দেশে-বিদেশে লাইব্রেরি সেবা

Send
আলম তালুকদার
প্রকাশিত : ১৫:৩৬, ডিসেম্বর ১০, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫২, ডিসেম্বর ১০, ২০১৮

আমরা কি লাইব্রেরিকে 'প্রতিষ্ঠান বলতে পারি? প্রতিষ্ঠানের সংজ্ঞা অনুযায়ী বলাই যায়। এর যাত্রা শুরু খৃস্টের জন্মের অনেক আগে। ‘অসুরবানী পাল’ লাইব্রেরিকে এখনো প্রাচীন লাইব্রেরি মনে করা হয়। যাক, আমি ইতিহাসের বাঁকে না গিয়ে আমার জীবনের ফাঁকে ফাঁকে পাবলিক লাইব্রেরিতে মহাপরিচালক থাকাকালীন লাইব্রেরি সেবার সাতকাহন পাঠকদের সাথে একটু শেয়ার করতে চাই।

সঙ্গত কারনেই আমাদের দেশ উন্নত দেশের চেয়ে অনেক দিক থেকেই একটু পিছিয়ে। কেন পিছিয়ে তার ১০০১টি কারণ লিপিবদ্ধ করা যাবে।

যা হোক, ডিজি থাকার সময়ে আমার একান্ত চেষ্টার ফলে, লাইব্রেরিতে কর্মরত কর্মকর্তাদের প্রতি বছর ৪/৫জন বিদেশে যাবার মহান সুযোগ লাভ করে। এর আগে বিদেশে যাবার কোনো সুযোগ ছিল না!ডিজি থাকাকালীন সময়ে আমি মালয়েশিয়া, চীন ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের লাইব্রেরি পরিদর্শনের সুযোগ পেয়েছিলাম।

২০১১ সালে আমি আর আমার এক সহকর্মীকে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে সফর করি। এই যাওয়া কিন্তু ‘উঠ ছেরি তোর বিয়া!’ ঠিক তা নয়। সরকারী জিও বের করা, পাসপোর্ট-ভিসা সংগ্রহ সহ সে অনেক রকমের হ্যাপা। আমার নিচের অফিসারদের অনুমোদন দিবেন মন্ত্রী মহোদয়, আর ডিজির অনুমোদন নিতে হয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট থেকে। এসব ফরমালিটি এক দেড়মাস আগে থেকে করতে হয়। তাছাড়া নানান কোয়ারি! পশ্চিমবঙ্গে লাইব্রেরি দেখার কী আছে? যুক্তি দেখাতে হবে! তার বাংলাদেশ দূতাবাসকে লিখতে হবে তারা ঐ দেশের মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করে আমাদের জন্য প্রোগ্রাম তৈরি করবে। বিমানবন্দরে দূতাবাসের লোক আসবে। আমাদের কোথায় কোন হোটেলে রাখবে সেসব নিয়ে পরিকল্পনাসহ বিবিধ ঝামেলা! তাছাড়া লাইব্রেরির ডিজি আবার লাইব্রেরি ভিজিট করবে কেন? এটার কী প্রয়োজন? আমাদের দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চলমান আছে, যেমন পরিবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান. ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, কোর্ট কাচারি, হাসপাতাল ইত্যাদি ইত্যাদি। এসবের মাঝে লাইব্রেরির নাম কি আসে? সম্ভবত আসে। সাধারণভাবে আমরা প্রতিষ্ঠান বলতে বুঝি যার প্রতি মানুষের আস্থা, বিশ্বাস, ভক্তি শ্রদ্ধা আছে, মূল্যবোধ আছে। প্রতিষ্ঠানের একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা বেশি পরিস্কার হতে পারে। যেমন, আমাদের অনেকেরই সার্টিফিকেটের জন্ম তারিখ ও সাল ঠিক নেই। কারণ এসএসসি পরিক্ষা হওয়ার আগে মাধ্যমিক বিধ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তার মনের মাধুরি মিলিয়ে একটা বসিয়ে দিয়েছেন, আর রেজিস্ট্রশন হয়ে গেছে ভুল তারিখে। এখন? কেউ যদি কোর্টে চ্যালেঞ্জ করে যে ঐ ব্যাটার জন্ম তারিখ ঠিক নাই! কোনো কাজ হবে না। ঐ যে প্রধান শিক্ষক দিয়েছেন। কোর্ট কাচরি সরকার ঔটাই সঠিক বলে বিবেচনা করবে। এটাই প্রতিষ্ঠানের মাজেজা।

প্রাচীন বলে লাইব্রেরিকে আমরা সামাজিক প্রতিষ্ঠান বলতেই পারি। আর লাইবেরিতে কী কী থাকে তা আমরা সকলের জানি। প্রধানত বই, পেপার. জার্নাল ইত্যাদি। এই ‘বই শব্দটি এসেছে, আরবি ‘ওহি’ হতে। আরবি ‘ওহি’ হতে ফারসি শব্দ ‘বহি’। আর এই ‘বহি’ হতে ‘বই’ শব্দের উৎপত্তি। আরবি ‘ওহি’ শব্দের অর্থ হলো, প্রত্যাদেশ, জ্ঞান বা প্রজ্ঞা। লাইব্রেরি হলো এমন একটা স্থান যেখানে সময় নিয়ে যেতে হয়।

পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশ ব্রিটিশদের শাসনে ছিল। এই কারণে আমাদের ও তাদের শাসন ও শোষণ ব্যবস্থায় অনেক মিল আছে। আমাদের দেশের মতো ঐ দেশে সরকারী-বেসরকারী লাইব্রেরি আছে। প্রতি বছর বাজেট আছে। বেসরকারী লাইব্রেরিতে স্থানীয়ভাবে সরকারী লোক নিয়োগ দেয়া আছে। তাদের বেতন-ভাতা সরকার থেকে প্রদান করা হয়। এমনকি পশ্চিমবঙ্গে একজন লাইব্রেরির জন্য একজন মন্ত্রীও আছে! প্রায় সবকিছু আমাদের মতই, তবে একটা জিনিস নতুন—যেমন, বেকারদের মানে চাকরি প্রার্থীদের পড়ার জন্য আলাদা কক্ষ আছে। তারা বাইরে থেকে বই নিয়ে আসতে পারে। তবে বেসরকারি লাইব্রেরিতে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের-কর্মচারিদের সম্পৃক্ত করা হয়।

বই ক্রয় কমিটি আছে বেশ কয়েক সদস্যের। তাদের জন্য বিশাল কক্ষ বরাদ্দ আছে। প্রাপ্ত বই সকল বড় রুমের টেবিলে সাজিয়ে রাখা হয়। সদস্যরা এসে একাকী বা দলবদ্ধভাবে বই সিলেকশন করে থাকেন। তাতে বাজে বই কেনার ঝুঁকি কমে যায়।

এবার মালয়েশিয়ায় যাওয়া যাক। বিশাল দেশ। কয়েকটা বাংলাদেশ ঢুকে যাবে। লোকসংখ্যা মাত্র তিনকোটি! মুসলিম দেশ। ওদের ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে যাওয়ার ব্যবস্থা হলো। ওরা তখন ওটোমেসিনের শেষ পর্যায়ে। ঐ দেশও বিটিশদের অধীনে ছিল। ওদের পাঠকদের জন্য সুযোগ-সুবিধা অনেক বেশি। সেন্ট্রাল এসি লাইব্রেরি। বড় দেশ সুবিধাও অনেক বড়। লাইব্রেরির প্রধান দোভাষীর মাধ্যমে আমাদের সাথে বাৎচিত করেন। পাঠক? ওরা জানায় অভাব নেই। বই ধার দেওয়ার সিস্টেম বিদ্যমান। আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে একেবারে গ্রাম পর্যায়ে লাইব্রেরির সার্ভিস থাকা দেখে। সেখানে সেন্টার রয়েছে মা ও শিশুদের জন্য। চিকিৎসা সেবা এবং পড়াশুনা একসাথে! স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার ব্যবস্থা সেখানে শেখানো হয়। মালয়েশিয়ার গ্রামের পথে চলতে গিয়ে দাড়িপাল্লা মার্কাও দেখেছি!

চীনের কথা আর কী বলবো! এরা তো সব বিষয়ে এগিয়ে! উদ্ভট যত আইডিয়া তাদের মাথা থেকেই যেন বের হয়! ওরা ব্রিটিশদের অধীনে কোনোদিনই ছিল না। ফলে ওদের রাষ্ট্রচালনা ভিন্নরকমের। আমাদের প্রথম দিন ‘ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ চায়না’তে যাওয়ার সুযোগ হলো। কত তলা? ঘাড় বাঁকা হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। ডিজাইন ভিন্নরকম। সেন্ট্রাল এসি। কার্ড ছাড়া কেউ ঢুকতেই পারবে না। দশ মিনিটের মধ্যে আমাদের কার্ড তেরি হলো। তাতে ছবি ও অন্যান্য তথ্য যুক্ত হলো। পাঞ্চ করে তারপরে ভিতরে ঢুকলাম। ঢুকতেই বারান্দায় দেখলাম সোফাসেটে বেশ কয়েকজন পাঠক ঘুমাচ্ছেন! কী ব্যাপার? এটাই নাকি স্বাভাবিক! ঘুমাবে পড়বে। আবার ঘুমাবে। গোসলের সুবিধা, তাও নাকি আছে! দেখতে চাইনি! তাপরে দেখলাম শিশুদের খেলাধুলার সু-ব্যবস্থাও মজুত আছে! তাইতো বলি, ‘বাবা লাইব্ররিতে কেনে আসবা না? আসিতে হইবেই’!

ওদের লাইব্রেরি পুরোটাই অটোমেটেড। বই চুরির প্রশ্নই  আসে না। পরিচ্ছন্ন, ঝকঝকে-তকতকে। লাইবেরির নির্মাণ শৈলী অসাধারণ। মাঝখানে ফাঁকা। আকাশে রোদ থাকলে কোনো কক্ষে লাইট জ্বালাতে হয় না!

প্রদেশ পর্যায়ে এবং জেলা পর্যারে লাইব্রেরি দেখেছি। না! ওদের সেবার তুলনাই হয় না! এলাকা ভিত্তিক লাইব্রেরিতে যাবার সূচি করা থাকে। খাবার জন্য বাইরে যেতে হবে না। ভিতরেই সুব্যস্থা আছে।  এমনভাবে করা যাতে রিডারদের কোনো সমস্যা না হয়! মনে হলো অনেকটা জামাই আদর। শুনলাম, তাদের দেশের জনপ্রতিনিধি হতে শুরু করে সমাজের প্রায় সব পর্যায়ের প্রতিনিধি লাইব্রেরির সাথে সম্পৃক্ত আছে। শিশুদের জন্য রয়েছে অগ্রাধিকার। বয়স্কদের জন্য প্রতিবন্ধিদের জন্যও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান রয়েছে।

আমাকে যদি প্রশ্ন করা হয় বাংলাদেশ তুলনায় উপরে উল্লেখিত তিনদেশের লাইব্রেরি কোনে দিক হতে এগিয়ে আছে? এক কথায় এর জবাব হলো, শান্তি-স্বস্তি, আরাম-আনন্দ দিক থেকে। যা আমরা পাঠকদের এখনো নিশ্চিত করতে পারি নি। ঐসব দেশে এমনিতে শিক্ষিতের হার বেশি। আবার তাদের নিজেদের মধ্যে কমিটমেন্টের একটা ব্যাপার তো আছেই। এই ক্ষেত্রে আমাদের ঘাটতি আছে। চীনারা ‘বিটিভি’ দেখে। আর কোনো চ্যানেল তারা অহরহ দেখে কিনা জানি না। কারণ, আমি হোটেলের রুমে টিভি অন করার পর দেখি বিটিভি। তবে বাংলা কথা বলে না! কি আশ্চর্য! পরে জানতে পারলাম বেইজিং টেলিভিশন’। আমাদের মতো ওদের অবাধ স্বাধীনতা নেই। প্রায় সবকিছু সরকার নিয়ন্ত্রিত। মসজিদে আজান হয় ঠিক। তবে মাইকে কখনো নয়!।

আমাদের দেশে যারা লাইব্রেরিতে চাকরি করেন, মানে পাঠকদের সেবা দান করেন এবং যারা বই পড়তে আসেন তাদের জন্য রঙ্গনাথনের পঞ্চনীতি অবশ্য পাঠ্য। কিন্তু মাত্র কিছুজন বাদে প্রায় সবাই এই নীতিতে পাঠক সেবায় মোটেই অভ্যস্থ নয়! এই বিখ্যাত পাঁচটা নীতি হলো: ১. বইগুলো ব্যবহারের জন্য, ২. প্রত্যেক পাঠকের জন্য বই থাকবে, ৩. প্রতিটি বই পাঠকের জন্য, ৪. পাঠক তার সময় বাঁচাবে, ৫. গ্রন্থাগার ক্রমবর্ধমান । এই পাঁচটি নীতির সাথে বই ক্রয়, বই সূচিকরণ, বই সংরক্ষণ. বই ধার দেয়া, বই নির্বাচন, পাঠকদের প্রতি সৌজন্য ব্যবহার ইত্যাদি ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। কোন বই কোন সেলফে আছে পাঠকক্ষের কর্মীকে জানতে হয়। অনেকটা ঔষধের কর্মচারীর মতো। বলা মাত্র ঠিক জায়গায় হাত চলে যায়। একবার যে পাঠক লাইব্রেরিতে আসবে সে বারবার আসবে, কারণ লাইব্রেরিতে এমন কেউ আছেন যে তার পছন্দ-অপছন্দকে মূল্যায়ন করতে পারেন। তার রুচি মতো বই নির্বাচন করতে পারেন। কেমন লাইব্রেরি চাই, কেমন লাইব্রেরিয়ান চাই, কেমন বই চাই? এসব কথা স্বয়ং কবিগুরু ১৩৩৫ বাংলা সালে তার একটা প্রবন্ধে খুব পরিস্কারভাবে বলে গেছেন। কিন্তু সেটা সংশ্লিষ্টরা পড়েছেন কি না তা নিয়ে আমার সন্দেহের অবকাশ আছে বৈকী! পাঠক যখন পাঠকক্ষের কর্মীদের কাছে জানতে চান অমুক বইটা আছে কী? যদি জবাব আসে, দেখেন! তাহলে ঐ পাঠকের মনোভাব কী হতে পারে?

এমন আচরণ মোটেই কাম্য নয়। এই বিচিত্র জগতে বিচিত্র মানুষের বসবাস। কেঊ বউ পাগল, কেউ আবার বই পাগল। ফান্সিস বেকন বলে গেছেন, ‘কিছু বই দেখতে হয়, কিছু বই পড়তে হয়, আবার কিছু বই চিবিয়ে গিলতে

পাদটিকা: সরকারি চাকরির সবচেয়ে সুবিধা হলো এই চাকরি সহজে কেউ খাইতে পারে না। খাইলেও কোর্ট তার পক্ষে রায় দিবে এবং  কয়েক বছর বসে থেকে পুরো সুবিধা ভোগ করবেন। কিন্তু লাইব্রেরি হলো সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। আমি বলি, অনেকটা কন্যা পক্ষ। কন্যা দায়গ্রস্থ পিতা-মাতা। কিন্তু কিছু ব্যতিক্রম বাদে ছেলে পক্ষের পক্ষপাতি! বর্তমানে লাইব্রেরির আরো কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। কারণ, জানার জন্য, গবেষণার জন্য, বিনোদনের জন্য অনেক মাধ্যম মানুষের হাতের মুঠোর মধ্যে। এই কারনে সেবাটা নাকের কাছে বা চোখের সামনে নিতে হবে। নতুবা দেখা যাবে লাইব্রেরি এক সময় জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।

লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগার; শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযোদ্ধা।

//জেডএস//

লাইভ

টপ