ডক্টর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের দশম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা

Send
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রকাশিত : ০০:০২, সেপ্টেম্বর ০৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:১৫, সেপ্টেম্বর ০৩, ২০১৮

তাঁর মৃত্যুর পর, তাঁর সহকর্মীদের অনেকেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকা থেকে তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহ বাদ দিয়ে দেন। এমন কী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের প্রকাশনায় ডক্টর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের রচিত গান অন্যের গান হিসেবে মুদ্রিত হতেও দেখা গেছে।

কবি অধ্যাপক ডক্টর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান-এর  দশম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। এই দশ বছরে তিনি চোখের আড়াল হবার সাথে সাথে যেন সবার মনেরও আড়াল হয়ে গেছেন।

অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও প্রাক্তন চেয়ারম্যান, কবি, গীতিকবি, গবেষক, শিক্ষাবিদ, বেতার ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব, ১৯৭২-এ বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও ১৯৮৭ সালে একুশে পদকে ভূষিত ডক্টর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বাংলাদেশের অন্যতম ব্যক্তিত্ব।

১২ টি কাব্যগ্রন্থ ও ৩ টি অনূদিত কাব্যগ্রন্থ সহ তাঁর মোট ৬০ টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। একদিকে তিনি যেমন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কবি, তেমনই আধুনিক গান ও চলচ্চিত্রের গান রচনার ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ গীতিকবি। তাঁর কবিতা ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, পর্তুগিজ, রুশ, কাজাখ, চীনা, জাপানি, কোরিয়ান, হিন্দি ও উর্দু ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

বেতার, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র মিলিয়ে দেড় হাজারের অধিক গীতিকবিতা রচনা করেছেন তিনি, যা বিশিষ্ট সুরস্রষ্টাদের সুরে এবং বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পীদের কণ্ঠে গীত হয়ে, গান হিসেবে সমাদ্রিত ও জনপ্রিয় হয়েছে। এই সব গানের অধিকাংশই ৫০/ ৬০ বছরেরও অধিক কাল ধরে সমান জনপ্রিয় ও সুধীজনের কাছে আদ্রিত হয়ে শতাব্দীকালের দিকে এগিয়ে চলেছে।

এই জ্ঞানতাপস সারা জীবন নিজে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করেছেন। আধুনিক সাহিত্য, বিশেষ করে আধুনিক কবিতার বিষয়, প্রাসঙ্গিকতা ও আঙ্গিক তাঁর গবেষণার মূখ্য বিষয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা একাডেমি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত তাঁর রচিত দশটি ও সম্পাদিত দশটি, মোট কুড়িটি গবেষণাগ্রন্থ দেশে বিদেশে উচ্চ প্রশংসা লাভ করেছে। শুধু নিজের গবেষণাই নয়, তাঁর তত্ত্বাবধানে ৪০ জন গবেষক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেছেন। যে কৃতিত্ব বাংলাদেশে অন্য কোনো গবেষক বা অধ্যাপকের নেই। তিনি লন্ডনের রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন ১৯৬৯ সালে। তিনি বাংলা একাডেমির ফেলো, ইতিহাস সমিতি, ইতিহাস পরিষদ ও এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ-এর জীবন সদস্য।
অথচ, বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই ডক্টর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের নাম শুনলেও তাঁর কর্ম সম্পর্কে বিশেষ ধারণা রাখেন না। বিশেষত, তাঁর অসংখ্য জনপ্রিয় গান এখনো নিয়মিত বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে প্রচারিত হলেও, প্রায়ই রচয়িতা হিসেবে তাঁর নাম অনুচ্চারিত থেকে যায়। বহু ক্ষেত্রে, নতুন প্রজন্ম সেই গানসমূহ অজ্ঞতার কারণে অন্য গীতিকবির নামে বিভিন্ন মাধ্যমে গেয়ে থাকেন। ইউটিউবে তাঁর অধিকাংশ গান অন্যের নামে প্রচারিত হয়ে চলেছে। এ বিষয়ে কারোই কোনো সচেতনতা নেই। তাঁর মৃত্যুর পর, তাঁর সহকর্মীদের অনেকেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকা থেকে তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহ বাদ দিয়ে দেন। এমন কী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের প্রকাশনায় ডক্টর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের রচিত গান অন্যের গান হিসেবে মুদ্রিত হতেও দেখা গেছে।
এই সব বিভ্রান্তি পেরিয়েও একটি প্রত্যাশা মনের কোণে জেগে থাকে, তা হলো বৈরী মানুষেরাও যেমন অমর নন তেমনই অজ্ঞতাও স্থায়ী নয়। ডক্টর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান যে সৃষ্টিসম্ভার রেখে গেছেন, তাকে আড়াল করে রাখা সম্ভব নয়। তিনি যেমন তাঁর জীবদ্দশায় প্রতিষ্ঠিত ছিলেন, সময় তাঁর নিজের প্রয়োজনেই আবার সে প্রতিষ্ঠা ফিরিয়ে দেবে। আমি তাঁর বিদেহী আত্মার প্রতি আমার শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

//জেডএস//

লাইভ

টপ