পুরস্কার একটা প্রাপ্তি, দায়ভারও : আশরাফ জুয়েল

Send
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : অনন্য মুশফিক
প্রকাশিত : ১৯:০০, নভেম্বর ১৬, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:০০, নভেম্বর ১৬, ২০১৭

আশরাফ জুয়েল কবিতা ও ছোটগল্প লেখেন। এবছর যৌথভাবে জেমকন তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। জন্মস্থান : চাঁপাইনবাবগঞ্জ। বসবাস করেন ঢাকায়। পেশায় চিকিৎসক।

 

প্রথমেই আপনাকে অভিনন্দন জানাই। জেমকন তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার পাবার সংবাদ শুনে কেমন লাগছে?

অভিনন্দন জানানোর জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। পুরস্কার একটা প্রাপ্তি, পুরস্কার একটা দায়ভারও। পুরস্কারকে প্রাপ্তি হিসেবে ভাবলে অবশ্যই আনন্দিত হয়েছি, ভীষণ আনন্দিত। এই আনন্দকে ঠিক কীভাবে প্রকাশ করা যায়? যেমন ধরুন তীব্র বৃষ্টিতে হাতের ছাতাটাকে বন্ধ রেখেই বৃষ্টিতে ভেজা অথবা একটা হলদে ঘাস ফড়িঙ-এর ক্ষণে ক্ষণে দৃশ্য পরিবর্তন করার ফলে হৃদয়ে তৈরি হওয়া অনুরণন, এরকম আরকি। আবার দায়ভার হিসেবে ভাবলে শঙ্কিত হচ্ছি- দায় এবং ভার দুটো একসাথে বহন করা সত্যিই দুরূহ কাজ। তবে হ্যাঁ, এতদিনে হয়তো আনন্দ, দায় অথবা ভার এসব বহন করার অভ্যাস তৈরি হয়ে গেছে, সংসার করা মানুষ আমি। তবে এখন আমাকে যেটা করতে হবে সেটা হল, নিজেকে সামলানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এটা কঠিন কাজ। লেখালেখির চাইতেও কঠিন, তবে টিকে থাকতে হলে এই কঠিন কাজকে সহজ করে তুলতেই হবে। 

 

পুরস্কার পেয়ে কি বিশেষ কিছু মনে হচ্ছে?

সত্যি কথা বলতে ‘হচ্ছে’, ‘বিশেষ’ কিছু বলেই মনে হচ্ছে। আমার প্রতিদিনের দেখা দৃশ্যাবলীকে অথবা অবচেতন মনের ভাবনাগুলোকে অসংখ্য শব্দে রূপান্তরিত করে থরে-বিথরে সাজিয়ে নিজের মতো করে গড়ে তোলা হয়ত সহজ, কিন্তু পাঠকের সামনে সেটার উন্মোচন? আসলে প্রকাশিত হবার লোভ মানুষের জন্মগত। এ বড় ঝক্কির কাজ। তবুও এ কাজটা আমরা- মানে লেখক’রা নিয়মিত করি, করি বলেই এই পুরস্কার প্রাপ্তির ব্যাপারটা প্রত্যেক লেখকের কাছেই বিশেষ কিছুই। এ এমন এক ‘বিশেষ কিছু’ যেটাকে সংজ্ঞায়িত করা অসম্ভব।

 

‘রাষ্ট্র ধারণার বিরুদ্ধে মামলা এবং বিবিধ গল্প’ লিখতে শুরু করেছিলেন কবে?

প্রত্যেকটা মানুষ একেকটা গল্প- জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি। জন্মের পূর্বে থেকে বা মৃত্যুর পরেও এই গল্প বহমান। তাই ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় আমার গল্প’রাও বেড়ে উঠেছে। প্রত্যেকের ভেতরেই এই ব্যাপারটা ঘটে চলেছে। তবে ‘রাষ্ট্র ধারণার বিরুদ্ধে মামলা এবং বিবিধ গল্প’ লেখার একটা নির্দিষ্ট কাল বা সময় আছে। ২০ জানুয়ারি, ২০১৫। পরের দিন আমার ছোট সন্তানের একটা জটিল অপারেশন। এ কথা শুনে আমার মা- বাবা রাতের বাসে ঢাকার উদ্দেশ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে রওনা হলেন। রাজশাহীর ভদ্রা নামক স্থানে তাদেরসহ অন্যান্য যাত্রীদের উদ্দেশ্যে পেট্রল বোমা ছুঁড়ে মারা হল। বিরোধী রাজনৈতিক জোটের ডাকা লাগাতার হরতালে সারা দেশেই এই অরাজকতা, মানুষ শঙ্কিত। মাকে হাসপাতালে নেয়া হয়, পরের দিন আগুনে পুড়ে যাওয়া তার মুখের ছবি প্রকাশ পায় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। চ্যানেলে চ্যানেলে তার সাক্ষাতকার! মাকে ঢাকা নিয়ে আসা হয়। দুঃসহ যন্ত্রণা সহ্য করে প্রায় ২১ দিন পর মাকে নিয়ে বাড়ি ফিরি, মার এমন বীভৎস চেহারার সাথে আমরা অপরিচিত। মামলা করার সিদ্ধান্ত নেই, রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে মামলা। মামলা আমি করতে পারিনি। আমার সমস্ত আক্রোশ গিয়ে পড়ে রাষ্ট্র ধারণা’র উপর। আমি লেখা আরম্ভ করি। আমার এই বিশ্বাস জন্মায় ‘রাষ্ট্র ধারণা’ একটা ভ্রান্ত ধারণা। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে আরম্ভ করি- রাষ্ট্র আসলে মানুষকে শোষণের একটা হাতিয়ার। বরং দেশ ভাবনা আমাকে প্রশান্তি দেয়- ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি।’  

 

আপনি কীভাবে লেখেন? কখন লেখেন?

দিন দিন আমি নিজের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছি। পরিবারের কাছ থেকে, সন্তানদের কাছ থেকে, পিতামাতা বা সমাজের কাছ থেকে- ক্রমশই দূরে সরে যাচ্ছি। এটা ভয়ানক। নিকটবর্তী হচ্ছি এক অচেনা জগতের- অনবরত মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকে অস্পষ্ট, ধূসর, ঘোলাটে কিছু অবয়ব। ভাবনাগুলোকে অবমুক্ত করে দেই আমি। ইচ্ছামতো উড়ে বেড়ায় ওরা। উড়তে উড়তে কেউ কেউ আর ফিরে আসে না। আবার অনেকেই ফিরে আসে- ক্রমশ স্পষ্ট, উজ্জ্বল, পরিষ্কার হয়ে গেঁথে যায় হৃদয়ের দলিলে। তখনই লিখি- স্মৃতির খাতায় লিখে রাখি। পেশাগত ব্যস্ততা! তবুও সময়- সময় পেলেই বসে যাই- দিন রাত বা নির্দিষ্ট কোন ক্ষণে নয়। তবে হ্যাঁ- জ্যাম আমার জন্য আশীর্বাদ। জ্যামে বসে বসে লিখি। লিখতেই থাকি।

 

কার কার গল্প আপনার ভালো লাগে?

বাংলা ভাষার রবীন্দ্রনাথ। তার হাতেই বাংলা ছোটগল্পের পত্তন, পরিচর্যা, বিকাশ। এটা অস্বীকার করার সামর্থ্য এই পর্যন্ত কারও হয়নি। শরৎচন্দ্র- তিনিও। রাজশেখর বসু, প্রমথ চৌধুরী। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর। বনফুল, সৈয়দ মুজতবা আলী। সোমেন চন্দ। মহাশ্বেতা দেবী। সমরেশ, শীর্ষেন্দু। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। সৈয়দ শামসুল হক। আল মাহমুদ। হাসান আজিজুল হক। সেলিনা হোসেন। শহীদুল জহির। হুমায়ূন আহমেদ। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। নাসরিন জাহান। ইমদাদুল হক মিলন। মঈনুল আহসান সাবের। জাকির তালুকদার। আহমাদ মোস্তফা কামাল। আর এখনকার সময়ের প্রায় সবার। বিশ্বসাহিত্যে মোপাসাঁ, এলেন পো, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, নাথালিয়ন হর্থন, নিকোলাই গোগোল। বিচ্ছিন্নভাবে আরও অনেকের গল্প পড়া হয়েছে। সত্যিকারার্থে অনেক কিছুই পড়া এখনও বাকি।  

 

আপনার গল্প বিষয়ক ভাবনা কী?

নির্দিষ্ট করে তেমন কোন ভাবনা নেই। তবে লিখতে চাই। অনেক অনেক গল্প লিখতে চাই। অনেক অনেক ভালো গল্প লিখতে চাই। আমার না-লেখা লেখাগুলো লিখতে চাই। লিখতে চাই মানুষের গল্প- তবে মানুষের জন্য নয়। যাই লিখি না কেন নিজের কাছে দায়বদ্ধ থেকেই লিখবো।

 

লিখতে পরিবারের সদস্যরা উৎসাহ দেয়?

না। হ্যাঁ। না। হ্যাঁ। তাদের ব্যাপারটা ঠিক এমনই। কেনই বা দেবে? দেবে নাই বা কেন? বাচ্চাদের থেকে সময় ধার করি, বাচ্চারা জানে এই সময় আর কোনদিনও শোধ করতে পারব না আমি, এ কথাটা আমিও জানি। আমার স্ত্রী- ভীত, ভীষণ ভীত, ভীত বাবা মা। অথচ আড়ালে প্রশংসা। আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। স্বাচ্ছন্দ্য কি তা আমার সন্তানেরা সবে বুঝতে আরম্ভ করেছে। আমি বা আমার বাবা স্বাচ্ছন্দ্য শব্দটির অর্থ জানতাম না। তাই সন্তানরা আরও চায়, পিতামাতা ততোটা নয়- তবুও চায়, সহধর্মিণীও নয়- কিন্তু তারা চাইতেই পারে। এটা তাদের অধিকার। আবার আমার শব্দের- গল্পের- উপন্যাসের- কবিতারও সমান অধিকার। আমি মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজেকে তুলে দেয়- দুই পক্ষের কাছে নিজের পুরোটাই তুলে দেই, ওরা আনন্দিত হয়।  

 

আপনি কবিতায় সিরিয়াস, কিন্তু গল্পে পুরস্কার পেলেন। বন্ধুরা আর কবি বলবে?

উপন্যাস লিখছি। চিত্রনাট্য লেখার প্রস্তাব পেয়েছি।                       

//জেডএস//

লাইভ

টপ