নিজেকে আবিষ্কারের আনন্দ আছে : সুলতান সালাহ্উদ্দিন

Send
.
প্রকাশিত : ১৫:১৯, অক্টোবর ১৮, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৩৩, অক্টোবর ১৮, ২০১৭

সুলতান সালাহ্উদ্দিন। জন্ম : ২০ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৮। কবিতার বই : বিচ্ছিন্ন নাবিক।

দ্বিতীয় দশকের কয়েকজন কবির কাব্য-ভাবনা ও লেখালেখি নিয়ে বাংলা ট্রিবিউন সাহিত্যের এই আয়োজন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একই সময়ের কবি রাসেল রায়হান।

 

প্রশ্ন : কবিতা লেখার ক্ষেত্রে নিজের জগত নির্মাণ কতটা জরুরি? জরুরি হলে আপনার সেই পদ্ধতিটা কেমন?

উত্তর : একজন কবি নিজেই একটি জগত। ফলে আলাদা করে জগত নির্মাণ জরুরি নয়। তবে এক্সপেরিমেন্ট করতে চাইলে সেটা ভিন্ন ব্যাপার। আমি জগত নিয়ে মাথা ঘামাই না।

 

প্রশ্ন : আপনি কিসের দিকে বেশি জোর দেন? নির্মাণে, না বোধে?

উত্তর : আমি নির্মাণের দিকে জোর দেয়ার চেয়ে কবিতার বোধ ও ভাষার দিকে মনযোগ বেশি দেই। সেটিই আমাকে মুক্তি দেয়। নির্মাণের দিকে আমার আগ্রহ নেই। কবিতাকে সৃষ্টি হয়ে উঠতে হয়, সেদিকেই আমার চেষ্টা...

 

প্রশ্ন : কবিতার পাঠক কমের একটা অভিযোগ পাওয়া যায়? এই অভিযোগের ভিত্তি কী? উত্তরণ সম্ভব কি না? কীভাবে?

উত্তর : কবিতার পাঠক কমে যাওয়াটা বাস্তবসম্মত। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কবিতাকে শৈশব থেকে মুখস্ত করানো হয়, কিন্তু ভেতরের অর্থ বোঝানোর ক্ষেত্রে তেমন গুরুত্ব দেয়া হয় না। এরপর কবিতার ব্যাখ্যা ও প্রশ্নের উত্তর লিখতে বাধ্য করা হয় ক্লাসে সেটার স্পষ্ট ধারণা না দিয়েই। নোটবইয়ে কবিতার ব্যাখ্যা মুখস্ত করিয়ে কবিতার পাঠক সৃষ্টি করা যায় না। কবিতা নিয়ে ক্লাসের শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে খোলাখুলি আলোচনা ও সমালোচনার চর্চা প্রয়োজন। এভাবেই কবিতাকে বুঝতে ও ভালবাসতে পারবে এরা। পাঠকও সৃষ্টি হবে।

 

প্রশ্ন : অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের সাথে কবিতার পার্থক্য কোথায়?

উত্তর : কবিতা ব্যক্তির গভীর উৎসারণ যা ব্যক্তির নিজস্ব কণ্ঠস্বর অথচ সামগ্রিক সত্তার আর্তনাদ। এর সামগ্রিকতার শক্তি এতই যে, অন্যান্য শিল্পমাধ্যম তা এত অল্প সময়ে সামগ্রিকভাবে বহিঃপ্রকাশ করতে পারে না। একটি বাক্য কিংবা একটি শব্দও জীবন হয়ে উঠে কবিতায়, এমনকি মৃত্যুও ঘটায় এই কবিতা।

 

প্রশ্ন : ছোটকাগজ ঠিক কী ভূমিকা রাখছে এখন?

উত্তর : ছোটকাগজ একটা সংগ্রামের নাম। নতুন লেখক, কবি ও গবেষক সৃষ্টি করা এবং পরিচিত করে দেয়ার মাধ্যম এই ছোটকাগজ। কিন্তু ছোটকাগজের মান ও কাজের ধরন নিয়ে এত বেশি এক্সপেরিমেন্ট হয়ে গেছে যে কোনটা যে আসলে আদর্শ তা ভুলে গিয়েছে অনেকেই। লেবু বেশি চিপলে যা হয় আরকি। ছোটকাগজ তার অভিযাত্রা থেকে দূরে সড়ে গেছে। এখন গ্রুপিং ছাড়া আর কিছুই হচ্ছে না তেমন। সাহিত্যের কঠোর সমালোচনার চর্চা বাদ দিয়ে নিজেদের তেল দেয়ার রীতি একে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে অনেক। বর্তমানে ‘লোক’ ছাড়া আর কোন ছোটকাগজই নিজস্ব চরিত্রে নেই।

 

প্রশ্ন : দৈনিক বা অনলাইন নিউজে সাহিত্য বিভাগ থাকে। এই বিভাগটি সাহিত্যের কতটুকু উপকার করছে?

উত্তর : সাহিত্য হচ্ছে প্রকাশের শিল্প। লুকিয়ে থাকবার জন্য এর সৃষ্টি হয়নি। আর কোনোভাবে লুকিয়ে থাকলেও একদিন সবার মাঝে তা চলে আসবেই। প্রকাশের জন্য সব মাধ্যমই জরুরি। দৈনিক পত্রিকা আধুনিক সাহিত্যের সাথে পা মিলিয়ে চলতে চলতে এখন উত্তরাধুনিক পথের পথিকদের চিনিয়ে দিচ্ছে। এতে সাধারণ পাঠকরা একটা ধারণা অন্তত পাচ্ছে। তবে দৈনিক তাদের দায়িত্বের জায়গায় স্বচ্ছ নয়। এরা নিজেরা গ্রুপিংয়ের ফাঁদে পা দিয়ে বসে আছে। অন্যদিকে তরুণ থেকে শুরু করে সব বয়সীরা অধিকাংশ সময়ই এখন ভার্চুয়াল জগতে বিচরণ করে। ফলে অনলাইন সাহিত্যপাতাগুলো যেভাবে চেষ্টা করছে তাতে মনে হয় সাহিত্য প্রকাশে ও বিকাশে আগামীতে এরাই দাপট দেখাবে।

 

প্রশ্ন : লিটল ম্যাগাজিনের ম্রিয়মাণতা আর দৈনিকগুলোর উত্থান, এই দুইয়ের সুবাদে সাহিত্য একটি করপোরেট শ্রেণির কাছে বাঁধা পড়ছে কি না?

উত্তর : হ্যাঁ। এই ধারণাটি বা অভিযোগটি সত্য। পুঁজি যারা নিয়ন্ত্রণ করে তারা সংগ্রামকে দমাতে চাইবেই। পুঁজি কখনই নতুন চিন্তা, বিপ্লবী মতাদর্শিক সাহিত্য গড়ে উঠুক- এটা চায় না। ছোটকাগজের সৃষ্টি হয়েছে পুঁজির আশ্রয়ে পতিত শিল্প-সাহিত্যকে অস্বীকার করার সংগ্রামে। তাই পুঁজিকে সে অস্বীকার করবেই। এটা চিন্তার বিপ্লব। কিন্তু সুবিধাবাদী সম্পাদকদের ভুলে আজ ছোটকাগজ পতনের দিকে চলে গেছে অনেকটা। এটাকে ফিরিয়ে আনতে নতুন চিন্তার লেখক, কবিদের স্পেস দিতে হবে সকল দল, মত ভুলে। লিটলম্যাগের আদর্শ হতে হবে সাহিত্যের চূড়ান্ত গতির দিকে ধাবিত স্পর্ধা।

 

প্রশ্ন : আর পুরস্কার কী প্রভাব ফেলছে সাহিত্যে?

উত্তর : কারও কারও কাছে এর প্রভাব কিংবা গুরুত্ব আছে বৈকি। আমার কাছে পুরস্কারের কোনো গুরুত্ব নেই।   

 

প্রশ্ন : গ্রুপিংয়ের যে ফাঁদের কথা বললেন একটু আগে, গ্রুপিং করে আসলে কবি হিসেবে টেকা সম্ভব কি?

উত্তর : মিডিয়ার কল্যাণে যাদেরকে বিভিন্ন সাহিত্যের আলোচনায় দেখা যায়, তাদের কারও কোনো শ্রেষ্ঠ কাজ নেই। একটা ভাল কবিতাও লেখেননি তারা। তাহলে কিভাবে তারা এসব জায়গায়? আর বাংলা একাডেমি কাদের নিয়ে পড়ে আছে? কেন?

 

প্রশ্ন : নবীন কবিদের প্রবীণরা সহযোগিতা করেন না। সত্যিকারের কবিরা সেটা চায়ও না হয়তো। কিন্তু প্রবীণদের অসহযোগিতার কারণটা ঠিক কী? সিংহাসন হারানোর ভয়?

উত্তর : বাংলাদেশের সিনিয়র কবিরা নিজেদের সম্রাট ভাবেন। কিন্তু তাদের যারা(মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ)রাজ্য জয় করে দিয়েছেন, তাদের মূল্যায়নই ঠিকমতো করেন না। নবীনদের সিনিয়ররা(কবি ও সম্পাদক) সহযোগিতা করলে সম্ভবত বাংলা সাহিত্যের অবস্থা এত করুণ হতো না। ঠিক কতটা বাজে অবস্থায় আছে বাংলা সাহিত্য- সেটা বুঝতে হলে পৃথিবীর যে কোন সমৃদ্ধ দেশের লেখক, কবিদের আমাদের দেশের সমসাময়িক কবি বা লেখকের নাম জিজ্ঞেস করলেই বোঝা যাবে। কেউই চেনে না এখানকার লেখক কবিদের।      

 

প্রশ্ন :ছন্দের গুরুত্ব কতটা? সিনিয়ররা প্রায়ই অভিযোগ করেন, নবীনরা ছন্দ পারে না। আসলেই নবীনরা ছন্দ পারে না? নাকি তাদের আগ্রহের অভাবও হতে পারে?

উত্তর : ছন্দের গুরুত্ব ব্যাপক। বাংলা সাহিত্যে সমৃদ্ধ সব কবিতাই ছন্দে লেখা। সময়ের প্রভাবে ছন্দহীন ভাল কবিতা লিখতে ও আলোচিত হতেও দেখি। নবীনরা ছন্দ পারে না, এই অভিযোগটা সত্যি। আমি নিজেও খুব কাছ থেকে দেখেছি অনেক তরুণ কবিদের- যারা কেউই ছন্দ সম্পর্কে ধারণা রাখে না, তাই চর্চাও করে না। এটা ভাল কোনো লক্ষণ নয়। সমৃদ্ধ কবিতা চর্চায় ছন্দজ্ঞান থাকা চাই। এতে ভাষার উপর নিজস্ব শক্তি প্রয়োগ করা যায়। যারা ছন্দ জেনেও লিখে না তাদের কথা আলাদা।

 

প্রশ্ন :  বাংলা কবিতায় নানা বৈশিষ্ট্য-বৈচিত্র্য আছে। এর মধ্যে আপনার কবিতা কী স্বাতন্ত্র্য নিয়ে এসেছে। ঠিক কিসের তাগিদে লিখছেন?

উত্তর : আমার কবিতা মূলত শ্লোকবাস্তব কাজ। ইংরেজিতে মেজ রিয়েলিজম ধারা। এ ধারায় অতীতে কেউ লিখেছে বলে আমার জানা নেই। ‘বিচ্ছিন্ন নাবিক’ বইটি মেজ রিয়েলিজম ধারার বিশ্বসাহিত্যে প্রথম কবিতার বই। সময়ে এর শক্তি কিংবা অক্ষমতা টের পাওয়া যাবে। 

আর তাগিদের কথা আসলে বলব, লিখতে ভাল লাগে বলেই হয়তো লিখি। কবিতায় নিজেকে অন্যভাবে আবিষ্কারের আনন্দ আছে।

 

ধন্যবাদ, সুলতান।

ধন্যবাদ।


আরো পড়ুন-

পড়ার সাথে সাথে পর্যবেক্ষণের প্রকৃতিও বদলে যায় : অহ নওরোজ

 

//জেডএস//

লাইভ

টপ