উপন্যাসটা আপনি কেমন করে লিখলেন?

Send
মূল : গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস ।। ভাষান্তর : রঞ্জিত মিত্র
প্রকাশিত : ১৮:৩৯, মার্চ ০৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:২৮, মার্চ ০৭, ২০১৮

এটা নিঃসন্দেহে অন্যতম একটি প্রশ্ন, একজন ঔপন্যাসিককে প্রায়শই যার মুখোমুখি হতে হয় কে প্রশ্ন করেছে, সেদিকে তাকিয়েই, সন্তুষ্ট করার মত একটা উত্তর প্রত্যেককেই তৈরি রাখতে হয়। এ প্রশ্নের উত্তর দিতে সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজনীয়, কেননা বৈচিত্র্যই জীবনের একমাত্র মহার্ঘতা নয়, বরং বলতে হয়, এর মধ্যে নিহিত রয়েছে সত্যকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা। একটি বিষয়ে নিশ্চিত আমার ধারণা, যারা নিজেদের কাছে প্রায়শই প্রশ্ন রাখেন, কেমন করে উপন্যাসটা লেখা হলো, ঔপন্যাসিকরা নিজেরাই। এবং আমরা নিজেদের কাছে সর্বদাই ভিন্ন ভিন্ন উত্তর দিয়ে থাকি। অবশ্যই আমি, সেই সব লেখকদের কথাই বলেছি, যাঁদের বিশ্বাস, সাহিত্য হচ্ছে এমন একটা শিল্প যা বিশ্বকে উন্নততর করার লক্ষ্যে নিবিষ্ট। অন্যরা, যাঁরা মনে করেন, এই শিল্পটা হচ্ছে তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টকে স্ফীত করার জন্যই নির্ধারিত, লেখার একটা ফর্মুলা তাঁদের থাকে, যেটা শুধু নিখুঁতই নয়, তাঁরা এতই যথাযথ যে অঙ্কের মতোই সমস্যাবলির সমাধান করে ফেলেন।

সম্পাদকরাও সেটা জানেন। খুব বেশি দিনের কথা নয়, তাঁদেরই একজন আমাকে বোঝাচ্ছিলেন, তাঁর প্রকাশকের কাছে জাতীয় পুরস্কার জিতে আনা কতখানি সহজ ব্যাপার। প্রাথমিক ক্ষেত্রে, তালিকাভুক্ত বিচারকমণ্ডলীর ওপর একটি বিশ্লেষণ করতে হয়েছিল— তাঁদের জীবন-যাপন তাঁদের কর্মকাণ্ড এবং সাহিত্যে তাঁদের রুচির বিষয়ে। সম্পাদক ভেবেছিলেন, এই সব উপাদানের সামগ্রিক যোগফল থেকে রেরিয়ে আসবে বিচারকদের সাধারণ রুচির একটি গড়। “আর সে জন্যেই তো রয়েছে কম্পিউটার : তিনি বলেছিলেন। একবার যখন ঠিক হয়ে গেল, কি ধরনের বই পুরস্কার পাবার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা,  তখন এমন একটা পদ্ধতিতে এগোতে শুরু করলেন, বাস্তবে সাধারণত যেমনটি ঘটে থাকে, ঠিক তার উল্টো পথে— বইটিকে খুঁজে বের করার পরিবর্তে কেউ একজন বেরিয়ে পড়লেন, লেখকের ইতি বৃত্তান্তের খোঁজ খবর নিতে,  আধিষ্ট বস্তুটি নির্মাণে যিনি হতে পারেন সবচেয়ে উপযুক্ত। বাকি থাকবে তাঁকে দিয়ে চুক্তিপত্রে সই করিয়ে নেওয়া এবং মাপ-মতন বইটিকে লিখতে বসিয়ে দেওয়া, যে বইটি পরবর্তী বছরে জাতীয় সাহিত্য পুরস্কার জিতে আনবে। ভয়ের ব্যাপার হলো, সম্পাদক ক্রীড়াশৈলী রচনার ভার কম্পিউটারের ওপর ছেড়ে দিলেন এবং কম্পিউটার তাঁকে বলে দিল, তাঁর ৮৬ শতাংশ সাফল্যের সম্ভাবনা রয়েছে।

অতএব,  একটি উপন্যাস বা গল্প লেখাটা সমস্যা নয়, সমস্যা হল আন্তরিকতার সঙ্গে লেখা, এমনকি তা যদি বিক্রি নাও হয় কিংবা পুরস্কার নাও পায়। এই উত্তরের কোনো বাস্তবতা নেই,  এবং কেউ হয়তো ভেবেও নিতে পারেন,  হেঁয়ালেটির নিজস্ব উত্তর খোঁজার বাস্তবতা নেই, এবং কেউ হয়তো ভেবেও নিতে পারেন, হোঁয়ালিটির নিজস্ব উত্তর খোঁজার গুপ্ত বাসনা নিয়েই লোকটি এই গল্পটা লিখছে। আমি, মেক্সিকোয় আমার পড়ার ঘরে ফিরে গিয়েছিলাম, যেখানে আমি সদ্য শুরু করা একটি উপন্যাস ও বেশ কয়েকটি অসমাপ্ত ছোট গল্প রেখে এসেছিলাম এবং আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না সুতোরগিট কোথা খেকে খুলতে শুরু করব। গল্পগুলো নিয়ে আমার কোনো সমস্যা হয়নি, সেগুলো ওয়েস্ট পেপারবাস্কেটে জায়গা পেয়েছিল। প্রয়োজনীয় দূরত্ব থেকে গল্পগুলি পড়ে ফেলার পর, আমি মনস্থির করার মতো জোর পেয়ে গিয়েছিলাম— এবং হয়তো তা সত্যি এই লেখাগুলো যে লিখেছে সে আমি নই। সেগুলি উইরোপ প্রবাসী লাতিন আমেরিকানদের জীবন নিয়ে ৬০ বা ততোধিক গল্প লেখার একটি পুরোনো পরিকল্পনার অংশ বিশেষ, এবং তাদের ত্রুটিই সেগুলোকে ছিঁড়ে ফেলার অবশ্যম্ভাবী কারণ হয়েছিল। এমন কি আমি নিজেও তাদের বিশ্বাস করতে পারিনি।

আমি এ কথা বলার ঔদ্ধত্য দেখাবো না যে লেখাগুলিকে যাতে আর পুনগর্ঠিত করার সুযোগ না থাকে সেটা নিশ্চিত করার জন্য টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলার সময় আমার হাত দুটো কেঁপে ওঠেনি। শুধু আমার হাত দুটোই নয় আমিও কেঁপে উঠেছিলাম।  কেননা, কাগজগুলো টুকরো টুকরো করার এই কারবারে আমার স্মৃতিতে এমন একটা ঘটনা রয়েছে যেটা উৎসাহব্যঞ্জক। এই স্মৃতি ১৯৫৫ সালের জুলাই মাসের একটি রাতের, এল এসপেক্তদোরের বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে ইউরোপে যাত্রার প্রাক্কালে। কবি হোর্জ গাইতান দুরাজ বোগাতায় আমার ঘরে এসে মিতো পত্রিকার জন্য আমায় কিছু একটা দিতে বলেছিলেন।

আমি সবেমাত্র আমার কাগজ-পত্রগুলো দেখা শেষ করেছিলাম, আমার কাছে যেগুলো রেখে দেওয়ার যোগ্য মনে হয়েছিল যখন আলাদা করে রেখেছিলাম এবং যেগুলি বাতিল যোগ্য মনে হয়েছিল ছিঁড়ে ফেলব ভাবছিলাম। গাইতান দুরান, সাহিত্যের জন্য তাঁর সর্বগ্রাসী ক্ষুধা নিয়ে এবং বিশেষ করে, তিনি যখন ভাবলেন, গুপ্ত সম্পদ আবিষ্কার করতে পারবেন, ফেলে দেওয়া কাগজের টুকরিতে চোখ বোলাতে শুরু করলেন দুরাজ হঠাৎ-ই কিছু একটা তাঁর মনযোগ আকর্ষণ করল। “এটা অবশ্যই ছাপার যোগ্য,” তিনি আমাকে বলেছিলেন। আমি তাকে বুঝিয়েছিলাম, কেন এটাকে ছুঁড়ে ফেলেছি। লেখাটা ছিল একটা পুরো অধ্যায় যা আমার প্রথম উপন্যাস  লা হোজারাস্কায় (পাতার ঝড়) যুক্ত করিনি। বইটি এতদিনে প্রকাশিত হয়ে গিয়েছিল এবং সেই অধ্যায়টির ওয়েস্ট-পেপার বাস্কেট ছাড়া অন্য কোনো সম্মানজনক গন্তব্য থাকতে পারে না। গাইতার দুরান একমত হননি। তাঁর মনে হয়েছিল, উপন্যাসে হয়তো পরিচ্ছেদটির প্রয়োজনীয়তা ছিল না, তবে এটার নিজস্ব কিছু মূল্য রয়েছে। অপরাধবোধের তাড়নায় যতটা না, তার চেয়ে বেশি তাঁকে খুশি করার আকাঙ্খায় তাঁকে ছেঁড়া টুকরোগুলি জুড়তেও পরিচ্ছেদটি ছোটগল্প হিসেবে প্রকাশ করার অনুমতি দিলাম। “কি নাম দেব আমরা?” বহুবচনে প্রশ্নটা তিনি রেখেছিলেন, অল্প কিছু ক্ষেত্রে এক বচনের চেয়ে বহুবচনই যথার্থ হয়ে থাকে। “আমি জানি না,” আমি ভেবেছিলাম,” কেননা, এটা মাকোন্দোর বৃষ্টি দেখতে দেখতে ইসাবেলের স্বাগত-ভাষণ।” এভাবেই আবর্জনার স্তূপ থেকে উদ্ধার পেয়েছিল আমার সবচেয়ে ভালো সমালোচিত ও পাঠকের কাছে সর্বাধিক প্রশংসিত গল্পগুলির অন্যতম একটি গল্প। যদিও, এই অভিজ্ঞতার শিক্ষা থেকেও আমি নিজের কাছে প্রকাশের অযোগ্য মনে হলে মূল রচনাটি ছিঁড়ে ফেলার অভ্যাস বন্ধ করতে পারিনি। এ থেকে যা শিখেছিলাম, তা হলো, ছিঁড়লে এমন ভাবে ছেঁড়া উচিৎ যাতে টুকরোগুলো আর কোনোভাবেই যেন জোড়া দেওয়া না যায়।

ছোটগল্প ছিঁড়ে ফেলাটা অপরিহার্য, কেননা, ছোটগল্প লেখা কংক্রিটের ঢালাইয়ের মত। যদিও উপন্যাস লেখা থরে থরে ইট সাজানোর মতো এর অর্থটা দাঁড়ায়, প্রথম চেষ্টাতেই যদি গল্পটা না দাঁড়ায়, লেগে না থাকাই ভালো। উপন্যাস সহজতর আপনি আবার শুরু করুন। ঠিক যেটা এখন ঘটেছে। চরিত্র ও ব্যক্তিত্বগুলির বৈশিষ্ট্য বা ভঙ্গিমা আমার অসমাপ্ত উপন্যাসটির সঙ্গে খাপ খাচ্ছিল না। কিন্তু এখানেও আবার ব্যাখ্যাটা সেই একই। আমার নিজের কাছেও সেটা বিশ্বাসযোগ্য ছিল না। একটি সমাধার বের করার চেষ্টায়, প্রয়োজনে লাঘবে মনে করে আমি দু’টি বই আবার পড়লাম। প্রথমটি হলো, পবার্ডের লা এডুকেশন সেন্তিমেন্তালে, যে বইটি আমি আমি পড়েছিলাম আমার সেই সুদূর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনিদ্র রাত্রিগুলিতে, এবং যেটা এখন আমাকে সন্দেহ জাগাতে পারে এমন কিছু উপমার ব্যবহার এড়াতে সাহায্য করল। কিন্তু সেটা আমার সমস্যার সমাধান করে দিতে পারত না।

অন্য যে বইটি আমি আবার পড়লাম, ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার ‘দ্য হাউস অব স্লিপিং বিউটিজ’ যেটা আমার অন্তরাত্মাকে বিদ্ধ করল এবং ভালো লাগা বইয়ের তালিকায় যুক্ত হয়ে থাকল। তবে এবার আমার আদৌ কোনো কাজে আসল না। কেননা  আমি খুঁজছিলাম বৃদ্ধ লোকদের যৌন আচরণের রহস্য-সূত্র এবং এই বইটিতে আমি যা পেলাম তা হল জাপানের বৃদ্ধ লোকদের যৌন-আচরণ, যেটা জাপানের আর সব কিছুর মতই মনে হতো অপরিচিত এবং যেটা দিয়ে ক্যারিবিয়ানের বৃদ্ধদের যৌন আচরণের ব্যাপারে সত্যিই কিছু করার ছিল না। রাতে খাবার টেবিলে আমি যখন আমার যন্ত্রণার কথাটা বললাম, আমার এক ছেলে— বাস্তববুদ্ধিতে যে প্রখরতর “কয়েক বছর অপেক্ষা কর, নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই জেনে নিতে পারবে।” কিন্তু অন্য ছেলেটি, যে শিল্পী অধিকতর বাস্তব প্রস্তাব রাখল “দ্য সরোজ অব ইয়ং ওয়ার্দার বইটি আবার পড়।” তার কণ্ঠস্বরে বিদ্রূপের সামান্যতম লেশও ছিল না। বাস্তবিকই আমি চেষ্টা করেছিলাম, ঠিক এই কারণে নয় যে আমি খুব বাধ্য পিতা, সত্যিই আমি ভেবেছিলাম গোয়েটের বিখ্যাত উপন্যাসটি আমার কাজে লাগতেও পারে। সত্যি বলতে কি, প্রথমবারের মতই, এবারও তাঁর বেদনাদায়ক অন্তিমযাত্রার কথায় আমার চোখের জল সামলাতে পারিনি। পরবর্তিতে, আমি অষ্টম চিঠিটা পড়ে ফেলতে পারিনি,  যেখানে যুবকটি তার বন্ধু ভিলহেম্মকে বলছে সে কিভাবে তার নিঃসঙ্গ কেবিনে সুখ অনুভব করতে শুরু করেছে। এই হলো সেই সিদ্ধান্ত যেখানে আমি পৌছেছি এবং তাই এতে অবাক হবার কিছু নেই যে আমার জিভটা কামড়ে ধরে রাখতে হচ্ছে যাতে যার সঙ্গে দেখা হয় তাকেই না জিগ্যেস করে ফেলি, “আমায় বলুন তো বন্ধু, কোন জ্বালায় আপনি উপন্যাসটা লিখলেন।”

একবার হয়তো বইটা পড়েছিলাম বা ছবিটা দেখেছিলাম বা কেউ হয়তো আমাকে একটা সত্য কাহিনি শুনিয়েছিল, যার গল্পটা ছিল এই রকম— একটি যুদ্ধ জাহাজের কেবিনের ভিতরে একজন নেভি অফিসার তার প্রিয়তমাকে লুকিয়ে রেখেছিল এবং সেই শ্বাসরোধী প্রকোষ্ঠের ভিতরে, কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে, কয়েক বছর ধরে তাদের উত্তপ্ত প্রেমের জীবন কাটিয়ে দিয়েছিল। আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ, এই অত্যন্ত সুন্দর গল্পটির লেখক কে, যদি কেউ জানেন, অবিলম্বে আমায় বলুন। কেননা  অত লোকের কাছে আমি জানতে চেয়েছি অনেকেই জানেন না যে আমি সন্দেহ করতে শুরু করেছি যে ঘটনাটা আমিই হয়তো কখনো ঘটিয়েছি, এখন আর মনে করতে পারছি না। ধন্যবাদ। 

পুনমুর্দ্রণ



//জেড-এস//

লাইভ

টপ