‘ম্যাজিক ল্যাম্প’ নিয়ে বেন অকরির জাদুবাস্তবতার আড্ডা

Send
রাশহা মুনতাকা
প্রকাশিত : ১৩:২১, নভেম্বর ১৭, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২৫, নভেম্বর ১৭, ২০১৭

ইলশেগুঁড়িতে ঢাকা লিট ফেস্টের প্রথম দিনের জনসমাগম অন্যবারের চেয়ে কম হয়নি। বেশ কিছু প্রাণবন্ত বৈঠকের মাঝে একটি ছিল অশোক ফেরেইয়ের সঙ্গে বেন অকরির আড্ডা 'ম্যাজিকাল টেইলস'। আয়োজিত হয় আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ অডিটোরিয়ামের মঞ্চে। আলোচনার মূল বিষয়বস্তু বেনের বই 'ম্যাজিক ল্যাম্প'। জাদুর চেরাগের মতোই জাদুবাস্তবতা আর জীবন, শিল্প মিলেমিশে একাকার সেই আড্ডা ছিলো গল্পে-প্রশ্নে মুখর। উঠে এসেছে নাইজেরিয়ান পোস্ট-কলোনিয়াল পোস্টমডার্ন কবি ও ঔপন্যাসিক বেন অকরির লেখাযাত্রার ভেতর বাহিরের কথা, জাদুর ও বাস্তবতার কথা। 

অশোক ফেরেইয়ের সঙ্গে বেন অকরির আড্ডা

একজন সমসাময়িক আঁকিয়ের আঁকা পঁচিশটি ছবিকে কেন্দ্র করে পাঁচ বছর জুড়ে লেখা পঁচিশটি পদ্যাকারের গল্প নিয়ে বইটি সাজানো। বেনের ভাষ্যমতে, এটি একটি আনইন্টেনশিনাল বা অনিচ্ছাকৃত বই। এর পেছনে ছিল না লেখার কোনও চাপ, না ছিল ভাবনা গ্রন্থিত করার ইচ্ছে। কেবল একটা করে গল্প লিখে একটি নির্দিষ্ট বাক্সে ফেলতেন তিনি। এভাবেই তৈরি হয়ে গেল বইয়ের রসদ।

বেন জানালেন, দুই ধরনের দুনিয়া রয়েছে যার একটি গোপন আর আরেকটি সেই গুপ্ত দুনিয়ার ওপরের আবরণ। সবাই ওই গহীনে যায় না। হয়তো পারে না, হয়তো চায়ও না। দীর্ঘ দৃষ্টিপাত প্রয়োজন যেকোনও শিল্পের ক্ষেত্রে।

প্রশ্নে উত্তরে জানা গেল, প্রফেটিক কবিত্ব সম্পর্কে বেনের ভাবনা। বেনের মতে দৈবের সম্পর্ক নেই এই শিল্পের সঙ্গে, বরং কবি যখনি ভাববেন যে, তিনি এমন কিছু দেখতে পান যা বাকিরা পায় না, সে মুহূর্তেই তার কবিত্ব কাটা পড়ে যায়।

ব্যাপারটা শক্ত হলেও আসলে প্রফেসির সঙ্গে যোগ নেই ভবিষ্যতের। বরং দেখবার, বোধ করবার, শোনার গভীরতাই এখানে মূল বিষয়। বর্তমানই আসলে ভূত-ভবিষ্যতের একক স্টেশন। আমাদের বাস্তবতা পরিবর্তনশীল, আর নিজের মুখের সামনের মুখোশটা সরিয়ে দিতে পারলে দেখবার ভঙ্গি, দৃষ্টিকোণ অনেকটাই পাল্টাবে, সামনের বিষয়বস্তুকে দেখা সহজতর হবে। একবার দেখে কোনোকিছুই পুরোপুরি জানা যায় না। অনেক সময় অন্য কারর হাতেও থাকতে পারে কবির দৃষ্টির নিয়ন্ত্রণ। আবার একই জিনিস একেক সময় একেক রকম দেখায়। কবির জীবনে আর তার চারপাশের সংস্কৃতিতে যে পরিবর্তন আসে, যা ঘটে যায় তার সবই বিভিন্ন দিক থেকে এসে জোটে লেখনীতে। 

সবাইকে আশ্চর্য করে দিয়ে বেন বললেন, তার আশ্চর্য প্রদীপের গল্প যেটা কিনা লুকানো থাকে সবার মস্তিষ্কে, নিজ দায়িত্বে যার হদিস জানতে হয় কেননা এর জন্যে চোকাতে হতে পারে অনেক দাম। তিনি বলেন, ‘সৃষ্টিশীলতা, সৃষ্টি, এমনকি অনুপ্রেরণার জন্যেও মূল্য পরিশোধ করতে হয়।’ 

বেন বললেন লেখালেখির অদ্ভূত শক্তির কথা। লেখক কী দেখাতে চান পাঠককে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। কবির ব্যক্তি পরিচয়ের সঙ্গে সঙ্গে তার ভেতরকার আবেগ ও কৌশল মিলেমিশে তৈরি হয় তার সৃষ্টি। বেনের লেখায় ডিসটোপিয়ান শহরের ছবির কথা উঠতে তিনি বলেন, শহর হলো শোরগোল আর সৃষ্টিশীলতার দারুণ মেল। তিনি দেখেছেন যুদ্ধ, মৃত্যু আর সেই সঙ্গে মানুষের সহমর্মিতা। ছোটবেলা থেকেই তার মাথায় গিজগিজ করতো জটিল সব প্রশ্ন। তাই থেকেই এতো লেখা, এতো ভাবনার শিল্পায়ন।

প্রশ্নোত্তর পর্বে ভি এস নাইপলের উক্তি টেনে বেন বলেন, লেখালেখির জন্যে অনেক স্বার্থত্যাগের প্রয়োজন, শ্রমের সঙ্গে দিতে হয় মনস্তাত্ত্বিক মূল্য।

কী করে একই জিনিসকে প্রতিবারের দেখায় অন্যরকম লাগে তার উত্তরে বেন বলেন, ‘তিনটি প্রভাবকের কারণে এমনটি হয়– প্রথমটি হলো আলোকপাত, মানুষের ওপর, সময়ের ওপর; দ্বিতীয়টি মানুষ নিজেই, মানুষ সারাক্ষণই পাল্টাতে থাকে আর আমরা সবকিছুর মাঝে আমাদেরকেই মূলত দেখি; তৃতীয়টি হলো যেকোনও বস্তুর নিচের জল, সেটির ভেতরকার নিজস্বতা।

বনে বলে চলেন, যেকোনও সৃষ্টির পরেই শিল্পী আসলে মারা যায়, মধুমক্ষী যেমন হুল ফুঁটিয়েই মারা পড়ে; সৃষ্টি পরিপূর্ণতায় শুষে নেয় নিজের সৃষ্টিকর্তাকে। তিনি জানান, পেইন্টিংয়ের সঙ্গে লেখার তফাত। লেখায় থ্রি-ডাইমেনশনাল (ত্রিমাত্রিক) ভাবনাগুলো ফুটিয়ে তোলা কঠিন তাই তিনি তৈরি করেন ভ্রান্তি, লেখার মোড়ে মোড়ে, একে তিনি বলেন 'মারাদোনা' কৌশল!

লেখাকে তুলে ধরতে গিয়ে বেন বলেন, তিনি অপেক্ষায় বিশ্বাসী, একই সঙ্গে প্রয়োজন সময়োপযোগিতার। বেন চান ‘মানুষ আরও শুনুক, স্থির হোক, তবেই দৃষ্টির সার্থকতা ছাপ ফেলবে শিল্পে’।

.

লাইভ

টপ