কথায় কথায় মামুন হুসাইনের শিল্পচেতনা

Send
.
প্রকাশিত : ১৬:২২, মার্চ ২০, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৫, এপ্রিল ০৫, ২০১৮

[ মামুন হুসাইন জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬২ সালের ৪ মার্চ, কুষ্টিয়া জেলা সদরের কমলাপুরে। ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি ও এইচএসসি শেষে ১৯৭৯ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। ১৯৮৫ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করে চিকিৎসক হিসেবে সরকারি হাসপাতালে যোগদান করেন। পরে তিনি মানসিক ব্যাধি বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০২ সালে এমফিল ডিগ্রি এবং ‘সাঁওতালদের মধ্যে মনোরোগের বিস্তার ও ধরন’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভ রচনা করে ২০০৯ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপরে সাইকিয়াট্রি বিষয়ে বিসিপিএস থেকে ২০১১ সালে এফসিপিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি ২০০৪ সালে কাগজ কথাসাহিত্য পুরস্কার, ২০১১ বাঙলার পাঠশালা-আখতারুজ্জামান ইলিয়াস পুরস্কার এবং ২০১৭ সালে কথাসাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার অর্জন করেন। তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন অনুপম হাসান।]

অনুপম হাসান : আপনার গল্পের কথা উঠলেই সিরিয়াস ধর্মিতার প্রসঙ্গটি অনিবার্যভাবে সামনে আসে। এক্ষেত্রে আরো দুটো প্রসঙ্গ আমাদের জানা আছে— জনপ্রিয় ও মূলধারা; আমাদের কথা হচ্ছে, আপনার গল্প প্রকাশের পর থেকেই সিরিয়াসধর্মিতার একটা লেবেল সেঁটে গেল কিংবা ব্রান্ডেড হওয়ার বিশেষ কোনো কারণ আদৌ কী আছে বলে মনে করেন? অথবা আপনি নিজে কী বিশ্বাস করেন, সাহিত্য বিচারের ক্ষেত্রে এরকম একটা ধারা-বিভাজন প্রয়োজনীয় ব্যাপার?

মামুন হুসাইন : লেখা সিরিয়াস হচ্ছে, লেখা জনপ্রিয় হচ্ছে, লেখকের ব্র্যান্ডিং হচ্ছে, লেখার অভিমুখ মূলধারার দিকে প্রবাহিত করছি— এরকম ভাবনায় কোনো লেখক বুঁদ হয়ে থাকেন কিনা আমার ধারণা নেই। লেখা কী আদৌ কোনো ওপরভাসা চাতুরী? লেখক নিশ্চয়ই পঠিত হতে চান; এখন বড় মানুষদের মতো ছোট মুখে— লেখা একটি কাজ, লেখা একটি দায়, লেখায় দূষিত রক্ত বিশুদ্ধ হয়, ক্যাথারসিস হয়, ...এতসব আপ্তবাক্য না আওড়ে বলতে পারি— আমাদের বেঁচে থাকার, আমার নিজের বেঁচে থাকার যে অভিজ্ঞতা তা সামান্য অপরকে পাইয়ে দিতে চাই, অথবা আমি আমার মতো বেঁচে থাকার গল্পটিই কেবল বলতে চেয়েছি। লেখার গায়ে যে নামাবলি অঙ্কিত হয়, এটি প্রকাশনা ইন্ডাস্ট্রির এবং জ্ঞানময়-ক্রিটিকদের প্রিয় খেলাধূলা। লেখা জনপ্রিয় হয়েও গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টিশীল কর্মে রূপান্তরিত হতে পারে, অথবা আপনাদের ভাষায় ‘সিরিয়াস’ তকমা নিয়ে ক্লিশে ও বাতিল দুষ্কর্ম হয়ে সদা বিরাজমান হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ লেখা আপনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, আক্রান্ত করে এবং হীরকদ্যুতির মতো একটি ভিশান আনে।

এখন সাহিত্য বিচার তো আমি করি না। গদ্য-পদ্য-উপন্যাস ইত্যাদির বাইরে কত বিচিত্র পদের লেখা আছে, কত বিচিত্র এর বর্গীকরণ, সব আমিও ওয়াকিবহাল নই। কিন্তু সবাই জানেন— অধুনা-সাহিত্য বিচার শেখানোর স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, সর্বোপরি নানা লিটারেরি থিওরি বিদ্যমান। এদের একটি নির্দিষ্ট গজকাঠি থাকে, না চাইলেও, এই মাপযন্ত্রে আপনি প্রতিস্থাপিত হন এবং যেকোনো ‘তত্ত্ব’-এর যন্ত্রর-মন্তরে আপনি বশীভূত হতে বাধ্য। সাহিত্য ‘বিচার’ অর্থ— তাহলে কী বলবো কাঠগড়ায় দাঁড়ানো? লেখার এই অংশটুকু মার্কস মহোদয়ের, এই শরীর রুশি, এই হাত ইয়ূং-এর, এই আঙুলগুলো ফ্রয়েডের, এই হেঁটে যাওয়া কুহকী বাস্তববাদ, এই স্বর জাদুবাস্তববাদ, এই চাউনি ধ্রুপদী, এই অংশ রাজনৈতিক, কিংবা লেখাটি একইসঙ্গে স্বপ্ন, সংগীত ও কবিতাময়, কিংবা এই সংগীতের ভাষায় এই গায়কী, এই গমক উত্তরাধুনিক, ইত্যাদি-ইত্যাদি! একবার এক ডাচ নিজের ভাষা নিয়ে ঠাট্টায় মেতেছিলেন— ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলি ল্যাটিনে, প্রেমিকার সঙ্গে ফরাসি ভাষায় আর কেবলমাত্র আমার ঘোড়ার সঙ্গে কথা হয় ডাচ-এ। এই পরিপ্রেক্ষিত মাথায় রেখে তোমাকে জিজ্ঞেস করি— সাহিত্যের প্রধান কাজ যদি সংযুক্তি, তবে বিভাজন বলছি কেন? (যদিওবা বিযুক্তিও এক প্রকার সংযুক্তি)— আমার সামান্য বিবেচনায় দায়িত্বশীল ক্রিটিক, তথা অগ্রসর পাঠক এবং সাহিত্যের বিচারকমণ্ডলী লেখক-পাঠকের সেতু-বন্ধন তৈরিতে সার্বিক সহায়তা দিতে পারেন; যে বিবিধ স্বর লুকোনো আছে, দুই বাক্যের মধ্যস্থানে তাকে আলাদা চিহ্নিত করতে পারেন, যে মিড় আমার কানে লাগে না, তা আমার সামনে মেলে ধরেন,... কত রকমের সুর-যন্ত্র, আলাদা-আলাদা বুঝতে পারি না, তিনি খুলে দেখান— এটি বেহালা, এটি পিয়ানো, এটি হার্মোনিয়াম, এটি সারেঙ্গী, এটি মৃদঙ্গ, আর এই গম্ভীর, অনেক গভীর থেকে উঠে আসা স্বরটি হলো সরোদ।

অনুপম হাসান : চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করেছেন, সমাজে সাইকিয়াট্রির ডাক্তার হিসেবে ভালো পসারও আছে আপনার, তারপরও গল্পের সঙ্গে এমন গাঁটছড়া গড়ে ওঠার রহস্যটা কোথায়? এরকম একটা প্রশ্ন আপনার সম্পর্কে পাঠকের থাকেই, এটা অনেকেই ঠিক ব্যাখ্যা করে উঠতে ব্যর্থ হন। আমার বিশ্বাস চিকিৎসাশাস্ত্র এবং আপনার গল্প লেখার মধ্যে কোথাও একটা সমান্তরাল দায়বোধ আছে— বিষয়টি যদি কার্যকরণসহ পাঠকের সামনে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করেন।

মামুন হুসাইন : একাত্তরের পর আমাদের অনেক উচ্চনম্বর প্রাপ্ত ছাত্র সোভিয়েতে এবং পূর্ব-ইউরোপে মেডিকেল শাস্ত্র অধ্যয়ন করতে যায়। তাঁরা টলস্টয়-গোর্কি-চেখভ পড়েছেন, মূলশাস্ত্রের পাশাপাশি— এই সংবাদ আমি জেনেছিলাম মেডিকেল কলেজের শেষ বছরে। চেখভ, নিশ্চয়ই স্মরণে আছে, তিনি ছিলেন চিকিৎসক— ওঁর একটি সুবিখ্যাত উক্তি আছে : মেডিসিন হলো আইনগত স্ত্রী, আর সাহিত্য তার বান্ধবী। তথ্য-জালিকায় প্রবেশ করলে, ‘চিকিৎসক এবং সাহিত্যচর্চা’ নিয়ে বিস্তর গল্পগাছা যোগাড় করা সম্ভব। আমাদের কালে বেশ কজন খ্যাতিমান চিকিৎসক পুরস্কৃত লেখক; অগ্রজদের মধ্যে আহমদ রফিকের নাম করা যায়, যিনি এখনো সক্রিয়। কিছুদিন আগে কবি ভূমেন্দ্র গুহ মৃত্যুবরণ করেছেন। অতীতকাল থেকে শুরু করে, হালের অলিভার স্যাকস, কিম্বা খালেদ হোসাইনি পর্যন্ত এই তালিকা দীর্ঘ করা যায়। ইতোমধ্যে কিছু চিকিৎসক হয়ে গেছেন চিরকালের লেখক— যেমন কীটস, আর্থার কোনান ডয়েল, চেখভ, মম, ল্যুসুন, ব্রেখট, উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস, মিখাইল বুলগাকভ ইত্যাদি।

পাশাপাশি অন্যভাবে দেখা যায়— সাহিত্য-সংস্কৃতির যে গুরুত্বপূর্ণ বাহন ‘ভাষা’ সে সম্পর্কে মৌলিক ভাবনা আছে লাকার লেখাপত্রে। আবার, আমাদের পুরাণ, চেতন-অবচেতনের ছায়া, আর্কিটাইপ, আমাদের ট্রমা, আমাদের বন্ধুত্ব, আমাদের সম্পর্ক ইত্যাদি মিলিয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সাইকিয়াট্রির মনীষীবৃন্দই প্রকাশ করেছেন। ফলে এই বিদ্যার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে আমার কোনো ক্ষতি-বৃদ্ধি হয়নি, হয়তো তোমাদের মনের মতো অবিরত সরল-সুমিষ্ট লেখাপত্র তৈরি করতে পারিনি— কিন্তু এই বিদ্যার নির্যাস আমার নিঃসঙ্গতা আড়াল করে, আমাকে রক্ষা করে, আমাকে আত্মমগ্ন করে, এবং আমার ওপর বর্ষিত তাবৎ অপমান-অসম্মান যজ্ঞকে ক্ষমা করার শক্তি যোগায়। এই প্রসঙ্গে শেষ কথাটি বলতে চাই : চিকিৎসক, আইনজীবী, ইঞ্জিনিয়ার, থানার দারোগা ইত্যাদি মানুষেরা ‘লেখক’ হলে, আমরা যেমন সংস্কারবশত আঁতকে উঠি— এমনটি সব দেশে নয়; আমার সাহেব-বন্ধুদের মুখে শুনেছি, দু’একটি প্রতিষ্ঠানের নাম স্মরণ আছে— কলম্বিয়া, স্টানফোর্ড ইত্যাদি মেডিকেল স্কুলে বরঞ্চ চিকিৎসকদের লিখতে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। রয়টার ২০০৬-এর অক্টোবরে খবর ছেপেছিল— লেখালেখি উন্নততর চিকিৎসক উৎপাদনে সহায়ক। স্টানফোর্ড মেডিকেল স্কুলে ‘আর্টস, হিউম্যানিটিস এবং মেডিসিন প্রোগ্রাম’ নামে বিশেষ কোর্স পরিচালিত হয়। বিভিন্ন সময়ে ‘ওয়ার্ল্ড ইউনিয়ন অফ ফিজিসিয়ান-রাইটার’, বাৎসরিক কংগ্রেস করেন ইউরোপে। আমি একটি পত্রিকার নাম জানি— জার্নাল অফ পোয়েট্রি থেরাপি...। এই পরম্পরায় ‘মেডিকেল হিউম্যানিটিজ’ নিয়ে এখন বিস্তর আলোচনা হচ্ছে এবং তরুণ চিকিৎসকদের পাঠ্যসূচিতে এর অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রস্তাবনা এসেছে। অন্যান্য দেশ তো বটেই, পার্শ্ববর্তী দেশ নেপালেও ‘মেডিকেল-মানববিদ্যা’ এখন যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে। কাজেই মানুষের বৃহত্তর যে জ্ঞান কাঠামো, সেই অনুসন্ধিৎসার পথ ভিন্ন হলেও আমরা সবাই একই নৌকার যাত্রী হয়ে পড়ি। ছিঁড়েছিঁড়ে অপরকে ব্যাখ্যা করার চল যেহেতু বর্তমান, অতএব তোমরাও হয়তো এই প্রশ্ন এড়াতে পারনি শেষ পর্যন্ত।

অনুপম হাসান : বলা যায়, আপনার গল্প আমার অধ্যয়নের তালিকায় প্রায় সবগুলোই আছে; সেই পাঠ থেকে আমার ধারণা হয়, আপনার গল্প বলার কৌশলে সরাসরি না হলেও বাক্যের গঠনগত কৌশলে গাবোর (গ্যাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ) কোথাও না কোথাও প্রভাব আছে— এ সম্বন্ধে আপনার ব্যক্তিগত অবস্থান কী?

মামুন হুসাইন : আমার মতো অকিঞ্চিৎ মানুষের গায়ে মার্কেজ-এর সিলমোহর দিয়েছ, আনন্দিত হলেও, তুমি ভেবে নাও— অন্ধের নাম দিয়েছ পদ্মলোচন! আমার প্রথম পুস্তিকা প্রকাশের বছর মার্কেজের নোবেলখ্যাত উপন্যাস হাতে পাই। মার্কেজের উপন্যাস পাঠে, আমার নিঃসঙ্গতা কমতে থাকে, এই ভেবে যে— আমার চিন্তনজগতের খানিকটা-খানিকটা ছায়া এই প্রথম কোথাও সমান্তরাল প্রবাহিত হতে দেখছি। তাতে সামান্য সাহসের সঞ্চয় হয়। মার্কেজের হাত ধরে, চেনা ইউরোপীয় মডেলের বাইরে গল্প-উপন্যাস লেখার যে চল, তার সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয় এবং এই আবিষ্কার আমাদের কালে ছিল এক অত্যাশ্চর্য ঘটনা। মার্কেজ যে বাস্তববাদ বর্ণনা করেছেন, তা ছিল ক্রিটিকদের ভাষায় কুহকী বাস্তববাদ। যদিও তুমি মার্কেজেই স্থিত হয়েছ, কিন্তু আমাদের উড়নচণ্ডী-মন তখন খুঁজে পেয়েছে বোর্হেস, ওর্তেগাই গাসেত, কার্পেন্তিয়ের, ফুয়েন্তেস, রুলফো, কোর্তাজার ইত্যাদি। লাগাতার সামরিক অভ্যুত্থান, হত্যা, গুম, ধ্বংস ইত্যাদি মিলিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র যা-যা করে— এ সবের আভাস আমরা পাচ্ছি তখন এই দূরন্ত লেখককূলের লেখায়। ফলে এদের পাঠবৃত্ত থেকে দুএকটি শব্দ-বাক্য আত্তীকরণ হয়নি তা অস্বীকার করি কী করে! কিন্তু আমার বাক্যের গঠনগত কৌশল কোথায় পৃথক, কোথায় একান্নবর্তী পরিবারের সদস্য আমি নিজে এখনো সঠিক জানি না। হয়তো তোমরা, যারা নিবিষ্ট পাঠক, তোমরা এই ব্যবচ্ছেদ কর্মে অধিক সফল হবে।

অনুপম হাসান : অধিকাংশ বলার চেয়ে বলা ভালো মামুন হুসাইনের সব গল্পই নির্দিষ্ট কোনো টাইমফ্রেমে আবদ্ধ থাকে না, প্লটের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য; কিন্তু গল্প-উপন্যাসে সময়(টাইম) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রথাগত গল্প-উপন্যাসের প্রচলিত টাইমফ্রেমের চৌহদ্দি ভাঙার ক্ষেত্রে আপনার নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আছে কী?

মামুন হুসাইন : এক্ষণে আমার সকল ভ্রষ্টাচারের ‘উদ্দেশ্য’ খুঁজে পেতে আবিষ্কার করা, বুঝতে পারি, তোমার প্রধান অভীষ্ট। মনীষীরা বলেছেন : মন্ত্রের গূঢ় রহস্য সহসা প্রকাশ করতে নেই! আমি কি জানি, আমি কে? বড় সময়ের, নিরিখে আমাদের পরিচয় ...ফরগেটফুলনেস ...কেবল বিস্মৃতি! তারকোভস্কির মতো মেধাবী সিনেমাটোগ্রাফার ধন্দে পড়েছিলেন ‘সময়’ নিয়ে— টাইম উইথ ইন টাইম ...কাজটি বেজায় শক্ত, কিন্তু করতে হবে। মৃত্যুর চারশ’ বছর পর, শেকসপিয়র তাঁর শিল্পকর্ম বিষয়ে বছরে শতাধিক বই লিখিয়ে নিলেও সবার জন্য নিশ্চয় সেই রাজযোটক বরাদ্দ হয়নি। উপন্যাসে-গল্পে সময়ের ব্যবহার নিয়ে অধ্যাপকবৃন্দ প্রায়শ টিউটোরিয়াল লেখান সাহিত্যের ছাত্রদের দিয়ে। আইনস্টাইন বলতেন, অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের বিভাজন, পদার্থবিদদের কাছে ইল্যুশন! অনেক কাল আগে, কিয়ের্কেগাডের ডাইরিতে পড়েছিলাম— জীবনকে বুঝতে চাইলে, পেছনটা ঘুরে দেখতে হবে। কিন্তু জীবন অতিবাহিত করতে হয় ভবিষ্যতের নিরিখে; জয়েস সাতশত তিরাশি পৃষ্ঠার ইউলিসিস রচনা করেন একটি দিনের নিরিখে।

অনুপম হাসান : বাংলাদেশের গল্প-উপন্যাস বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ কিংবা তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাল অতিক্রম করে কতটা এগিয়েছে বিশের দ্বিতীয় দশকে? এক নজরে যদি বিশ্ব-সাহিত্যের সঙ্গে তুলনা করে সংক্ষেপে কিছু বলেন।

মামুন হুসাইন : কথাটি কী, ‘বাংলাদেশের’ না ‘বাংলা ভাষার’? এক্ষণে দুই বাংলার বাইরেও যেমন ত্রিপুরা, আসাম, বিহার, আন্দামানসহ গোলার্ধ জুড়ে শুরু হয়েছে ডায়েস্পোরা সাহিত্যের এক বিপুল বিস্তার। কতদূর এগিয়েছে, এর অনুপুঙ্খ মাপজোখ, এর রোডম্যাপ— সাহিত্য ডিপার্টমেন্ট যেভাবে করেন, তা আমার আয়ত্তাধীন নয়। বাংলা ভাষাকে আমার সব-সময়ই ঐশ্বর্যশীল, বলশালী এবং রাজসিক মনে হয়। প্রধান অধিপতিদের বাইরে, অন্য বিশিষ্ট লেখক— বিশিষ্ট লেখাপত্রের নাম করা যায়, বড় একটি নির্ঘণ্টও করা সম্ভব। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ছাড়া, সাতচল্লিশ উত্তর বেশির ভাগ লেখায় পাকিস্তান ও পাকিস্তান নামক নতুন রাষ্ট্রের অধিবাসী হওয়ার সরল ঘটনা এবং বর্ণনা লিপিবদ্ধ হয়েছে। ওয়ালীউল্লাহ, আমার ধারণা বাংলা ভাষায় প্রথম মানুষ, যিনি ইউরোপের চিন্তনকে আমাদের পলিমাটিতে সন্নিবেশিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কাজী আবদুল ওদুদের ‘নদীবক্ষে’ উপন্যাসটি নিয়ে আলাদা পাঠ-পর্যালোচনা হওয়ার দরকার। এক্ষণে আবু ইসহাকের কথা স্মরণ আসছে। সরদার জয়েনউদ্দিনের নিম্নবৃত্ত বয়ান দ্বারা আমি আক্রান্ত হতে পারিনি কখনো। আবুল ফজল, আবু রুশদ আবার নতুন করে পাঠ নেয়ার ইচ্ছা সহসা জাগে না। তবে শামসুদ্দিন আবুল কালামের ‘কাশবনের কন্যা’ কখনো মনে হয়, আবার উল্টে দেখি— জানি না সময় নামক মহাশয় দয়াদ্র হবেন কিনা!

যদ্দুর বুঝেছি— ষাটের দশকেই লেখককূলের মধ্যে প্রথম নিজেকে ব্যবচ্ছেদ করার ঝোঁক তৈরি হয়। তারিক আলীর সেই বিখ্যাত বই স্ট্রিট ফাইটিং ইয়ারস স্মরণ করা যায়। রাষ্ট্রের আধিপত্য, সামরিক অকুপেশান ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের ভেতর নতুন একটি উপস্থাপনা, নতুন একটি বয়ান তৈরি হতে থাকে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভাবনার অভিমুখ আরো খানিকটা স্বচ্ছ হয়— যার প্রমাণ স্বরূপ শওকত আলী, হাসান আজিজুল হক, আবুবকর সিদ্দিক, মাহমুদুল হক, ইলিয়াস, সুশান্ত মজুমদার, আহমেদ বশির, মঞ্জু সরকার, জাকির, শাহাদুজ্জামান, ইমতিয়ার, অদিতি, শাহিন আখতার ইত্যাদিসহ আমাদের কালের অকালপ্রয়াত শহীদুল জহির পর্যন্ত পৌঁছানো যায় অনায়াসে। আর এর বাইরে দশকওয়ারী’র হিসেবে সব গুরুত্বপূর্ণ লেখক তো এখনো সক্রিয়ভাবে লিখেই চলেছেন— এই নাম ঠিকানাটা আমি এড়িয়ে গেলাম। পাশাপাশি ভারত দেশের বাংলা রাজ্যের চেনা নক্ষত্রমণ্ডলীর বাইরেও এক্ষণি একটি গুরুত্বপূর্ণ লেখক বলয়ের সৃষ্টিশীলতা খুব সহজেই চিহ্নিত করা যায়, যা সতীনাথ, জগদীশ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, সমরেশ বসুর বাইরেই অবস্থান করছে। এই পর্বে স্মরণ করছি অমিয়ভূষণ, মহাশ্বেতা, দেবেশ, স্বপ্নময়, অভিজিৎ সেন, নবারুণ ইত্যাদি।

এখন আমাদের গল্প-উপন্যাসকে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে তুলনা করতে হলে তো তুলনামূলক সাহিত্যতত্ত্বের কাউকে নেমন্তন্ন দিতে হয়। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বের নানান ভাষায় অনূদিত হয়েছেন। কিন্তু আমার পাঠবৃত্তে বিদেশ-বিভূঁইয়ের হঠাৎ কোনো লেখায় তাঁর গান-কবিতার একটি দুটি চরণ কেবলমাত্র এপিগ্রাম হিসেবে উদ্ধৃত হতে দেখি। ইউথ্যানাসিয়া নিয়ে কাজ করে, এমন অনেক প্রতিষ্ঠান তাঁর পদ্য বা লিরিক, যেখানে তিনি মৃত্যু-বেদনা এবং জীবনের অন্তর্গত মর্মবাণী উল্লেখ করেছেন, তা মৃত্যুপথ যাত্রায় ব্যক্তিগত ‘হিলিং’ হিসেবে আওড়ান। কিন্তু তাঁর গল্প-উপন্যাস-কবিতা? যদিওবা খ্যাতিমান অনেক ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার আলাদা বিভাগ আছে, সাধারণ পাঠযোগ্যতা কেমন আমি আন্দাজ করতে পারি না। ওয়ালীউল্লাহ এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও অনূদিত হয়েছিলেন— এখন বাংলাদেশের এই মহার্ঘ্য ইউরোপ গ্রহণ করেছে বলে, আমার কাছে কোনো খবর নেই। ক্যামুর ডা. রিউ আর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শশী নিয়ে প্রবন্ধ তো তৈরি করা যায়, কিন্তু জগৎসভা ক্যামুর পক্ষেই নম্বর বেশি দিচ্ছে। এতে করে নিশ্চয়ই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দারিদ্র্য চিহ্নিত হয় না। বিশ্বসাহিত্যের, গোলক ধাঁধাঁ যখন বর্ণনা করছি, বলতে কী পারি বাংলা সাহিত্য ভারতবর্ষের অন্যান্য ভাষায় অনূদিত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠযোগ্যতায় পৌঁছে গেছে ইতোমধ্যে? এখানে শাসকের হিন্দি ভাষা নতুন প্রজন্মের খিলখিল ইংরেজির যৌথ প্রযোজনায় বাংলা শব্দ-বাক্যকে করে নিশ্চেতন, নিষ্পিষ্ট ও নিষ্প্রভ। কাজেই বাংলা সাহিত্য এবং বিশ্বসাহিত্য— এই দুয়ের গপ্প-গাছা সামনে এলে, আমি নিষ্করুণ এক ধন্দে পড়ে যাই অহরহ। অর্থাৎ ভাষা নিজে ক্ষমতাবলয়ের বাইরে পৌঁছতে পারে না কখনো। জগৎসংসারের অর্থনীতি যে লোকালয় থেকে পরিচালিত হয় সেখানে বাঙাল-জনপদ হয়ে থাকে আঁধার ও অসংস্কৃত, ক্ষমতাপুষ্ট ভাষাই তখন আধিপত্য বিস্তার করে প্রবল তোড়ে। যেমন, এখন মনযোগ পাচ্ছে ইংরেজি, ফরাসি, জর্মন, জাপানি ইত্যাদি। কেউ এখন যত্ন করে গ্রিক, ল্যাটিন, ফার্সি শিখতে বসে না। ফলে বাংলা ভাষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য সম্ভার আশ্রয় পায়, বাঙালির অন্তর্জগত, বাঙালির নিজের ভিটেবাড়িতে।

অনুপম হাসান : সমকালে আপনি একজন শক্তিশালী গল্পকার হওয়ার পরও আপনার নীরবে নিভৃতে কিংবা মৌনব্রত পালনের ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য আছে কী?

মামুন হুসাইন : এই ব্যাধি আমার ব্যক্তিত্বের, বহন করছি সেই শৈশব থেকে। গ্যাং স্পিরিট নিয়ে প্রচুর বন্ধু-বান্ধব, হুল্লোড় করছি— স্কুলপলায়ন করছি বেজায়, এ রকম অভিজ্ঞতা আমার জীবনে খুব সামান্য। অকাল পিতৃবিয়োগের ছায়া আমি আজীবন বহন করতে করতে প্রায়শ বেদনার্ত এবং নিঃসঙ্গ হই। আর গল্প-উপন্যাস লিখে জগৎ জয় করার ক্ষমতা নিশ্চয়ই আমার নেই। সর্বোপরি খ্যাতিমান হওয়ার জন্য যে আয়োজন, যে জনসংযোগ এবং চুক্তিপত্র তৈরি করতে হয়— সে সম্পর্কে আমার জ্ঞান বড্ড ক্ষীণ। আমি নিশ্চয় গান্ধিজীর মৌনব্রত বা চার্চের পুরোহিত-এর মতো রিট্রিটে নেই— কথাবার্তা, জলপান, অন্নগ্রহণ ইত্যাদি সামাজিক সম্পর্ক আমি নিশ্চয় তোমার সঙ্গে নস্যাৎ করিনি কখনো।

এখন সব সময় তো বাচাল হতে পারি না, কথা তুমি যখন আদায় করে নাও, তখন তা আনন্দদায়ক তো বটেই। তাছাড়া আমি তো কোনো দ্বীপবাসী নই, যে পণ করেছি, কথা না বলার। আর ‘মৌনতা’ শব্দকে যদি মহিমান্বিত করতে চাই, তাহলে বলবো, এই মৌনতা, প্রকান্তরে আমাদের অক্ষম ‘ধ্যানমগ্নতা’কেই প্রকাশ করে। যেজন্য, যিনি লেখক, যখন তিনি বাক্য রচনা থেকে বিরত থাকেন, তখনও তিনি লিখেই চলেন, তাঁর মস্তিষ্কের গোপন কোনো রাজ্যে। লেখা নামক দুরারোগ্য ব্যাধির অভিপ্রায় এইভাবে আমাদের সঙ্গী হয় আমৃত্যু-আজীবন; আমরা এর অভিঘাত সহসা এড়াতে পারি না।

অনুপম হাসান : আমাদের দেশের তরুণ গল্পকাররা যে ধারায় আগ্রহী হয়ে লিখছে, তাতে করে আপনি কী বাংলাদেশের গল্প-গল্পকার নিয়ে আশাবাদী কোনো মন্তব্য করতে পারেন?

মামুন হুসাইন : এখন আমি তো জ্যোতিষী নই, যে ভবিতব্য নিয়ে মন্তব্য করতে পারি। রবীন্দ্রনাথের কথা আছে : ‘আমরা গল্পপোষ্য জীব...।’ সে হিসেবে পৃথিবী লয় না হওয়া পর্যন্ত, মানুষ অনর্গল গপ্পোবাজ। এখন ‘গপ্পোবাজি’ এবং ‘গল্প লেখা’ এক সমান্তরালে যায় কিনা, এ নিয়ে আমরা আলোচনা করতেই পারি। বিদ্যা, ভাবনা এবং চিন্তনের সঙ্গে আমার বিবেচনায় এক ধরনের বিষাদময়তা যুক্ত থাকে; কিন্তু ‘নৈরাশ্য’ এবং ‘বিষাদময়তা’ নিশ্চয় সমার্থক নয়। কাজেই তীব্র মনোবৈকল্য না হওয়া পর্যন্ত আমি আশাবাদী থাকতেই চাই।

এই মুহূর্তে বয়সের আন্দাজে যাকে ‘তরুণ’ বিবেচনা করছি, তিনিও নিশ্চয় সময়ের খাল-নদী পাড়ি দিতে বসেছেন; অতএব বার্ধক্য-জরা, এসব মানবপ্রজাতির একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। লেখা তো বয়স এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা দিয়ে বাঁচে না; আর সময় সবচেয়ে নির্মম বিচারক— জগতের অসাধারণ-উজ্জ্বল মানুষ এবং তার সৃষ্টিসম্ভার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে চিরতরে। আমাদের কালে দশকওয়ারী বিচার-বিশ্লেষণ শুরু হয়েছিল; ... এখন তা ক্রমবর্ধমান হয়ে ‘শূন্যের দশকে’। সব লেখা আয়ত্তে এসেছে, সব লেখার পাঠবৃত্ত তৈর করতে পেরেছি, তা বললে মিথ্যে হবে। শূন্য দশকের শাজান শীলন, সৈকত আরেফিন— এঁদেরকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি এবং এঁদের শেষতম লেখাটিও পাঠ করার সুযোগ হয় হয়তো আমার। তৌহিন হাসানের একটি গল্প পড়েছিলাম ‘গণিত মাস্টার’; কিন্তু ও নিজে পরিচয় না দিলে আমি চিনতে পারব না। নূরুন্নবী শান্তর সঙ্গে দেখা হয়েছে এক দু’বার, খুব সামান্য কথা হয়েছে, কিন্তু গল্পের বাইরেও ওঁর নানান গদ্য পড়ার সুযোগ হযেছে দৈনিকের কল্যাণে।

এরকম নাম বর্ণনা, মুগ্ধতা এবং আত্মীয়তার রেশধরে অন্য দশক থেকেও একটি লম্বা-ছোট তালিকা প্রণয়ন সম্ভব। আমার ভাবনায়— নতুন লেখকদের সামনে এখন জগতের সর্বোচ্চ উজ্জ্বল সৃষ্টিসম্ভার উন্মুক্ত; শুধু সাহিত্য নয়, শিল্পের বিবিধ শাখা প্রশাখা এখন তাদের করতলগত। ঝুঁকি, সম্ভাবনা, রক্ষণশীলতা ইত্যাদির অভিঘাতও তাই বিপুল— উন্মুক্ত জানালা দিয়ে তথ্য পাচার হচ্ছে হু-হু; কিন্তু ‘তথ্য’ কেথায় জ্ঞান ও মনীষাকে স্পর্শ করে, কোথায় বিযুক্ত করে, কোথায় আত্মীকরণ করে, সেই পরীক্ষায় পাস নম্বর অর্জন এখন প্রধান বিবেচ্য বিষয়। আর মহাকালই বিবেচনা করবে; আমাদের অক্ষমতা, সবলতা, উদ্যমতা এবং শক্তিমত্তা, অথবা একেবারে অন্য প্রেক্ষিত থেকে দেখা যায়—এক দঙ্গল তরুণ বৃদ্ধ, বৃদ্ধ তরুণ, তরুণী বৃদ্ধা, অশীতিপর মানুষ আমরা একদিন পথ হেঁটেছিলাম একত্রে, আমরা আমাদের বেঁচে থাকার কথাটা আমাদের মতো বলতে চেয়েছিলাম আমাদের যৌথ-অভিজ্ঞানে; যেখানে খ্যাতি, অখ্যাতি, দুর্যোগ, পুরস্কার— এসব ছিল লেখার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অথবা বাই-প্রোডাক্ট।

অনুপম হাসান : একজন কথাশিল্পী যখন, তাঁর সমকাল থেকে স্কেপ করেন, তখন মূলত তিনি বাস্তবতাকে এড়িয়ে যেতে চান কিংবা সমকালের বাস্তবতা প্রকাশ করে বিতর্কে জড়াতে চান না। আমি মনে করি, কথাশিল্পীর এই মানসিকতা সত্য-সুন্দরের বিপক্ষে; কেননা কথাকারের দায় হচ্ছে— বাস্তবতাসংলগ্ন থেকে সাহিত্য রচনা করা। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কি?

মামুন হুসাইন : ইতিহাসের সময় এবং কাল বিষয়ে খানিকটা কথা বলা গেছে ইতোমধ্যে। ‘বাস্তবতা’ শব্দ কী ইংরেজি ‘রিয়েলিজম’-এর সমার্থক? শুরুতে রিয়েলিজম ছিল— সহজ বা সরল হওয়া। ওয়ার্ডসওয়ার্থ তাঁর ‘লিরিক্যাল ব্যালাড’ (১৮০০)-এর ভূমিকায় লিখেছেন— এই কবিতা মানুষের ‘রিয়েল ল্যাংগুয়েজ’-এ কথা বলবে। ইতিহাসে দেখা যায়, ১৯ শতকের পেইন্টার গুস্তাভ কুরবেট ১৮৫০ সালে ‘ডু-রিয়েলিজম’ নামে প্যারিসে যখন প্রদর্শনীর আয়োজন করেন তার অব্যবহিত পর এ্যাডমুন্ড ডুরান্টির সম্পাদনায় ‘রিয়েলিজম’ নামক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। যেহেতু এর গোড়াপত্তন হয় ফরাসিতে, তখন একে বলা হতো ফ্রেঞ্চ-স্টাইল রিয়েলিজম, যা পরবর্তীতে ‘ইংলিশ রিয়েলিজম’-এর উদ্ভব ঘটায়। বিশেষ করে ডিকেন্স, জর্জ এলিয়ট এবং এলিজাবেথ গাসকেল-এর হাতে। আর ১৯ শতকের শেষ প্রান্তে ‘রিয়েলিজম’ গতি পায় যুক্তরাষ্ট্রে। স্তাঁদালের সুবিখ্যাত কথাটি স্মরণ আছে— ‘অ্যা নভেল ইজ অ্যা মিরর ওয়াকিং ডাউন দ্য রোড।’ লক্ষ করি, এই সময়ের বাস্তবতা তৈরি হয় কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতে : ১. শিল্পায়ন ২. মানবতাবাদ ৩. বিজ্ঞানের শনৈঃশনৈ উন্নতি এবং ৪. সমাজবিজ্ঞানের উদ্বোধন। এরপরেও তর্ক থেকেই যায়— রিয়েলিস্ট নভেলের গঠনপ্রকৃতি নিয়ে এবং রিয়েলিজম নিয়েও নানান সময় বিস্তর তত্ত্ব তৈরি হয়েছে; যার প্রমাণ মেলে অরকেকস-এর ‘মিমেসিস’, আয়ান ওয়াটের ‘রাইজ অফ নভেল’, রেমন্ড ট্যালিসের ‘ইন ডিফেন্স অফ রিয়েলিজম’, মিশেল রিফাতারের ‘ফিকশনাল ট্রুথ’ ইত্যাদিতে। যাহোক খুব মোটা দাগে বললে এই মুহূর্তের ‘ঘটনা’ নিয়ে বক্তব্য প্রকাশ না করলেই তিনি পলাতক, তিনি ‘বিতর্কে জড়াতে চান না’— এই চটজলদি মন্তব্য আমি করতে চাই না। পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য সাহিত্য রচিত হয়েছে, যদিবা তা ইতিহাস আশ্রয়ী হয়ে থাকে, মূল ঘটনার বহু বছর পর; আবার যিনি রচনা করছেন, তিনি হয়তো ঐ ঘটনার সময় জন্মগ্রহণই করেননি, তিনি ছিলেন নিতান্ত শৈশবে। কাজেই স্রষ্টা কখন আক্রান্ত হবেন সৃষ্টিশীলতার জটাজালে, তা আমরা নিশ্চয় দাগ কেটে বলতে পারি না, পারি না কোনো বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে।

তুমি কথাকারের ‘দায়’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছ— এ বিষয়েও নানান যুক্তিতর্ক সম্ভব। দায় কী পার্টির কাছে, নিজের কাছে, সমাজের কাছে, নাকি নতুন সাহিত্যের মেনিফেস্টোর কাছে? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মতো স্বচ্ছ মানুষটিও সংঘবদ্ধতার ঝাঁঝ গ্রহণ করতে পারেননি। আবার যদি তিরিশের-চল্লিশের উত্তাল ভারতবর্ষ দেখি— সাধারণ মানুষের সমান্তরালে নাট্যশিল্পী, গায়ক, কবি, লেখক, চলচ্চিত্রকার সমাজের তাৎক্ষণিক ঘটনায় স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করেছেন, প্রতিবাদ করছেন এবং সত্য-ন্যায়ের পক্ষে জনমত তৈরি করেছেন। এরকম অংশগ্রহণ, ভাষা-আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, স্বাধীনতা আন্দোলন হয়ে, আমরা আমাদের দেশের নানান উত্তাল মুহূর্ত দেখেছি। সংবেদনশীল শিল্পী আমাদের দেশে নানান সময়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, আহত হয়েছেন, এমনকি মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন। এখন সব শিল্পী, সব সংবেদনশীল মানুষ, ব্যক্তিত্বের বিশেষ গঠনের কারণে অন্য মানুষের মতো সমমাত্রায় রাজপথে সোচ্চার বক্তৃতা করার ঘটনা প্রতিষ্ঠা করতে পারে না— এর অর্থ কী পলায়ন বৃত্ততা? হয়তো তাই, আবার সব সময় তা নয়। সত্য-সুন্দরের পক্ষের মানুষ এজরাপাউন্ডের মতো ব্যক্তি নাৎসীদের পক্ষে রেডিওতে বক্তৃতা করার হেতু কী?

ডেভিড থরো’র ‘সিভিল ডিজওবিডয়েন্স’ স্মরণ করুন, আবার অন্যঘটনাও ঘটেছে সারা ইউরোপে। জর্জ অরওয়েল, হিটলারের ভয়ঙ্কর বিস্তার নিয়ে সুপ্রচুর কথা বলেছেন। ‘কমব্যাট’ পত্রিকার হয়ে ক্যামু গুরুত্বপূর্ণ মতামত লিখছেন। স্পেনের আঁধার কালকে মোকাবিলার জন্য পৌঁছেছেন হেমিংওয়ে, লোরকা, হার্নেন্দাজ, নেরুদা, রাফায়েলসহ অজস্র মনীষী-শিল্পী। মায়াকোভোস্কির কবিতা ‘কনভার্সেশান উইদ অ্যা ট্যাক্স কালেক্টর এ্যাবাউট পোয়েট্রি’ যেন বা কম্যুনিস্ট মেনিফেস্টো। সোলঝেনিৎসিন-এর কথা নাই-বা বললাম। ‘স্ট্যালিন-এপিগ্রাম’ লিখে ওসিপ ম্যানডেলস্টান নির্বাসিত হচ্ছেন; বহ বছর পর্যন্ত মিখাইল বুলগাকোভ-এর উপন্যাস ‘দ্য মাস্টার এ্যান্ড মারগারিটা’ প্রকাশে বাধা তৈরি করা হয়। কোরিয়ার সামরিক শাসক পার্ক চুং হিং ১৯৭৫-এ ‘উইন্টার রিপাবলিক’ নামক কবিতা লেখার জন্য একজন স্কুল শিক্ষককে বন্দী করেছেন। এই উদাহরণ— স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধ হয়ে আমাদের ঘর-বাড়ির সোমেনচন্দ, শহীদ সাবের, মাতুব্বর, ১৪ই ডিসেম্বর, হুমায়ুন আজাদ, দীপন ইত্যাদি হয়ে আরো বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত করা যায়। লেখকের এই দায় থেকেই তখন তত্ত্বকথা তৈরি হয়— আমরা বলি রেজিসটেন্স থিয়োরি, বলি রেজিসটেন্স লিটারেচার।

অনুপম হাসান : আপনার মূল্যবান সময় অপচয় করে দীর্ঘক্ষণ আমার সঙ্গে সাহিত্য-শিল্পের বিবিধ বিষয় নিয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন, এজন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

মামুন হুসাইন : তুমি অনেক যত্ন করে, কষ্ট করে আমার গল্প-উপন্যাস কিংবা লেখালেখি নিয়ে কথা বলেছ, তবে গুটিকয় পাঠক ব্যতীত বিপুল সংখ্যক পাঠকের নিকট পৌঁছায়নি আমারা লেখা, এই দীর্ঘ আলোচনার শেষে আমার প্রত্যাশা— লেখাগুলো আমাদের হয়ে উঠুক। আমার লেখালেখির উপদ্রব সহ্য করার জন্য তোমাকেও অনেক ধন্যবাদ।

উ‍ৎস : রাঢ়বঙ্গ

অলঙ্ককরণ : আল নোমান

//জেডএস//

লাইভ

টপ