অগ্নিপুরুষ : ইতিহাসের মহানায়ক-নির্মিতি

Send
রহমান রাজু
প্রকাশিত : ১৯:৩৪, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৩৯, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৮

বাঙালির জাতীয় জীবনে শেখ মুজিব একটি অনিবার্য নাম; ইতিহাসের মহানায়ক। দেশবিভাগের অব্যবহিত কাল থেকেই সক্রিয় রাজনীতিক; আত্মউৎসর্গীকৃত মানুষ। স্বায়ত্ত্বশাসন থেকে স্বাধিকার আন্দোলন-পর্বের দীর্ঘসময়ের কারানির্যাতন, মৃত্যুর পরাকাষ্ঠার মুখোমুখি দুর্বিষহ জীবনপরিস্থিতি নিয়ে স্বদেশ ও স্বাধীনতার কাণ্ডারিরূপে নিজেকে নির্মাণ করেছেন। বাংলাদেশ শব্দটির সঙ্গে এখন এ নামটি সহশব্দরূপে পরিগণিত। ধারাবাহিক আন্দোলন সংগ্রামে বিচক্ষণতা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা, মেধা, সাহস ও চারিত্রিক দৃঢ়তা তাঁর গভীর বিশ্বাসকে সংহত করেছে; নিশ্চিত করেছে কোটি মানুষের আস্থা। তিনি হয়ে উঠেছেন অগ্নিপুরুষ। সরল আখ্যানে এরূপ বিবেচনায় মোস্তফা কামালের উপন্যাস অগ্নিপুরুষ বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু তারও অধিক পাঠ এ গ্রন্থটি দাবি করে। একইসঙ্গে ইতিহাস ও সাহিত্যের। স্বাধীনতা সংগ্রামের যে রাজনৈতিক ইতিহাস তার ভূগোল পাঠ হতে পারে তা।

 করাচি থেকে একজন পুরুষ পা রাখলেন ঢাকায়। আসাটা নিশ্চিত ছিল না; স্বভূমির মাটিতে আসতে পেরে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। এখান থেকেই শুরু অগ্নিপুরুষের যাত্রা আর রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে আইয়ুব খানের প্রস্থানে সমাপ্তি। আদিঅন্ত্য একজন মানুষ এর কেন্দ্রবিন্দু। সাতচল্লিশোত্তর বাংলায় বিশেষত ছয় দফার কালে মুজিব হয়ে উঠলেন অনিবার্য। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ভীত দুর্বল হতে থাকে এ পর্ব থেকেই। আইয়ুবের রক্তচক্ষু এ আন্দোলনকে স্তিমিত করতে পারেনি বরং পতনের আভাস বহন করেছে। বাংলার রাজনীতি, সংগ্রাম ও প্রত্যাশা বিবর্তিত হয়েছে তাঁকে ঘিরে। কেন্দ্রে তিনিই। আইয়ুব-ইয়াহিয়া-মোনেম চক্রের মাথাতেও ওই একটিই নাম। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, বজলুর রহমান, জহুর হোসেন, শহীদুল্লা কায়সার,  তাজউদ্দীন আহমদ, মতিয়া চৌধরী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রমুখেরও সারথি ওই একজনই। তাঁর ঘোষিত ছয় দফা স্বাধীনতা-সংগ্রামের অপরিহার্য বাঁক, যে ছয় দফার স্বায়ত্ত্বশাসনমূলেই স্বাধিকার আন্দোলনের সূত্রপাত।

অগ্নিপুরুষের ভূমিটা ইতিহাসের কিন্তু বিনির্মাণটা সাহিত্যের। ঐতিহাসিক উপন্যাস সবসময়ই একটি আলাদা গুরুত্ব বহন করে। কেননা পাঠক তাতে দুয়ের সন্ধান পায়, সাহিত্যের সঙ্গে ইতিহাসের বাড়ি দেখা হয়। আরো খোলাখুলি বললে রাজনৈতিক উপন্যাস পাঠকের নিকট অধিকতর গ্রহণীয়। বোধ করি মানুষ স্বভাবতই রাজনৈতিক জীব বলে সেদিকটায় আগ্রহ থাকে সহজাতভাবেই। ইতিহাসের নিরেট সত্যকে অক্ষুণ্ন রেখে সাহিত্যের পাঠ নির্মাণটা সহজ কথা নয়। মোস্তফা কামাল সেদিকটায় মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। একজন রাজনীতিক এ উপন্যাসের নায়ক। শুধু তাই নয়, চরিত্রটি নির্মাণগুণে ক্রমান্বয়ে ইতিহাসের মহানায়ক হয়ে ওঠে। পাঠক অবলীলায় এ চরিত্রের সঙ্গে ভ্রমণ করতে পারে দেশপ্রেম ও মানবিকবোধে। উপন্যাসের ক্ষেত্রে চরিত্রের হয়ে ওঠাটা বেশ জরুরি এবং এক্ষেত্রে তা সফল; কেন্দ্রে মুজিব আর তাঁকে ঘিরে ছেষট্টি থেকে ঊনসত্তরের কালের নায়কেরা। কালের নায়কদের মহানায়ক হয়ে ওঠে অগ্নিপুরুষ।

ছয় দফার মোদ্দা কথা, ‘কত নিছো? কবে দেবা? কবে যাবা?’ গণমাধ্যমগুলো সাহসী ভূমিকায় অবতীর্ণ। দৈনিক আজাদ, ইত্তেফাক, সংবাদ ইত্যাদি। বিশেষত ইত্তেফাক। আইয়ুবী নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ইত্তেফাকে রাজনৈতিক মঞ্চ চালু করেন। ঔপন্যাসিক জানান, ‘আওয়ামীলীগ আর ইত্তেফাক হচ্ছে পরস্পরের পরিপূরক। আওয়ামীলীগ যা করে তা যদি ইত্তেফাকে না থাকে তাহলে মানুষ এটা পড়বে? আওয়ামীলীগকে যারা ভালোবাসে তারাই এই পত্রিকাটা পড়ে।’ একসময় ইত্তেফাক বাজেয়াপ্ত হয়। মুজিব বলেন, ‘হায়রে দেশ! আইয়ুব খান-মোনেম খান মিলে দেশটারে শেষ করে দিচ্ছে। প্রতিবাদ করার কেউ নেই। যেই প্রতিবাদ করে তারই টুঁটি চেপে ধরে! কী এক বর্বর শাসনের মধ্যে আছি আমরা। মানিক ভাই জেলে। তাঁর পত্রিকাও বন্ধ। কে আর লিখবে এসব দুঃশাসনের বিরুদ্ধে! জহুর মাঝেমধ্যে কিছু লেখার চেষ্টা করে। কিন্তু এত চাপাপচাপি করলে লিখবে কী করে! তাঁকেও তো চাকরি করেই খেতে হয়। ওটাও যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে কতগুলো সাংবাদিক-কর্মচারী বেকার হয়ে যাবে। ইত্তেফাক বন্ধ হওয়ার পর কত লোক বেকার হলো! তাঁদের পরিবার কীভাবে দিন কাটাচ্ছে কে জানে!’

মহাকালের সাহসী পুরুষ নির্মাণে মোস্তফা কামাল ইতিহাসের সত্যপ্রকাশে সতর্কদৃষ্টি রেখেছেন। জনতার সংগ্রাম পর্যন্ত প্রতিবেশ তৈরি হয়েছে। পরিবার ও ব্যক্তিজীবনকে তুচ্ছ করে জাতি-রাষ্ট্রের জন্য জীবনবাজির বাজিকর শেখ মুজিব। মেয়ের বিয়ের সময়ও তিনি কারাবন্দী। শিশুপুত্র রাসেলের আব্বা ডাক তাঁর কানে ভাসে। কিন্তু বৃহত্তর দায় তার জাতির প্রতি। আইয়ুব খান নিজেও তাঁর সম্পর্কে বলেন, ‘আমার মনে হয় সে অনেক বেশি দূরদর্শী নেতা।’ কাহিনির পরিণতি তা প্রমাণ করে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁকে যুক্ত করা হয়। ঘটনা এখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক নেয়। ছয় দফার পথ ধরে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের এগারো দফা আসে। আইয়ুব খানের পতন অবধারিত হয়ে আসে। এসবের নেপথ্যে ইতিহাসের মহানায়ক। লেখক জানান, ‘১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং রাজনীতির উত্থান-পতন, রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় আসে ছয় দফার ঘোষণা। একপর্যায়ে ছয় দফাকে ঘিরেই পাকিস্তানের রাজনীতি আবর্তিত হয়। নানা ঘাত-প্রতিঘাত আর চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্যদিয়ে অগ্নিপুরুষরূপে আবির্ভূত হন শেখ মুজিব।’ তাঁর দুর্দান্ত সাহস বিচলিত করেছে শাসকগোষ্ঠীকে আর প্রাণিত করেছে বাঙালি জাতিকে। উপন্যাসের একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, ‘২১ এপ্রিল। ভোর থেকে শেখ মুজিবের বাসার চারদিকে পুলিশ ঘিরে আছে। গেটের সামনে কয়েকজন অফিসার ওয়াকিটকিতে কথা বলছেন। ওয়াকিটকিতে যে কথা হচ্ছে তা ভাঙা ভাঙা। সে কথাগুলো জোড়া লাগালে যা হয় তা এ রকম, দেরি কর না। শেখ সাহেবের কাছে খবর পাঠাও। তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য ওপর থেকে নির্দেশ আছে। উনি পালানোর মানুষ না। তোমরা খবর পাঠালেইে উনি বেরিয়ে আসবেন।’ মুক্তিকামী মানুষের প্রত্যাশার পুরুষ তিনি। উত্তপ্ত রাজপথ আর বাঁধভাঙা জনতার কণ্ঠস্বর তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করে। ‘অগ্নিপুরুষ শেখ মুজিব, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ। জেলের তালা ভাঙব শেখ মুজিবকে আনব।’ স্লোগানের এ বিন্দুতেই ঔপন্যাসিকের পক্ষপাত। নামকরণ তাই ‘অগ্নিপুরুষ’। চার বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের খতিয়ানে এমন তথ্যই প্রাপ্তি হয়ে আসে।

মোস্তফা কামাল উদ্ধৃতির মাঝে রেখেছেন ইতিহাসের প্রামাণিক সংলাপগুলো। আবহ নির্মাণ করেছেন স্বকল্পিত প্রতিবেশে। গল্প বা ঘটনা বুননেও পারম্পর্য রক্ষা করেছেন এমনরূপে যে, তা ইতিহাসের পাঠ-ই মনে হতে পারে। বস্তুনিষ্ঠতার খুব নিকট থেকে সাহিত্যের সত্য পরিবেশন করেছেন। পারিবারিক পর্বগুলো বেশ আবেগময়; গণমাধ্যমের পর্বগুলো গঠনমূলক-কৌশল আর ধারাবাহিক ঘটনাগুলো দাবির পীঠে ধাবমান। গান-স্লোগান-কবিতার প্রয়োগ দূর করেছে পাঠের একঘেয়েমিতা। সংলাপগুলো প্রামাণিক ভূমিকায় ধ্বনিত। কখনো কখনো মনে হয় রেকর্ডে বাজছে শেখ মুজিবের কণ্ঠস্বর। অসামান্য দক্ষতায় অন্তর্গত কষ্ট আর বাহ্যিক প্রতিবেশ মোকাবেলা মুজিব চরিত্রটি আনপ্যারালাল।

ছয় দফার নেতাকর্মীদের জেল, সার্জেন্ট জহুরুল হক ও ছাত্রহত্যা, পত্রিকা বন্ধ, পহেলা বৈশাখ পালনে নিষেধাজ্ঞা, রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন করতে না দেয়া, সংস্কৃতিচর্চার পথ রুদ্ধ করেও লাভ হয়নি আইয়ুব খানের। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চলমান অবস্থায় গোলটেবিল বৈঠকের প্রস্তাব আসে। পথে-প্রান্তরে তখন এগারো দফা তুঙ্গে উঠেছে।  শেখ মুজিব বৈঠকে প্রথমত যোগ দেননি। পরবর্তী সময়ে ঊনসত্তরের ১০ মার্চ গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেন রাওয়ালপিন্ডিতে। ছয় দফা ও এগারো দফা মেনে নেবার আহ্বান জানান। আইয়ুব খান তা না মানলে তিনি ওয়াক আউট করে ঢাকায় চলে আসেন। এরপর পঁচিশ মার্চ জানা যায় ইয়াহিয়া খানের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করে রাজনীতির মঞ্চ থেকে বিদায় নেন আইয়ুব খান। মুক্তি মেলে শেখ মুজিবের। ‘আনন্দের সাগরে ভাসে পূর্ব পাকিস্তান।’

বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস এখানেই সমাপ্ত নয়। উত্তাল পরিস্থিতি আরো ঘনীভূত হতে থাকে। গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুক্তিসংগ্রামের পথ নির্মিত হয়। কিন্তু উপন্যাসের এ পর্বে এখানেই সমাপ্তি। এটুকু মেনে আমাদের পরবর্তী উপন্যাসের অপেক্ষায় থাকতে হয়। কেননা এটি একটি ধারাবাহিক উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্ব। পূর্ববর্তী উপন্যাস ‘অগ্নিকন্যা’য় একজন মতিয়া চৌধুরী আর বর্তমান উপন্যাসে বাংলার মহানায়ক শেখ মুজিবকে সাহিত্যের শুভ্রকাননে আমাদের পাওয়া হয়ে যায়। দ্বিবিধ পাঠেই ইতিহাসের মহানায়কের নির্মিতি এ উপন্যাসের মর্মমূলে ক্রিয়শীল। ঔপন্যাসিক মোস্তফা কামালের সেখানেই জিত।

অগ্নিপুরুষ : মোস্তফা কামাল। প্রচ্ছদ :  ধ্রুব এষ। প্রকাশক : পার্ল পাবলিকেশন্স, ফেব্রুয়ারি ২০১৮। মূল্য : ৪০০ টাকা।                        

 

//জেডএস//

লাইভ

টপ