হুমায়ূন আহমেদ নেই, কেমন আছে বাংলা সাহিত্য?

Send
.
প্রকাশিত : ১২:২২, জুলাই ১৯, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:২৮, জুলাই ১৯, ২০১৮

আজ জনপ্রিয় কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের ষষ্ঠ প্রয়াণ দিবস। ‘তার মৃত্যুর পর বাংলা সাহিত্য কেমন আছে বা সাহিত্যে কেমন পরিবর্তন এসেছে’ এমন প্রশ্ন রাখা হয়েছিলো বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ থেকে শুরু করে তরুণ লেখকদের কাছে। গ্রন্থনা করেছেন মনিরুল ইসলাম

 

আল মাহমুদ : আমি অনেকদিন ধরে অসুস্থ। এখন বাইরে কে কি করছে, কেমন বই পড়ছে সে সম্পর্কে আমার ধারণা নেই। আমি আগে হুমায়ূন আহমেদের বই পড়েছি এবং তাদের পাঠকদের দেখেছি। তিনি জনপ্রিয় লেখক ছিলেন এতে সন্দেহ নেই। তবে একজন লেখক বাংলা সাহিত্যে নেই, তাতে বাংলা সাহিত্য বসে থাকবে না। কোনো ভাষার সাহিত্যই কোনো লেখকের মৃত্যুর পর বসে থাকে না। ভাষার নিয়মই হলো পরিবর্তন। আমি মনে করি হুমায়ূন আহমেদের আগে বাংলা সাহিত্য তার যেমন নিজস্ব গতিতে ছিলো এখন তেমনই আছে। লেখকরা শুধু পারেন প্রবাহের মধ্যে ঢুকতে। তবে এটাও সত্য যে, বিভিন্ন সময়ে রবীন্দ্রনাথের মতো মহান লেখকেরা আসেন যারা সাহিত্যের প্রবাহের মধ্যে ঢুকে তাকে আন্দোলিত করার ক্ষমতা রাখেন।

কবি ও কথাশিল্পী

 

হাসান আজিজুল হক : হুমায়ূন আহমেদের কথা বলতে গেলে প্রথমে যে কথাটি বলতে হবে সেটি হলো, সাম্প্রতিক সময়ে তিনি জনপ্রিয়; জনপ্রিয়তম লেখক। এর আগে শরৎচন্দ্র ছিলেন যেমন। তবে আমি মনে করি শরৎচন্দ্র আরও বেশি জনপ্রিয় ছিলেন এবং আছেন। এতো জনপ্রিয় হলে কী হবে, শরৎচন্দ্রের সবকয়টি বইয়ের নাম কিন্তু পাঠকের মনে নেই। বলতে গেলে ‘গৃহদাহ’, ‘পথের দাবী’ ‘দেবদাস’সহ মাত্র কয়েকটি উপন্যাস পাঠকের মুখে মুখে। আমার লক্ষ্য তুলনা করা নয়, আমি বলতে চাই যার স্থান যেখানে তিনি সেখানেই থাকবেন এবং সেটা নির্ধারিত হবে তার কাজের মাধ্যমে। আমাদের সামনে অনেক লেখক উদাহরণ হিসেবে আছেন যারা তাদের সময়ে জনপ্রিয়তা না পেয়েও টেক্সটের কারণে পরবর্তীতে টিকে গেছেন। আবার অনেক লেখক আছেন যারা একসময় জনপ্রিয় ছিলেন কিন্তু তাদেরকে এখন সেভাবে পড়া হয় না। একসময় জনপ্রিয়তার স্রোতে লেখক ভেসে গেলেও সময়ের স্রোতে অনেকেই টিকতে পারেন না। সুতরাং কোন লেখকের প্রভাব কেমন সেটা তার টেক্সটের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে এবং সময় তা বলে দেবে। হুমায়ূন আহমেদ চলে যাওয়ার পর তার জনপ্রিয়তার সেই ক্রমবর্ধমান অবস্থা এখন আর লক্ষ্য করি না। তারপরও আমার মনে হয় তার কিছু লেখা আগামীতে পাঠক পড়বে। বিশেষ করে তার প্রথম দুটি উপন্যাস।

সাহিত্যিক হুমায়ূনের চলে যাওয়া বাংলা সাহিত্যকে কতটুকু প্রভাবিত করেছে সেটা সময় বলতে পারবে, তবে ব্যক্তি হুমায়ূন চলে যাওয়াতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা অবশ্যই পূরণ হবার নয়।

কথাশিল্পী

 

সেলিনা হোসেন : হুমায়ূন আহমেদ যখন নেই, সেই অবস্থায় বাংলা সাহিত্য কেমন আছে সেই প্রশ্ন করাটা কতটুকু যৌক্তিক সেটা আমার প্রশ্ন। কারণ সৈয়দ শামসুল হক যিনি সেই পঞ্চাশের দশক থেকে আমাদের সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে আসছেন তিনিও এখন নেই। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ কিংবা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এখন নেই। একজন নেই সেই একজনের প্রভাব পুরো সাহিত্যের উপরে পড়ে কিনা সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। এটা ঠিক যে হুমায়ূন আহমেদ জনপ্রিয় লেখক ছিলেন। তিনি অনেক পাঠক তৈরি করেছেন ঠিকই কিন্তু ফেসবুকের যুগে, মোবাইল ফোনের যুগে সেই পাঠক বইয়ের সাথে এখন কতটুকু আছে সেটাও ভাববার বিষয়।

কথাশিল্পী

 

আতা সরকার : হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন সাহিত্যপাঠের প্রবেশমুখ। আকর্ষণীয় মনোহর তোরণ। তরুণ ও মহিলাদের সাহিত্য-আকর্ষণের চুম্বক। বই-বিমুখ পাঠকদের ভেতর তিনি সাহিত্য-পাঠের স্পৃহা তৈরি করেছেন। পড়ার তৃষ্ণা ও চাহিদা বাড়িয়ে দিয়েছেন। পাঠাভ্যাস সৃষ্টি করেছেন। এরপর পাঠক বাংলাদেশের বাংলার ও বিশ্বসাহিত্যের মুক্ত আকাশ দেখতে প্রলুব্ধ হয়ে উঠেছে।

আবার তিনি কারো কারো জন্য প্রথম তোরণ হয়েও শেষ তোরণ। হুমায়ূন আহমেদ ছাড়া দিগন্তপ্রসারী সাহিত্যের দিকে তাকাতে তাদের বিবমিষা তৈরি হয়।

এর আগে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক আকবর হোসেন ও রহস্যপুরুষ স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন এমন ধারার কাজ করে গিয়েছেন। এ দেশের সাহিত্যে তারা কালে কালে একজন করেই এসেছেন। কিন্তু আসা প্রয়োজন ছিল ঝাঁকে ঝাঁকে।

তাই হুমায়ূন আহমেদের প্রস্থান এখন ভয়াবহ শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। বই-বাজারে নিশ্চয়ই এটা বড় ধরনের ধাক্কা। কিন্তু সাহিত্যের জন্য নয়। সে তো দিগন্তপ্রসারী। যে পাঠক, তাকে সেখানে পৌঁছতেই হবে।

কথাশিল্পী

 

পাপড়ি রহমান : সাহিত্য চিরকালই সাহিত্যের জায়গায় থাকবে। কোনো লেখকের থাকা বা না-থাকাতে কিইবা আসে যায় বা যাবে সাহিত্যের। সাহিত্য বেগবান নদীর মতো। ফলে এর থমকে দাঁড়াবার কোনো অবকাশ নাই। তবে হুমায়ূন আহমেদের বিপুল পাঠক গোষ্ঠীর পাঠ কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে হয়তো বা। তার বইয়ের সহজপাঠ এই শ্রেণীর পাঠক তৈরিতে সহায়ক হয়েছিল। আমি মনে করি, কোনো লেখকের শূন্যস্থান অন্য লেখক এসে পূর্ণ করতে পারে না। কারণ লেখকের নিজস্বতা বলে একটা বিষয় আছে। তবে এটা এমনও নয় যে, কোনো লেখকের অন্তর্ধানে বাংলাসাহিত্য স্তিমিত হয়ে পড়বে। এই পৃথিবীর মতো সাহিত্যও সদা সঞ্চরণশীল।

কথাশিল্পী

 

মুম রহমান : প্রত্যেক বড় লেখকই তার ভাষায় এবং ভাষার ইতিহাসে একটা অধ্যায়। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র থেকে বনফুল, নিহাররঞ্জন সবারই বাংলা সাহিত্যে একটা নিজস্ব অধ্যায় বা ভূমিকা আছে। তেমন আছে হুমায়ূন আহমেদের। জানা মতে, বাংলা ভাষায় সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক তিনি। এ জনপ্রিয়তা আজকের দিনের অনেকের মতো ফেসবুক বা বুস্টিং কেন্দ্রিক নয়। এটা তো আমাদের স্বচোক্ষে দেখা, হুমায়ূনের বই কিনতে পাঠকের তুমুল আগ্রহ। প্রায় সাড়ে তিনশ বই নিয়ে তিনি একাই একটা সাম্রাজ্য। তার প্রয়াণে প্রকাশনা সংস্থাগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এটা জানি। সাহিত্যে শূন্যতা বলে কিছু নেই। সাহিত্য অসীম মহাশূন্যর মতো। সেখানে শেকসপিয়র, গ্যাটে, রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত অনুপস্থিতি তেমন কোন প্রভাব ফেলে না। লেখকের প্রয়াণ হয়। কিন্তু মহৎ লেখার হয় না। সাহিত্যিক চলে যায়। সাহিত্য থেমে থাকে না। তবে অবস্থান কিংবা বাজার ধরার একটা চেষ্টা থাকেই। হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণে কেউ কেউ বাজার ধরার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু হুমায়ূন একজনই। তার বিকল্প নেই।

অনুবাদক ও কথাশিল্পী

 

হামীম কামরুল হক : মহাভারতের ভীষ্ম তার ভীষণ প্রতিজ্ঞার জন্য যেমন ‘ইচ্ছামৃত্যুর বর’ পেয়েছিলেন, প্রকৃত লেখকমাত্রই তেমন ভীষণ প্রতিজ্ঞা করে থাকেন। তেমন লেখক নিজে না চাইলে কেউ তাকে ধ্বংস করতে পারে না। হুমায়ূন আহমেদের প্রতিজ্ঞা ছিল লেখক হওয়াটাকে বজায় রাখা। সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে তিনি সার্বক্ষণিক লেখক হয়ে উঠেছিলেন। সাহিত্যের নামে নানান পুরস্কার কমিটি, আরো যা যা চলে তিনি সেসব থেকে দূরে ছিলেন বলেই জানি। লেখাটাই ছিল তার আসল কাজ। তিনি যখন লিখতে বসেছেন হাতি দিয়েও তাকে টেনে সরানো যেতো না বলে শুনেছি। হয়ত সেজন্য তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের সাহিত্যের বরপুত্র। তার প্রভাব, বইয়ের কাটতি মৃত্যুর পরও কমেছে বলে মনে হয় না। আগামীতে কী হবে জানি না।

তবে তিনি যে কালের লেখক, সেই কাল এখন আর নেই। যেমন টিভি নাটক লিখে, ঘরে ঘরে জনপ্রিয় হওয়ার উপায় তার ছিল। এটা এখন প্রায় নেই বললেই চলে। এখন হুমায়ূন আহমেদের মতো বিপুল জনপ্রিয় হওয়া সম্ভব নয়। তবে সৃষ্টিশীল লেখক হিসেবে একটা দিক খোলা আছে- ফরাসি বালজাক বা কলম্বিয় গার্সিয়া মার্কেসের মতো জনপ্রিয়তা অর্জন। বাংলা সাহিত্যেও লেখকদের সামনে একটা নজির তো আছেই- শরৎচন্দ্রকে যেভাবে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন তার পরবর্তি প্রজন্মের তিন লেখক- বিভূতি, তারাশঙ্কর ও মানিক, যারা প্রত্যেকে কীর্তিতে শরৎচন্দ্রকে ছাড়িয়ে গেছেন, হুমায়ূন আহমেদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি তেমন ঘটতে পারে। তাকে সামনে রেখে সৃজনশীল লেখকরা তার চেয়েও গুণেমানে অধিকতর প্রতিজ্ঞবদ্ধ লেখক হয়ে উঠতেও পারেন। তিনিই হতে পারেন নবীন লেখকদের বীজতলা।

হুমায়ূন আহমেদ লেখক হিসেবে যে দায়িত্ব পালন করেছেন, যেমন- র‍্যাব নিয়ে লিখেছেন, দিয়েছিলেন ‘তুই রাজাকার’ কথাটি- এসব সমকালীন ইস্যু আমাদের সমাজে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনে ‘তুই রাজাকার’ তলে তলে বীজমন্ত্র হিসেবে কাজ করেছে। তার দায় ছিল এতে। কিন্তু লেখার ভেতর দিয়ে নিজের আনন্দের জগৎ, নিজস্ব ভুবন নির্মাণের যে কৌশল তিনি সফলভাবে সম্পন্ন করেছিলেন, সেটা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। নতুন প্রজন্মের লেখকদের এসব বিষয়ও ভাবতে হবে।

কথাশিল্পী

 

স্বকৃত নোমান : হুমায়ূন আহমেদের ছিল বিশাল একটা পাঠকগোষ্ঠী। তাদের বেশিরভাগই তার বই ছাড়া অন্য কোনো লেখকের বই খুব একটা পড়ত না। পড়তে ভালো লাগত না। কারণ তারা হুমায়ূনের লেখায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তার বই ছাড়াও যে পৃথিবীর মহান মহান সাহিত্যকর্ম রয়েছে, সেসবের প্রতি তারা ছিল উদাসীন। এখন হুমায়ূন আহমেদ নেই। তার নতুন বইও আর প্রকাশ পাচ্ছে না। তাই বলে কি তার পাঠকেরা বই পড়া বাদ দিয়েছে? না, দেয়নি। তাদের পাঠ এখন বহুমাত্রিক হচ্ছে। হুমায়ূন তো তাদেরকে পাঠের নেশা ধরিয়ে দিয়েছেন। এখন তারা চোখ মেলে চারদিকে তাকাচ্ছে। দেশি-বিদেশি গল্প-উপন্যাস পাঠে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এটি ইতিবাচক ব্যাপার। হুমায়ূন আহমেদের লেখায় প্রভাবিত হয়ে হয়ত তার মতো করে কেউ লেখার চেষ্টা করবেন; করছেনও। কিন্তু আমার মনে হয় না তা বেশিদূর এগুবে। কারণ এক নদীতে একবারই স্নান করা যায়। এক বাতাসে একবারই শ্বাস নেওয়া যায়। কেউ যদি হুমায়ূন আহমেদের মতো করে লেখার চেষ্টা করেন, তা হবে রিপিটেশন। রিপিটেড সাহিত্যের আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য থাকে না। তা পরগাছার মতো। তার প্রভাবকে ডিঙিয়ে তার পাঠকরা যদি ভিন্ন ধারার সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে, তার প্রভাবে প্রভাবিত লেখকরা যদি ভিন্ন ধারার সাহিত্যসৃষ্টির প্রতি মনোযোগী হয়, সেটাই হবে তার প্রতি সম্মান। সেখানেই তার স্বার্থকতা।

কথাশিল্পী

 

//জেডএস//

লাইভ

টপ