ডৌল : ইউসুফ জোলেখার নব্য আখ্যান

Send
রাদ আহমদ
প্রকাশিত : ১৮:১১, মার্চ ০৮, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:১৮, মার্চ ০৮, ২০১৮

নাটক শুরু হতেই মনোযোগ টেনে নিয়ে যায় এর চরিত্রেরা। জেরা,জেরার চমৎকার নাটকীয় কথা, একশন— এগুলো মনোযোগ কেড়ে নেয়। "জুলেখা বাদশার মেয়ে" এই শিশুতোষ ছড়া-কবিতার স্মরণ, আবার সঙ্গে সঙ্গেই দেখা যায়,এই বাদশা বাদশাহী বাদশা নয় বরং একজন কৃষক বাদশা। গ্রাম বাংলায় বাদশা নামক কৃষক আছেন অনেক— এটাও মনে পড়ে গেল। আমার নিজেরই পরিচিত একজন আছে। নীলফামারীর বাদশা মিয়া। সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত পরিবেশের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে কাহিনি।

ক্রমান্বয়ে নাটকের ঘটনা বা বক্তব্য উন্মোচিত হতে থাকে। আর বুঝতে পারা যায় যে,এই জুলেখা অত সরল জুলেখা নয়। একই সঙ্গে সে বাদশা নামক কৃষকের মেয়ে,শিশুতোষ ছড়ার চরিত্র,একজন লেখিকা,আবার আরবে উদ্ভূত একাধিক একেশ্বরবাদী ধর্ম কাহিনির অন্তর্গত সেই সুপরিচিত ‘ইউসুফ-জুলেখার’  জুলেখাও বটে। আরব কেন্দ্রিক এই ধর্মগুলোকে অনেকে পুরুষ-তান্ত্রিকতার প্রচার ও প্রতিষ্ঠার সঙ্গে মিলিয়ে চিন্তা করে থাকেন। নবী ইউসুফের কাহিনিও চলে আসে একই সঙ্গে। এই দুজনার কাহিনিকে স্মরণে রেখে নাটকের বিষয়-বক্তব্য উন্মোচিত হতে থাকে। সুদর্শন নবী ইউসুফ কে প্রথম দেখার সময় পরস্ত্রী জুলেখার ফল কাটতে গিয়ে যে আঙুল কেটে গিয়েছিল— সেটার উল্লেখও আছে এই নাটকে। ইউসুফের চরিত্রটা পুরুষ-তান্ত্রিকটার প্রতিভূ হিসাবে দেখানো হলেও মাঝে মাঝে নিতান্ত মানবিক মনে হয়েছে। একই সঙ্গে ধর্ম রক্ষার দায়,মনের সায়,আত্মার সায় খুঁজে ফিরছেন একজন মানুষ। কী করবেন ঠিক যেন বুঝতে পারছেন না।এই দোটানা ভাব চলে এসেছে চরিত্রে ফলে শেষ পর্যন্ত মানবিক হয়ে উঠেছে চরিত্রটা।
নাটকের এই পর্যন্ত এসে দর্শক হিসাবে দুটা ভাবনা কাজ করা শুরু করল আমার মাথায়। প্রথমেই তুলনা চলে আসল মেঘনাদ-বধ কাব্যের সঙ্গে। ধর্মে কিংবা ধর্ম-কাহিনিতে যিনি সুপ্রতিষ্ঠিত ভিলেন— তাকে উল্টোভাবে হিরোইক করে দেখা এবং দেখানোর বিষয়টা মনে আসল । পজিটিভ আলোতে নিয়ে এসে পুনর্বিবেচনা। এবং তার ওপরে নতুন চিন্তা আরোপ— এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে ভাবতে ভাবতে মনে হলো "খাইছে। রাবণের পরিবেশটা তার আশেপাশের সভাসদ, স্থান,কাল পাত্র-পাত্রীর সমাহার নিয়ে যে বিচিত্র এলিমেন্টে ভরপুর,সেরকম বিচিত্রতা  জুলেখার কাহিনিতে নেই। ইউসুফ-জুলেখার খুব বেশি উল্লেখও কিন্তু ওল্ড টেস্টামেন্ট আর কুরান শরিফে নেই। ঘুরে ফিরে অল্প কয়েকটা সেটিংস। ইহুদিদের অবশ্য "ইদ্দিশ টেইলস" নামে আরেকটা ধারা আছে। ওখানে কিছু অতিরিক্ত এলিমেন্ট থাকতে পারে। তবে সেসব মিলিয়েও রাবণের সভাসদের বৈচিত্র্যের ধারে কাছে এই কাহিনি যেতে পারবে না। নাট্যকার কীভাবে এর মধ্যে 'মজা' কিংবা 'বিচিত্রতা' আনবেন?"
পরে দেখা গেল যে,না। ইতিহাসে জুলেখার অবস্থান কে কেন্দ্র করেই মূলত দুই কি তিনটি দার্শনিক ভাবনা-ধারা এই নাটকে চলে আসছে।আর এই ধারাগুলোর প্রবল উপস্থিতি দর্শককে গোড়া থেকেই গ্রাস করে ফেলছে আর নাড়া দিয়ে যাচ্ছে।
দ্বিতীয় যে চিন্তাটা মাথায় আসল। তা হলো— যেকোনো শিল্পকে তার সময়ের চাহিদা পূরণ করে দামি হয়ে ওঠার  বিষয়টা। ঢাকা,তথা বাংলাদেশের এখনকার সামাজিক ট্রেন্ড বা চাহিদার প্রেক্ষিতে এই নাটকের অবস্থানটা কিরকম হবে— এটা ভাবতে থাকলাম।
একটু ব্যাখ্যা করি। বামপন্থী কিছু লিটারেচার পড়ছিলাম একসময়। তারা পুরো ইউরোপীয় রেনেসাঁ কে যেরকম যুক্তির আলোকে, তৎকালীন চাহিদার আলোকে ব্যাখ্যা করে ফেলছিলেন— আমি খুব অবাক,বিস্ময়াপন্ন আর সঙ্গে সঙ্গে হতাশও হয়ে গেছিলাম ওটা পড়ে। মধ্যযুগের রাজা আর ক্যাথলিক চার্চের সঙ্গে টেক্কা দেবার মত যখন একটা ধনিক শ্রেণির উদ্ভব ঘটল ইউরোপে— তখন সেই নতুন বক্তব্য সমাজে বলিষ্ঠভাবে এস্টাবলিশ করার জন্য নতুন সংস্কৃতির দরকার পড়ে। ধর্মের প্রিস্টিন স্বর্গীয় সৌন্দর্যের চাইতে মর্ত্যলোকের সাধারণ মানুষের দিনযাপনের সঙ্গে এর যোগসাজশ যে বেশি জরুরি— এটা দেখানোটা দরকার পড়ে। 'মানুষের কথা' বলার দরকার পড়ে। প্রচলিত শিল্প সংস্কৃতি থেকে একটা শিফট করা দরকার ছিল (কারণ,প্রচলিত সংস্কৃতি শুধু রাজা আর চার্চের স্বার্থ সংরক্ষণ করছিল), আর এ কারণেই,রেনেসাঁর শিল্পীদের সাহিত্য,চিত্রকলাকে ধনিকেরা হাইলাইট করে সামনে নিয়ে আসে। অর্থাৎ এই পুরা রেনেসাঁ পর্যায়টি জন্ম লাভ করে আর বিকশিত হয় কেবলমাত্র যেন ঐ ধনিক শ্রেণির উদ্ভবের কারণেই। অর্থাৎ সমাজে প্রচলিত চাহিদার সঙ্গে কোন শিল্পটি দাম পাবে— তার একটা গভীর যোগসাজশ থাকে।
মধুসূদনের মেঘনাদ বধ ও কি তৎকালীন কোলকাতা কেন্দ্রিক সনাতন ধর্মী বাঙালি সম্প্রদায়ের নতুন পলিটিকাল অবস্থান জোরালো করার জন্য দরকার ছিল না? ব্রিটিশদের সঙ্গে টেক্কা দেবার জন্য নিজেদের আবহমান স্বীকৃত সংস্কৃতিকে ভেঙ্গে পুনর্গঠনের,পুনর্বিবেচনার দরকার ছিল। ঠিক একইভাবে আমি ভাবতে চাইলাম,জুলেখাকে কেন্দ্র করে এই ডৌল নাটকের অন্যতম মূল বক্তব্যটি ঢাকা শহরের বর্তমানে প্রচলিত চাহিদার প্রেক্ষিতে কিরকম হবে।






ঢাকার সব কিছু আমি নিজে বুঝে বসে আছি তা নয়,কিন্তু একটু ভাবতে চাইলাম— আমার পর্যবেক্ষণ মতে সেই চাহিদা টা কিরকম। নাটকটি নিঃসন্দেহে নারী কে একটা স্বাধীন উচ্চতায় নিয়ে এসে বিবেচনা করছে। আর নাটকের অনেক বক্তব্যের মধ্যে একটি বক্তব্য হলো— নারীকে  নির্বাপিত করে রাখছে ধর্ম আর পুরুষ।
ঢাকার নারীদের কথা চিন্তা করলে,মোটা দাগে— দুটো জিনিস আমার চোখে পড়ে।  ফ্যাশন দিয়েই বিবেচনা করা যাক। এক শ্রেণি সরাসরি পশ্চিমা বা আন্তর্জাতিক শহুরে কালচারে চলে যাচ্ছে,আর আরেক শ্রেণিতে দেখা যাচ্ছে পর্দার ছড়াছড়ি। অর্থাৎ বোরখা, হিজাব এসবের ব্যবহার ভালো পরিমাণে হচ্ছে। যারা আন্তর্জাতিক নাগরিক কালচারে চলে যাচ্ছে— তাদের কথা বাদ দেয়া যায়,কারণ তার প্রথমেই ধর্মের,বা প্রচলিত কালচারের অপ্রেশন থেকে মুক্ত থাকার ঘোষণা দিয়ে দিচ্ছে।
আবার যাঁরা হিজাবের ধারাটি ফলো করছেন। তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে,হিজাবের মধ্যেই আকর্ষণীয় স্টাইল নিয়ে আসার চেষ্টা করছে ইয়াং মেয়েরা। একাধিক স্তর বিশিষ্ট মাথার ঘোমটা টা— বেশ ইন্টারেস্টিং, নয়নাভিরাম আর স্টাইলিশ একটা কায়দা।
আবার অনেক বয়স্করা,আমার মনে হয়েছে,সম্পূর্ণভাবে,মনে প্রাণে হিজাব কে সমর্থন না করলেও— বাসা থেকে বের হয়ে বাইরে কাজ করার সুযোগটি যেন অন্তত পায়— এই কারণে হিজাব জিনিসটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে,আগ্রাসীভাবে মেনে নিয়েছেন। মূল লক্ষ্য হলো কাজ করার স্বাধীনতার প্রেক্ষিতে যদি হিজাব পরতে হয়— ঠিক আছে— আমি তাও পরব। এই ভাবনাটা মনে হয়েছে কাজ করে অনেকের মধ্যে। সুতরাং এখানে কিন্তু ধর্ম বড় বিষয় নয়। বিষয়টা হলো কোনোমতে একধরনের লোক-কালচার রক্ষা করে নিজের প্রাপ্তি বা স্বাধীনতাটা অর্জন করে নেওয়া।
অন্যদিকে,মালয়েশিয়ার হিজাবিদের একটা জিনিস চোখে পড়েছিল কয়েক দিন আগে। ওদের নগরের কিছু মেয়েরা মাথায় হিজাব পড়ছে ঠিকই,কিন্তু জামাকাপড়ে কিন্তু এমন কোনো নিদর্শন নেই যে তারা তাদের শারীরিক "চার্ম" কে ঢেকে রাখবে। বরং আঁটসাঁট গেঞ্জির কাপড়ে বুনন করা জামায় তাদের শারীরিক সৌন্দর্য বেশ ভালোভাবেই প্রকাশিত হয়ে থাকে। হিজাবের মূল তত্ত্বে কিন্তু একটা বিষয় ছিল— তা হলো— পুরুষ এবং নারী উভয়কেই (নারীদেরকে বেশি করে) তাদের শারীরিক চার্ম (সৌন্দর্য বা আকর্ষণ)ঢেকে রাখতে হবে। এমন না যে বোরখাই পরতে হবে— কিন্তু নিজের শারীরিক চার্মটা প্রদর্শন না করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। সুতরাং, দেখা যাচ্ছে ওখানকার ওই নারীরা ধর্মের মূল তত্ত্বকে না মেনে (চার্ম ঢেকে রাখা)— দায়সারাভাবে লৌকিক দায় রক্ষা করছে। ঢাকায়ও এরকম বিষয় ঘটছে বলে মনে হয়।

মূল কথা যেটা বলতে চাচ্ছি— এখানে কিন্তু গোড়াতেই ধর্মের সঙ্গে এক ধরনের লুকোচুরি খেলা শুরু হয়ে গেছে। অর্থাৎ ধর্মের বিধি নিষেধ দ্বারা নারীরা কিন্তু নিজেদের সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত হতে দিচ্ছে না। যেভাবেই হোক, সৎ বা অসৎ, সরাসরি কিংবা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে— বলতে চাচ্ছি— ঢাকার এখনকার পরিস্থিতিতে হয়তো সারা দেশের যেকোনো নাগরিক পরিবেশেই,ধর্ম দ্বারা নারীদের সরাসরি পর্যুদস্ত হওয়ার বিষয়টি অত স্ট্রং । সুতরাং নাটকের অন্যতম একটি ভাবনা—  ধর্ম দ্বারা নারীদের অপ্রকাশিত হয়ে থাকার বক্তব্যটা—  গ্রহণ করার পিছনে অতখানি চাহিদা হয়তোবা ঢাকা শহরে এ মুহূর্তে নেই। নাটকে ফেরত আসি।



সর্বপ্রথম ভালো লেগে গেল যখন সংলাপ পর্যায় থেকে গান— তারপর গান থেকে সংলাপ— তারপর পুনরায় সংলাপ থেকে গানের পর্যায় আসতে থাকল। এই পালাবদলের পর্যায়গুলো ছিল খুবই স্বাভাবিক,ন্যাচারাল,সুন্দর আর মধুর। মোলায়েম ট্র্যানজিশন। অদ্ভুত। বুদ্ধিদীপ্ত,চমৎকার সংলাপ তো ছিলই। সংলাপের সময় গানের পর্যায়ের জন্য অপেক্ষা,আবার গানের সময় সংলাপের। আর এই চাহিদা মেটানো হয়েছে বেশ দক্ষভাবেই।








এই যে নাটকের চরিত্রেরাই  ব্যাক  স্টেজের বিভিন্ন কাজ করে যাচ্ছিলেন প্রকাশ্যে— নাটকের ফাঁকে ফাঁকে— যেন নাটকেরই অংশ— এটা বেশ ভালো লাগছিল। জেরাকারী নাটকের মধ্যেই— স্টেজের পিছনে গিয়ে টেবিলে ঝুঁকে লাইটিং নিয়ন্ত্রণ করছেন।আবার সূত্রধর যিনি আছেন স্টেজের বামে সরে গিয়ে লাইভ বাদ্য বাজিয়ে যাচ্ছেন । মাঝে মাঝে সবাই একত্রিত হয়ে চমৎকার সিনক্রোনাইজড এ্যাক্‌ট করে যাচ্ছেন। কোনো বাহুল্য নেই। নাটকের লাইটিং আর মিউজিক চালিয়ে নিচ্ছেন নাটকের চরিত্রেরাই।
জুলেখার মুখে নিজের বাড়ির বর্ণনা ভালো লেগেছে। খুব দৃশ্যময়। যেন তার বাবা যখন গ্রাম থেকে শহরে আসেন। মা আর তাকে ভিজিট করতে অথবা মায়ের বাবার সঙ্গে ব্যবসায়িক আলাপ সারতে। সেই বর্ণনাগুলো খুবই উজ্জ্বল,যেন মনে মনে দেখা যায় সেই সময়গুলো। জুলেখা নামি শিশু-কন্যাটির চোখ দিয়েই।
বিড়ালের মুখোশ পরা অভিনয় অত্যন্ত বিনোদন-সমৃদ্ধ। একটা মুখোশ আর তার সঙ্গে সঙ্গে উপযুক্ত অভিনয় যে কত অন্যরকম একটা মাত্রা নিয়ে আসতে পারে— এটা দেখে আমি বেশ অভিভূত। যেকোনো মুখোশকে এরকম বাস্তবিক পরিস্থিতির সঙ্গে অবলীলায় মিশে যাওয়াটা কখনোই এর আগে কোথাও দেখিনি। যতগুলো গান ছিল এর মধ্যে— প্রত্যেকটির সুর উৎকৃষ্ট মানের। নারীকে শুধু একটা ট্রিপিকাল চরিত্রের মধ্যে আটকে রাখেননি নাট্যকার এবং অভিনেত্রী। নারী যেন একই সঙ্গে কোমল, ক্রিয়েটিভ,জনপ্রিয়,দুর্বল,সবল,অত্যাচারিত,অত্যাচারকারী— এ রকম কিন্তু সহসা পাওয়া যায় না আমাদের প্রচলিত নাটকে।
আমার মনে হয়েছে— জুলেখা আর ইউসুফের এই দ্বন্দ্বটি শেষ পর্যন্ত শুধু নারী অপ্রেসনের ভিতরে আটকে থাকেনি। এটা একজন শিল্পী— তথা সাধারণ মানুষের খুব অন্তর্গত অন্যতম একটা দার্শনিক দ্বন্দ্বে চলে গিয়েছে মাঝে মধ্যেই। এটা করব— না- ওটা? এটা করলে কেন করব— বা ওটা করলেই বা কেন?  প্রচণ্ড ডিপ্রেশনের একটা রূপ ফুটে ওঠে— অর্থহীনতার টানাপোড়েন। যা কিনা অনেকেই আমরা আমাদের জীবনে মাঝে মাঝে খুঁজে পাই।এই জিনিসটা প্রকাশিত হয়েছে নাটকে। বিশেষ করে ওই সময়টার কথা বলছি— যখন প্রেমিকের (নাকি জেরাকারীর) চোখে জুলেখা পেন্সিল ঢুকিয়ে দেয়— ওই সময়টাতে জুলেখা আর তার সঙ্গে সঙ্গে জেরাকারীর মধ্যে— পর্যায়ক্রমে যেই ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের প্রকাশ পেতে থাকে— একেবারে 'ইনসেইন' বলা যায়। এটা অদ্ভুত। এর রিজল্ভ হয় সম্ভবত ওই প্রচণ্ড রকমের অর্থহীন অমীমাংসিত একটা টানাপোড়েন দিয়ে। যা শেষ পর্যন্ত নারী আর পুরুষকেও ছাড়িয়ে যায়। ধর্ম আর শিল্পকেও ছাড়িয়ে যায়।
তবে একটা সমালোচনা আছে,নাটকের শেষ পর্যায় পিকাসোর আঁকা ছবির রেপ্লিকা টা (ডোরা মারের একটা ছবি) নিয়ে আসাটা আমি অত সহজে নিতে পারিনি। মনে হচ্ছিল ওই ছবিটা নাটকের বক্তব্যকে অনেক খানি খেয়ে ফেলতে উদ্যত হয়েছে। অনেক কথা যা নাটক দিয়ে বলাই হয়ে গেছে— তার জন্য আবার ছবিটা কেন?
সব মিলিয়ে ভালো লাগার পাল্লাটাই ভারি বলতে হবে। নাটকের শেষে দর্শকেরা অনেকেই কিন্তু স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাতে তালি দিয়ে উঠেছেন,কিন্তু আমার খটকা লাগল— এ ধরনের মঞ্চ নাটকে দর্শক এত কম কেন। কয়েক মাস আগেও একটি চমৎকার মঞ্চ নাটক দেখি—  নভেরা সেখানেও আমার একই জিজ্ঞাসা ছিল। এত চমৎকার চমৎকার কাজ হচ্ছে অথচ দর্শকদের মধ্যে ঢাকার নব্য কিংবা পুরোনো লেখক শ্রেণির কাউকে কিংবা নব্য ইন্টেলেকচুয়ালদের কাউকে দেখা যাচ্ছে না কেন? অন্যান্যদের দৈনন্দিন লেখালেখিতে স্টেজ-নাটকের কথা উঠে আসে না কেন? পত্র-পত্রিকা বা মিডিয়াতেই বা মঞ্চ-নাটক নিয়ে এত নীরবতা কেন? চমৎকার শিল্পমাধ্যম,আর এই মাধ্যমে নানা নানা চমৎকার কাজের মধ্যে এসে আরও একটি যুক্ত হলো 'ডৌল'— অথচ যেরকম সাড়া-শব্দ আশা করা সমীচীন— তার অনেকখানিই কিন্তু নাট্যপাড়ার বাইরে অনুপস্থিত। ডৌল নাটকটি সামনে আরও পরিবেশিত হতে হতে মানুষের চিন্তা,মনন ও আবেগকে উস্কে দিতে থাক। নানা ক্ষেত্রের সংস্কৃতির কর্মীরা,ইন্টেলেকচুয়ালেরা,দর্শকেরা,ছোট-বড় সবাই মঞ্চ নাটকে নিয়মিত গতায়াত করুক— এই কামনা করি।
নাট্যকার,নির্দেশক আর চমৎকার দক্ষ কুশীলবদের আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। জুলেখা চরিত্রে পারভীন পারু, জেরাকারী কিংবা ইউসুফ চরিত্রে জুনায়েদ ইউসুফ, সূত্রধর কিংবা গায়েন চরিত্রে শিশির রহমান এবং নাট্যকার চয়ন খায়রুল হাবীব— প্রত্যেকেই অসাধারণ শ্রম আর আন্তরিকতা দিয়ে এই স্মার্ট প্রোডাকশন গড়ে তুলেছেন। আমার জানা মতে, ডৌল প্রোডাকশনটি "জুলেখা ট্রিলজি" -র অংশ। বাকি দুটো পর্ব দেখার জন্যেও অনেক আগ্রহ জারি থাকল।

//জেড-এস//

লাইভ

টপ