‘মৌ এর সংসার’ ।। হামিম কামাল

Send
.
প্রকাশিত : ১৯:০০, নভেম্বর ১৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:২৭, নভেম্বর ২৪, ২০১৮

তখন একটা অনলাইন পত্রিকায় কাজের রেশ টানছি আমি। ইচ্ছের বিরুদ্ধে নিত্য আসা যাওয়া; মনটা তাই মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছিল ক্রমশ। তবু জঠরদায় অনুভব করি বিধায় এড়ানোর উপায় ছিল না। সপ্তাহের একটিমাত্র দিন বাদে, প্রকৃতির আরো ছ’টি দিন বিকেলে কাজে যেতাম, আর রাত গভীর করে ঘরে ফিরতাম।

আমার এই আসা যাওয়ার পথে অনেক ঘর ছাড়া মানুষকে দেখতে হতো। ওরা ফুটপাতে এক ধরনের প্রাকৃত সংসার যাপন করে। ছাদ যাদের খোলা আকাশ, মহাবিশ্বের সত্য নাগরিক হওয়ার পথে ওরা বোধয় অনেকটা এগিয়ে। সেইসব এগিয়ে থাকা পথিকদের পথসংসারের বিচিত্র যাপন, অদ্ভুত সাংসারিক খুনসুটি—এসব দেখতাম। মন খারাপের অংশটুকু বাদ দিলে বেশ লাগত।

একদিন অফিসে যাওয়ার পথে হঠাৎ দেয়ালে একটা লেখা চোখে পড়ল, ‘মৌ এর সংসার’। থান ইটের ভাঙা টুকরো দিয়ে পল্টন থানার গম্ভীর দেয়ালে মিষ্টি এই টুকরো লেখাটা যে লিখেছে—তার মনের নন্দজ্ঞানের মাত্রা আমার কাছে যথেষ্ট উন্নত বলে মনে হলো। লেখাটা পড়ে আমার মুখে হাসি ফুটে উঠেছিল। কেমন অদ্ভুত না! ফুটপাতে যারা কোনোক্রমে টিকে আছে, তাদের ভেতর কে এমন আছে, যার মনে অক্ষরজ্ঞানের সঙ্গে এমন আনন্দের মিলন ঘটল? সে কি নারী, না পুরুষ! মানুষেরমজ্জাগত ভয়গুলো একটি—নিরাশ্রয় থাকার ভয়। যে ভয় থেকে এই আমিও বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দাসবৃত্তি করে যাচ্ছি।তাকে এমন তৃষ্ণা মেটানো তৃপ্তিসহ কে এমন পান করে নিলো?

মৌয়ের সংসার!

আমার ভাবতে ইচ্ছে করল, মৌ নামে একটি দুঃখী মেয়ের পরিবার গত বর্ষায় কুড়িগ্রামে তিস্তার ভাঙনেনিঃস্বহয়ে, ঠাঁকুরগাঁও এক্সপ্রেস নামের কালের মতো দীর্ঘ এক ট্রেনে চড়ে, ক’দিন হলো ঢাকায় এসেছে। তাদের অস্থাবর সম্পদের শেষ কিছু চিহ্ন পড়ে আছে ফুটপাতে ওই দেয়ালটার গোড়ায়, পলিথিন দিয়ে মোড়া। দেয়ালের ওপার থেকে আসা একটা শিউলির ঘন ছায়া সেই দরদমেদুর বাকশো পেটরার ওপর ছায়া ফেলে রেখেছে। এখানে, কাছেই আছে এক প্রেক্ষাগৃহ— ‘জোনাকি’ নাম। হয়ত পছন্দের কোনো নায়ক-নায়িকা জুটির কোনো ছবির দেয়ালমিত্র দেখে মেয়েটি তার ভেতরকার সুপ্ত সংসারপ্রিয়া সত্তাটিকে সে আহিত করেছে! এরপর রাস্তায় পড়ে থাকা ইটের টুকরো হাতে তুলে নিয়ে, থানার দেয়ালের সরকারি হলুদাভ রঙের ওপর লাল রঙা বর্ণমালায় সেই স্বপ্নটা আঁকার পর, হয়ত মুগ্ধ হয়ে অনেকটাক্ষণ তাকিয়ে থেকেছে।

আমার সামনেই কল্পিত সেই মৌ নামে মেয়েটির মূর্তি ক্রমশ জীবন্ত হয়ে উঠল।

আরো কত অক্লান্ত কল্পনা আমার। কিন্তু ওসব আরোপ করছি যার ওপর, যাদের ওপর, কোথায় তারা? তাদের কারো সঙ্গে আমার একটা দিনও দেখা হয়নি।

এই যে এতোগুলো দিন আসা যাওয়া করেছি; বিকেলে ভেবেছি, এ জায়গাটা আমার পেরিয়ে যাওয়ার একটু আগেও বুঝি ওরা ছিল। রাত গভীরে ফিরে যাওয়ার কালে ভেবেছি, ওরা বোধহয় এখনও ফিরে আসেনি। আমি গলিটার মোড়ে অদৃশ্য হওয়ামাত্র আমার কল্পনায়, মৌ এর বাবা তার ভায়রার কাছ থেকে ধার করা রিকশায় মেয়েকে চড়িয়ে ওই দেয়ালের সামনে এসে থামে। তারপর বাপেতে মেয়েতে ভাত চড়িয়ে লবণ আর লেবু মেখে ভরপেট খেয়ে কিছুক্ষণ গল্প করে। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসতে দেরি হয় না। ফুটপাতের কুশলী মশারির নিচে পরস্পরে জড়াজড়ি এরপর চোখ দু’জোড়া বুজে চুপচাপ শুয়ে থাকে। কখন ঘুমিয়ে পড়ে টেরও পায় না।

আমি তখন দীর্ঘপথ হেঁটে ফিরে সবে আমার বাসা—মাতৃছায়ার সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। ঘুমিয়ে পড়া দারোয়ান আলেকজান্ডারকে নিস্তব্ধতার সঙ্গে আপস করে হিসহিসিয়ে ডাকছি—আলেকজান্ডার! আলেকজান্ডার!

এভাবে দেখতে দেখতে প্রায় একটি মাস কেটে গেল।  মৌ এর সংসারের একটি সদস্যকেও আমি দেখতে পেলাম না। দেয়ালের গোড়ায় যে ক’টি অস্থাবর সম্পদ নীল পলিথিনের আবরণে মোড়ানো ছিল, সেসব তেমনই আছে। নোংরা, বিবর্ণ; ধুলো ময়লার স্তরের ওপর স্তর পড়া আর না পড়া তার সমান। প্রতিদিন আসা এবং যাওয়ার পথে সেদিকে তাকানো আমার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল একপ্রকার। ধীরে ধীরে এমন হলো, চোখদুটো আপনাতেই সেদিকে ওই লেখাটার গিয়ে পড়ে, কিন্তু আগের মতো সেই সব রঙ চড়ানো কল্পনা আর জাগায় না। ধীরে ধীরে এটিও এমন অভ্যাসের বেড়ের ভেতর ঢুকে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল যে; ওই শব্দ ক’টার মিষ্টতা, অর্থ, কল্পনা, ওদের দেখা প্রতীক্ষা—আমার বিবশ হয়ে আসা মনে সচেতন বিক্রিয়াখেলা বন্ধ করে দিলো।

কিন্তু অবচেতনে যে তা তখনও চলছে, বুঝলাম তার ক’দিন পর। হঠাৎ একটা দুর্ঘটনা ঘটল। যে ঘটনার পর আমার অভ্যস্ততা, প্রবোধ, কল্পনা, মনের সুকৌমার্য—ভেঙে পড়ল সব।

ঘটনাটা হয়ত আর দশজনের বিচারের, অভিজ্ঞতার কাছে খুব তুচ্ছ হিসেবে গণ্য হতো, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে তা হলো না। বরং অফিসে যাওয়ার পথটা পর্যন্ত বদলে ফেলে নিজেকে বাঁচাতে চাইলাম।

সেইদিন, আমি দেখেছিলাম, কে বা কারা যেন মৌ নামের ওই মধুর শব্দটি কেটে দিয়ে রোমান বর্ণমালায় রূঢ় করে চেপে ‘sumon’ লিখে দিয়েছে তার ওপর, আর তাই দেখে আমার মনে হলো, মৌ এর পূর্ণতার সংসার বুঝি মানুষের তুচ্ছতা, ক্ষুদ্রতার কাছে বিশ্লিষ্ট শতছিন্ন হয়ে গেল। এতোদিনের ললিত সেই বাক্যটির ওপর এমন কুৎসিত অস্ত্রোপচার আমাকে এতো বেশি আক্রান্ত করেছিল, আমার এতোদিনের অভ্যাস ঠিক কতখানি গভীরে তার শেকড় ছড়িয়েছিল আমি অনুভব করতে পেরেছিলাম।

রাস্তা বদলে অফিসে আসা যাওয়া করি, কিন্তু আমার মনটা থেকে থেকেই সেই দেয়ালের কাছে চলে যায়। সেখানেই পড়ে থাকে। আমার ভেতর একটা অস্পষ্ট প্রতিশোধ স্পৃহা জেগে উঠেই মিলিয়ে যেতে থাকে। আমি তাদের জড়ো করে একটা আকার দিতে না পেরে ছটফট করি। একসময় আবিষ্কার করি, আমার মন যথেষ্ট প্রতিশোধ স্পৃহার অভাবটিকে কৌতূহল আর উদ্যম দিয়ে পূর্ণ করে তুলেছে। এবং শিগগিরআমার আবার সেই পুরনো পথ ধরে হেঁটে যেতে খুব ইচ্ছে হলো। ইচ্ছে করল দেখতে, আর কতটা কী বদল সেখানে ঘটেছে।

এবং, গেলাম। ‘Sumon এর সংসার’ নামে শ্লীলতাবিহীন সেই বাক্যটি আগের মতোই আছে। মৌকে ঘষে মুছে ফেলার এক রাতের চেষ্টাও আর অগ্রসর হয়নি। তেমনই ঝাপসা পাটকিলে লাল রঙা মৌ আমার মনে নথি হয়ে থাকা রক্তাক্ত ইতিহাসকে তার নিভু নিভু আলোর নিচে ধরে রেখেছে। বুঝি কারো পড়ার অপেক্ষায়।

কে এই সুমন? কে সেই স্বঘোষিত সুন্দর মনের অধিকারী, মৌহন্তারক, সংসারপ্রিয়? আমার তাকে দেখতে ইচ্ছে হলো খুব।

তাকে দেখার জন্যেই আমি শক্ত মুখে আবার সেই পুরনো পথে আসা যাওয়া শুরু করলাম। প্রতিদিন ওই স্থান পেরোনোর সময় আমি উত্তেজিত হয়ে থাকি। মনে ভাবি, আজই বোধয় সেই দিন, যাওয়ার পথে আমি দেখতে পাব, বছর ত্রিশের এক রূঢ় চেহারার পুরুষ জায়গাটিতে পা ছড়িয়ে বসে আমার দিকে ঘৃণাভরে তাকিয়ে আছে। ঠোঁটে সস্তার সিগারেট। পাশে বসে আছে রোমওঠা এক পথকুকুর। বসে থেকেও লেজ নেড়ে যাচ্ছে। আর তার জিভ বের করা লালা ঝরা মুখটা যেন তার প্রভুর নাম জপ করে করে ওপরনিচ দুলছে। ভাবতাম, ফেরার পথে দেখব, রাতে শিউলি গাছের ডাল ভেঙে শুয়ে শুয়ে মশা তাড়াচ্ছে অশ্লীলটা। আমি যেন তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে হঠাৎতীব্রকণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম- ‘কী করেছিস মৌকে?’

পরমুহূর্তে আমার মনের যত অবরোধ বুঝি ভেঙে পড়ল সেই অন্ধকারে। হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে কণ্ঠে মিনতি নিয়ে আমি বললাম, ‘বলো না ভাই, ওদের কোথায় তাড়িয়েছ? কেন এমন করলে তুমি!’

আমার কাতর ভেজা কণ্ঠ শুনে লোকটা যেন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।

আরো একটি মাস আমি আসা যাওয়া করলাম ওপথে; এবং সেবারও, কোনোদিন, কাউকে সেখানে দেখতে পাইনি।

এরই মাঝে অফিসের নানা রকম নীতির প্রশ্নে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের সাথে বচসায় জড়িয়ে পড়লাম। কয়েকবার কথা কাটাকাটি হয়ে গেল। তার সঙ্গেউঁচু গলায় অফিসের নীতি বিষয়ে তর্ক করব—এমন পদাধিকার, দাপট কিংবা সমর্থন, কোনোটাই আমার ছিল না। তবু করেছি। একদিন দপ্তরে আমাকে ডেকে নিয়ে, বসিয়ে, প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে পাওনাদির সমস্ত দাবি মুছিয়ে নেওয়ার কৌশলে ওরা আমাকে ‘রিজাইন লেটার’ জমা দিতে বলল। আমি রাগে, ঘৃণায় তখনই একটা অব্যাহতি পত্র লিখতে বসে গেলাম। এরপর যথেষ্ট আত্মনিয়ন্ত্রণ দেখিয়ে ওদের টেবিলের ওপর রেখে, ওদের ঠাণ্ডা চোখের দিকে একবার চোখ করে, ঘুরে দাঁড়ালাম।

এরপর কিছুদিন আমি আর চাকরি বাকরি আর করিনি। পরে আবার নিরুপায় হয়ে দাসবৃত্তিতে জড়াতে হয়েছিল। এবারের জায়গাটা রীতিমতো শহরের আরেক প্রান্তে।আলেকজান্ডারকে স্তব্ধকরে দিয়ে তাই বাসাটাও বদলে ফেলতে হলো। কাজ হারালেও রাস্তাটিকে দেখতে পাওয়ার যে সম্ভাবনাটা ছিল, সেদিনের পর সেটাও গেল।

পল্টন থানার শিউলিঘন দেয়ালের সেই তুচ্ছ বাক্যটা, আজ কেবল একটা তথ্য হয়ে আমার মনে ঘুমিয়ে আছে। তার সঙ্গে এমনকি, কোনো আবেগিক সম্বন্ধও আর নেই।

//জেডএস//

লাইভ

টপ