কাজুও ইশিগুরোর নোবেল ভাষণ আমার বিশ শতকীয় সন্ধ্যা ও অন্যান্য সাফল্য

Send
অনুবাদ : মনসুর আলম
প্রকাশিত : ১৩:০৫, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৪০, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৭

৭ ডিসেম্বর সুইডিশ একাডেমিতে ভাষণ দিচ্ছেন কাজুও ইশিগুরো।

১৯৭৯ সালের শরতে আমার সঙ্গে আপনাদের হঠাৎ দেখা হয়ে গেলে আমার সামাজিক কিংবা জাতিগত অবস্থান শনাক্ত করা বেশ কঠিন মনে হতো। তখন আমার বয়স ছিল চব্বিশ বছর। আমার চেহারায় জাপানি ভাবটা দেখতে পেলেও ওই সময়ে ব্রিটেনে দেখা অন্যান্য জাপানিদের মতো ছিলাম না; ঘাড় পর্যন্ত লম্বা চুল ছিল; নিচের দিকে নামানো ডাকাতিয়া গোঁফ ছিল। আমার কথার মধ্যে আলাদা করে চেনার মতো একমাত্র বিষয় ছিল ইংল্যান্ডের দক্ষিণের কাউন্টিগুলোতে বেড়ে ওঠা কারো মতো উচ্চারণভঙ্গি। মাঝেমধ্যে হিপি যুগের গত হয়ে যাওয়া ভাষার মতো নিস্তেজ একটা ভাবও বোঝা যেত আমার কথার মধ্যে। আমরা যদি কোনো বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা করে থাকতাম তাহলে আমাদের আলাপের বিষয় হিসেবে থাকতে পারত হল্যান্ডের টোটাল ফুটবলারদের কথা, বব ডিলানের সর্বশেষ অ্যালবাম, কিংবা লন্ডনের গৃহহীন মানুষদের সঙ্গে আমি যে এক বছর কাজ করেছি সদ্যো সমাপ্ত সে সময়টার কথা। যদি জাপানের কথা উল্লেখ করতেন এবং জাপানের সংস্কৃতি সম্পর্কে আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করতেন তাহলে ওই দুটো বিষয়ে আমার অজ্ঞতার কথাই বলতাম; দেখতেন, আমার বলার ভঙ্গির মধ্যে কেমন একটা অধৈর্যের ভাব ঢুকে পড়ছে। হয়তো জানাতাম, পাঁচ বছর বয়সে ছেড়ে আসার পরে সে দেশে আর যাইনি, ছুটি কাটাতেও যাইনি কখনও।  

কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, গিটার আর বহনযোগ্য একটা টাইপরাইটার নিয়ে সে শরতে আমি এসে হাজির হলাম ইংল্যান্ডের নরফোকের বাক্সটন নামক ছোট এক গ্রামে। গ্রামের চারপাশে পুরোনো একটা পানির কল আর সমতল খামারি জমিজমা। ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাঙ্গিলায় এক বছর মেয়াদী ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ের পোস্টগ্রাজুয়েট করার জন্যই এখানে আসা। ইউনিভার্সিটি দশ মাইল দূরে গির্জার শহর নরউইচে। আমার তখন গাড়ি ছিল না এবং সেখনে পৌঁছানোর একমাত্র উপায় ছিল বাসে যাতায়াত। সে বাসও চলত সকালে একবার, দুপুরের খাবারের সময় একবার এবং সন্ধ্যায় একবার। শীঘ্রই বুঝতে পারলাম, এটা কোনো অভাবের বিষয়ই নয়। ইউনিভার্সিটিতে সপ্তাহে দুদিনের বেশি আসার দরকার হতো না। একটা ছোট বাড়ির একটা রুম ভাড়া নিয়েছিলাম। মালিকের বয়স তখন ত্রিশের কোঠায়; তার স্ত্রী কিছুদিন আগে তাকে ছেড়ে চলে গেছেন। তার জন্য বাড়িটা তার পুরোনো ভাঙা স্বপ্নের প্রেতাত্মায় ভরা, তাতে সন্দেহ নেই। কিংবা হতে পারে, তিনি আমাকে এড়িয়ে চলতে চাইতেন। এমনও হতো, দিনের পর দিন তার সঙ্গে আমার দেখাই হতো না। অন্য কথায়, লন্ডনে কাটানো উন্মত্ত জীবনের পর এখানে এসে পেলাম নীরবতা আর নিঃসঙ্গতার জীবন; এরকম পরিবেশই দরকার ছিল নিজেকে লেখক বানানোর জন্য।  

আসলে আমার ছোট রুমটা ক্ল্যাসিক লেখকদের চিলেকোঠার মতো ছিল না। মাথার ওপরের ছাদ আতঙ্ক জাগানোর মতো ক্রমশ নিচু ছিল; তবে পায়ের আঙুলের ওপর ভর করে দাঁড়ালে জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখা যেত: বহুদূর পর্যন্ত চলে গেছে শুধু চাষের জমি। রুমের মধ্যে একটা ছোট টেবিল ছিল। টেবিলটার প্রায় সবটুকু জুড়ে থাকত আমার টাইপরাইটার আর ডেস্ক ল্যাম্প। মেঝেতে বিছানার বদলে ছিল তিনকোণাকার একটা ফোম; সেটার ওপরে শুয়ে ঘুমের মধ্যে গরমে আমার গা ঘেমে উঠত, এমনকি নরফোকের কঠিন ঠান্ডার রাতেও।

ওই রুমে বসেই আগের গ্রীষ্মে লেখা দুটো গল্প খুব যত্নের সঙ্গে পরীক্ষা করে দেখেছি, গল্পদুটো আমার নতুন সহপাঠীদের দেখানোর মতো ভালো মানের হয়েছে কি না।(তখন জানতাম, আমাদের ক্লাসে মোট ছয়জন আছি, দুসপ্তাহ পরপর আমাদের দেখা হতো।) আমার জীবনের ওই সময়টাতে মানসম্মত কথাসাহিত্য হওয়ার মতো তেমন খুব বেশি কিছু লেখা হয়নি। বিবিসির জন্য একটা রেডিও নাটক লিখেছিলাম, ফেরত এসেছিল সেটা। নাম বলতে ওই আর কি। আর এর আগে আমার দৃঢ় বিশ্বাস গড়ে উঠেছিল,আমি বিশ বছর বয়সে রকস্টার হবো। সে কারণে তখন আমার সাহিত্যিক অভিলাষ খুব অল্পদিন হলো আমার মনের গোচরে এসেছে মাত্র। 

যে দুটো গল্প নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করছিলাম সে দুটো লেখা হয়েছিল এক রকম আতঙ্ক থেকে, ইউনিভার্সিটি কোর্সে আমাকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য স্বাগত জানানো হয়েছেÑএই খবরের প্রতিক্রিয়া স্বরূপও লেখা হয়েছিল সে দুটো। একটা লেখা হয়েছিল ভয়ংকর আত্মহত্যার চুক্তি হিসেবে। আরেকটা লেখা হয়েছিল স্কটল্যান্ডের রাস্তায় মারামারি সম্পর্কে। কমিউনিটি কর্মী হিসেবে সেখানে আমি কিছুদিন কাটিয়েছিলাম। গল্পদুটো খুব ভালো মানের ছিল না। এরপর আরেকটা লেখা শুরু করি; এক কিশোরের নিজের বিড়ালকে বিষ প্রয়োগের কাহিনি ছিল সে গল্প। সমসাময়িক কালের ব্রিটেনের মতোই ছিল পটভূমি। তারপর ওই রুমে আমার তৃতীয় কি চতুর্থ সপ্তাহের এক রাতে হঠাৎ নতুন অপরিহার্য ঐকান্তিকতা থেকে আমার লেখা শুরু হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকের জাপান সম্পর্কে, আমার জন্মভূমি নাগাসাকি সম্পর্কে লেখা শুরু করি।

উল্লেখ করতেই হবে,ওই অভিজ্ঞতা আমার নিজের কাছেই বিস্ময় হয়ে দেখা দেয়। আজকের দিনের আবহটা স্বাভাবিকভাবেই এমন যে,  মিশ্র সংস্কৃতির ঐতিহ্যের আবহে বেড়ে ওঠা কোনো সম্ভাবনাময় অল্পবয়সী লেখকের জন্য তার লেখার মধ্যে নিজের শিকড় সন্ধান করাটা একেবারেই সহজাত। কিন্তু সে সময়ে এমনটা ছিল না। ব্রিটেনে বহুসংস্কৃতির সাহিত্যের বিস্ফোরণ থেকে বেশ কয়েক বছর দূরেই ছিলাম আমরা। সালমান রুশদির কেবল একটা উপন্যাস প্রকাশ হয়েছে, তবে বাজার থেকে একবার শেষ হয়ে যাওয়ার পরে আর পাওয়া যায়নি- এমন অবস্থা। তখনকার দিনে ব্রিটেনের প্রথম সারির উঠতি লেখকদের নাম উল্লেখ করতে বললে লোকে মার্গারেট প্যাবলের নাম বলত;বয়স্ক লেখকদের মধ্যে নাম শোনা যেত ইরিস মারডক,কিংসলি এমিস, উইলিয়াম গোল্ডিং, অ্যান্টনি বার্জেস,জন ফাওয়েলস প্রমুখের নাম। বিদেশিদের মধ্যে অল্পবিস্তর পড়া হতো গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, মিলান কুন্ডেরা, বোর্হেসের লেখা। অনেক আগ্রহী পাঠকের কাছেও তাঁদের নাম অর্থহীন ছিল।

জাপান সম্পর্কে আমার প্রথম গল্প শেষ করার সময়টা এরকমই ছিল। একটা নতুন দিক খুঁজে বের করার ফলে খুব শীঘ্রই আমার মধ্যে কৌতুহল জাগতে থাকে: এই নতুনত্বকে আত্মতৃপ্তি হিসেবে দেখা যাবে কি না, আমাকে বেশি মাত্রার স্বাভাবিক বিষয়বস্তুর দিকে তাড়াতাড়ি ফিরে আসা উচিত কি না ইত্যাদি। বেশ অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব পার হয়ে তবেই আমি চারপাশের মানুষদের আমার গল্প দেখানো শুরু করি। আজ পর্যন্ত আমার সহপাঠী,আমার শিক্ষক ম্যালকম ব্র্যাডবেরি, অ্যাঞ্জেলা কার্টার,ওই বছরের রাইটার-ইন-রেসিডেন্স ঔপন্যাসিক পল বেইলির কাছে তাঁদের দৃঢ় এবং উৎসাহদায়ক প্রতিক্রিয়ার জন্য আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। তাঁরা যদি খানিকটা কম ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাতেন তাহলেও আমার পক্ষে আর কখনও জাপান সম্পর্কে লেখা সম্ভব হতো না। তারপর আমার রুমে ফিরে আমি অবিরাম লিখতে থাকলাম।

১৯৭৯-৮০ সালের শীতের পুরোটা সময় এবং বসন্তেরও কিছুটা সময় জুড়ে মাত্র কয়েকজন মানুষ ছাড়া সত্যিকার অর্থেই আমি কারো সঙ্গে কথাই বলিনি। যাদের সঙ্গে কথা বলেছি তাদের মধ্যে ছিল আমার অন্য পাঁচজন সহপাঠী, গ্রামের মুদি দোকানী, তার কাছ থেকে আমি সকালের নাস্তার খাবার এবং ভেড়ার যকৃত কিনতামÑ ওইগুলো খেয়েই বাঁচতাম তখন;আরেকজন ছিল আমার বান্ধবী লোরনা (এখন আমার স্ত্রী)। লোরনা দুসপ্তাহ পরপর দেখা করতে আসত। ওই জীবনটার মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য ছিল না। তবে ওই চার পাঁচ মাসের মধ্যে আমার প্রথম উপন্যাস ‘আ পেল ভিউ অব হিলস’-এর অর্ধেকটা লিখে শেষ করে ফেলি। এটারও পটভূমি নাগাসাকি। আণবিক বোমা-পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার সময়ের নাগাসাকি। মাঝে মাঝে মনে পড়ে,ওই সময়টাতে জাপানের পটভূমি ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে ছোটগল্প লেখার চেষ্টা করে দেখেছি। তবে বুঝতে পেরেছি, আমার আগ্রহ দ্রুত কমে যাচ্ছে।

ওই মাসগুলো আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জীবনের ওই সময়টা ছাড়া আমি লেখক হতেই পারতাম না। তারপর থেকে পিছনে ফিরে তাকিয়ে নিজেকেই জিজ্ঞেস করেছি,তখন আমি করছিলামটা কী? এই অদ্ভূত শক্তিটা আসলে কী ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর হলো,জীবনের ওই সময়টাতে আমি সংরক্ষণের একটা অদ্ভূত জরুরি কাজে ব্যস্ত ছিলাম। এ কথার ব্যাখ্যা করার জন্য আমাকে একটু পেছনের দিকে যেতে হবে।

১৯৬০ সালের এপ্রিল মাসে আমার বাবা মা এবং বোনের সঙ্গে পাঁচ বছর বয়সে আমি ইংল্যান্ডে আসি। জায়গাটা লন্ডন থেকে ত্রিশ মাইল দক্ষিণে ফটকা ব্যবসায়ীদের বিত্তবান এলাকা,সারের গিলফোর্ড। আমার বাবা ছিলেন গবেষক বিজ্ঞানী একজন মহাসমুদ্রবিদ। তিনি ব্রিটিশ সরকারের জন্য কাজ করতে এসেছিলেন। যে যন্ত্রটা তিনি আবিষ্কার করেন ঘটনাক্রমে সেটি এখন লন্ডনের বিজ্ঞান জাদুঘরের স্থায়ী সংগ্রহের অংশ হয়ে আছে।

আমাদের ইংল্যান্ডে আসার পরপরই যে সব ছবি তোলা হয়েছিল সেগুলোতে ইংল্যন্ডের বিলীন হয়ে যাওয়া সময়ের চিত্র দেখা যায়। সে সময় পুরুষরা পরে ভি-গলার পশমী পুলওভার এবং টাই। গাড়িগুলোতে তখনও রানিংবোর্ড লাগানো, আর পেছনে একটা অতিরিক্ত চাকা ঝলানো। বিটলস,লিঙ্গ বিপ্লব,ছাত্র প্রতিবাদ, বহুজাতির সংস্কৃতির প্রসঙ্গ এগুলো তখনও কেন্দ্রে আসেনি। তবে আমাদের পরিবার প্রথম যে ইংল্যান্ডের পরিচয় পেয়েছে সেখানে বহুজাতের সংস্কৃতির বিষয়টাকে চিন্তায় রাখা হতে পারে তেমনটা বিশ্বাস করাই কঠিন। ফ্রান্স কিংবা ইতালি থেকে আসা কোনো বিদেশির সঙ্গে দেখা হওয়াটা ছিল যথেষ্ট লক্ষণীয় বিষয়। আমার জাপানের কথা তো বাদই দিলাম।

আমাদের পরিবার বারোটা বাড়ির একটা কানাগলিতে বসবাস শুরু করে। ওখানেই পাকা রাস্তার শেষ আর গ্রাম এলাকার শুরু। স্থানীয় খামারের দূরত্ব ছিল পাঁচ মিনিটেরও কম হাঁটাপথ। একই দূরত্বে ছিল একটা সরুপথ। সে পথে গরুর পাল হেলেদুলে ক্লান্ত পায়ে মাঠে যাওয়া আসা করত। ঘোড়ার গাড়িতে করে দুধ সরবরাহ করা হতো এলাকায়। ইংল্যান্ডে আমার জীবনের প্রথম দিকের সবচেয়ে স্পষ্ট স্মৃতি হলো শজারুর স্মৃতি। দেখতে চমৎকার লম্বা কাঁটাঅলা নিশাচর জীব শজারু তখন অনেক দেখা যেত ইংল্যান্ডে। রাতের বেলা কোনো গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে পড়ে থাকত সকালের শিশিরে ভিজে। রাস্তার পাশের ময়লা আবর্জনা সংগ্রহকারীরা সেগুলো গুছিয়ে নিয়ে যেত।

আমাদের প্রতিবেশিদের সবাই গির্জায় যেতেন। তাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে দেখেছি, কিছু খাওয়ার আগে তারা ছোটখাটো প্রার্থনা করে নিত।

আমি সানডে স্কুলে পড়তাম। খুব তাড়াতাড়িই আমি গির্জায় ধর্মসংগীতে নেতৃত্বদানকারীদের অন্যতম হয়ে গেলাম। দশ বছর বয়সে আমি গিলফোর্ডে প্রথম জাপানি হেড কোরিস্টার হয়ে গিয়েছি। আমি স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম। সেখানে আমিই ছিলাম একমাত্র অইংরেজ ছাত্র;মনে হয়,স্কুলের ইতিহাসেও প্রথম ছিলাম। এগার বছর বয়সে পাশের শহরে আমার গ্রামার স্কুলে যেতাম ট্রেনে। প্রতিদিন সকালে একই গাড়িতে বিভিন্ন পদবির মানুষেরাও যেতেন। পিনস্ট্রাইপ স্যুট আর বাওলার হ্যাট পরে তারা লন্ডনে অফিস করতে যেতেন।

ওই বয়সেই ইংরেজ মধ্যবিত্ত কোনো বালকের জন্য ওই সময়ে মানানসই যেসব আদব কায়দা ছিল সেগুলো আমি রপ্ত করে ফেলেছি। কোনো বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে গেলে বড়রা রুমে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে দাঁড়াতে হবে জানতাম। খাওয়ার সময় টেবিল ছেড়ে উঠতে গেলে অনুমতি নিতে হয়,তাও শিখে নিয়েছিলাম। একমাত্র বিদেশি বালক হিসেবে বাড়ির আশপাশের এলাকায় একরকম নাম পরিচয় ছড়িয়ে পড়ে। অন্য ছেলেমেয়েরা জানত,তাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে আমি কে ছিলাম। রাস্তায় কিংবা পাড়ার দোকানে দেখা হলে একদম অপরিচিত বড়রাও আমার নাম ধরে ডাকতেন।

পেছন ফিরে ওই সময়টা দেখতে গেলে মনে পড়ে, বিশ্বযুদ্ধের পরে তখনও বিশ বছর পার হয়নি;যুদ্ধে জাপানিরা তাদের ঘোর শত্রু ছিল। অথচ বিস্ময়ের কথা হলো,এই সাধারণ ইংরেজ সমাজ আমাদের পরিবারকে খেলামেলা মন আর সহজাত উদারতার সঙ্গেই গ্রহণ করেছিল। ব্রিটনদের যে প্রজন্ম বিশ্বযুদ্ধ পার হয়ে এসেছে এবং যুদ্ধের পরে লক্ষণীয় একটা কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে তাদের প্রতি আমার মমতা,সম্মান এবং কৌতুহল তৈরি হয়েছে মূলত আমার ইংল্যান্ড বাসের প্রথম দিনগুলোর অভিজ্ঞতা থেকেই।

তবে ওই সময়ের পুরোটা জুড়েই আমার জাপানি বাবা মায়ের সঙ্গে আমি বাড়িতে যাপন করতাম আরেক জীবন। বাড়িতে ছিল ভিন্ন নিয়মকানুন,ভিন্ন প্রত্যাশা,ভিন্ন ভাষা। শুরু থেকে আমার বাবা মায়ের ইচ্ছে ছিল,আমরা এক বছর কিংবা দুবছর পরই জাপানে ফিরে যাব। আসলে আমাদের ইংল্যান্ড বাসের প্রথম এগারো বছর আমাদের মানসিকতায় একটা চলমান ইচ্ছে ছিল,আমরা ‘পরের বছর’ই জাপানে ফিরে যাব। ফলে আমার বাবা মায়ের দৃষ্টিভঙ্গি বেড়াতে আসা মানুষদের মতো ছিল,অভিবাসীদের মতো ছিল না। স্থানীয়দের বিভিন্ন আগ্রহোদ্দীপক রীতিনীতি সম্পর্কে মতামত বিনিময় করতেন;তবে সেগুলো রপ্ত করার ব্যাপারে তাদের তেমন দায়িত্ববোধ দেখা যেত না। অনেক দিন পর্যন্ত এমন একটা ধারণা বজায় ছিল: আমার প্রাপ্তবয়স্ক সময়টা জাপানে কাটানোর জন্য ফিরে যাব। আমার শিক্ষাদীক্ষার মধ্যে জাপানি দিকটা বজায় রাখার চেষ্টাও যথেষ্ট করা হয়েছে। প্রতি মাসে জাপান থেকে পার্শ্বেল আসত;আগের মাসের কমিকস,বিভিন্ন ম্যাগাজিন, শিক্ষামূলক ডাইজেস্ট ইত্যাদি বোঝাই থাকত সে পার্শ্বেলে। আমি সাগ্রহে সেগুলো গিলে খাওয়ার মতো ক্ষুধা নিয়ে পড়তাম। আমার কিশোর বয়সের একটা সময়ে সে পার্শ্বেলগুলো আসা বন্ধ হয়,সম্ভবত আমার দাদার মৃত্যুর পর। তবে আমার বাবা মায়ের বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, জাপানে কাটানো তাদের জীবনের বিভিন্ন অধ্যায় নিয়ে তাদের আলাপচারিতা চলতেই থাকে। সে সব আলাপ থেকে চিত্রকল্প এবং অনুভূতির প্রতিক্রিয়ার অবিরাম সরবরাহ পেতে থাকি আমি। তারপর আমার নিজেরও স্মৃতিভাণ্ডার ছিল;আশ্চর্য রকমের বিশাল এবং সুস্পষ্ট ছিল সে ভাণ্ডারের স্মৃতিগুলো। আমার দাদা-দাদি নানা-নানি,আমার ফেলে আসা খেলনা,আমাদের জাপানি ঐতিহ্যের বাড়ি (আমাদের সে বাড়ির প্রতিটা রুম পর্যন্ত এখনও আমি কল্পনায় নিয়ে আসতে পারি,)কিন্ডারগার্টেন,স্থানীয় ট্রামস্টপ,ব্রিজের পাশের সেই বদরাগী কুকুরটা,নাপিতের দোকানের একটা বিশেষ চেয়ার, ছোট ছেলেদের জন্য বিরাট আয়নার সামনে সেটার সঙ্গে লাগানো ছিল গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলÑ এসব ছিল আমার স্মৃতিতে।

স্মৃতির এসব উপাদান মিলে যা তৈরি করেছে সেটা হলো,গদ্যে আমার কথাসাহিত্যের জগত তৈরি করার কথা চিন্তা করার অনেক আগে, আমার বড় হওয়ার প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে বেশ ব্যস্ততার সঙ্গেই জাপান নামে একটা সমৃদ্ধ বিশদ বৈশিষ্ট্যের জায়গা গড়ে তুলছিলাম। যেভাবেই হোক না কেন সে জায়গার স্বত্বাধীন হওয়ার মতো অনুভূতি আমার ছিল;সেখান থেকেই আমি তৈরি করে নিয়েছি আমার একটা পরিচয়বোধ এবং আত্মবিশ্বাস। ওই সময়ে আমি যে সশরীরে জাপানে ফিরে যাইনি সে সত্যটাই আরো বেশি স্পষ্ট এবং ব্যক্তিক জাপান সম্পর্কে আমার মনের ভেতর নিজস্ব দৃষ্টি তৈরিতে সাহায়ক হয়েছে।

এজন্যই সংরক্ষণের দরকার। কারণ আমার বয়স বিশের কোঠার মাঝামাঝি পৌঁছনোর সময় কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে শিখছি যদিও এই কথাটা তখন মুখে বলে প্রকাশ করিনি। তখনই আমি এরকম একটা সত্য গ্রহণ করতে প্রস্তুত হচ্ছিলাম, 'আমার’ জাপান সম্ভবত বিমানে চড়ে আমি যে জায়গাটাতে যাব তার সঙ্গে মিলবে না;আমার বাবা মায়ের কথাবার্তা থেকে যে জীবনের কথা শুনেছি,আমার ছেলেবেলার প্রারম্ভ থেকে স্মৃতিতে পাওয়া জীবন ১৯৬০ এবং ১৯৭০-এর দশকে অনেকটাই বিলীন হয়ে গেছে;আমার মাথার ভেতর যে জাপান ছিল সেটা নিশ্চয় একজন ছোট বালকের স্মৃতি,কল্পনা আর অনুমানের ওপর তৈরি করা এক আবেগী কাঠামো। মনে হয়, সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কথা হলো,বছরে বছরে যত বড় হয়েছি,উপলব্ধি করতে পেরেছি যে, আমার জাপান,মানে যে মহার্ঘ জাপানের সঙ্গে আমি বেড়ে উঠেছি, আস্তে আস্তে যেন ফিকে হয়ে আসছে।

আমি এখন নিশ্চিত,আমার জাপান যে অনন্য এবং একই সময়ে পলকা,সে ব্যাপারটা বাইরে থেকে প্রমাণ করার মতো উন্মুক্ত নয়।এই অনুভূতিই আমাকে নরফোকের ওই ছোট রুমটাতে কাজ করার তাড়না জুগিয়েছে। ওই জগতের রং,লোকাচার,শিষ্টাচার,মর্যাদা,ঘাটতি ইত্যাদি ওই জায়গা সম্পর্কে আমার চিন্তার মধ্যে থাকা সবকিছু আমার মন থেকে উবে যাওয়ার আগে আমি শুধু কাগজের ওপরে সংরক্ষণ করে যাচ্ছিলাম। আমার জাপানকে কথাসাহিত্যে পুননির্মাণ করা এবং নিরাপত্তা দেওয়াটাই ছিল আমার ইচ্ছে যাতে পরবর্তীতে আমি একটা বই দেখিয়ে বলতে পারি,হ্যাঁ,এটাই আমার জাপান,এই বইয়ের মধ্যে।

সাড়ে তিন বছর পরে ১৯৮৩ সালে লোরনা এবং আমি লন্ডনের একটা সরু বাড়ির ওপরের তলায় দুটো রুম নিয়ে থাকতাম। লন্ডনের সবচেয়ে উঁচু জায়গায় পাহাড়ের ওপরে ছিল বাড়িটা। কাছেই টেলিভিশনের একটা ইস্পাত কাঠামো ছিল। আমরা যখন আমাদের টার্নটেবল ভৌতিক ব্রডকাস্টিংয়ে রেকর্ড শোনার চেষ্টা করতাম টেলিভিশনের কণ্ঠ এসে আমাদের স্পিকারে আক্রমণ করত। আমাদের বসার ঘরে কোনো সোফা কিংবা হাতলঅলা চেয়ার ছিল না; তবে মেঝেতে কুশনঢাকা দুটো জাজিম ছিল। বড় একটা টেবিল ছিল; দিনের বেলা সেটার ওপরে আমি লিখতাম। আর রাতের বেলা আমরা খাবার খেতাম। বিলাসবহুল না হলেও ওখানে আমাদের ভালো লাগত। আগের বছর আমার প্রথম উপন্যাস প্রকাশ করেছি এবং ব্রিটিশ টেলিভিশনের প্রচারের জন্য একটা শর্টফিল্মের চিত্রনাট্যও লিখেছি।

একটা সময় কারণসঙ্গতভাবেই আমার প্রথম উপন্যাস নিয়ে গর্বিত ছিলাম। কিন্তু সেই বসন্তে একটা অতৃপ্তি আমাকে পেয়ে বসে। এখানেই সমস্যা। আমার প্রথম উপন্যস আর প্রথম চিত্রনাট্য অনেকটা একই রকম, বিষয়বস্তুর দিক থেকে নয়, শৈলীর দিক থেকে। শৈলীর দিকে যতই তাকাই দেখি, আমার উপন্যাস আমার চিত্রনাট্যের মতো সংলাপ, নির্দেশনাÑ সব এক। কিছুদূর পর্যন্ত ঠিক ছিল;তবে এবার আমার ইচ্ছে হলো,এমন কথাসাহিত্য লিখব যেটা শুধু বইয়ের পাতায় গ্রহণযোগ্য হবে। কেউ যদি টেলিভিশন চালু করে একই রকম অভিজ্ঞতা পেতে পারে তাহলে সে রকম অভিজ্ঞতা নিয়ে উপন্যাস কেন লিখব?উপন্যাস যদি অনন্য কিছু দিতে না পারে, সিনেমা আর টেলিভিশন যা দিতে পারে শুধু সেটাই দিয়ে যায় তাহলে আর সিনেমা আর টেলিভিশনের বিপক্ষে উপন্যাসের টিকে থাকার আশা করা যায় কী করে?

এই সময় ভাইরাস আক্রান্ত হয়ে আমি কয়েকদিন বিছানায় কাটালাম। অবস্থা একটু ভালোর দিকে এলে দেখলাম,সব সময় ঘুম পায় না। আমার বিছানার চাদরের ভেতর যে জিনিসটা খানিক বিরক্ত করছিল বের করে দেখলাম,সেটা একটা বই। মার্সেল প্রুস্তের ‘রিমেমব্রান্স অব থিংস পাস্ট’-এর প্রথম ভলিউমের একটা কপি। (নাম তখন অনূদিত হয়ে গেছে।) বইটা হাতের কাছে ছিল বলে পড়া শুরু করলাম। আমার জ্বরজ্বর অবস্থাটাই একটা কারণ ছিল হয়তো; তবে ওভারচার এবং কমব্রে সেকশন আমাকে দরুণভাবে আকৃষ্ট করে এবং আমি বার বার পড়ি। এই প্যাসেজগুলোর নিজস্ব সৌন্দর্য ছিল। তাছাড়াও প্রুস্ত যেভাবে এক পর্ব থেকে আরেক পর্বে কাহিনী নিয়ে যাওয়ার যে কৌশল ব্যবহার করেছেন সেটাও আমাকে রোমাঞ্চিত করে। ঘটনা এবং দৃশ্যের বিন্যাস ঘটনার পরম্পরার দাবি অনুসরণ করেনি। রূপরেখার সারল্য বজায় রাখা হয়নি। মনে হলো,চিন্তার স্পর্শক্ষম সংশ্রব কিংবা স্মৃতির খেয়াল লেখাটাকে এক পর্ব থেকে আরেক পর্বে নিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে আমার কৌতুহল জাগতে থাকে: আপাত সম্পর্কহীন দুটো মুহূর্তকে বয়ানকারীর মনে পাশাপাশি স্থাপন করা হয়েছে কেন?হঠাৎ করেই আমার দ্বিতীয় উপন্যাস লেখার একটা উত্তেজনাকর এবং অপেক্ষাকৃত মুক্ত পদ্ধতি পেয়ে গেলাম। এ পদ্ধতিতে লেখা উপন্যাস কাগজের পাতায় চমৎকারিত্ব তৈরি করতে পারবে এবং ভেতরের একটা চলমানতা থাকবে যেটা কোনো পর্দায় ধরা অসম্ভব হবে। বয়ানকারীর সংশ্রব এবং ধাবমান স্মৃতি অনুসারে যদি আমি এক প্যাসেজ থেকে আরেকটায় চলে যেতে পারি তাহলে আমি কিছু একটা তৈরি করতে পারব এবং আমার কাজটা হবে বিমূর্ত চিত্রকরের ক্যানভাসের চারপাশে মূর্তি আর রং স্থাপনের স্বাধীনতার মতো। দুদিন আগের কোনো দৃশ্যের পাশে বিশ বছর আগের দৃশ্য স্থাপন করে পাঠককে দুটোর সম্পর্ক নিয়ে ভাবার কথা বলতে পারব। আমি চিন্তা করে দেখলাম,এরকম পদ্ধতিতে কাজ করলে আমি আত্ম-প্রতারণা আর বঞ্চনার অনেক স্তরের কথা ইঙ্গিত করতে পারব;এরকম স্তর কোনো ব্যক্তির নিজের দৃষ্টিভঙ্গি এবং তার অতীতকে আড়াল করে রাখে।

মার্চ ১৯৮৮। আমার বয়স তখন তেত্রিশ বছর। আমাদের একটা সোফা হয়েছে। সোফায় শুয়ে আমি টম ওয়েটসের অ্যালবাম শুনতে পারি। আগের বছর লোরনা এবং আমি দক্ষিণ লন্ডনে ফ্যাশনেবল না হলেও চমৎকার এলাকায় আমাদের নিজেদের বাড়ি কিনি। প্রথমবারের মতো আমার আলাদা পড়ার রুম পাই। রুমটা ছোট এবং জানালা নেই। তবে কাগজপত্র যেমন তেমন করে রুমের মধ্যে ছড়িয়ে রাখা যেত,দিন শেষে গুছিয়ে রাখার ঝামেলা ছিল না। পড়ার ওই রুমে সম্ভবত আমার তৃতীয় উপন্যাস শেষ করি। এবারই প্রথম জাপানি পটভূমি ব্যবহার করিনি। আমার আগের উপন্যাসগুলোর মাধ্যমে আমার ব্যক্তিগত জাপানের নাজুক অবস্থা কমিয়ে আনা গেছে। আসলে আমার নতুন বই ‘রিমেইনস অব দ্য ডে’ আগেরগুলোর তুলনায় সবচেয়ে বেশি ইংরেজি চেহারা পেয়েছে। তবে তেমন হলেও আগের প্রজন্মের অনেক ব্রিটিশ লেখকের লেখার মতো নয়। তাঁরা অনেকেই যেমন মনে করেছেন,তাঁদের পাঠকরা সবাই ইংরেজ;তাদের সবার ইংরেজি দ্যোতনার সঙ্গে পরিচয় আছে,চিন্তাবিষ্টতা আছে। ততদিনে সালমান রুশদি এবং ভি এস নাইপলের মতো লেখকরা আরো বেশি আন্তর্জাতিক ও বহির্মুখি ব্রিটিশ সাহিত্যের পথ তৈরি করেছেন যে সাহিত্য নিজের কেন্দ্রিকতা এবং ব্রিটেনের জন্য স্বকীয় গুরুত্ব দাবি করেনি। ব্যাপক অর্থেই তাঁদের লেখা উত্তর ঔপনিবেশিক। আমি তাঁদের মতো আন্তর্জাতিক কথাসাহিত্য লিখতে চেয়েছি যে সাহিত্য সহজেই সংস্কৃতিগত এবং ভাষাগত সীমানা পার হয়ে যেতে পারে। এমনকি অদ্ভূতভাবে ইংরেজ সমাজের পটভূমিতে লেখা কোনো গল্পও যেন তেমনই মনে হয়। আমার লেখার মধ্যে উপস্থাপিত ইংল্যান্ডের চেহারা হবে পৌরাণিক যেটার রূপরেখা জগতজোড়া অনেক মানুষের কল্পনায় আগে থেকেই রয়ে গেছে, এমনকি যারা কখনও ইংল্যান্ডে আসেনি তাদের কল্পনাতেও।

তখন একটা গল্প সবে শেষ করেছি;কাহিনি তৈরি হয়েছে একজন ইংরেজ বাটলারকে কেন্দ্র করে। অনেক দেরিতে সে বুঝতে পারে, তার জীবনটা যাপন করা হয়েছে ভুল মূল্যবোধের দ্বারা;জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়টা সে ব্যয় করেছে এক নাৎসি অনুকম্পাকারীর সেবায়। জীবনের জন্য রাজনৈতিক এবং নৈতিক দায়িত্ব নিতে ব্যর্থ হয়ে গভীর অর্থে সে জীবনটা অপচয়ই করেছে। আরো বড় কথা হলো,নিখুঁত সেবক হওয়ার প্রতিজ্ঞায় সে পছন্দের একমাত্র নারীকে ভালোবাসা থেকে নিজেকে বিরত রেখেছে এবং নারীর ভালোবাসা থেকে নিজেকে বঞ্চিতও করেছে। 

আমার পাণ্ডুলিপি বেশ কবার খুঁটিয়ে পড়লাম। সঙ্গত কারণেই সন্তুষ্টিও এল। কিন্তু তারপরও অপূর্ণতার একটা অনুভূতি থেকেই গেল: কী যেন নেই।

তারপর একদিনের ঘটনা: এক সন্ধ্যায় বাড়িতে সোফায় বসে টম ওয়েটসের গান শুনছিলাম। ‘রুবিসআর্মস’ গানটা দিয়ে শুরু হলো। আপনারা অনেকেই এই গানটার কথা জানেন। (আপনাদের সামনে গানটা গাওয়ার ইচ্ছেও ছিল আমার। তবে সীদ্ধান্ত বদলেছি।) গানটা একটা ব্যালাড,একজন সৈনিক সম্পর্কে বোধ হয়। সে তার প্রেমিকাকে বিছানায় ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে চলে যাচ্ছে। সময়টা সকালের শুরু। রাস্তায় একটা ট্রেন ধরে সে। এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। কিন্তু গানটা বের হচ্ছে আমেরিকার একজন বেকার ভবঘুরের কণ্ঠ থেকে। এরকম কণ্ঠে সে ভেতরের আবেগ বের করে আনতে অভ্যস্ত নয়। গানের মধ্যে দুপুরের একটা সময় আসে; তখন গায়ক বলে, তার হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে। হৃদয়ানুভূতি আর বিশাল বাধার মাঝখানের স্মায়ুবিক চাপের কারণে মুহূর্তটা পুরোপুরি অসহ্য রকমের মর্মস্পর্শী। হৃদয়াবেগ প্রকাশ করার সঙ্গে বাধাটাও জয় করা হয়ে যায়। আবেগমুক্তির বিশালত্ব নিয়েও গানটা করেন টম ওয়েটস। আর শ্রোতা অনুভব করেন,কিভাবে একজন আজীবন কঠিন-হৃদয় মানুষের ধৈর্য সর্বজয়ী দুঃখবোধের সামনে ভেঙেচুরে যায়।

টম ওয়েটসের গান শোনার পর বুঝতে পারলাম আমার কী করণীয় আছে। অনেক দিন আগে না বুঝেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আমার ইংরেজ বাটলার তার আবেগী সুরক্ষা বজায় রাখবে। নিজের কাছ থেকে এবং পাঠকের কাছ থেকে শেষ অবধি নিজের সুরক্ষা ব্যবস্থার আড়ালেই সে লুকাবে। এরপর দেখলাম, আমাকে আগের সিদ্ধান্তের উল্টোটা করতে হবে। আমার কাহিনীর শেষে সচেতনতার সঙ্গে বেছে নিতে হবে একটা মুহূর্ত যখন তার সুরক্ষার বর্ম ভেঙে যাবে। বিরাট ট্র্যাজিক বাসনার প্রকাশ ঘটতে দিতে হবে।

এখানে উল্লেখ করতে চাই, গায়কদের কণ্ঠ থেকে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিখেছি। মানে গানের কথার চেয়ে গায়কের গায়কী থেকেই বেশি শিখেছি। আমরা জানি,গানের মধ্যে মানুষের কণ্ঠ অনুভূতির অপরিমেয় জটিল মিশেল প্রকাশ করতে সক্ষম। অনেক বছর ধরে আমার লেখার বৈশিষ্ট্যের ওপরে প্রভাব ফেলেছেন বব ডিলান, নিনা সিমোন, এমিলু হ্যারিস, রে চার্লস, ব্রুস স্প্রিংসটন,জিলিয়ান ওয়েলকা এবং আমার বন্ধু ও সহযোগী স্টেসি কেন্ট। তাদের কণ্ঠে বিশেষ কিছু পেলেই আমি নিজেকে বলেছি,হ্যাঁ, এই তো। ওই দৃশ্যে আমার এটাই তো দরকার। ঠিক এটার কাছাকাছি কিছু। ব্যাপারটা মাঝে মাঝে এমন আবেগে পরিণত হয়, আমি প্রকাশ করতে পারি না। কিন্তু জিনিসটা গায়কের কণ্ঠে থাকে সত্যিই। এই জিনিসটাকেই লক্ষ্য হিসেবে সামনে রেখে এগোতে হয়।

১৯৯৯ সালের অক্টোবরে আন্তর্জাতিক আউসভিৎস কমিটির পক্ষে জার্মান কবি ক্রিস্তফ হিউবনার অতীতের কয়েকটা কনসেনট্রেশন ক্যাম্প ঘুরে দেখার এবং কয়েকটা দিন তাঁদের সঙ্গে কাটানোর জন্য আমন্ত্রণ করেন। আমার থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল দুমাইল দূরে প্রথম আউসভিৎস ক্যাম্প আর বার্কেনৌ ডেথ ক্যাম্পের মাঝের রাস্তায় অবস্থিত আউসভিৎস যুব সম্মেলন কেন্দ্রে। ওই জায়গাগুলো ঘুরে দেখি এবং আনুষ্ঠানিকভাবেই তিনজন আউসভিৎস উত্তরজীবীর সঙ্গে দেখা করি। আমি অনুভব করতে পারি, আমার প্রজন্ম যে অন্ধকারের নীচে বড় হয়েছে অন্ততপক্ষে ভৌগলিকভাবে সে অন্ধকারের কেন্দ্রে আসতে পেরেছি আমি। বার্কেনৌতে এক বৃষ্টিভেজা দিনে গ্যাস চেম্বারের পাথুরে ভগ্নাবশেষের সামনে দাঁড়াই;এখন অযত্নে পড়ে আছে;কেউ দেখে না। লাল বাহিনীকে দেখে পালানোর সময় জার্মানরা যেভাবে এগুলো গুড়িয়ে দিয়ে যায় সেভাবেই পড়ে আছে এখনও। পোলান্ডের কঠিন জলবায়ুর প্রভাবে এগুলো এখন আর্দ্র ভাঙা স্ল্যাব মাত্র;অবস্থা বছর বছর আরো খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আমার আমন্ত্রণকারী তাঁদের সংকটের কথা বলেন। এই অবশিষ্টাংশগুলো কি সংরক্ষণ করা উচিত?পরবর্তী প্রজন্মগুলোর দর্শনের জন্য সংরক্ষণ করতে কি এগুলোর ওপরে প্লাস্টিকের মজবুত আবরণ তৈরি করতে হবে?নাকি প্রাকৃতিক নিয়মে পচে নাই হয়ে যেতে দেওয়া হবে?বড় সংকটেরই একটা শক্তিশালী রূপক মনে হয় এটাকে। এই স্মৃতিগুলো কিভাবে সুরক্ষা পেতে পারে?কাচের মিনারগুলো কি অশুভ শক্তি আর দুর্দশার অবশিষ্টাংশগুলোকে জাদুঘরের নির্জীব প্রদর্শনীতে রূপান্তরিত করবে? স্মৃতি হিসেবে ধরে রাখার জন্য আমরা কোনগুলো বেছে নেবো?কখন এগুলো ভুলে গিয়ে সামনে এগোনো ভালো? 

আমার বয়স তখন ৪৪ বছর। তখন পর্যন্ত মনে করতাম,দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ,যুদ্ধের ভয়াবহতা,বিজয়Ñ এসব শুধু আমার বাবা মায়ের প্রজন্মের বিষয়। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, যারা সরাসরি ওই বিশাল ঘটনার অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন তারা অনেকদিন আগে থেকেই মারা গেছেন। তাহলে কী হবে? স্মৃতি ধরে রাখার দায়িত্ব আমার প্রজন্মের ওপর পড়েছে? যুদ্ধের দিনগুলোর অভিজ্ঞতা আমরা পাইনি। কিন্তু যে বাবা মায়েরা আমাদের বড় করেছেন তাদের জীবন অবধারিতভাবেই তৈরি হয়েছে যুদ্ধদিনের অভিজ্ঞতায়। এতদিন যে দায়িত্ব সম্পর্কে অনঅবগত ছিলাম,গণমানুষের গল্পকার হিসেবে এখন কি আমাকে সে দায়িত্ব নিতে হবে? আমার বাবা মায়ের প্রজন্মের কাছ থেকে পাওয়া স্মৃতি আর শিক্ষা আমার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমাকে নিতে হবে?

আরো কিছুদিন পরের একটা ঘটনা মনে পড়ছে: টোকিওতে দর্শকদের সামনে আমার বক্তৃতার সময় দর্শকদের মধ্য থেকে একজন জিজ্ঞেস করলেন,আমার পরের লেখা কী নিয়ে লিখব। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, প্রশ্নকারী উল্লেখ করলেন, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিরাট পরিবর্তনের অভিজ্ঞতার জীবন যাপনকারী ব্যক্তিদের তুলে ধরা হয়েছে আমার বইগুলোতে। তারা অতীতের দিকে ফিরে দেখার চেষ্টা করে এবং তাদের অন্ধকার ও লজ্জাকর স্মৃতিকে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রাম করে। তিনি জিজ্ঞেস করেন,আমার ভবিষ্যতের কাজও একই রকম এলাকা তুলে ধরবে কি না।  

ভালো করে না ভেবেই তাকে তাৎক্ষণিক একটা জবাব দিলাম। হ্যাঁ,আমি তাকে বললাম,যারা স্মৃতি আর বিস্মৃতির মাঝে সংগ্রাম করে তাদের সম্পর্কে আমি প্রায়ই লিখেছি। তবে ভবিষ্যতে আমি লিখতে চাই ওই বিষয়কে কোনো জাতি কিভাবে মোকাবেলা করে সে সম্পর্কে। কোনো ব্যক্তি যেমন স্মরণ করে এবং ভুলে যায় কোনো জাতিও কি সেভাবে স্মৃতি আর বিস্মৃতির অভিজ্ঞতা লাভ করে? কিংবা এ প্রসঙ্গে ব্যক্তি আর জাতির মধ্যে কি গুরুত্বপূর্ণ কোনো পার্থক্য আছে? জাতির স্মৃতি আসলে কোনগুলো?কোথায় সংরক্ষিত থাকে সেগুলো?সেগুলোর আকার কিভাবে দেওয়া হয়, নিয়ন্ত্রণইবা কিভাবে করা হয়?সংঘর্ষের চক্র থামাতে কিংবা সমাজের বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া বা যুদ্ধের দিকে যাওয়ার পরিণতি থামাতে কখনও কি বিস্মৃতিই একমাত্র পথ হতে পারে? অন্যদিকে,ইচ্ছেকৃত স্মৃতিবিলোপ আর হতাশ ন্যায় বিচারের ভিত্তির ওপরে স্থিতিশীল এবং মুক্ত সমাজ গঠন করা বাস্তবে কি সম্ভব? প্রশ্নকারীকে কোনো রকমে বললাম,এসব বিষয় নিয়ে লেখার পথ বের করতে চাই আমি। তবে ওই মুহূর্তে দুর্ভাগ্যক্রমে হলেও আমি ভেবে ঠিক করিনি কিভাবে করব কাজটা।

২০০১ সালের শুরুর দিকে এক সন্ধ্যায় উত্তর লন্ডনের (তখন আমরা ওখানে থাকতাম,)আমাদের বাড়ির সামনের আবছা অন্ধকার রুমে লোরনা আর আমি মোটামুটি একটা ভিএইচএস টেপে টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি নামের হাওয়ার্ড হকসের ১৯৩৪ সালের একটা চলচ্চিত্র দেখা শুরু করি। আমরা সবে পেছনে ফেলে এসেছি বিশ শতক;তবে চলচ্চিত্রটির শিরোনামে যা আছে সেটি আসলে বিশ শতককে বোঝায়নি। নামটি আসলে একটি বিলাসবহুল ট্রেনের। ট্রেনটি নিউইয়র্ক আর শিকাগোর মাঝে সংযোগ স্থাপন করেছে। আপনারা কেউ কেউ জেনে থাকবেন,চলচ্চিত্রটি দ্রুত গতিসম্পন্ন একটা কমেডি;এর পটভূমির বেশিরভাগই ট্রেনের ভেতর। কাহিনির কেন্দ্রে আছেন একজন ব্রডওয়ে প্রযোজক। তার অধীনে কাজ করা প্রধান অভিনেত্রী ব্রডওয়ে ছেড়ে চলচ্চিত্র তারকা হওয়ার মানসে হলিউডে যেতে মনস্থির করেছেন। কিন্তু প্রযোজক বেপরোয়া হয়ে তাকে আটকাতে চাইছেন। পুরো চলচ্চিত্রটি জুড়ে জন ব্যারিমোরের অফুরন্ত কমিক পারফরম্যান্স আছে। ব্যারিমোর তাঁর সময়ের মহান অভিনেতাদের অন্যতম। তাঁর মুখভঙ্গি,তাঁর অন্যান্য অঙ্গভঙ্গি, তাঁর মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটি লাইন পরিহাসের নানা স্তরে বের হয়ে আসে। একই রকম করে বের হয়ে আসে অহংসর্বস্বতা আর আত্ম-নাটকীয়তার ভেতরে ডুবতে থাকা একজন ব্যক্তির অর্থের বৈপরিত্ব,সামঞ্জস্যহীনতা ইত্যাদি। অনেক দিক থেকেই তাঁর পারফরম্যান্স মেধাবী। কিন্তু চলচ্চিত্রের কাহিনি আরো এগিয়ে যেতে থাকলে দেখলাম,আমি আর এর সঙ্গে একাত্বতা অনুভব করছি না। ব্যাপারটাতে প্রথমে আমি বিমূঢ় হয়ে গেলাম। আমি তো ব্যারিমোরের অভিনয় পছন্দ করতাম। হাওয়ার্ড হকসের ‘হিজ গার্ল ফ্রাইডে’, ‘অনলি অ্যাঞ্জেলস হ্যাভ উইংস’যুগের সব চলচ্চিত্রই আমার আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল। চলচ্চিত্রটি নিয়ে ঘণ্টাখানেক ভাবার পর একটা সাধারণ তবে মনোগ্রাহী ধারণা এল আমার মাথায়। উপন্যাস,চলচ্চিত্র,নাটকে প্রায়ই দেখা গেছে,অনেক স্পষ্ট এবং অনঅস্বীকার্য রকমের বিশ্বাসযোগ্য চরিত্র প্রায়ই আমার অনুভূতিতে নাড়া দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তার কারণ হলো, এই চরিত্ররা অন্য চরিত্রদের সঙ্গে নিজেদেরকে মানব সম্পর্কে জড়াতে পারেনি। সঙ্গে সঙ্গে আমার নিজের কাজের বেলায়ও শেষের প্রসঙ্গটি আসে: যদি আমার চরিত্রদের নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া থামিয়ে দিই এবং আমার সম্পর্ক নিয়েই উদ্বিগ্ন হই, তাহলে? 

ট্রেনটা একটানা শব্দ তুলে যত পশ্চিমে যেতে থাকে জন ব্যারিমোরের হিস্টিরিয়া ততই বাড়তে থাকে। তখন আমার মনে পড়ে যায় দ্বিমাত্রিক এবং ত্রিমাত্রিক চরিত্রদের মধ্যে ই এম ফর্স্টারের দেখানো বিখ্যাত স্পষ্ট পার্থক্যের প্রসঙ্গটি। একটি কাহিনিতে একটি চরিত্র যখন আমাদেরকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে বিস্মিত করে তখন সে চরিত্র ত্রিমাত্রিক হয়ে ওঠে। এভাবেই সে চরিত্র রাউন্ড হয়ে ওঠে। কিন্তু আমার মাথায় আরেক প্রসঙ্গও এসে যায়: কোনো চরিত্র ত্রিমাত্রিক হলেও তার সম্পর্কগুলো যদি ত্রিমাত্রিক না হয়?তাঁর ওই লেকচার সিরিজের অন্যখানে ফর্স্টার একটা হাস্যকর চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন; একজোড়া সাঁড়াসি দিয়ে একটি উপন্যাস থেকে মোচড়াতে থাকা পোকার মতো কাহিনি-রেখা তুলে আনেন যাতে আলোর নিচে এনে পরীক্ষা করতে পারেন। কোনো কাহিনিকে ছেদ করে যাওয়া বিভিন্ন সম্পর্ককে ওইভাবে তুলে এনে আমিও কি একই রকম পরীক্ষা করতে পারতাম না?আমার যে সকল কাজ,মানে যে সকল কাহিনি লিখে ফেলেছিলাম এবং লেখার পরিকল্পনা ছিল সেগুলোতে কি এরকম পদ্ধতির বাস্তবায়ন করতে পারতাম?ধরুন আমি এই ওস্তাদ সাগরেদ সম্পর্কের দিকে তো তাকাতে পারতাম। এই সম্পর্ক কি গভীর দৃষ্টিসম্পন্ন এবং নতুন কিছুর কথা বলে?কিংবা আমি যে এই সম্পর্কের দিকে তাকিয়ে আছি, তাতে কি মনে হচ্ছে,এটা অবশ্যম্ভাবী এবং গঁৎবাধা হয়ে যাচ্ছে,মানে শত শত মধ্যম মানের গল্পে যেমন পাওয়া যায় তেমন হয়ে যাচ্ছে?অথবা এই যে,এই সম্পর্কের কথা বলা যায়;এখানে দুজন প্রতিদ্বন্দ্বী বন্ধুর কথা বলা হয়েছে;এ সম্পর্কটা কি গতিময়?এটার মধ্যে কি আবেগগত অনুরণন আছে?এটা কি বিবর্তনশীল?এটা কি বিশ্বাসযোগ্যভাবে বিস্ময় জাগায়?এটা কি ত্রিমাত্রিক?হঠাৎ আমার মনে হলো,অতীতে আমার কাজের কতিপয় বৈশিষ্ট্য আমার বেপরোয়া প্রতিকার প্রয়োগ সত্ত্বেও কেন ব্যর্থ হয়েছে। জন ব্যারিমোরের দিকে একটানা তাকিয়ে থাকা অবস্থাতেই আমার মাথায় এলÑ গল্প বলার ঢং প্রথাগত হোক, কিংবা নতুন হোক,সব ভালো কাহিনির মধ্যে এমন সম্পর্ক থাকতে হবে যেগুলো আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ;সেগুলো আমাদের আবেগে নাড়া দিবে,আনন্দ দিবে দুঃখ দিবে,বিস্মিত করবে। পরবর্তীতে আমার সম্পর্কগুলোতে বেশি নজর দিয়ে থাকলে আমার চরিত্ররা নিজেরাই নিজেদের খেয়াল রাখত।

এখানে যে বিষয়টা এইমাত্র আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম সেটা আপনাদের কাছে সব সময়ই সাধারণভাবে অবশ্যম্ভাবী ছিল। কিন্তু আমি বলতে চাচ্ছি, এই ধারণাটা আমার লেখক জীবনে বিস্ময়কর রকমের দেরিতে এসেছে। আজ আপনাদের কাছে অন্যান্য যে সব বিষয় সম্পর্কে কথা বললাম সেগুলোর তুলনায় এটা আমার কাছে বড় বাঁক বদল। ওই সময় থেকে আমার কাহিনিগুলো অন্যভাবে তৈরি করা শুরু করি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়,আমার উপন্যাস ‘নেভার লেট মি গো’ লেখার সময় শুরু থেকে কাহিনির প্রধান ত্রিভুজকে কেন্দ্রে রাখার কথা ভেবেছি,তারপর ভেবেছি অন্যান্য সম্পর্ক নিয়ে;সেগুলো ওই প্রধান ত্রিভুজ থেকে বের হয়ে ছড়িয়ে পড়বে।

অন্যান্য অনেক ক্যারিয়ারে যেমন হতে পারে,লেখকের ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক বদল এগুলোর মতোই। কখনও কখনও সেগুলো হতে পারে খুব তুচ্ছ, শ্রীহীন কোনো নিভৃত ব্যক্তিগত মুহূর্ত। এরকম সময় আসলে নীরবে আসে, একান্ত প্রকাশের মতো। সব সময় যে আসে তাও না, আবার আসলেও খুব হৈচৈ করে দামামা বাজিয়ে আসে না। কোনো পরামর্শদাতা কিংবা সহকর্মীর অনুমোদনের প্রক্রিয়ায়ও আসে না। কখনও কখনও সরব ও আপাত জরুরি দাবির মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য প্রতিযোগিতার ভেতর দিয়েও আসতে হয়। বাঁক বদলের মুহূর্তগুলো কখনও কখনও এমন কিছু প্রকাশ করে যা বিরাজমান প্রজ্ঞার বিপরীতে চলে যেতে পারে। তবে সে মুহূর্তগুলো যখন আসে সেগুলোর স্বরূপ ঠিকমতো চেনা চাই;নইলে আঙুলের ফাঁক দিয়ে বের হয়ে যেতেও পারে। 

আমি এখানে তুচ্ছ এবং ব্যক্তিগত বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করছিলাম। কারণ আমার কাজ তো এগুলো নিয়েই। লেখার সময় একজন ব্যক্তি নিভৃত কোনো রুমে বসে একা একা লিখে যাচ্ছেন,আরেকজন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করে যাচ্ছেন,দ্বিতীয় ব্যক্তি আরেকটা নিভৃত নীরব রুমে কিংবা হয়তো নীরব নয় এমন কোনো রুমে পড়ছেন। গল্প বিনোদন দিতে পারে,কখনওবা কোনো নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে শেখার কোনো কথা বলতে পারে,যুক্তি দেখাতে পারে। তবে আমার প্রেক্ষিতে বলতে গেলে, গল্পের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য হলো অনুভূতির যোগাযোগ ঘটানো। আমাদের সীমা আর বিভাজনের পরিসরে মানব হিসেবে আমরা একে অন্যের সঙ্গে যা যা শেয়ার করি সেগুলোর কাছে আবেদন তৈরি করে থাকে গল্প। গল্পের চারপাশে বড় বড় মোহনীয় শিল্প আছেÑ গ্রন্থশিল্প,চলচ্চিত্র শিল্প,টেলিভিশন শিল্প,নাট্যশিল্প। তবে শেষ পর্যন্ত গল্প হলো এক ব্যক্তির দ্বারা আরেক ব্যক্তির কাছে বলা কথা। বিষয়টা আমার কাছে এরকমই মনে হয়। আপনারা বুঝতে পারছেন আমি যা বলছি? বিষয়টি কি আপনাদের কাছেও এরকমই মনে হয়?

তাহলে বর্তমানে চলে আসি। সম্প্রতি আমার এরকম উপলব্ধি হয়েছে: বেশ কবছর ধরে আমি একটা আকাশ কুসুমের মধ্যে বাস করছি; আমি যেন আমার চারপাশের অনেক মানুষের হতাশা আর উদ্বিগ্নতা দেখতে ব্যর্থ হয়েছি। আমি বুঝতে পেরেছি,শ্লেষপটু উদার মনের মানুষে পূর্ণ আমার সভ্য,উদ্দীপনাদায়ী জগতটাকে আমি যত বড় বলে কল্পনা করেছি সেটা তার চেয়ে অনেক ছোট। ২০১৬ সাল আমার জন্য হতাশাজনক। বছরটা ইউরোপ এবং আমেরিকায় বিস্ময়কর রাজনৈতিক ঘটনার বছর;পৃথিবীব্যাপী সন্ত্রাসবাদের অসুস্থ কাজকর্মের বছর। ওই বছরটা আমাকে স্বীকার করতে বাধ্য করেছে,ছেলেবেলা থেকে আমি যে উদারমনা মূল্যবোধের অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতিকে সত্যি বলে জেনে এসেছি সেটা একটা মায়া হতে পারে।

আমি একটা শুভবাদ-ঘেষা প্রজন্মের অংশ,কেন হবো না?আমরা দেখেছি,আমাদের অগ্রজরা সফলতার সঙ্গে ইউরোপকে একদল-মতবাদী শাসন,গণহত্যা আর ঐতিহাসিকভাবে অভূতপূর্ব সংহারের এলাকা থেকে সীমারেখাহীন বন্ধুত্বের মধ্যে বসবাসরত ঈর্ষণীয় উদারনৈতিক গণতন্ত্রের এলাকায় পরিণত করেছেন। আমরা বিশ্বব্যাপী পুরোনো ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যেগুলোর ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়া দেখেছি। তিরস্কারযোগ্য যে ধারণাগুলো সাম্রাজ্যবাদকে খাড়া করেছিল সেগুলোরও যুগপৎ পতন দেখেছি আমরা। নারীবাদ,সমকামী অধিকারের অগ্রগতি এবং জাতিবাদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু এলাকায় লড়াই দেখেছি। পুঁজিবাদ এবং সমাজতন্ত্রের মাঝের আদর্শগত এবং সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটের বিপরীতে আমরা বড় হয়েছি। আমাদের অনেকে যেটাকে সন্তুষ্টিজনক উপসংহার বলে বিশ্বাস করেছি সেটাও প্রত্যক্ষ করেছি।

তবে এখন পেছনে ফিরে তাকালে বার্লিন দেয়ালের পতন থেকে শুরু হওয়া সময়টাকে মনে হয় হারিয়ে যাওয়া সুযোগের আত্মতুষ্টির যুগ। জাতিতে জাতিতে এবং জাতির অভ্যন্তরে সম্পদ এবং সুযোগের বিশাল অসাম্য অবাধে বেড়েছে। বিশেষ করে ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ,সাধারণ মানুষের ওপরে চাপিয়ে দেওয়া কৃচ্ছ সাধনের নীতি, তৎপরবর্তী ২০০৮ সালে অর্থনৈতিক অকীর্তিকর পতন আমাদেরকে এক বর্তমানের কাছে নিয়ে এসেছে যেখানে সুদূর ডানপন্থী আদর্শ আর খণ্ডিত জাতীয়তা দ্রুত বিস্তার লাভ করে। পুরোনো চেহারা আর নতুন আধুনিক উন্নত বাজারী চেহারায় জাতিবাদ আবার মাথাচাড়া দিয়েছে,আমাদের সভ্য সড়কের নিচে যেন ঘুমন্ত দৈত্য জেগে উঠেছে। এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে,আমরা নিজেদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার মতো কোনো প্রগতিশীল কারণই খুঁজে পাচ্ছি না। তার পরিবর্তে পশ্চিমের ধনী গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও আমরা বিভক্ত হয়ে পড়ছি প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরে যেখান থেকে সম্পদ আর ক্ষমতার লোভে আমরা একে অন্যের বিপরীতে প্রতিযোগিতা করতে চাই।

আরেক অঞ্চল থেকে,অবশ্য এই অঞ্চলের দিকে আমরা ইতোমধ্যে নজর দিয়ে থাকলে,ওই অঞ্চল থেকে বিজ্ঞান,প্রযুক্তি আর চিকিৎসা বিজ্ঞান আমাদের সামনে কতিপয় চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করেছে। বংশানুগতি সংক্রান্ত সম্পাদনা সিআরঅইএসপিআর-এর মতো নতুন বংশানুগতি সম্বন্ধীয় প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতি ও রোবটিকস আমাদের জন্য বিস্ময়কর জীবনরক্ষাকারী সুবিধা নিয়ে আসবে। তবে বর্ণবাদের মতো মেধাচার এবং বর্তমানের পেশাগত এলিটদেরসহ ব্যাপক বেকারত্বও তৈরি করতে পারে।

সুতরাং এখানে আমি একজন ষাটোর্ধ ব্যক্তি,আমার চোখ কচলে দেখার চেষ্টা করছি কুয়াশার মধ্যে গতকাল পর্যন্ত অস্তিত্বে ছিল না এমন কোনো জগতের সীমারেখা দেখতে পাই কি না। ক্লান্তশ্রান্ত লেখক আমি,বুদ্ধিবৃত্তিক ক্লান্ত প্রজন্মের একজন হিসেবে কি এই অপরিচিত জগতের দিকে তাকানোর শক্তি পেতে পারি? আমাকে দৃষ্টিভঙ্গি সংস্থান করতে সাহায্য করার মতো আমার কি এখনও অবশিষ্ট কিছু আছে?বিশাল পরিবর্তনের সঙ্গে সমাজ যখন খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করবে তখন যে যুক্তি,লড়াই আর যুদ্ধ আসবে সেগুলোর জন্য আবেগী স্তর আনতেও কি সেটা আমাকে সাহায্য করবে? 

আমার কাজ আমাকে করে যেতে হবে;যথাসাধ্য সর্বোত্তম করার চেষ্টা করতে হবে। কারণ আমি এখনও বিশ্বাস করি,সাহিত্যের গুরুত্ব আছে এবং আমাদের এই কঠিন ভূখ- পার হওয়া অবধি এ গুরুত্ব থাকবে। তবে আমি নতুন প্রজন্মের লেখকদের ওপর নির্ভর করব;তাঁরা আমাদের পথ দেখাবেন। এখন চলছে তাঁদেরই যুগ। এ যুগ সম্পর্কে জ্ঞান এবং প্রবৃত্তি তাঁদেরই আছে; আমার মধ্যে সেগুলোর ঘটতি আছে। বই, চলচ্চিত্র, টিভি এবং নাটকের জগতে আমি আজকাল অনেক সাহসী ও উদ্দীপনামূলক মেধা দেখতে পাচ্ছি। তাঁরা হলেন চল্লিশ, ত্রিশ এবং বিশের কোঠার নারী পুরুষ। সুতরাং আমি আশাবাদী। আশাবাদী হবো না-ই বা কেন?

আপনাদের পছন্দক্রমে আমার কথা শেষ করার আগে আমি একটা অনুরোধ রাখতে চাই। আপনারা আমার এ অনুরোধকে নোবেল অনুরোধ বলতে পারেন। গোটা বিশ্বকে ঠিক করে ফেলা কঠিন। তবে আমরা তো ভেবে দেখতে পারি, আমাদের এই ছোট এলাকাটাকে কিভাবে প্রস্তুত করতে পারি। মানে আমাদের এই সাহিত্যের এলাকাটার কথা বলছি যেখানে আমরা পড়ি, লিখি,প্রকাশ করি,পছন্দ হলে পক্ষে বলি, অপছন্দ হলেও মতামত দিই এবং বইয়ের জন্য পুরস্কার দিই। আমরা যদি এই অনিশ্চিত ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে চাই,আমরা যদি আজকের এবং আগামীর লেখকদের কাছ থেকে সবচেয়ে ভালোটা পেতে চাই তাহলে আমি মনে করি, আমাদের আরো বেশি বৈচিত্র্যপূর্ণ হতে হবে। আমি বলতে চাচ্ছি, দুটো উপায়ে আমরা বৈচিত্রপূর্ণ হতে পারি।

প্রথমত: আমাদের সাধারণ সাহিত্য জগতকে আরো প্রসারিত করতে হবে। আমাদের প্রথম বিশ্বের সংস্কৃতির এলিট অঞ্চল,যে অঞ্চলকে আমরা নিরাপত্তার এবং স্বস্তির মনে করি সেখানকার বাইরের জগতের কণ্ঠও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আরো উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে আজ পর্যন্ত আজানা আছে এমন সাহিত্যিক সংস্কৃতির জগত থেকে রত্ম খুঁজে নিতে হবে। লেখকরা অনেক দূরবর্তী দেশে থাকতে পারেন কিংবা আমাদের নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্যেও থাকতে পারেন। দ্বিতীয়ত: ভালো সাহিত্যের উপাদানের সংজ্ঞা নির্ধারণ করার সময় আমাদের দৃষ্টি যেন অতিমাত্রায় সংকীর্ণ এবং রক্ষণশীল না হয়ে যায় সে ব্যাপারে যত্নবান হতে হবে। পরবর্তী প্রজন্ম গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্ময়কর গল্প বলার নতুন এবং মাঝে মাঝে বিহ্বলকর পদ্ধতি নিয়ে আসবে। তাদের প্রতি আমাদের মন উদার রাখতে হবে। বিশেষ করে সাহিত্যের শাখা এবং আঙ্গিক বিষয়ে তাদের সবচেয়ে ভালো সৃষ্টির যত্ন নিতে পারি এবং সেটার প্রতি আমরা শ্রদ্ধশীল থাকতে পারি। ভয়ানক রকমের বিভাজনের সময়ে অন্যের কথা শোনার জন্যও আমাদের মনোযোগ দিতে হবে। ভালো লেখা, ভালো পাঠ সব বাধা ভেঙে ফেলবে। আমরা নতুন কোনো ভাবনা পেয়ে যেতে পারি, মহান কোনো মানবীয় দৃষ্টি পেয়ে যেতে পারি যেখানে আমরা সবাই সমবেত হতে পারব।

আমরা মানুষেরা যে মঙ্গল অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাই বছরের পর বছর ধরে নোবেল পুরস্কারকে সে মঙ্গলের উজ্জ্বল প্রতীকে পরিণত করেছেন সুইডিস একাডেমি,নোবেল ফাউন্ডেশন এবং সুইডেনের জনগণ। তাঁদের সবাইকে আমার পক্ষ থেকে অনেক ধন্যবাদ।

//জেডএস//

লাইভ

টপ