দেড়যুগের ‘চিহ্ন’ : তারুণ্য-সত্তার উত্থান প্রয়াস

Send
সুবিদ সাপেক্ষ
প্রকাশিত : ১৪:১৩, নভেম্বর ০৪, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২৩, নভেম্বর ০৪, ২০১৭

চলাচল যদি বন্ধ হয়ে যায়, তৃণের আচ্ছাদনে লুপ্ত হয় পথ। তবুও তোমাদের ‘চিহ্ন’ এখন পূর্ণ যুবতীর সিঁথির মতো অমলিন’—এ ধরনের মন্তব্য শুনে আনন্দিত হলেও এ প্রাপ্তিতে সন্তুষ্ট নয় ‘চিহ্ন’। বরং এ ধরনের প্রাপ্তি সাথে নিয়ে আরও মহত্তর কল্যাণের পথে অগ্রসর হওয়াই ‘চিহ্ন’র ব্রত। আর এই ব্রত নিয়েই ২০০০ সালের ১ এপ্রিল ‘চিহ্ন’র জন্ম। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপদাহে জন্ম নেওয়া সদ্যোজাত ‘চিহ্ন’র লালন-পালনের দায় যার উপর ন্যস্ত তিনি একাধারে বড্ড জেদি, আবেগি আর প্রেমিক। তিনি জনক। আর জনকের এই তিন গুণের মিশেলে ধীরে ধীরে বড় হওয়া সন্তানের বয়স এখন ১৮ ছুঁই ছুঁই। জন্মের পরই ‘চিহ্ন’ ঘোষণা দেয়—‘সেইসব শেয়ালেরা ঠোঁট চেটে কিছুই হচ্ছে না রব তোলে তাদেরকে ‘চিহ্ন’ থেকে দূরে থাকতে বলা হচ্ছে।’ আবার ‘চিহ্ন’ তৃতীয় সংখ্যায় এসে আহ্বান জানাচ্ছে—‘এসো লিখিয়েসব লেখায় লেখায় ভাঙি মগজের কারফিউ।’ আর এ থেকে এর চরিত্রটিও সহজেই অনুমেয়। ‘চিহ্ন’র বাঁক বদলে ‘চিহ্ন’ ঘোষণা দিয়ে ২০০৯ সালে জন্ম দেয় ছোটকাগজ ‘স্নান’কে। নিজেকে নিয়োজিত করে বড় কার্যক্রমে মহীরুহের ভূমিকায়। সেই থেকে ‘চিহ্ন’ ছুটে চলেছে সাহিত্যের দিগ্বিদিক। ফেলছে ‘চিহ্ন’।

‘চিহ্ন’ একটি প্রকাশনা, একটি পত্রিকা, একটি চিন্তাশীল আড্ডাক্ষেত্র। প্রতি ছয় মাস পর নিয়মিত বের হয় ‘চিহ্ন’র নতুন সংখ্যা। নতুন এবং পুরাতন লেখকদের মিশেলে এ পর্যন্ত ‘চিহ্ন’র প্রকাশিত সংখ্যা ৩৩ টি। ‘চিহ্ন’প্রকাশনা থেকে নিয়মিত বই ও পত্রিকাও বের হয়। কবি-প্রাবন্ধিক জুলফিকার মতিন, কবি শেখ আতাউর রহমান কিংবা মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদের মতো প্রবীণ লেখকদের পাশাপাশি তুহিন ওয়াদুদ, কুমার দীপ, সজল সমুদ্রসহ অনেক নবীন এবং প্রতিশ্রুতিশীল লেখকদের বই প্রকাশ করেছে ‘চিহ্ন’প্রকাশন। ‘চিহ্ন’র সর্বশেষ এবং ৩৮তম প্রকাশনা কবি ও প্রাবন্ধিক জুলফিকার মতিনের ‘বাঙালি মুসলমান ও তার মন। এছাড়া ‘চিহ্ন’ একটি কিশলয় সাহিত্যক্ষেত্রও। অনলাইন ভিত্তিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ‘চিহ্ন’ সফট্ কপি আকারে পাওয়া যায়। ‘চিহ্ন’র যাবতীয় কার্যক্রম ‘চিহ্ন’ওয়েবপেজের মাধ্যমে বিস্তারিত জানা যায়।

মানিক, তারাশঙ্কর নাকি বিভূতি—শ্রেষ্ঠত্বের জায়গায় কে এগিয়ে? আর তাঁদের শ্রেষ্ঠত্বের হাতিয়ারই বা কী? তাঁদের লেখার মূল বিষয়বস্তু কী? তাদের নিজেদের দর্শনগুলো কেমন? তাদের লেখায় এর প্রভাবগুলো কতটা শক্তিশালী? নাকি তারা আপন আপন জায়গায় প্রত্যেককে শ্রেষ্ঠ! কে বেশি মেধাবী, মানিক না বঙ্কিম? চলে তর্ক, চলে আড্ডা। ‘চিহ্ন’আড্ডা। ‘চিহ্ন’র রবিবারের আড্ডা। স্থান ১৩০, শহীদুল্লাহ্ কলাভবন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। আড্ডারু প্রথম বর্ষ থেকে শেষ বর্ষ পর্যন্ত বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। আর আড্ডার প্রাণকেন্দ্র হয়ে যিনি বসে থাকেন তিনি ‘চিহ্ন’প্রধান ও ‘চিহ্ন’সম্পাদক শহীদ ইকবাল। তাকে আড্ডা চলাকালীন সময়ে মনে হবে খুব ব্যস্ত। যদিও আড্ডায় তর্ক জমে উঠলে মুখ টিপে টিপে হাসেন। আর আড্ডারুরা নিজেদের কথা শেষ করে সমাধানের আশায় ‘চিহ্ন’প্রধানের দিকে তাকান। অবশেষে ‘চিহ্ন’প্রধান আলোচ্য বিষয়ে যে আলোচনা করেন তাতে অনেক প্রশ্নের সমাধান আসে, সেই সাথে আসে অনেক নতুন প্রশ্ন, আসে আলো। ঘটে ভাবান্তর। বিষয়ের গভীরে গিয়ে কত দিক থেকে, কত আঙ্গিকে ব্যাখ্যাদানের প্রচেষ্টা যেন। আড্ডারুরা যে আলোটুকু ফুয়েল হিসেবে পান তাই নিয়ে তাদের কী বাহাদুরী! হাটে-ঘাটে-মাঠে সৃষ্টির অন্বেষণ। চিত্তের উন্নয়ন। নিজেকে লেখক হিসেবে আবিষ্কার করা। কবিতা, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ, উপন্যাস, সিনেমা, পথনাটক, মঞ্চনাটক ইত্যাদি হয় আড্ডার বিষয়।   

আগেই বলেছি, ‘চিহ্ন’র গর্ভ থেকে জন্ম নেয় ছোটকাগজ ‘স্নান’। ‘চিহ্ন’কর্মীদের মধ্যে একজন হয় ‘স্নান’ সম্পাদক। আর যাকে ‘স্নান’ সম্পাদনার দায়িত্ব দেয়া হয় তিনি হয়ে যান অন্য কেউ। অন্য মানুষ। একজন সাধারণ ছেলের অন্য মানুষ হয়ে যাওয়ার মন্ত্র ‘স্নান’-সম্পাদনা। তাকে দেখে মনে হয় যেন সে ঐশ্বরিক মন্ত্রে দীক্ষিত মানুষ। আপাত তাকে দেখে মনে হয় সে ময়লা, রুগ্ন, বেপোরোয়া, কারো কারো কাছে পাগলও মনে হতে পারে। ‘স্নান’ যেন তার কাছে মশাল। অন্ধকার দূর করবে সে। তার কাঁধে তখন কত দায়িত্ব। প্রথমত নিজেকে দায়িত্বশীল, শিক্ষিত, দেশপ্রেমিক হিসেবে মেনে নেওয়া। আর সেই দায় নিয়ে লেখক খুঁজে বের করা। যারা লিখতে পারেন না তাদেরকে, কী করে লিখতে হয়, কী করে ভাবতে হয়, তাকে কেন লিখতে হবে, মানুষ হিসেবে তার দায় কোথায় ইত্যাদির ভাবনা তার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া। আর এই প্রক্রিয়ায় চার মাস পর ‘স্নান’-এর নতুন সংখ্যা বের হয়। সাথে অনেক নতুন লেখক। ‘স্নান’-এ লিখতে লিখতে ওই লেখকরাই ক্রমশ ‘চিহ্ন’-এ লেখা শুরু করে। তৈরি হয় ‘চিহ্ন’র লেখক ঘরানা। এবং এই প্রক্রিয়ায় ১৮ বছর ধরে ‘চিহ্ন’র কর্মশীলতা তৈরি হয়েছে।

কয়েকটি সংখ্যার প্রচ্ছদ‘চিহ্ন’র বিকাশমান ধারায় মাঝে মাঝে ‘চিহ্ন’ লেখক-পাঠক-সম্পাদকদের মিলন ঘটিয়ে দেওয়ার কাজটি করেছে। ২০১০ সালে ‘চিহ্ন’ দশকপূর্তি উৎসব পালন করে ঘোষণা দেয় এবার থেকে ‘চিহ্ন’ লেখক-পাঠক-সম্পাদকের বৈশ্বিক সম্মিলন করবে। আর সেই থেকে— ‘‘‘চিহ্ন’ ছোটকাগজ মেলা-২০১১’’ করে। প্রথমবারই প্রায় অর্ধ-শতাধিক পত্রিকা অংশগ্রহণ করে এ মেলায়। ২০১১ এ মেলায় কবি আসাদ চৌধুরী, আনোয়ারা সৈয়দ হক, জাকির তালুকদারসহ আরও অনেক লেখক-সম্পাদক অংশগ্রহণ করেন। ২০১১ এ মেলায় ‘চিহ্ন’ ঘোষণা করে প্রতি তিন বছর পর পর ‘চিহ্ন’মেলার আয়োজন করবে ‘চিহ্ন’। এবং সৃজনশীল ও মননশীল শাখায় ‘চিহ্ন’পুরস্কার ও সম্মননা প্রদান করা হবে। এমন ধারাবাহিকতায় এরপরের মেলার আয়োজন হয়। যার শিরোনাম ‘চিহ্ন’মেলা-২০১৩ এপার বাঙলা-ওপার বাঙলা’। এ মেলায় দেশ-বিদেশের প্রায় শতাধিক পত্রিকা অংশগ্রহণ করে। এ মেলায় উপস্থিত হন লেখক সৈয়দ শামসুল হক, আনোয়ারা সৈয়দ হক, কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, প্রাবন্ধিক সনৎকুমার সাহা, কবি জুলফিকার মতিনসহ অনেকে। এরপর ২০১৬ তে তৃতীয় মেলারও আয়োজন করে ‘চিহ্ন’। এবার আয়োজনের আঙিনা আরো খানিকটা প্রসারিত, বড়। ‘চিহ্ন’মেলা-বিশ্ববাঙলা-২০১৬’ শিরোনামে লেখক-পাঠক-সম্পাদকের সফল বৈশ্বিক সম্মিলন ঘটায় ‘চিহ্ন’। এবারো দেশ-বিদেশের শতাধিক পত্রিকা অংশগ্রহণ করে। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন লেখক আনিসুজ্জামান। এছাড়া সেলিনা হোসেন, হাসান আজিজুল হক, সনৎকুমার সাহা, জুলফিকার মতিন ও পশ্চিমবঙ্গের লেখক ইমানুল হকসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। হাসান আজিজুল হকের সঞ্চালনায়  ওই মেলার মঞ্চে ‘বাঙালির চোখে শ্রেষ্ঠ বাঙালি’ নিয়ে হয় মনোমুগ্ধকর আড্ডা অনুষ্ঠিত হয়। এ মেলায় ‘চিহ্ন’ সৃজনশীল শাখায় মোস্তাক আহমাদ দীন ও মননশীল শাখায় শরীফ আতিক-উজ-জামানকে ‘চিহ্ন’পুরস্কার ও সম্মাননা প্রদান করে। এছাড়া দূর্বা (ঢাকা বিভাগ), পুষ্পকরথ (চট্টগ্রাম বিভাগ), কবিকুঞ্জ (রাজশাহী বিভাগ), প্রয়াসী (রংপুর বিভাগ), চৈতন্য (সিলেট বিভাগ) এবং পশ্চিমবঙ্গের কোরক, শিলিগুড়ির মল্লার ও কোচবিহারের তিতিরকে ছোটকাগজ সম্মাননা প্রদান করে। আসছে ২০১৯, ‘চিহ্ন’ আয়োজন করতে যাচ্ছে চতুর্থ ‘‘চিহ্ন’মেলা-চিরায়তবাঙলা—২০১৯’। এই মেলাকে সফল করার জন্য ‘চিহ্ন’প্রধান ও ‘চিহ্ন’কর্মীরা আগেভাগেই তাদের কর্মযজ্ঞ শুরু করে দিয়েছেন। ‘চিহ্ন মেলা চিরায়তবাঙলা-২০১৯’আপনি, আপনারা আমন্ত্রিত।

কার্যত, ‘চিহ্ন’-পত্রিকাকে ঘিরেই এ আয়োজনগুলো চলে। বছরব্যাপী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ্ কলাভবনে একগুচ্ছ তরুণ স্বপ্নাশ্রয়ী এ কাজে নিরত হন। স্মর্তব্য যে, ‘চিহ্ন’-পত্রিকা নিছক কোনো লেখা বা লেখকের সংকলন নয়। এর পরিকল্পনায় পূর্ণ দার্শনিক-চিন্তা বিরাজমান। প্রায় ৬০% তরুণের অংশগ্রহণ এর প্রাণশক্তি। বাকিরা বাংলা ভাষাভাষী যশস্বী লেখক। গত ৩৩টি সংখ্যায় পত্রিকাটির বিষয় ও প্রচ্ছদ পরিকল্পনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ের নান্দনিক গেট-আপ বাংলাভাষিক অঞ্চলে অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। পত্রিকাটি প্রতিটি সংখ্যায় ক্রোড়পত্র হিসেবে একটি শিরোনাম বেছে নেয়। এছাড়া আছে শ্রদ্ধাঞ্জলি, সাক্ষাৎকার, প্রবন্ধ-গল্প-কবিতা, বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সংস্কৃতিচর্চার খবরাখবর, কী লিখি কেন লিখি সিরিজ, নির্বাচিত পুস্তক ও পত্রিকা পরিচিতি, বই ও পত্রিকা সমালোচনা ও কিছু নির্ধারিত ধারাবাহিক। তবে বিভিন্ন সময়ে রুচির বদল ঘটিয়ে চিহ্নে বিষয়ের পরিবর্তন আনে। বর্তমানে এর ৩৪ সংখ্যার কাজ চলছে। এবার এর বিজ্ঞান বিষয়ক একটি বিভাগ যুক্ত হতে যাচ্ছে। এভাবে পরিকল্পনামাফিক নবীন ও প্রবীনের সমন্বয়ে ‘চিহ্ন’র যাত্রা অব্যাহত আছে। বস্তুত, ‘চিহ্ন’ বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর কাগজ নয়, এতে মানসম্পন্ন সকলের লেখাই মুদ্রণের প্রয়াস থাকে। তবে প্রান্তিক ও কেন্দ্র-বিরোধী একটি প্রবণতা পত্রিকাটি লালন করে। নানাভাবে তা চর্চারও হয়। ‘চিহ্ন’ তার অগ্রযাত্রায় চিন্তাশীল সকলের অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করে। 

//জেডএস//

লাইভ

টপ