অন্য সত্তা নদ্দিউ নতিম

Send
আফসানা বেগম
প্রকাশিত : ১৪:০৬, ডিসেম্বর ২১, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:২৯, ডিসেম্বর ২১, ২০১৭

 

নিজের ভিতরে এক সমান্তরাল সত্তা জেগে ওঠার গল্প নদ্দিউ নতিম।

নিজের মনে কে না কথা বলে? অবসরে কি একাকিত্বে অতীতের আনন্দ-বেদনা বা ভবিষ্যতের সুখস্বপ্ন মনে মনে কে না ঝালিয়ে নেয়? আর যে মানুষ বাস্তবেও একা তাকে তার ভাবনায় কি কথোপকথনেও একাকী থাকতে হয়। মতিন উদ্দিন এমনই একজন মানুষ। মতিন উদ্দিন কবি। কবিতার প্রতি তার আজন্মের টান। কিন্তু ভাগ্যচক্রে পরিচিতিহীন কবি। হাজার চেষ্টাতেও দুর্ভাগা কবির কবিতা কোথাও ছাপা হয় না। মতিন উদ্দিন কবি হিসেবে অনাবিষ্কৃত থাকতে থাকতে নিজের জগতে আত্মমগ্ন হয়ে পড়েন। তার কথা হয় কেবল নিজের সঙ্গে। নিজের সঙ্গে কথোপকথনের এক পর্যায়ে তার নিজেরই ভিতরে জন্ম নেয় আরেকটি ভিন্ন সত্ত্বা, যার নাম নদ্দিউ নতিম। কবিতা লেখায় অসফল হলে কী হবে, বুদ্ধির খেলায় মতিন কিন্তু ঠিকই ভাগ্যকে টেক্কা দিয়ে ফেলেন। নিজের নাম উলটে উচ্চারণ করতেই তিনি হয়ে ওঠেন এক উজবেক কবির ছায়া! নিজের কবিতা উলটে পড়তেই হয়ে যায় উজবেক ভাষার কবিতা। এভাবে তিনি পেয়ে যান বিখ্যাত উজবেক কবি নদ্দিউ নতিমকে, যার ওপরে শুরু হয় মতিন উদ্দিনের গবেষণা।

মতিন উদ্দিন পত্রিকাওলাদের কাছে নিজের কবিতা গছাতে পারেননি বটে কিন্তু তাদের আচার আচরণ বুঝতে তার মোটেও অসুবিধা হয়নি। আবেগী কবিতার চেয়ে দুর্বোধ্য প্রবন্ধ ছাপায় তাদের আগ্রহ মতিনের চোখ এড়ায়নি। তাই যেই ভাবা সেই কাজ, মতিন উজবেক কবি নদ্দিউ নতিমের কবিতার ব্যবচ্ছেদ শুরু করলেন নিজের রচিত প্রবন্ধে। শুধু কবিতা-ভাবনা নয়,  নদ্দিউ নতিমের মৃত্যুচিন্তা কিংবা উজবেকিস্তানের ঝকঝকে আকাশের নীচে নদ্দিউ নতিমের বিচিত্র অনুভূতি নিয়ে লিখে ফেললেন পাতার পর পাতা। বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে পত্রিকাওলারা কল্পিত রচনাগুলো গোগ্রাসে গিলে ফেলল। আর এভাবেই দিনের পর দিন বিখ্যাত উজবেক কবি নদ্দিউ নদিমের ব্যক্তিত্ব ঘায়েল করল অতি সাধারণ মতিন উদ্দিনকে।

‘নদ্দিউ নতিম’ নামের অপূর্ব নাটকটির নাট্যরূপ দিয়েছেন ম্যাড থেটারের কর্ণধার,  আসাদুল ইসলাম। তার নিজের কথায়,  ‘এটিকে মঞ্চে আনার চিন্তা কেউ বিপদে না পড়লে করবে বলে মনে হয় না।’ জানি না কী বিপদের কথা তিনি ইঙ্গিত করেছেন। তবে দর্শক হিসেবে বিপদের সুফল ভোগ করে এসেছি গত সপ্তাহে। বাংলাদেশে বছর দুয়েকের প্রদর্শনীর অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছুদিন আগে লন্ডনেও নাটকটির একাধিক সফল প্রদর্শনী করেছে ম্যাড থেটার। গত সপ্তাহে ছিল এর ৩৬তম প্রদর্শনী। হুমায়ূন আহমেদের দীর্ঘ এবং প্রায় জটিল উপন্যাস ‘কে কথা কয়’-এর নাট্যরূপ দেবার কথা যিনি চিন্তা করেন তিনি অবশ্য শুরুতেই প্রশংসার যোগ্য। উপন্যাসটিতে সমাজের বিচিত্র স্তরের অনিয়ম আর অনাচারকে কেন্দ্র করে মানুষের মানসিক জটিলতা ফুটে উঠতে দেখা যায়। আর উন্মোচিত হয় মানুষের অবচেতন মনের অবাস্তব ভাবনা। তিনশ’ পাতার উপন্যাসকে কেটে ছেঁটে দর্শকের সামনে তার চৌম্বক অংশ অসাধারণ নৈপুণ্যে তুলে ধরেছেন আসাদুল ইসলাম। ঠিক যতটুকু বললে গল্পটা দর্শকের সব প্রশ্নের উত্তর দেয়, ততটুকু। তাই অহেতুক পুনরাবৃত্তি তাকে ক্লান্ত করে না, অথচ বিষয়ের গভীরে যাবার মতো যথেষ্ট উপাদানও মেলে সহজে। তবে শুধু নাট্যরূপ দিয়েই থেমে থাকেননি তিনি, নির্দেশনার ভার নিয়েছেন আর প্রধান চরিত্র নদ্দিউ নতিমের ভূমিকায় অনবদ্য অভিনয়ও করেছেন।

নাটকের পরদা ওঠে মতিনের স্বগোতোক্তির মধ্যে দিয়ে। তিনি মতিন উদ্দিন আবার তিনিই কী করে নদ্দিউ নতিম, এই ব্যাখ্যা নাটকের শুরুতেই দর্শকের পুরো মনোযোগ কেড়ে নিতে সক্ষম হয়। দর্শক পুলক বোধ করে, হয়ত কয়েক মুহূর্তের জন্য চরিত্রটিকে স্বাভাবিক নাকি অস্বাভাবিক-- কোন ভাগে ফেলবে, এ নিয়ে দ্বিধায় থাকে। প্রকৃতপক্ষে,  হলফ করে কেউ কি বলতে পারে জগতে কে কতটা স্বাভাবিক?  জীবনভর মানুষ কি ক্রমাগত কথা আর কাজের ছলে নিজের উন্মাদনা লুকিয়ে স্বাভাবিকতার প্রমাণ দিতে থাকে না? মতিন উদ্দিনও সেভাবে ধীরে ধীরে দর্শকের চোখে অস্বাভাবিকতার দেয়াল সরিয়ে তাদেরই একজন হয়ে ওঠে। পোড় খাওয়া কবির সৃষ্টির বিপুল উদ্দীপনা দর্শককে বিগলিত করে। অন্যদিকে ‘মনোলগ’ বা ‘স্ট্রিম অফ কনশাসনেস’ কৌশলে মতিন উদ্দিনের বিরতিহীন সংলাপ দর্শককে বিমোহিত করে রাখে। দর্শক অন্যমনষ্ক হবার এতটুকু ফাঁক পায় না। মঞ্চের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে মতিন উদ্দিনের ধীর বা দ্রুত পদক্ষেপ,  কখনো দৌড়,  কখনো এমন ভঙ্গি যে কেউ যেন তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, আর সর্বপোরি শক্তিশালী সংলাপ-- এই সমস্ত কিছু মিলিয়ে দর্শককে চলমান নাটকটির মধ্যে আঁকড়ে ধরে ডুবিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট।

অর্থের প্রয়োজনে মতিন উদ্দিন যায় শিশু কমলের সার্বক্ষণিক সহযোগী হিসেবে পরীক্ষা দিতে। দেখা হয় কমলের বাবা ব্যারিস্টার সালেহ ইমরান সাহেবের সঙ্গে। নিজের বায়োডাটার সঙ্গে উজবেক কবি নদ্দিউ নতিমের কাব্যভাবনা বিষয়ক দুটো প্রবন্ধ জুড়ে দেয়ার লোভ সামলাতে পারে না মতিন উদ্দিন। কিন্তু প্রতিবন্ধী শিশুকে দেখাশোনার দায়ের কথা জানতে পেরে সেই পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হতে সারলতার আশ্রয় নেয়, প্রকাশ করে দেয় কল্পিত রচনার কথা। অথচ সেটাই তার সততা বলে বিবেচিত হয় কমলের বাবা-মায়ের কাছে। কমলের মা, মুনার সঙ্গে তাই অবধারিত হয়ে ওঠে মতিনের সাক্ষাৎ। মুনারূপী সোনিয়া হাসানের মঞ্চে প্রবেশে দর্শকেরা নড়েচড়ে ওঠে। তার শুরুটাই এমন চমকপ্রদ যে ততক্ষণের সাদাকালো নাটকে যেন হঠাৎ রঙের বন্যা বয়ে যায়। চলনে-বলনে ব্যারিস্টারের স্ত্রী হিসেবে আপাদমস্তক মানানসই মুনার প্রশংসা না করা রীতিমতো অন্যায় হবে। তবে মুনার ভাষণ মতিনের জন্য সুখকর হয় না। কিছুতেই সে কমলের সহযোগী হতে চায় না। সে বিদায় নেয়। কিন্তু ওদিকে গম্ভীর আর গণিতবিদের মতো চিন্তাশীল অটিস্টিক কিশোরী কমল মতিন উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলতে চায়। নিজের সবচেয়ে বেশি গোপন কথা জানানোর জন্যও সে বেছে নেয় মতিনকেই।

নাটকে সাধারণ মাত্রার অটিজম ও উচ্চ মাত্রার ডিজলেক্সিয়ায় আক্রান্ত একটি শিশুকে দেখানো হয়েছে। ডিজলেক্সিয়ার কারণে সে উলটো করে বলে বা লেখে। কিন্তু অন্যদিকে অটিস্টিক শিশুদের কারো কারো মধ্যে যে বিস্ময়কর প্রতিভা দেখতে পাওয়া যায়, কমল চরিত্রটি তেমনই এক প্রতিভার অধিকারী। মুখে মুখেই কমল দীর্ঘ অংক সমাধান করে, গণিতের জটিল সূত্র গড়গড় করে বলে যেতে থাকে। তার বয়সী শিশুর যেমন প্রিয় হবার কথা ছবি বা গান, শখ হবার কথা বেড়ানো কি গল্প শোনা, সময় কাটার কথা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে, সেখানে কমলের প্রিয় হয় গণিতের ফিবোনাচ্চি সিরিজ, শখ হয় অক্ষরকে পারমুটেশন-কম্বিনেশন করে একই শব্দকে বারবার ভিন্ন কায়দায় লেখা, সময় কাটে কেবল নিজের সঙ্গে। আবেগহীন অথচ সামান্য ভোগান্তিতে কাতর হয়ে পড়ে, আশেপাশের প্রত্যেককে এক কথায় বাতিল করে দেয়, এরকম এক শিশুকে বড়ো করে তোলার ক্ষেত্রে অভিভাবকের ভোগান্তি অপরিসীম। মতিন উদ্দিন সরাসরি সেই ভোগান্তির ভার পেয়ে যায়। প্রথমে আড়াল থেকে শোনা যায় কমলের কষ্ঠস্বর, ‘ফিবোনাচ্চি সিরিজের দুই নম্বর সংখ্যা কী?’ এই সংখ্যা জানা না-জানার উপরেই নির্ভর করে সে মতিন উদ্দিনের মুখদর্শন করবে কি না। মুনার কাছে সাহায্য পেয়ে মতিন উতরাতে চাইলেও পরে ঠিকই ধরা পড়ে যায়। তাই আলাপের শুরুতেই কমলের রোষের কারণে কপাল ফাটে তার। আবার উজবেক কবির ছায়া নদ্দিউ নতিমের কথাকে উলটে ভাবার অভ্যাসের কারণে কমলের সঙ্গে যোগাযোগও ঘটে সহজে। আর তারই মধ্যে দ্রুত কথোপকথনে শিশুটির অস্থিরতা, হতাশা এমনকি গোপন জানাকে লুকিয়ে রাখার প্রচেষ্টাও সামনে আসে। কমল নামের আলুথালু অগোছালো শিশুর ভূমিকায় আর্য মেঘদূত দর্শককে তাক লাগিয়ে দেয়। মাথাভরা অবিন্যস্ত কোঁকড়া চুল আর কৌতূহলী অথচ তাবৎ পৃথিবীর উপরে বীতশ্রদ্ধ চোখ-মুখের ভঙ্গি শুরুতেই তাকে দর্শকের কাছে নাটকের ‘কমল’ হয়ে উঠতে সাহায্য করে। স্বাভাবিক গতিতে চিন্তা করতে নারাজ কমলের প্রতি কৌতূহলী হতে আর তার অসহায়ত্বকে ভালোবাসতে দর্শকের এতটুকু সময় লাগে না। দীর্ঘ জটিল গাণিতিক সংলাপ কমল অবলীলায় উচ্চারণ করে। তার কচি মুখের নির্দোষ ভঙ্গিতে দুর্বোধ্য সংলাপগুলো যেন আদুরে বাক্য হয়ে ওঠে। চরিত্রের মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে গড়গড় করে দুরুহ সংলাপ বলার এক চরম উদাহরণ দর্শকের সামনে উপস্থাপিত হয়।

মতিনের এক বন্ধু আশরাফ থাকে নাইক্ষংছড়ির কঠিন পাহাড়ি এলাকায়। মোমের আলোয় বসে সে মতিনকে চিঠি লেখে। জানা যায় উজবেক কবি নদ্দিউ নতিমের জীবনীটি অনুবাদ করা শেষ হয়েছে, দেখা যায় An Autobiography of a Ficticious Poet  পেঙ্গুইন প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে। নিভৃতের কবি মতিন উদ্দিনের জীবনে নিঃসন্দেহে বিরাট ঘটনা। আপন মানুষদের মাঝে বই বিলিয়ে তা সে উদ্যাপন করে।  

বিদগ্ধ কবি মতিনের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ থাকে, যার নাম নিশু। বুদ্ধিমতী নিশু তার একসময়ের সহপাঠী। নিশু আর তার রন্ধনপটু বাবার দৈনন্দিন জীবনের একজন হলেও মতিন নিজের অবস্থানের বাস্তবতা বিবেচনা করে সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও নিশুর জীবনে জড়ায় না। বাবার মৃত্যুর পরে একাকী নিশু নিজের ঘরে ধর্ষণের শিকার হয়। সে খবরে মুষড়ে পড়ে কবি মতিন উদ্দিন। তবে আরো বেশি আহত হয় যখন দেখে আদালতে শুনানির নামে নিশুকে প্রশ্ন করা হয়েছে, ‘আপনার রেট কত?’ ছোট্ট একটি বাক্য আর কপাল চাপড়ানো মতিনের প্রতিক্রিয়ায় সমাজের বিভীষিকাময় চিত্রটি তখন স্পষ্ট দেখা যায়। একদিকে অসহায় একাকিত্বে নিশুর পরিণতি অন্যদিকে সমাজের উঁচু স্তরে আপাত দৃষ্টিতে সুখময় সংসারের মধ্যেও ঘুণপোকা দেখাতে নাটকটি পিছ পা হয়নি। মুনার সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক তাদের কর্মচারী আহমেদ ফারুকের। তারই ফল শিশু কমল। বুদ্ধিমান কমলের তা বুঝতে সময় লাগে না। নিজের ভিতরে পুষে রাখা সত্যটি সে জানায় কেবল মতিনকে। তারপরেও নিজের অন্তর্দহনে সে আত্মহত্যাকে শ্রেয় মনে করে। অন্য কেউ থামাতে না পারলেও তাকে বাঁচানোর জন্য চিলছাদে পৌঁছে যায় মতিন। তারপর ভালোবাসার মর্মার্থ বুঝতে অপারগ কমলকে স্নেহের প্রমাণ দিতে গিয়ে কমলের পরিবর্তে নিজেই লাফিয়ে পড়ে। একইসঙ্গে মৃত্যুবরণ করে মতিন উদ্দিন আর উজবেক কবি নদ্দিউ নতিম।

প্রধান চরিত্রের মৃত্যুর মাধ্যমে নাটকটি চরমে গিয়ে দাঁড়ায়। মৃত্যু আসে একটি শিশু মনে সত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। জীবন দিয়ে মতিন শিশুটিকে ভালোবাসার টান বোঝাতে চেষ্টা করে। নিস্তব্ধ দর্শকদের মাঝে দীর্ঘসময় ধরে তিল তিল করে গড়ে ওঠা নিরীহ কবি মতিনের পরিণতি আকস্মিক বা ভয়ঙ্কর মনে হলেও ভালোবাসা প্রতিষ্ঠার কোমল ছোঁয়ায় সামনে যা ঘটছে সমস্তকিছুকে স্বাভাবিক লাগে।

নাটকটি দেখার পরে মনে কিছু ভাবনা আসে বটে। কিছু প্রশ্নও। দৃশ্যমান তিনটি চরিত্র ছাড়াও বাকি যে চরিত্রগুলো ছিল, তারা কেউ মঞ্চে নেই কেন? চাইলে কি নাট্যকার সেইসব চরিত্রের জন্য ভিন্ন মানুষদের উপস্থাপন করতে পারতেন না? পারতেন হয়ত। কিন্তু একক ধারাবর্ণনার চমকপ্রদ মনোলগ তাতে হারিয়ে যেত। নাট্যকার বা অভিনেতা হিসেবে এতটা চ্যালেঞ্জও হয়ত নেয়া হতো না। এদিকে নাটকের মঞ্চে অদেখা চরিত্রগুলো নেই আবার আছেও। তারা আছে মতিনের অপূর্ব বর্ণনায়। প্রত্যেক চরিত্রের মধ্যে প্রবেশ করে মতিন তার অন্তর্গত কথা বলে। ভিন্ন বাক্যে, ভিন্ন মুখভঙ্গিতে মতিনের মধ্যেই দেখতে পাওয়া যায় মঞ্চে শারীরিকভাবে অনুপস্থিত সেইসমস্ত চরিত্রকে। এভাবে নিশু, নিশুর বাবা, আহমেদ ফারুক, আশরাফ এমনকি আরো দু-তিনজনকে দেখতে পাওয়া যায়। দর্শক হিসেবে তাদেরকে শারিরীকভাবে দেখার ভিন্ন কোনো আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয় না। যেমন, আশরাফের চিঠি পড়ার সময়ে সংলাপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, ‘মোমের আলোয় যে চিঠি লেখা হয় তা পড়তে হবে মোমের আলোয়’ বলতে বলতে অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় মতিন মোমবাতি জ্বালায়। মঞ্চের আলো নিবে গিয়ে তখন যেন নিবু নিবু আলোয় আস্ত আশরাফ সেখানে উপস্থিত হয়। হুমায়ূন আহমেদীয় কায়দায় মতিনের মুখ দিয়ে আশরাফের নাম উচ্চারিত হয় কঠিন গাধা, যেখানে গাধা হলো Ass আর কঠিন হলো Rough। নাটকে আরো বেশ কিছু ব্যাপার বা সংলাপ এসেছে যার উপরে হুমায়ূনের লেখার ছাপ মারা। যেমন, কবির কপাল ফাটাতে দুঃখপ্রকাশ করলে নির্লিপ্ত কবি স্বীকার করেন যে কবিদের কপালই ফাটা। আবার, আহমেদ ফারুকের নামের স্বরূপ প্রকাশ করতে বলা হয়, আগে গাড়ি পরে ঘোড়া। তারপর আছে এক স্বপ্নের দৃশ্য যেখানে মতিন চোরাবালিতে ডুবে যেতে থাকে। ওদিকে একেবারে বিপরীত মেজাজে মুনা সেখানে জামার ঘের উড়িয়ে প্রজাপতির মতো ছুটে বেড়ায়, উদ্ধারের অনুরোধে জাপানিজ বা রাশান ভাষায় চোরাবালির প্রতিশব্দ জানতে চায়। অভিনয়ের গুণে আর হুমায়ূনের সংলাপে দৃশ্যটি দারুণ উপভোগ্য। 

খুবই নগণ্য হলেই উল্লেখ করব যে দু-এক জায়গায় মূল চরিত্রের দ্রুত সঞ্চালন বাস্তবের চেয়ে দ্রুত মনে হয়েছে। ওইটুকুই শুধু কৃত্রিমতা কিংবা অতি অভিনয়ের আভাস নিয়ে চোখের সামনে এসেছিল বার দুয়েক। কখনো যেন আলো একটু দেরিতে তাকে অনুসরণ করেছে। কখনো মনে হয়েছে মঞ্চের ঠিক একখানে আলোটা কুক্ষীগত থাকলেও বাকি অংশে বেশ আলো যা অন্ধকার হলে হয়ত দর্শকের জন্য মনোযোগের কেন্দ্র খুঁজে পাওয়া আরো সহজ হতো। তা ছাড়া, কাহিনির প্রয়োজনে কমল চরিত্রটি যে উপায়ে নিজের জন্মদাতা বাবা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়, তা অনেকাংশে দর্শকের আস্থা অর্জন করতে পারে না। তবে শিশুমনের অদ্ভুত খেয়াল হিসেবে হয়ত লেখক ওরকম একটি বিষয়ের অবতারণা করে থাকবেন।

নাটকটিতে তিনটি চরিত্র দৃশ্যমান হলেও, যেহেতু অর্ধেকের বেশি সময় কেবল মতিন উদ্দিনকেই দেখা যায় তাই নাটকটিতে একক অভিনয়ের আমেজ আছে। মনোযোগী ও চিন্তাশীল দর্শকের জন্য উপযুক্ত বটে। অন্যদিকে একক অভিনেতার শারীরিক ভঙ্গি এবং নড়াচড়ার মধ্যে উপভোগের বিষয়টিও আছে। দর্শক হিসেবে যখন জানতে পারি যে নাটকে অংশ গ্রহণ করা তিনজন একই পরিবারের সদস্য তখন দর্শকের সারিতে বসে নানানরকমের কল্পনা আসে... তারা নিশ্চয় এ নাটক বাড়িতে বসেই রিহার্সাল করেছেন, হয়ত একেকদিন তাদের বসার ঘরে নিজেদেরই সংলাপে নিজেরাই হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়েছেন, একেকদিন একে অন্যের কঠোর সমালোচনা করেছেন, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কত কত খিটিমিটি-খুনসুটির মধ্যে দিয়ে প্রোডাকশনটি দাঁড়িয়েছে ভাবতে ভালোই লাগছিল।

সব মিলিয়ে একাধিক ডাইমেনশনের জটিল একটি কাহিনির সরল উপস্থাপনার জন্য ম্যাড থেটার প্রশংসার যোগ্য। নাটকের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের প্রাপ্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে আরো বহু সফল প্রদর্শনী প্রত্যাশা করি।

 

//জেডএস//

লাইভ

টপ