আমি মুক্তিযুদ্ধ করিনি, কিন্তু...

Send
.
প্রকাশিত : ০৯:০১, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:১৭, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৭

[কাজী আরিফ আহমেদ মুক্তিযুদ্ধের সময় পঞ্চম শ্রেণিতে কুমিল্লা জিলা স্কুলে পড়তেন। তখন তার যুদ্ধে যাবার বয়স হয়নি,  কিন্তু দেশে কিছু একটা হচ্ছে আঁচ করতেন। ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনেছেন পরেরদিন রেডিও-তে। মহল্লার বড় ভাইদেরকে যুদ্ধে যেতে দেখেছেন, তাদের ফিরে আসার গল্প শুনেছেন। তাদের হারিয়ে যাওয়ার কথা শুনতে শুনতে উদীপ্ত হয়েছেন। এভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রবেশ করেছে তার রক্তে, সে চেতনা ধারণ করে কাজের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সময় অবস্থান করেছেন ২৩টি দেশে। কুয়েত, সৌদি আরবে মুখোমুখি হয়েছেন-যুদ্ধ ফেরত পাকিস্তানিদের সঙ্গে। তাকে বার বার উত্তর দিতে হয়েছে নানান অযৌক্তিক প্রশ্নের। কথা বলতে গিয়ে যখন দেখলেন উর্দুভাষা না শিখলে পাকিস্তানিদের বুঝাতে পারবেন না। তখন ৬ মাসে র্উদু ভাষা শিখেছেন। এমন দৃঢ় সংকল্পের কাজী আরিফ আহমেদের সঙ্গে কথা বলেছেন কাজী মোহাম্মদ আলমগীর।]

কাজী মোহাম্মদ আলমগীর : ২৫ তারিখ রাতে আপনাদের বাড়ির পাশে কী হয়েছিল?

কাজী আরিফ আহমেদ : ২৫ মার্চ রাতের বেলায় কুমিল্লা টি এন্ড টি একচেঞ্জ অফিসটি আক্রান্ত হয়। আমরা গুলির আওয়াজ শুনি। নিরাপত্তার জন্য আমরা আমাদের বাসার পেছনে চলে যাই। সেখানে লেকের মতো একটা জায়গায় আমরা আত্মগোপন করি। পরদিন সকালে শুনি একচেঞ্জের লোকদেরকে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের বাসার কাছে পত্রিকা অফিসের সামনে একজনকে রাস্তার ওপর গুলি করে হত্যা করে। লোকটা রিক্সা চালাতো। রিক্সা বন্ধ করে ঘরে ফিরছিল। আমরা ভাবলাম নদী পাড় হয়ে পেছনে আমাদের পুরাতন বাড়িতে যাব। আমাদের নতুন বাড়িতে কলাবাগান ছিল। কলা গাছ কেটে ভেলা বানানো হয়। নদী পাড় হতে দেখে প্রতিবেশিদের অনেকে বলল,  আমরা কোথায়  যাব?  আমাদের কী হবে? একথা শুনে আমার বড় ভাই বলেলেন, তাদেরকেও সাথে লইয়া লও। সকলে মিলে পুরাতন বাড়িতে ঠাঁই নেই।

 

কাজী মোহাম্মদ আলমগীর : আপনি কি তখন মুক্তিযুদ্ধ বুঝতেন?

কাজী আরিফ আহমেদ : না বুঝতাম না। আমি তখন ফাইভে  জিলা স্কুলে পড়ি।যারা সেভেন-এইটে পড়ত তারা যুদ্ধে গিয়েছিল। একজনের নাম মনে পড়ছে, সফিক ভাই।  তিনি যুদ্ধে গিয়েছিলেন। সফিক ভাইয়ের সাথে তার অন্য অনেক বন্ধু যুদ্ধে গেছেন। তবে রেডিওতে বড়দের সাথে ৭ই মার্চের ভাষণ শুনেছি। দেশে কিছু একটা হচ্ছে বুঝতাম। সবকিছু পরিস্কার হলো ৭২ সালে যখন এলাকায় বড় ভাইরা ফিরে এলেন। নঈম ভাই ফিরে এলেন। বীর প্রতীক জামাল ভাই ফিরে এলেন। জামাল ভাইদের বাসায় আসতেন মেজর হায়দার। তখন বিভিন্ন মহল্লায় যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা হতো। আমাদের নতুন বাড়ি তখন মাঠের মতো। সামনে পুকুর। পাশে অসংখ্য গাছ। আমরা এখানে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলতাম।

 

কাজী মোহাম্মদ আলমগীর : মুক্তিযুদ্ধ,  স্বাধীনতা, শেখ মুজিব, বাংলাদেশ প্রশ্নে আপনি বিদেশে নানান প্রসঙ্গের সম্মুখিন হয়েছেন, কারা প্রশ্ন করত?

কাজী আরিফ আহমেদ :  ৮৪ সালে আমি পলিটেকনিকে পড়ালেখা শেষ করি। কলেজে এডমিসন থাকা সত্ত্বেও সার্ভেয়ারের জব নিয়ে কুয়েতে যাই। একটা পাওয়ার স্টেশনে আমার কাজ । অই স্টেশনের ছয় লক্ষ কিউবিক মিটার কংক্রিট টেস্ট চলছিল। আমি ছিলাম ল্যাব টেকনেশিয়ান। এখানে এসে দেখি অসংখ্য পাকিস্তানি। এদের নব্বই ভাগ যুদ্ধ ফেরত। এরা আমাদের অনেক আগে এসেছে। যুদ্ধ শেষে পাকিস্তানে ফিরে গিয়ে কুয়েতে এসেছে। পাম্প ড্রাইভার, মিক্সার কার অপারেটরসহ বিভিন্ন শ্রমিক পদে পাকিস্তানিরা কাজ করত। উচ্চতর পদে ইন্ডিয়ান এবং জাপানিরা কাজ করত। কুয়েতে তখন ডেবলাপমেন্ট ওয়ার্ক চলছে। তখন পাকিস্তানিদের সাথে কথা বলতে গিয়ে সমস্যায় পড়ি। তারা আমার কথা বুঝে না। আমি উর্দু বলতে পারি না। সব কথার শেষে হায় যুক্ত করি। তাতে কি উর্দু হয়?  হয় না। উর্দু আমি শিখতাম না। শিখতে বাধ্য হলাম। তারা যখন শুনে আমি বাংলাদেশের লোক তখন তারা বলতো,  দেশ ভাগের জন্য শেখ মুজিব দায়ী। ইন্ডিয়ার চালে দেশ ভাগ হয়েছে। সব বাঙালির দোষ। ইন্ডিয়া পাকিস্তানকে ভেঙ্গেছে। তাদের এসব কথা আমি বুঝতাম। কিন্তু তারা আমার কথা বুঝতো না। উর্দু শিখবই জেদ ধরলাম। কাউকে শিক্ষক ধরে নয়। উর্দুভাষিদের  সাথে কথা বলতে লাগলাম। লক্ষ্য করলাম তেমন কঠিন না। হিন্দি ভাষায় প্রায় ৬০ বা ৭০ ভাগ শব্দ উর্দু রয়েছে। তখন আমাদের কোম্পানিতে পাকিস্তানিদের প্রায় সবাই ছুঠিতে দেশে গেছে। ছয় মাস পর ফিরে এসে তারা দেখে আমি তাদের চেয়ে ভালো উর্দু জানি। তারা তো অবাক। এবার আমার বলার পালা। তারা আমার কথা বিশ্বাস করে। যুক্তিও মানে। কিন্তু আমাকে বলে তুই কি যুদ্ধ করেছিস?  তুই এতো কিছু জানিস কী করে? আমি বলি হাঁ আমিও যুদ্ধ করেছি। এবার তারা জব্দ। তাদের মধ্যে যারা আরো প্রমাণ খুঁজে তাদেরকে বলি, দেখ আমার পা দেখ। তারা আমার পা দেখে। আমার পায়ে গ্রেনেডের স্প্লিন্টারের দাগ ছিল। তা দেখে তো তারা আর কোনো কথা বলতে পারে না। পাকিস্তানি এবং ইন্ডিয়ান সকলে বলে, কাজী মুক্তিযোদ্ধা হায়।

 

কাজী মোহাম্মদ আলমগীর :  আপনার পায়ে স্প্লিন্টারের দাগ এলো কোত্থেকে?

কাজী আরিফ আহমেদ :  বলব। রিয়াজ নামে একজন পাকিস্তানি ছিলো। আমরা পাশাপাশি থাকতাম।  সে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্র বিজ্ঞান অথবা অন্য কোনো সাবজেক্টে অনার্স পড়তো । সে পড়াশুনা ছেড়ে দিয়ে কুয়েতে চাকরি করতে আসে। তার সাথে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তার আর আমার তর্কাতর্কি চলতো। সে আমার চেয়ে বয়সে বড় হবে। সে এমন কিছু বলতো যা আমার কাছে পরে সত্য মনে হয়েছে। তাকে যখন বলতাম,  শেখ মুজিবের নেতৃত্বে  সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সত্ত্বেও তোমরা পশ্চিম পাকিস্তানিরা  মুজিবকে ক্ষমতা দাওনি। তখন সে বলেছিলো, কীভাবে দেবো, মুজিব কি প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছে? সে বলতো, শেখ মুজিবের ছয় দফা, ১১ দফা,  মুদ্রানীতি- এসব কার্যকর হলে কি পাকিস্তান থাকে? মুজিব দুই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবে কি করে?  আমরা পশ্চিম পাকিস্তানিরা কি মেনে নেব? আসলে বঙ্গবন্ধু তখনই জানতেন তাঁর গন্তব্য স্বাধীন একটি রাষ্ট্রের দিকে। রিয়াজের এসব কথা বুঝতে আমার সময় লেগেছিলো। 

 

কাজী মোহাম্মদ আলমগীর :  যুদ্ধ ফেরত পাকিস্তানি যাদের আপনি সেখানে দেখা পেলেন তাদের সম্পর্কে বলুন।

কাজী আরিফ আহমেদ  :  এদের মধ্যে অনেকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ছিল। আমাকে বলতো,  তুমি বাংলাদেশের কোন অঞ্চলের। আমি বলতাম কুমিল্লা। তারা তখন কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট কথা বলতো। চকবাজার ফাঁড়ির কথা বলতো। একজন বলতো সে যুদ্ধের সময়- গারা মুক্তি মারা। এগারো জন মুক্তিযোদ্ধা মেরেছে। সে সিলেটে কোনো বনের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা আহত হয়েছিলো। তার পায়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল। আমি তাকে বলতাম,  তুমি মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা আহত হয়েছো ঠিক। কিন্তু মেরেছ নিরীহ সাধারণ মানুষ। আমি এ কথা বার বার বলতাম। সে তখন চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতো। তার চোখের দিকে তাকালে মনে হতো সে যেন বলতে চায়- তুই জানিস কী করে।

 

কাজী মোহাম্মদ আলমগীর : যুদ্ধে বাঙালি হত্যার প্রসঙ্গে তারা কী ধরনের কথা বলতো?

কাজী আরিফ আহমেদ :  কেউ কেউ খুব আক্রমণাত্বক কথা বলতো,  খুব এগ্রিসিভ। মুক্তি বাহিনী মেরেছে, মানুষ মেরেছে। কেউ কেউ মুখ খুলতো না। সৌদি আরবে একজন বেলুচকে পেয়েছিলাম। আমি আমার গাড়ি পরিস্কার করার জন্য লাইনে দিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। যেখানে অপেক্ষা করছিলাম ওই স্থানগুলোকে বলা হয় মাছলা। লোকটা মাছলায় এগিয়ে এলো। এসে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কোন দেশি। আমি বললাম, বাংলাদেশি। বাংলাদেশের কোন জায়গায়? বললাম কুমিল্লায়। কুমিল্লা শুনে সে আগ্রহী হয়ে ওঠলো। সে বললো,  আমি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ছিলাম। আমি বেলুচ। আমি সৈনিকটিকে বললাম, তুমি তখন সেকেন্ড ল্যাফটেনেন্ট। সে বলল, হাঁ। তারপর সে বিস্ময় নিয়ে জানতে চায়,  তুমি একোরেট বললে কী করে। সে জানালো, প্রমোশনের পর সে পাকিস্তান চলে যায়। তাকে যুদ্ধ করতে হয়নি। কুয়েতে একজন বৃদ্ধের সাথে আমার কথা হয়। সে ছিল রেডিও টেকনেশিয়ান। সে ভাসানির কথা বলতো। তার স্মৃতিতে শুধু ভাসানি। বলতো তোমাদের লিডার ভাসানি। একদিন লাহরে খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো। সবাই চললো ছাতা মাথায়। সবাই বলছে বাংলাদেশের ভাসানি এসেছে। ভাসানি কী বলেছে তার মনে নেই। শুধু এ কথা মনে আছে,  আগ লাগা দো, আইয়ুবকা গদিমে আগ লাগ দো। আগ লাগা দো। ইন্ডিয়ানরা বলতো, ইন্ডিয়া বাংলাদেশকে আজাদ করে দিয়েছে। আমি তাদেরকে বলতাম, আমরা যুদ্ধ করেছি। তোমরা আমাদের সাহায্য করেছ।

 

কাজী মোহাম্মদ আলমগীর : আপনার পায়ে স্প্লিন্টার...

কাজী আরিফ আহমেদ : বলছি। তখন ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৮৬ সাল। কুয়েতে সারে চার হাজার বাঙালি। আমি দেশে থাকতে লিও ক্লাব করতাম। লিও ক্লাবের অনুষ্ঠানে একটা অনার সেশন থাকতো। এর দায়িত্বে থাকতাম আমি। আমি এখানেও এমন একটা অনুষ্ঠান করবো ভাবলাম। অনার সেশন করবো। মাল্যদান করবো। মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা দেবো। দাওয়াত দিতে শুরু করলাম। একেই সাথে মুক্তিযোদ্ধা খুঁজতে লাগলাম। একজন ক্যাটার পিলার ম্যাকানিক পেলাম। ওনার নাম মনে করতে পারছি না। শুনলাম ওনি মুক্তিযোদ্ধা। বললাম,  আপনি মুক্তিযোদ্ধাদের একটা লিস্ট তৈরি করেন। তিনি আমার কথায় রাজি হলেন। একদিন তিনি কুমিল্লার একজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে এলেন,  আমি তো আবাক,  তিনি আমাদের বুলবুল ভাই। ঝাউতলার শামীম ভাইয়ের বড় ভাই। ভালই হলো সহযোগিতার হাত বাড়ল। আমি অবাক হয়েছি,  সেখানে আমাদের মধ্যে গান গাওয়ার লোক পেলাম, অভিনয় করার লোক পেলাম, কাগজ কেটে কোলাজ করার লোক পেলাম। পাকিস্তানিরা কিভাবে ঘর বাড়ি পুড়িয়েছে এর কোলাজ ছবি মঞ্চের দেয়ালে লাগানো হয়েছে। পাকিস্তানি আর্মিদের ইয়া বড় বড় গোঁফসহ ভয়ানক মুখ কোলাজ করা হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যে বুলবুল ভাই এবং ওই ভদ্রলোক মিলে এগারোজন মুক্তিযোদ্ধা খুঁজে পেলেন। এগারো জনের নাম লিস্ট করা হলো। অনুষ্ঠানের আগের দিন আমাকে লিস্ট দেখানো হলো। লিস্ট হাতে নিয়ে দেখি এক নম্বরে আমার নাম। আমি বললাম, ভাই আমার নাম কেন? ওনি বললেন আপনি মুক্তিযোদ্ধা না? আমি মুক্তিযোদ্ধা আপনাকে কে বলল? এখানকার ইন্ডিয়ান আর পাকিস্তানিরা যে বলে আপনি মুক্তিযোদ্ধা। আপনি যুদ্ধ করেছেন। আপনার পায়ে গুলির দাগ আছে। আমি যদি মুক্তিযোদ্ধা হই তাহলে যুদ্ধের সময় আমার বয়স কত? আমার কথায় তিনি অবাক হলেন। তখন আমি বললাম, পাকিস্তানিদের যুদ্ধ সম্পর্কে কথা বললে- তারা বিশ্বাস করতো না। তারা যুক্তি মানতো না। তখন আমি বলতাম আমি যুদ্ধ করেছি এবং আমি আমার পায়ের কাটা দাগটা দেখাতাম। সাইকেল থেকে পরে গিয়ে ছোটবেলা এ দাগটা হয়। দেখতে স্প্লিন্টার দাগের মতো। আমার সব কথা শুনে তিনি আমার নামটি কেটে দেন। আমি বুলবুল ভাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে সমস্ত অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করি। বিশাল হলরুমে ইন্ডিয়ান এবং পাকিস্তানি এ অনুষ্ঠান উপভোগ করে। জাপানি, ব্রিটিশ, কুয়েতি নাগরিকরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল। যারা জানতো আমি মুক্তিযোদ্ধা তারা দেখলো সংবর্ধনাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে আমি নেই।

 

 

 

 

//জেডএস//

লাইভ

টপ