চেনা সুরের রাগ-রঙ

Send
বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায়
প্রকাশিত : ০৬:০০, অক্টোবর ৩১, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০৬:০০, অক্টোবর ৩১, ২০১৮

(পর্ব-১৭)

মিঞা মল্লার রাগের একটি অবিস্মরণীয় রেকর্ডের কথা এবার বলি, যা ১৯৫৮ সালে আকাশবাণীর অখিল ভারতীয় কার্যক্রমে এবং ইউ-টিউবের সৌজন্যে যা আজ পৌঁছে যাচ্ছে সারা পৃথিবীর সঙ্গীতপ্রেমীর ঘরে ঘরে। গানটির শিল্পী ওস্তাদ আমীর খাঁ। প্রথমে বিলম্বিত একতালে নিবদ্ধ খেয়াল—‘করিম নাম তেরো’ এবং এরপর দ্রুত ত্রিতালে নিবদ্ধ খেয়াল—‘বরসন লাগি বাদরিয়া’। বিলম্বিত এবং দ্রুত খেয়াল মিলিয়ে সম্পূর্ণ গানটির সময়কাল প্রায় ৫২ মিনিট এবং এটি শুনলে মিঞা মল্লার রাগের পূর্ণ রূপায়ণ প্রত্যক্ষ করা যাবে। ধীরে ধীরে দিগন্তে মেঘের সঞ্চার থেকে শুরু করে ক্রমশ সমস্ত আকাশ পরিব্যাপ্ত করে বৃষ্টি নামা, তারপর মাঠঘাট প্লাবিত করে, নিজেরও একাকার হয়ে যাওয়া পর্যন্ত সবই প্রত্যক্ষ হবে। গানটি অবশ্যই শুনুন।

ওই একই বিলম্বিত খেয়ালের আরো একটি রেকর্ড স্মৃতিতে অক্ষয় হয়ে আছে। ১৯৮০ সালে পণ্ডিত ভীমসেন যোশীর কণ্ঠে; অবশ্য দ্রুত খেয়ালটি ছিল একতালে নিবদ্ধ এবং বাণী বহু প্রাচীন সদারঙ্গ, অর্থাৎ সুলতান মহম্মদ শা’র সভাগায়ক ওস্তাদ নিয়ামৎ খাঁ রচিত সেই গানটি—‘মহম্মদ শা রঙ্গিলে/তুম বিনা ম্যায় কা কারি’। এই গানটির বহু পুরোনো একটি রেকর্ড এখনো পাওয়া যায়। শিল্পী পণ্ডিত সওয়াই গন্ধর্ব। ওস্তাদ আবদুল করিম খাঁর শিষ্য, কিরাণা ঘরাণার এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী ছিলেন, গঙ্গুবাঈ হাঙ্গলে, বাসবরাজ রাজগুরু এবং ভীমসেন যোশীরও সঙ্গীতগুরু। প্রসঙ্গত উল্লেখ করি, মিঞা মল্লার রাগে ওস্তাদ আবদুল করিম খাঁর একটি রেকর্ড আছে—‘বরসন লাগি বাদরিয়া’। রেকর্ড হয়েছিল, ১৯০৫ সালে। গঙ্গুবাঈ হাঙ্গলেরও একটি ছোট রেকর্ড আছে এই রাগে।

যন্ত্রসঙ্গীতেরও বহু রেকর্ডের কথা মনে পড়ছে। বিশেষভাবে তিনটি রেকর্ডের কথা বলব। প্রথমটি সেতারে। শিল্পী পণ্ডিত রবিশঙ্কর। দ্বিতীয়টি সুরবাহার—শিল্পী ইমরৎ হুসেন খাঁ এবং তৃতীয়টি সরোদ, শিল্পী ওস্তাদ আমজাদ আলি খাঁ।

মিঞা মল্লার রাগটির সৌন্দর্য তার আন্দোলিত গান্ধারে এবং দুটি নিথাদের প্রয়োগে অবর্ণনীয় হয়ে ওঠে। ওস্তাদ মেহেদী হাসান তাঁর একটি গজল গানের শুরুতে এ বিষয়ে আশ্চর্য মনোজ্ঞ একটি আলোচনা এবং সুরের প্রদর্শন উপহার দিয়েছেন।

মিঞা মল্লার প্রসঙ্গে সব শেষে বলব, ছায়াছবির কিছু স্মরণীয় গানের কথা। একটি গানের কথা, সম্ভবত আগেই বলেছি, ‘গুড্ডি’ ছায়াছবি থেকে বাণী জয়রামের গাওয়া ‘বোলের পাপিহারা’ গানটির কথা। এর মূল যে খেয়াল গানটি, সেটির একটি অসাধারণ রেকর্ড আছে পণ্ডিত  কুমার গন্ধর্বের কণ্ঠে। এই একই গানের রেকর্ড পাবেন অশ্বিনী ভিদে দেশপাণ্ডবের কণ্ঠেও। তবে ছায়াছবির গানে মিঞা মল্লারের একটি বিস্ময়কর রূপ উন্মোচিত হয়েছিল কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে, সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘জলসা ঘর’ ছবিতে, সালামৎ আলি খাঁর কণ্ঠে। ছবিটি যারা দেখেননি, তারা অবশ্যই দেখুন। যারা দেখেছেন তারাও আবার দেখুন। বিশেষত, গানটিও শুনুন। মিঞা মল্লারকে চিনুন।

তবে, ‘গুড্ডি’ ছায়াছবির ওই গানটি প্রসঙ্গে একটা কথা বোধহয় বলা হয়নি। মূল খেয়াল গানটি, অর্থাৎ ‘বোলেরে পাপাইহা’ গানটির অনুসরণে রবীন্দ্রনাথের একটি গানের কথা কি বলেছি? হ্যাঁ, বলেছি, অষ্টম পর্বে। তবু আবার বলি। গানটি, ‘কোথা যে উধাও হ’ল’। রবীন্দ্রনাথের ভাঙাগান পর্যায়ের এই গানটি, প্রায় দ্ব্যর্থহীনভাবেই, মিঞা মল্লার রাগাশ্রিত গান হিসাবেই চিহ্নিত হয়েছে; যদিও গানটির প্রথমাংশ, অর্থাৎ যাকে ‘স্থায়ী’ বলা হয়, তাতে মিঞা মল্লারের স্পর্শও নেই, বরং ‘সাহানা’ নামে একটি রাগই প্রকাশ পেয়েছে। তবে, পরবর্তী অংশ, অর্থাৎ ‘অন্তরা’য় মিঞা মল্লারকে পাওয়া যায়। সাহানা রাগটি রবীন্দ্রনাথের বিশেষ প্রিয় ছিল এবং তার অনেক গানই সাহানা রাগাশ্রিত। যেমন, ধরুন, ‘চাঁদের হাঁসির বাঁধ ভেঙেছে’—গানটিতে সাহানা রাগটি পরিপূর্ণ রূপেই পাওয়া যায়। আরো একটি গান, ‘নিবিড় ঘন আঁধারে’ গানটিও সাহানা রাগাশ্রিত। এই সঙ্গে দুটি রেকর্ডের কথাও বলব। একটি খেয়াল, সাহানা রাগে, শিল্পী ওস্তাদ আমীর খাঁ এবং অন্যটি সরোদে সাহানা রাগে গৎ, শিল্পী—ওস্তাদ আমজাদ আলি খাঁ।

মিঞা মল্লারের সূত্র ধরে প্রথমেই যে রাগটির কথা মনে পড়ে, সে রাগটি হলো মেঘমল্লার। নামটি বহুশ্রুত হলেও, রাগটি অন্তত এখন আর তেমন নয়। শুধুমাত্র ‘মেঘ’ নামে যে রাগটি প্রচলিত, অনেকের মতে, সেটা আসলে মেঘমল্লার ছাড়া আর কিছুই নয়। আবার অনেকের মতে দুটি রাগ আসলে আলাদা। সে যাই হোক, ‘মেঘ’ রাগটির আসল রূপ নিয়েও মতান্তর কিছু কম নেই। প্রাচীন মতানুসারে মল্লার আর মেঘ ভিন্ন রাগ নয়। কিন্তু ছয় রাগ-ছত্রিশ রাগিনীর যে শ্রেণী বিভাজন পদ্ধতি তখন প্রচলিত ছিল, তাতে মল্লারি নামে একটি রাগকে মেঘ রাগের রাগিনী রূপে চিহ্নিত করা হয়েছিল। মল্লারির প্রকৃত রূপ কেমন ছিল, তা নিশ্চিতভাবে আজ আর বলা না গেলেও, ওই একই রাগ মল্লারি, মল্লারিকা, মলহর, মলহার—এমনি সব নানা নামে বিবর্তিত হয়েই সম্ভবত আজকের মল্লার রাগে এসে পৌঁছেছে। তবে, সঠিকভাবে বলতে হলে, শুধুমাত্র ‘মল্লার’ নামে কোনো রাগ এখন আর প্রচলিত নেই, সে কথা আগেই বলেছি এবং মল্লার বলতে এখন একটি বিশেষ ‘অঙ্গ’ বা স্বর সমন্বয়কেই বোঝানো হয়ে থাকে। সে স্বর সমন্বয় হলো ‘রেমারেপা’—এও বলেছি, যা প্রতিটি মল্লারেরই আবশ্যিক অঙ্গ—এই বলা হয়। মল্লারের যে প্রাচীন রূপ, যার শেষতম কিছু নিদর্শন, বহু পুরোনো কিছু রেকর্ডে এখনো ধরা আছে, সে মল্লারকে ‘শুদ্ধ মল্লার’ নামেই চিহ্নিত করা হয। গহর জানের একটি রেকর্ডের কথা মনে পড়ছে, মল্লার রাগ হিসেবেই সেটি চিহ্নিত হয়েছিল। আরো কিছু কিছু রেকর্ডও আছে। গহর জানের রেকর্ডটি ১৯০২ সাল নাগাদ করা হয়েছিল। আরেকটি রেকর্ড, সম্ভবত এরও দু’দশক পরের, শিল্পী মেহেবুব জান। গানটির কথা ছিল, ‘ঝুম্ ঝুম বাদরিয়া বরষে’ এবং অনেকটা এখনকার নটমল্লারের মতো। বোঝার সুবিধার জন্য বলি, গানটি অনেকটা রবীন্দ্রনাথের ‘মোরে বারে বারে ফিরালে’ গানটির মতো। এটিও কবিগুরুর ভাঙাগান পর্যায়েরই একটি গান, যার মূল খেয়াল গানটি ছিল, একতালে নিবদ্ধ, বাণী—‘মোরি নঈ লগন লাগিরে’। রবীন্দ্রসঙ্গীতটির একটি সুন্দর রেকর্ড আছে, চিত্রলেখা চৌধুরীর। খেয়াল গানটির রেকর্ড করেছিলেন, নীহাররঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, রাগ—নটমল্লার। ...

সমস্যাটা একটা গাছের বর্ণনা দেওয়ার মতো। যেখান থেকেই শুরু করি, শিকড় থেকে কাণ্ড, কাণ্ড থেকে শাখা-প্রশাখা-বৃন্ত-শির-উপশিরা হয়ে এক সময় কোনো একটি পাতার গভীরে বিভাজিত হয়ে হারিয়ে যেতে হয়—গাছটি অদেখাই থেকে যায়।...

নটমল্লার থেকে আমরা অনায়াসেই গৌড়মল্লারে চলে যেতে পারি, কিন্তু প্রসঙ্গটা ছিল ‘মেঘমল্লার’। আপাতত তাতেই ফিরে যাব। মেঘমল্লার এবং মেঘ, রাগ দুটি আলাদা নাকি একই রাগ, এ তর্ক থাক। শুধু এটুকুই বলা যেতে পারে যে, মেঘমল্লার রাগে রেকর্ড খুব বেশি নেই। দুটি রেকর্ডের কথা মনে পড়ছে একটি রেকর্ড বেশ পুরোনো, ৭৮আরপিএম, গালার রেকর্ড, মাত্র সাড়ে তিন মিনিটের খেয়াল, দ্রুত একতালে নিবদ্ধ। শিল্পী—ওস্তাদ লতাফৎ হুসেন খাঁ। অন্যটি বড় রেকর্ড অর্থাৎ কুড়ি/বাইশ মিনিটের খচ রেকর্ড—শিল্পী, ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খাঁ। অবশ্য বড়ে গোলাম আলি খাঁর গাওয়া ৭৮আরপিএম একটি ছোট রেকর্ডও আছে এবং সেটি মেঘ নামেই চিহ্নিত হয়েছে। এই দ্বিতীয় রেকর্ডে খাঁ সাহেবকে পূর্ণ দীপ্তিতেই পাওয়া যায়।

তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, পার্থক্যটা আসলে সত্যিই কোথায়।

আগেই বলেছি, এ নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে, যারা বলেন, দুটি রাগ আসলে আলাদা, তাদেরও নানা মতের মধ্যে যেটা সবচাইতে বেশি উচ্চারিত, সেটা হলো, মেগ রাগের মতো মেঘমল্লারও গা, ধা বর্জিত, কিন্তু মেঘমল্লারে কোমল এবং শুদ্ধ—দুটি নিখাদেরই ব্যবহার আছে কিন্তু মেঘ রাগে শুধুমাত্র কোমল নিখাদই ব্যবহার করা হয়। কেউ কেউ মেঘমল্লারে কোমল গান্ধারও ব্যবহার করে থাকেন।

অর্থাৎ মেঘ রাগের আরোহণ অবরোহণ হলো এই রকম—

‘সা রে মা পা ণি র্সা / র্সা ণি পা মা রে সা’

প্রসঙ্গত, সেনী ঘারাণার মেঘ রাগে অবরোহণে শুদ্ধ গান্ধার এবং শুদ্ধ ধৈবতের ব্যবহার আছে অর্থাৎ সেনী ঘরাণার মেঘ রাগের আরোহণ অবরোহণ হবে—

‘সা রে মা পা ণি র্সা / র্সা ণি ধা পা মা গা রে সা’

তবে গান্ধারের ব্যবহার অল্প। ... তা সে যাই হোক, আসলে যৌক্তিক বিচারে এটা স্বীকার না করে উপায় নেই যে, মেঘ-এর এই যে দুটি প্রকার, এদের মধ্যে পার্থক্য আছে এবং সেই কারণেই এটাও মানতেই হবে যে, দুটি রাগের নাম যদিও মেঘই বলা হচ্ছে, তবু তারা আসলে পৃথক। সুতরাং, সমস্যাটা আর কিছুই নয়—একই নামে দুটি পৃথক রাগকে চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং তর্কের উৎস্যও সেখানেই। একই বাড়িতে দুটি ছেলে বা মেয়ের একই নাম রাখলে যে সমস্যা হয়, এও তাই। সেই জন্যেই প্রত্যেকের আলাদা আলাদা নাম রাখা হয়। দুজনের নামই যদি হয় রতন, তবে কোনটা আসল রতন—এ নিয়ে তর্ক করা অর্থহীন।

আবার এর উল্টোটাও আছে, একই রাগের একাধিক নাম থাকলেও সমস্যা। উদাহরণ? ভিন্নষড়জ, কৌশিধ্বনি এবং হিন্দোলী—এই তিনটি নামে আসলে একটি রাগই প্রচলিত রয়েছে! (চলবে)

//জেডএস//

লাইভ

টপ