চেনা সুরের রাগ-রঙ

Send
বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায়
প্রকাশিত : ১৪:১৩, সেপ্টেম্বর ০৫, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৮, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৮

(পর্ব : ৯)

আপাতত আবার ফিরে আসি নজরুলের ‘রাগনামাঙ্কিত গানের প্রসঙ্গে। অর্থাৎ সেই সব গান, যাতে রাগের নামটি কোনোভাবে, আকার ইঙ্গিতে অথবা সুস্পষ্টভাবেই বাণীর মধ্যেই উল্লেখিত আছে।

‘মধুমাধবী সারং’ রাগাশ্রিত এমনি একটি গান- ‘চৈতালী চাঁদিনী রাতে’, এই গানটি আমরা আগেই বলেছি, ‘মধুমাধবী সারং’ বা ‘মধমাদ সারঙ’ রাগাশ্রিত, যার ইঙ্গিতও তার গানটির বাণীতেই আছে। কিন্তু রাগটির যে প্রচলিত রূপ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে পাই, তার সঙ্গে এর যেন ভাবগত কিছু পার্থক্য অনুভব করা যায়। যে বিষয়ে কবিসাহেব যে সম্পূর্ণ রূপেই অবগত ছিলেন এবং যা করেছেন তা যে সচেতনভাবেই করেছেন, সেটা নিশ্চিতভাবেই বোঝা যায়। যখন গানের বাণীটি একটি চৈতালী চাঁদিনী রাতের আবহ রচনা করে। বস্তুতপক্ষে গানটির প্রথম পঙক্তির সুর রাত্রির একটি রাগ, ‘আড়ানা’র সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। কথাটার সত্যতা কতখানি, সেটা পরখ করে নিতে হলে আমি অনুরোধ করব, ‘কনক কনক পায়েল বাজে’ ছায়াছবির সেই অবিস্মরণীয় গানটি শুনুন, যা আসলে একটি দ্রুত খেয়াল, রাগ আড়ানা, শিল্পী, ওস্তাদ আমীর খাঁ। গানটির বাণীর প্রথম পঙক্তিও হলো, ‘কনক কনক পায়েল বাজে’। এই গানটির চলনের সঙ্গে ‘চৈতালী চাঁদিনী রাতে’- গানটির প্রথম পঙক্তি বেশ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু মধমত্ সারংয়ের মধ্যে এই রূপের প্রকাশ আর কোনো শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বাণী বা বন্দিশে প্রকাশিত হতে দেখিনি। মনে হয়, এ একান্তভাবেই নজরুলের নিজস্ব।

তবু, প্রসঙ্গত ‘আড়ানা’র কথা যখন এসেই গেল, এই রাগটির সঙ্গেও আরেকটু পরিচয় করে নেওয়া যাক। আড়ানা রাগাশ্রিত একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘বাণী তব ধায় অনন্ত গগনে লোকে লোকে’। রবীন্দ্রনাথের ‘ভাঙা গান’ পর্যায়ের এই গানটি যে মূল ধ্রুপদটির অনুসরণে রচিত, সেটি হলো- ‘বেণী নিরখত ভুজঙ্গ’, চৌতালে নিবদ্ধ। রবীন্দ্রসঙ্গীতটিও তাই। চৌতাল, ১২ মাত্রার তাল, যা সাধারণত ধ্রুপদেই ব্যবহৃত হয়। এই রবীন্দ্রসঙ্গীতটির রেকর্ড আছে দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে এবং পূর্ণাঙ্গ ধ্রুপদটির রেকর্ড পাবেন, নাসির আমিনুদ্দীন খান ডাগরের কণ্ঠে। আরেকটি ছোট রেকর্ডও আছে; শিল্পী- দেব শঙ্কর দ্বিবেদী। আড়ানা রাগাশ্রিত রবীন্দ্রনাথের আরেকটি গান- ‘মন্দিরে মম কে আসিলে হে’, শুনতে পাবেন সুবিনয় রায়ের কণ্ঠে। গানটি একতালে নিবদ্ধ (১২ মাত্রা)। যে মূল খেয়াল গানের অনুসরণে রবীন্দ্রসঙ্গীতটি সৃষ্টি (সুন্দর লাগ রহি...), সে গানটি পাবেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে। এসব গান এবং তাদের মূল শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি সুন্দর সঙ্কলন প্রকাশ করেছিলেন ‘HMV’। প্রথমে একটি (কিংবা দু’টি, ঠিক মনে নেই) গ্রামোফোন এল.পি-রেকর্ড, পরে ক্যাসেটে এবং তারপরে সি.ডি. হিসেবে সংকলনটি প্রকাশিত হয়। নাম, ‘রূপান্তরী’। অবশ্যই রবীন্দ্রনাথের সমস্ত ভাঙা গান এতে সঙ্কলিত হয়নি, তবু এটি একটি স্মরণীয় সঙ্কলন, তাতে সন্দেহ নেই। প্রসঙ্গত, রবীন্দ্রনাথের ভাঙা গানগুলির প্রতিটির উৎসই কোনো শাস্ত্রীয় গান- এটা ভাবলে ভুল হবে। প্রকৃত পক্ষে শুধু শাস্ত্রীয় সঙ্গীতই নয়, বহু লোকগীতি, এমনকি বিদেশি গানের সুরও তিনি গ্রহণ করেছেন তার গানে এবং এসবই তার ভাঙা গান পর্যায়েই পড়ে।

... যে কথা বলছিলাম। ‘আড়ানা’ রাগটি গভীর রাত্রির রাগ এবং চঞ্চল প্রকৃতির। এই সূত্র ধরে যে রাগটির কথা বিশেষভাবেই মনে পড়ে সে রাগটি, অন্তত নামে, সবার কাছেই খুবই সুপরিচিত। সে রাগটি হলো ‘দরবারী কানাড়া’। অতি গম্ভীর প্রকৃতির এবং করুণ রসের রাগ দরবারী কানাড়া। কিন্তু ‘আড়ানা’ রাগটির সঙ্গে এর একটা নিবিড় যোগসূত্র আছে। কিন্তু সেটা বুঝতে হলে, আগে দরবারী কানাড়া রাগটির সঙ্গে পরিচিত হতে হবে।

আমি প্রথমেই বলব, ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁর গাওয়া দরবারী কানাড়া রাগে আলাপটির কথা। শুনলে মনে হবে, দিগন্ত বিস্তৃত এক নিঃসীম রাত্রির শূন্যতার মধ্যে থেকে যেন উঠে আসছে ইতিহাসের যুগসঞ্চিত কান্না। এক ভাঙা ভগ্ন প্রাসাদের ভেতর থেকে হৃদয় বিদারক সে যন্ত্রণা যেন মুক্তি পেতে চাচ্ছে, কিন্তু পারছে না!...

সে ভাবের সবটা তো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। তা যদি যেত, তবে সঙ্গীতের প্রয়োজনই থাকত না। তাই দরবারী কানাড়ার ভাষা দরবারী কানাড়া- আর কিছুই নয়। ভাষা শুধু তার আভাস দিতে পারে- এই মাত্র। কিন্তু তার পরিপূর্ণ রসাস্বাদন করতে হলে আপনাকে শুনতে হবে এইসব প্রায় বিস্তৃত গানের রেকর্ড। প্রকৃতপক্ষে রাগের প্রকৃত রূপ এখনো শুধু মাত্র সেই পুরোনো কিছু গালার চাকতিতেই ধরা আছে। তাই তারই কাছে নতজানু হতে হবে, নিবিষ্ট হতে হবে। ওই যে পরিত্যক্ত নির্জনে ক্ষুধিত পাষাণের কথা বললাম, তার অন্ধকার অলিন্দের মধ্যে মধ্যে দিয়ে নূপুরের নিক্কন ধ্বনি তুলে যে অশরীরী রমণীর চরণচিহ্ন আবার মহাকালের অর্থহীনতায় হারিয়ে যায়, তার বর্ণনা ভাষায় কি করে দেবো? তাকে চাক্ষুষ করতে হলে আপনাকে শুনতে হবে ওস্তাদ আবদুল করিম খাঁর কণ্ঠে ‘ঝনক্ ঝনক্বা মোরে বিছাওবা’... অবিস্মরণীয় এই গানটি। এই একই গানে আছে পণ্ডিত ভীমসেন যোশীর কণ্ঠেও। ওস্তাদ আলি আকবর খাঁর সরোদেও দরবারী কানাড়া রাগটি শুনুন। ওস্তাদ বিলায়েৎ খাঁর সেতারে দরবারী কানাড়া গৎটিও না শুনলে এক বিস্ময়কর অনুভূতি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবে।

দরবারী কানাড়া রাগে আরো দু’টি বাংলা গানের কথা না বললে, হয়তো আস্বাদন অপূর্ণ থেকে যাবে। একটি হলো নজরুলগীতি- ‘কেন মেঘের ছায়া আজি চাঁদের চোখে’ এবং অন্যটি হলো- ‘আজি নিঝুম রাতে কে বাঁশি বাজায়’। দ্বিতীয় গানটির লেখক কে, তা মনে পড়ছে না। সম্ভবত তুলসী লাহিড়ী, খুব নিশ্চিত নই।

একটা কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন। ‘দরবারী কানাড়া’ রাগটির নাম অনেক সময় শুধুমাত্র ‘দরবারী’ শব্দটি দিয়েই বোঝানো হয়। একে বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই। ‘দরবারী’- শব্দটি আসলে সম্রাট আকবরের দরবারের অনুষঙ্গেই এসেছে। যতদূর মনে হয়, রাগটি মিঞা তানসেনের সৃষ্টি। মিঞা তানসেন ছিলেন সম্রাট আকবরের সভাগায়ক আর তাই তার সৃষ্ট রাগগুলির সঙ্গে কখনো কখনো ‘দরবারী’ আবার কখনো বা ‘মিঞা কী’ অভিধা যুক্ত হয়। যেমন ‘দরবারী টোড়ি’ বা ‘মিঞা কী টোড়ি’, ‘মিঞা কী মল্লা’র, ‘মিঞা কী সারং’, তেমনি ‘দরবারী কানাড়া’। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ‘কানাড়া’ কী?

‘কানাড়া’ আসলে একটি অতিপ্রাচীন রাগের নাম ছিল। অবশ্য একটা পৃথক রাগ হিসেবে ‘কানাড়া’ এখন কমই শোনা যায়, বরং বর্তমানে ‘কানাড়া’ শব্দটির দ্বারা একটি স্বর-সমন্বয়কেই বোঝানো হয়ে থাকে (সমন্বয়টি হলো, জ্ঞমারেসা)। বহু রাগের সঙ্গে এই স্বরসমন্বয়টি যুক্ত হয় এবং সেই রাগে কিছুটা নতুন রসের সঞ্চার করে; যেমন, ধরা যাক, আমরা আলোচনা করেছি কৌশিকী কানাড়া রাগটি সম্পর্কে। এই রাগটি হলো মালকোশ ও কানাড়ার সমন্বয়, অর্থাৎ মালকোশের অবরোহণে ওই স্বরসমন্বয়টি (জ্ঞমারেসা) যুক্ত হয়। সেই কারণেই, ‘কানাড়া’ এখন মূলত একটি ‘অঙ্গ’ হিসেবেই স্বীকৃত, যা অন্য রাগের সঙ্গে যুক্ত হয়। সে দিক থেকে বিচার করলে বাহার, মিঞা মল্লার, সাহানা, আভোগী... এসব রাগই কানাড়া অঙ্গেরই রাগ। তবে ‘কানাড়া’ কথাটা প্রায়ই উহ্যই থাকে। এমনকি বাগেশ্রী রাগটিও আসলে কানাড়া অঙ্গেরই রাগ, যদিও প্রচলিত যে বাগেশ্রী, তার থেকে কিছুটা পৃথক একটি রাগও ‘বাগেশ্রী কানাড়া’ নামে প্রচলিত আছে। তবে ‘বাগেশ্রী কানাড়া’ কোনো পৃথক রাগ হিসেবে ধর্তব্য কিনা, এ নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু আমরা সে বিতর্কে যাব না; বরং আসুন, বাগেশ্রীর রসে ডুব দেওয়ার চেষ্টা করা যাক।

বাগেশ্রী রাগে খুব চেনা গানটি হলো, ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে’। রাজেশ্বরী দত্তের কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীতটি সবাই শুনেছেন। রবীন্দ্রনাথের গল্প অবলম্বনে, তপন সিংহ পরিচালিত ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ ছায়াছবিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গেয়েছিলেন নায়ক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে। ...ওই একই গান।

...পাঞ্জাবের সুস্তা নদীর তীরে এক পরিত্যক্ত জনহীন প্রাসাদে রাত্রির অন্ধকারে নায়ক একা। বঙ্গসন্তান নায়ক স্থানীয় কোনো এক বরিজেব হাটে তুলোর কর সংগ্রহের চাকরি নিয়ে সেখানে গেছেন এবং বসবাসের জন্য নির্জন এই প্রাসাদটিকেই বেছে নিয়েছেন, যদিও, রাতের বেলায় তো দূরের কথা, দিনের বেলাতেও এ প্রাসাদের সান্নিধ্য এড়িয়েই চলেন। স্থানীয় এক পোস্টমাস্টারের ভাষায়, ‘...ওখানে তো লক্ষ লক্ষ প্রেতাত্মা কিলবিল করছে!’...আর এমনিই এক আরবী ক্রীতদাসীর প্রেতাত্মার প্রেমে পড়েছেন নায়ক। প্রতিদিনই যখন গভীর রাত্রির অন্ধকারে আলো-ছায়ার আনাচে জীবন্ত হয়ে ওঠে কত শতাব্দীর প্রাচীন ইতিহাস, তখনই তাদের দেখা হয়, জেগে ওঠে জন্মজন্মান্তরের প্রেম। কখনো বেজে ওঠে পেলব পদপাতে নূপুর-নিক্কন-ধ্বনি, কখনো বা দক্ষ ওস্তাদী কণ্ঠে কোনো চকিত ক্ষিপ্র তান আবার কখনো হৃদয় নিংড়ানো বাগেশ্রীর সুরে শোনা যায় ‘ক্যায়সে কাটে রজনী, আর সজনী... পিয়া বিন মোসে রহু না যায়ে...’ আর এই গানের সঙ্গে সঙ্গেই নায়কের মনে পড়ে যায় বাগেশ্রী রাগাশ্রিত ওই গানটি- ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে...’

ওস্তাদের কণ্ঠটি ছিল আমীর খাঁ সাহেবের। গানটি অবশ্যই শুনুন। এই রাগটির রস অতি হৃদয়গ্রাহী এবং ততধিক করুণ, হৃদয়-বিদারকও বটে। বাগেশ্রী রাগে ওস্তাদ বিসমিল্লা খাঁর সানাইয়ের রেকর্ডটিও শুনুন। এনায়েৎ খাঁর সুরবাহারে বাগেশ্রী রাগে আলাপও অনবদ্য। কণ্ঠ সঙ্গীতে মগুবাঈ কুর্দিকরের গাওয়া খেয়াল গানটি এবং এ কাননের গাওয়া খেয়ালটিও অবিস্মরণীয়। এছাড়াও অজস্র উৎকৃষ্ট রেকর্ড আছে এ রাগে। কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘মাগো চিন্ময়ী রূপ ধ’রে আয়’... গানটিতে বাগেশ্রীর যে রূপ ধরা আছে তাকে মনে রাখলে বাগেশ্রীর ছবি আপনার মনে গাঁথা হয়ে যাবে। এই গানটিও অমর হয়ে আছে জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামীর কণ্ঠে।

বাগেশ্রী এবং রাগেশ্রী- দু’টি শব্দের মধ্যে একটি মাত্র ফুটকির তফাৎ। রাগ দুটিরও মিল যথেষ্টই। তবে তফাৎটা বুঝতে হলে রাগেশ্রী রাগটির সঙ্গে পরিচিত হওয়া দরকার। এই রাগে আধারিত একটি নজরুল গীতির কথা বলি, যার প্রথম পঙক্তিতেই সুকৌশলে রাগের নামটিও দেওয়া আছে- ‘কার অনুরাগে শ্রী-মুখ উজ্জ্বল’... গানটি কারও রেকর্ড আছে কিনা জানা নেই। তবে, এই রাগাশ্রিত সবচাইতে উল্লেখযোগ্য বাংলা গানগুলির মধ্যে ইলাবসুর গাওয়া ‘বনে বনে গাহে কোয়েলিয়া’ নিঃসন্দেহে অন্যতম। গানটি কার লেখা জানি না, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের অনুসরণে একেও ভাঙা গান বলতে পারি অনায়াসেই। মূল গানটির বাণী হলো, ‘বন বন বোলত কোয়েলিয়া...’। এটি একটি খেয়াল। শিল্পী পণ্ডিত নারায়ণ রাও ব্যাস। দু’টি গানের সুরও প্রায় একই। (চলবে)

 

আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন-
চেনা সুরের রাগ-রঙ

 

//জেডএস//

লাইভ

টপ