শান্তিতে নোবেলজয়ী নাদিয়া মুরাদের আত্মজীবনী দ্য লাস্ট গার্ল ।। পর্ব-০৭

Send
অনুবাদ : সালমা বাণী
প্রকাশিত : ০৯:০০, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:০০, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৮

অধ্যায় : ০৩

ইয়াজিদিরা বিশ্বাস করতো ঈশ্বর বা গড মানুষ সৃষ্টির পূর্বে সাতটি পবিত্র আত্মা তৈরি করেন। যাদের বলা হয় এ্যাঞ্জেল, যে নিজেই নিজেকে পরিচালনা করে। মুক্তার  আকৃতির পৃথিবী সৃষ্টির পর ঈশ্বর সর্বপ্রথম তার প্রধান এ্যাঞ্জেল  অথবা ফেরেশতা তাওউসি মিলেককে পৃথিবীতে প্রেরণ করে। এখানে এসে সে ময়ুরের বেশ ধারণ করে এবং পৃথিবীকে সে তার পাখার সমস্ত উজ্জল রং দিয়ে রাঙায়। এভাবে পৃথিবীর সৃষ্টির গল্প এগুতে থাকে। তাওউসি মিলেক ঈশ্বরের সৃষ্টি প্রথম মানবের সাথে সাক্ষাত করে। ঈশ্বরের প্রথম মানব আদম হলো নিখুঁত এবং মৃত্যুঞ্জয়ী। এ্যাঞ্জেল তাওউসি মিলেক ঈশ্বরের সৃষ্ট এই মানবকে অস্বীকার করে। যদি আদম পুনরায় মানব জন্মদান করতে সক্ষম হয় তাহলে সে মৃত্যুঞ্জয়ী হতে পারবে না।  এবং সে নিখুঁত থাকতে পারবে না বলে তাওউসি মিলেক ঈশ্বরকে পরামর্শ দান করে। তাকে গন্ধম খেতে হবে, যেটা ঈশ্বর তার জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। ঈশ্বর তার সকল এ্যাঞ্জেলদের বলে যে পৃথিবীর ভাগ্য নির্ধারণ তাওউসি মিলেকের হাতে। সুতরাং আদমকে গন্ধম খেতে হয় এবং সে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়। যার দ্বিতীয় প্রজন্ম ইয়াজিদিরা পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে।

নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার জন্য তাওউসি মিলেক পৃথিবীতে ঈশ্বরের দূত হিসেবে নিয়োগ লাভ করে। সে স্বর্গের সাথে মানুষের সম্পর্ক স্থাপন করে। আমরা প্রার্থনা করি তাওউসি মিলেককে। তাওউসি মিলেক যেদিন পৃথিবীতে আগমন করেছিলো সেই দিনটিকে আমরা উদযাপন করি নববর্ষ হিসাবে। সেদিন ময়ুরের অবয়ব, মূর্তি অথবা প্রতীক দিয়ে ইয়াজিদিদের বাড়ীঘর সাজানো হয়। ময়ুরের অবয়ব দিয়ে সাজানোর মূল উদ্দেশ্য হলো তার প্রতি ভক্তি প্রদর্শন করা। এর ভেতর দিয়ে স্মরণ করা হয় তাহার মাহাত্মের। যে মাহাত্ম আমাদের অস্তিত্ব দান করেছে। ঈশ্বরের প্রতি তাওউসি মিলেকের সীমাহীন ভক্তির কারণে ইয়াজিদিরা তাকে অত্যন্ত ভালবাসে। তার মাধ্যমে ইয়াজিদিরা তাদের ঈশ্বরের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে। ইরাকি মুসলমানদের নিকট আমাদের এই ধর্ম বিশ্বাসের কোন মূল্য নাই। তারা মনে করে আমাদের ধর্ম বিশ্বাসের যেসব গল্প প্রচলিত, তার কোন সত্যতা নাই। তারা চায় আমাদের মানুষেরা ময়ূর ফেরেশতার প্রতি ভক্তি বিসর্জন দেবে এবং তাদের ঈশ্বরকে প্রার্থনা করবে।

এই কথা বলতেও বেদনা বোধ করি কারণ এসব নিয়ে কথা বলারও অনুমতি নেই ইয়াজিদিদের। ইরাকিরা ময়ূর ফেরেশতার গল্প শুনে ইয়াজিদিদের শয়তানের উপাসক বলে আখ্যায়িত করে। তারা ময়ূর ফেরেশতা তাওউসি মিলেককে কোরআনে বর্ণিত ইবলিশের সাথে তুলনা করে। তার এটাও বলে যে আমাদের ময়ূর ফেরেশতা তাদের এ্যাডামকে প্রতিরোধের চেষ্টা করেছে, সুতরাং সে ঈশ্বরের বিরোধীতা করেছে। বিশ শতকের প্রথম দিকে ইরাকি ধর্মীয় গুরুগণ ধর্ম বিষয়ক গ্রন্থাদি বিতরণ শুরু করে। এই সব ধর্মগুরুগণ ইয়াজিদিদে ঐতিহ্যবাহী মৌখিক ধর্ম প্রচার সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল। তারা তাদের  ধর্ম বিষয়ক গ্রন্থে প্রচার করা শুরু করে যে, আদমকে সেজদা করতে অস্বীকার করার কারণে তাওউসি মিলেককে নরকে প্রেরণ করা হয়েছে। যদিও এটা ছিল সম্পূর্ণ অসত্য এবং ভুল ব্যাখ্যা, কিন্তু এটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনলো।  ইয়াজিদিরা গভীর ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে যা ধারণ করতো তাদের মঙ্গলের জন্য সেই বিশ্বাসকে প্রতিপক্ষ গণহত্যার যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করে ।

ইয়াজিদিদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্য এটা একটা জঘন্য মিথ্যা ছিল, যদিও এটিই গণহত্যার প্রধান কারণ ছিল না। প্রতিপক্ষ বলা শুরু করে, ইয়াজিদি আলাদা কোন ধর্ম নয়। কারণ বাইবেল অথবা কোরআনের মতো  ইয়াজিদিদের লিখিত ধর্মগ্রন্থ নেই। তাওউসি মিলেকের পৃথিবীতে আগমনের দিন হলো বুধবার। সেদিন দিনব্যাপী ইয়াজিদিরা প্রার্থনায় মগ্ন থাকে। বহু ইয়াজিদি সেদিন গোসল করে না। প্রতিপক্ষ এই ব্যাপারটিকে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা শুরু করে। তারা প্রচার চালায় যে, ইয়াজিদিরা নোংরা অপবিত্র। আমরা সূর্যকে প্রণাম ও প্রার্থনা করি। একারণে আমাদের ডাকা হয় ‘পেগান’। পুনর্জন্মে বিশ্বাস মৃত্যুকে গ্রহন করতে আমাদেরকে সহায়তা করে। এই বিশ্বাস আমাদের গোত্রকে একতাবদ্ধ করে রাখে। কিন্তু মুসলমান ধর্ম বিশ্বাসে শুধু নয়, সমগ্র আরব বিশ্বের আব্রাহিম অনুসারীদের কোন ধর্মই পুনর্জন্মে বিশ্বাস করে না। ইয়াজিদিরা অনেক ধরণের খাদ্য গ্রহণ করে না। যেমন অনেক ইয়াজিদি আছে যারা লেটুস খায় না। এজন্য ইয়াজিদিদের ব্যঙ্গ ও উত্যক্ত করা হয়। ইয়াজিদিদের অনেকেই নীল রংয়ের পোশাক পরিধান করে না। কারণ নীল হলো তাওউসি মিলেকের পবিত্র রং। এটা পবিত্রতার প্রতীক, এটা মানুষদের পরিধানের জন্য অতি পবিত্র। এই বিশ্বাসের কারণেও ইয়াজিদিদের নির্যাতন ও কটাক্ষের স্বীকার হতে হয়।

কোচোতে বেড়ে ওঠার কারণে ইয়াজিদি ধর্ম সম্পর্কে আমার নিজেরও জ্ঞানের পরিধি ছিল সীমিত। খুব স্বল্প সংখ্যক ইয়াজিদি ধর্মের বিধি-নিষেদের এর মধ্যে জন্ম গ্রহণ করতো অথবা বেড়ে উঠতো। শেখ এবং অন্যান্য নেতাগণ, যারা ইয়াজিদি ধর্ম সম্পর্কে শিক্ষা দান করে থাকেন তাদের সংস্পর্শে না থাকার কারণে ইয়াজিদিদের বৃহত্তর অংশ ধর্ম সম্পর্কে যথেষ্ট শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারেনি। লালিশের নিকট ব্যাপটাইজ করতে নির্দিষ্ট পরিমান অর্থ খরচ হতো। এই অর্থ যোগাড় করতে করতে আমি একেবারে টিনএজে পৌছে যাই। আর আমার পক্ষে এটাও সম্ভবপর ছিল না, প্রতিদিন দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে শেখদের নিকট এসে ধর্ম শিক্ষা গ্রহন করা। ক্রমাগত আক্রমণ, এমন কী মৃত্যু ভয় আমাদের ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ মৌখিকভাবে ধর্ম প্রচারের যে ঐতিহ্য সেটা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এসব সত্ত্বেও আমাদের ধর্মীয় গুরুগণ ইয়াজিদিইজম অথবা ইয়াজিদি ধর্ম রক্ষা করে যাচ্ছিলেন। বলতে গেলে তারা পাহারাদারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ব্যাপারটি আমাদের স্বস্তিতে রেখেছিল। একথা আমরা নিশ্চিন্ত বলতে পারি যে, আমাদের ধর্ম সঠিক নেতাদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছিল। যদি আমাদের ধর্ম সঠিক ধর্মীয় নেতাদের দ্বারা পরিচালিত না হতো তাহলে সহজেই আমাদের ধর্ম আমাদেরই বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যেত।

কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল যেগুলো সম্পর্কে প্রতিটি ইয়াজিদিকে শিশু বয়স থেকেই শিক্ষা গ্রহন করতে হতো। যেমন—ইয়াজিদি পবিত্র দিন অথবা হলিডে সমূহ। এই সব পবিত্র দিনসমূহের পেছনের ধর্মীয় ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। অতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল আমরা পবিত্র দিনসমূহ কী রূপে পালন করছি। যেমন ইয়াজিদি নববর্ষ। এইদিন আমরা ডিম রং করতাম, পরিবারের যারা মৃত্যূবরণ করেছে তাদের কবরস্থানে যেতাম এবং মন্দির বা ধর্মালয়ে প্রদীপ জ্বালাতাম। 

শেখয়ানে অবস্থিত লালিশ আমাদের পবিত্র ভ্যালি বা উপত্যকা। আর অক্টোবর পূণ্যভূমি বা তীর্থে যাওয়ার শ্রেষ্ট মাস।  সেখানে বাবা শেখ আমাদের ধর্মের সর্বপ্রধান আধ্যাত্মিক গুরু। বাবা চাউইশ পূণ্যভূমিতে আগত তীর্থযাত্রীদের অভিভাকত্ব করতেন। ডিসেম্বর মাসে তিন দিন আমরা উপবাস করতাম পাপমোচনের জন্য। ধর্ম বর্হিভূত বিবাহ আমাদের ধর্ম অথবা সামাজে স্বীকৃত নয়। এমন কী ধর্মান্তরিত হলেও নয়। ইয়াজিদিদের বিরুদ্ধে তিয়াত্তর বছরের অধিক সময় যাবত জারিকৃত ফরমান সম্পর্কে আমাদের শিক্ষা দেয়া হতো। নিপীড়ন নির্যাতনমূলক এইসব গল্প আমাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে গভীর উপলদ্ধির জন্ম দিতো। আমি নিজে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতাম প্রতিটি ধর্মে জন্মগ্রহনকারী নারী ও পুরুষ উভয়ের মহান দায়িত্ব তার ধর্মকে লালন করা ও রক্ষা করা।    

মা আমাদের ধর্মের বিধি-নিষেধ, ধর্ম-পালন ও প্রার্থনা করা শিখিয়েছিলেন। সকালে সূর্য, দিবসে লালিশ ও রাতে চন্দ্রের প্রার্থনা সবই মায়ের শেখানো। সব কিছুতেই রীতিনীতি ও নিয়ম কানুন আছে। তবে সেখানে কঠোরতা নেই বরং আছে শিথিলতা। প্রার্থনা হলো ব্যক্তিগত অভিব্যাক্তির বহিঃপ্রকাশ, এটা কখনো দলবদ্ধ অথবা শুন্য অনুষ্ঠান নয়। নিরবে অথবা উচ্চস্বরে প্রার্থনা হতে পারে। প্রার্থনা একাকী হতে পারে অথবা দলবদ্ধভাবে হতে পারে। তবে তাদের সকলকেই ইয়াজিদি  হতে হবে। প্রার্থনার বিশেষ কতগুলি অভিব্যক্তি ছিল। যেমন লাল অথবা সাদা ব্রেসলেটে চুম্বন করা। ইয়াজিদি নারী-পুরুষদের কব্জিতে সব সময় ধর্মীয় ব্রেসলেট পরিধান করার রীতি ছিলো। পুরুষদের জন্য প্রার্থনার সময় বিশেষ রীতি হলো তাদের ঐতিহ্যবাহী সাদা সার্টের কলারে চুম্বন দেয়া। 

আমি যে সব ইয়াজিদিদের সাথে বেড়ে উঠেছি তাদের সবাই তিন ওয়াক্ত প্রার্থনায় বসতো। যে কোন স্থানে এই প্রার্থনায় বসা যেত। মন্দিরে প্রার্থনায় বসার চাইতে আমি অনেক বেশি প্রার্থনায় বসেছি  মাঠে, ক্ষেতে, ছাদে এমন কী রান্নাঘরে পর্যন্ত—যখন মাকে রান্নায় সহযোগীতা করতাম। প্রার্থনার সময় ঈশ্বর এবং তাওউসি মিলেকের প্রশংসায় অবশ্য-পাঠ কিছু বাক্য আছে। অতপর যে কোন কিছু পাঠ করা যায়। মা সব সময় বিশেষ ভঙ্গিমা দেখিয়ে বলতেন, ‘তাওউসি মিলেকের নিকট জানাও, কোন বিষয় তোমাকে মানসিক কষ্ট দিচ্ছে’। মা আরও বলতেন, ‘যদি তুমি কাওকে ভালবেসে থাকো, এমন কী তুমি যদি কোন বিষয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে থাকো সেটাও তাওউসি মিলেককে জানাও’। এ সকল বিষয়ে তাওউসি মিলেক তোমাকে সাহায্য করতে পারে। আমি প্রার্থনা করতাম আমার ভবিষ্যতের জন্য। স্কুল শেষ করা ও একটা সেলুন চালু করা ছিল আমার প্রার্থনার বিশেষ আবেদন। এছাড়াও আমি আমার ভাইবোন ও মায়ের মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করতাম। কিন্তু এখন আমি  প্রার্থনা করি শুধু আমার ধর্ম এবং গোত্রের সকল মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য।

সুদীর্ঘ সময়ব্যাপী ইয়াজিদিরা এইভাবে জীবন যাপন করছে। অন্যান্য ধর্মের মানুষ অথবা কমিউনিটি থেকে ভিন্ন হবার কারণে আমরা আমাদের ধর্ম বিষয়ে গর্ববোধ করতাম। অধিক জমি অধিগ্রহণ অথবা ক্ষমতা লাভের কোন প্রকার লোভ লালসা আমাদের ছিল না।  ইয়াজিদি নয় তাদের ওপর বিজয় লাভ করে, তাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে আমাদের ধর্ম প্রচার অথবা বিস্তার নিষিদ্ধ ছিল। তাছাড়া ইয়াজিদি ধর্মে জন্ম গ্রহন করেনি এমন কেহ ধর্মান্তরিত হয়ে ইয়াজিদি হতে পারতো না। কিন্তু আমি যখন শৈশবে পদার্পণ করেছি তখন থেকে ক্রমশ পরিবর্তন আসতে থাকে। গ্রামবাসীরা এই সময় টেলিভিশন ক্রয় করে আনে। ইতোপূর্বে আমরা স্যাটেলাইট ডিস এর মাধ্যমে তুর্কি সোপ অপেরা এবং কুর্দিশ খবর দেখতাম। কাপড় ধোয়ার ইলেকট্রিক মেশিন যখন কেনা হলো তখন সেটা ছিল অনেকটা যাদুকরী ঘটনার মতো। যদিও তখনও মা তার প্রথাগত পোশাক এবং মাথার স্কার্ফ হাতেই ধুতেন। অসংখ্য ইয়াজিদি অভিবাসী হয়ে আমেরিকা, জার্মানী ও ক্যানাডা চলে যায় এবং পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে। অবশ্যই আমার প্রজন্ম অনেক কিছুই করতে সক্ষম হয়েছে যা আমার পূর্ব-প্রজন্ম ভাবতেও পারেনি—আমরা স্কুলে যেতে শিখেছি।

কোচোর প্রথম বিদ্যালয় স্থাপিত হয় ১৯৭০ সালে সাদ্দামের শাসনামলে। প্রথমে এটা ছিলো মাত্র পঞ্চম শ্রেনী পর্যন্ত। সেখানে শিক্ষা দেয়া হতো আরবী ভাষায়, কুর্দিস ভাষায় নয়—পাঠ্যসূচীর  সবই ছিল অতিমাত্রায় জাতীয়তাবাদী। রাষ্ট্রীয় পাঠ্যক্রমে  স্পষ্ট বর্ণিত ছিল ইরাকের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সম্পর্কে এবং তারা কোন ধর্ম রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করতে অনুমিত । স্কুলে যে সব ইতিহাসের বই আমি পাঠ করেছি তার কোথাও ইয়াজিদিদের অস্তিত্ব নেই। রাষ্ট্রের জন্য কুর্দিরা বিপদজনক বলে ঘোষনা করা হয়েছে। যখন ইরাকের ইতিহাস পাঠ করি তখন আমার সামনে যুদ্ধের এক পটভূমি যেন মেলে ধরা হয়। যে পটভূমিতে দেখা মেলে আরব ইরাকি সৈন্যদের, যাদের লেলিয়ে দেয়া হয়েছে আমাদের মানুষদের বিরুদ্ধে। আমাদের ছোট্ট ভূখন্ডকে কেড়ে নেয়ার জন্য। এ ইতিহাস এক রক্তক্ষয়ী বীরত্বের ইতিহাস। আমাদের বীর যোদ্ধা ও মহান নেতারা যে অসীম সাহসিকতার সাথে  ঔপনিবেশিক শক্তিকে পদদলিত করেছে এবং  সিংহাসনের বাইরে ছুঁড়ে ফেলেছে সে সব কাহিনী বর্ণিত হয়েছে এই ইতিহাসে। এই ইতিহাস রচনা করা হয়েছে আমাদিগকে অহংকারী করে তোলার জন্য। কিন্তু আমার মনে  এই ইতিহাস বিপরীত প্রভাব বিস্তার করে।

পরবর্তীতে আমার মনে হয়েছে ইতিহাসের এই সমস্ত বইয়ের প্রভাবে আমাদের প্রতিবেশিরা আইসিসে যোগ দিয়েছে। অথবা যখন টেররিষ্টরা ইয়াজিদিদের আক্রমণ করেছে তখন নিস্ক্রিয় দাঁড়িয়ে থেকেছে। আমাদের বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি। ইরাকি বিদ্যালয় সমূহে  ইতিহাসের এই সব বই পাঠ করে বেড়ে ওঠা শিক্ষার্থীরা কখনো ভাবতে শেখেনি আমাদের ধর্মকে রক্ষা করার প্রয়োজন আছে। বিরতিহীন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের নিষ্টুরতা,  ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে এই সব গ্রন্থে কিছু লেখা নেই। স্কুলের প্রথম দিন থেকেই আমাদের শিক্ষা দেয়া হয় হিংস্রতা। 

শৈশব থেকেই আমার দেশ আমাকে বুদ্ধিভ্রষ্ট, দ্বিধাগ্রস্থ করে ফেলেছে। এই সুন্দর পৃথিবী তার নিজের দেহকে কেটে টুকরো টুকরো করে অগণিত ভূমিতে পরিণত করেছে। যেখানে যুগব্যাপি নিষেধাজ্ঞা, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, নোংরা রাজনীতি ও পেশা আমাদের প্রতিবেশিদের করেছে দ্বিধাবিভক্ত । ইরাকের দূর উত্তর প্রান্তে কুর্দিদের বসত। তারা প্রতিনিয়ত স্বাধীনতার জন্য হাহাকার করেছে। দক্ষিণের শেষ প্রান্ত হলো সম্পূর্ণত শিয়া মুসলমানদের বসত। ওরাই হলো দেশের সংখ্যা গরিষ্ঠ ধর্মীয় ও  রাজনৈতিক দল। মধ্য ইরাক সম্পূর্ণরূপে সুন্নি আরবদের নিয়ন্ত্রণে। ওদের মাঝ থেকেই প্রেসিডেন্ট সাদ্দম এর ক্ষমতায়ন, রাস্ট্র নিয়ন্ত্রণ। এক সময় যারা রাস্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করেছে তারাই এখন একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে।

আমাদের মানচিত্র খুব সহজ। একটা মানচিত্রে গাঢ় তিনটা রঙে  দেশটাকে অনুভূমিক হারে বিভক্ত করা হয়েছে । এই মানচিত্রে ইয়াজিদিদের বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এবং বহিরাগত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইরাকের বাস্তবতা এতই জটিল যে এই ভূখন্ডে জন্মগ্রহণকারী মানুষদের পক্ষেও এসব বুঝে ওঠা কঠিন। কোচোর মানুষেরা রাজনীতি নিয়ে কোন আলাপ আলোচনা অথবা মন্তব্য করতো না। অন্তত আমার বেড়ে ওঠার সময় থেকে আমি কখনো শুনি নি। আমাদের মানুষদের চিন্তার বিষয় ছিল ফসলের উৎপাদন, কার বিয়ে, ভেড়ার দুধ কতটুকু উৎপন্ন হচ্ছে প্রভৃতি—একখানা ছোট্ট গ্রামের অতি সাধারন বিষয়াদি, জীবনধারনের জন্য যা জরুরি।

যুদ্ধে ব্যবহার এবং বাথ পার্টির সদস্য বাড়ানো, এই দুটি প্রয়োজনে ইয়াজিদিদের সংগ্রহ করা হতো। এছাড়া ইয়াজিদিদের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের আর কোন আগ্রহ ছিল না। ইরাকের অন্যান্য ধর্মগোষ্ঠী অথবা জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের তুলনায় ইয়াজিদিদের অবস্থান ও অধিকারহীনতা সম্পর্কে আমরা অবহিত ছিলাম। মানচিত্রের তিনটি গাঢ় রংয়ের ভূখন্ডের কোথাও আমাদের স্থান দেয়া হয়নি। ইরাকের দক্ষিণপ্রান্তে কোচোর একেবারে উত্তরপশ্চিমে কুর্দিস্থান একখানা ডট অথবা বিন্দুর মতো স্থান। যে স্থানকে দেখানো হয়েছে তুর্কি জাতিগোষ্ঠী, শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের বসত হিসেবে। সমগ্র দেশ জুড়ে বিশেষ করে নিনেভা সমভূমি জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসত ছিল খ্রীষ্টান ধর্মগোষ্ঠীর আসিরিয়ান, চালডিয়ান, এবং আর্মেনিয়ানদের। এছাড়া বসত ছিল কাকা’আই, সাবাক, রোমা, এবং ম্যানডিয়েনসদের। আফ্রিকান এবং মার্স আরবদের কথা উল্লেখ নাই বা করলাম। আমি আরও শুনেছি বাগদাদের কাছে এখনও স্বল্প সংখ্যক ইহুদিরা বসত করছে। নানা জাতিগোষ্ঠীর ভেতরে ধর্ম বিরাজ করছে স্বকৃয়তায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কুর্দি জনগোষ্ঠীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি মুসলমান। কিন্তু তাদের জন্য কুর্দ জাতি সবখানে প্রাধান্য পায়। রাষ্ট্রীয় পরিচয় না থাকার কারণে  ইয়াজিদিরা নিজেদের সংখ্যা লঘু ক্ষুদ্র ধর্মগোষ্ঠী হিসাবে মনে করে। এবং ধর্মই তাদের পরিচয় মাত্র। ইরাকি আরবদের বেশিভাগই সুন্নি ও শিয়া মুসলমান। এই বিভাজনই বছরের পর বছরব্যাপী যুদ্ধের প্রধান কারণ। ইরাকের ইতিহাস গ্রন্থসমূহে এর প্রধান কারন বিস্তারিত ভাবে  বর্ণনা করা হয়েছে।

পায়ে চলা ধূলিময় দীর্ঘ পথ শহরের প্রান্ত পর্যন্ত চলে গেছে।  সে পথে হেটে বাশরাদের বাড়ি পার হয়ে স্কুলে যেতে হতো আমাকে। বাশরার বাবাকে আল কায়েদার সদস্যরা হত্যা করেছে। ওদের বাড়ি পার হলেই আমাদের বাড়ী, যেখানে আমি জন্মগ্রহন করেছি। সেখানে আমার বাবা আজও সারাকে নিয়ে বসবাস করে। এই বাড়ি পার হয়ে ওয়ালাদের বাড়ি। একটু চাপা রংয়ের গোল মুখশ্রীর ওয়ালা ছিলো অপূর্ব সুন্দরী। আর তার শান্ত গম্ভীর হাবভাব আমাকে তার বন্ধুত্ব পেতে আগ্রহী করে রেখেছিলো। রোজ সকালে  সে দৌড়াতে দৌড়াতে এসে আমার সাথে যোগ দিত স্কুলের পথে। পায়ে চলার দীর্ঘ পথ একার জন্য নিরাপদ ছিল না। প্রতি সকালের এই দৌড় ছিল একজন সঙ্গী পাওয়ার প্রত্যাশায়। বাড়ি ঘরের আঙ্গিনায় অথবা বাগানে ভেড়া পাহারাদার কুকুর অথবা একগাদা গবাদি পশু বেঁধে রাখা হতো। বাড়ির আঙ্গিনায় আগন্তুক অথবা অচেনা কেউ এলেই এই সব প্রাণীরা গলা ফাটিয়ে ঘেউ ঘেউ অথবা ডাকাডাকি শুরু করতো। যদি তাদের কারো বাড়ির গেট খোলা থাকতো তাহলে এই সব প্রাণীরা দাঁত খিঁচিয়ে খেঁকিয়ে ছুটে আসতো কামড় বসানোর জন্য। এবং ধরতে পারলেই ঝাপিয়ে পড়তো আমাদের ওপর। এই সব জন্তুরা গৃহপালিত ছিল না। এগুলো ছিল হিংস্র, বন্য ও আকৃতিতে বড়। এদের আক্রমণের ভয়ে ছুটে পালিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে আমরা হাপিয়ে পড়তাম। এভাবে স্কুলে পৌছাতে গিয়ে তখন আমরা রীতিমতো ঘেমে ভিজে হাঁপাতাম। শুধুমাত্র আমার বাবার কুকুর আমাদেরকে চিনতো সে এভাবে ঘেউ ঘেউ করতো না।

আমাদের স্কুলটা ছিল একেবারেই যেমন-তেমনভাবে বালুর মতো ধূসর কংক্রিটে তৈরি। কিছু রং ওঠা পুরাতন পোস্টার সাটা ছিল দেয়ালগুলোতে। নিচু দেয়াল ঘেরা চত্বর, আর ছোট্ট শুকনা এক টুকরা বাগান ছিল স্কুল আঙ্গিনার বিশেষত্ব। এর শ্রী অথবা জৌলুস নয়, এই স্কুলে পড়তে আসার সৌভাগ্য ছিল যাদুর মতো। স্কুলে সহপাঠী বন্ধুদের দেখা পাওয়াও ছিল আরেকটা বড় আকর্ষণ। স্কুলের বাগানে আমি, ওয়ালা, ক্যাথরিন এবং আরও কয়েকজন ছাত্রী মিলে বিন আক্ষি নামে মজার খেলা খেলতাম। কুর্দ ভাষায় বিন আক্ষি অর্থ হলো ‘আবর্জনার ভেতরে’। তাড়াহুড়া করে মার্বেল, কয়েন, এমন কী সোডা কাপ পর্যন্ত, যার যা আছে তাই লুকাতে হবে মাটির ভেতরে। তারপর লুকানো মাটির চারপাশে পাগলের মতো দৌড়াতে হবে। সব শেষে মাটিখুঁড়ে সে সব বের করে আনতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত টিচার আমাদের বকাবকি না করতো ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা মাটি খুঁড়তাম। হাতদিয়ে মাটি আচরাতে আচরাতে আমাদের আঙ্গুলের নখ সব ক্ষয় হয়ে যেত। এমন কী কখনো কখনো আঙুলের ডগা পর্যন্ত ক্ষয়ে যেত। এমন খেলা অবশ্যই মায়েদের বিরক্তির কারণ হবে। তুমি যেটা পেয়েছো সেটা রেখে দিতো পারো—বেদনার্ত কন্ঠে অশ্রু সজল চোখ এই কথা বলার মধ্য দিয়ে খেলা শেষ হতো। এটা আমাদের খুব পুরাতন খেলা।  আমার মা আজও মনে করে তার শৈশবে সেও খেলেছে এই খেলা।

পাতার পর পাতাভরা বৈষম্য ও অবিচারগুলো বাদ দিলে, ইতিহাস আমার প্রিয় বিষয়। ইতিহাসের বইয়ের পাতায় পোকার মতো আটকে থাকতাম। ফলে ক্রমশ আমি ইতিহাস বিষয়ে পারদর্শী হয়ে উঠি। ইংরেজিতে একেবারে দুর্বল ছিলাম। শিক্ষাকালীন সময়ে আমি মনোযোগী এবং পরিশ্রমী ছিলাম। ফলে ভাল ছাত্রী হিসাবে আমার সুনাম জুটেছিল। আমি যখন স্কুলে যেতাম তখন আমার সহদোরেরা কৃষি কাজে ক্ষেতে মজুরি দিতো। আমার মা এতই দরিদ্র ছিলো যে, স্কুলে বই বহন করার জন্য একটা ব্যাগ প্যাক কেনার সামর্থ আমার মায়ের ছিল না। আমার সহপাঠীরা ব্যাগ প্যাক পিঠে ঝুলিয়ে স্কুলে যেত। আমি ওসবে মনোযোগ দিতাম না অথবা কখনো মায়ের কাছে একটা ব্যাগ প্যাক কেনার আবদার করতাম না। এটুকু বোঝার ক্ষমতা হয়েছিল যে, আমার মা অতি দরিদ্র। শুধু ব্যাগ নয়, আমি কখনোই মায়ের কাছে কোন কিছু কেনার আবদার করি নি।  গ্রামের সেকেন্ডারি স্কুল নিমার্ণ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কয়েক গ্রাম পার হয়ে সেকেন্ডারি স্কুলে যেত হতো। বহুদূরের এই স্কুলে যাওয়ার গাড়ী ভাড়া দেওয়ার মতো সামর্থ আমার মায়ের ছিল না। সেকেন্ডারি স্কুলে যাওয়ার ট্যাক্সি ভাড়ার অভাবে আমার স্কুল যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। তখন পুনরায় আমি ক্ষেতে কাজ করার জন্য ফিরে যাই। আর অপেক্ষায় থাকি আমাদের গ্রামের সেকেন্ডারি স্কুল নির্মাণ কাজ শেষ হবার জন্য। অভিযোগ করে কোন ফল পাওয়া যাবে না। অভিযোগ করলেই টাকা উড়ে এসে আমার মায়ের আঁচল ভরে তুলবে না। আমি বোধ হয় কোচোর একমাত্র ছাত্রী ছিলাম, ট্যাক্সি ভাড়ার অভাবে যার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

১৯৯১ সালে সাদ্দাম কুয়েত আক্রমণ করার পর ইউনাটেড ষ্টেট অফ আমেরিকা ইরাকের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। শৈশবে আমি বুঝতে পারি নি, কেন আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ইরাকের ওপর। বাড়িতে শুধুমাত্র আমার ভাই মাসাউদ ও হেনজি এটা নিয়ে কথা বলতো। টেলিভিশনে সাদ্দাম যখন বক্তৃতা দিতো তখন আমার ভাইয়েরা গভীর মনোযোগের সাথে সেটা শুনতো। সেসময় কেউ কথা পর্যন্ত বলতে পারতো না। কেউ টু শব্দটি করলে আমার ভাইয়েরা ঠোঁটের ওপর আঙ্গুল দিয়ে হিসসসস শব্দ করে চোখ রাঙিয়ে তাকাতো। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সাদ্দাম প্রচার চালিয়ে ইয়াজিদিদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালাতো। যদি ইয়াজিদিদের সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হতো তাহলে তাদেরকে কুর্দদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কাজে লাগাতো পারতো। তারা প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতো ইয়াজিদিদের বাথ পার্টিতো যোগ দান করাতে এবং আমাদের ইয়াজিদি পরিচয় মুছে আরব পরিচয় সেটে দিতে।

কখনো কখনো শুধু সাদ্দামকেই দেখা যেত টেলিভিশন জুড়ে। একখানা বড় ডেস্কের পেছনে বসে সিগারেট টানছে আর ইরানের গল্প বলছে—যুদ্ধ নিজের বুদ্ধিমত্তা ও বীরত্বগাঁথা। একজন গোঁফধারী পাহারাদার তার পাশে দাঁড়িয়ে। ‘সে বলছেটা কী ?’। আমরা একে অপরের দিকে এভাবে প্রশ্ন করতাম। আর সকলেই দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করতো কাঁধ ঝাকিয়ে। সংবিধানে ইয়াজিদিদের সম্পর্কে কোন কথাই বর্ণনা করা হয়নি। বিদ্রোহ সম্পর্কে সামান্যতম সন্দেহ হলেই কঠিন শাস্তি বরাদ্দ হতো। কখনো আমার ইচ্ছা হতো গলা ছেড়ে উচ্চকণ্ঠে অট্টহাসি দিতে। কিন্তু আমার ভাইয়েরা সব সময়ই ভীত সন্ত্রস্ত থাকতো। মাসউদ আমাকে বলতো, ‘সাবধান ওরা আমাদেরকে কঠিন নজরে রেখেছে’। সবসময় খুব সচেতনভাবে কথা বলবে। সাদ্দামের গোয়েন্দা বিভাগের অগণিত চোখ-কান সার্বক্ষণিকভাবে আমাদের ওপর আবর্তিত।’

আমি যতটুকু বুঝতে শিখেছি শুধুমাত্র ইরাকের সাধারণ জনগণ এই নিষেধাজ্ঞার চরমতম খেসারত দিয়েছে। রাজনৈতিক এলিট, অবশ্যই সাদ্দাম স্বয়ং এই নিষেধাজ্ঞায় কোনরকম ভুক্তভোগী ছিল না। আমাদের হাসপাতাল ও বাজারসমূহ সম্পূর্ণ রূপে বন্ধ হয়ে যায়। ঔষধ ছিল সর্বাধিক চড়া মূল্যের। স্কুলগুলোর অবনতি তীব্রভাবে ধরা পড়ে আমার দৃষ্টিতে। একসময় ইরাকের যে শিক্ষা ব্যবস্থা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ছাত্র-ছাত্রীদের আকর্ষণের কেন্দ্রে ছিল সেই শিক্ষাব্যবস্থায় নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশাল এক ধ্বংস নেমে আসে। শিক্ষকদের বেতন এত হ্রাস করা হলো, যাকে বেতন বলা যায় না। ফলস্বরূপ শিক্ষক পাওয়া কঠিন হয়ে গেলো। অস্বাভাবিক হারে বেকারত্বের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলো। দেশের প্রায় অধের্ক শতাংশ পুরুষ বেকার হয়ে পড়লো। চলবে

আরো পড়তে ক্লিক করুন: দ্য লাস্ট গার্ল ।। পর্ব-০৬

//জেডএস//

লাইভ

টপ