শনিবার ।। রবিশংকর বল

Send
.
প্রকাশিত : ১২:০০, ডিসেম্বর ১২, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:০৭, ডিসেম্বর ১২, ২০১৭

আজ সকালে পশ্চিমবঙ্গের লেখক রবিশংকর বল মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি জন্মেছিলেন ১৯৬২ সালে। পূর্বপুরুষের বাড়ি বাংলাদেশের বরিশালে। তিরিশ বছর ধরে লিখেছেন পনেরোটির বেশি উপন্যাস, পাঁচটি ছোটগল্পের সংকলন। দোজখনামা’র জন্য পেয়েছেন বঙ্কিমচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার।

খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। লোকটা আমার দিকে তাকিয়েই আছে। হাতে ধরা গ্লাস থেকে চা খেতেও ভুলে গেছে। এমন তার তাকানোর ভঙ্গিমা- যেন অদূরেই একটা দূরবীন বসানো আমার সামনে- সে আমাকে একটা খোলা বইয়ের মতো পড়ে নিতে চাইছে। এমন কিছু কিছু দৃষ্টি আছে, যা মানুষের চোখকে বদলে দেয়, সে তখন শুধু তাকিয়ে থেকেই কাউকে নগ্ন করে দিতে পারে।
লোকটার বয়স সত্তরের কাছাকাছি তো হবেই, পাকানো চেহারা, মাথার সামনে টাক, পেছন দিকে সাদা বাবরি চুল, পরনে ময়লা ধুতি-পাঞ্জাবি, চোখে মলিন চশমা। সে আমার দিকে তাকিয়ে কী যেন বিড়বিড় করে বলছে নিজের মনেই। মাঝে মাঝে ঠোঁটের কোণে কি বাঁকা হাসি ফুটে উঠছে? তাড়াতাড়ি চা শেষ করে নিকুঞ্জদাকে পয়সা দিয়ে আমি দোকান থেকে বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। এ অনেকটা পালিয়ে আসা, সেই তাকানো থেকে, এমনকি নিজের থেকেও।

কিছুদূর এগোতেই পিছন থেকে ডাক শুনতে পেলাম, ‘শুনছেন ভাই-।’ ফিরে তাকিয়ে দেখলাম, লোকটা। এখন আর পালানোর উপায় নেই, লোকটা পেছন-পেছন চলে এসেছে।

-   আমাকে বলছেন? বিরক্ত গলায় বলি

-   আপনার বাবা কি সুরেন্দ্রনাথ নাগ? লোকটা আমার মুখে কী যেন  খুঁজতে-খুঁজতে বলে।

-   না।

-   ও। সুরেন্দ্রনাথ আমার বন্ধু ছিল। আপনাকে একেবারে ওর মতো দেখতে। দেশভাগের সময় এ-পারে আসতে গিয়ে কোথায় যে চলে গেল। পরে কার কাছে যেন শুনেছিলাম, এই কালীঘাট অঞ্চলেই থাকে। তাই খুঁজতে বেরিয়েছিলাম। ছোটবেলার বন্ধু তো-। আমার নাম অনাদি আচার্য।

-   ঠিকানা জানেন?

-   না। তাহলে তো কাথাই ছিল না। ঠিক খুঁজে বের করতাম। কতজনকে জিজ্ঞেস করলাম-

-   এত বড় অঞ্চলে কোথায় তাকে খুঁজে পাবেন? আমি হেসে বলি, ‘যান, বাড়ি চলে যান। আপনারও তো বয়স হয়েছে।

-   হু। লোকটা কিছু সময় আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে পিছন ফিরে হাঁটা দেয়। আমি তার দিকে তাকিয়ে থাকি। হ্যাঁ, আমি সুরেন্দ্রনাথ নাগের বড় ছেলে, লোকটাকে বললে কী ক্ষতি ছিল? কিন্তু লোকটা সুরেন্দ্রনাথের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে-। বাবা তো এখন আর কাউকে চিনতে পারে না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।

আজ শনিবার। কালী মন্দিরের দিকে যাওয়ার রাস্তায় ভিড়। আমি ভিড়ের ভিতরে মিশে গিয়ে ভাবি, তবু অনাদি আচার্য তো চিনতে পারত। আমরা তার কাছ থেকে বাবার শৈশব-কৈশোরের অনেক গল্প হয়তো জানতে পারতাম। …কিন্তু অনাদি আচার্যও যদি সব ভুলে গিয়ে থাকে? হয়তো সে জানেই না, আসলে কাকে খুঁজতে বেরিয়েছে।

এসব ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছুই বলা যায় না।   

//জেডএস//

লাইভ

টপ