অপেক্ষার শ্বাসবিরতি

Send
নাহিদা নাহিদ
প্রকাশিত : ১৮:৩৭, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:০৯, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৮

উঁচুনিচু গিরিখাদ বেয়ে নামছি উঠছি। শহরের রাস্তায় নেশাতুর চোখ ঘুমঘুম। বাসে যাত্রী কম। কত অস্থির তক্ষকের সুচতুর খসখসে চাহনি আজ আর গলে গলে পড়ছে না আমার গা-বেয়ে। তবু আমি পুড়ছি গরমে; উষ্ণতার আরাম নয় ভ্যাপসা গরম! তরল আঠালো নুনে আমার রাতকামিজের পিঠ কেটে যাচ্ছে। ভিজেঘাম দখল করে নিয়েছে অন্তর্বাস। পেছনে শুনতে পাচ্ছি অস্থির কোলাহল। লাইসেন্স, লাইসেন্স! কিছু পুরুষহাত কিছু নারীহাত! কিছু শিশুহাত! ড্রাইভার ফোঁসফোঁস করে, কাগজ দেখায়। আমরা এখন ক্যাঙারুর মত লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটছি দ্রুত! আমি চোখ রগড়ে সতেজ করি ঘোলাটে দৃষ্টি। পাশের ভদ্রলোকের প্রয়োজনের তুলনায় হাত অনেক লম্বা। আমি আমার শরীর খুঁজে চিহ্ন দেখি কিছুর। ওই হাত কি ছুঁয়েছিল কোথাও; অথবা আমি ছুঁয়েছিলাম তার কোথাও? আধোঘুম বা তন্দ্রায়? ওপাশের সিটে কমবয়সী ছেলেটা হেডফোন লাগিয়ে গান শুনছে, রুক্ষ নির্দয় মুখ! বাসটা এখন মিরপুর, কল্যাণপুর ছাড়িয়ে শ্যামলি। হেল্পপার হাত-চাপড়ে টিনের দরজায় কিছু একটা বলছে। টিভিতে মিউট করা চ্যানেলের মত আমি দেখে যাই তার গাল মুখ ঠোঁট নড়ার তীব্র অভিব্যক্তি। উসখুস করি। কেন কিছু শুনতে পাই না? আমার হঠাৎ কেমন জানি লাগে। হেল্পার কি খিস্তি করছে আমাকে নিয়ে? অন্তর্বাস দেখা যাচ্ছে কি? বাসের অন্যসব যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে কন্ডাক্টর, ড্রাইভার, হেল্পার এখন আমায় কোন নির্জন স্ট্যান্ডে নিয়ে যাবে না তো? পত্রিকায় দেখি এসব ! অবশ্য ব্যাপারটার রোমাঞ্চকর অংশটা ভাবতে আমার মন্দ লাগছে না৷ লোকটাকে ডেকে আমারই বলতে ইচ্ছে করছে— 'চলুন না ভাই, যাই।' গতরাতেও মাসুদের সাথে ওসব হয়নি। হয়না ওসব নিয়মিত! কন্ডাক্টর ষড়যন্ত্রীর মত গলা-বাড়িয়ে ড্রাইভারের সাথে ফিসফিস করছে। আমি কান পাতি; ওরা কি ব্রিজের ওপর থেকে কোন মানুষ ফেলে এসেছে, অর্ধমৃত অথবা জীবিত মানুষের লাশ? ধর্ষণের পর আমাকেও ওরা ফেলে দেবে না তো? বুড়িগঙ্গা ধলেশ্বরী; ওগুলোতো নদীর নাম। আমার মনে হয় লাশবাহী এম্বুলেন্সের মতো ওখানেও একটা লাশবাহী জাহাজ জরুরি। ওই মুখ ঢেকে রাখা মহিলার কোলের ছেলেটা ঘুমিয়ে আছে কেন? আহা বাচ্চাটার আঙ্গুলগুলো কেমন গোলগোল নরম, কত বয়স ওর? ছয় না আট? আমি জানি জানালার কাচে এই হাত কেটে যাবে অথবা অন্যবাসের ঘঁষায় ছিঁড়ে যাবে কনুই পর্যন্ত। ঠিক যাবে। যাক কাটুক, ছিঁড়ুক। আমার কী! সবাই বলে নিজের চোখে কাঁচা রক্ত দেখলে কেমন একটা নেশা হয়, মাতাল লাগে। রাস্তাঘাটে চলতে গেলে লাগে ওসব। জমে যাওয়া রক্তের রঙ বিশ্রী, গন্ধটাও কুৎসিত, অথচ তাজা রক্ত কেমন নোনতা-মিষ্টি! ড্রাইভারের কোলের কাছে বসে আজ আমি দেখবো সব। হাতের ফাঁকে চুলকে ঘা করে রাখা সেই পুরুষলোকটার হাত এতক্ষণে সজীব হয়েছে। এখন আমার শরীরের অনেক কাছে এসেছে এ হাত। আমার ভালো লাগছে, খপ করে খাঁমচে ধরি হাতটা। আহ্ শান্তি! মনে মনে ভেবে নেই এ লোকটার সাথেই আজ একসাথে মরবো। সাথে মরার জন্য ওই নেশাখোর রুক্ষচুলের ছেলেটাকেও দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করি কিছুক্ষণ। আমার এতসব অঙ্গভঙ্গির মাঝে তাদের কারো ইতিবাচক সাড়া পাই না। বরং হেল্পার আমায় নামিয়ে দেয় জোর করে মাঝরাস্তায়! হেলপারের মেজাজ তিরিক্ষ! গালিও দেয় দু-চারটা। এই যাহ! ভাড়াটাও নেয়নি লোকটা। না নিক। নামিয়ে দিলো তো বেশ, লাগবে না আমার বাস। ফুটপাথ ধরে হেঁটে গেলেই হবে। দুটো সড়ক পরেই তো স্কুল! আমি যেন চিনি না পথ। হাঁদারাম ড্রাইভার। আমি ফুটপাথ ধরে হাঁটি। আল-মদিনা হোটেলে একসাথে দুই চুলায় পরোটা ভাজছে। অনেকদিনের পচে যাওয়া বাসি তেলের পোড়াগন্ধে আমার নাড়িভুঁড়ি কেমন করে! ঘরে গতরাতের স্ন্যাকস ছিল। খেলেই হতো। নেসক্যাফের প্যাকেটটাও খোলা হয়নি। মাসুদ সকালে কফি খায়। আজ সকালে কে ওকে ব্রেকফাস্ট দেবে? সাবু? দিক।

হোটেলটার কোনায় গিয়ে দাঁড়াই। বালতিতে ডিমের খোসার সাথে আঠালো হলুদ রঙ লেগে আছে। ভেতরে আস্ত কোনা খোসা আছে কিনা দেখার জন্য এগিয়ে যাই। রায়ান পুতুলের মুখ আঁকে খোসায়! আশ্চর্য আমার গায়ের জামা কাপড় খুব একটা খারাপ নয়; তবু মানুষজন আমায় কেমন করে দেখছে। আমি যেন পাগল! আমি সরে আসি আবার। অন্যদিনের তুলনায় রাস্তায় আজ পথচারী কম। ছোট ছোট বাচ্চারা প্ল্যাকার্ড হাতে কী যেন বলছে। শ্লোগানের মত কিছু। আমি শুনতে পাই না; অথবা চাই না। ইদানীং অপ্রয়োজনীয় কথার সময় কান বন্ধ রাখার এক অদ্ভুত কৌশল আবিষ্কার করেছি আমি। রাস্তাঘাটে এ কৌশল কাজে দেয়। আমি হোটেল ছাড়িয়ে হাঁটি। মাছবাজারের গলিমুখটা খুঁজি! সকাল সকাল বাজারটায় হুলস্থূল অবস্থা। এ একটা জায়গায় কোন হরতাল নেই, অবরোধ নেই, মিছিল নেই মিটিং নেই। লোকজন সবে ব্যস্ত হয় রোজ। হুড়োহুড়ি লুটোপুটি করে চলে উদরপূর্তির আয়োজনে। বটিহাতে একেকটা কাতলামাছের মাথা আলাদা করছে দুটো ছেলে। পাশে কেটে রাখা কৈমাছগুলো লাফাচ্ছে তিড়িংবিড়িং, আমার হাসি পায়! বোকা মাছ মরে গিয়েও লাফায়! আমার চোখ কৈমাছ থেকেও সরে না। কাতলামাছ থেকেও না। সাবুকে নিয়ে আসবো একদিন বাজারটায়। এ বাজারের মাছগুলো অন্যরকম। একেকটা মাছের অনেকগুলো মাথা! সাবুকে দেখাতে হবে এসব৷ ভেবেই ভাললাগছে সাবু কত বিস্ময়ের সাথে দেখবে মাছের মাথাগুলো। মাছের চোখগুলো নাচতে নাচতে কেমন করে মানুষের চোখ হয়ে যায়!

মাছবাজারের ভিড় আমায় ঠেলতে থাকে। ঠেলতে ঠেলতে কাতলামাছ হলুদ কুসুম পরোটার দোকান পেছনে ফেলে এগিয়ে নিয়ে যায় ফুটপাথের ফলবিতানে। দোকানটায় আজ ভিড় নেই। স্বস্তিতে একটা শ্বাস ফেলি। আঙুর আপেল, মাল্টা, আনারস বসে আছে পাশাপাশি। দোকানির বিক্রি নেই। ওপাশের দোকান থেকে মুণ্ডুহীন লাশের ছবি। ধর্ষিত নারীশরীর, বন্দুক হাতে র‍্যাব আর গরম গরম তেলেভাজা পরোটার মত প্ল্যাকার্ডের খবর বিক্রি হচ্ছে দেদারসে। ওসব রেখে আনরসের চোখা চোখা চোখের কথা ভাবতে ভাবতে আমি পৌঁছে যাই খুঁজতে আসা স্কুলটায়। রায়ানের স্কুল!

—আজ হঠাৎ এলে দিদি? দাদা কোথায়? তুমি একা?

—হু, ঘুমভেঙে গেলো সকাল সকাল।

ললিতার চোখে শঙ্কা, পরক্ষণেই স্বাভাবিক হয়।

—খেয়েছো কিছু?

আমি পেটের ভেতরে হাত রাখি, হাতড়ে দেখি উদর। কোমরের ওপর স্থূল পাকস্থলী নির্জীব। হয়তো খাইনি।

ললিতা জানালার কাচ মোছার ন্যাকড়া খোঁজে। রেজিস্টার খাতা গোছায়। ফাঁকে ফাঁকে আমাকে দেখে। ওর কপাল কুঁচকানো, চোখ বিষণ্ণ। কী হয়েছে ললিতার?

—আজ স্কুল বন্ধ দিদি।

—কেন?

—রাস্তা নিয়ে আন্দোলন হচ্ছে।

—ও, চলে যাবো?

—না বোসো, চা খাবে? এনে দেই

—আচ্ছা

আমি চায়ের অপেক্ষায় বসে থাকি, মাথাটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে। কত চুল ছিল আমার, গতসপ্তাহে মাসুদ কেটে দিয়েছে সব। বলতে গেলে প্রায় ন্যাড়া এখন। আহা আমার এমন সাধের চুল। রায়ান বলতো শ্যামবাবুদের গয়লার মত চুল।

—মাম্মা তোমার চুল চুরি হয় না সেই গোঁফের মত?

—ধুর পাগল হাতের চামড়া চুল দাড়ি গোফ এগুলো কি কেউ চুরি করে? করে না।

কে বললো হয় না। সাবু আন্টি যে বলেন, ওই যে ছড়ার বইটা দিলো ওটায়ও হয়, শুনবে?

 

ব্যস্ত সবাই এদিক-ওদিক করছে ঘোরাঘুরি—

বাবু হাঁকেন, “ওরে আমার গোঁফ গিয়েছে চুরি!”

বুদ্ধুরাম এবার তুইও শোন!

গোঁফ হারানো! আজব কথা! তাও কি হয় সত্যি?

গোঁফজোড়া তো তেমনি আছে, কমেনি একরত্তি।

সবাই তাকে বুঝিয়ে বলে, সামনে ধরে আয়না,

মোটেও গোঁফ হয়নি চুরি, কক্ষনো তা হয় না।”

 

—বুঝলি পাকাছেলে এটা আমার কথা না; তোর রায়বাবুরই কথা।

ললিতা আড়চোখে আমাকে দেখছে; আমিও আড়াল থেকে দেখছি ওকে। মেয়েটার গায়ের রঙ ময়লা। হাসলে গালের কালো চামড়া ভেদ করে বের হয়ে যায় হলুদ দাঁতের গোড়া। অথচ কত সুন্দর সে, কত মায়া ''ইচ্ছে করে এই ললিতার গোঁফ ধরে খুব নাচি,

মুখ্যুগুলোর মুণ্ডু ধরে কোদাল দিয়ে চাঁচি। হা হা হা।”

আমার ব্যাগের ভেতর মৌমাছির মত কিছু একটা গুনগুন করছে, করুক! শব্দকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা আমার অনেক আগেই হয়েছে, আমি ললিতার চায়ের অপেক্ষা না করে যাত্রী ছাউনির খোঁজে রাস্তার দিকে হাঁটি। বিআরটিসির কাউন্টারের পাশে সিমেন্টের বেঞ্চ পুরোটা ফাঁকা । একটা বাসি পেপার পড়ে ছিল নিচে, তুলে নেই। প্রথম পাতায় সারি সারি ইউনিফর্ম পরা বাচ্চার ছবি, আমি রায়ানকে খুঁজি,ওর স্কুল ব্যাগ লাল। ওয়াটার বটল নীল। ছাউনির বেঞ্চে পা-তুলে বসি। ঝিমুনি লাগে আবার। পেপারের ময়লা সরিয়ে মুখের ওপর ধরে রাখি। লাল ছাতার নিচের ছেলেটা আজকে আসবে নিশ্চই। ওর ঘাড়টা বেঁকে গেলে ঠিক রায়ানের মত লাগে! সমস্যা একটা; ছেলেটা কথা বলে খুব কম। অথচ ওর কণ্ঠ রিনরিনে— ঠিক রায়ানের মত!

—আমার তৃষ্ণা পায়— পানির জন্য ব্যাগ হাতড়াই। নেই। তৃষ্ণার্ত চোখে চেয়ে থাকি লাল-বাসের কাউন্টারের দিকে। কোথায় গেলো আমার সেই আদুরে সকাল—

 —মাম্মা লেডিসফিঙ্গার কী?

—ঢেঁড়স

—নো মাম্মা ইউ রং। ইটস মে বি কুমড়ো অর পটল

—ওহ ইয়াপ! ইফ ইজ ইট জাস্ট কিডিং দেন ম্যাঙ্গো উড বি চালতা অর কামরাঙ্গা!

—ওহ নো মাম্মা ইউ নটি, ইউ কিডিং।

—সায়ান সকাল সকাল বানিয়ে বানিয়ে আর কোন কথা না, হারি আপ, তোমাকে ড্রপ করে আমি অফিস যাবো। এমনিতেই সাতমিনিট লেট আজ।

—ওহ নো মম, আই হ্যাব আ সিঙেল আসকিং, প্লিজ

—নো মোর

—মাম্মা প্লিজ তুমি কি বলতে পারবে— সুইটহার্ট মানে কী? সাবু আন্টি এটা বলেন আমায়। এটা কি লভ বা এফেয়ার হওয়ার মত কিছু?

—সায়ান, পাকামি করো না তো। ইংলিশ এডাল্ট মুভি দেখতে শুরু করেছো মনে হচ্ছে। ইটস ভেরি ব্যাড।

—ইজ ইট মিন ডারলিং, দ্যাট মিনস এজ লাইক সাবু আন্টি।

—রায়ান চুপ করবা?

—আম্মু সি ইজ টোটালি অ্যা কিউট পাই, ওহ গড সাবেরা আন্টি ইজ সো সুইট। মাই ডার্লিং। বাট ইউ ভেম্পায়ার! ইয়া লম্বা দাঁত। ভয়ংকর!

একটা লোক এসে আমার হাত ঝাঁকায় পেটমোটা অফিসগোয়িং লোকটা আমার ঘোর কাটিয়ে দেয়। আজব! কে লোকটা? আমাকে দেখে কপাল কুঁচকে বিস্ময়ে হতবাক সে।

—ভাবী! আপনি এখানে কেন? এই অবস্থায়!

—কোন অবস্থা? আমি আমাকে দেখি। বেশতো। পরনে লম্বা ঝোলা কামিজ। নিচে প্যাটিকোট। ওহ পায়ে স্যান্ডেল। হাতে ঘড়ি থাকলে এ পোশাকে আমি অফিসেও যেতে পারতাম। যদিও গত তিনমাস ধরে আমাকে চাকরিতে যেতে হচ্ছে না। মাসুদ একাই যায়।

—আমি রায়ানকে নিতে এসেছি, রডড্রেনডন পাশেই। ও এবার স্ট্যান্ডার্ড ফোর।

লোকটা হাতের সেলফোন টিপে কাকে যেন ফোন দেয়, দিক। বারোটা বাজে সায়ানের টিফিন! তার আগে আগে আমাকে পৌঁছুতে হবে স্কুলে। আচ্ছা ওকে আজ আমি টিফিনে কী দিয়েছিলাম? পাউরুটি, জেলি, আমলেট? কী জানি; মনে নেই!

লোকটা ঘড়ি দেখে ঘনঘন। সূর্য মাথার ওপরে, আমি সরে যেতে চাই। লোকটা আমায় পালাতে দিচ্ছে না, পিছু নেয়। আমি উঠে গিয়ে হনহন করে হাঁটতে থাকি। আজব তো! আমি যেখানে যাই; লোকটাও সেখানে যায়। আসাদগেটের ভেতরদিকে গেলে একটা সরু রাস্তা! রাস্তার পাশে একটা মাঠ, আমি বাসি পেপারটা বিছিয়ে হাত পা ছড়িয়ে মাঠে বসি। লোকটা পাশে দাঁড়িয়ে থাকে বিরক্ত হয়ে। কিছু সময় পর ছোট একটা সাদা গাড়ি এসে থামে। আমি জানি, গাড়ির দরজা খুলে এখন মাসুদ নামবে। রায়ানের আব্বু। মাসুদকে সাবুর খুব পছন্দ ছিল। যতটা না ওর কল্যাণে; তারচেয়ে বেশি মাসুদের ছেলে রায়ানের কল্যাণে। মাসুদ- রায়ান-রাবু, মাসুদ- রায়ান-সাবু। কোন প্যাকেজটা সুন্দর? আমার হাসি পায়। হিহিহি।

—রাবু তুই কি জানিস; তোর ছেলের চাউমিন কত পছন্দ,

—হু জানি তো!

—উহু জানিস না, তোর সময় নেই ছেলে দেখার। এই দেখ!

সাবু ওর ফোন থেকে গতকালকের চেকইনের একটা ভিডিও দেখায়, সেখানে সায়ান গপগপ করে চাউমিন খাচ্ছে। একেবারে দৈত্য!

—দেখ রাবু কী সুইট ছেলে। দেখ! আহা! কেমন করে হাভাতের মত খাচ্চে ছেলেটা। তুই একটা ডাইনি মা, আমি চলে গেলেও রোজ ওকে চাউমিন করে খাওয়াবি৷ আহা বাচ্চার শার্ট আর কলার মেখে যাচ্ছে সসে, নাকে মুখে নুডুলস লেগে একদম ছেড়াবেড়া অবস্থা করছে আহা। মাথাটা দেখেছিস? মনে হচ্ছে না পপাইয়ের ডল!

—চুপ সাবু। আবার তুই আমার ছেলেকে প্রভোক করে স্কুল পালিয়েছিস। শার্ট নষ্ট করেছিস ওর। বজ্জাত মেয়েছেলে!

—করেছিতো করেছি। আরো করবো! রাবু প্লিজ তোর ছেলেটাকে আমায় দিয়ে দে প্লিজ, তোরতো একটা মাসুদভট্টি আছে, বছর বছর রায়ান নিতে পারবি, আমায় দিয়ে দে না এই চাউমিনখোর মাস্টার পিস।

—খবরদার রায়ানের ওপর তোর শকুনি আন্টির দৃষ্টি দিবি না, আহ্লাদ দিবি না। একদম বখে যাবে। মাসুদ ভট্টিকে দরকার নিয়ে যা। তোর আর আমার নামতো কাছাকাছি সাবু, রাবু। ওর একটা হলেই চলবে।

—হা হা হা যা বলেছিস আমি নেবো তোর ভট্টি সাহেবকে? হাহ্ সে ভাগ্যি কি আছে মোর সখি।

—আচ্ছা সত্যি করে বলতো! তোদের মধ্যে প্রেম-ট্রেম চলছে নাতো! আই মিন-- আমাকে লুকিয়ে পরকীয়া! তোর চোখমুখ যেন কেমন! যথেষ্ট সন্দেহজনক।

—হুহ সন্দেহ, তোর ন্যাদা বর। বড় হয়নি এখনো।

—কী বললি? ফাজিল এখানেও প্রভোকিং। তোর প্রজেক্ট শেষ করে দ্রুত আমার বাসা থেকে ফোট। তোর বাছবিচার নাই।

—নেই কথা সত্য, কিন্তু ভট্টির কাছে পাত্তা পাওয়া লাগবে তো, সে তো ফিরেও দেখে না সই! তুই-ই নাকি তার রাই কিশোরি। হা হা হা। না হয় আমার কি থাকতো না এমন একডজন গুলতু গালতু রায়ান!

সাবু কথার ফাঁকে ফাঁকে সায়ানকে কাতুকুতু দিয়ে হাসায়, আমি সাবুর কবল থেকে সায়ানকে উঠিয়ে দেই ,সরে যেতে যেতে রায়ান হেসেই যায়, হেসেই যায়, আমার মাথায় বাজতে থাকে সে হাসির রিনরিনে শব্দ।

মাসুদ এখন সেই ভূড়িওয়ালা কেজো লোকটার সাথে কথা বলছে। আমি মাঠের ঘাস ছিঁড়ছি। কচি কচি পাতার ঘাস। ঘাসগুলো জমা করে দেখছি, সবুজ রঙ; সবুজ রায়ানের পছন্দ!

—ভাবীকে ভালোকোথাও নিয়ে যাওয়া যায় না মাসুদ? সেখানে কেয়ার-টেয়ার পেত। এখানে কিইবা ট্রিটমেন্ট কিবা সিকিউরিটি!

—কিছু করার নেই, এশহর ছেড়ে ওকে অন্যকোথাও নিয়ে যাওয়া সম্ভব না। শতহলেও মা তো!

আর শহর! গত পরশুও এক স্কুলের তিনটে বাচ্চা মারা গেলো। একদম পিষে দিল গাড়িটা। বাচ্চাগুলো মরে পড়ে রইলো রাস্তায়।—ওদের মা বাবা ছিল পাশে?

—নাহ, আর এখানে থাকলেই কী; না থাকলেই বা কী! এসব কথা থাক। কাজের কথা হলো ভাবির এভাবে হুটহাট বাইরে চলে আসাটা বন্ধ করতে হবে। জানিস কেমন করে বসে ছিল যাত্রী ছাউনির তলায়! কেমন তার চোখ! প্লিজ দোস্ত মাইন্ড করিস না। ভাবীকে আটকে রাখ বাসায়। প্রয়োজনে বেঁধে রাখ।

—সিকিউরিটি গার্ডের নজর এড়িয়ে আজ বাইরে এলো কীভাবে জানি না। আর তাছাড়া রাবুর যে পার্সোনালিটি; তাতে করে ওকে প্রেশারাইজডও করতে পারছি না! কোন মানুষের সঙ্গও বেশিক্ষণ নিতে পারে না। যা-ই করি হিতে বিপরীত হয়। অলরেডি এট এ টু টাইমস সি ইজ ট্রাইং টু ডুয়িং সুইসাইড।—ওহ তাহলে তো বিপদ। আচ্ছা ওই মেয়েটা কোথায়? তোর বাসার পেইন গেস্ট না যেন কী! সাবেরাই তো নাম নাকি?—হু। ও আছে কোনরকম, ট্রিটমেন্টের জন্য ওকে কানাডায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে আবার।—উন্নতি হয়েছে কিছু?

—একটু আধটু কথা বলতে পারে। ও কোথায় কোথায় যেন মামলা করবে বলছে, কী হবে আর এসব করে বল?

—এদেশে সবই সম্ভবরে মাসুদ, সব সম্ভব! ভাবীকেও তুই বাইরে পাঠিয়ে দে।

—মাসুদের মুখ নিচু হয়ে যায়, ওই কেজো লোকের দীর্ঘশ্বাসে মাসুদের জামার ভাঁজ গলে যায়, তবু সাদাজামা ঝকঝক করে রোদের তেজে, মাসুদ এখন অফিসে যাবে তবুও ওকে অফিস করতে হয়। লোকটার গলা ধরা, মাসুদ নরম!—আবার বলছি ভাবীকে হুটহাট ছেড়ে দিস না, দেখে রাখিস। আজ না হয় আমার চোখে পড়লো, আগামীকাল?

মাসুদ সম্মতির মাথা নাড়ায়। লোকটা বিদায় নিয়েও দাঁড়িয়ে থাকে। মাসুদ পরম মমতায় আমার হাত ধরে আলগোছে, এতক্ষণে ওর চোখের কোণে চিকচিক করছে পানি, ওপাশের লোকটার চোখ ভেজা!

—রাবু বাসায় চল, তুমি জানো আজকের সকালটা আমার কেমন কেটেছে। দরজা হাট করে খুলে কেউ এভাবে পালায়? ফোনও তুলছ না, কেমন লাগে বলো?

—পালাইনিতো মাসুদ। রায়ানকে নিতে এসেছিলাম। নিয়ে যাই? ও আজ চাউমিন খেতে চেয়েছে। এই দেখো আমি ঢাকার সব রেস্তোরাঁর লিস্ট নিয়ে এসেছি, লাইলাতি, মিডনাইট সান, ওয়াংবিন,

—রাবু প্লিজ বোঝার চেষ্টা করো, এমন করছো কেন?

—আচ্ছা বুঝবনে। এবার বলো রায়ানের জন্য এবছর একটা নতুন রেইনকোট কেনার কথা ছিল তোমার, কিনেছো?

—হু কিনেছি, সব কিনেছি, সব রেখেছি বাসায়, চলো এবার লক্ষী। এখানে আর লোক জমায়েত করো না প্লিজ।

—উহু জমায়েত করবো না। রাস্তায় এমনিতেই কত জমায়েত, কত পোস্টার! আমি বাসায়ই যাবো, যাবতো বলেছি। ফ্রিজ ভর্তি করে রাখবো লেডিস ফিঙ্গার। রায়ানের জন্য রাওলিংয়ের বই নিয়ে যাবো, কি যেন নাম ওই সিরিজের একটার? মনে পড়েছে 'হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ডেথলি হ্যালোস, চিপসের প্যাকেট নেবো, নতুন ব্রাশ নেবো, বাটায় একটা নতুন স্যান্ডেল এসেছে ওটাও নেবো। সবুজ রঙের ওয়াটার বটল খুঁজবো আমি। মাসুদ আমরা আজ আবার পিৎজাহাটে যাই, নভোথিয়েটারের টিকেট করে আনি, ছেলেটা খুশি হবে খুব। চলো না যাই। ছেলেটা ঘুরতে, খেতে কত পছন্দ করে।

—রাবু চলো

—যাবো তো যাব! আচ্ছা, তুমি আর আমি সময়ই পাই না কেন? ওর ব্যস্ত বাবা-মা নিয়ে রায়ানের কত অভিমান!

—সব করবো রাবু; সব করবো! তুমি বাসায় চলো!

—বাসায় গিয়ে কী করবো? বাসার সব খারাপ। ফ্রিজ আলমারি কিচেন সব। সবচেয়ে খারাপ টিভিটা। ওটা কিন্তু তুমি খুলে ফেলবে। আমি আর দেখবো না ওটা। দেখবোই না। ওই টিভিটা ভয়ঙ্কর, একদম খারাপ টিভি। ওখানে বড়বড় গাড়ির চাপায় চেপ্টে যাওয়া ছোটছোট বাচ্চাদের দেখায়। ওটা আর আমি দেখবো না। শিমুলফুল জবাফুল কত সুন্দর; অথচ রাস্তাজুড়ে থকথকে লালকে কত কুৎসিত করে দেখায় ওরা।

—রাবু চুপ

—না চুপ না সাবুতো বেঁচেই গেলো । আমার ছেলেটা বাঁচলো না কেন? কেন থেঁতলে গেলো দানব চাকায়। ও কেন মরে গেল, কেন মরলো বলো। তুমি আমি সাবু আমরা কেন শ্বাস নেই এখনো?

—দেখো একদিন সব ঠিক হবে রাবু সব! সময় ভুলিয়ে দেয় সব।

—হু হু আমি জানি সব ভুলে যাবো।এখনি ভুলে গেছি আমার রায়ান মরে গেছে। আমিতো জানি রায়ান বেঁচে আছে নিশ্চই বেঁচে আছে। চলো না মাসুদ! তুমি আর আমি একটু ভালো করে খুঁজে দেখি। ওর স্কুলে যাই চলো! ওয়ান্ডার ল্যান্ডে যাই। রাস্তায় দেখেছি প্ল্যাকার্ড হাতে কত ছোট্ট সোনারা দাঁড়িয়ে আছে। কত কী বলছে, নিরাপদ সড়কচাই। চল যাই ওখানে। চল না চল।

মাসুদ কথা শোনে না আমার। টানতে টানতে নিয়ে যায় কোথাও, মাসুদের হাত শক্ত। শক্তটানে কখন যেন আমি মাসুদের বুকের কাছে চলে যাই; টের পাই না। ও একহাতে জড়িয়ে রাখে আমায়, অন্যহাতে খোঁজে লাইসেন্স। গাড়ির ভেতর জায়গা অনেক ফাঁকা। রায়ানের পছন্দের একটাও মিউজিক বাজছে না। না বাজুক আমি মাসুদের কানের কাছে মুখ রেখে গুনগুন করে গোঁফচুরিটা আওড়ে যাই

“হেড অফিসের বড়বাবু লোকটি বড় শান্ত,

তার যে এমন মাথার ব্যামো কেউ কখনো জানত?

দিব্যি ছিলেন খোসমেজাজে চেয়ারখানি চেপে,

একলা বসে ঝিমঝিমিয়ে হঠাৎ গেলেন ক্ষেপে!”

 এর পরের লাইন কী?

আমার কানের ভেতর রায়ান খিলখিল করে হাসে।

“ব্যস্ত সবাই এদিক-ওদিক করছে ঘোরাঘুরি—

বাবু হাঁকেন, ‘ওরে আমার পোস্টারটা কোথায় গেলো চুরি!’”

এখানে আবার পোস্টারের কথা এলো কেন? কেন এল? কেন ভাববো আমি পোস্টারের কথা! বারান্দার টবে রায়ান নিজ হাতে একদিন একটা গাছ লাগিয়েছিল, কামরাঙা গাছ। আমি এখন গাছটার কথা ভাববো, আমি জানি ওই গাছটায় একদিন ফল হবে। ডালেডালে ফুটবে ছোটফুল, সাদাফুল। গোলাপি ফুল। ছোট দানাদানা দুধফুল। ফুটবেই একদিন!


 

নাম না জানা একটি গল্পপাঠ ও পাঠ-প্রতিক্রিয়া :

সম্পাদক মহাশয় লেখকের নাম এবং গল্পের নাম উহ্য রেখে গল্পটি পাঠিয়েছেন পাঠশেষে পাঠ প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য। তার ধারণা এতে লেখকের নামপ্রভাবমুক্ত থেকে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে সুবিধা হবে। তার ধারণার সাথে দ্বিমত পোষণ না করেও বলছি বর্তমান সময়ের গল্পকারদের সাথে আমার চেনা-জানার গণ্ডিটা এতো ক্ষুদ্র যে, নাম দেয়া থাকলেও হয়ত তেমন সুবিধা কিংবা অসুবিধা হতো না। এবং শব্দ সংখ্যাও মোটামুটি বেঁধে দিয়েছেন দুইশতে। ফলে মাথায় একটা অযাচিত তাড়াহুড়া হয়ত থেকে যাবে। যাহোক এবার শুরু করা যাক—

এক কথায় বলি, গল্পটা ভালো লেগেছে। কেন ভালো লেগেছে সেটাই ব্যক্ত করতে চাই— প্রথমত গল্পের চরিত্রের সাথে এবং বিষয়ের সাথে গল্পের ভাষা শৈলীর সামঞ্জস্যতা। গল্পটা একজন আধুনিক মায়ের। একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নারীর। যে-কিনা তার একমাত্র ফুটফুটে ছেলের সড়ক দুর্ঘটনায় মরে যাওয়া মেনে নিতে পারেন না। ফলে তার মস্তিষ্কের যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সেটা অনেকটা ভারসাম্যহীন। এই ভারসাম্যহীন রাবুর মুখে যখন লেখক বয়ান করেন আমাদের চারপাশকে, ইট-পাথরের শহরকে, প্রতিদিনের ক্ষয়িত সময়কে, তখন লেখক বেছে নিয়েছেন এমন ভাষা শৈলী যা প্রচল নয়— খানিকটা কাব্যিক; প্রথম প্রথম সান্ধ্য ভাষার মতই ঠেকে। কিন্তু রাবুর সাথে পথ চলতে চলতে খানিক পরেই আত্মস্থ হয়ে উঠি— রাবুর উন্মুলতায় ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ি। কথকের এই জটিল মনস্তত্ত্ব উপস্থাপনের জন্য লেখকের একটি স্বতন্ত্র ভাষা নির্মাণ জরুরি ছিল যা লেখক করতে সক্ষম হয়েছেন।

গল্পটা বেশ সাবলিল এবং গতিশীল। একবার পড়া শুরু করলে পুরো গল্প শেষ না করে ওঠা দায়। দৃশ্যকল্পগুলো এমন পষ্ট, যেন সবাক চলচিত্রের মতই চোখের সামনে দিয়ে চলে যায়। সমসাময়িক ঘটে যাওয়া নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের আবহকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এমন একটি বিষয়ের অবতারণা করেও— যেখানে একটি ফুটফুটে আট-নয় বছরের প্রাণবান ছেলে বাস চাপায় নিহত হয় এবং তার মায়ের মুখে যখন গল্প বয়ান করা হয় সেখানে অযাচিত আবেগের প্রাবাল্য দেখা দেয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু এ গল্পে মনে হয়েছে লেখক এ ব্যাপারে সচেতন। কোনরকম অতি আবেগের প্রশ্রয় তিনি দেননি। ফলে রায়ানের জন্য রাবুর না বলা হৃদয় কথা, পাঠকের হৃদয়ে এমনভাবে আঘাত করে যা গল্প পাঠশেষেও দীর্ঘসময় ধরে অনুরণিত হতে থাকে। 

আমাদের গতিসম্পন্ন অস্থীর জীবন ব্যবস্থা, চারিদিকের ঘিনঘিনে লোভাতুর দৃষ্টি, রাষ্ট্র যন্ত্রের নিশ্চুপ পড়ে থাকা, এইসব কিছুর বিরুদ্ধে কোথাও কোন স্পষ্ট আওয়াজ নেই; তবু সমস্ত গল্পের ভিতরে যে ক্ষরণ, দ্রোহ আর স্ফুলিঙের প্রকাশ তা ছড়িয়ে পড়ে দ্রুততার সাথেই।

নাম না জানা গল্পকারের জন্য অনেক শুভ কামনা।

[আমরা গল্প ও কবিতার সঙ্গে পাঠ-প্রতিক্রিয়া জুড়ে দেবার সীদ্ধান্ত নিয়েছি। যিনি পাঠ-প্রতিক্রিয়া লিখবেন তাকে শুরুতে জানতে দেয়া হয় না লেখকের নাম। আবার লেখক কখনোই জানতে পারবেন না পাঠ-প্রতিক্রিয়া কে লিখেছেন।–বি.স.]

//জেডএস//

লাইভ

টপ