শেখর দেবের কবিতা

Send
.
প্রকাশিত : ১৫:৫৬, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০২, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৮

 

 

আষাঢ়িয়া

অলস সকাল ঘিরে দেবীর চোখের তারা জাগে

ঘোরের ঘুঙুর পায়ে নেচে উঠে মনের মিনার

আষাঢ়ি অমৃত কথা ঝরেছে আকুল হয়ে ধীরে।

পাহাড়ে জাদুর দেশ কেঁপে উঠে সহসা যখন

অজান্তা ইলোরা ঢঙে নাচে শুধু গুহাবাসী মন!

 

ছুঁলেই তোমাকে যদি ফুটে উঠে পাহাড়িয়া ফুল

নেমে আসে চঞ্চল ঝরনা ধারা দারুণ আবহে

ধবল পাখির চোখ পড়ে নেয় প্রেমের গণিত।

ঘাসের জমিন থেকে জাগে কোন উষ্ণ আয়োজন

তখন বৃষ্টির নামে ভিজে যায় পাহাড়িয়া খাঁজ

খুলে যায় অবারিত মায়া নিয়ে মৃত্তিকার ভাঁজ।

 

তিলোত্তমা ফুল হতে গন্ধ আসে গন্ধমের দেশে

বিষহরি অমৃত হরণ দোষে স্বেচ্ছা মনোবাসে

ঘুরে ঘুরে পথের সীমানা খোঁজে কিনারাবিহীন।

অযথা এমন হাল হলো তার কবিতার দেশে

হারায়ে শব্দের তেজ পড়ে থাকে পঙক্তির শেষে

অবিরত বাড়ে শুধু অজানা আনন্দ সীমাহীন।

 

ঠোঁটের এমন হাসি বিজলি লেগে যায় আকাশে

আষাঢ় হেসে হেসে শ্রাবণের গান গায় বাতাসে

বরষার রাগ নিয়ে গান বাঁধে পাখির পালক।

বিরান শহর ঘিরে দোল খায় বাসনা প্রবল

ঘুরে ফিরে নেমে আসে মরমিয়া পাহাড়িকা জল।

 

নদীগর্ভ জল

অঝোর বৃষ্টিতে পাহাড় ধোয়া ঘোলা জল হয়ে বয়ে যাই নদীর স্রোতে। যে নদী তোমার নিকটবর্তী সামগ্রিক বাস্তুসংস্থানে রেখেছে অকপট ভূমিকা। সেই বহতা দেহের ভেতর ঘুরপাক খায় দিনের পর দিন। তোমার পরিত্যক্ত ছোট হয়ে যাওয়া বা ছোটবেলার পোশাকাদি জড়িয়ে রাখে স্রোতের আলিঙ্গনে। প্রকৃতিগত প্রেরণা ও ঘ্রাণের মুগ্ধতায় ডুবি আর ভাসি।

বরষার ছাদে জল টুপটুপ টবে ফুটে থাকা ফুল হয়ে তাকিয়ে থাকি তোমার রিবন্ডিং চুলের দিকে। কৃত্রিমতার ভেতর খুঁজি প্রকৃতির ঘ্রাণ। কখনো ঝরে গেলে সযতনে তুলে গুঁজে দিও চুলে। তোমার বৃষ্টি ধোয়া দেহের জল সুরম্য পাইপ বেয়ে নিচে নেমে আসে, মিশে যায় নদীর শরীরে। নদীটির নাম দিবো দিবো করে কেটে গেলো সহস্র দণ্ড ও পল। নদীটিকে সবাই শঙ্খ নামে ডাকে, অথচ আমি ছাড়া নদীটিকে কেউ চিনে না।

 

প্রিজমের মায়া

কতদূর এগিয়েছি ভেবে

ছিটকে পড়ি চলমান পথের দিশা হতে

খই ফুটে বেরিয়ে আসি খোলার বন্ধন ছেড়ে

মুক্ত মানুষের চেতনায় জ্বালাই যাপনের আলো

অথচ অন্ধকার জ্বলে ওঠে দিগ্বিদিক

দুচোখ খুলে অজানা অন্ধত্বের ভেতর হাঁটি

 

অনিশ্চয়তার ফণা হতে খসে পড়া আঁধার

চারপাশে ঘুরে বেড়ায় যাপনের আলোয়

সময়ের কোলে শুয়ে, কালের স্রোতের ভেতর

নিজেকে ভাসাই স্বাভাবিক উল্লাসে

হতে থাকি ক্রমশ সাধারণ জীবনের বাঁকে

 

আলাদা জীবনের তরে নিজেকে রেখেছি বাজি

ভুলে যেতে থাকি আতশবাজির ফুলকিতে

খোলের ভেতর ঘুরে ঘুরে দুমড়ে মুচড়ে

হয়ে উঠি জীবনের খাবার, ভোগের প্রসাদ!

 

জীবনের পথে মিশে যেতে যেতে

কতদূর এলাম ভেবে স্থির দাঁড়াই

দাঁড়িয়ে থাকি চিরায়ত বিশ্বের ভেতর

শূন্য রেখায় থমকে থাকা নক্ষত্রের স্বভাবে

কে করে ঝরে যাবার নীরব আয়োজন?

ঘনায়মান বর্ষার হাওয়া লাগে তপ্ত জীবনে

অবারিত প্রান্তর ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়

আলোর রেখা হতে খসে পড়ে প্রিজমের মায়া!

 

আলোর ফুল

ক্রমাগত আলোর খোঁজে হাঁটি, কোথাও যেনো জ্বলে আছে আলো। কে যেন টেনে নিয়ে যায় সেই আলোকের দিকে। কোন বর্তিকা হাতে কে যেন আগে আগে হাঁটে, নিয়ে যাবে দূরে। আলোর জন্য দূরের পথিক হতে চেয়েছি। নিরবচ্ছিন্ন অন্ধকারের ভেতর পষ্ঠ আলোর রেখা পথ দেখায়, কখনো-সখনো সেই আলো অনুসরণ করে আমাকে। উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের অবিকল আলোকে পথ দেখাই। অন্ধকার আর আলো যুগপৎ পেছন পেছন যেতে চায়, প্রতিযোগিতায় নামে। অন্ধকারকে আলোর মহিমা বর্ণনা করি, আলোকে বলি অন্ধকারের মাহাত্ম্য। এইভাবে শরীরের অন্ধকার থেকে ঠিকরে পড়ে অজস্র আলোর ফুল। সেই ধবল ফুলের প্রেরণা  নিয়ে পেরিয়ে যাই অন্ধকার।

 

কাপালিক

সারাদিন বিষণ্ণ বৃষ্টির পর গুমট নেমেছে সন্ধ্যা

নাতিদূর দালানেরা খুলে আছে নীরব আলোর চোখ

ক্রমশ মেঘের ভাঁজে জমা অন্ধকার কালো হয়ে আসে।

 

আকাশের পথ ধরে চলে গেছো দূরে, অজানা নগরে

বিগত জন্মে যেখানে পালন করেছি ব্রহ্মচর্য দিন

ঘুরেছি দারুণ কালে দ্বাপরের কালো রাখালের দেশে

তখন অমূল্য ফুল তুমি ফুটে ছিলে গোয়ালার ঘরে

বাতাসে এসেছে সুর ছড়িয়েছিল নীরব অনুরাগ ।

 

ভ্রমরের অবারিত মনে প্রবল গিয়েছি ছুটে কাছে

নিয়মের কঠিন দেয়াল উঠেছিল আমাদের মাঝে

মানবিক টানের ভেতর জয়ী হলো যাপতি করাল।

 

অবশেষে আশা পুষে বুকের ভেতর, পুড়ে গেছি ধীরে

চন্দন কাঠের গন্ধে মিশে গেছি, অতৃপ্ত আত্মার দেশে

সেখানে জেনেছি গিয়ে তোমার প্রাণের প্রভু হয়ে আছি

আড়ালে লুকানো ছিল মমতার অমোঘ বাসনা আর

প্লেটোনিক প্রেম নিয়ে শেষে চলে গেছো চন্দনের বনে।

 

নিয়তির ধরা-বাঁধা নিয়মের মাঝে যুগপৎ এসে

পাহাড়ে বেঁধেছো ঘর, সুরভিত জীবনের আশা নিয়ে

হয়েছি কলির কাপালিক আজ বিগত জন্মের পর।

 

নতুন জন্মের স্বাদ নিয়ে আজ দুজনে এসেছি কাছে

এমন বরষা দিনে দূরেই রয়েছো আশ্রমের ঘরে

অথচ অদূরে আমি জ্বলে আছি সান্ধ্য বাতির শিখায়

জ্বলন্ত আগুন সত্য আরো বেশি ধূপের দারুণ মায়া

তার চেয়ে সত্য আজ গুমট সন্ধ্যার এই আকুলতা!

 


 

পাঠ-প্রতিক্রিয়া :

একই ঘরানার পাঁচটি কবিতা পড়লাম। কবিতা পড়ার যে আনন্দ তার কিছুটা হলেও পেয়েছি। তবে কবিতাগুলোতে ভাবনার দিক থেকে কবির যতটুকু বৈচিত্র্য বা নিজস্বতা আছে; কিংবা তিনি যতটা আধুনিক, সে তুলনায় শব্দ চয়ন বা উপস্থাপনায় ততটা নন। আমার কাছে মনে হয়নি। এদিক থেকে কিছুটা আশাহত হয়েছি বলাই যায়। এদিকে কবি হয়তো “আলোর ফুল” এবং  “নদীগর্ভ জল” কবিতা দুইটির মাধ্যমে নিজেকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে চেয়েছিলেন কিন্তু সেখানেও উপস্থাপনার স্বর অন্য কবিতাগুলোর মতই বলে মনে হয়েছে। তবে সবকিছুর পরেও কবিতাগুলোর মাধ্যমে কবি পাঠককে বৈচিত্র্যের সন্ধানে নিয়ে গিয়ে নতুন কিছু দেখানো পাশাপাশি নিজেরও কিছু উপলব্ধি যে ভাগাভাগি করতে চেয়েছেন, আমি বলবো সে দিক থেকে তিনি অনেকটা সফল। কবিকে শুভেচ্ছা।  

[আমরা গল্প ও কবিতার সঙ্গে পাঠ-প্রতিক্রিয়া জুড়ে দেবার সীদ্ধান্ত নিয়েছি। যিনি পাঠ-প্রতিক্রিয়া লিখবেন তাকে শুরুতে জানতে দেয়া হয় না লেখকের নাম। আবার লেখক কখনোই জানতে পারবেন না পাঠ-প্রতিক্রিয়া কে লিখেছেন।বি.স.]

//জেডএস//

লাইভ

টপ