প্রকৃতিসখা হে

Send
দীপংকর গৌতম
প্রকাশিত : ১৩:৫৭, সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:০৮, সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৭

দ্বিজেন শর্মা
থমকে যাওয়া শহর যেন ঘোষণা করে বৃক্ষসখাহীন শোকের খবর। এ ভাষা যারা বোঝেন তারা জানেন এই শোকের শহরে বৃষ্টি কেনো অনিবার্য হয়ে ওঠে। হিম শীতল দ্বিজেনদা এ শহরের বৃক্ষের আত্মীয়তা এত দ্রুত ছিন্ন করবেন—এ কথা কে ভেবেছে!

শহর ঘুরে ফুলেল কফিন চলে যায় বরদেশ্বরী কালিবাড়ির শ্মশানে। চারিদিকে বৃক্ষ-সন্তানের, স্বজনের কান্নার  রোল ঘন হয়ে উঠছে। কমে আসছে সূর্যের তেজ । নুয়ে পড়া বৃক্ষের ছায়া বড় হয়ে যাচ্ছে পুরোহিতমন্ত্র পাঠ করে। বৃক্ষের টুকরোয় সাজানো শ্মশানে তোলা হয় বৃক্ষ সন্তানকে। পুরোহিতের মন্ত্র কানে আছড়ে পড়ে। ‘ধর্মাধর্ম সমাযুক্তং লোভমোহসমাবৃতং দিব্যান লোকান স গচ্ছতি’(যদি তিনি অজ্ঞাতসারে কোনো ভুল করেও থাকেন, লোভ-মোহ যদি তাকে আবৃত করে রাখে, তাহলে এই অগ্নিদাহে তাকে দাহ্য করে দিব্যলোকে নিয়ে যাওয়া হোক)। এই মন্ত্রের মধ্য দিয়ে তার ছেলে ডা. সুমিত শর্মা পিতার মুখাগ্নি করার সঙ্গে সঙ্গে জ্বলে ওঠে চিতাকাঠ। অসংখ্য মানুষের দ্বিজেনদা জ্বলছেন তার প্রিয় বৃক্ষের সহযোগে। মানুষের কান্না আর্তনাদ পর্যায়ে পৌঁছে যেতে যেতে শ্মশানের আগুন লেলিহান হয়ে যায়। আগুনের উৎসবে মেলায় হারানো শিশুর মতো হারিয়ে যান দ্বিজেনদা। বৃক্ষের অভিভাবক। আমাদের শিক্ষক।

বৃক্ষের পাঠশালায় যিনি উদ্ভিদবিদ্যা পড়াতে পড়াতে ধোঁয়া হয়ে মিশে গেলেন আকাশপ্রদীপে। যে বৃক্ষের সংসারে তিনি প্রকৃতির পাঠশালা খুলেছিলেন—সেই কাঠেই দহিত জীবন নিয়ে তিনি মিশে গেলেন প্রকৃতির মাঝে। বাংলার প্রকৃতি তাই থমকে আছে—অসময়ে বৃষ্টি নামে, বজ্রপাত হয়।

পরিণত বয়সে তিনি চলে গেলেও কিছু মানুষের মৃত্যু মানুষকে ছায়াশূন্য করে দেয়। তার জন্যই এত শোক, এতো মনখারাপের গন্ধ। হানাহানি, দ্বন্দ্ব-সংঘাত এড়িয়ে মানুষের প্রশ্বাসকে মুক্ত রাখতে চেয়েছিলেন তিনি। চেয়েছিলেন সভ্যতা প্রকৃতি-সংলগ্ন হোক, মানবিক হোক।
জগদীশ চন্দ্র বসুর ভাবধারায় তিনি মানুষকে শিক্ষা দিচ্ছিলেন। অভ্যস্তও করেছিলেন। বলা যায়, জগদীশ যেখানে শেষ করেছিলেন, তিনি সেখানে আরেকটি ধাপ খুলেছিলেন। জগদীশ চন্দ্র বসু আবিষ্কার করেছিলেন বৃক্ষের প্রাণ আছে । আর এই নিসর্গসখা সেই বৃক্ষের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে কথা বলতেন। একটা তত্ত্ব, আরেকটা প্রয়োগ। প্রয়োগের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জ্যোতির্ময়।

নিসর্গ বিক্ষত হলে দ্বিজেন শর্মা সন্তান হারানোর কষ্ট পেতেন। বৃক্ষের সঙ্গে কথা বলে যিনি তৃপ্ত হতেন।

দুই.

ঢাকায় আসার পর সংবাদে কাজ করার সূত্রে পরিচয় হয় দ্বিজেনদার সঙ্গে। তার সিদ্ধেশ্বরীর গলির ভেতরে বাড়িটায় মাঝে মধ্যেই যেতাম লেখা আনতে।  লেখা আনার ফাঁকে তার সঙ্গে কথা বলে সময় কাটাতাম। প্রায় সময়টাই তিনি চাইতেন ঘুরতে যেতে। গাছ, লতা-পাতা চিনাতে তার ক্লান্তি ছিলো না। দেশের কোথায় কোন গাছটার সঙ্গে কীভাবে তার পরিচয় তা একদম শিশুর সরলতা নিয়ে বলতেন। রমনায় প্রায়ই যেতেন। কবে কোন গাছে নতুন পাতা আসবে, বৃক্ষের সংসারে কোনো নতুন অতিথি আসবে কিনা, সব ছিলো তার জানা। রমনায় গিয়ে অনেক গাছের গায়ে হাত বুলিয়ে বলতেন—কেমন আছো? দিনকাল ভালো চলছে?

খুব আক্ষেপ করতেন, সভ্যতা যতো গতিশীল হচ্ছে মানুষ ততো প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।  একথাগুলো বলতে বলতে তিনি খুবই কষ্ট পেতেন। প্রকৃতি ও মানুষের ভেতরের এই বিচ্ছিন্নতার কষ্ট প্রতিনিয়ত তাকে দহনের যন্ত্রণা দিতো। তিনি বলতেন, মানুষ যতোই সভ্য  হোক, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি যতোই অগ্রসর হোক, প্রকৃতিকে ভালোবেসেই যেতে হবে। নইলে  মানুষ একদিন নিজেকে ধ্বংস করে ফেলবে। 

তার কথায় যাদু ছিলো। তিনি কথা বললে যে কেউ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতো। দ্বিজেনদা’র বাসা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকতো। তার স্ত্রী দেবী শর্মা গল্পের অংশীদার হতেন। বৌদি’র বাড়ি বরিশালে। বনেদী পরিবারের মেয়ে। দ্বিজেনদা মৌলভীবাজারের বড়লেখার বনেদী পরিবার ‘কবিরাজ বাড়ির ছেলে’। বরিশাল বিএম কলেজে অধ্যাপনা করাকালীন অনেক মজার ঘটনা শুনতাম দ্বিজেনদা’র কাছে। দেবী শর্মা আমাকে মাতৃস্নেহে আপ্যায়ন করতেন। বরিশাল শহরের উপর দ্বিজেনদা’র আত্মিক টান ছিলো। শহরের কোথায় কোন গাছ আছে এক নিঃশ্বাসে বলতে পারতেন।

আমাদের কৈশোর থেকে আজ অবধি সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অজস্র বই পড়ে ঋদ্ধ হয়েছি, মুগ্ধ হয়েছি। দ্বিজেনদা সব গুরুত্বপূর্ণ বই নিষ্ঠার সাথে অনুবাদ করেছেন।

মিখাইল নেস্তুথের ‘প্রজাতি জাতি প্রগতি’—প্রগতি প্রকাশনের এই দুর্লভ বইটির অনুবাদক ছিলেন দ্বিজেনদা। ভারতবর্ষের ইতিহাস বইটাও যতদূর মনে পড়ে তার অনুবাদ। সোভিয়েত থেকে আসা তার বই পড়তাম বেশ আগে থেকেই।  বাংলা একাডেমি বা জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনীর গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা— শ্যামলী নিসর্গ, গাছের কথা ফুলের কথা, সমাজতন্ত্রে বসবাস, ডারউইন ও প্রজাতির উৎপত্তি , বাংলার বৃক্ষ— এইসব পড়েছি। এত বিখ্যাত মানুষ যে এত সহজ হয় দ্বিজেনদাকে না দেখলে তা অনুমান করা যাবে না। বুদ্ধিবৃত্তির উচ্চশিখরে দাঁড়িয়েও তিনি সুবিধার ধার কাছ দিয়ে কখনো হাঁটেননি। বামপন্থী চিন্তার আদর্শবাদী জায়গাটা ধরে রেখেছিলেন আমৃত্যু । ছিলেন শান্ত-সহজ প্রকৃতির মতোই কোমল ও ছায়াবৃক্ষের মতোই শীতল ছায়া দিতেন যে কাউকে । তিনি আমাদের নতুন করে প্রকৃতির পাঠ শিখিয়েছেন। বিজ্ঞানকে করে তুলেছেন নিটোল এক সাহিত্য, এক মহাকাব্য। সে মহাকাব্য পাঠ হয়ে ওঠে অনিবার্য, হয়ে ওঠে শিল্প ও বিজ্ঞানের এক অতুলনীয় সংশ্লেষ। 

জেড.এস.

লাইভ

টপ