রাইফেল, রোটি, আওরাতে সময়ের চিহ্ন

Send
মো. মেহেদী হাসান
প্রকাশিত : ১২:১৫, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৩৮, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৭

এক.

কথাসাহিত্য তার দেহে সময়ের প্রবল চিহ্ন রেখে যায়। এটা কথাসাহিত্যের সাধারণ বৈশ্ষ্ট্যি। আনোয়ার পাশার রাইফেল,  রোটি, আওরাতে  সময় তার চিহ্ন রেখে যাবে এটাও সাধারণ প্রত্যাশা। কিন্তু ১৯৭১ সালে মার্চের শেষ আর এপ্রিলের প্রথমে দিকে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া নিষ্ঠুরতম ঘটনাবলি যখন উপন্যাসের বিষয় হয়ে ওঠে তখন সময় আর শুধু চিহ্ন রেখে যায় না। সময় তখন কর্তা হয়ে ওঠে। আমরা মনেই করতে পারি  রাইফেল,  রোটি,  আওরাত  নামে কোনো উপন্যাসই লেখা হতো না যদি না ১৯৭১ সালের ঘটনাবলি সংঘটিত না হতো। সময়ই এ উপন্যাসটি লিখিয়ে নিয়েছে আনোয়ার পাশার হাত দিয়ে সুদীপ্ত শাহিনের দৃষ্টিকোণে। সুদীপ্ত শাহিন আসলে আনোয়ার পাশার আরেক নাম। পাকিস্তান শাসনকালের অবিকশিত মধ্যবিত্তের একজন সুদীপ্ত শাহিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,  যে প্রতিষ্ঠানটা বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই করে যুদ্ধটাকে অবশ্যাম্ভাবী করে তুলেছিলো সুদীপ্ত শাহিন তারই অধ্যাপক। অনেকটা রচয়িতা আনোয়ার পাশার মতোই। বিশ্ববিদ্যালয়ে সবাই মুক্তিযুদ্ধেও পক্ষে নয়। ড. খালেক যখন মানুষের পরিচয়ে ধর্মকে প্রধান উপাদান করে তুলে ধরতে চায় তখন সুদীপ্ত বলে,  ‘বাঁচার দৃষ্টিতে হিন্দু-মুসলমান সত্য নয়। সত্য হচ্ছে মানুষ।’ আমরা মনে করতে পারি, নজরুলকে যিনি ঔপনিবেশিক শাসনকালে এমন করেই উচ্চারণ করেছিলেন,  ‌হিন্দু না মুসলিম ঐ জিজ্ঞাসে কোন জন, কাণ্ডারী বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মার।’ আমরা দেখবো,  এ মনোভঙ্গি ধারণকারী নির্বিরোধী অধ্যাপক সুদীপ্ত শাহিনের দৃষ্টিতে উন্মোচিত হচ্ছে একটি ধ্বংসাত্মক নিষ্ঠুরতার কতিপয় ছবি। তাঁর চিন্তার সূত্রটা দেখি তাহলে দেখবো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান- স্রোতটার প্রতিই তার পক্ষপাত। কিন্তু বিরুদ্ধ স্রোতটা রচয়িতা বাদ দিয়ে যাচ্ছেন না। একটা তীর্যক,  বিদ্রূপাত্মক ভঙ্গিতে পাকিস্তানি ডিসকোর্সটাও তুলে ধরছেন। ‌‌‌‌‌

বাখতিন মনে করতেন, ‌ ‘উপন্যাস ‌‌‌‌প্রত্যক্ষ বাস্তবতার শিল্প।’ যে প্রত্যক্ষ বাস্তবতা হত্যা-মৃত্যু আর ধ্বংসের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয় তার প্রকরণটা আর দশটা সাধারণ প্রকরণের মতো হতে পারে না। তাই অভ্যস্ত প্রকরণের বাইরে এর প্রকাশ। যুদ্ধ-আক্রান্ত একটা জনপদের ছবি এটি। তাই এর প্রকরণটাও আরামের নয়। কষ্ট করেই এটা অর্জন করতে হয়। সুদীপ্ত শাহিনের মনোযাতনার সঙ্গী হয়েই বাঙালির ইতিহাসটা পাঠ করতে হয় এ উপন্যাসে।

 

দুই.

উপন্যাসটা শুরু হচ্ছে এভাবে: ‘বাংলাদেশে নামল ভোর। ভোরেই ঘুম ভাঙ্গে সুদীপ্তর। আজো তার ব্যতিক্রম হ’ল না। হ’তে পারতো। কতো রাত অবধি ঘুম হয় নি। আজো তো সারারাতেই মাঝে মাঝেই গুলির আওয়াজ শোনা গেছে। আর ভয় হয়েছে। মৃত্যু ভয় নয়। মৃত্যুকে আর ভয় লাগে না। তবে যদি বেঁচে থাকতে হয় তখন? এমনি আগুন আর গুলি-গোলা নিয়ে কি মানুষ বাঁচে?’  আবার উপন্যাসটা শেষ হচ্ছে : নতুন মানুষ, নতুন পরিচয় এবং নতুন একটি প্রভাত। সে আর কত দূরে। বেশি দূরে হ’তে পারে না। মাত্র এই রাতটুকু তো! মা ভৈঃ। কেটে যাবে’। শুরু ও শেষের দুটো ভোরের মধ্য দিয়ে রাত কেটে যাবার ইঙ্গিতময় ভাষাটুকু ছাড়া আর কোথাও ভাষার কারুকাজ করার চেষ্টা নেই। আরাম করে পড়ার মজাটুকুও নেই। দুএকটি অতি নির্দোষ দাম্পত্য-পারিবারিক সিকোয়েন্স ছাড়া সবটুকু একটি জাতির ওপর নেমে আসা নিষ্ঠুর অত্যাচার আর ধীরে ধীরে প্রতিরোধের আগমন ধ্বনি নিয়েই এ উপন্যাস। এর বাইরে বাঙালির জাতিসত্তার টিকে থাকার মনস্তাত্ত্বিক লড়াইটা আছে। এ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে আমরা পৌঁছে যাই মুক্তিযুদ্ধের জীবন সত্যে। যে সত্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধেরই এক মনস্তাত্ত্বিক জীবন ভাষ্য।

পঞ্চাশের দাঙ্গার পর সুদীপ্ত পশ্চিমবঙ্গ থেকে ঢাকায় চলে আসে। কিন্তু যে নামটা সে নিয়ে আসে তা অচল হয়ে পড়ে এদেশে। মুসলমানদের দেশে সুদীপ্ত শাহিন নামটি অচল তাই এফিডেভিট করে নাম পাল্টিয়ে চাকরি নিতে হয় তাকে। এ প্রসঙ্গে উপন্যাসের নামটাও আমরা স্মরণ করতে পারি। রাইফেল, রোটি, আওরাত । এটি একটি উর্দু ভাষার উপন্যাস হতে পারতো। কিন্তু হয়েছে বাংলা উপন্যাসের নাম। দুটো দিক ইঙ্গিত করে এ নামকরণ। এর ভাষা আর এর ভাষায় প্রকাশিত তিনটি উপাদান। যুদ্ধের জন্য এ তিনটির দরকার হয়। পাকিস্তানের মুসলমানদের এ তিনটি ছাড়া চলে না যুদ্ধের সময়। পাকিস্তানের বিশ্বস্ত খাদেম ড. মালেকের বাসা থেকে ‘তিন তিনটে খুবসুরৎ আওরাত, চল্লিশ ভরি জেওয়ার, পাঞ্চশো রুপেয়। এ সবি মালে গণিমাৎ,  অতএব হালাল।’ বলে তিনটি নারীকে তুলে নিতে তারা এভাবে ব্যাখ্যা দিচ্ছে।

আর এ ঘটনায় সুদীপ্তের সঙ্গে আলাপ কালে তারই সহকর্মী ড. মালেকের আপন ভাই ড. খালেক বলে, “আর্মিও জেনারসিটি দেখুন,  মেয়েদের ফেরত পাঠাবার সময় চিকিৎসার জন্য তিন শো টাকাও দিয়েছে। দে আর কোয়াইট সেন্সিবল ফেলো।”  নিজের ভাইয়ের বৌ আর মেয়েদের সঙ্গে পাকিস্তানি সৈন্যদের আচরণ এমন করে গ্রহণ করে ড. খালেক। বলা হয়ে থাকে জীবন গল্পের চেয়েও রোমাঞ্চকর। আর এ উপন্যাসতো জীবনের ভাষ্য। গল্পের নয়। তাই এটাকে যুদ্ধকালে পাকিস্তানের বাঙালি সমর্থকদের সাধারণ অভিব্যক্তি বলেই মনে হয়। ড. খালেকের কাছে পাকিস্তানের ঐক্যের প্রতীক ধর্মীয় পরিচয় মাত্র। সে বলে,  “হিন্দু বা মুসলমানের ভেদাভেদটাই যদি না থাকল তা হলে পাকিস্তান হিন্দুস্তানের ভেদাভেদটাই বা থাকল কোনখানে?  অতএব হিন্দু বা মুসলমানের ভেদাভেদ যারা না মানবেন তারা পাকিস্তানি আদর্শের বিরোধী।” পুলিশের বাঙালি সদস্য হাসিম সেখের একটা ভাষ্য পাচ্ছি এমন: “চার শ্রেণির মানুষ ওরা দেশ থেকে নির্মূল করবে- বুদ্ধিজীবী, আওয়ামীলীগার,  কমিউনিস্ট ও হিন্দু।” এ ভাষ্য থেকে সুদীপ্ত শাহীন একটা উপসংহারে আসে তা এমন: “চমৎকার প্ল্যান। আওয়ামী লীগ খতম হলে অন্যান্য বামপন্থী দলগুলিকে কমিউনিস্ট,  তার মানেই নাস্তিক কাফের আখ্যা দিয়ে দুদিনেই ঠান্ডা করে দেওয়া যাবে। বুদ্দিজীবী সাবাড় হলে বেহুদা স্বাধীন চিন্তার বালাই দেশে থাকবে না।”

 

তিন.

এ গল্পে যেমন পাচ্ছি ড. মালেক,  তার ভাই ড. খালেককে তেমনি পাচ্ছি ফিরোজের চাচা গাজী মাস-উদ রহমানকে যে রাজারবাগ পুলিশ লাইন থেকে বেঁচে যাওয়া তিন প্রতিরোধকারী পুলিশ সদস্যকে মিলিটারির হাতে তুলে দিচ্ছে এ যুক্তিতে যে,  ‘আশ্রিত যদি আমার নিজের জীবনের শত্রু হ’ত আমি তাকে জীবনের বিনিময়ে হলেও রক্ষা করতাম। কিন্তু এই পাক ওয়াতানের সঙ্গে বেঈমানী কিছুতেই আমরা সইবো না।” গণহত্যা সম্পর্কেও তার অভিমতটা মনে করা যেতে পারে: “নরহত্যার সমর্থক আমরা নই,  তবে আমাদেরই কর্মেও ফলে ইয়াহিয়া খানকে যে এই নরহত্যার পথ বেছে নিতে হয়েছে সেই সত্যকে তো বাবা অস্বীকার করতে পারবে না।”  ফিরোজ তার স্ত্রীকে নাজমা নামে না ডেকে মীনাক্ষী নামে ডাকায় তিনি বলছেন,  ‘একজন মুসলমানকে হিন্দু বানানো যে কতো বড় কবীরা গুনাহ, তা জান?’  ফিরোজ সাহস করে জবাব দিচ্ছে না। কিন্তু সংস্কৃতির মূল জায়গাটা নিয়ে সে ভাবছে: ‘বাঙালিকে খোট্টা বানানোর চেষ্টা তার চেয়েও জবর গুনাহ’। এভাবে পরস্পর বিরোধী ডিসকোর্স-এর মুখোমুখি হচ্ছি আমরা,  সংস্কৃতির গভীরতম দেশে যার অবস্থান। এসব চরিত্র-নাম ইতিহাস থেকে সরাসরি নেওয়া নয় কিন্তু এদের আচরণ ঐতিহাসিক। এদেরই মতো করে ভেবেছিলো,  আচরণ করেছিলো সে সময়ে কতিপয় বাঙালি। কিন্তু এটি যেহেতু ঐতিহাসিক ঘটনার প্রত্যক্ষ বিবরণ সেহেতু সরাসরি ঐতিহাসিক নামও পাচ্ছি আমরা। আইয়ুব খান,  ইয়াহিয়া খান,  টিক্কা খানরা যেমন আছে তেমনি আছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও। এঁদের প্রত্যেকের ভাষা আলাদা। প্রত্যেকের আকাঙক্ষার রূপও ভিন্ন। ড. মালেককে আইয়ুব খান বলছেন: ‘তোমাদের অধঃপতনের মূলটা কোথায় জান! তোমাদের ঐ ভাষা। ঐ ভাষা তোমাদের যতদিন থাকবে ততদিন হিন্দুদের গোলামী থেকে তোমরা মুক্ত হতে পারবে না।’  আইয়ুব খানের এ ধরনের উচ্চারণের পাশাপাশি শেখ মুজিবুর রহমানকে পশ্চিম পাকিস্তানের রেডিওতে ‘দেশের শত্রু, বিশ্বাসঘাতক’  বলছে ইয়াহিয়া খান তখন সুদীপ্তের মনে পড়ে যায়,  সাতই মার্চের কণ্ঠস্বর : ‘রক্ত যখন দিয়েছি প্রয়োজন হলে আরও রক্ত দেব। দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইন্শাল্লাহ।’   এটা আসলে সুদীপ্তের একার নয়,  যুদ্ধকালের নয় মাস মুক্তিযোদ্ধাদের চেতনায় এ ভাষণ অনুপ্রেরণা হয়ে বিরাজ করেছিলো। একটা জাতির যৌথ মনস্তত্ত্বেও প্রতিরূপ সুদীপ্ত শাহিন। বাঙালির আশা,  আশাভঙ্গ বেদনার যেমন স্বপ্ন কল্পনার প্রতীক সুদীপ্ত শাহিন।

এসব ঐতিহাসিক চরিত্রের পাশাপাশি পাচ্ছি,  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শিক্ষকদের মধ্যে ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব,  ড. ফজলুর রহমান,  ড. মুকতাদির,  ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার মতো ব্যক্তিদের। সুদীপ্তর সঙ্গে তাদের স্মৃতি আর মৃত্যুর বিবরণে উপন্যাসের ভাষা ভারী হয়ে যাচ্ছে। উপন্যাস পড়তে পড়তে পাঠক বেঁচে থাকা সুদীপ্তর জন্য স্বস্তি বোধ করতে করতে এক সময় বেদনায় নীল হয়ে উঠবে যখন মনে পড়বে সুদীপ্ত আসলে রচয়িতা নিজেই। যে কি না উপন্যাসটি লেখার ৬মাসের মধ্যে মৃত্যুর মুখোমুখি হবে। যে এ উপন্যাসের শুরুতেই বলেছিলো: ‘অমন সহজ মৃত্যু তার ভাগ্যে ছিলো না’। আসলে এ মৃত্যুই তার জন্যে অপেক্ষমাণ ছিলো।

প্রত্যেক সাহিত্য সময়কে ধারণ করে কিন্তু সময় তার চালিকা শক্তি হয়ে ওঠে না সব সময়। এ উপন্যাসে সময় একটা চরিত্র আর মানুষগুলো এক একটা ইতিহাসের উপাদান হয়ে ওঠে। তাই এ উপন্যাসকে বলা যায়, বাঙালি জাতিসত্তার স্বতন্ত্র কাঠামো নির্মাণে একটি কালিক দলিল।

//জেডএস//

লাইভ

টপ