হাঁটার দায়িত্ব পা-ই পালন করুক, হাত নয়

Send
রাসেল রায়হান
প্রকাশিত : ১৩:০৪, মার্চ ১১, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:০৪, মার্চ ১১, ২০১৮

আমার ‘একচক্ষু হরিণীরা’ নামের উপন্যাসটি নিয়ে কদিন আগে বাংলা ট্রিবিউনে একটা আলোচনা করেছেন আফরিন শরীফ বিথী। আলোচনাটি অবশ্যই ধন্যবাদার্হ এবং স্বাগতমযোগ্য। বিথীর প্রতিক্রিয়াতেই বোঝা যাচ্ছিল কতটা নিবিষ্ট পাঠক তিনি। এটুকু নিবিষ্টতাই একজন লেখকের জন্য প্রাপ্তি।

আলোচনাটিতে একটি অভিযোগ ছিল। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে যদিও সেটিকে খুব নিরীহ এবং সরল মনে হয়, কিন্তু সূক্ষ্মভাবে দেখলে অভিযোগটা আসলে একজন লেখকের জন্য গুরুতর। আমার চোখে তার আপত্তির জায়গাটিকে যথেষ্ট শক্তিশালীও মনে হয়েছে। এই যুগে যেখানে একেকটি বাড়িতে গোপনে বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন নারীরা, সেখানে একজন লেখকের কিছু দায়বদ্ধতা অবশ্যই থাকে, এবং সেটাতে ব্যর্থতাকে অপরাধ হিসেবে দেখলেও সেটা খুব অতিরিক্ত মনে হবে না। একজন নারী হিসেবেই নয়, একজন পুরুষ হিসেবেও যে-কারও চোখেই এটাকে আপত্তিকর মনে হতে পারত, সেটা যে হয়নি, তাকে আমি দুর্ভাগ্যজনকই বলব। লেখক হিসেবে আমি যেহেতু এই দায় বহন করি, এবং এই দায় মোচনের চেষ্টাও করা উচিত বলে মনে করি না, সেহেতু এটার প্রেক্ষিতে আমি নিশ্চুপ থাকলেই হয়তো সেটা শ্রেয়তর হতো। নিশ্চুপ থাকতে চেয়েছিলামও। তবে একজন খুনীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয় রাষ্ট্র, তার সিস্টেম। সেটা একারণেই শুধু নয় যে সে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারুক, এজন্যও যে, কোন পরিস্থিতিতে এমন একটা ঘৃণ্য কাণ্ড সংঘটিত হলো— সেটা জানা দরকার। অন্যরা সতর্ক হোক।

হয়তো খুনী বলবে, ভিক্টিম আগে আমাকে শুধু শুধু চড় মেরেছিল সবার সামনে, আমি অপমানিত হয়েছিলাম, তাই খুন করেছি। এতে করে খুনীর শাস্তি কমে যাবে, ব্যাপারটি মোটেও তা নয়। যেটা হতে পারে, এতে খুনীর বুকের ভার সামান্য হয়তো লাঘব হবে। হয়তো খুনীও মনে মনে অভিযোগ করতে পারবে না, হায়, আমার অপমানিত হওয়ার ব্যাপারটি কেউ শুনল না! হয়তো অন্যকিছুও। কিন্তু আমি সেক্ষেত্রেও কিছু বলব না। অভিযোগ মেনে নিচ্ছি। এমনকি বিথী এই উপন্যাস পড়ে আঘাতপ্রাপ্ত এবং উদ্বিগ্ন হয়েছেন, সেটার জন্য আমি দুঃখপ্রকাশ করছি।

মূলত, নিজের লেখা নিয়ে নিজের কথা বলা দৃষ্টিকটু যথেষ্ট। যদি সুদূর বা অদূর ভবিষ্যতে অন্য কেই ঐ প্রসঙ্গে কিছু বলতে আগ্রহী হন, বলবেন। তবু এই লেখাটি লিখতে হচ্ছে একারণে যে, এখানে আমার নিজের প্রতিই শুধু আপত্তি নেই, অন্য একটি বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে, যেটি নিয়ে আমার আপত্তি আছে। তাছাড়া আমার আপত্তির জায়গাটি হয়তো বিথী উপস্থাপন করেছেন, কিন্তু বিথীর এই দাবিটা আসলে নারীপুরুষ-নির্বিশেষে অনেকেরই। আগে অংশটুকু হুবহু তুলে ধরছি...

‘‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ লেখকগণ তাঁদের লেখার মাধ্যমেই কিন্তু সমাজের অনেক সংস্কার সাধন করেছেনএই উপলব্ধি বর্তমান লেখকদের থাকতে হবে। না-হলে তাঁরা বর্তমানে জনপ্রিয়তা পেলেও সাহিত্যের ইতিহাসে টিকে থাকতে পারবেন না। তাদের কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না। একজন সত্যিকার লেখক সাহিত্যের ইতিহাসে যুগ যুগ ধরেই বেঁচে থাকতে চান বলেই বিশ্বাস করি।’’

এই উদ্ধৃতটুকুর প্রেক্ষিতে আমার প্রশ্ন :  লেখায় একটি মেসেজ দেওয়ার বাধকতা লেখকের ঠিক কতটুকু? সম্পূর্ণ সত্য বলার দায়ই বা কতটুকু, যেখানে লেখক সাহিত্য রচনা করছেন, ইতিহাস নয়? একজন পাঠকই বা তাকে কতটা প্রভাবিত করার অধিকার রাখে? শরৎচন্দ্র নির্যাতিতাদের নিয়ে লিখেছেন বলে ‘বর্ষারানী’কেও কি নির্যাতিতদের পক্ষে লিখতে হবে? যখন একজনের বিঁধিয়ে দেওয়া অপমানের কাঁটা একটি সুন্দর লেখা পড়ে আপনি ভুলতে পারবেন, সেটাকে কী বলবেন? হয়তো ঐ কাঁটাটুকু দূর করাই ছিল এই লেখাটির উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্যটুকুকে কি আপনি প্রভাবিত করতে পারেন? কিংবা সত্য বলার যে ব্যাপারটি আছে, একজন লেখক কি শুধু সত্যটা বলেই চুপ থাকতে পারেন না? তাকে কেন সমাধানও বাৎলে দিতে হবে? সমস্যা সমাধানের জন্য তো সমাজ আছে, রাষ্ট্র আছে। তাদেরকে কিছু কিছু দৃষ্টিকটু বিষয় জানিয়ে দেওয়াও কি একধরনের নির্যাতিতের পক্ষে দাঁড়ানো নয়? সমাজের প্রতিও দায় থাকতেই হবে কতটা লেখকের? ইতিবাচক অর্থেও সমাজ পরিবর্তনের পতাকা একজন লেখককে কেন নিতে হবে? কেউ মিসরিড না করেন। আমি এটাও বলতে চাচ্ছি না যে একজন লেখক সমাজ পরিবর্তনের দায়িত্ব নিতে পারবেন না। অবশ্যই নিতে পারবেন। কিন্তু আমার কথা হলো, সেই দায় নিতে বা না-নিতে একজন পাঠক কতটা বাধ্য করার অধিকার রাখেন? চাপ প্রয়োগ করার অধিকার রাখেন? কিংবা একজন সত্যিকারের লেখক যুগ যুগ ধরেই বেঁচে থাকতে চান, এই ধারণাই-বা বিথীর কী করে হলো? তিনি কি নিশ্চিত যে সব বড় লেখকই ইতিহাসে জ্বল জ্বল করে টিকে থাকতে চান? কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাই প্রকাশ করেন না? বর্তমান জনপ্রিয়তাকেও কেন আমরা ঘৃণার চোখে দেখব? কেন সন্দেহ করব? জনপ্রিয়তা তো সেই দুর্লভ পা, যেটা আসলে সাপের পেটে থাকে, দুয়েকজন সৌভাগ্যবান ব্যক্তি বড়জোর সেটি দেখতে সমর্থ হন।

প্রশ্ন অনেক আছে। উত্তরও আছে নিশ্চয়ই। আমি যে বিষয়টিকে ফোকাস করতে চাই, সেটি হলো লেখকের প্রতি আমরা আসলে কিছুই চাপিয়ে দিতে পারি না। আপনি যতটুকু স্বাধীনতা দাবি করেন, একজন লেখকেরও ততটুকু স্বাধীনতা প্রাপ্য। আপনাকে লেখক যা যা বলতে বা না-বলতে বাধ্য করতে পারেন না, আপনিও লেখককে তা তা বলতে বা না-বলতে বাধ্য করতে পারেন না। একজন লেখকের কাছে আমরা যখন একজন শিক্ষক কিংবা সমাজসংস্কারকের ভূমিকা আশা করব, তখন তার লেখকসত্তা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করে দেওয়া যায় না। আর ব্যাপকার্থে এই ইচ্ছাও কি আসলে অনেকটা পায়ের কাছে না দিয়ে বরং হাতের কাছে হাঁটার দায়িত্ব দেওয়ার ইচ্ছার মতন মনে হয় না? আশা করি শুধু বিথী না, অন্য অনেক পাঠকও বিষয়টি অনুধাবন করতে সমর্থ হবেন।

//জেড-এস//

লাইভ

টপ