মা এক বিষণ্ণ নৌকা

Send
আশরাফ জুয়েল
প্রকাশিত : ১৪:১৫, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪২, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৮

এক

শুধু ভাসে, ভাসতে ভাসতে কোথায় যে চলে যায়? পাখি হয়ে ফিরে আসে পুনরায়। পাখি! সেও তো এক নৌকা – মায়ের মতো; উড়তে উড়তে দানা বাঁধে, ফিরেও আসে, এসেই জিজ্ঞেস করে, তোর পশম কই বাবা? আমি তখন আকাশ হই, স্নেহের আঁচল ভর্তি ভ্যাকুয়ামে ঘুড়ি হয়ে যাই। মা, রান্নার অভ্যাসে ঢুকে যায়, তার হাতের তালুতে পৃথিবীর সঞ্চয় জমা হয়, আর আমি বেয়াড়া সুতোর ভঙ্গিতে এসে তার বুকে সেঁটে যাই। আমাদের নদী তখন স্রোতের গন্ধ ভেজা আদরে আমাকে স্তন শেখায়, আমি পুষ্টি হই, অংক ফেল করা ছাত্র; হয়ে উঠি আর্কিমিডিস, কি আশ্চর্য! কাদার স্বার্থে মা হস্তশিল্প, আমাদের, বালিশের ঢেউয়ে পৃথিবী লুকায়, আমি আর মা হয়ে উঠি পরস্পরের সুবর্ণদ্বীপ, আমি আর মা তখন থেকে জাহাজ আঁকি-

দুই

আব্বার অবরুদ্ধ চেহারা ভেসে উঠেছে স্ক্রিনে। আব্বা কাঁদছে। আমি ফোন কেটে দেই। আবার কান্না আসে-  বাতাসের চুল ধরে ভেসে আসে সেই কান্না। আমার হাসি পায়, আব্বা কাঁদতে শিখেছে কবে থেকে? একটা ঘড়ি এসে আমার ঘোরের ভেতর ঝুপ করে নেচে ওঠে। রাত সোয়া বারোটা? আব্বা হোক বা না হোক- একজন মানুষ, যে কোনদিন কেঁদেছে বলে মনে হয় না, সে কাঁদছে- ফোন ফেরাই, আব্বার মতন কেউ একজন কাঁদতে কাঁদতে বলছে, ‘তোর মা আগুনে পুড়ে গেছে।’ আগুন আমার প্রিয়, মায়ের মতন প্রিয়- অতএব দুই প্রিয় জিনিস মাখামাখি খাচ্ছে- আমার আনন্দ উপলব্ধি শবে-বরাত রাতের পটকার শলাকা হয়ে দিক হারায়। কিন্তু আব্বার কান্না যেহেতু আমি কোনদিন শুনিনি, সন্দেহের পোর্টেট আমার দৃষ্টি ক্ষেতে বীজ ফাটা শিশুর হয়ে নাচে।

তিন

মেয়েটি তেরবার বয়স খেয়েছে- তারপর হারিয়ে গেছে। হারিয়ে যাওয়ার সাথে তার তফাৎ ঠিক তের। তার আর বয়স দোল উৎসবে মেতে উঠেনি, বরং কোলের ভেতর ভাসার চেষ্টা করছে আরেক নৌকা। মেয়েটি বন্যা চেনা আরম্ভ করেছিল সবে! এর ভেতরই বাঁধ? হোক, তবু তো উজানে কিছু জমা হচ্ছে। উজান আর মেয়েটি নিজেদের বয়স বাড়াতে লুডুর ঘুঁটি হয়ে যায়- ঘুরতে ঘুরতে ঘরে, ঘুরতে ঘুরতে বাহির, ঘুরতে ঘুরতে পাকা, ঘুরতে ঘুরতে কাঁচা। জোড়া হয়ে হাঁটছে ওরা। পৃথিবী ভাসান দেয়া নুন, মানুষের প্রিয় নুন, গলে যায়, দেহ গলে, দেহ ফোলে- ভেতরে কে যেন হাসছে, খেলছে, কথা বলছে! একুশ হতে না হতেই মেয়েটি মোম-গলা শিখে গেছে। তার সে কি আনন্দ? সে এখন আর বয়সের জন্য লুডু খেলে না। একদিন নিজেকে আবিষ্কার করলাম মেয়েটি আমার গ্রহ, আমি তার আশ্রিত, আমিও নৌকা-  

চার

মা একদিন সমুদ্র টাঙিয়ে আমাকে তাতে ভিজতে দিলেন, আমার জ্বর বকবক করছিল বলে। তখন থেকেই মা সম্পর্কে আমার ধারণা ‘মা’ হয়ে গেছে। এরপর থেকে আমি জীবনের সমস্ত সঞ্চয় শুকিয়ে সমুদ্র দেখতে যাই- পৃথিবীর তামাম দেশের সমুদ্র- দেখতে যাই কথাটা ভুল, আসলে সমুদ্র খুঁজতে যাই, করুণা ছিটিয়ে ফিরে আসি আমি, কোথায় সমুদ্র? শুধু কি কিছু ঢেউকে সযত্নে তুলে এনে সৈকতে আছড়ে ফেলার নাম সমুদ্র? না। মোটেও তা না। তা না বলে আমি পৃথিবীর কোথাও সমুদ্র খুঁজে পাইনি। ঢেউকে ধারণ করতে পারার নাম সমুদ্র। আমি ঢেউ হই, আমি সৈকত হই। ভেতরে ভেতরে নিজের উচ্চতার মাপ নেই, মাপ নিয়ে লজ্জিত হই, আমু বামুন, জন্মদানের ভেতরে নিজেকে ভাঁজ করে লুকিয়ে রাখি, আবার সমুদ্রে ঝাঁপ দেই, পানি শুকিয়ে লবণ, আমি লবণ হয়ে যাই, গলতে গলতে আমি মার কোল ভিজিয়ে ফেলি। পৃথিবীতে একটিও সমুদ্র নেই আমার মা ব্যতীত।

পাঁচ

আমি শেষবারে আব্বার কল এটেন করি। কান্নার কানাগলিতে ঢুঁ মেরে দেখি সত্যি আমার আব্বা কাঁদছে। আমার মা পুড়ে গেছে বলে কাঁদছে না- তার স্ত্রী পুড়ে গেছে বলে কাঁদছে। আমার ভীষণ আনন্দ হয় তখন, আমি হাসতে হাসতে পাথর হয়ে যাই, আমি আব্বাকে বলি, আরও কাঁদুন। আমি আব্বাকে বলি, আমার মায়ের জন্য আপনার কাঁদার প্রয়োজন নেই। কাঁদুন, আপনার কান্না আমার খুব ভালো লাগছে- কাঁদুন প্লিজ, আপনার সন্তানের মা পুড়ছে বলে কাঁদছেন জেনে খুব আনন্দ লাগছে আমার। আব্বা আপনি আরও কাঁদুন, মা পুড়েছে তো কি হয়েছে? আমার মা আজ একজনের স্ত্রী হতে পেরেছে, এই আনন্দে আমি হাসতেই থাকি- পাথর হয়ে যাওয়া আমার হাসি ফেটে অনেক অনেক মা আমার দিকে উড়ে আসতে থাকে...! আমি দুই হাতে কয়েকশো নদী ধরে ভীষণ আনন্দ চিত্তে আমার মায়ের মত একটি নারীর জন্য অপেক্ষা করতে থাকি...

ছয়

নদী খরচ করে ফেলেছি। আমার নদীকে নিলামে তুলেছে পাতি রাজনীতি। ঘি খাওয়া কুত্তার মতো চেহারা নিয়ে রজনীতি শীতের খোপের ভেতর থেকে বের হয়ে সময়কে কামড়ে দিয়েছে। আমার মা, আমাদের মা মরিচের ঝালের কাছে পরাজিত না হওয়া মা, লবণের পরীক্ষা নেয়া মা, ভাতের আন্দাজের কাছে রীতিমত গুরু হয়ে থাকা মা আদরের আগুনে পুড়ছে, হাওয়ায় ভাসছে তার সমস্ত অভিজ্ঞতা, মা আমার পুড়তে পুড়তে আমাকে আড়াল করছে। আমি নাকি রাজনীতি, আমি তবে রাজনীতি? আমি বলি ‘না’। মুহুর্তেই মা বরফ হয়ে যায়, আমি বরফের স্তূপে মুখ ঘষতে ঘষতে ঘোষণা দিয়ে বসি নদীকে ফেরত আনতে আগুনের মুখে আজান তুলে দেব, তুফান আসুক, আমার মা পুড়ছে, পুড়ছে। আমি রীতিবিরুদ্ধ হয়ে যাই। এসো হে নদী, ফিরে এসো বিকল্প নদীর সন্ধান করে লাভ নেই, ফিরে এসো নৌকার তালে, আমরা সবাই স্রোত বেচা খুদ, খুদ, খুদ।

সাত

আকাশ ভেঙে পড়ছে, চারিদিকে ছাই আর চাই। উদ্ধত ভঙ্গিমায় ধোঁয়া আমাদের শাসাচ্ছে। কুঁকড়ে যাওয়া মস্তিষ্কে কারা যেন ঢেলে দিয়ে যাচ্ছে বিধুর বিলাপ। আমি বিলাপ খেয়ে আমার জবান ফোলাচ্ছি, কা কার আব্বা কান্না জানে, কার? হাত তুলুন। হাত নেই কোথায় হাত? কারা জমা নিয়ে গেছে হাত? হাতের তালুতে লুকানো ছিলো মতামত, কারা ফেনলে ডুবিয়ে দিয়েছে আমাদের হাত। মা- মা, আমার নদী, স্রোতের বিকল্পে ভেসে যাওয়া নদী, হাসতে হাসতে পেট্রল খাওয়া মা, তোমার কোল ছুঁড়ে মেরে ওরা হাসছে খিল খিল, শকুনের হাসি? শকুন হাসলে কেমন দেখায় মা? শকুনেরাও তো মা, তবে কেন ওরা ধরা নিয়ে যাচ্ছে রক্ত? রক্তে ওরা নখ রাঙাবে, সামনে উৎসব- সামনে রক্ত উড়ানোর খেলা- আমার আব্বার কান্নাকে ওরা খাঁচাবন্দী করে নিয়ে যাবে বলে গেছে-

আট

মা তুমি বলেছিলে আব্বা একটা কল্পনা। আমার কল্পনা কাঁদছে, তার কান্না নিয়ে বিস্তর ফুটেজ তৈরি হচ্ছে। মজলিস ভরা মাইক, মা- আব্বা কান্নায় আমার কল্পনার শরীরের ভিত নড়ে গেছে। তুমি বলেছিলে আমি নাকি মাঠ ভর্তি ফসল, মা আমি কি তবে কাস্তে হয়ে উঠবো, নিজেই নিজেকে কাটবো? নিজেই নিজেকে ছাঁটবো? নিজেই নিজেকে, আর পারছি না, ওরা আকাশ ওড়াচ্ছে দেদারসে। আমি খুন হয়ে ঢুকে যাবো মা? কিছু বলছ না, পুড়ছ বলে? পুড়ছ বলে, তুমিও নিজেকে সাজাচ্ছো, আব্বার কান্নায় ঢেউ হয়ে ভাসবে বলে? মা, পুড়তে ক্যামন লাগে? পুড়ে পুড়ে চাই হতে? তোমার কসম মা, আমি খুন হবোই, খুন করে খুন ওড়াবো। আমিই ওদের পোড়াবো, কুলিকুচি করব মা। খুব ব্যথা পাচ্ছো মা? জানি তুমু মরতে মরতেও বলবে, দ্যাখ বাবা তোর জন্য ভাপা পিঠা বানানোর জন্য চাল ভিজিয়ে রেখেছি... সময় মতো বাড়ি হয়ে যাস... 

নয়

আগুনের ঘর আগুনের মন আগুনের ছবি পাতা আগুনের নর আগুনের কোণ আগুনের কবি আগুনের ছাতা... মা আমি অধিকের চেয়েও অধিক, তোমার মনে আছে, ভরা মহানন্দায় আমি স্রোত হয়েছিলাম, স্রোতের আগুনে পুড়ে, পুড়ে হয়েছিলাম ঘাম। মা- আব্বার কান্না আকাশ ছুঁয়েছে, আব্বার কান্না আকাশ ছড়িয়ে দৌড়ে আসছে বিনিদ্র টাকার দিকে, মা- আব্বা মাঝি হয়ে গেছে, তুমি ভাবছো আমরা নিরাপদ, মা- আমরাও পুড়ছি, পুড়তে পুড়তে আমাদের ভেতরে ছাইয়ের চর মা- ওই পাখিটা, স্মৃতির সুক্ষ্ণ দানা হয়ে একদিন, তোমাকেও মা- মনে পড়ছে? আরও পুড়ছে তোমার বুক, মুখ, পেট, পুড়ছে তোমার অবয়ব, আবহ পুড়ছে, সঙ্গীত, ছায়া পুড়ছে মা, আকাশ থেকে ঝরে পড়েছে আব্বা। আমি আব্বাকে কেটে দিচ্ছি মা। একটা কুকুর এগিয়ে আসছে আমার দিকে- নব্য কুকুর...

দশ

আমার মায়ের মুখ মানচিত্র হয়ে গেছে। অনেক অনেক শুভেচ্ছা আমাদেরকে বিদ্ধ করছে। আমরা সকলেই একটা মাখনের দ্বীপের দিকে দৌড়ে যাচ্ছি। পথ দস্তানা হয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে দিচ্ছে শেষ বিন্দু। দ্বীপটি হাসতে হাসতে এগিয়ে যাচ্ছে একটি কালো জাহাজের ইশারার দিকে, ইশারাটি দ্বীপটিকে সমুদ্র দেখাতে নিয়ে যাবে, দ্বীপটি ফেনা হয়ে যাবে- ফেনার ওপর নাম উচ্ছ্বাস, মা- নদী পেরুনো নৌকা, মা- এতো বিষণ্ণ পরে আছো ক্যানো? তোমাকে দেখে ভবিষ্যত লাগছে, তোমার ছোঁয়া প্রাচীন পাথরের মুখেও কান্না-ফুল ফোটাচ্ছে। বাতাস আমাদের ঘ্রাণ ধার দিয়েছে। সেখানে পোড়া নিঃশ্বাসের মা মা গন্ধ- তাকে জড়িয়ে ধরেই ঘুম আমাদের আশ্রয়া দেবে, আব্বা এখনও কাঁদছে, আব্বার কান্নার সুর বিক্রি হচ্ছে দেশের হাটবাজারে, অপ্রতিরোধ্য গতিতে অস্বচ্ছ চোখ হয়ে উঠছে আব্বার কান্না। আমিও একদিন... আমার শরীরে হলদে দাগ, আমিও, আমিও পশুত্ব, আমিও অস্বচ্ছও, ওদের পোড়াবো, মাখনের বিছানায় শুয়ে ওরাও গোঙাবে- তখন তুমি রাজপথ, তখন তুমি শক্ত কোমর, পেশীবহুল হাত...

এগারো

কুকুর মশাই আসুন। আমার মাকে বেড়ে রেখেছি সোনার প্লেটে। একটু চেখে যাবেন। তারপর আমার মা আপনার হাত তালি হয়ে ঝুরঝুর করে ঝরবে। আর আমরা বুলেট। বুলেট হবার শখ আমাদের বহুদিনের। বুলেট হয়ে আমরা নিজেরা নিজেদের গাঁথবো। আপনি বেশুমার হাততালি, আমার মা চাপ কল হয়ে আপনার হাত থেকে- বিশ্বাস করুণ, মা না খেয়েই বেরিয়েছিল, মা- তো! তার ঠোঁটের ইশারা আমাদের আয়ু। আসুন কুকুর মশাই, আমাদের আয়ুর ফানুসে কাঠি জ্বেলে দেবেন, আর উড়াল দেখবেন। চাটার সুখ- কুকুর মশাই, মা সারাজীবন আগুনকে শিক্ষা দিয়েছেন, আপনি হালকা ভাবছেন? ছুঁয়ে দেখেন? নিজের আগুনে নিজের হবেন মাটি। একবারের জন্যও মাটি হয়ে দেখতে ইচ্ছে করে না আপনার, মাননীয় কুকুর? আমরা টন টন ঘি প্রস্তুত রাখছি... দেখি কতোটা মাখতে পারেন আপনি, আপনি মাখবেন, লোম ঝরাবেন-

বার

প্রভূত বন্যা হয়ে ভাসছি আমরা। একে অপরের হাত ধরে, বিচ্ছিন্ন, বিপন্ন তুলার বীজ হয়ে। সঙ্ঘবদ্ধ হিসাবের কৌসুলি নিজেকে তসবীর দানা ভেবে অপার আনন্দ পাচ্ছি। শান্ত জলেই খেলে আগুন, বস্তুর প্রতি অন্যায় না করে ক্রমাগত নকশার মজুরী হয়ে- আয়নায় মা বেরিয়ে আসবে আগুনের ফেনা হয়ে। শ্লেষের পুকুরে ভাসতে ভাসতে পৃথিবী  কৌতুক হয়ে যাচ্ছে। মানুষ ইদানীং কৌতুকের গন্ধ নিয়ে ঘরে ফিরছে, কৌতুকের গন্ধ ভালোবাসতে শিখে গেছে মানুষেরা। মা- আমরা দরোজা নিয়ে ঘোরা শিখে গেছি, যখনই তোমাকে দেখতে ইচ্ছে হবে খুলে দেব- আমি- আগুন- বন্যা সবাই ঢুকে পড়ব তোমার আগুনে পোড়া আদরের অরণ্যে। আরেকটা কথা মা- আব্বার কান্না বিক্রি করে প্রাপ্ত সাহস দিয়েই তোমার শূশ্রুষা চলছে। মা- আপনার হারানো সন্তান আজও আপনার জন্য...

তের

বস্তুত ‘শব’-এরও জীবন আছে...

//জেডএস//

লাইভ

টপ