আধুনিক মানুষ ও মানসের নির্মাণে

Send
হামীম কামরুল হক
প্রকাশিত : ০৬:০০, অক্টোবর ১৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০৬:০০, অক্টোবর ১৪, ২০১৮

ডেমোক্রিটাসের পরমাণুবাদ ও বস্তুবাদ নিজের মতো করে গ্রহণ করে এপিকুরস এমন এক দর্শন তৈরি করেছিলেন যার সঙ্গে আধুনিক জীবনমানসের ধরনটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ডেমোক্রিটাসের মতে, এই বস্তুময় জগতের যা কিছু আছে তাতে পরমাণু ও পরিসর বা স্থান ছাড়া কিছু নেই। এপিকুরীয় দর্শনের সঙ্গে স্টোয়িকদের মিল থাকলেও এপিকুরস তাদের নিয়তির ধারণাকে প্রত্যাখান করেছিলেন এবং পূর্বাপর সংগতির জায়গা থেকেও এটি অনন্য। সুখ এই দর্শনের অন্যতম দিক হলেও এপিকুরসের লক্ষ্য ছিল ‘ইনার পিস’ বা অন্তর্গত শান্তি, ভয়মুক্তি, বিশেষ করে মৃত্যুভয় দূর করা। তার মতে, ‘চিয়ারফুল প্রোভার্টি ইজ অ্যান অনারেবল স্টেট।’ তার ঘোষণা, ‘লিভ আননোন।’ অজনায় বাঁচো। সর্বোপরি মানুষকে মুক্ত করা অজ্ঞতা ও কুসংস্কার থেকে।

কার্ল মার্ক্স ‘ডক্টরেট’ অর্জন করেন ১৮৪১ সালে। তার থিসিসটি পেশ করা হয়েছিল জেনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনেক পরে, ১৯০২ সালে সেটি প্রকাশিত হয়। এর বিষয় ছিল ‘ডেমোক্রিটীয় ও এপিকুউরীয় প্রকৃতির দর্শনের পার্থক্য।’ একদিক থেকে বলতে গেলে এটি ছিল এক ধরনের তুলনামূলক পাঠ। কিন্তু এর ভেতর দিয়ে একটি ঘটনা ঘটে যায়, সেটি হলো এপিকুরসের পুনর্জন্ম। আমরা জানি আধুনিক জীবনদৃষ্টি তৈরিতে যে কজন চিন্তকের ভূমিকা প্রধান তার ভেতরে মার্ক্স অন্যতম। ফলে তিনি যখন এপিকুরসকে বেছে নিয়েছিলেন তরুণ বয়সে, এর গুরুত্বও তাই আমাদের অন্যতম দ্রষ্টব্য বিষয় হয়ে ওঠে।

মানুষ জীবনকে যেভাবে দেখে জীবন আসলে তাই। জীবন কী এবং জীবন সম্পর্কে আমরা কীভাবে ভাবি—দুটো জিনিস এক নয়। জীবনকে দেখা তাই আপাত সহজ হলেও মোটেও সহজ কিছু নয়। এর ভেতরে আবার প্রাচ্য তথা পূর্ব ও প্রতীচ্য তথা পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির আলাদা দৃষ্টিকোণ আছে। পশ্চিমাদের জীবনদর্শন বিশ্লেষণাত্মক, প্রাচ্যের দৃষ্টিকোণ সংশ্লেষাত্মক। পশ্চিমের জীবনদর্শন খণ্ডিত এবং প্রাচ্যের জীবনদৃষ্টি সামগ্রিক। পশ্চিমে ট্রাজেডি লেখা হয়, প্রাচ্যে ট্রাজেডি বলে কিছু ছিল না, যখন সাহিত্য এখানে নির্মিত হচ্ছিল। প্রমথ চৌধুরী অনেক মজা করে ‘আমরা ও তোমরা’তে এই ভেদটি তুলে ধরেছিলেন। তিনি ‘ইউরোপীয় সভ্যতা বস্তু কি’তে একটু সিরিয়াসভাবে যা বলেছেন, বলতে কি তার পরে ‘আমরা ও তোমরা’ সেটি সহজ করে করে দেখিয়েছেন। যেমন: ‘‘আমরা পূর্ব, তোমরা পশ্চিম। আমরা আরম্ভ, তোমরা শেষ।  আমাদের দেশ মানবসভ্যতার সূতিকাগৃহ, তোমাদের দেশ মানবসভ্যতার শ্মশান। আমর ঊষা, তোমরা গোধূলি। আমাদের অন্ধকার হতে উদয়, তোমাদের অন্ধকারের ভিতর বিলয়।’’ এই বলতে বলতে তিনি এক জায়গা বলেন যে,‘‘তোমাদের সুখ ছটফটানিতে, আমাদের সুখ ঝিমুনিতে। সুখ তোমাদের Idel , দুঃখ আমাদের Real’’ এখানে এসেই মনে হয় ঠিক এ ব্যাপারটির ওপর নির্ভর করে জীবনের সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি। সবচেয়ে বড় কথা জীবনকে আধুনিকভাবে দেখা, বা আধুনিক জীবনকে দেখা। এই সামান্য এদিক ওদিক করার ভেতরেই আমাদের সূক্ষ্ম ও স্থূল, মিহি ও মোটা কত কত কাহিনির বসবাস। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের এই সুখ ও দুঃখকে দেখবার কাজটি নতুন করে একালে আরো এক দফা সম্পন্ন করেছেন বিরঞ্জন রায়। তিনি তার ‘এপিকুরস, আধুনিকতা ও আমরা’ বইতে ইতিহাস ও দর্শনের মিশেলে জীবনকে নানানভাবে দেখবার বিন্দুগুলির সন্ধান দিয়েছেন। কিন্তু এর কেন্দ্রীয় বিষয় বস্তুবাদ। তিনি এই বইয়ের কৈফিয়ত বা শুরুতে ভূমিকার মতো লেখায় যখন বলেন, ‘আমাদের পা অতীতে, হাত বর্তমানে, মাথা ভবিষ্যতে।’—এই বাক্য থেকেই বোঝা যায় তার বলবার ঢঙটি পাঠককে কতটা চমৎকৃত করতে পারে ।

তার বই পড়তে পড়তেই আমাদের দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের কথা মনে পড়বে। মনে পড়বে দেবীপ্রসাদের লেখা ‘ভারতে বস্তুবাদ প্রসঙ্গ’ এবং ‘লোকায়ত দর্শন’। বিরঞ্জন রায় অত্যন্ত সহজভাষায় প্রাচ্য ও প্রচীত্যের কেন্দ্রীয় চিন্তাবৃত্তের বিন্দুতে হানা দিয়ে হাজির করেছেন বস্তুবাদী ঐতিহ্যের সারসংক্ষেপ। অনেকক্ষেত্রেই ঘটিয়েছেন তুলনামূলক পাঠ। যেমন বুদ্ধ ও এপিকুরসের চিন্তায় মিল। বুদ্ধের শিক্ষা: অনিত্য, অনাত্ম, দুঃখ। এপিকুরসও অনিত্যের কথা বলেন। তবে এপকুরাসের মূল কথা হলো সুখ লাভ। বিরঞ্জন লেখেন,‘‘এপিকুরসের মতে, জীবনের উদ্দেশ্য সুখ লাভ। এ সুখ লাভের পথে প্রধান বাঁধা ভয়। তাই ভয় থেকে মুক্তিই হচ্ছে সুখ লাভের গুরুত্বপূর্ণ উপায়। দর্শনের কর্তব্য হচ্ছে মানুষের মনকে এই ভয় থেকে মুক্ত করা: ধর্মের ভয়, দেবতার ভয় আর মৃত্যুর ভয়। এপিকুরস এই মহৎ উদ্দেশ্য নিয়েই তার দর্শন প্রচার করেছেন।’’ লক্ষণীয় এপিকুরসের সময়কাল খৃষ্টপূর্ব ৩৪১ থেকে খৃষ্টপূর্ব ২৭০ সালে। এর ভেতর দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। বিরঞ্জন এই জল গড়ানোর দুটো ধারাকে দেখেছেন ভারতীয় ও ইউরোপীয় অংশে। বইটির দিকে তাকালে দেখি যে, তিনি এটিতে ইউরোপীয় ধারায় রেখেছেন, ‘‘ গ্রোকো-রোমান পর্বের আলোচিত ব্যক্তিত্বদের ছক’, ‘আধুনিক ইউরোপের আলোচিত ব্যক্তিত্বদের ছক’,‘তরুণ মার্ক্সের পরিমণ্ডল এবং এপিকুরসের নবজীবন’। এতে তিনি থালেস থেকে মার্ক্সে এসে থেমেছেন। যদিও এর আগে শুরু আছে প্রাচীন মিশরীয় দর্শন থেকে, মেসোপপমিয়া, ক্রীট ও গ্রীক থেকে। অন্যদিকে ভারতীয় অংশে আছে: ‘ভারতীয় বস্তুবাদ ও পরমাণুবাদ’, ‘ভারতীয় বস্তুবাদের উত্তরাধিকার’। এখানে তিনি  চার্বাক দিয়ে শুরু করে এগিয়ে গেছেন বস্তুবাদী বাউল ঘরানা হয়ে শাহ আবদুল করিম অব্দি। এর ভেতরে কাজ করেছে মানুষের সুখ সন্ধান ও বস্তুচেতনার ধারা-উপধারা। ‘দর্শন কী’ নামের জিল দলয়জ ও ফেলিস গাত্তারির যৌথ রচনায় আছে,‘ দর্শন হচ্ছে অস্তিত্বের ধরনটিকে চিহ্নিত করা এবং জীবনের সম্ভবনাকে দেখানো।’ ফলে এপিকুরস তার দর্শনের কেন্দ্রীয় বিষয় যে সুখ, এর উপর ভিত্তি জীবনকে আমরা কী করে একালে দেখতে পারি ও দেখাতে পারি, এর রূপরেখা তৈরি করে দিয়েছেন বিরঞ্জন রায়।

একদিক থেকে পুরো বইটি বলা যায় দর্শন পাঠের নতুন ভূমিকা। বিরঞ্জন রায় ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সাম্প্রদায়িতার বদলে দার্শনিক প্রগতি ও সম্প্রতি এবং বদ্ধতা ও সংস্কারের বদলে গতিময়তা ও সৃষ্টিশীলতার দিকে আমাদের নিয়ে যেতে চেয়েছেন। তার এই বই আমাদের ইতিহাস ও সভ্যতা, দর্শন ও রাজনীতিসহ আধুনিকতা ও বস্তুবাদের পরিপ্রেক্ষিতে এক বৈশ্বিক ভ্রমণ সম্পন্ন করায়। একটি বই পড়ে এতখানি প্রাপ্তি খুব কম বইয়ের ক্ষেত্রেই আজকাল ঘটে থাকে।

বইয়ের নাম: এপিকুরস, আধুনিকতা ও আমরা/ লেখক:বিরঞ্জন রায়/ প্রকাশকাল:ফেব্রুয়ারি ২০১৮/ প্রকাশন:সংহতি, ঢাকা/ মূল্য: ৬৯০ টাকা।

//জেডএস//

লাইভ

টপ