রুশোর সোশ্যাল কন্ট্রাক্টমানুষ জন্মায় স্বাধীন কিন্তু সর্বত্র শৃঙ্খলিত

Send
জাহেদ সরওয়ার
প্রকাশিত : ০৮:২৩, মে ১৮, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:২৩, মে ১৮, ২০১৮

রুশোর সবচেয়ে বিখ্যাত লাইন ‘মানুষ জন্মায় স্বাধীন হয়ে কিন্তু সে সর্বত্র শৃঙ্খলিত। কেউ কেউ ভাবে সে আর সকলের প্রভু কিন্তু সে জানে না সে অন্য সবার চাইতেও পরাধীন।’ পুরো সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট বইটি এই পরাধীন মানুষের জন্মগত স্বাধীনতার অধিকার বা সাধারণ ইচ্ছা বাসনার অন্বেষণ। তবে বইটি সম্পর্কে অনেক বিখ্যাত চিন্তকেরাই মনে করেছেন বইটি আরো বৈপ্লবিক হতে পারত। যে কয়টা বইকে ফরাসি বিপ্লবের উদ্গাতা মনে করা হয় তার মধ্যে এই বইটিও ছিল। বইটি প্রকাশের কিছুদিন পর নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। নিষিদ্ধ করার কারণ তিনি ক্ষমতাবানদের উলঙ্গ করেছেন। তাদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন করেছেন। শুধু নিষিদ্ধ নয় রুশোকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে।

রুশোর বিখ্যাত ‘সাধারণ ইচ্ছা’কী? এটাই সার্বভৌম। যা রুশোর রাষ্ট্রকল্পের শীর্ষে থাকে। এই বইটাকে রুশোর রাষ্ট্রকল্প বা ইউটোপিয়াও বলা হয়। চারখণ্ডের এই বইটি অনেকগুলো অধ্যায়ে বিভক্ত। এখানে তিনি পরিবার থেকে শুরু করে শাসক, জনতা, রাষ্ট্র ও তার বিভিন্ন টুলস ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করেছেন। প্রয়োজনের ভিত্তিতেই সমাজবন্ধন গড়ে উঠে এই বাস্তবতা রুশো গ্রহণ করেছিলেন। রুশো বলেন, সব ধরনের সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন হচ্ছে পরিবার এবং পরিবারে সন্তানেরা ততক্ষণ পর্যন্তই পিতার অনুগত যতক্ষণ পিতা তাদের রক্ষণাবেক্ষণ করে। আর যখন তাদের এই প্রয়োজন শেষ হয় তখন থেকেই পিতা-পুত্রের এই স্বাভাবিক বন্ধন সমাপ্ত হয়।

রুশোর প্রতিটি বিচারই অত্যন্ত নিষ্ঠুর মনে হতে পারে। কিন্তু সত্য যে কঠিন সেটাতো ইতিমধ্যে আমরা জেনেছি। রুশো মনে করেন সমাজের প্রতিষ্ঠাই হয়েছে শাসিতের মঙ্গলের জন্য। এই শাসিতের যৌথমননকেই তিনি বলেছেন সার্বভৌমত্ব। সেখান থেকেই সমাজ শুরু। সেটাই রুশোর নৈতিকতা। কিন্তু রুশো সন্দেহ পোষণ করেছেন সবসময় যাদেরকে সমাজ শাসনের জন্য নির্বাচিত করা হবে তারা সমাজের সঙ্গে প্রতারণা করবে। রুশোর সতর্ক দৃষ্টি সবসময় তাদের পর্যবেক্ষণ করছে।

তিনি গ্রোটিয়াস, ক্যালিগুলা, হবস ও এরিস্টটলের মতের সমালোচনা করেছেন। যেমন গ্রোটিয়াস বলেছিলেন, মানবজাতি হচ্ছে ভেড়ার পাল। প্রত্যেক দলের অধিনায়ক তাদের সংরক্ষণ করে সুযোগ মতো ভক্ষণ করার জন্য। অন্যদিকে ক্যালিগুলা ও হবসের মতামত অনেক কাছাকাছি তারা বলেন, সাধারণ মানুষ মানুষের পর্যায়ের হলে—রাজন্যবর্গ দেবতার পর্যায়ের, আর রাজন্যবর্গ সাধারণ মানষের পর্যায়ের হলে, সাধারণ মানুষ পশুর পর্যায়ের। আবার এরিস্টটলের বলেন, মানুষের মাঝে কেউ কেউ জন্মগ্রহণ করে দাস হয়ে আর কেউ হুকুম করার জন্যে।তিনি এইসব মতামতকে উড়িয়ে দিয়েছেন। রুশো বলেন এনারা কারণকে কার্যের বা ফলাফলের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন। ক্ষমতা সম্পর্কে রুশো সমালোচনা করেছিলেন যে শক্তি ন্যায়যুক্ত নয় ও বাধ্যবাধকতা দ্বারা ব্যবহৃত হয় না তা ক্ষতিকর হতে পারে। তিনি এই আশঙ্কাও করেছিলেন যে যদি কোনোদিন যা কিছু শক্তিশালী তাই ন্যায়সঙ্গত হয়ে দেখা দেয়। তবে বুঝতে হবে যে কার্য ও কারণ পরস্পর স্থানচ্যুত হয়েছে। তবে এটাতো প্লেটোর রিপাবলিক বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ জুড়েই ছিল যে ন্যায় কী? ন্যায়ই কি শক্তিমানের স্বার্থ? এটারই ধারাবাহিকতায় রুশো বলেন, ক্ষমতাবান যদি শক্তির ভিত্তিতে ন্যায়বান হয়ে দেখা দেন তবে যেকোনো উপায়ে সমাজে ক্ষমতাবান হওয়াটাই হবে মানুষের মুখ্য উদ্দেশ্য। হয়েছেও তাই। আজ যখন আমরা বিশ্বব্যবস্থার দিকে তাকাই তখন কী দেখি? আমরা দেখি ক্ষমতা ও ন্যায় আলাদা হয়ে গেছে। ক্ষমতা যুক্ত হয়েছে ক্যাপিটালের সঙ্গে সেটা অনেক পরে এসে মার্কস বলেছেন, ক্ষমতা এখন ন্যায় তৈরি করে। মিথ্যাকে তার প্রচার যন্ত্র দিয়ে ক্ষমতা এক নিমিষেই সত্যে রূপান্তরিত করছে। ফলে ন্যায় নিয়েই মানুষ এখন দ্বিধান্বিত। এখন যেকোনো শ্রেণির মানুষের মধ্যেই ক্ষমতার প্রতিযোগিতা।

যেহেতু মানুষ সামাজিক জীব। সমাজ জীবনের কিছু অলিখিত নীতির ভিত্তিতেই একজন মানুষের জীবন এগিয়ে যায়। সেহেতু সে কিছু সামাজিক শর্তের কাছে বিনীত থাকবে। তাই বলে যেই নীতির বিষয়ে তার জ্ঞান নাই—সেরকম গড্ডালিকা প্রবাহে নিজেকে ঠেলে দেওয়াও রুশো সমর্থন করেন না। তিনি বলেন, জ্ঞানের দ্বারা প্রণোদিত না হয়ে কোনো কিছু করা হচ্ছে দাস মনোবৃত্তির প্রকাশ। রুশোও সম্পদের ব্যক্তিগত অধিকার বিলোপের পক্ষে। তিনি চান সম্পদ থাকবে সার্বভৌমের হাতে। তিনি তিনটি স্তরে ক্ষমতা কাঠামো দাঁড় করান। প্রথম হচ্ছে সার্বভৌম (জনতার মতামত)। সেই মতামতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা সমাজ সংস্থা (রাষ্ট্র), সেই রাষ্ট্র পরিচালনা করার কর্মচারীবৃন্দের সংগঠন শাসন সংস্থা (সরকার)। তিনি বলেন, সরকারের অন্তর্গত শাসকদের নিছক একটা শক্তি যা সার্বভৌম প্রদত্ত শক্তিতে বলিয়ান হয়ে সার্বভৌমের নামেই জনগণকে শাসন করে থাকে। সার্বভৌম (জনগণ) ইচ্ছা করলে যেকোনো সময়ই সরকারকে সীমাবদ্ধ, সঙ্কুচিত, শোধন ও পুনরুদ্ধার করতে পারে। কারণ, সার্বভৌমের পক্ষে তার ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে বিলিয়ে দেওয়া সমাজের ও সামাজিক উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।

লক্ষ-কোটি জনগণ ব্যক্তিগতভাবে সমাজ চালাতে পারে না। তাই সরকারের দরকার। আবার সরকারও ইচ্ছে মতো আইন প্রণয়ন করতে পারে না। আর যদি তা ঘটে তাহলে সার্বভৌমের মনন আর সরকারের শক্তি পরস্পর-বিরোধী হয়ে উঠবে এবং গোটা সমাজ ব্যবস্থাই অরাজকতার একটা চারণভূমি হয়ে দেখা দেবে। রুশো সতর্ক থাকেন শক্তির ব্যাপারে। কারণ শক্তি নিজেই প্রতিক্রিয়াশীল। সার্বভৌম সেই শক্তি সরকারকে দিলে সরকার যেকোনো সময় হঠকারী হয়ে উঠতে পারে বলে, তিনি সন্দেহ পোষণ করেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সরকার সার্বভৌম প্রদত্ত ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগও পায় প্রচুর আর তাই জনগণকে শাসনাধীনে রাখার জন্য সরকারের যতটুকু প্রয়োজন তার চাইতেও সরকারকে বাগে রাখার জন্য সার্বভৌমকে (জনগণ) অনেক বেশি শক্তির অধিকারী হতে হবে। ... সরকার জনগণের রাষ্ট্রের অন্তর্গত একটা নতুন সংগঠন মাত্র এবং তার অবস্থান সার্বভৌমের ও জনগণের অন্তবর্তী।

এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় নিয়ে রুশো ডিল করেছেন। তিনি বলছেন, রাষ্ট্র সার্বভৌমের। সরকার তারই অন্তর্গত একটা সংগঠন। সরকারকে কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয় জনগণকে পরিচালনা করার জন্য। কিন্তু সেই শক্তিতে সরকার যদি নিজেকে সর্বেসর্বা মনে করে বা নিজের মনগড়া আইনকানুন সৃষ্টি করে তাহলে সেটা আর রাষ্ট্র থাকে না। সেখানে সার্বভৌম জনগণ আর সরকার পরস্পর বিরোধী হয়ে পড়ে। রুশো বলেন, সরকারের হাতে ন্যস্ত ক্ষমতা তা শুধু রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতারই রূপান্তর। কোনো দেশে সরকার যদি সার্বভৌমের দ্বারা প্রণোদিত না হয়ে স্বেচ্ছায় কোনো কাজে রত হয়, তাহলে বুঝতে হবে যে, সে দেশে সামাজিক সকল বন্ধন শিথিল হতে বসেছে। সরকারের মনন যদি সার্বভৌমের মননের চাইতে তৎপর হয়ে উঠে আর তার খায়েশ মিটাতে যদি রাষ্ট্রের সমগ্র শক্তি নিয়োগ করে, তবে বুঝতে হবে যে উক্ত রাষ্ট্রে দুটি সার্বভৌম শক্তির সৃষ্টি হয়েছে। তার একটি বৈধ অন্যটি অবৈধ।

রুশোর সিদ্ধান্ত মোতাবেক সার্বভৌমের ক্ষমতাকে (জনগণের ক্ষমতা) যদি কোনো সরকার নিজের ক্ষমতা হিসাবে ব্যবহার করা শুরু করে তাহলে সেটা অবৈধ, সামাজিক চুক্তির বরখেলাপ। তখন সেই রাষ্ট্র শাসন করবে মিথ্যা ও প্রপাগাণ্ডায় ছেয়ে যাবে প্রচার মাধ্যম। কারণ সরকার তার অবৈধ ক্ষমতা দিয়েই এসব ঢেকে রাখে। রুশো বলেন, প্রতিটি শাসকের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মনন, যার গতি সর্বদাই আত্মস্বার্থ সংরক্ষণে প্রণোদিত। যদি দেখা যায় সমগ্র শাসনভার একই ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রিভূত হয়েছে। তাহলে দেখা যাবে সরকারে শাসকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে কিন্তু সরকার তার কর্তব্যে উদাসীন হয়ে ওঠে। নৈরাজ্য ও অনাচারে ডুবে যাবে রাষ্ট্র। আর সেই শাসক হয়ে উঠবে স্বৈরাচার আর যাত্রা করবে রাজতন্ত্রের দিকে। এর কুফল এই যে তখন সেখানে ব্যক্তিস্বার্থকেই মুখ্য ও জনস্বার্থকে গৌণস্থলে অভিষিক্ত করা হয়।

এত স্বল্প পরিসরে রুশোর বইটি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা সম্ভব নয়। কারণ মানুষের জন্ম থেকে শুরু করে একটা রাষ্ট্রের টোটাল কাঠামো এবং তার প্রতিটি শিরা উপশিরা নিয়ে কাজ করেছেন তিনি।


 

লেখক : কবি ও ভাবুক।

//জেডএস//

লাইভ

টপ