লজ্জা ও নিষিদ্ধ লজ্জার দুই যুগ

Send
এমরান কবির
প্রকাশিত : ১৪:৫৭, জুলাই ১১, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:২৫, জুলাই ১১, ২০১৭

 



১৯৯৫ সালের ১৯ নভেম্বর বাংলাদেশ সরকারের এক আদেশপত্রের মাধ্যমে হুমায়ুন আজাদের নারী গ্রন্থটি নিষিদ্ধ ঘোষণার পর রাজু আলাউদ্দীনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে লেখক বলেছিলেন, ‘কোনো গ্রন্থকেই নিষিদ্ধ করা যায় না।’ বিশ্বব্যাপী নিষিদ্ধ গ্রন্থের ইতিহাস এবং পরিণতি পর্যালোচনা করে দেখা যায় সেগুলোর প্রচার, প্রসার, পঠন, সংরক্ষণ কোনোটাই রহিত করা যায়নি। বরং নিষিদ্ধ ঘোষিত হবার সাথে সাথেই সেগুলো পেয়ে যায় ব্যাপক প্রচার। তখন পাঠক অপাঠক সবাই পড়তে উদ্যত হয়। প্রকাশ্যে পড়ার সাধারণ মজা তখন পরিণতি পায় নিষিদ্ধের উল্লাসে। গ্রন্থটির প্রভাবও হয়ে ওঠে প্রবল। জ্ঞাতে অজ্ঞাতে প্রভাবিত হতে থাকে সমাজ। সমাজ হয়তোবা কখনোই সচেতনভাবে এই প্রভাব নিয়ে ভাবেনি। কিন্তু প্রভাবিত হয়েছে ঠিক ঠিকই। সেটা নিষিদ্ধ হোক আর না হোক। কারণ একটি প্রকৃত গ্রন্থ সমাজকে, সমাজের প্রচলিত ভাবনাকে প্রভাবিত করেই। বহিরাঙ্গিকে, মানস গঠনে, মূল্যবোধ রচনায় রাখে বিশেষ ভূমিকা। কিন্তু সমাজ যেমন স্বীকার করেনি এর প্রভাব, সমাজ যেমন স্বীকার করে না এর মূল্য তেমনি প্রশাসনও স্বীকার করেনি তাদের হীনম্মন্যতা, প্রশাসনও স্বীকার করে না তাদের হীনম্মন্যতা।
একদা নিষিদ্ধ, পরে আইনি লড়াইয়ে জিতে গেছে এরকম গ্রন্থের উদাহরণ খুব বেশি পাওয়া যায় না। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকা সত্বেও অসংখ্য গ্রন্থ রয়েছে যেগুলো যে দেশে বা যে রাজ্যে বা যে কমুনিটিতে একদা নিষিদ্ধ হয়েছিল সেখানেই পঠিত হয়েছে ব্যাপক। বাংলাদেশে একমাত্র ‘নারী’ গ্রন্থটি, ভারতে সমরেশ বসুর ‘প্রজাপতি’ উপন্যাসটির মতো দুই একটা উদাহরণ পাওয়া যায় যেখানে আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছে। এর বাহিরে রয়েছে বিশাল উদাহরণ যেগুলো নিষিদ্ধাবস্থাতেই সমাজ গ্রহণ করেছে, প্রভাবিত হয়েছে, আদর্শে মেনেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কাজী নজরুল ইসলামের ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশি’; আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘সত্যের মতো বদমাশ’, বুদ্ধদেব বসুর ‘রাত ভ’রে বৃষ্টি’, তসলিমা নাসরিনের ‘লজ্জা’, ‘আমার মেয়েবেলা’, ‘উতল হাওয়া’, হুমায়ুন আজাদের ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’; বিশ্ব সাহিত্যের দিকে তাকালে জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’, জন স্টেইনবেকের ‘দ্য গ্রাপস অব রেথ’ ও ‘অব মাইস এন্ড মেন’; টনি মরিসনের ‘দ্য ব্লুয়েস্ট আই’, উইলিয়াম ফকনারের ‘অ্যাজ আই লে ডাইং’, কবি সিলভিয়া পাথের আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘দ্য বেল জার’, মায়া অ্যাঞ্জেলুর ‘আই নো হোয়াই দ্য ক্যাজেড বার্ড সিংস’, নাদিন গর্ডিমার ‘বার্গারস ডটার’, ড্যান ব্রাওনের ‘দি দ্য ভিঞ্চি কোড’, সালমান রুশদির ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’, জর্জ অরওয়েলের ‘অ্যানিমেল ফার্ম’, এরিখ মারিয়া রেমার্কের ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’, ভ্লাদিমির ‘নবোকভের লোলিটা’, ফ্রানস কাফকার ‘মেটামরফসিস’, ডেভিড হারবার্ট লরেন্সের ‘লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার...’। এ তালিকা দীর্ঘ হতেই থাকে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমার সংগ্রহে থাকা বইরাশির মধ্যকার একটা অংশ নিষিদ্ধে ভরা। যখন বইগুলো সংগ্রহ এবং পাঠের তাগিদ অনুভব করি তখনো জানা ছিল না এগুলোর নিষিদ্ধের কথা। আমার ধারণা নয় প্রবল বিশ্বাস যে, অধিকাংশ পাঠকের সেলফ এখনো শোভাবর্ধন করে থাকে উপর্যুক্ত গ্রন্থগুলোর এক বিরাট অংশ।
তাহলে কি দাঁড়ালো? বই কি সত্যি সত্যি নিষিদ্ধ করা গেলো?
গেলো না। কিন্তু কেন নিষিদ্ধ করা হয় বই? যারা নিষিদ্ধ করে তারা অবশ্য প্রকাশ্য একটা কারণ দেখায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সে কারণগুলোকে অজুহাত মনে হয়। মাঝে মাঝে সে অজুহাত এতই দুর্বল থাকে যে হাস্যকর লাগে।
যেমন– নারী গ্রন্থের নিষিদ্ধকরণের আদেশপত্রে বলা হয়, ‘পুস্তকটিতে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতি তথা মৌলিক বিশ্বাসের পরিপন্থী আপত্তিকর বক্তব্য প্রকাশিত হওয়ায় সরকার কর্তৃ ফৌজদারি কার্য বিধির ৯৯ (ক) ধারার ক্ষমতাবলে বর্ণিত পুস্তকটি বাজেয়াপ্ত হইল।’ বিশ্বসাহিত্যের দিকে তাকালে দেখা যায় ড্যান ব্রাউনের ‘দি দ্য ভিঞ্চি কোড’ (২০০৩) নিষিদ্ধ হয় লেবাননে, ক্রিশ্চিয়ানিটির ওপর আঘাত হানার অজুহাতে, জর্জ অরওয়েলের ‘অ্যানিমেল ফার্ম’ (১৯৪৫) কেনিয়ায় নিষিদ্ধ হয় ১৯৯১ সালে, কারণ এতে ছিলো দুর্নীতিগ্রস্থ নেতাদের সমালোচনা। বইটি ২০০২ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্কুলে নিষিদ্ধ হয়। উপন্যাসটি রাজনৈতিক হলেও নিষেধাজ্ঞায় বলা হয়, এতে এমন কিছু রয়েছে যা ইসলাম এবং আরব মূল্যবোধের বিরুদ্ধে যায়। এরিখ মারিয়া রেমার্কের উপন্যাস ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ (১৯২৯) নিষিদ্ধ করেছিল সে সময়ের জার্মান সরকার, নাজিদের ডিমোর‌্যালাইজড করার অনুহাতে, জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’ (১৯২২) নিষিদ্ধ হয় সেক্স কনটেন্টের জন্য ১৯৩৩ সালে বৃটেনে। নাদিন গার্ডিমারের ‘বার্গারস ডটার’ (১৯৭৯) প্রকাশের বছরই নিষিদ্ধ করা হয় আফ্রিকার সরকার– বর্ণবাদের বিরুদ্ধ চারণের জন্য। অবসিনিটির অজুহাতে জন ক্লেল্যান্ডের ‘ফ্যানি হিল’ (১৭৪৯) আমেরিকায় নিষিদ্ধ হয় ১৮২১ ও ১৮৬৩ সালে, ‘লোলিটা’ (১৯৫৫) নিষিদ্ধ হয়েছিল অবসিনিটির কারণ দেখিয়ে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, অার্জেন্টিনা, নিউজিল্যান্ড আর সাউথ আফ্রিকায়। গুস্তাভ ফ্লবেয়ারের ‘মাদাম বোভারি’ (১৮৫৭) জনসাধারণের নৈতিক স্খলনে উৎসাহের অজুহাত দেখিয়ে নিষিদ্ধ করা হয়। ফ্রান্স কাফকার ‘মেটামরফোসিস’ (১৯১৫) নাজি ও কম্যুনিস্ট কর্তৃক নিষিদ্ধ হয়। উইলিয়াম ফকনারের ‘অ্যাজ আই লে ডাইং’ (১৯৩০) বইটি নিষিদ্ধ হয়েছিল এর ভাষা আর খ্রীষ্টধর্ম বিরোধী বক্তব্যের কারণে। মার্গারেট অ্যাটেউড এর উপন্যাস ‘দ্য হ্যান্ডমেইড টেল’ নিষিদ্ধ হয় খ্রীষ্টধর্ম বিরোধী অশ্লীলতার কারণে। নরাত্মারোপিত প্রাণীরা মানুষের মতো আচরণ করছে এই অভিযোগ তুলে লিউস ক্যারোলের ‘অ্যালিস অ্যাডভ্যানচার ইন ওন্ডারল্যান্ড’ গ্রন্থটিকে নিষিদ্ধ করা হয়। জার্মান সশস্ত্র বাহিনি ভারম্যাকটকে সমালোচনা করার জন্য এরিখ মারিয়া রিমার্কের ‘অল কোয়াইট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ নিষিদ্ধ হয়। অশ্লীলতার অভিযোগে ভলতেয়ারের ‘দ্য ক্যানডিড’, বলশেভিক পার্টির সমালোচনা করার জন্য বরিস পাস্তেরনাকের ‘ডক্টর জিভাগো’, অশ্লীলতার অভিযোগে অ্যালেন গিন্সবার্গের ‘দ্য হাউল’, যশবন্ত শিং-এর জিন্নাহ; ইন্ডিয়া পার্টিশন ইনডিপেনডেন্স- মদ ও শুকুরের মাংশের প্রতি জিন্নাহর পছন্দের বিষয়টি উল্লেখ থাকায় পাকিস্তানে নিষিদ্ধ হয়। স্ট্যানলি ওলপার্টের ‘জিন্নাহ অব পাকিস্তান’, নোয়াম চমস্কির রাজনীতি বিষয়ক গ্রন্থ ‘ইয়ার ৫০১ দ্য কনকোয়েস্ট কন্টিনিউ’ গ্রন্থটিও নিষিদ্ধ হয় একই অজুহাতে। অরুন্ধতি রায়ের ‘গড অব স্মল থিংস’ (১৯৯৬) খ্রিস্টান মহিলার সঙ্গে নিম্নবর্গের হিন্দুর যৌনকর্মের বর্ণনার অভিযোগে ভারত সরকার নিষিদ্ধ করে।
কিন্তু সবকিছুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, পৃথিবীর সকল নিষেধাজ্ঞাকে অস্বীকার করে নিষিদ্ধ গ্রন্থগুলো প্রবেশ করে সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্দর মহলে, জায়গা করে নেয় অন্তরে, ভাবিত হয় মস্তিষ্কে, প্রভাব রাখে সমাজ বদলে। তাইতো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মাঝে মাঝে ঘটা করে মেলা বসে শুধুই নিষিদ্ধ গ্রন্থের। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, গ্রন্থ নিষিদ্ধ করে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা। কখনো সারাদেশে কখনো নির্দিষ্ট এলাকায়। কখনো সাময়িক কখনো চিরস্থায়ী। কিন্তু একটি গ্রন্থ যদি আলোঘর হয়ে ওঠে তখন তাকে কোনো কিছু দিয়েই আটকানো যায় না। নিষেধাজ্ঞা এই প্রবাহকে ত্বরান্বিত করে মাত্র। স্থিমিত করতে পারে না।
আবার এমনও হয়েছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতদিন নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকার জন্য অনুশোচনা করেছে সংশ্লিষ্ঠ সংস্থা। আলেক্সন্দর সোলঝেনিৎসিনের ‘দ্য গুলাগ অর্কিপিল্যাগো’ (১৯৭৩) সোভিয়েত সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার অভিযোগে নিষিদ্ধ হয়। ২০০৯ সালে রাশিয়া সরকার এই নিষেধজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। শুধু তাই নয় রাশিয়ার শিক্ষা মন্ত্রণালয় হাইস্কুল কারিকুলামে বাইটি অন্তর্ভুক্তও করে। নাদিন গর্ডিমারের উপন্যাস ‘জুলাই’স পিপল’ (১৯৮১) দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার নিষিদ্ধ করলেও এখন সেদেশের স্কুলের পাঠ্যসূচীতে জায়গা করে নিয়েছে।

দেখা যাচ্ছে অধিকাংশ গ্রন্থই নিষিদ্ধ করা হয় অশ্লীলতার অভিযোগে। কিন্তু অশ্লীলতা যে কী জিনিস তা এখনো স্পষ্ট নয়। ১৯৮৫ সালের ২৬ অক্টোবর দেশ পত্রিকায় চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘এক সমাজের নীতিবোধ যা বিপজ্জনক রকমে সংক্রামক, অশ্লীল এবং বর্জনীয়- অন্য সমাজে তাকেই শ্রেষ্ঠ কীর্তির মুকুট পরিয়েছে।’ ১৯৪৮ সালে অশ্লীলতার প্রশ্নে একটি মামলা আদালত পর্যন্ত গড়ালে আমেরিকার বিচারপতি কুটিক রক রায়ে উল্লেখ করেছিলেন, ‘কোনো বইয়ের প্রচার নিষিদ্ধ না করে তাকে বরং জনমতের সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে থাকার সুযোগ দেয়া উচিৎ। (দূরের বইঃ চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়)। এ প্রসঙ্গে অন্নদাশঙ্কর রায়ের একটি বক্তব্য উল্লেখ্য মনে করি। তিনি বিনুর বই- এ বলেছেন, ‘কৌতূহলই নিষিদ্ধ বইয়ের মূল্য বাড়িয়ে দেয়। নিষেধ তুলে নিলে দেখা যায় বইখানা সত্যি এমন কিছু মূল্যবান নয়। কৌতূহল মিটে গেলে চলনসই।’ কিন্তু রায় বাবুর এ বক্তব্যের সাথে সহমত পোষণ করা যায় না। কারণ ‘কৌতূহল মিটে গেলে চলনসই’ হলে নিষিদ্ধ বইগুলো এভাবে টিকে থাকত না। প্রবল রূপে পঠিত হতো না। প্রভাবও ফেলত না পাঠক ও সমাজের ভেতরে।
তবে নিষিদ্ধকরণের অজুহাত হিসেবে কিংবা বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ালে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা কিংবা আদালত প্রায়ই এমন আজগুবি আচরণ করে যা রীতিমতো হাস্যকর। যেমন– হুমায়ূন আজাদের ‘নারী’ গ্রন্থখানি নিষিদ্ধকরণের আদেশের সাথে জুড়ে দেয়া হয় দুই পাতার একটি সুপারিশ। দ্বীনি দাওয়াত ও সংস্কৃতি বিভাগ এবং ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমির পরিচালক- ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এ দু’জন বিশেষজ্ঞ থেকেই আসে সুপারিশটি। এবং নারী গ্রন্থ থেকে ১৪ টি বাক্য উদ্ধৃত করে নিষিদ্ধকরণের পক্ষে প্রমাণ করবার হীন চেষ্টা করা হয় । হুমায়ূন আজাদ এ প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, ‘এত বড় বই পড়ার শক্তি ওই দুই মৌলবাদীর ছিল না ; তারা বইটি থেকে কয়েকটি বাক্য তুলে পরামর্শ দেয় নিষিদ্ধ করার।’
যে বাক্যগুলো তারা উদ্ধৃত করে তা বহুল কথিত, প্রচলিতই বলা যায়। অথচ সেসব বক্তব্যের চেয়ে তীব্র আক্রমণাত্মক বক্তব্য গ্রন্থটিতে থাকা সত্ত্বেও তারা সেসবের সন্ধান পান না। অথবা সেসব বাক্যের মর্মার্থ বুঝবার মতো ধীশক্তি তাদের নেই। একটি গ্রন্থ নিষিদ্ধকরণ প্রয়াসের মধ্যে এ কারণটিকেই সর্বাগ্রে রাখা যায় যে, গ্রন্থটির শক্তি সম্পর্কে তাদের ধারণা ভয়ঙ্কর রকম সীমিত। ২০০০ সালের ০৭ মার্চ হাইকোর্টের দু’জন বিচারপতি রায় দেন, ‘নারী’ নিষিদ্ধকরণ আদেশ অবৈধ। সরাসরি মামলায় লড়ে নিষিদ্ধকরণ আদেশ অবৈধ প্রমাণ করার ইতিহাস খুব বেশি নেই। এর আগে ভারতে সমরেশ বসুর ‘প্রজাপতি’ উপন্যাস নিয়েও এরকম ঘটনা ঘটেছিল। তবে ‘প্রজাপতি’ মুক্ত হতে সময় লেগেছিল ‘নারী’র চেয়ে অনেক বেশি। প্রকাশের পর ০২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৮ সালে এক তরুণ অ্যাডভোকেট অমল মিত্র মামলা করে দেন কোর্টে। ১১ ডিসেম্বর ১৯৬৮ সালে রায় হয় উপন্যাসটি অশ্লীল এবং একে নিষিদ্ধ করতে হবে। ‘প্রজাপতি’ নিষিদ্ধ হয়ে যায়। মামলাটি সুপ্রিম কোর্টে ওঠে ১৯৭৯ সালে। রায় প্রাকাশিত হয় ১৯৮৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয়, ‘প্রজাপতি অশ্লীল নয়।’ দীর্ঘ আঠারো বছর পর মুক্ত হলো ‘প্রজাপতি’। ‘নারী’ নিষিদ্ধ ছিল পাঁচ বছর।
‘প্রজাপতি’ নিষিদ্ধের আবেদনের সাথে হাস্যকর আরেকটি কান্ড করে বসেন অমল মিত্র। যে আট জন স্বাক্ষী তিনি মানেন তার মধ্যে সপ্তম জন হিসেবে দেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম। অষ্টম জন হলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আশুতোষ ভট্টাচার্য। দু’জনের কেউই সাক্ষ দিতে যাননি। বিবাদী হিসেবে ছিলেন ‘প্রজাপতি’র লেখক সমরেশ বসু এবং দেশ-এর প্রকাশক ও মুদ্রাকর সীতাংশুকুমার দাশগুপ্ত। সমরেশের পক্ষে সাক্ষী হিসেবে ছিলেন বুদ্ধদেব বসু এবং নরেশ গুহের মতো ব্যক্তিত্বজন। আদালত বনাম বুদ্ধদেব বসুর জিজ্ঞাসাবাদ বহুল পঠিত এবং এই জিজ্ঞাসাবাদ সাহিত্য সমালোচনার একটি দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে মান্য আজ।
দুই.
নিষিদ্ধ ঘোষিত যে কোনো গ্রন্থের অবতারণা করলে এর পূর্বাপর অন্যান্য নিষিদ্ধ গ্রন্থের কথাগুলোও চলে আসে। উপর্যুক্ত আলোচনা তারই এক ক্ষদ্র প্রয়াস মাত্র। কারণ এ ধরনের আলোচনার মাধ্যমে নিষিদ্ধের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ সহজতর হয়।
noname১৯৯৩ সালের ১১ জুলাই সরকারি এক তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, ‘‘জনমনে বিভ্রান্তি ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অঙ্গনের বিঘ্ন ঘটানো এবং রাষ্ট্রবিরোধী উসকানিসূলক বক্তব্য প্রকাশের জন্য নিষিদ্ধ করা হলো তসলিমা নাসরিনের ‘লজ্জা’ উপন্যাসটি।’’
তথ্য বিবরণীর তারিখ হিসেবে এ বছর পূর্ণ হতে চলেছে নিষিদ্ধ ‘লজ্জা’র দুই যুগ। এখনো ‘লজ্জা’র প্রসঙ্গ দীপ্যমান। তাহলে কেন নিষিদ্ধ হলো ‘লজ্জা’! ‘লজ্জা’র শিল্পমানই বা কেমন?
কোনো গ্রন্থ যখন তীব্র আলোঘর হয়ে ওঠে তখন কিছু ঘটনা ঘটতে পারে। সরকার যদি আলোর কদর বোঝা শিক্ষিত হয় তাহলে গ্রন্থটি জনগণের হাতে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব গ্রহণ করে। কিন্তু সরকারযন্ত্র যদি মধ্যযুগীয় হয়, সম্প্রদায়িক ও মৌলবাদে দীক্ষিত হয় তাহলে অন্ধকারের সেবা দাসের মতো গ্রন্থটিকে নিষিদ্ধ করার মতো মূর্খামি করে। কিন্তু যুগে যুগে দেখা গেছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সরকারযন্ত্র আলোর কদর বোঝা শিক্ষিত ছিল না। ফলে তাদের খড়গ থেকে মুক্ত হতে পারেনি বিচ্ছুরিত সম্ভাবনাময় আলোকসম্পন্ন গ্রন্থগুলো। অফিসিয়ালি নিষিদ্ধ হয়ে গেছে তারা।
কিন্তু তারা হুমায়ুন আজাদদের কথার মর্মার্থ বুঝতে অক্ষম। তারা আসলেই জানে না কোনো গ্রন্থকেই নিষিদ্ধ করা যায় না। তাই তো স্বাধীন বাংলাদেশে আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘সত্যের মতো বদমাশ’ থেকে শুরু করে হুমায়ূন আজাদের ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’সহ অনেক গ্রন্থ নিষিদ্ধ করলেও নিষিদ্ধকরণ আদেশের কোনো অংশই বাস্তবায়ন করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। সবগুলো গ্রন্থই সহজলভ্য, সংরক্ষিত এবং বিপুল পাঠ্য।
১৯৯৩ সালে প্রকাশের পরপরই তসলিমা নাসরিনের ‘লজ্জা’ গ্রন্থখানি অন্যতম আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়ে ওঠে দেশব্যাপী। গ্রন্থটি সমালোচিত হয়। লেখক তসলিমা নাসরিন ধিকৃত হন। কিন্তু ‘লজ্জা’ পঠিত হয় ব্যাপকভাবে। বোধ করি ‘লজ্জা’র আগে অন্য কোনো গ্রন্থ এত বিপুলসংখ্যক কাটতি লাভের সুযোগ পায়নি বাংলাদেশে।
বাংলদেশের সাহিত্য এবং রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘লজ্জা’ গ্রন্থখানির প্রকাশের প্রভাব নানামুখী। সরকার অভিযোগ করে এটা জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করছে। শুধু তাই নয় তসলিমা নাসরিনের সাথে ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনি’র এর গভীর যোগাযোগ আছে বলে সন্দেহ করতে থাকে সরকার। ইসলামী মৌলবাদী সমমনা কিছু দল এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে একজোট হয়ে ‘ইসলামী ঐক্য জোট’ নামে রাজনৈতিক জোট গঠন করে। তারা ব্লাসফেমি আইনের দাবি জানাতে থাকে। তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। প্রকাশ্যে মিছিলে তসলিমা নাসরিনের ফাঁসি চাওয়া হয়। মসজিদে মসজিদে জুম্মার নামাজের খুৎবায় তার নামে বিষোদাগার করা হয়। বিতরণ করা হয় লিফলেট। মৌলবাদীরা প্রকাশ্য জনসভায় সিলেটে এবং বগুড়ায় তার মাথার মূল্য ঘোষণা করে পঞ্চাশ হাজার টাকা। সিলেটে প্রকাশ্যে মৌলবাদীদের জনসভায় তাকে বিয়ে করে মুসলমান বানানোর ঘোষণাও দেয়া হয়। তসলিমা নাসরিন ও তার পরিবার লাঞ্চনার শিকার হন। এক বিচারপতি তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার সাথে এক ইফতার পার্টিতে তসলিমা নাসরিনের পরিচয় করিয়ে দেন। বিচারপতি এবং শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীরা শেখ হাসিনার কাছে সহযোগিতা চান। জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমিও তো ওর লেখা পছন্দ করি না।’
তসলিমা নাসরিনের শেষ ভরসাটুকুও শেষ হয়ে যায়। নোবেল লরিয়েট সাহিত্যিকরা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো তার নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। সরকারের কাছে তাঁর নিরাপত্তা চেয়ে পত্র লেখে। এক দুর্বিসহ পরিস্থিতির মধ্যে তিনি পড়ে যান। এক পর্যায়ে তিনি আত্মগোপনে চলে যেতে বাধ্য হন। তাঁকে সহযোগিতা করেন এদেশের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ। এরপর ১৯৯৪ সালের ০৯ আগস্ট তিনি গোপনে দেশত্যাগ করেন।
তারপরও থামে না তাঁর বিরুদ্ধে করা আন্দোলন। ১৯৯৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তসলিমা নাসরিনকে পুনরায় ‘মুরতাদ ও দেশদ্রোহী’ হিসেবে উল্লেখ করে ইসলামী মোর্চা, ইসলামী ছাত্র সমাজ, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনসহ কয়েকটি সংগঠন। তসলিমা নাসরিনের গ্রেফতার ও ফাঁসি দাবি করে তাণ্ডব শুরু করে। পরিস্থিতি ক্রমশঃই অবনতির দিকে যায়। ০৬ অক্টোবর ১৯৯৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘তসলিমা নাসরিন এবং তাকে যাঁরা হুমকি দিচ্ছেন, তারা সবাই সীমা ছাড়িয়ে গেছেন।’ কিন্তু প্রগতিশীল আওয়ামী লীগ সরকার বিষয়টা সামলানোর কোনো তাগিদ অনুভব করেনি; পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়ে যাবার আশঙ্কায়। ধর্মভীরু জনগণের ভোট হারানোর ভয়ও ছিল তাদের। ২০০২ সালের ১২ অক্টোবর গোপালগঞ্জের ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সুইডেন-প্রবাসী লেখক তসলিমা নাসরিনকে এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। ‘লজ্জা’ গ্রন্থটি শুধু বাংলাদেশে নয় ভারতের কয়েকটি রাজ্যে, নেপালে, শ্রীলঙ্কায় এবং ভুটানেও নিষিদ্ধ করা হয়।
যে গ্রন্থ নিয়ে এত কিছু, এবার দেখা যাক তার ভেতরে কী আছে। তার আগে ওই সময়ের প্রেক্ষাপট নিয়ে দু’টি কথা বলা যাক। ১৯৯০ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে উঠলে বাংলাদেশের ‘দৈনিক ইনকিলাব’ পত্রিকা বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়েছে মর্মে শিরোনাম করে। শুধু শিরোনামই নয় পুরো পাতা জুড়ে বাবরি মসজিদ বিষয়ক সংবাদ প্রকাশ করে। বাংলাদেশে এই সংবাদ প্রকাশের পরই শুরু হয়ে যায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ। একদিন পর বিষয়টি মিথ্যা প্রমাণিত হলে ‘ইনকিলাব’ পত্রিকা দুইদিন পর ভুল স্বীকার করে বিবৃতি দেয়। এর দুই বছর পর ১৯৯২ সালে সত্যি সত্যি বাবরি মসজিদ আক্রান্ত হলে প্রায় সব ক’টি দৈনিকের শিরোনাম হয় এই সংবাদটি। এরপরই সংখ্যালঘু (এই শব্দটি আমি লিখতে চাই না, লিখতে গেলে কষ্ট হয়) হিন্দু সম্প্রদায় কতিপয় সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠীর দ্বারা আক্রান্ত হয়। তাদেরকে মারধর করা হয় এবং ঘরবাড়ি ও মন্দির ভাঙচুর করা হয়। অনেকেই বিষয়টিকে দাঙ্গা হিসেবে আখ্যায়িত করতে চান। কিন্তু দাঙ্গা হলে তো উভয় পক্ষেরই ক্ষতি হবার কথা। মুসলমানদের ঘরবাড়ি অথবা উপাসনালয় আক্রান্ত হবার কোনা সংবাদ পাওয়া যায়নি।
ওই সময় ডাক্তার হিসেবে দায়িত্বরত তসলিমা নাসরিন সরাসরি এই সংঘাতের সাথে পরিচিত হয়ে যান। প্রতিদিন হাসপাতালে আক্রান্ত আহত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন ভর্তি হতে থাকেন। তসলিমা নাসরিন সেবা করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত ডাক্তার হিসেবে। কিন্তু তার কোমল মন এতই আক্রান্ত হয় যে দায়িত্বকাল শেষ হয়ে যাবার পরও তিনি দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। দিনকে দিন এই সংখ্যা বাড়তেই থাকে। বাড়তে থাকে এর ভয়াবহতা। তিনি সেবা করার পাশাপাশি ওইসব আক্রান্ত ব্যক্তিদের সাথে কথা বলেন। দৈনিক পত্রিকায় চোখ রাখলে গা সিঁউরে ওঠে। ওই সময় চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত হয় ‘গ্লানি’ নামক একটি পত্রিকা। সেখানে এই ভয়াবহ ঘটনার পূর্বাপর প্রামাণ্য দলিল উপস্থাপিত হয়। এগুলো হলো তসলিমা নাসরিনের ‘লজ্জা’ উপন্যাস লেখার প্রধান উপাদান।
অর্থাৎ ব্যক্তি তসলিমা নাসরিনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, ওই সময়ের পূর্বাপর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিত, দৈনিক পত্রিকার সংবাদ, ‘গ্লানি’র প্রামান্য দলিল এবং মানুষ হিসেবে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তাকে ‘লজ্জা’ লিখতে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি সেবা করার পাশাপাশি নোট নিতে থাকেন। ডাক্তারি প্যাডে লিখতে থাকেন একটু একটু। এবং অ্যাপ্রোনের পকেটে সেগুলো রেখে দেন। রোগীকে ওষুধ লিখতে গিয়ে অ্যাপ্রোনের পকেট থেকে কাগজ বের করলে মাঝে মাঝে সে-সব নোট বেরিয়ে আসত। সিনিয়র ডাক্তাররা সেগুলো দেখে বিরক্ত হতেন।
‘লজ্জা ’ গ্রন্থটিকে উপন্যাস বলা হয়। বিশেষ করে প্রকাশকের তরফ থেকে। কিন্তু কাঠামো, চারিত্র ও নন্দনের দিক বিবেচনা করলে গ্রন্থটিকে উপন্যাস বলা যাবে কি-না তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে। লেখকও স্বীকার করেন বিষয়টি। তসলিমা নাসরিন তার ‘উতল হাওয়া’ নামীয় আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসে লিখেছেন, ‘বইটির গদ্য ভালো নয়, বইটি উপন্যাস হয়নি, তথ্যে ঠাসা বইটি বারবার মনোযোগ বিনষ্ট করে। বইটিতে ত্রুটি আছে। অবশ্যই। খুব অল্প সময়ের মধ্যে লেখা।’ শুধু লেখক নিজেই নন। ওই সময়ে বইটির চারিত্র নিয়ে কবি শামসুর রাহমান, শিবনারায়ণ রায়ও একই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন। গ্রন্থটির নন্দন বিষয়ক বিতর্ক চাপা পড়ে যায় এর বক্তব্য নিয়ে বিতর্কের বিধ্বংসী অবস্থার কাছে। কী সেই বিধ্বংসী বিতর্ক! সেটা জানতে হলে প্রবেশ করতে হবে ‘লজ্জা’র গল্পে। প্রবেশ করতে হবে সুরঞ্জনের বাবা সুধাময়ের মানসালয়ে। যেখানে একটি কাটা দাগ বারবার বিদ্ধ করে তাকে।
কী সেই ‘কাটা দাগ’? মাত্র একুশ দিনের গবেষণায় মানচিত্রের ওপর পেন্সিলের দাগ দিয়ে দেশভাগ করা হয়েছিল। সেই দাগকাটা মহামানবের (এবং মহামানবদের) কাটা দাগ নিয়ে যাপিত অসংখ্য পারিবারের একটি পরিবারের গল্প ‘লজ্জা’ গ্রন্থটি। সেই ‘কাটা দাগ’ নিয়ে যে ব্যক্তিটি বাপ-দাদার ভিটে-মাটি কামড়ে পড়েছিল তার নাম সুধাময়। সুরঞ্জনের বাবা। যে কাটা দাগ তাকে কাটতে পারেনি সাতচল্লিশে, ষাটে, ছেষট্টিতে, একাত্তরে, নব্বইয়ে- সেই কাটা দাগের চূড়ান্ত পরিণতি পায় বিরানব্বইয়ে। সুধাময় বাধ্য হয় দেশত্যাগে।
মায়া ও সুরঞ্জনের কথোপকথন দিয়ে গ্রন্থটির শুরু। মায়া সুরঞ্জনকে কিছু একটা করতে বলছে। এই ‘কিছু একটা’ বলতে বের করতে বলছে লুকানোর জায়গা। সুরঞ্জন নির্বিকার। তার চোখ টিভিতে। সেখানে সিএনএন চলছে। সম্প্রচারিত হচ্ছে বাবরি মসজিদ ভাঙার দৃশ্য। এদিকে বাংলাদেশেও শুরু হয়ে গেছে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ। পত্র পত্রিকায় পাওয়া যাচ্ছে সে-সবের সংবাদ। তার চেয়েও বড় কথা প্রতিবেশি অনেকেই আক্রান্ত হয়েছে। চোখের সামনে এই ভয়াবহ দৃশ্য ঘটে যাওয়ায় মায়া একটু বেশিই উদ্বিগ্ন। মায়া ও সুরঞ্জনের বাবা সুধাময় নাস্তিক মানুষ। ছেলেমেয়েদেরও মানুষ করেছেন সেভাবেই। যার যার মতো। ধর্ম বা ধর্মীয় আচার-আচরণের কোনো বিধি-নিষেধ তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়নি কখনোই। কত আত্মীয়-স্বজন শুভাকাঙ্ক্ষী এমনকি পরিবারের সদস্যরাও ওপারে যাবার জন্য চাপ দিয়েছেন তাকে। কিন্তু সবার আদেশ-অনুরোধ আর চাপ উপেক্ষা করে তিনি আঁকড়ে ধরে আছেন বাপ দাদার ভিটে-মাটি। একাত্তরে তাঁকে ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়। বিভিন্ন ধরনের চাপ ও কৌশলে তার বাড়ি-জায়গা জমি কিনে নেয়া হয়। সরকারের পক্ষপাতিত্বের জন্য পেশায় তিনি আশানুরূপ সফলতা অর্জন করতে পারেন না। ছেলে সুরঞ্জন প্রগতিশীল রাজনীতি করে।
মহল্লায় হিন্দু-মুসলমান এক সাথে বাস করে। তারা পরস্পরের ভালো প্রতিবেশি। কারো সাথে কোনো বিরোধ নেই। কিন্তু বাবরি মসজিদ ভাঙার খবর পাবার পর থেকেই সুরঞ্জনদের সাথে পাড়ার মুসলমানদের এযাবৎকালের সম্পর্কের ওপর টান পড়ে। এ ঘটনায় বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো দোষ না থাকলেও তাদের ওপর আক্রমন আসায় সুরঞ্জনদের দৃষ্টিতেও পাড়ার মুসলমান প্রতিবেশিদেরকে কেমন লাগতে শরু করে। সুরঞ্জন স্পষ্ট দেখে শুধু হিন্দু নাম ধারণ করার জন্য কী জঘন্যভাবে তাদের দিকে তাকাচ্ছে মুসলমান প্রতিবেশিরা। মুসলমান বন্ধুরাও তার সঙ্গে ‘কেমন জানি’ আচরণ শুরু করে। এ ঘটনায় সম্প্রদায়গত ভেদ-রেখাহীন মানসিকতাসম্পন্ন সুরঞ্জনের মনও মুসলমানদের অবিশ্বাস করতে শুরু করে। তার মনে হতে থাকে ‘হিন্দু’রাই আপন। এক সময় বোন মায়াকে তুলে নিয়ে যায় ‘মুসলমান’রা। মায়াকে ধর্ষণ করে তারা। জ্বালিয়ে দেয়া হয় বাড়ি-ঘর। এতদিন সুরঞ্জন নিজেকে ‘মানুষ’ ভাবত। হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়গত ভাবনার উর্ধ্বে যে মানবতা তাকেই মান্য করত। কিন্তু তাদের পরিবারের উপর দিয়ে ঘটে যাওয়া এ হেন কর্মকাণ্ডের জন্য এবং তার বন্ধু-প্রতিবেশির ‘মুসলমান’ হয়ে ওঠায় ‘মানুষ’ সুরঞ্জনও ‘হিন্দু’ হয়ে যায়। প্রতিশোধ নিতে চায় ‘মুসলমান’দের ওপর। কিন্তু শক্তি ও সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতার জন্য তার তা করা হয়ে ওঠে না। নিরুপায় হয়ে যে ধর্ষকামী হয়ে যায়। এক ‘মুসলমান’ পতিতাকে বাসায় এন ধর্ষণ করে। এভাবে সে ‘মুসলমান’দের ওপর জমে থাকা ক্ষোভ উপশম করতে চায়।
উপর্যুপরি আঘাতে জর্জরিত সুধাময়। যে সুধাময় কখনোই বাপ দাদার দেশ থেকে কোথাও যেতে চায়নি, সে-ই একসময় চলে যেতে চায়। কোথায়? ভারতে। কারণ ‘ততদিনে তার ভেতরে গড়ে তোলা শক্ত পাহাড়টিও দিনে দিনে ধ্বসে পড়েছে।’
বিশ্বাস ও আস্থার ওই পাহাড় সুধাময়ের ধীরে ধীরে ধ্বসে পড়লেও সুরঞ্জনের বিশ্বাস ও আস্থার পতনকে অতটা যুক্তশীল ও পরিপক্ক মনে হয় না। বাবার স্ট্রোকের পর সুরঞ্জন পুলকের বাড়িতে যায়। খাবার খায়। টাকা ধার চায়। তখন জানা যায়, সুরঞ্জন আর সাম্প্রদায়িক ভেদ-রেখাহীন নয়। সে হয়ে গেছে আস্ত ‘হিন্দু’। হায়দারের সাথে কথা বলার সময় জানা যায় সে সবেমাত্র ভেদ-রেখাটি টেনেছে। সে আর মানুষ নেই। সে পুলককে বলে, ‘শোনো পুলক, আসলে যাদের ভাবি অসাম্প্রদায়িক, যাদের বন্ধু ভাবি, নিজেদের মানুষ ভাবি, যাদের সঙ্গে এমনভাবে মিশেছি যে আমরা এখন অনর্গল আসসালামু আলাইকুম বলি, খোদা হাফেজ বলি, জলকে পানি বলি, স্নানকে গোসল বলি, যাদের রমজান মাসে আমরা বাইরে চা সিগারেট খাই না, এমনকি প্রয়োজনে কোনো হোটেল রেস্তারায় খেতে পারি না দিনের বেলা, তারা আসলে আমার কতটুকু আপন। কাদের জন্য আমাদের এই স্যাক্রিফাইস, বলো? পুজোয় ক’দিন ছুটি পাই? আর দুটো ঈদের মৌসুমে তো সরকারি অফিস– হাসপাতালগুলোতে ঘাড় ধরে হিন্দুদের দিয়ে কাজ করানো হয়। অষ্টম সংশোধনী হয়ে গেল, আওয়ামী লীগ কদিন চেঁচাল, ব্যস, হাসিনা নিজেই তো এখন মাথা ঢেকেছে ঘোমটায়। হজ করে আসার পর তো চুল দেখা যায় না এমন ঘোমটাই দিয়েছিল। সবার চরিত্র এক পুলক, সবার। এখন আমাদের সবার হয় আত্মহত্যা করতে হবে, নয় দেশ ছাড়তে হবে।’
দেখা যাচ্ছে, কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে সুরঞ্জন সারাদেশের মানুষকে সাম্প্রদায়িক বলে ফেলছে। এখানে সুরঞ্জনের বক্তব্যকে আরোপিত ও অযৌক্তিক মনে হয়। গ্রন্থটির দুর্বল দিকও এটা। একথা ঠিক যে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর বাংলাদেশের অনেক জায়গায়ই হিন্দুদের ওপর আক্রমণ হয়েছে। অনেক বাড়িঘর-মন্দির শুধু ভাংচুরই নয়, ধূলিস্যাত হয়েছে। মেয়েদেরকে ধর্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু পাড়ায় পাড়ায় মহল্লায় মহল্লায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে সম্প্রীতি বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। পত্রিকায় বিবৃতি দিয়েছে বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজ। প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল কর্মসূচি দিয়েছে। তারা কমিটি গঠন করেছে। সচেতনতা এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলবার আয়োজন করেছে। হ্যাঁ, সরকার তাৎক্ষণিক এই সংঘাত প্রতিরোধ করতে পারেনি। তার দায় সরকারের কর্তাব্যক্তির ওপরই বর্তাবে। কিন্তু সুরঞ্জন দায়ী করে ফেলে পুরো দেশের মানুষকেই। সুরঞ্জনের ওই কথার প্রত্যুত্তরে পুলক বলে, ‘কাল দাদা এসেছে সীতাকুণ্ড থেকে, অনেকটা পালিয়ে। বলল বৃহস্পতিবার রাতে বারইপাড়া, নাথ পাড়া, ফরাদপুর, মহালঙ্কা গ্রাম আর বাড়বকুণ্ডু ইউনিয়নের দামপাড়া, সাহাপাড়ায় নাকি ভীষণ হামলা হয়েছে। বারইপাড়ায় পঁয়তাল্লিশটি, বহরপুরে বাহাত্তরটি, ফরাদপুরে দশটি, মহালঙ্কায় বাইশটি, দাসপাড়ায় আটটি সাহাপাড়া-নাথপাড়ায় ঊনত্রিশটি বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বিএনপি আর জামায়াত মিলেই এগুলো করেছে। হিন্দুরা কেউ বলছে না কারা পুড়িয়েছে বাড়ি। ভয়ে। মিরসারাইয়ে একই অবস্থা। ... মিরসরাই কলেজের এক অধ্যাপকের মেয়ে উৎপলা রানী ভৌমিককে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে নিযে যায়, ফেরত দেয় শেষ রাতে।’
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, উপরোক্ত বক্তব্যটি সাংবাদিকীয় প্রতিবেদন হিসেবে মানানসই। উপন্যাসের কোনো চরিত্রের সংলাপ হিসেবে নয়। পুলক কিংবা পুলকের দাদা কেউই তো রিপোর্টার নয়। উপরন্তু তারা আক্রান্ত হবার ভয়ে ভীত। এহেন মানসিক অবস্থার ভেতরে জায়গার নাম এবং আক্রান্ত বাড়িঘরের সংখ্যা হুবহু বলে যাওয়া বিশ্বাস্য? উল্লেখিত পরিসংখ্যান হয়তো মিথ্যা নয়। কিন্তু এরকম মানসিক বিপর্যস্ত কোনো চরিত্রের মুখে এভাবে হুবহু সংখ্যা উঠে আসা চরিত্রর সহজাত বিশ্বস্ততা হানি করে। পরিসংখ্যানটি চরিত্রের মুখে না দিলেই বরং ভালো হতো। তাতে চরিত্রের বিশ্বস্ততা যেমন থাকত তেমনি গ্রন্থেরও শিল্পমূল্যের হানি হতো না।
সুরঞ্জনকে গড়ে তোলা হয়েছে মুক্তবুদ্ধির একজন মানুষ হিসেবে। ধর্মের ভেদরেখা যাকে স্পর্শ করে না। জন্মগতভাবে মানুষ সম্প্রদায়ভুক্ত নয়। সুরঞ্জনও তাই। সেই সুরঞ্জন ধীরে ধীরে কট্টর ‘হিন্দু’ হয়ে ওঠে। তাকে অবশ্য ধর্মীয় উৎসবেও দেখা গেছে। কিন্তু সেখানে যাওয়া ধর্মীীয় অনুভূতি থেকে নয়। উৎসবের আনন্দ থেকে। প্রতিবেশি লুৎফর যখন তাদের খবরাখবর জানতে চায় সুরঞ্জনের মনে হয় তাদেরকে করুণা করা হচ্ছে। অবিশ্বাসের বীজ রোপিত হয়ে যায় তার ভেতরে। সুরঞ্জনের ভেতরে এভাবে ‘হিন্দুত্ব’ প্রবল হতে থাকে। এই প্রবল ‘হিন্দুত্ব’ তাকে একসময় ক্রুর করে তোলে। সব ক্রোধ গিয়ে পড়ে রাষ্ট্রের ওপর। সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে সে বাংলাদেশকে একটা বিশ্রী গালি দেয়। বলে, ‘শালা শুয়োরের বাচ্চা বাংলাদেশ।’ এভাবে তার ‘হিন্দুসত্ত্বা’ গাঢ় হতে হতে প্রতিশোধপরায়ন হয়ে ওঠে। মায়াকে তুলে নিয়ে যাবার পর থেকেই এই প্রবণতা তার ভেতরে প্রবলতর হতে থাকে। সিদ্ধান্ত নেয় ধর্ষণের বদলা হিসেবে সেও ধর্ষণ করবে। তার কাছে মনে হয় এ কাজটি না করতে পারলে এক শ্বাসরুদ্ধকর জীবন থেকে সে মুক্তি পাবে না। সুরঞ্জন ওই কাজটিই করে।
সুরঞ্জনের এ মানসিকতা নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন তোলা যায়। অন্যায়ের প্রতিবাদ অন্যায় দিয়ে করা যায়? না-কি এটা প্রতিবাদের স্বীকৃত মাধ্যম? একজন শিক্ষিত প্রগতিশীল মানুষ কী করে এরকম ভাবনা ভাবতে পারে? ক্ষুব্ধ হতে হতে সে এতটাই বেসামাল হয়ে যায় যে, এতটাই দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে যায় যে, সে ভুলে যায় এ দেশের অসংখ্য মানুষের কথা যারা অসাম্প্রদায়িক চেতনায় আলোকিত। ভুলে যায়- দেশে ব্যাপক প্রতিবাদ হয়েছে, ভুলে যায় সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী মিছিল হয়েছে, ভুলে যায় তারই কোনো প্রতিবেশি তাদেরকে আক্রান্ত হতে বাঁধা দিয়েছে, ভুলে যায় মানববন্ধন হয়েছে, ভুলে যায় বুদ্ধিজীবীরা বিবৃতি দিয়েছেন, ভুলে যায় সরকারের পক্ষ থেকেও পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এসবের কোনো কিছুই সুরঞ্জনের চোখে ধরা পড়ে না। কেন, নিরাপত্তার জন্য মায়া যাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল তারাও তো ছিল ‘মুসলমান’। তারাও কি মায়াকে ধর্ষণ করেছে? সুধাময় ও সুরঞ্জনের কথোপকথনও উল্লেখ্য- সুধাময় বলছে, দেশে কি দু’একটা ভালো লোকও নেই সুরঞ্জন?’ সুরঞ্জন বলে, ‘না নেই’। সুধাময় তখন বলে, তুই অযথা হতাশায় ভুগছিস।’ সুরঞ্জন বলে, ‘অযথা নয়।’ সুধাময়ের মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থা লক্ষ করা যাচ্ছে। সুরঞ্জনের ভেতরে একটুও নয়।
রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা সাম্প্রদায়িক সংঘাত ঠেকানোর জন্য যতটা না ব্যাকুল ছিল তার চেয়ে ব্যাকুল ছিল যেন এই ঘটনাগুলো প্রকাশ না পায়। কিন্তু ‘লজ্জা’ গ্রন্থটি বের হবার পর তাদের মাথা খারাপ হয়ে যায়। সরকারযন্ত্র তখন উঠে পড়ে লাগে এর বিরুদ্ধে। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি ‘লজ্জা’ শুধু সাংবাদিক বিন্যাস নয়। ‘লজ্জা’ শুধু সুরঞ্জনের গালি দেয়া বাক্য নয়। ‘লজ্জা’য় তসলিমা নাসরিন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন মানুষের ভেতরে বিরাজমান একাধিক সত্তাকে। যখন শুভ সত্তাটির মৃত্যু হয় তখন অশুভ সত্তাটি জেগে ওঠে- তখন কীভাবে ভূলুণ্ঠিত হয় মানবতা- তা তিনি দেখিয়েছেন।
বাবরি মসজিদ ভাঙার পর সাম্প্রদায়িক আক্রমণে আহতদের চিকিৎসা করার জন্য স্বেচ্ছায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনরত তসলিমা নাসরিনকে এক ডাক্তার জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি হিন্দু কি-না? প্রথমবার তিনি কোনো উত্তর দেননি। পরে আবার জিজ্ঞাসা করলে দাঁতে দাঁত চেপে বলেছিলেন, ‘আমি মানুষ’। ‘লজ্জা’ মূলত এক আক্ষেপের গল্প। ‘লজ্জা’ মূলত ওই মানুষের পশু হয়ে ওঠার গল্প। ‘লজ্জা’ মূলত ওই মানুষদের ‘হিন্দু’ ও ‘মুসলমান’ হয়ে ওঠার গল্প। ‘লজ্জা’ চেয়েছে মানুষ ‘মানুষ’ হয়ে থাক। ‘লজ্জা’ চেয়েছে মানুষ যেন ‘হিন্দু’ না হয়ে ওঠে। ‘লজ্জা’ চেয়েছে মানুষ যেন ‘মুসলমান’ না হয়ে ওঠে। ‘লজ্জা’ মানুষের ‘মানুষ’ থাকার আকুতি জানিয়েছে। ‘লজ্জা’ সেই পাহাড়ের ধ্বসে পড়ার গল্প। সে পাহাড়টির নাম বিশ্বাস। ‘লজ্জা’ হচ্ছে সুরঞ্জন ও হায়দারের জন্মমৃত্যুর গল্প। ওই মৃত্যুর নাম সুরঞ্জনের ‘মানুষ’ থেকে ‘হিন্দু’ হয়ে ওঠা। ওই ‘মৃত্যুর’ নাম হায়দারের ‘মানুষ’ থেকে ‘মুসলমান’ হয়ে ওঠা। তসলিমা নাসরিন যেটা চাননি।
এই বার্তাটিই সরকারযন্ত্র বুঝতে পারেননি। ফলে নিষিদ্ধ করা হয় ‘লজ্জা’। দেশ থেকে বিতাড়িত হন তসলিমা নাসরিন।
আজ দুই দশক পর কতিপয় ঘটনার দিকে তাকালে ‘লজ্জা’ উপন্যাসটির কথা মনে পড়ে। ‘লজ্জা’ মনে করিয়ে দেয় আমরা ক্রমশ ‘মুসলমান’ হয়ে উঠছি। আমরা ক্রমশ ‘হিন্দু’ হয়ে উঠছি। আমরা ক্রমশ ‘মানুষ’ হয়ে উঠছি না। অথচ তসলিমা নাসরিন চেয়েছিলেন এর বিপরীতটাই ঘটুক।

 

লাইভ

টপ