আমার হাওয়াকল থেকে লেখা চিঠিগুলো প্রথম অনুভূতি ।। আলফস দোদে

Send
অনুবাদ : ফারহানা রহমান
প্রকাশিত : ১০:০০, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২১, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৮

ফরাসি ঔপন্যাসিক আলফস দোদে ১৮৪০ সালের ১৩ মে ফ্রান্সের নাইম শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন উনিশ শতকের একজন বিশিষ্ট গল্পকার ও ঔপন্যাসিক। তাকে মূলত ফ্রান্সের দক্ষিণের প্রাদেশিক জীবনের অনুভূতিপ্রবণ গল্পকার হিসেবে মনে করা হয়। তার ছোটগল্পের সংকলন ‘লেটা দে মু মুলান’ বা 'লেটারস ফ্রম মাই উইন্ডমিল' (বাংলায় : আমার হাওয়াকল থেকে লেখা চিঠিগুলো) তাকে সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। ১৮৬৯ সালে চিঠিগুলো প্রথম সম্পূর্ণভাবে বই আকারে প্রকাশিত হয়। তবে এর আগে ১৮৬৫ সালের শুরুতে কিছু কিছু গল্প ‘লে ফিগারো’ ও ‘এল ইভেনমেন্টের’ মতো ওই সময়ের বিখ্যাত পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছিল। 'লেটারস ফ্রম মাই উইন্ডমিল’ কে আলফস দোদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২৪ টি গল্পের এই গ্রন্থের অন্যতম জনপ্রিয় গল্প ‘ফার্স্ট ইম্প্রেশন’ বা ‘প্রথম অনুভূতি’ বাংলা অনুবাদে প্রকাশ করা হলো।

প্রথম অনুভূতি

আমি যখন পৌঁছলাম, কে বেশি অবাক হয়েছিল—আমি নাকি খরগোশগুলো, সে ব্যাপারে নিশ্চিত নই। দরজাটা বহুদিন থেকে ভেজানো আর খিল দেওয়া ছিল। দেয়ালগুলো এবং মাচা এমনই আগাছায় ভরা ছিল যে, সহজেই বোঝা যায়, খরগোশগুলো একটা ব্যাপার ঠিকই অনুভব করতে পেরেছে—সেটা হচ্ছে, মিলের  মালিকরা এখন মৃতপ্রায় বংশমাত্র। আসলে এই পরিত্যক্ত জায়গাটি তাদের দারুণ পছন্দ হয়েছিল। উইন্ডমিলটাকে তারা তাদের সাধারণ ও কৌশলগত সদর দফতর হিসেবে একেবারে উপযুক্ত জায়গায় পরিণত করেছিল।

 যে রাতে আমি প্রথম ওখানে গেলাম, সত্যি করে বলছি, তারা কুড়ি জনেরও বেশি ছিল। তখন চাঁদের আলো পোহাচ্ছিল।

ওরা আমার অ্যাপ্রনের চারপাশে ঘোরাঘুরি করছিল। যখন আমি একটি জানালা খুলে দিলাম, পুরো বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের ছোট ছোট লেজ নাচাতে শুরু করলো। এরপর তারা তুলোর মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেলো। আমি জানি, তারা শগিগিরই ফিরে আসবে!

আরেকজন বিস্ময়কর বাসিন্দা, যে আমার আসায় মোটেও সন্তুষ্ট ছিল না, সে হচ্ছে বুড়ো, চিন্তাশীল, অলক্ষ্মী চেহারার একটি পেঁচা—যে প্রায় বিশ বছর ধরে স্থায়ীভাবে এখানে ভোগ দখলকারী হিসেবে রয়েছে। আমি তাকে পড়ে থাকা পলেস্তারা ও টালির ওপর দৃঢ়, অনড় এবং বিশ্রামরত অবস্থায় দেখলাম। সে মুহূর্তের মধ্যে আমার ওপর তার বড় বড় গোল চোখ দিয়ে একবার দেখে নিলো। সম্ভবত একজন অপরিচিত ব্যক্তির উপস্থিতিতে সে ভীষণ হতাশ হয়েছে। সে তারস্বরে চিৎকার করে উঠলো এবং যন্ত্রণাদায়কভাবে সাবধানে তার ধূলিমলিন, ধূসর পাখাগুলোকে বিষণ্ণতার সঙ্গে ঝাঁকাতে থাকলো। সে একজন বিশিষ্ট চিন্তামগ্ন প্রাণী। নিজেকে হয়তো কখনো সেভাবে পরিষ্কার করে রাখে না। তবে, এটা আসলে কোনও ব্যাপারই না। এমনকি তার পিটপিট করা চোখ নিয়ে ও গোমরামুখো অভিব্যক্তি নিয়েই এই বিশেষ ভোগ দখলকারী আমার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মানানসই হবে বলে আমি মনে করি। তাই আমি তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম যে, একেই একমাত্র আমার সঙ্গে থাকার জন্য স্বাগত জানানো যায়।    

যেখানে সে সবসময় ছিল, সেই মিলের সবচেয়ে উঁচুতে, ছাদে আসার ব্যক্তিগত প্রবেশ পথে, সেখানেই সে থাকলো। আমি ছাদের কিছুটা নিচের দিকে—চুনকাম করা, দরজায় খিল দেওয়া যায়, এমন একটি নিচু ছাদের ঘরে থাকতে শুরু করলাম। কক্ষটি আসলে অনেকটা নানদের ডাইনিং রুমের মতো দেখতে।

আমি আমার উইন্ডমিল থেকে তোমাকে লিখছি—এখানে খোলা দরজা দিয়ে বিস্তৃত উজ্জ্বল রোদের আনাগোনা। আমার সামনে একটি সুদৃশ্য ঝলমলে মাতাল পাইন গাছ পাহাড়ের নিচের দিকে ডুবে আছে। এখান থেকে আল্পস সবচেয়ে কাছের পর্বতমালা, সেও অনেক দূরের। তাদের অভিজাত ছায়া আকাশের প্রতিকূলে গা ঘেঁষাঘেঁষি করছে। এখানে খুব কম শব্দ শোনা যায়, কোথাও একটু ম্লান বাঁশির সুর, ল্যাভেন্ডারের সুগভীরে হয়তো কোনও চক্রবাক ডেকে চলেছে , কোথাও কোনও গলিপথে ঘোটকীর পায়ের টুংটাং শব্দ বেজে চলেছে। প্রঁভাসের আলো সত্যি প্রাকৃতিক ভূ-চিত্রকে দারুণ সুন্দর করে তোলে।

তুমি কি এখন অবাক হবে না, যদি বলি, আমি তোমার সাদাকালো ও ব্যস্তবাগীশ প্যারিসকে মিস করছি? আসলে তা একটুও না। প্রকৃতপক্ষে আমি আমার এই উইন্ডমিলে খুব সন্তুষ্ট আছি। এটা এমনই উষ্ণ, মিষ্টি সুগন্ধময় জায়গা, যা আমি খুঁজছিলাম। যেটি সংবাদপত্র থেকে, ভাড়াটে ঘোড়ার গাড়ি থেকে ও আরও কুহেলিকা থেকে বহু বহুদূরে। এছাড়া, দারুণ দারুণ সুন্দর সব জিনিস দিয়ে এখন আমি ঘিরে আছি। এখানে মাত্র আট দিন থাকার পরই আমার মনটা অবিস্মরণীয় সব স্মৃতি আর অদ্ভুত সব গভীর আবেগে তোলপাড় করে উঠছে। উদাহরণস্বরূপ, গতকাল সন্ধ্যায় আমি পাহাড় থেকে খামার পর্যন্ত ঝাঁক বেঁধে ফিরে আসা প্রাণীদের দেখেছি এবং শপথ করে বলতে পারি যে, আমি প্যারিসে পুরো সপ্তাহের নাটক দেখার দামের বিনিময়েও এখানকার পাহাড়ের ঢালের এই বিস্ময়কর একটি মুহূর্তকেও অদল-বদল করবো না। ঠিক আছে, আমি না হয় তোমাকেই বিচারক বানাবো।

এখানে প্রঁভাসে একটি প্রচলিত অভ্যাস হচ্ছে, বসন্তের উষ্ণ সময়ে ভেড়াদের পাহাড়ে পাঠিয়ে দেওয়া। প্রায় ৫/৬ মাস ধরে মানুষ ও পশুর দল একইসঙ্গে আকাশের  নিচে  ঘাসের ওপর বসবাস করে। যখন প্রথম হেমন্তের শীতল বাতাসে অনুভব হয়, তখন তাদের দল বেঁধে মাঠে ফিরিয়ে আনা হয়। আর তখন তারা  আশেপাশের পাহাড়ে আরামদায়কভাবে চিরহরিৎ সুগন্ধযুক্তগুল্মের ওপর চরে বেড়াতে পারে। এই বার্ষিক আনন্দ উৎসব, এই ভেড়ার পালের ফিরে আসা গতরাতে শেষ হয়েছে। ঊষা থেকেই দু’দরজা বিশিষ্ট গোলাঘর খুলে রাখা হয় এবং তাজা খড় দিয়ে তা ভরে ফেলা হয়। মেষের পাল প্রকৃতপক্ষেই তখন কোথায় ছিল, সে ব্যাপারে সেখানে আকস্মিক, উদ্দীপ্তপূর্ণ জল্পনা-কল্পনা চলতো। গুজব ছিল যে, তারা এখন ইগুয়েরস বা প্যারাদুওতে আছে।

তারপর হঠাৎ, সন্ধ্যার দিকে আমরা একটি জোরালো শব্দ শুনতে পেলাম, ‘তারা চলে এসেছে’ এবং আমরা চমৎকার ধুলোর মেঘ দেখতে পেলাম। যা পশুর পালকে দৃশ্যমান করে দিল—যেন এটা বরাবর এই পথেই চলমান ছিল। এতে এমন অনুভূত হলো যে, এটা গ্রেট মার্চ হোমের পথেই সবকিছুকে জড় করবে। বুড়ো ভেড়াগুলো, যাদের শিঙগুলো তীক্ষ্ণভাবে সামনের দিকে ঝুকে আছে, তারাই পেছনের সব ভেড়াদের নেতৃত্ব দিচ্ছে। ভেড়াগুলোকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে আর তাদের পায়ের কাছে পড়ে আছে। এরপর জিভ ঝোলাতে ঝোলাতে ঊর্ধ্বশ্বাসে পরিশ্রান্ত মেষ পাহারাদার কুকুরগুলো আসে। আর মাটির সঙ্গে গড়ানো ঢিলাঢালা লাল কোট পরিহিত দুই ফিতাওয়ালা মেষপালক তাদের সঙ্গ দেয়।

গুদামঘরের দরজার ভেতর সম্পূর্ণ অধিগ্রস্ত হওয়ার আগেই এই পুরো প্রদর্শনীটি সানন্দে পরিবেশিত হয়ে যায়। গ্রীষ্মের প্রবল বর্ষণের মতো তারা নিজেদের ভেতর ভীষণ শব্দে ওলট-পালট করে। আসলে এর ভেতরের অস্থিরতা তোমার দেখা উচিত ছিল। নতুন আগন্তকদের স্বাগত জানাতে বিশাল সিল্কের ঘাগরা পরা, সবুজ ও সোনালি ময়ূরগুলো উচ্চস্বরে তাদের ভেঁপু বাজাতে থাকলো।  কাকডাকা ভোরে ঘুম ভেঙে গেলেই মুরগিগুলো চারিদিকে নিজেদের মতো করে ছড়িয়ে পড়ে। সমস্ত কবুতর, হাঁস, টার্কি ও গিনি ফাউলগুলো দুরন্তভাবে দৌড়াদৌড়ি করতে করতে উড়ে বেড়ায়। পুরো হাঁস-মুরগির দলটা একেবারে পাগল হয়ে যায়।

তুমি হয়তো ভাববে যে, প্রত্যেকটি মেষ তার লোম দিয়ে বন্য পর্বতের বায়ুকে মাদকাসক্ত ডোজ ফিরিয়ে দিচ্ছে যা অন্যসব প্রাণীকে পাগলের মতো লাফালাফি করতে উদ্বুদ্ধ করে।  

এই সব উত্তেজনার মধ্য দিয়ে, মেষের দল কোনোভাবে নিজেদের মধ্যে বসতি স্থাপন করতে সক্ষম হয়। বাসায় ফিরে আসার মতো এত আনন্দদায়ক কোনও ব্যাপার তুমি অন্য কোনও কিছুর সঙ্গে কল্পনা করতে পারবে না। বুড়ো ভেড়াগুলো তাদের বাড়ির খামারে দৃশ্যতই আয়েশ করে আরাম পোহাচ্ছিল। তখনই হয়তো একইসঙ্গে ছোট ছোট মেষের বাচ্চাগুলো চারদিকের এই অত্যাশ্চর্য পরিবেশে জন্ম গ্রহণ করছিল। 

কিন্তু আসলে বলতেই হয় যে, সবার মধ্যে কুকুরগুলোই সবচেয়ে বেশি স্পর্শকাতর ছিল। আর মেষ পাহারাদার ভদ্র কুকুরগুলো খুব ব্যস্তভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিল, যতক্ষণ না মেষের সমস্ত দল নিরাপদে খামারে ফিরে গেলো। পাহারাদার কুকুর বাসস্থান থেকে ঘেউ ঘেউ করে তাদের ডেকে আনার সর্বাধিক চেষ্টা করতো এবং কুয়ার বালতি থেকে উপচেপড়া ঠাণ্ডা পানি দিয়ে অন্য পশুদের প্রলুব্ধ করতো। কিন্তু কোনোকিছুই তাদের ভ্রান্ত করতে পারতো না অন্তত ততক্ষণ, যতক্ষণ পর্যন্ত না পশু-পাখিগুলো নিরাপদে নিজেদের খোয়াড়ে ফিরে যেতো। ছোট্ট গেটটি নিরাপদেই তার বড় নাটবল্টু দিয়ে আটকানো থাকতো এবং মেষপালক নিচু ছাদওয়ালা ঘরের টেবিলে বসে থাকতো। কেবল তখনই কুকুরগুলো নিজেদের খোঁয়াড়ে গিয়ে সন্তুষ্ট হতো।

আর ঢালু স্থানে গিয়ে তাদের পিছলে পড়া, পাহাড়ে তাদের উত্তেজনাপূর্ণ অভিজ্ঞতার কাহিনি অন্য প্রাণীদের কাছে বর্ণনা করতো। এগুলোতে নেকড়েদের রহস্যজনক জগতের রমরমা সব বর্ণনা থাকতো। এছাড়া থাকতো শিশিরে উদ্বেল হওয়া লম্বা সব বেগুনি লতাগুল্মের বর্ণনাও।

//জেডএস//

লাইভ

টপ