“আরবি নয়, সংস্কৃত শিখতে চেয়েছিলাম”

Send
আহমদ রফিক
প্রকাশিত : ১৪:০৬, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৭, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৮

আমাকে লিখতে বলা হয়েছে আমার কৈশোর নিয়ে, যখন ক্লাসের বাইরেও আমার বিচরনের একটি ভুবন তৈরি হতে শুরু করেছিলো। এসবের কথা মনে করতে গেলে আমার প্রথম মনে পড়ে স্কুলের কথা। আমি যখন স্কুলে পড়ি, তখন নড়াইল শহরে ছিলাম আমরা। নড়াইলে আমার জীবনের একটি সোনালি যুগ কেটেছে। ১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ছিলাম সেখানে। ৪৭-এ আমি নড়াইল হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরিক্ষা দিয়েছি। মেধা তালিকায় নাম ছিলো। ঐ স্কুলটা ছিলো কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। যা হোক, স্কুল জীবন থেকে দেখেছি পারিবারিকভাবে আমার বড় ভাইয়ের বই পড়ার প্রচুর নেশা ছিলো। সেই সূত্রে আমাদের বাড়িতে প্রচুর পরিমাণে বইয়ের সংগ্রহ ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছি। ধীরে ধীরে বই পড়ার প্রতি আমারও নেশা জন্মে। স্কুলজীবন থেকেই আমার ভেতর দুইটা জিনিস— রাজনীতি এবং সাহিত্য, প্যাশন হিসেবে গ্রো করেছিলো। সাহিত্য মানে তখন বইপড়া। বিচিত্র রকমের বই আমি পেয়েছিলাম বাড়িতে। সেই বই পড়ার সাথে সাথে লেখার ইচ্ছাও আসতে থাকে। বাঙালী সন্তান হিসেবে তারুণ্যে বা অস্ফুট যৌবনে কবিতা লেখেননি এমন বইপ্রেমী লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন। তো আমার শুরুটা এভাবেই হয়েছিলো- কাঁচা কবিতা লেখার মধ্য দিয়ে এবং কিছুসময় প্রবন্ধ লেখার মধ্য দিয়ে। ছাপা হয়েছিলো স্কুলের দেয়াল পত্রিকায়। তবে সে সময়ে আমি যে বই পড়েছি তার মধ্যে প্রাধান্য পেয়েছিল কাজী নজরুল ইসলামের বই।

এর কারণ হলো, তার বিপ্লবী কবিতা। এছাড়া ভারতের স্বাধীনতা একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল সে সময়। তার কবিতা মনের মধ্যে এক ধরণের উদ্দীপনা সৃষ্টিতে বিশাল ভূমিকা পালন করতো। আমি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে মানসিকভাবে নিজেকে যুক্ত করেছিলাম। তবে ঐসময়ে রবীন্দ্রনাথও পড়েছি। ঐ বয়সে আমার পক্ষে খুব কষ্টকর ছিলো রবীন্দ্রনাথের “গোরা” পড়ে শেষ করা এবং সম্পূর্ণরূপে বোঝা। কারণ তত্ত্বের কচকচি কারণেই বোধহয়। তবে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম।

১৯৪৮ সালে মুন্সিগঞ্জ কলেজে যখন আইএসসি পড়ি তখন বিশ্বসাহিত্য, মার্কসবাদী সাহিত্য, এগুলো ব্যাপকভাবে পড়ার সুযোগ হয়। এগুলোর কারণে চিন্তার একটি নতুন দিগন্ত খুলে যায়। লেখালেখিও চলতে থাকে। ১৯৪৯ সালে কলেজ ম্যাগাজিনে কিছু কবিতা ও প্রবন্ধ ছাপা হয়। এ নিয়ে একটি ঘটনা আমার মনে আছে— সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার উপর তাকে হাইলাইটস করে বেশ কড়া একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম। স্কুল ম্যাগাজিনে সেটি ছাপা হয়েছিলো। প্রবন্ধটাতে আবেগের প্রাধান্যও ছিলো। অরবিন্দ পোদ্দার নামক একজন ইংরেজির প্রফেসর ছিলেন যিনি আমার সরাসরি শিক্ষক, উনার অনেকগুলো বইও প্রকাশিত হয়েছিলো আছে পরবর্তীকালে— রবীন্দ্রমানস, বঙ্কিমমানস, মঙ্গল সাহিত্য, মধ্যযুগের সাহিত্য ইত্যাদি নামে। উনার সঙ্গে আমার খুবই ঘনিষ্ঠতা ছিলো। বিকেলে দুজনে একসঙ্গে হাটতাম, উনি একদিন আমাকে কথা প্রসঙ্গে বললেন, তোমার লেখা ভালোই কিন্তু আবেগ খুব বেশী। রোমান্টিসিজম খুবই বেশী। আবেগ এবং রোমান্টিসিজম কিন্তু যুক্তি তর্কের বিপরীত। আমি বললাম, হ্যাঁ, হ্যাঁ স্যার ঠিকই বলেছেন। উনি আমার খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন, উনি কথা প্রসঙ্গে একদিন বললেন, আমি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি পিএইচডি থিসিস সাবমিট করে এসেছি, বঙ্কিমচন্দ্রের উপর।  আগে থেকেই বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ; “বন্দেমাতরম্” সম্পর্কে আমার জানা ছিলো। এরপর আমি বঙ্কিমচন্দ্রের সব ব-ইই পড়ে ফেলি। তাকে আমার প্রতিভাবান লেখক মনে হয়েছে কিন্তু সাথে সাথে মুসলিমবিদ্বেষী ও সাম্প্রদায়িক মনে হয়েছে। এ কথা আমি স্যারকে বললাম, তিনি একমত হয়েছিলেন। তিনি বললেন কিন্তু তোমার এই কথাগুলো সত্যি হলেও থিসিসে যদি আমি এগুলো লিখি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে ডক্টরেট দেবেনা।

যা হোক, কথা প্রসঙ্গে অন্যদিকে চলে গেলাম। পরবর্তী সময়ে যখন আমার প্রথম বই বের হলো, বঙ্কিমকে আমার কাছে মনে হলো মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার বিশ্লেষণটা করলে কেমন হয়। তো আমার প্রথম বইতে সবথেকে বড় যে প্রবন্ধটি ছিলো সেটি ছিলো বঙ্কিমের উপর। ৩২ পৃষ্ঠার। এবং সেটি আবেগ নয়, তথ্য নির্ভর।

আমি আগাপাছতলা একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। দাঙ্গা আমাকে আহত করে, হিন্দু কিংবা মুসলিম যেই হোক, কারো সম্পর্কে একটি অর্বাচীন মন্তব্য করলে আমি ক্ষুব্ধ হই।

ভাষার দিক থেকে বিভক্তি থাকলেও আমি বলি মানুষের মধ্যে কোন বিভক্তি নেই। আমার মনে হয় একমাত্র ধর্মের কারণেই মানুষ সাদা-কালো ছকে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। আমার ধর্ম শ্রেষ্ঠ ধর্ম এটা বলেই একভাবে অন্যদের ছোট করা হয়। কাজেই আমি বলি রবীন্দ্রনাথের সেই কথা, হয়তো মুখ ফসকেই তিনি বলে ফেলেছিলেন : “ধর্মকর্মের থেকে নাস্তিকতা অনেক ভালো”। এটা রবীন্দ্রনাথের কথা হওয়ার কথা নয়। তিনি ১৯৩০ সালে অক্সফোর্ডে লেকচার দিতে গেলেন, বিষয়বস্তু হলো রিলিজিয়ান অফ ম্যান। বাংলায় লিখলেন মানবধর্ম। এবং সেসব জায়গায় বললেন, “মানুষের মনুষ্যত্বই হলো তার ধর্ম। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম, ধর্ম নয়। অন্তত আমার ধর্ম নয়”। তার গীতাঞ্জলী থেকে শুরু করে, গীতিমাল্য, গীতালি এবং নৈবেদ্য’র অংশত, এগুলোতে যে ভক্তিবাদ, সেই ভক্তিবাদ কিন্তু রক্ষণশীল নয়, সেখানে ঈশ্বর মানুষ প্রকৃতি, এক ত্রিভুজের মধ্যে রয়েছে। ঈশ্বরকে তিনি মানুষের পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। তার একটি বিখ্যাত গানের লাইন বলি : “আমায় নইলি ত্রিভুবনেশ্বর/ তোমার প্রেম হতে যে মিছে”।

তো, সাম্প্রদায়িকতার ব্যাপারটাকে দূর করা সম্ভব একমাত্র আমি যদি মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখি- মানবিক চিন্তা, মানবিক চেতনা। রবীন্দ্রনাথ বহু জায়গায় মানবধর্ম, মানবকল্যাণ, মানবপ্রকৃতি প্রভৃতি উল্লেখ করেছেন। এটা ছাড়া আর কোন উপায় নেই সাম্প্রদায়িকতা রোধের। অনেকে বলেন ধর্মকে নমনীয় পর্যায়ে এনে, অর্থাৎ মানুষ হিসেবে মানুষকে গ্রহণ বাদ দিয়েও ধর্মের মৌল সূত্রগুলো মেনেও সাম্প্রদায়িকতা রোধ করা যায়।  কিন্তু আমি তার সাথে একমত নই।

আমার জীবনের একটি ঘটনা বলি, সাম্প্রদায়িকতা সুত্রপাতের জায়গাগুলো বোঝানোর জন্য আমার এই বাস্তব ঘটনা বলা। আমি তখন ম্যাট্রিকের ছাত্র। আমার ম্যাট্রিকে আরবি একটি বিষয় ছিলো। তখন মুসলমানদের জন্য অপশনাল সাবজেক্ট ছিলো তিনটা— আরবি, ফার্সি এবং উর্দু। আর হিন্দুদের জন্য সংস্কৃত। ওদের যেহেতু অপশন নেই সেহেতু ওরা সংস্কৃতই নিতো। আমার যে শিক্ষকরা কাছের ছিলেন তারা সবাই ছিলেন হিন্দু। আমাকে অসম্ভব পছন্দ করতেন। আমি ক্লাসের ফার্স্ট বয়। তো যখন প্রশ্ন উঠলো অপশনাল সাবজেক্ট কি নেওয়া হবে। তখন আমি বললাম, বাংলাটা ভালো করে শেখার জন্য সংস্কৃত নিলেই ভালো হয়। কিন্তু আমার বড় ভাইয়ের কারণে হলোনা। তিনি এমনিতেই খুব উদার। বই পড়া তার নেশা ছিলো। এছাড়া তার বন্ধুদের মধ্যে হিন্দু মুসলমান বাছ-বিচার ছিলো না। এসব সত্ত্বেও তিনি বললেন, না দরকার নেই। আরবি, ফার্সি বা উর্দু যেটাই হোক একটি নাও। যেহেতু ফার্সি এবং উর্দুর ভালো শিক্ষক ছিলেন না সে কারণে আরবি নিয়েছিলাম।

গল্পটা বললাম এই কারণে, যে আমাদেরকে ঐবয়সে এভাবে ভাগ করে দিয়ে আমাদের মানবিক চেতনাকে নষ্ট করা হয়েছে। কাজেই যে কথা বলছিলাম যে— ধর্মকে নমনীয় করেও সাম্প্রদায়িকতা রক্ষা করা সম্ভব নয়। মাওলানা ভাসানী একটি কথা বলেছিলেন: “ধর্মের মৌলিক সূত্রগুলোকে মেনে নিলে আর কোন সমস্যা থাকবে না”। কিন্তু সেই সুযোগ নেই।

আরও একটি ব্যাপার আমাদের মধ্যে ভর করেছে, সেটি হলো ইসলামিক নাম, হিন্দু নাম। এটি সাম্প্রদায়িকতার কারণে প্রসার লাভ করেছে। নাম কি কখনো ইসলামিক কিংবা হিন্দু হয় নাকি। নাম তো ভাষার ব্যাপার। ধর্ম আর ভাষার ব্যাপার তো আলাদা। ধর্ম হলো মৌলিক কাঠামো। আর ভাষা তো সময়ে সময়ে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নভাবে বিকাশ লাভ করেছে। এবং আমাদের এই অঞ্চলের বাইরে নাম নিয়ে এরকম আর মাতামাতি দেখা যায় না। যে বাঙালী, সে বাংলা নাম রাখবে, যে আফগান, সে আফগানি নাম রাখবে, যে জার্মান, সে জার্মান নাম রাখবে। নামের সাথে ভাষার সম্পর্ক। এই বিষয়ে ধর্মের সম্পর্ক চিন্তা করা অযৌক্তিক।

একসময় ষাট দশকের শেষ দিকে বাঙ্গালিয়ানার জোয়ার এসেছিলো এই দেশে। তখন পরিবারে বাংলা নাম রাখার চল শুরু হয়েছিলো। সাইনবোর্ড লেখা হতো সম্পূর্ণ বাংলায়। লুঙ্গী, ধুতি এবং শাড়ি পরার চল বেড়েছিলো। ঐ সময় আবাসনের নাম বাংলা, বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের নাম বাংলা, রাখা হতো। সেসব চেতনা এখন হাওয়ায় উড়ে গেছে।

আবারো ধর্মীয় সংস্কৃতি নামক একটি বিষয় মাথায় চেপে বসে আছে। এই বিষয়টি থেকে মুক্ত না হতে পারলে সেক্যুলার হওয়া অসম্ভব। আমি ইংরেজি সেক্যুলার শব্দটিকে ব্যবহার করি এই কারণে যে, শব্দটির একটি তাৎপর্য আছে।

এর সাথে সাথে আরও একটি ব্যাপার আমাদের মাথা কুড়ে খাচ্ছে, সেটি হলো বাংলার সাথে ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলার অভ্যাস। এটি অহরহ দেখা যাচ্ছে। রেডিও টেলিভিশন এমনকি দৈনন্দিন জীবনে এই বিষয়টি দেখা যাচ্ছে। এটি আমাদের জন্য একটি মারাত্মক সমস্যা। এগুলো এক ধরণের অপসংস্কৃতির অংশ। নিজেদের আভিজাত্য প্রকাশের চেষ্টা থেকে অনেকেই এগুলো করেন। তারাশঙ্কর  বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি নাটক আছে যার নাম দুই পুরুষ। তো ওখানে একটি ডায়লগে নায়ককে বলা হচ্ছে আপনি যখন কথা বলেন খুবই শুদ্ধ বাংলায় বলেন। ইংরেজি বাংলা মেশান না। তখন উনার উত্তর হচ্ছে, দেখো আমি দুটো ভাষা-ই ভালো জানি, এজন্য একটার সাথে আরেকটি মেশে না।

আরও আরেকটি বিষয়, অনেকে মনে করেন ইংরেজি বাংলা মিশিয়ে কথা বললে মানুষকে চমকে দেওয়া যায়।

আমাদের এই ব্যাপারের দিকে লক্ষ্য দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে তরুণদের। বাংলা ভাষাকে টিকিয়ে রাখার জন্য একটি সামগ্রিক আন্দোলন দরকার। সরকারের একার তো কিছু করার নেই। এর জন্য সামাজিকভাবেই একটি বিপ্লব দরকার, যার নেতৃত্ব দেবে তরুণরা। তরুণদের মধ্যে এই বোধ যতদিন না জাগ্রত হবে ততদিন বাংলা ভাষা তার সুস্থ অবস্থা ফিরে পাবে না। যা হোক, স্কুলের কথা বলতে গিয়ে অনেককিছু  লিখে ফেললাম। কৈশোরের গল্প আরেকদিন করা যাবে।

শ্রুতিলিখন : অহ নওরোজ

//জেডএস//

লাইভ

টপ