সাহিত্যের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা কি পুরুষতান্ত্রিক

Send
আফরিন শরীফ বিথী
প্রকাশিত : ১৩:৪২, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:২৭, মার্চ ০১, ২০১৮

একজন তরুণ হিসেবে এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলা থেকে তরুণ লেখক ও কবিদের বেশ কিছু বই কিনি। একটা উপন্যাস পড়ে ভীষণ আঘাতপ্রাপ্ত ও উদ্বিগ্ন হই। সে বিষয়েই লিখছি। রাসেল রায়হান, একজন তরুণ লেখক ও কবি। মূলত তিনি একজন কবি। এ পর্যন্ত তাঁর দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি তাঁর "বিব্রত ময়ূর " পাণ্ডুলিপির জন্য পেয়েছেন মার্কিন গবেষক অধ্যাপক ক্লিন্টন বি সিলি ও প্রথমা প্রকাশনের যৌথ উদ্যোগে প্রবর্তিত 'জীবনানন্দ দাশ পাণ্ডুলিপি পুরস্কার ১৪২২ '।

তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস 'একচক্ষু হরিণীরা'। এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বা নায়ক মুকুল। মুকুলের আত্মজীবনীমূলক ভাষ্যেই উপন্যাসের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। মুকুল একজন কবি। প্রসঙ্গক্রমেই লেখক নিজের রচিত একটি কবিতা উপন্যাসে যুক্ত করেছেন এবং এই কবিতা লেখার পিছনের কারণ উপন্যাসে বর্ণনা করেছেন। সমস্যাটা ঘটেছে কবিতাটির এই প্রেক্ষাপট উল্লেখ করার কারণেই। আমার লেখার প্রসঙ্গে উপন্যাসে বর্ণিত অংশটুকু এখানে তুলে দিচ্ছি, নাহলে আমার আপত্তির জায়গাটা বোঝা যাবে না।

পরম্পরা (কবিতা) : "আমি যখন ক্লাস ওয়ানে পড়ি, ফিস চাইতে গেলে বাবা আমার দিকে ম্রিয়মান ভঙ্গিতে তাকিয়ে ছিলেন, যেন তার মনে পড়ে গেছে গত রাতের কথা, যখন আমি মোমের আলোয় চেঁচিয়ে পড়ছিলাম, ‘ফিস মানে মাছ, ফিস মানে মাছ...।’ তিনি মাছ কুটছিলেন। সেই মুহূর্তে আমার দিকে মনোযোগ দেওয়ার ফলে তার একটি আঙুল ছিন্ন হয়ে যায়। যেহেতু ফিস দেওয়া হচ্ছেই না, কিছু অ্যাডভেঞ্চার করা যাক ভেবে আমি সেই আঙুল রঙিন পেপারে মুড়ে স্কুলে জমা দিয়ে দিলাম।...এইভাবে দশম শ্রেণি পর্যন্ত দশ ক্লাসে দশটি আঙুল জমা পড়ে স্কুলে ! স্কুল ছাড়ার আগে ফিজিক্স-টিচার দেখলাম শল্যচিকিৎসকের ভূমিকায় নেমে গিয়ে কাগজে মুড়িয়ে রাখা পুরাতন দশটি আঙুল আমার দুহাতে লাগিয়ে দিলেন। নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, আমার সন্তানকে বিশ ক্লাস পড়াতে পারব। সেও নিশ্চয়ই তার সন্তানকে পড়াবে ত্রিশ-ত্রিশটি ক্লাস..."

উপন্যাসে বর্ণিত কবিতার প্রেক্ষাপট : "আমি একটা কবিতা লিখেছিলাম বাবাকে নিয়ে। সেই কবিতাটা সত্যিকার অর্থে আমার মাকে নিয়ে লেখা। কিন্তু সাহিত্যে সত্যিকারের জিনিস অবিকল লিখলে যত রসই দেওয়া হোক, পত্রিকার রিপোর্ট মনে হয়। যেকোনো সাহিত্যেই সবসময়ে কিছু মিথ্যে ঢোকাতে হয়, স্বর্ণালঙ্কারের খাদের মতন। খাদটুকু না থাকলে অলঙ্কার মজবুত হয় না। এই কথাগুলো কি আগেই সাহিত্যের রথী-মহারথীরা কেউ বলে ফেলেছে? বললে বলুক।

এক সিনিয়র কবি আমায় বলেছিলেন কবিতাটা পড়ে নাকি সারারাত ঘুমাতে পারেননি।তিনি আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, আমার বাবা কি করেন। তিনি সত্যিই মাছের ব্যবসা করেন কি না। আমি হেসেছিলাম।বলতে ইচ্ছে হয়নি, আমার বাবা অন্ধ। তিনি একটি পান সিগারেটের দোকান চালান, দূর এক মফস্বলে। এই কবিতার সঙ্গে তার দূর-দূরান্তের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং মায়ের একটি স্মৃতি আমার প্রায়ই মনে পড়ে। বাবার পান-সিগারেটের দোকান থেকে আমাদের ভালোই চলে যাচ্ছিল সে সময়। এমনিতেই চালু দোকান। বাবার অন্ধত্ব এবং ভালো ব্যবহার, এই দুইটা জিনিসই দোকানটাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। তাও মায়ের টাকার প্রয়োজন ছিল।

বড় হয়ে বুঝতে পেরেছি, বাবার চোখের অপারেশনের জন্য মা টাকা জমাচ্ছিলেন। রোজ খুব ভোরে মা পাইকারি বাজার থেকে মাছ কিনে আনতেন। সেই মাছ আঁইশ ছাড়িয়ে, কেটেকুটে আমায় দিয়ে বাজারে পাঠিয়ে দিতেন। ভাগা হিসেবে বিক্রি করতাম। একবেলা মাছ বিক্রি করে এসে দুপুরের পরে স্কুলে যাই আমি। টিফিনের পরের পিরিয়ডগুলি ধরি। স্কুলের স্যাররা এটা মেনে নিয়েছিলেন।

এক ঝুম বর্ষায় আমার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম থেকে উঠে রান্নাঘরে যাই। দেখি মা একপাশে ইলিশ মাছের টুকরো রেখে উঁবু হয়ে কী যেন করছেন। অন্যপাশে প্রমাণ সাইজের বটি। কাছে গিয়ে দেখি মা হাত বাঁধছেন। মাটিতে তাজা রক্ত। হাত কেটে গেছে। আমার উপস্থিতি টের পেয়ে মা আমার দিকে তাকান। করুণ একটা হাসি দেন আমার দিকে তাকিয়ে। সেই রক্ত এবং করুণ হাসির দৃশ্য অনেকদিন গেঁথে ছিল আমার মনে। এই কবিতা ছিল সেই দৃশ্যের উপশম। লিখতে গিয়ে দেখি কীভাবে জানি মায়ের জায়গায় বাবা হয়ে গিয়েছে। সম্ভবত আমার অবচেতন বলছিল, এখানে মা হলে লেখাটার গ্রহণযোগ্যতা কিংবা বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে না।"

আমার প্রশ্ন হচ্ছে লেখক কেন একজন নারী তথা একজন মায়ের অবদানকে লুকিয়ে সেখানে একজন পুরুষ তথা একজন বাবাকে বসিয়ে দিলেন? হ্যাঁ লেখক কি লিখবেন না লিখবেন সে স্বাধীনতা লেখকের রয়েছে। সেক্ষেত্রে লেখকের এই কবিতা নিয়ে আমার আপত্তির কোনো যুক্তি ছিল না। কিন্তু লেখক এ উপন্যাসে কবিতার সত্যিকারের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেই আমার আপত্তি, উদ্বেগের কারণ, আঘাত পাবার কারণ ও প্রশ্ন তোলাকে হালাল করে দিয়েছেন। লেখক উল্লেখ করেছেন যে, এখানে মা হলে লেখাটার গ্রহণযোগ্যতা কিংবা বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে না। প্রশ্ন হচ্ছে মা হলে কেন গ্রহণযোগ্যতা বা বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে না? এর অন্তর্নিহিত কারণ আমরা যতটুকু বুঝতে পারছি তা হচ্ছে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, পুরুষতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। অর্থাৎ একজন সন্তানকে পড়াশোনা করিয়ে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলার জন্য একজন বাবার রক্তে ভেজা উপার্জনের কাহিনি সাহিত্যে গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা পাবে, তাই তো? হ্যাঁ, তাই, লেখক এখানে তাই বুঝাতে চেয়েছেন। বিষয়টা কতটা ভয়াবহ তা আপনাদের চোখে ধরা পড়ছে কি না জানি না। কিন্তু আমার কাছে ভয়ংকর মনে হয়েছে। কারণ এর দ্বারা বোঝা যাচ্ছে যে, সাহিত্যও পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পাকাপোক্ত করার দায়িত্ব হাতে নিয়েছে! সে কারণেই লেখক একজন মায়ের সত্যিকারের রক্তে ভেজা অবদানকে লুকিয়ে কবিতায় মায়ের জায়গায় বাবাকে বসিয়ে দিয়েছেন। একজন মা যখন এই উপন্যাস পড়বেন তখন তিনি কতটা আঘাত পাবেন বুঝতে পারছেন?

এই জায়গাটা উপলব্ধি করার পর আমি ভীষণ আঘাত পেয়েছি। কারণ এই তরুণ লেখকরা যদি তাঁদের লেখার মাধ্যমে সমাজের একটা একপেশে ব্যবস্থার পরিবর্তনে ভূমিকা না রেখে উল্টো এই ব্যবস্থারই প্রমোট করে যান তাহলে আমরা তাঁদের কাছ থেকে কি আশা করতে পারি? লেখক তাঁর বয়ানে কারণ উল্লেখ করে জবাবদিহি করেছেন।বুঝলাম লেখক তাঁর লেখার গ্রহণযোগ্যতা পাবার জন্য বাধ্য হয়ে সমাজের প্রচলিত পথে হেঁটেছেন বলে স্বীকার করেছেন। তবুও কি তিনি এই অনৈতিক দিকটার দায় এড়াতে পারেন? তাহলে লেখকের দায়িত্বশীলতা থাকল কই? সমাজের প্রতি লেখকের দায়িত্বশীলতা বলতে তো একটা ব্যাপার আছে।

তাছাড়া বাবার জায়গায় মায়ের ভূমিকা অগ্রহণযোগ্য হয়ে যাবে এ কথাই বা তিনি কেন মনে করছেন? অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মায়েদের ভূমিকা কি কম? যে সংসারে বাবা নেই সে সংসারের হাল কি— মায়েরা ধরেন না? বাবা থাকতেও কি মায়েরা উপার্জন করছেন না? অবশ্যই করেন। আমার নিজের চোখে দেখা অনেক মা রয়েছেন যারা স্বামীর অবর্তমানে সন্তানকে মানুষ করতে দিনরাত কষ্ট করে টাকা উপার্জন করছেন।
আমার মনে হয় এটা নিয়ে আমার নতুন করে বলার কিছু নেই। এসব সবারই জানা। সমস্যা হচ্ছে জানা থাকলেও এ পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সহজে এক বাক্যে নারীদের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে চায় না। এ দুনিয়ায় সকলেই নিজের অবদানের স্বীকৃতি চান, স্বীকৃতি পেলে আনন্দিত হন। তাহলে একজন মায়ের অবদানকে সাহিত্যে স্বীকৃতি দিতে আপনার সমস্যা কোথায় লেখক?
তাছাড়া এখানে আরেকটা বিষয় লক্ষণীয়। আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে মাছ কাটাকুটি মূলত মায়েদেরই কাজ। সেক্ষেত্রে লেখকের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার যুক্তিতে বাবা মাছ কাটছেন সেটাও কিন্তু গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য হয় না। কিন্তু লেখক ঠিকই বাবার হাতে বটি ও মাছ কাটাকে সাহিত্যে গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করতে পেরেছেন বা করার চেষ্টা করেছেন। তাহলে তিনি কেন মায়ের অর্থনৈতিক অবদানকে সাহিত্যে গ্রহণযোগ্য ভাবতে পারলেন না বা গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করলেন না?

হ্যাঁ উদার ও সমতার দৃষ্টিভঙ্গিতে ভাবলে ভাবতে হবে মাছ বাবাও কাটতে পারে, মাও পারে। তেমনি সন্তানের পড়াশোনার পিছনে বাবারও অক্লান্ত পরিশ্রম ও কষ্টের অবদান থাকতে পারে, মায়েরও থাকতে পারে। যেটা সত্য সেটাই লেখককে তুলে ধরতে হবে। তাহলেই পৃথিবীতে সত্যের মূল্যায়ন করা হবে এবং সেটা জরুরি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ লেখকগণ তাঁদের লেখার মাধ্যমেই কিন্তু সমাজের অনেক পরিবর্তন নিয়ে এসেছেন, সমাজের অনেক সংস্কার সাধন করেছেন এই উপলব্ধি বর্তমান লেখকদের থাকতে হবে। নাহলে তাঁরা বর্তমানে জনপ্রিয়তা পেলেও সাহিত্যের ইতিহাসে টিকে থাকতে পারবেন না, তাঁদের কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না। একজন সত্যিকারের লেখক সাহিত্যের ইতিহাসে যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকতে চান বলেই বিশ্বাস করি।

 

//জেড-এস//

লাইভ

টপ