ভলতেয়ারের কাঁদিদ : ইউরোপের আপন আয়না

Send
জাহেদ সরওয়ার
প্রকাশিত : ০৬:০০, মার্চ ০৯, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৮, এপ্রিল ০৫, ২০১৮

যখন সব কিছুরই খারাপ দশা, তখন সব কিছুকে ভালো বলার বাতিক হল আশাবাদ–ভলতেয়ার

কাঁদিদ যখন প্রথম প্রকাশিত হয় ভলতেয়ারের অন্য অনেক বইয়ের মতই লেখকের নাম ছিল না। বইটির নামের নিচে লেখা ছিল শুধু ‘ডক্টর রালফ-এর মূল জার্মান থেকে অনূদিত এবং মিনডেন-এ ১৭৫৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর পকেটে পাওয়া আরো কিছু রচনাংশ সহযোগে পরিবর্ধিত। কিন্তু বইটি প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে পাঠকরা বুঝতে পারে এ ধরণের লেখা একমাত্র ভলতেয়ারের কলম থেকেই বেরুনো সম্ভব। সুইস সরকার বইটি পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়। বই পোড়ানো বা বইলেখার কারণে নির্বাসনএগুলো ভলতেয়ারের জীবনে নতুন কিছু না। মাত্র বাইশ বছর বয়সে রাজা পঞ্চদশ লুইকে নিয়ে বেনামে ব্যঙ্গ নাটক লেখার কারণে সন্দেহজনকভাবে তাকে ফ্রান্সের এক জায়গায় নির্বাসিত করা হয়। পরে আবার চতুর্দশ লুইকে নিয়ে লেখা একটি কবিতার জন্য তাকে নিক্ষেপ করা হয় বাস্তিল কারাগারে। বাইশ বছর বয়স থেকে সেই যে শুরু হল চুরাশি বছর বয়স পর্যন্ত নির্বাসন, কারাগার আর বই পোড়ানো তাকে ছাড়েনি।

সবসময় ক্ষমতাবানদের বিরোধিতা করেছেন। নির্বাসন আর জেল ছিল তাঁর জীবন। তিনি বলতেন দুর্ণীতিপরায়ন রাষ্ট্রে সৎ মানুষের একমাত্র বাসস্থান কারাগার।

এই বইটিতে তিনি মূলত অষ্টাদশ শতাব্দীর পুরো ইউরোপকে পটভূমি ও বিষয়বস্তু করেছেন। যদিও এটাকে ফিকশন বলা হয়, মূলত মানুষের বোধ্য করে তিনি দর্শন লিখেছেন। শুধু লাইবনিৎস নয়,পৃথিবীর যে সব আশাবাদী দার্শনিক সক্রাতেস, এরিস্তেলেস আর ধর্মগ্রন্থসমূহ এমনকি ভারতীয় গীতা উপনিষদেও যে সবকিছু সবসময় সবচেয়ে ভালোর জন্য ঘটেএ আশাবাদী তত্ত্ব কাঁদিদকে শিখিয়েছিল তাঁর দর্শনগুরু প্লাঁগস। ব্যারন কন্যাকে ভালোবাসা আর চুমু খাওয়ার অপরাধে রাজদরবার থেকে পাছায় লাথি দিয়ে কাঁদিদকে বের করে দেবার পর সে বেরিয়ে পড়ে পৃথিবীর পথে। ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশে কাঁদিদের নিয়তি তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। কিন্তু সবখানেই কাঁদিদ দেখল জানোয়ার-সুলভ মানুষ হিংস্রতা, প্রতারণা, নিষ্ঠুরতা, দখলদারিত্ব, নারীধর্ষণ, খুন, যুদ্ধএই সব পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে সে জানতে পারে পৃথিবীতে সব কিছু ঘটে সবচাইতে খারাপ হবার জন্য কারণ প্রাণী হিসাবে মানুষের স্বভাবে গলদ আছে। অন্যান্য জীব থেকে মানুষ বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে আলাদা কিন্তু অদ্ভুতভাবে মানুষের এই বুদ্ধিমত্তা সবসময় নিয়ন্ত্রণ করেছে আত্মসুখ বা স্বার্থপরতা। মানবজাতির ভবিষ্যত সম্পর্কে বিরাট হতাশার ভেতর নিক্ষেপ করেন ভলতেয়ার পাঠককে। জেস্যুটদের ভণ্ডামী, তথাকথিত আত্মাহীন সাহিত্যিকদের ছলনা, দার্শনিকদের ভ্রান্তিসব নিজের মতো  অকাট্য যুক্তি দিয়ে তিনি পরাজিত করেন। এই কাহিনির বিভিন্ন চরিত্রের অভিজ্ঞতার বর্ণনার ছলে তিনি পৃথিবী সম্পর্কে তার মতামত ব্যক্ত করেন।

জাহাজে ভ্রমণের সময় ওলন্দাজ দস্যুদের হাতে সবকিছু হারানো মারত্যাঁ নামের এক বৃদ্ধ কাঁদিদের প্রশ্নের উত্তরে পৃথিবী সম্পর্কে বলেন ‘এই ভূগোলক যখন আমি নিরীক্ষণ করি, তখন আমার মনে হয় ভগবান একে কোনো অশুভ সত্তার হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। আমি এমন শহর কদাচিৎ দেখেছি যে প্রতিবেশী শহরের ধ্বংস কামনা না করে, এমন পরিবার কদাচিৎ দেখেছি যে আর এক পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করতে না চায়। সর্বত্র দুর্বল সবলকে ঘৃণা করে এবং তার পদলেহন করে, আর সবল দুর্বলকে মনে করে ভেড়া, যার লোম ও মাংস বাজারে বিকোয়।’

ত্রয়োবিংশ পরিচ্ছেদে ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ডের উপকূলে এসে কাঁদিদ মারত্যাঁকে জিজ্ঞেস করে ‘আপনি কি ইংল্যান্ডকে জানেন? তখন মারত্যাঁ বলল ‘সে এক অন্য ধরনের পাগলামি। আপনি জানেন এই দুই জাত কানাডা অঞ্চলে কয়েক বিঘা বরফ-ঢাকা জমির জন্য লড়াই করেছে এবং চমৎকার লড়াইয়ের জন্যে তারা কানাডার যা দাম তার চেয়ে অনেক বেশি টাকা খরচ করেছে।’ কাঁদিদ বইটির বয়স ২৫০ বছর হতে চলল। কিন্তু উপরোক্ত বয়ান এখনো পৃথিবী সম্পর্কে কত সত্য। যুদ্ধাস্ত্র ছাড়া মানব স্বভাবের যেন আর কোনো কিছুই পরিবর্তন হয়নি।

কাঁদিদকে জিজ্ঞেস করে তার ভৃত্য, তাহলে আশাবাদ মানে কী? কাঁদিদের উত্তর, সবকিছু খারাপ থাকা অবস্থায় যে বলে সবকিছু ভালো চলছে সে হলো গিয়ে আশাবাদী।

পেশাদার বুদ্ধিজীবিদের সম্পর্কে ভলতেয়ার এক চরিত্রকে দিয়ে বলান ‘ক্ষমতাবান আর তাদের ক্ষমতার নৈরাজ্যকে বৈধতা দিতে এরা পাদ্রি হিসাবে কাজ করে। ক্ষমতাবানদের গুণগান গেয়ে পত্রিকার পাতা ভরানোই এইসব পেশাদার লিখিয়ের কাজ।’ ভলতেয়ারের প্রায় লেখার ভেতর এই সত্যকে পাওয়া যায়।

তার ‘মাইক্রোমেগাস’ বইতে ভিন্ন গ্রহ থেকে এলিয়ানরা আসে পৃথিবীতে। অতিকায় এই গ্রহের বাসিন্দাদের শারীরিক কাঠামোও অতিকায়। একেকজনের উচ্চতা পাঁচ লক্ষ ফুট উঁচু। শূন্যপথে আসার সময় ও শনিগ্রহের থেকে এক লোককে তুলে আনে। তার উচ্চতা মাত্র কয়েক হাজার ফুট উঁচু। ভুমধ্যসাগর দিয়ে হাঁটার সময় এলিয়ানটার পায়ের গোড়ালিটুকুই কেবল ভিজেছিল। সে শনিবাসিকে জিজ্ঞেস করে ‘তোমরা কত বছর বাঁচো’? শনিবাসিটা কাচুমাচু করে বলে সে কথা বলে আর লজ্জা দিয়েন না মহাশয়। আমাদের প্রায় জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যু হয়। খুব কম সংখ্যক লোকই ১৫ হাজার বছরের বেশি বাঁচে।’ সাগরে হাঁটার সময় এলিয়ানটা সমুদ্রে চলন্ত মানুষভর্তি এক জাহাজ সমুদ্র থেকে তুলে নিয়ে তার বুড়ো আঙুলের ওপর রাখে। জাহাজের যাত্রীরা মৃত্যু সন্নিকট ভেবে দোয়াদরুদ পড়তে লাগল। পাঁচ লক্ষ ফুট আকাশের কালো মেঘের মতো তার মাথাটি সামান্য নুয়ে জিজ্ঞেস করে। ‘ওহে পরমাণুবৃন্দ, প্রভূ তোমাদের মধ্যেই মনে হয় তার সৃষ্টির সেরা জ্যামিতিটা প্রকাশ করেছেন। তোমাদের আকার দেখে মনে হচ্ছে তোমরাই একমাত্র আনন্দের অধিকারি, প্রাণ দিয়েই তোমাদের এই ক্ষুদ্র দেহ গঠিত। মনে হয় তোমরাই পুর্ণাঙ্গ আত্মা। সত্যিকারের সুখের সঙ্গে আমার কখনো মোলাকাত হয়নি। মনে হয় তোমাদের মধ্যেই তা বিরাজমান।’

যাত্রীদের মধ্যে জনৈক দার্শনিক বলে ওঠে ‘মহাশয় এমন প্রচুর পদার্থই আমাদের মধ্যে আছে যা দিয়ে যথেষ্ঠ বদমাইশি করা যায়। আপনার জানা দরকার, এই মুহূর্তে আমি যখন আলাপ করছি, এই আমার মতো হ্যাট মাথায় দেওয়া এক লক্ষ জীব অনুরূপ সংখ্যক স্বজাতীয় মাথায় হ্যাট পরা প্রাণীকে হত্যা করছে।’ ক্ষুদ্ধ এলিয়ান গর্জন করে উঠে ‘বদমাইশ সব। আমার ইচ্ছা হচ্ছে আর দুই কদম চালিয়ে এই ইতরদের পায়ে পিষে মারি।’ দার্শনিকটি বলে ‘দয়া করে আপনি আর এত কষ্ট স্বীকার করবেন না। তারা নিজেরাই অনেক পরিশ্রম করছে নিজেরাই নিজেদের হত্যা করবে বলে। বছর দশেক পরে এই শয়তানদের এক শতাংশও টিকবে কিনা সন্দেহ। এদের শাস্তি না দিয়ে বরং শাস্তি দেয়া উচিত ঐসব কুঁড়ে আর নিষ্কর্মার ঢেকি বর্বরদের যারা নিজেদের সৈন্য পাহারায় প্রাসাদের নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যার আদেশ দিয়ে থাকে আর পরে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে প্রার্থনাশালায় ধন্যবাদ দিয়ে থাকে ইশ্বরকে তাদের কামিয়াব করবার জন্য।’

এই ধরণের অসাধারণ খোঁচা আর প্রতিবাদে সব লেখা ঋদ্ধ। ভলতেয়ার শুধু যে আশাহীনতার কথা বলেন তা কিন্তু না। এই বইতে তিনি এই আশাহীনতার ভেতর থেকে বেরুনোর একটা নৈতিক রূপরেখাও টানেন। তিনি এলদোরাদো নামের এমন এক ইউতোপিয়ার স্বপ্ন দেখান মানবজাতিকে, যেখানে পথের ধুলো হচ্ছে সোনা আর হীরা। এগুলো ছুঁয়ে দেখে না এলদোরাদোর লোকজন। ও দেশে খেতে কোনো টাকা লাগে না। মোটকথা আত্মিক শুদ্ধিময় এক কাল্পনিক রাজ্য এই এলদোরাদো।

ভলতেয়ারের এই পুস্তকটি পৃথিবীর এমন কোনো ভাষা নেই যে ভাষায় অনুবাদ হয়নি এবং পাঠকপ্রিয়তা পায়নি। বাংলা ভাষায়ও এটির দুটি অনুবাদ চোখে পড়ে। একটা প্রকাশিত হয়েছিল বাংলা একাডেমি থেকে অন্যটা প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতা থেকে। মুল ফরাসি থেকে কবি অরুণ মিত্রর  অনুবাদটা সত্যিকার অর্থে বিশ্বাসযোগ্য এবং সহজপাঠ্য।

অলঙ্ককরণ : আল নোমান


 

ম্যাকিয়াভেলির প্রিন্স || ক্ষমতা বাসনার স্বরূপ

 

//জেডএস//

লাইভ

টপ