হলিউডের চোখে ভারত

Send
সাদিয়া খালিদ
প্রকাশিত : ০৬:১৬, সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০৬:১৬, সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৮

আমরা ঠিক কি করে জানতে পারলাম ভারত একটা অদ্ভুত মহাদেশ?— যখন একজন ককেশিয়ান “ইন্ডিয়ান সামার”, “দ্যা ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি” অথবা “ভিক্টোরিয়া এন্ড আব্দুল”-এর মতো সিনেমাগুলো দেখে এবং মনে মনে ভারতের একটি কাল্পনিক ছবি আঁকে, যা আসলে পুরোটাই এরকম বেশকিছু সিনেমা আর টেলিভিশন অনুষ্ঠানগুলোকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠে এবং সেই ককেশিয়ানের জন্য এই কাল্পনিক ছবিটাই হবে ভারত। তবে যদি দর্শক একজন ভারতীয় হয় তাহলে এই কি দুজনের কল্পনার মধ্যে বিস্তর ফারাক পাওয়া যাবে?

“ভিন্ন” হিসেবে দাঁড় করানোর জন্য যে সব বিষয় উল্লেখ করা হয় সেগুলো “আসল ভিন্ন” না; বরং সেগুলো হচ্ছে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচারিত “ভিন্ন”র নানান ধরন। আবার এক দেশের সংস্কৃতি অন্যদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য সিনেমা ও টেলিভিশন হচ্ছে অনন্য এক মধ্যম। উইনফ্রেড নথ একে “ভিন্ন” সংস্কৃতির সেমিওটিকস হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। বস্তুত এটি ব্যক্তির ভিন্ন সংস্কৃতি সম্পর্কেই শুধু ধারনা তৈরি করেনা, এটি ব্যক্তির সত্ত্বা এবং তার নিজের সংস্কৃতি সম্পর্কেও ধারনা তৈরি করে।

সংযোগের কথা হলো, সমস্ত সিনেমা বা টেলিভিশন প্রযোজনাগুলো তৈরি হয়েছিল ঔপনিবেশিক ভারতকে কল্পনা করে, যেখানে ভারতীয়দের (বর্তমান বাংলাদেশী, ভারতীয় ও পাকিস্তানীদের) দেখানো হয়েছে ঐতিহ্য আকড়ে পড়ে থাকা অদ্ভুত এক প্রাণী হিসেবে। গোছালো, শিক্ষিত আর আধুনিক ইংরেজদের থেকে যারা সম্পূর্ন বিপরীত। বিষয়টিকে ঔপনিবেশিক দাসত্ব কায়েম করার মানসিক প্রক্রিয়াও বলা যেতে পারে!

২০০০ সালে প্রকাশিত প্রেম চৌধুরী তার “কলোনিয়াল ইন্ডিয়া এন্ড দ্যা মেকিং অফ এম্পায়র সিনেমা : ইমেজ, আইডিওলজি আন্ড আইডেনটিটি” বইয়ে তুলে ধরেন, হলিউডের সাম্রাজ্যবাদ প্রতিফলন ঘটানো সিনেমাগুলো শুধুমাত্র তাদের অভিনব ইম্পেরিয়াল অবস্থান, সংস্কৃতি, জাতিগত উচ্চতা এবং শুধু বৃটিশ নয়, পুরো পশ্চিমা সাদাদের দেশভক্তি ও গর্বকেই কেবল গুরুত্ব দিয়েছে।চিন্তার ঠিক এই অবস্থান থেকেই হলিউডের প্রথম চেষ্টা শুরু হয় ভারতকে বুঝতে চাওয়ার এবং সারা বিশ্বে  ভারতকে উপস্থাপনের; ভারতের প্রতি বর্তমান হলিউডের দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি আসলেই এভাবে শুরু।

১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের পরে বৃটিশরা ভারতকে ভারতীয়দের থেকে আলাদা করার তীব্র চেষ্টা করতে থাকে। এডওয়ার্ড সাইদ তার গ্রন্থ “ওরিএন্টালিজম”(১৯৭৮)-এ স্পষ্টভাবে বলেন, প্রাচ্য সম্পর্কে জ্ঞান যা পাশ্চত্যে সৃষ্টি ও লালন পালন হয়েছিল, তা শুধুমাত্র ঔপনিবেশিক শক্তিকে আদর্শগত সমর্থন দেয়ার জন্য।

দৃশ্যত, শ্বেতাঙ্গদের মানবতাবাদ বেড়েই চলছিল একটা প্রতিক্রিয়াশীল জাতিগত ব্যাখ্যার উপরে ভর করে।২০০৯ সালে উইলিয়াম মাজারেলা তার একটি আর্টিকেলে ঔপনিবেশ পরবর্তী ভারতীয় সিনেমা নিয়ে বলেন, ভারত ও ইউরোপে প্রায় সমান তালেই সিনেমার অভ্যুত্থান হয় ১৮৯০ এর মাঝামাঝি সময়ে। এবং তা প্রপাগন্ডা ছড়ানোর এক অভুতপূর্ব হাতিয়ার হয়।কারণ শিক্ষার সীমাবদ্ধার কারণে বইয়ের জ্ঞান কিংবা ছেপে প্রকাশিত বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে প্রায় ব্যর্থ হয়েছিল বলা যায়।

গায়েত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের মতে, ঔপনিবেশিক শক্তি টিকে ছিল শিক্ষার নানা শাখা, নানান ব্যাখ্যা ও আলোচনা এবং বানীর মধ্যদিয়ে। যা ঔপনিবেশিক “সাব্জেক্ট” ও তাদের শ্রেষ্টত্ব স্থাপন করতে চেয়েছিল।

হলিউড সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারে বিরাট গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা পালন করেছে। প্রেম চৌধুরীর মতে, ১৯৩০ ও ১৯৪০ সালে হলিউডে বানানো সিনেমাগুলো এতোটাই প্রো-ইম্পেরিয়াল ও জাতিগত বিদ্বেষপূর্ণ ছিল যে, খোদ ব্রিটিশরাজ সেগুলো সরিয়ে ফেলতে আমেরিকান প্রযোজকদের অনুরোধ করেন।

‘দ্য ফার প্যাভেলিয়ন’ (১৯৮৪) এবং ‘জুয়েল ইন দ্য ক্রাউন’(১৯৮৪)-এর মত টিভি সিরিজগুলো ছিল ভারতে ব্রিটিশদের রাজত্ব এবং সাম্রাজ্যবাদের বিপরীতে ভারতীয়দের স্বাধীনতা পাওয়ার চেষ্টা ও তা নিয়ে বৃটিশদের ঝামেলা পোহানোর গল্প নির্ভর। ভারতীয় চরিত্রগুলোর বেশিরভাগই ছিল পার্শ্ব চরিত্র। যেগুলো পশ্চিমা দর্শকদের ভারত সম্পর্কে এক অদ্ভুত ও অপরিবর্তনশীল ধরনা দেয়। পাশ্চাত্য সিনেমা জগত চেয়েছিল ঔপনিবেশিক ভারতের স্বাধীনতার জন্য লড়াইকে সিনেমায় সীমাবদ্ধ করতে শুধুমাত্র গান্ধী আর কিছু কাল্পনিক রোমান্টিক প্লট দিয়ে। ‘দ্য সোর্ড অফ টিপু সুলতান’, ‘ঝাঁসি কি রানী’ কিংবা ‘চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য’-এর মত সিনেমা ও টিভি সিরিজগুলো ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সেইসব নায়কদের কথা বলে যারা আঞ্চলিকভাবে সমাদৃত।

ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম একরৈখিক হলেও তা জালের মত সারাদেশের শাসক-নাগরিকদের মাঝে ছড়িয়ে ছিল। এর বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যাবে সনি জালারজান রাজ ও রোহিণী শ্রীকুমারের লেখা ২০১৩ সালে প্রকাশিত আর্টিকেল ‘কলোনিয়াল রেবেলস ইন ইন্ডিয়ান সিনেমা ন্যারেটিভস, আইডিওলজি এন্ড পপুলার কালচার’-এ  

জয়কুমার তার বই ‘সিনেমা এট দি এন্ড অফ এম্পায়র’-এ উল্লেখ করেন ‘স্যান্ডারস অফ দ্য রিভার’ ও ‘এলিফ্যান্ট বে’ সিনেমা গুলোতে এমন ভাবে দেখানো হয়েছে যেন আদতেই ভারত একটি অসভ্য জাতি আর তাকে উদ্ধার করার জন্য তার উপরে “জ্ঞানী” ঔপনিবেশিক শাসন জারি করা দরকারি।

স্বাধীনতার ৭০ বছর পার করে এসেও এটা মনে হয় যে সেই ঔপনিবেশিক গল্পকারেরা আমাদের যা শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছে, আমরা তার মাঝেই আটকে আছি আর তাইই বলছি এবং এতগুলো বছর পরেও সিনেমা ও টিভির মধ্যে আমরা আমাদের ও সেইসব ঔপনিবেশিক লোকজনদের অস্বচ্ছ লেন্সের মতই অস্বচ্ছ দেখতে পাচ্ছি।

সূত্র : ঢাকা ট্রিবিউন

//জেডএস//

লাইভ

টপ