬]

ঈদের দিনের যুদ্ধ ও মুক্তিবাহিনীর সফলতা :

ঈদের দিনেও একাধিক জায়গায় যুদ্ধ হয়। অধিকাংশ জায়গায়ই মুক্তিবাহিনী জয় লাভ করে। অনেক পাকিস্তানি সেনা মারা পড়ে। বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় লোক শহিদ হন।

রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী তাঁর ‘৭১ এর দশমাস’গ্রন্থে লিখেন-

৩ অগ্রহায়ণ, ১৩৭৮ শনিবার, ২০ নভেম্বর ১৯৭১। এদিন মুক্তিবাহিনী নালিতাবাড়ি থানা (শেরপুর) আক্রমণ করে পশ্চিমা পুলিশ রাজাকারদের হাত থেকে দখল করে নেয়। পাকিস্তানি সেনারা এখানে ছিল না। এই অপারেশনে পশ্চিমা পুলিশ, রাজাকার এবং আলবদর নিহত হয়। অবশিষ্টরা আত্মসমর্পণ করে। এই বিজয়ের ফলে হালুয়াঘাট ছাড়া শেরপুর থেকে দুর্গাপুর পর্যন্ত সমগ্র সীমান্ত এলাকা-মুক্তি-বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। মুক্তিবাহিনী মেহেরপুরে (কুষ্টিয়া) পাকিস্তান বাহিনির একটি হেলিকপ্টার গুলি করে ধ্বংস করে। মুক্তি বাহিনির গেরিলাদের মুক্তিগঞ্জ থানা পুড়িয়ে দেয়। উল্লেখ্য, মুক্তিগঞ্জ কুষ্টিয়া এলাকায় গত দু’মাস ধরেই গেরিলাযোদ্ধারা কৌশলগত কারণে অবস্থান গ্রহণ করতে হয়েছিল। এদিন এস. ফোর্স আখাউড়া আক্রমণ করে। এ আক্রমণে নেতৃত্ব দেন মেজর মইনুল ইসলাম চৌধুরী। দুইদিন যুদ্ধের পর আখাউড়া পাকিবাহিনির হাত থেকে মুক্তিবাহিনির হাতে মুক্ত হয়।

পাকিস্তান রেডিও থেকে বলা হয়, যশোর ও সিলেট সীমান্তে ভারতীয় সেনাবাহিনি আজ সর্বাত্মক হামলা চালায়। পাকিস্তান সেনাবাহিনি হামলা প্রতিহত করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। [১৭]

পাকিস্তানি রেডিও’র ঘোষণা

বর্ষাকাল, শীত ও রমজান মাস এবং সর্বোপরি মুক্তিবাহিনির আক্রমণে বিপর্যস্ত পাকিস্তানি রেডিওতে নিরানন্দ ঈদকে ঢাকার চেষ্টা করে। স্রোতাদেরকে বোঝায়- তারা ভাল আছে।

রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী লিখেন-

আজ ঈদ-উল-ফিতর। অবরুদ্ধ বাংলাদেশের কোনো আনন্দ নেই। পাক রেডিও ‘সব ঠিক হায়’বলে খবর ও ঈদের আনন্দের বর্ণনা দেয়। [১৮]

শরণার্থীদের ঈদ :

উদ্বাস্তু জীবনে শরণার্থীদের ঈদও ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। তবে অনেক শরাণার্থী শিবিরে ঈদের জামাত হয়েছিল। শরণার্থী হিসেবে যারা পরিবার নিয়ে ভারতে ছিলেন তাদের কাছে দিনটি যে কত বিষাদের ছিল- তার উত্তাপটা অনুভব করা যায় কলকাতায় একাত্তরের ঈদের দিনের সকালে শহিদ জায়া বেগম মুশতারি শফি’র ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে প্রতিবেশীদের কথোপকথনে। বেগম মুশতারি শফি লিখেন-

আমার বাচ্চারা মুখ মলিন করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। এমন ঈদ তো ওদের জীবনে কখনো আসেনি! আমার পাশের ঘরের খ্রিস্টান ছেলে-মেয়ে জ্যাফরী, ননাট, ললী এলো। ওদের বললো, ‘তোমরা আজ নতুন কাপড় পরোনি? তোমরা ঈদ করবে না?’

ওদের প্রশ্ন শুনে আমার বুকের ভেতরটা যেন কেমন করে উঠলো, কি উত্তর দেবে আমার বাচ্চারা? আমি কান পেতে রইলাম। শুনলাম আমার বড় ছেলে এরাদ বলছে, ‘না ললী, আমরা ঈদ করবো না।’ওরা প্রশ্ন করছে, কেন?

এরাদ বলছে, ‘আমার কাকু বলেছে, দেশে যখন যুদ্ধ চলে, তখন কোন ঈদ করতে হয় না। এখন আমাদের সাথে আব্বু নেই, মামা নেই, ওদেরকে মিলিটারিরা নিয়ে গেছে। আমরা যুদ্ধ করে পাকিস্তানি আর্মিকে হারিয়ে দেব, আর আমাদের দেশ স্বাধীন হয়ে যাবে, আমরা দেশে ফিরে আব্বুকে পাবো, মামাকে পাবো তখন ঈদ করবো।’ওর কথা শুনে কান্না সংবরণ করতে পারলাম না। আঁচলে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেললাম। হে খোদা তুমি আমার বাচ্চাদের ইচ্ছে পূর্ণ করে দাও। তুমি তো অলৌকিক কত কিছু দেখালে, আরেকটু দেখাও, সত্যিই যেন ওদের আমরা ফিরে পাই। [১৯]

যে ঈদ সারাজীবন দিয়েছে আনন্দ, অতীতের সব দুঃখ-গ্লানি মুছে দিয়ে বয়ে আনতো আনন্দের বার্তা; ১৯৭১’র ২০ নভেম্বরের সেই ঈদ ছিল তার উল্টো। তাই বিষাদের ছায়াময় দিনটি দ্রুতই শেষ হোক, এমনটি চাইছিলেন এই শহিদ জায়া। তিনি লিখেন-

না, মুরগি না পোলাও, কোর্মা রাঁধার সাধ্য আমাদের নেই। তবে বেলাল ভাই সেমাই কিনে এনেছিল কাল; আজ মিনু আপাও চোখ মুছতে মুছতে সেটাই রান্না করে বাচ্চাদের সকালে খাইয়েছে। অনেক দিন পর আজ আমি যেন আবার একটু বেশি রকম মুষড়ে পড়ছি, কামনা করছি বার বার এই দিনটার দ্রুত অবসান। [২০]

ঈদের দিন দিবাগত রাতে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ গোপনে কুষ্টিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে আবেগঘন সাক্ষাতের পর রাতেই ফিরে আসেন কলকাতায় তাঁর কার্যালয়ে। আসার সময় তাঁর গাড়ি কলকাতার শরণার্থী শিবিরের পাশ দিয়েই এসেছিল। নিরাপত্তার কারণে তিনি সেখানে নামেননি। তবে তাঁর সঙ্গে থাকা নজরুল ইসলামের (মুক্তিবাহিনির সদরদপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা) স্মৃতিকথায় ঈদের রাতে সেখানকার শরণার্থী শিবিরের পরিস্থিতি উঠে এসেছে। তিনি লিখেন-

২৬ নভেম্বর ১৯৭১, জয় বাংলায় প্রকাশিত অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের বাণী।আমাদেরকে নিয়ে গাড়ির বহর পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তের শেষ রাতের স্তব্দতা বিদীর্ণ করে কলকাতার অভিমুখে ছুটে চলল। সীমান্ত এলাকা ছেড়ে বেশ কিছু দূর অগ্রসর হলে বাংলাদেশের শরণার্থী শিবির। গাড়িতে প্রধানমন্ত্রীর পাশে বসা ভারতীয় নিরাপত্তা অফিসার মিস্টার বোস প্রধানমন্ত্রীকে দেখালেন রাস্তার অদূরের কয়েকটি শরাণার্থী শিবির। শেষ রাতে আবছা আঁধারের আবরণে ঢাকা শরণার্থী শিবিরে লোকজনের কোলাহল, শিশুদের কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল, সেখানে ঈদ আসেনি। তথাকথিত ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানের হায়েনা বাহিনি এদেরকে নিজ মাতৃভূমি থেকে তাড়িয়ে দিয়ে পবিত্র ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর উদযাপনের ধর্মীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। এটাই নাকি পাকিস্তানি সামরিক জান্তার ইসলাম রক্ষার জেহাদ?
... অদূরে কিসের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। এ অসতর্ক মুহূর্তে অজ্ঞাতসারেই প্রশ্ন করে বসলাম, এটা কিসের আওয়াজ?

আমার গাড়ির চলন্ত স্টিয়ারিংয়ের উপর হাত রেখে বসা ভারতীয় সামরিক ড্রাইভার বললেন, এটা ডিউবয়েল চাপার আওয়াজ। শরণার্থী শিবিরের লোকজন পানির কল চেপে পানি উঠাচ্ছে। রাতে ঘুম এদের চোখ থেকে পালিয়ে গেছে। ক্ষুধার অনলে জ্বলন্ত চোখে ঘুম আসবে কি করে? [২১]

পত্র-পত্রিকায় একাত্তরের ঈদ :

আগরতলা থেকে প্রকাশিত দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় ২১ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধা, শরণার্থী ও অস্থায়ী সরকারের ঈদ পালন নিয়ে খবর প্রকাশ করে। শিরোনাম ছিল :

সমগ্র ভারতে পবিত্র ঈদ উৎসব পালিত

আগামী বছর বাংলাদেশেই ঈদ হবে

বিস্তারিত খবরে বলা হয়-

আগরতলা ২০ শে নভেম্বর : আজ আগতলা মসজিদে পবিত্র ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়, স্থানীয় ও বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ এই নামাজে অংশগ্রহণ করেন। আজ নয়াদিল্লী ঈদগাহ ময়দানে দেশ-বিদেশের মুসলিম জনসাধারণ ঈদোৎসব পালন করেন। এই উপলক্ষে আয়োজিত এক সভায় পূর্ব-বাংলার বর্ষীয়ান নেতা জনাব আবদুল হামিদ খান ভাসানী হিন্দু মুসলমান সবার কাছে তাঁর ঈদ মোবারক জানান। রাষ্ট্রপতি ভবনে অন্যান্য মুসলিম কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে মোবারকবাদ জানাতে পাকিস্তানের হাইকমিশনারও গিয়েছিলেন। কোলকাতা শহিদ মিনারে অসংখ্য পুণ্যার্থী সমাগম হয়েছিল।

ঢাকা থেকে প্রকাশিত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক সংবাদে বলা হয়েছে যে, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ঈদোৎসব উপলক্ষে ভারতে মৈত্রী কামনা করে পাক-ভারত সম্পর্কে উন্নতি আশা প্রকাশ করেছেন, যদ্যপি সীমান্তে পাক সৈন্যর রণসাজ তীব্রতর হচ্ছে এবং ‘ভারত চূর্ণ করো’ ইত্যাদি ধ্বংত্মক মনোভাব সৃষ্টিকারী ছাত্রসংস্থা একই সাথে গড়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম আজকের দিনটিকে স্মরণ করে বলেছেন, ঈদের চাঁদ আজ রক্তাক্ত- আগামী বছরের ঈদ স্বাধীন বাংলাদেশেই উদযাপিত হবে। [২২]

প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ ও তাঁর পরিবারের ঈদ :

তাজউদ্দীন আহমেদ প্রধানমন্ত্রী, অন্তত তাঁর অফিসে সামান্য হলেও ঈদের খাবার-দাবারের আয়োজন থাকবে- এমনটাই ধারণা করেছিলেন তাঁর পরিচিতজনেরা। কিন্তু এদিন তাজউদ্দীন আহমেদ ছিলেন একেবারেই নিরুত্তাপ। ঈদের নামাজ আদায়ের বাইরে অন্যসব আনুষ্ঠানিকতা থেকে বিরত থেকেছেন তিনি। ঈদের নূন্যতম আনন্দ থেকে বিরত রেখেছেন পরিবারকেও। যদিও তখন তাঁর সন্তানরা সবাই ছোটো ছোটো।

নজরুল ইসলাম লিখেন-

... প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের বিশেষ রাজনৈতিক সহকারী রহমত আলী, ঢাকার শাহবুদ্দিন এবং আমি প্রধানমন্ত্রী দপ্তরে গিয়ে হাজির হলাম ঈদের দিনের ভালো খাবারের প্রত্যাশা নিয়ে। কিন্তু হায়! প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে গিয়ে ঈদের কোনো আমেজই পাইনি। প্রধানমন্ত্রী নিজেই কোনো সেমাই খাননি। তাঁর মনোভাব খুবই শীতল। ঈদের দিনে আমাদেরকে আপ্যায়ন করার কোনো উদ্যোগ ছিল না এবং এই অপরাগতার জন্য তাঁর মধ্যে কোনো অনুশোচনার ভাবও ছিল না। আমি নিজে ব্যথিত হয়েছিলাম। খুব হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। ... ঈদের এই আনন্দের দিনেও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের দপ্তরের পাষাণ নিরবতা ভঙ্গ করার সাহস আমার ছিল না। হিমালয়ের মত স্তব্ধতা নিয়ে তিনি বসেছিলেন। [২৩]

প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের পরিবারেও ছিল না ঈদের আনন্দ। সময়টা যতই বেদনাবিদুর হোক, শিশুদের অন্তত নতুন জামার দাবিটা থাকে। কিন্তু কারো জন্যই কেনা হয়নি কোনো পোশাক। ঈদের দিনের খাবারও ছিল খুবই সাধারণ। তাজউদ্দীনের বড় মেয়ে শারমিন আহমেদ স্মৃতিকথায় লিখেন-

... নভেম্বর মাসেই এল রোজার ঈদ। আব্বু রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে তাদের ক্যাম্পে মিলিত হলেন। আমাদের ফ্ল্যাটে ঈদের দিন কোনো বিশেষ খাবারের আয়োজন হল না। নতুন কাপড়ও জুটল না। শাক, ডাল, আলু ভর্তা ও ভাত খেয়ে ঈদ উদযাপিত হল। আম্মা আমাদের বললেন, লাখ লাখ শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধার ভাগ্যে জোটেনি কোনো ঈদের আনন্দ। তাদের বেদনার ভাগীদার আমাদেরও হতে হবে। [২৪]

প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে না হয় ঈদের কোনো আয়োজন নেই। তাঁর বাসায় তো ঈদের খাবার রান্না হওয়ার কথা- এমনই আশা নিয়ে নজরুল ইসলামসহ কয়েকজন প্রধানমন্ত্রীর বাসায় যান। নজরুল ইসলাম লিখেন-

১৯ নভেম্বর ১৯৭১, জয় বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের বাণী।রহমত আলী সাহেবের সঙ্গে দুপুরের পর তাজউদ্দীন সাহেবের সিআইটি রোডের বাসায় গেলাম। হায় পোড়াকপাল! ঈদের আনন্দ! কোনো আয়োজন ওই বাসায় একবার উঁকিও দেয়নি নীরব-নিস্তব্ধতার পাষাণপুরীতে। রহমত আলী ও আমি একই সঙ্গে ভাবি বলে ডাক দিয়ে বেগম জোহরা তাজউদ্দীনের কাছ থেকে ঈদের এমন আনন্দের দিনে কোনো সাড়াটুকু পাইনি। জ্বরে পুড়ে যাওয়া একমাত্র ছেলেও (সোহেল তাজ) শিয়রে বসা। নির্বাক বেগম জোহরা তাজউদ্দীনের দুচোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। বাসায় চুলোয় হাঁড়ি পর্যন্ত চড়েনি। শুনলাম ঈদের দিনও তাজউদ্দীন সাহেব একবারের জন্যও বাসায় আসেননি। ঈদের দিনে বাসায় কি খাবারের আয়োজন আছে, কিংবা নেই, কী রান্না হবে, ছেলেমেয়েরা খেয়েছে কিনা, স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিমশীতল তাজউদ্দীন আহমেদ এসব চিন্তাভাবনার সঙ্গে একটিবারও নিজেকে জড়িত করার প্রয়োজনীয়তাটুকু পর্যন্ত অনুভব করেননি। তাঁর অফিস থেকে বাসায় একটিবার ফোনও দেননি। সিআইট রোডের একই বহুতল ভবনের অন্য ফ্ল্যাটে সপরিবারে বসবাসরত অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খোন্দকার মোশতাক ও অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর বাসা থেকে ঈদের দিনে কিছু মিষ্টিজাত খাবার তাজউদ্দীন সাহেবের বাসায় পাঠানো হয়েছিল। ছেলেমেয়েরা, রতন আর আফতাব মামা সে সব খাবার ভাগ করে খেয়ে নীরবে শুয়ে রয়েছে। রহমত আলীর শ্যালক রতন জানায়, ভাবি পর্যন্ত  কোনো দানাপানি মুখে দেননি।

... কতক্ষণ অপেক্ষা করার পর শেষে আমরা নীরবে চলে যাওয়ার সময় আমাদের দেখে ভাবি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, রহমত আলী ও নজরুল, গতরাত থেকে ছেলেটার ভয়ানক জ্বর। সে কিছুই খাচ্ছে না। আপনাদের ভাই বাসার কোনো খোঁজ-খবরই নিচ্ছে না। বাসায় কোনো দিন আসেন না। আমরা কি খাই না খাই, কোনো খবর নিচ্ছেন না। আপনাদের ভাইকে বলবেন, যেন বাসায় আসেন। তিনি না আসতে চাইলে আপনারা তাঁকে নিয়ে আসবেন। [২৫]

দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের নেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তাজউদ্দীনের স্ত্রী প্রয়াত জোহরা তাজউদ্দীন জানান-

ঈদের দিন ঈদ করিনি। বাসায় শুধু শাকসবজি রান্না করেছি। বিদেশের মাটিতে কী ঈদ! আমার ছিল এই চিন্তা। অনেকে বলেছে, এটা আমার ঢং। তাতে আমি কিছু মনে করেনি। তাজউদ্দীন ঈদ করেছে রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে। [২৬]

ঈদের দিন বাংলার মানুষ কেমন আছে? মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ তো ঈদে পরিবারের সাথে মিলিত হতে পারছেন না। তো প্রধানমন্ত্রী কিভাবে ঈদের দিন পরিবারের সান্নিধ্যে যান- রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সেই সহমর্মীতা থেকে তাজউদ্দীন পরিবারের কাছাকাছি গিয়েও দেখা করেন নি। পূরণ করেন নি স্ত্রী ও শিশু সন্তানদের আবদার। ঈদের দিন রাতে কুষ্টিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প পরিদর্শনে যাওয়ার পথে তাজউদ্দীন বাসার খুব কাছ দিয়েই গিয়েছিলেন। কিন্তু দেখা করেননি পরিবারের সঙ্গে। নজরুল ইসলাম লিখেন-

সিআইটি রোডে কনভয় (গাড়ির বহর) এগিয়ে যাওয়ার সময় সেই বহুতল ভবনের সন্নিকটবর্তী হলে তাঁর পাশে নিরাপত্তা অফিসার প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদকে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলেন, স্যার বাসায় নামবেন কি? গাড়ি থামাবো? খুব ছোটো করে গম্ভীর কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী জবার দিলেন, নো।

এই পাষণ্ডতা দেখে বিস্মিত ও ব্যথিত হয়েছিলাম। অলক্ষ্যে অন্তরে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ শীতল হয়ে আসছিল। তাজউদ্দীন সাহেব কি মানুষ না অন্য কিছু? তাঁর কী হৃদয় ও মন বলতে কিছু আছে? সারাটা পথে কেবল মনের মধ্যে এ প্রশ্নই বারবার গুমরে উঠেছিল। [২৭]

পশ্চিমবঙ্গ সরকার ঈদের দিন শুভেচ্ছা খাবার পাঠিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের দপ্তরে। কিন্তু আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার জন্য হলেও সে খাবার স্পর্শ করেন নি তাজউদ্দীন। নজরুল ইসলাম লিখেন-

ঈদুল ফিতরের দিন ভারত কিংবা পশ্চিবঙ্গ সরকার তাজউদ্দীন সাহেবের দপ্তরের লোকজনের জন্য বিভিন্ন ফলমূল ও মিষ্টিসহ প্রচুর শুকনো খাবার পাঠানো হয়েছিল। তাজউদ্দীন সাহেব কোনো কিছুই স্পর্শ করেননি। সবই অফিসের লোকজনের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছেন। [২৮]

তাজউদ্দীন অবশেষে ঈদের খাবার খেলেন, কাঁদলেন এবং কাঁদালেন

প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ ঈদের সারাটাদিনই কোনো খাবার মুখে দেননি। অবশেষে খেয়েছেন এ দেশপ্রেমিক, সেটা বাংলার মাটিতে, কুষ্টিয়ার এক জঙ্গলে মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে। অশ্রুভেজা চোখে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে বুকে জড়িয়ে গভীর রাতে স্পর্শ করলেন ঈদের আনন্দকে। পরিবেশটা কেমন আবেগঘন ছিল- সফরসঙ্গী নজরুল ইসলামের স্মৃতিচারণে সেটি স্পষ্ট। তিনি লিখেন-

হঠাৎ এক জঙ্গলের সামনে গিয়ে আমাদের সামনের ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনির জিপটি একপাশে সরে গেল। একজন অফিসার প্রধানমন্ত্রীর দরজার সামনে এসে বললেন, এসে গেছেন স্যার, গাড়ি থেকে নামুন।

প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন পরম শ্রদ্ধাভরে আনন্দাশ্রু মিশ্রিত এক আবেগ-আপ্লুত অনুভূতি নিয়ে পা রাখলেন স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে। সামনেই আমবাগানের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। মিট মিট করে হারিকেন জ্বলছে। ক্যাম্পের অফিসার এসে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদকে অভ্যর্থনা জানালেন। প্রধানমন্ত্রী কোনো প্রটোকলের ধার ধারলেন না। বুকে জড়িয়ে ধরলেন মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে। তারপর ক্যাম্পের ভেতরে গিয়ে একজন একজন করে অফিসার ও মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে আলিঙ্গনে আবদ্ধ হলেন। তাদের সঙ্গে বুক মিলালেন। আমাদের সকলের চোখে আনন্দাশ্রু। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের পরনে পায়জামা, গায়ে সাদা পাঞ্জাবি। চোখে সেই কালো মোটা ফ্রেমের স্বচ্ছ চশমা। মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে এই গভীর রাতে কোলাকুলির ছবি তোলার জন্য ক্যামেরাম্যান সুজিত ক্যামেরার সুইচ টিপে দিলে ফ্লাশগানের ঝলশানো আলোতে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের দুচোখে চিক চিক করে উঠা অশ্রু কারো দৃষ্টি এড়ায়নি। প্রধানমন্ত্রী রুমাল দিয়ে চোখ মুছলেন। আমরা কেউ কেউ চোখের অশ্রু সংবরণ করে রাখতে পারিনি। রাখার চেষ্টাও করিনি।

এটা ছিল কুষ্টিয়া জেলার মুক্ত সীমান্ত এলাকা। ঘন আমবাগানে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। জায়গাটার নাম আমাদেরকে বলা হয়নি।

রুমাল দিয়ে অশ্রু মুছতে মুছতে আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী বললেন, হানাদার বাহিনির দখলকৃত বাংলাদেশের ঘরে আমাদের মা-বোনদের জীবনে আজ ঈদ নেই, ঈদের আনন্দ নেই। বাংলার ঘরে ঘরে আজ ভয়ভীতি, হতাশা কান্নার রোল। পবিত্র ঈদের আনন্দ কেড়ে নিয়েছে নিষ্ঠুর হানাদার বাহিনি। বাংলার প্রতি ইঞ্চি মাটি থেকে এই দস্যুদের উৎখাত করে আমরা মুক্ত বাংলায় ঈদ করবো ইনশাল্লাহ।

ঈদ উপলক্ষে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে কিছু সেমাই রান্না করা হয়েছিল।  তাই এনে দেয়া হলো প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সঙ্গীদেরকে। আমরা খেয়ে নিলাম। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন মিষ্টিজাতীয় কোনো খাবার খেতেন না। তবু কিছু মুখে দিলেন। প্রধানমন্ত্রীর বহরের এক গাড়িতে করে কিছু ফলমূল, বিস্কুট ও বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য কলকাতা থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল। তিনি এসব খাদ্যদ্রব্য মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিতরণ করলেন এবং সারাদিনের জন্য এই কিছু মুখে দিলেন।  ঈদের দিন কলকাতায় সারাদিন বহু অনুরোধ করে কিছু খাওয়ানো যায়নি তাঁকে। তিনি বললেন, আমার মুক্তিযোদ্ধারা কেউ খেতে পায়নি। নিজ জীবনকে বিপন্ন করে ট্রিগার হাতে কোথায় কোন জঙ্গলে বসে রয়েছে। [২৯]

রণাঙ্গনে গেরিলাদের ঈদ :

ঈদ সব মুসলমানের জন্যই একটি বিশেষ দিন। পরিবারে স্বজন বাবা-মা বা অন্য কেউ এই দিনে মারা গেলে, শোকের মাঝেও ঈদের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ‘ঈদের জামাত’এ অংশ নেয় পরিবারের পুরুষ সদস্যরা। আর শিশু-কিশোরদের জন্য তো ঈদ বহু আকাঙ্ক্ষিত দিন। মুক্তিযুদ্ধে গেরিলাদের অধিকাংশই ছিল কিশোর। একাত্তরের পুরো রমজান মাসেও তারা বনে-জঙ্গলে, জলে ও ডাঙায় যুদ্ধ করতে হয়েছে মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করার জন্য। কিন্তু রোজা শেষে ২০ নভেম্বর এল ঈদ। রনাঙ্গনে বসবাস, তারপরও কিশোর মন কি আর বাধ মানে।

 মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সচিব মাহবুব আলম লিখেন-

ঈদ এসে গেল। ছেলেরা ঈদ উৎসব পালনের জন্য ব্যগ্র হয়ে উঠেছে।

... ঈদ মুসলমানদের জন্য প্রধান উৎসবের দিন। জন্ম থেকেই সবাই ঈদ উৎসব পালন করে এসেছে যার যেমন সঙ্গতি, সে অনুযায়ীই। এখানেও যুদ্ধের মাঠে ছেলেরা ঈদ উৎসব পালনের জন্য মেতে উঠেছে। ঈদের নামাজ পড়া হবে না, ঈদের উৎসব হবে না, ভালো খাওয়া-দাওয়া হবে না, ঈদের দিন সবাই হাতিয়ার হাতে শত্রুর অপেক্ষায় ওঁৎ পেতে বসে থাকবে, এরকম একটা কিছু কেউই যেনো মনে থেকে মেনে নিতে পারছে না।

যুদ্ধের মাঠে, দিনরাত ক্লান্তিহীন যুদ্ধ প্রক্রিয়ার ভেতরে ছেলেদের রিক্রিয়েশন বলতে কিছু নেই। দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের একঘেয়ে কাজ। অপারেশন আর যুদ্ধ। এ হাইড আউট থেকে অন্য হাইড আউট। গোলাবারুদ আর হাতিয়ার বয়ে বেড়ানো। ছুটি নেই, আরাম নেই, বিশ্রাম নেই। বড় একঘেয়ে আর বিরক্তিকর জীবন সবার। এরমধ্যে ঈদের উৎসব একটা খুশির আবহ নিয়ে এসেছে।  ছেলেদের এই খুশির ভাগ থেকে বঞ্চিত করতে ইচ্ছে করে না। পিন্টুসহ বসে তাই সিদ্ধান্ত নিই। আর সেটা এ রকমের : ঈদের দিন নামাজ হবে, বড় খানার আয়োজন করা হবে। মোদ্দাকথা, ঈদ উৎসব পালন করা হবে যথাসাধ্য ভালোভাবেই। সে অনুযায়ী পরিকল্পনাও ছকে ফেলে সবাই একসঙ্গে বসে। [৩০]

মাহবুব আলমের নেতৃত্বে গেলিরা যোদ্ধাদের ঈদ ও ঈদের জামাত পালনের সিদ্ধান্ত নিলেও সামনে চলে আসে নিরাপত্তার বিষয়টি। কারণ রমজান যদিও সংযমের মাস। কিন্তু পাকিস্তানি হানাদার বাহিনি সংযমের ধারে-কাছেও ছিল না। বিভিন্ন জায়গায় হত্যা, গণহত্যা, বাড়িঘর লুণ্ঠন ও মা-বোনদেরকে পাশবিক নির্যাতনসহ নানা অপকর্মে লিপ্ত ছিল তারা। তাই গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের রণাঙ্গনে ঈদ পালনে নিরাপত্তার বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সাথে দেখেন কমান্ডাররা। মাহবুব আলম লিখেন-

… একটা গুজব ছড়িয়ে পড়ছে এরকমের যে, ঈদের দিন পাকিস্তানি আর্মি ব্যাপকভাবে হামলা করবে সীমান্ত এলাকা জুড়ে। গুজবটা যেভাবেই ছড়াক, যথেষ্ট বিচলিত করে তোলে আমাদের। মুক্তিযোদ্ধারা যখন ঈদের নামাজের জন্য জামাতে দাঁড়াবে ঠিক সে সময়ই নাকি করা হবে এই হামলা।

যুদ্ধের মাঠে শত্রুবাহিনি সম্ভাব্য কোনো তৎপরতাকেই অবিশ্বাস করা যায় না। ঈদের দিন মুক্তিবাহিনির দল যখন ঈদ উৎসবে মেতে থাকবে, দলবদ্ধভাবে নামাজ পড়তে কোথাও সমাবেত হবে, তখনি সুযোগ বুঝে পাকিস্তানিরা হামলে পড়বে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর। খবর যখন রটেছে, এ ধরনের হামলা তখন পাকিস্তানিদের তরফ থেকে হওয়াটা বিচিত্র কিছু নয়। তাই খুব স্বাভাবিক কারণেই পাকিস্তানি বাহিনির তরফ থেকে এ ধরনের সম্ভাব্য হামলাকে সামনে রেখে আমরা ঈদুল ফিতর উৎসক উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেই...। [৩১]

পাকিস্তানিরা যেখানে সাম্প্রদায়িক ব্যাঘ্রতায় রক্তপিপাসু সেখানে ঈদের জামাত আদায় করতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা রচিত করে অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধের সুনিপুণ উদাহরণ।

 মাহবুব আলম লিখেন-

সিদ্ধান্ত হয়, ঈদের আগের দিন সবগুলো দল দু’ভাগে ভাগ হবে এবং সমাবেত হবে দুই জায়গায়। নালাগঞ্জ আর গোয়াবাড়িতে। ... নামাজ পড়বে একদম সীমান্তের ধার ঘেঁষে। গুয়াবাড়িতে সমবেত ছেলেরা ভারতীয় সীমান্তে উঁচু গড়ের পাদদেশে গিয়ে জামাত পড়বে। নালাগঞ্জে জামাত হবে আমগাছ তলায় পুকুর পাড়ে।

মুসলমান ছেলেরা যখন ঈদের জামাতে দাঁড়াবে, তখন হিন্দু ছেলেরা কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে হাতিয়ার নিয়ে সতর্ক পাহারায় থাকবে। হিন্দু সহযোদ্ধাদের দেয়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে মুসলমান ছেলেরা নামাজ পড়বে। এ সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়া হয় গুয়াবাড়িতে একরামুলের কাছে। সোনাবানে বকর ও শামসুদ্দিনের কাছে। নালাগঞ্জে মুসা আর চৌধুরীও সেভাবেই তৈরি হয়।

হিন্দু ছেলেরা তাদের মুসলামান ভাইদের নামাজের সময় পাহারা দেবার দায়িত্ব পেয়ে যারপরনাই খুশি হয়ে উঠে। ধর্মীয় সংকীর্ণতার উর্ধ্বে এই যুদ্ধের মাঠে জীবনমরণের সবার বসবাস। এক ধর্মের মানুষ ধর্মীয় আচরণ পালন করবে, আর তাদের নিরাপদ রাখার জন্য ভিন্ন ধর্মের মানুষ হাতিয়ার হাতে পাহারা দেবে, আমার কাছে এ অভাবনীয় আর মহান মানবিক ঘটনা বলে মনে হয়। হিন্দু ছেলেদের সংখ্যা বেশি না হলেও ঈদের জামাতের সময় তাদের স্বল্পসংখ্যক সদস্য দিয়েই তারা তাদের মুসলমান ভাইদের কীভাবে নিরাপত্তা বিধান করবে, তার পরিকল্পনায় মেতে উঠে।

... ঈদের দিনের সকাল। উৎসবমুখর পরিবেশ। সবাই আনন্দে উচ্ছল। পাশাপাশি চরম উত্তেজনা পাকিস্তান বাহিনির সম্ভাব্য আক্রমণ হতে পারে। ভরতের নেতৃত্বে ৮/১০ জন হিন্দু ছেলে এগিয়ে খালের পাড়ে গিয়ে অবস্থান নেয়।

সকাল ন’টায় ঈদের জামাত শুরু হয় পুকুর পাড়ে। আমি নিজে দাঁড়াতে এবং লাঠি দিয়ে ধরে চলাফেরা করতে পারলেও নামাজ পড়তে পারি না। ওরা সবাই ঈদগাহের মত জায়গায় পবিত্র মনে নামাজে দাঁড়ায়। আমিও লাঠি ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি জামাতের কাছাকাছি অবস্থানে।

যাহোক, যুদ্ধের মাঠেও আমরা তাহলে নামাজ পড়তে পারছি। গভীর এক প্রশান্তিতে ভরে উঠে মন। সতৃষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে আমি তাকিয়ে থাকি ঈদের জামাতের দিকে। না, শত্রুর হামলা হয়নি। তাই হৈচৈ করে, উৎসবের খাওয়া-দাওয়া নিয়ে আনন্দে আনন্দে গড়িয়ে যায় দিনটি। [৩২]

রণাঙ্গনে ঈদের রান্নাও হয় কোথাও কোথাও। তবে সেটা স্বল্প পরিসরে। একেবারেই সাদা মাটা। অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন অটুট ছিল ঈদের খাবারের মেনুতেও। মাহবুব আলম লিখেন-

... হিন্দু ছেলেরা রয়েছে, সেহেতু গরু চলবে না। গ্রামের বন্ধুরা শুভেচ্ছাস্বরূপ পাঠিয়ে দেয় দেয় ৪টি খাশি। এর মধ্যে ২টি খাসি পাঠিয়ে দেয়া হয় গুয়াবাড়িতে সেখানকার ছেলেদের জন্য।

... জলপাইগুড়ি বাজার খুঁজে সেমাই পাওয়া যায়নি। কথাটা শুনে প্রথমে মনে কেমন ধাক্কা লাগে। বলে কি! সেমাই পাওয়া যায়নি মানে? তারপরই মনে হয়, জলপাইগুড়ি তো আর আমাদের বাংলাদেশের শহর নয়, ইন্ডিয়ার। সেখানে মুসলমান খাবার হিসেবে বিবেচিত সেমাই না পাওয়ার ব্যাপারটিই তো স্বাভাবিক। ঠিক আছে, সেমাই যখন নেই, তখন চাল-দুধ দিয়ে পায়েস করেই ঈদের সকালের মিষ্টির কাজ চালিয়ে নেয়া যাবে। মিনহাজকে সেভাবে মেনু তৈরি করতে বলি। [৩৩]

স্মৃতিকথায় মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক অজয় দাশগুপ্ত লিখেন-

... এ থালাতেই একদিন পড়ল পবিত্র ঈদের বিশেষ খাবার। রমজান মাস কবে এসেছে এবং কত দিন চলছে সে হিসেব অনেকে জানতো না। তবে কেউ রোজা রেখেছেন এবং তারা সেটা তেমন প্রচার করেননি বলে পরে জেনেছি। দেশে অনেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ কামনায় রোজা রেখেছেন নিয়মিত। এটাও জেনেছি পরে। যেসব পরিবারের সন্তান যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে, তাদের প্রায় সবার ক্ষেত্রেই এমনটি ঘটেছিল।

ঈদের দিন উৎসবের দিন। এখানে যুদ্ধাদের জন্য নতুন জামা নিয়ে আসেনি কেউ। অনেকের নিশ্চয়ই মা-বাবার কথা বিশেষভাবে মনে পড়েছে। মায়েরা এদিন ঘরে ঘরে বিশেষ খাবারের আয়োজন করেননি বরং চোখের জল ফেলেছেন। যেমন আমাদের পরিবারে ঘটেছে দূর্গা পূজার দিনগুলোতে। পূজার মধ্যে একদিন বাবা মায়ের কাছে এসেছিলেন বাদল দাশগুপ্ত। সঙ্গে স্বজনদের একটি দল। তারা অনেকে খাবার এসেছিলেন। কিন্তু বাবা মায়ের মন পড়ে আছে রণাঙ্গনে, যেখানে রয়েছে তাদের পুত্র ও জামাতারা।

ঈদের দিন ক্যাম্পে খাসির মাংস মিলেছির জনপ্রতি এক টুকরো। খাবারের সময় মাংস দেয়া হচ্ছে কেনো- সে প্রশ্ন উঠতেই জানা গেল- আজ ঈদ। খুশির ঈদ। খেতে খেতে কেউ কেউ অশ্রুসিক্ত হলো। বাবা মায়ের কথা তাদের মনে পড়েছে। [৩৪]

ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারে ৩৮ মুক্তিযোদ্ধাকে নির্যাতন ও হত্যা :

মানবতা বিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযমের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের ১১তম সাক্ষী ছিলেন শফিউদ্দিন আহমেদ। কুমিল্লা জেলার হোমনা থানার বাসিন্দা ও মুক্তিযোদ্ধা শফিউদ্দিন আহমেদ ১৯৭১ সালের ২৭ অক্টোবর (রমজান মাস) শহিদ সিরু মিয়া দারোগা, তাঁর ছেলে শহিদ কামাল ও দাউদকান্দি থানা বিএলএফ কমান্ডার শহিদ নজরুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় রাজাকারদে হাতে ধরা পড়েন। পরে পাকিস্তানিরা এসে তাদেরকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলে নিয়ে যায়। সেখানে তাদেরকে অকথ্য নির্যাতন করা হয়। ঈদের দিন রাতে জেলে বন্দি ৩৮ জন মুক্তিযোদ্ধাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শহরের পৈরতলা খালে নিয়ে হত্যা করে পাকিস্তানিরা। আর এই হত্যাকাণ্ডে গোলাম আযমের হাত ছিল বলে জানিয়েছেন জেলে বন্দিদের মধ্যে বেঁচে যাওয়া কয়েকজন, যারা গোলাম আযমের বিরুদ্ধে করা মামলার সাক্ষীও ছিলেন।

২০১২ সালের ২৬ অক্টোবর বুধবার আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাব্যুনাল-১ এ গোলাম আযমের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন শফিউদ্দিন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন-

... ২১ নভেম্বর ঈদের দিন রাতে (এত বছর পর স্মৃতিভ্রম হয়ে তিনি ভুলবশত ২১ নভেম্বর উল্লেখ করেন। এটা হবে ২০ নভেম্বর।) পাকিস্তানি সেনাদের গাড়ি আসলে জেলখানার গেট খুলে যায়। নাম ধরে ডেকে ডেকে ৪০ জন বন্দিকে রশি দিয়ে কোমরে বেঁধে গাড়িতে তোলা হয়। একপর্যায়ে ব্রিগেডিয়ার সাদাত উল্লাহ বলেন, ‘ফেরেশতাকে ছোড় দো’। তখন আমাকে বাঁধন খুলে ৪ নম্বর সেলে ঢুকিয়ে দেয়। ওই চার নম্বর সেলে আমার সঙ্গে আরও একজনকে ঢোকানো হয়, যার নাম অনন্ত সিং। তিনি ভারতের সেনা সদস্য। পাকিস্তানি সেনারা তাকে সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন সকালে শুনি ৩৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে। [৩৫]

শফিউদ্দিন ১৯৭১ সালে করাচিতে লেখাপড়া করতেন। সেই সুবাধে ব্রিগেডিয়ারের সাথে তাঁর পরিচয় ছিল কিনা- তা জানা যায়নি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা হানাদার মুক্ত হওয়ার পর শফিউদ্দিন ছাড়া পান। এর বেশ কয়েকবছর পরে ঢাকার মতিঝিলে চিনু মিয়া নামে একজনের সঙ্গে দেখা হয় তাঁর। হত্যার জন্য জেল থেকে বের কয়ে নিয়ে যাওয়া ৩৮ জন মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে চিনু মিয়াও ছিলেন। সেদিন গুলিবিদ্ধ হয়েও লাশের নিচে পড়ে ভাগ্যক্রমের বেঁচে যান তিনি। মতিঝিলে সাক্ষাতের দিন চিনু মিয়া শফিউদ্দিনকে জানান, ৩৮ জনকে হত্যা করা হয় পৈরতলা খালের পাশে। সেখানেই শহিদদেরকে মাটিচাপা দেয়া হয়।

জেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজাকার পেয়ার মিয়া বন্দি মুক্তিযোদ্ধাদেরকে অনেক মারধরে করেছিল। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষি হিসেবে শফিউদ্দিন ট্রাইব্যুনালকে আরও জানান-

আমি যে পেয়ার মিয়ার কথা বলেছি, তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। জেল থেকে বের হওয়ার পর জানতে পারি, পেয়ার মিয়া শান্তি কমিটির লোক ছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সিরু মিয়া দারোগার স্ত্রীর কাছে জানতে পারি, তিনি তাঁর স্বামী ও সন্তানকে বাঁচাতে গোলাম আযমের কাছে চিঠি নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু তাঁকে বাঁচানো যায়নি। [৩৬]

 গোলাম আযমের বিরুদ্ধে করা অনেকগুলো অভিযোগের মধ্যে পঞ্চম অভিযোগে হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়। সেখানে উঠে আসে ঈদের রাতে ৩৮ জনকে হত্যার ইতিহাস। ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই (এদিন গোলাম আযমের মামলার রায় দেয়া হয়।) দৈনিক যায়যায় দিন পত্রিকার রিপোর্টে পঞ্চম অভিযোগ উল্লেখ করে লেখা হয়-

... স্বামী-সন্তানের ধরা পড়ার খবর পেয়ে সিরু মিয়ার স্ত্রী গোলাম আযমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সিরু মিয়ার ভগ্নিপতি ছিলেন গোলাম আযমের দুই ছেলে আজমী ও আমীনের শিক্ষক। তিনি গোলাম আযমের কাছে সিরু মিয়া ও তাঁর ছেলেকে মুক্তি দিতে অনুরোধ জানান। গোলাম আযম ব্রাহ্মণবাড়িয়া শান্তি কমিটির নেতা পেয়ারা মিয়ার কাছে একটি চিঠি পাঠান, যাতে সিরু মিয়া ও তাঁর ছেলেকে হত্যার নির্দেশ ছিল। চিঠি পাওয়ার পর ঈদের দিন রাতে সিরু মিয়াসহ ৩৯ জনকে পাকিস্তানি সেনারা রাজাকার ও আলবদরদের সহযোগিতায় কারাগার থেকে বের করে নিয়ে পৈরতলা রেলব্রিজের কাছে নিয়ে যায়। সেখানে পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে ৩৮ জন মারা গেলেও একজন প্রাণে বেঁচে যান। [৩৭]

ঈদের পর দিন কামাল ও তাঁর বাবাকে আনোয়ারা বেগমের কাছে ফিরিয়ে দিবেন বলেছিলেন গোলাম আযম। কিন্তু বাস্তবে ঘটল সম্পূর্ণ বিপরীত ঘটনা। ফিরিয়ে দেয়া হল কামালের রক্তাক্ত জামাকাপড়। একান্ত সাক্ষাৎকারে শহিদ কামালের মা আনোয়ারা খাতুন বলেন- ... ঈদের কিছুদিন আগে কামাল এক লোককে দিয়া গোপনে আমার কাছে চিঠি লেইখা পাঠায়। চিঠিটা লেখছিল সিগারেটের ঠোঙার ভিতরে। ঐ লোকটা চিঠিটা হোমনায় রামকৃষ্ণপুর আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসে। তখন তো আমি বাড়িতে নাই। ঢাকা আসছি গোলাম আযমের সঙ্গে দেখা করতে।

... ঈদের আগে আমার ভাইরে পাঠাইছিলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলে। গোলাম আযমের চিঠিটাও নিয়ে গিয়েছিল আমার ভাই। কিন্তু চিঠির ভিতরে কি লেখা ছিল- তা খুলে দেখে নাই। চিঠি পাইয়া অরা বলল, আমার স্বামী সিরু মিয়া দারোগাকে ছাড়া হবে না। কামালকে ছেড়ে দেবে। আরও বলল, ঈদের দিন বা ঈদের পরের দিন যেনো কামালকে এসে নিয়ে যায়।

কামালকে আনতে ঈদের পরের দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া পাঠাই আমার ভাই ফজলুকে। কিন্তু... (কান্না) কামালকে তো দেয় নাই। কামালের জামা-কাপড় দিছে। আমার স্বামীসহ সবাইরে রাত্রেই মাইরা ফেলছে ... (কান্না)। আমার বুক ত ছিঁড়া গেছে। আমি কই, যেহানো মারছে, আমি সেহানো যামু। আমারে সবাই ধইরা রাখছে যাইতে দেয় নাই। ... কিছু দিন আগে কামালের চিঠি ও জামাকাপড় পুলিশ জাদুঘরের লোকজন নিয়ে গেছে। আমি দিতে চাই না, কইছে, যন্তে থাকবো। তাই দিছি। [৩৮]

 ছেলের জন্য মায়ের অপেক্ষার বর্ণনায় সাবেক সচিব ও মুক্তিযুদ্ধকালীন সাংবাদিক মুসা সাদিক লিখেন-

কামালের মা বুক বেঁধে দিন গুনে গুনে, আয়তাল কুরসি পড়ে সময় কাটায়। কখন আসে ঈদের পরেরদিন। কখন দেখবেন তিনি তাঁর কলিজার টুকরা কামালকে। কখন শুনবেন সন্তানের মুখে মা ডাক।

ঈদুল আজহার (লেখক ভুলবশত ঈদুল আজহা লিখেছেন। প্রতিবেদনটি ১৯৮৩ সালের ১২ ডিসেম্বর দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত হয়।) পরেরদিন যথারীতি কামালের মামা যান কুমিল্লায়। তিনি পৌঁছালে কামালের বাবার ও কামালের কাপড়গুলো তার হাতে তুলে দেয়া হয়। ডেনমার্কের কিং ক্লডিয়াস হ্যামলেটকে কি পত্র দিয়ে সমুদ্র বক্ষে জাহাজ ভাসাতে বললেন? গোলাম আযমের ভরসাপূর্ণ সেই পত্রে কি ছিল? সেই পত্রে ছিল স্বামী ও পুত্রের কাপড় ফেরত দেয়ার নির্দেশ। স্বামী হারা বধূকে, সন্তানহারা জননীকে দয়া ভিক্ষা দেয়ার নামে এই নিষ্ঠুর আনন্দ, এই বিশ্বে কেউ কি শুনেছে কখনো? [৩৯]

একইসঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলে বন্দি ছিলেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত জনপ্রিয় সুরকার ও গীতিকার এবং মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। গোলাম আযমের মামলার ১৪তম সাক্ষী হিসেবে তাঁর বর্ণনা আরও হৃদয়বিদারক। তিনি বলেন-

পৈরতলায় ৩৮ শহিদকে মাটিচাপা দেয়ার স্থান। এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পৈরতলা রেলব্রিজের পাশে অবস্থিতরোজার ঈদের দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলের দরজা খুব জোরে শব্দ করে খুলে যায়। আমরা সকলে চমকে উঠি। জেলে ভেতরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনির প্রবেশ করে খুব উচ্চস্বরে লাইন আপ, লাইন আপ বলে চিৎকার করে। আমরা এ শব্দটির সাথে পরিচিত ছিলাম। ওই কথা শুনে আমরা জেলের গারদ থেকে বেরিয়ে কংক্রিটের মেঝেতে লাইন দিয়ে বসে পড়ি। সেখানে ক্যাপ্টেন আরী রেজা এবং লে. ইফতেখারকে দেখতে পাই। এরপর ব্রিগেডিয়ার সাদুল্লাহ এবং অনেক রাজাকারসহ পেয়ারা মিয়াকে দেখতে পাই। ক্যাপ্টেন আলী রেজা আঙ্গুল তুলে একজন একজন করে দাঁড় করাতে থাকেন। আমাকে একা রেখে এভাবে ৪৩ জনকে দাঁড় করায়।
তখন আমি ভেবেছিলাম, এখনই বুঝি আমাকে হত্যা করা হবে। আমি সাহস করে ব্রিগেডিয়ার সাদুল্লাহকে প্রশ্ন করি, আমাকে নাকি ওদেরকে মারবে। সাদুল্লাহ তখন আমার হাত ধরে বলে, ‘আজকের দিনটা কত পবিত্র জানো? আজ এই দিনে কোনো মানুষকে হত্যা করা হলে সরাসরি আল্লাহর কাছে চলে যাবে।’এ সময় আমি জিজ্ঞেস করি, তবে এই ৪৩ জনকে হত্যা করবেন? সাদুল্লাহ হাসিমুখে ‘সেটা করবো’বলে জানান।

এ সময় আমি তাকে আমার সঙ্গে থাকা মানিক, মাহবুব, খোকাকে আমার সঙ্গে রাখতে বলে আমাকে মারা হবে কিনা জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, যেহেতু দুইদিন পর আমাকে ধরা হয়েছে, এজন্য আরও দুই দিন পর আমাকে মারা হবে। ... তখন তিন জনকে আলাদা করে রাখা হয়।

এরপর আমি নজরুল ভাইয়ের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, আপনি তো পালিয়ে গেলেন না। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, আমার কিছু বলার নেই রে। এই লুঙ্গিটা আমার মায়ের কাছে পৌঁছে দিস। একটি সিগারেটের টুকরা দেখিয়ে সেটিও দিতে বলেন।

কামালের বাবা সিরু মিয়া দারোগা বারবার কাঁদছিলেন। তখন কামাল তার বাবাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে বলে, বুলবুল, যদি কোনো দিন রাস্তায় কোনো পাগলিকে দেখিস, তাহলে মনে করিস, ওটাই আমার মা।

নজরুল বলেছিলেন, যখন কোনো পাকিস্তানি আর্মি দেখবি, একটা করে মাথায় গুলি করবি। কুমিল্লার বাতেন ভাই তার গায়ের চাদরটি আমাকে দিয়ে দিয়েছিলেন। সে চাদর দিয়ে আমি প্রত্যেকের চোখের পানি মুছে দিয়েছিলাম। [৪০]

ঈদের দিনে শহিদ আশফাকুস সামাদ বীর উত্তম :

শহিদ আশফাকুস সামাদের পুরো নাম আবু মঈন মো. আশফাকুস সামাদ। পৈত্রিক বাড়ি ফরিদপুরে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ছাত্র ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে আশফাকুস সামাদ ব্যাপক রণ-কৌশলী পারদর্শীতা দেখান। যুদ্ধ চলাকালীন সময়েই ৯ অক্টোবর কমিশন লাভ করেন তিনি। দায়িত্ব পান ৬ নং সেক্টরের সাহেবগঞ্জ সাব-সেক্টরের একটি কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে। কমান্ডার হিসেবে তিনি বর্তমান কুড়িগ্রাম জেলার জয়মনিরহাট, ভুরুঙ্গামারী ও রায়গঞ্জ যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি ভুরুঙ্গামারী এবং আশেপাশের এলাকা শত্রুমুক্ত করে মুক্তাঞ্চল গঠন করেন।

মুক্তিযোদ্ধারা ২০ নভেম্বর (ঈদের দিন) রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনির শক্ত ঘাঁটি রায়গঞ্জ আক্রমণ করে। সে রাতে শত্রুবাহিনির ভারি অস্ত্রের প্রতি আক্রমণে দুর্বল হয়ে পড়ে আশফাকুস সামাদের কোম্পানি। সৈনিকদের নিরাপদ অবস্থানে সরে যাওয়ার জন্য আশফাকুস সামাদ নিজে মেশিনগান চালাতে থাকেন। ফলে তাঁর সৈনিকরা কাভারিং ফায়ারের সাহায্যে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে সক্ষম হয়। এক পর্যায়ে শত্রুবাহিনির গুলি এসে বিদ্ধ হয় আশফাকুস সামাদের মাথায়। শহিদ হন বাংলা মায়ের এই বীর সন্তান। [৪১]

তথ্যসূত্র :

১। একাত্তরের ডায়েরি, নাজনীন সুলতানা নিনা, মিজান পাবলিশার্স, ঢাকা, তৃতীয় প্রকাশ- সেপ্টেম্বর ২০১২। পৃষ্ঠা : ৭৮-৮৭।

২। একাত্তরের দিনগুলি, জাহানারা ইমাম, সন্ধ্যানী প্রকাশনী, ঢাকা, ৪০তম মুদ্রণ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, পৃষ্ঠা : ২৪৪।

৩। প্রাগুক্ত, একাত্তরের ডায়েরি।

৪। দৈনিক ইত্তেফাক, ০৩ অক্টোবর, ২০১৪।

৫। গৌরবের একাত্তর এবং, জেবুননেছা জেবু, প্রকাশক- বাংলার ধরিত্রী, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০১৭, পৃষ্ঠা : ৩২।

৬। মুক্তিযুদ্ধের ঈদ, সংকলন ও সম্পাদনা- আনোয়ার কবির, ঢাকা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, পৃষ্ঠা : ৬০ ৬৫।

৭। আত্মস্মৃতি, আবু জাফর শামসুদ্দীন, ঢাকা, সাহিত্য প্রকাশ, দ্বিতীয় পরিবর্ধিত সংস্করণ, জানুয়ারি ২০১৬, পৃষ্ঠা : ৫৯৭ থেকে ৫৯৯।

৮। মুক্তিযুদ্ধের ঈদ, সংকলন ও সম্পাদনা- আনোয়ার কবির, ঢাকা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, পৃষ্ঠা : ১৬ ও ১৭, ১৮।

৯। স্মৃকিথায় একাত্তরের ঈদ, গ্রন্থনা- কাজী জাহিদুল হক ৬ষ্ঠ বর্ষপূর্তি ও ঈদ ম্যাগাজিন ২০১৬, বাংলা নিউজ টোয়েন্টিফোর.কম, ঢাকা, পৃষ্ঠা- ৪২।

১০। প্রাগুক্ত, স্মৃকিথায় একাত্তরের ঈদ, পৃষ্ঠা- ৪১ ও ৪২।

১১। প্রাগুক্ত, স্মৃকিথায় একাত্তরের ঈদ, পৃষ্ঠা- ৪৩।

১২। প্রাগুক্ত, মুক্তিযুদ্ধের ঈদ, ইসলামী ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা- ১১৭। এবং

এবং ‘কেমন ছিল মুক্তিযুদ্ধে ঈদের দিন’ শীর্ষক পোস্ট, ওয়েব লিংক : http://www.somewhereinblog.net/blog/AahmadIstiak/30155787

১৩ । নিবন্ধ- চাঁদ তুমি ফিরে যাও, ফারুক ওয়াহিদ, বাংলা নিউজ টোয়েন্টিফোর.কম, ৮ জুলাই ২০১৬।

১৪। প্রাগুক্ত, স্মৃকিথায় একাত্তরের ঈদ,পৃষ্ঠা- ৪১।

১৫। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র, ৫ম খণ্ড, তথ্য মন্ত্রণালয়, হাক্কানী পাবলিশার্স, ঢাকা, পুনর্মুদ্রন- জুন ২০০৯, পৃষ্ঠা- ২৮৮-২৮৯।

১৬। প্রাগুক্ত- বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র, ৪ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৬৫৮।

১৭। ৭১ এর দশমাস, রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী, কাকলী প্রকাশনী, ঢাকা, প্রকাশ-আগস্ট ২০০৭, পৃষ্ঠা: ৫০৭ ও ৫০৯।

১৮। প্রাগুক্ত, একাত্তরের দশমাস।

১৯। স্বাধীনাতা আমার রক্তেঝরা দিন, বেগম মুশতারি শফি, অনুপম প্রকাশনী, ঢাকা, পঞ্চম সংস্করণ, জানুয়ারি ২০০৬, পৃষ্ঠা- ২৭৮ ও ২৭৯।

২০। গ্রাগুক্ত- স্বাধীনাতা আমার রক্তেঝরা দিন।

২১। প্রাগুক্ত- মুক্তিযুদ্ধের ঈদ, পৃষ্ঠা- ২৮ থেকে ২৯।

২২। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে আগরতলা ত্রিপুরা- দলিলপত্র, সংগ্রহ, সংকলন ও সম্পাদনা- সুকুমার বিশ্বাস, ঢাকা, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, তৃতীয় সংস্করণ মে ২০১৩, পৃষ্ঠা- ৭৪২।

২৩। প্রাগুক্ত- মুক্তিযুদ্ধের ঈদ, পৃষ্ঠা- ১৮।

২৪। তাজউদ্দীন আহমেদ- নেতা ও পিতা, শারমিন আহমেদ, ঢাকা, ঐতিহ্য প্রকাশন, পেপারব্যাক সংস্করণ- ডিসেম্বর ২০১৪, পৃষ্ঠা- ১৯।

২৫। প্রাগুক্ত- মুক্তিযুদ্ধের ঈদ, পৃষ্ঠা- ১৯।

২৬। ইতিহাসের সত্য সন্ধ্যানে : বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মুখোমুখি, সম্পাদনা- মতিউর রহমান, ঢাকা, প্রথমা প্রকাশন, দ্বিতীয় সংস্করণ- এপ্রিল ২০১৭, পৃষ্ঠা- ৬২।

২৭। প্রাগুক্ত- মুক্তিযুদ্ধের ঈদ, পৃষ্ঠা- ২৩।

২৮। প্রাগুক্ত- মুক্তিযুদ্ধের ঈদ, পৃষ্ঠা- ২০।

২৯। প্রাগুক্ত- মুক্তিযুদ্ধের ঈদ, পৃষ্ঠা- ২৫ থেকে ২৭।

৩০। গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধে, দ্বিতীয় খণ্ড, মাহবুব আলম, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা, তৃতীয় সংস্করণ নভেম্বর ২০০৮, পৃষ্ঠা- ৩৯৮ থেকে ৩০০।

৩১। গ্রাগুক্ত, গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধে।

৩২। গ্রাগুক্ত, গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধে।

৩৩। গ্রাগুক্ত, গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধে।

৩৪। একাত্তরের ৭১, অজয় দাশগুপ্ত, ঢাকা, আগামী প্রকাশনী, তৃতীয় বর্ধিত সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, পৃষ্ঠা- ১৪৫ থেকে ১৪৬।

৩৫। banglanews24.com, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১২, লিংক : http://www.banglanews24.com/national/news/bd/141358.details

৩৬। প্রাগুক্ত- শফিউদ্দিনের সাক্ষ্য।

৩৭। দৈনিক যায়যায় দিন, ১৫ জুলাই ২০১৩, ওয়েব লিংক : http://www.jaijaidinbd.com/?view=details&archiev=yes&arch_date=15-07-2013&type=single&pub_no=541&cat_id=1&menu_id=13&news_type_id=1&index=0

৩৮। শহিদ জননী ও জায়া আনোয়ারা বেগমের সাক্ষাৎকার, সাক্ষাৎকারগ্রহণ : ২৪ মে ২০১৭।

৩৯। কুমিল্লার মর্মসম্পর্শী ঘটনা, মুক্তিযুদ্ধে হৃদয়ে মম, মুসা সাদিক, প্রকাশক- হাবিব-ই-আকবর মাহমুদ এবং মায়মুন হাসি বব মুনাজ, ঢাকা, দ্বিতীয় সংস্করণ- ডিসেম্বর ১৯৯৫, পৃষ্ঠা : ১৬১-১৬৫।

৪০। সাক্ষ্য দিতে কাঁদলেন, কাঁদালেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, ওয়েব লিংক : http://www.banglanews24.com/national/news/bd/143093.details#3

৪১। বাংলা পিডিয়া, লিংক : http://bn.banglapedia.org/index.php?title=%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A6,_%E0%A6%86%E0%A6%B6%E0%A6%AB%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A7%81%E0%A6%B8


 

আরো পড়ুন-

নারীবাদীর পুত্রসন্তান যেভাবে গড়ে তুলবেন

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

লাইভ

টপ