আন্দামান ভ্রমণ কালাপানির কেচ্ছা ।। পর্ব ০৩

Send
মুহম্মদ মুহসিন
প্রকাশিত : ০৯:০০, ডিসেম্বর ২০, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:০০, ডিসেম্বর ২০, ২০১৮

জাহাজখানা তার রানওয়ের চক্কর শেষ করে অল্পক্ষণেই যাত্রী-লাউঞ্জের কাছে এসে থামলো। যাত্রীগণ সিট ছেড়ে উঠে খটাখট আওয়াজে উপরের ক্যারিয়ারের লিড খুলতে শুরু করলো। তার মধ্যে দেখতে পেলাম এক মজার কাণ্ড। কলকাতা থেকে বিমানে উঠছিলো এক পরিবারের চারজন সদস্য। স্বামী, স্ত্রী ও দুই বাচ্চা। বাচ্চা দুটির একজন এখনো দুধ খায় বয়সের, অন্যটি হয়তো বাল্য শিক্ষায় পড়ে। পরিবারের সদস্যগণের চেহারা ও লেবাসে যে দারিদ্র্যের ছাপ বিদ্যমান তাতে পূর্ববঙ্গের হলে এমন পরিবারের কেউ প্লেনে তো দূরে থাক, টিকেট কেটে ট্রেনে উঠবে এমনটাও ভাবা যেতো না। স্বামীর পরনে যে প্যান্ট ছিল তেমন ছুরতের প্যান্ট ওয়ার্কশপের কর্মীদের পরনেই সাধারণত দেখা যায়। স্ত্রীর পরনে গ্রামীণ আটপৌরে শাড়ী। যে বাচ্চাটি বাল্যশিক্ষায় পড়ে তার পায়ে কোনো জুতা-স্যান্ডেল ছিলো না। নাকে শিকনি ঝরছে এবং জামার হাতায় তা মুছছে। অথচ এই ছুরতের বাচ্চাটিকে কলকাতার নেতাজী সুভাষচন্দ্র বিমানবন্দরে যাত্রী লাউঞ্জে দামী টাইলসের ফ্লোরে যখন নির্ভয়ে নিঃসংকোচে ইচ্ছেমেতো দৌড়াতে দেখেছিলাম তখন আমার হঠাৎ সন্দেহ হচ্ছিল এটা কি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বিমানবন্দরেরর কোনো টার্মিনাল নাকি হাওড়া রেলস্টেশনের কোনো প্লাটফরম? যাই হোক, সে সন্দেহ মারাত্মকভাবে কেটে গিয়েছিল যখন দেখলাম সেই বাচ্চা আমাদের আগে আগেই গিয়ে বিমানে উঠেছিলো। এবার দেখলাম সে খালি ওঠার ক্ষেত্রেই আগে না, নামার ক্ষেত্রেও বিজনেস ক্লাসের সাহেবদের চেয়েও আগে। সবাই যখন সিট ছেড়ে ওঠে খটাখট ক্যারিয়ারের লিড খুলছে তখন সেই ছেলে কারো দিকে না তাকিয়ে সবাইকে পিছে ফেলে গিয়ে বিমানের বের হওয়ার সিঁড়ির কাছে হাজির। পিছনে তার বাবা ও মা দু’জনেই খাঁটি গ্রাম্য হিন্দিতে তাকে দাঁড়ানোর জন্য বলছে, কিন্তু সে দিকে ছেলের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। পথে দাঁড়ানো বিমানবালাও তাকে আটকাচ্ছে না। হয়তো ভয়, ওর ঝরা শিকনি তার গায়ে লেগে যায় কি-না। এযাবৎ যেটুকু যা বিমানে চড়েছি—কোথাও এমন বাংলাদেশী ট্রেন যাত্রীর নমুনার দৃশ্য দেখার সুযোগ হয়নি। জয়তু জাহাঙ্গীর ভাইয়ের ‘গো এয়ার’ হাওয়াই জাহাজ। পৃথিবীর সকল বিমান এমন দৃশ্য লালন করুক—ভিতরে এমন একটা আকাঙ্খার অনুভূতি নিয়ে জীবনে প্রথম পা রাখলাম বীর সাভারকার বিমানবন্দরে।

মাটিতে পা রেখে আবারও একটু হোচট খেলাম। আরে এটা বিমানবন্দর কীভাবে? এতো সাক্ষাৎ ট্রেনস্টেশন। যেখানে এসে বিমানটি নেমেছে সেটিও তো কোনো রানওয়ে ছিল না—সে তো এক রেলওয়ে লাইন। রেলওয়ে লাইনের ওপর দিয়ে রাস্তা থাকে এবং রাস্তার সাথে রেললাইনের এই ক্রসিংয়ে দুই পাশে গেট থাকে। সে গেটে গেটম্যান থাকে। এখানেও তো তাই তাই আছে। বীর সাভারকার বিমানবন্দরের রানওয়ের ওপর দিয়ে শহরের বাস চলাচলের রাস্তা গিয়েছে। সেই ক্রসিংয়েও দুই পাশে গেট আছে, সেখানে গেটম্যান আছে। যখন রানওয়েতে বিমান নামে তার অল্প আগে রাস্তাটি বন্ধ করে দেয়। বিমানের অবতরণ সম্পন্ন হলে গেটম্যান গেট খুলে দেন। তখন রানওয়ে ক্রস করে দিব্যি বাস ও অন্যন্য মটরযান চলাচল করে। আমাদের বিমানটি অবতরণ সম্পন্ন হয়েছে বলেই তো দেখতে পাচ্ছিলাম যে রানওয়েতে এমন করে বাস যাচ্ছে। বাহ, ইন্ডিয়া কি অগ্রসর জতি। তারা রেললাইন দিয়ে নির্বিঘ্নে বিমান চালায়। সুতারং রানওয়ের ওপর দিয়ে রেলক্রসিংয়ের মতো বাসের চলাচল দেখে প্রথম হোচট খেলেও পরক্ষণেই সামলে নিলাম। শুধু সামলেই নিলাম না, এই অগ্রসরমানতায় রীতিমত মুগ্ধ হলাম।

নতুন জায়গায় আসলে মুগ্ধ হতে হয়। ভ্রমণের এই ব্যাকরনের উপর আস্থা রেখেই আগাতে লাগলাম। সাথে বন্ধু শামীম রেজা। ফলে কোথাও উটকো ঝামেলার ভয়ও কম। কারণ অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে শামীম রেজা ঝামেলা সামলাতে প্রায় মহারাজা জিউসের কাছাকাছি পরিমাণ দক্ষ। সেই সাহস ও মুদ্ধতা নিয়ে খালি হাঁটছিই না, একটু ডানে বাঁয়ে তাকাচ্ছিও। এর মধ্যেই চোখে পড়লো একটি নির্দেশনা—NON-INDIANS, STOP PLEASE। থামলাম। নির্দেশনার পাশেই একটি টেবিল। আমাদের মতো আরো দু-তিনজন সেখানে থেমে আছেন। একজন মহিলা ও একজন পুরুষ বিমানের বোর্ডিংপাস নিয়ে তাতে কী একটা সিল দিচ্ছেন এবং একটি খুচরো কাগজে একটা নম্বর লিখে সেই টোকেন নিয়ে শহরের ভিতরে ইমিগ্রেশন অফিসে যাওয়ার নির্দেশনা প্রদান করছেন। আমার কাছে বেশ খটকাই লাগলো। বিমানবন্দর এখানে, আর ইমিগ্রেশন অফিস এখান থেকে তিন কিলোমিটার দূরে শহরের ভিতরে আরেক জায়গায়! বড় আজব ব্যাপার তো। নাকি, এই লোকগুলো আমাদেরকে বোকা বানাচ্ছে! যাক বাবা, সাথের সাদা চামড়ার সাহেবরা যদি বোকা হতে পারে, আমাদের বোকা হতে লজ্জা নেই।

তাই এবার লজ্জা না করেই হাতে লেখা টোকেনের ঠিকানা নিয়ে এসে দেখালাম প্রিপেইড ট্যাক্সি কাউন্টারে। কাউন্টারের ছেলেটির জামার ব্যাজে মুসলমান নাম দেখে বেশ ফুরফুরে লাগছিল। মনে হচ্ছিলো এত দূরেও এক আত্মীয় পেয়ে গেছি। ব্যাপারটার মধ্যে কোনো সাম্প্রদায়িকতার বোধ ক্রিয়াশীল কিনা জানি না। সম্প্রতি আমার স্নাতক সমাপনী এক ব্যাচের শিক্ষার্থীদের নিকট আমার অনেক দিনের চর্চার ধারায় মানুষ হিসেবে আমাকে মূল্যায়নের একটি ফরম দিয়েছিলাম। সেই ফরমে আমার একটি গুণ ও একটি দোষ লেখার অপশন ছিল। এক ছাত্র লিখেছিলো— আপনাকে কেন যেন আমার খানিকটা সাম্প্রদায়িক মনে হয়। ছাত্রের মন্তব্যটি পড়ে আন্দামানের বীর সাভারকার বিমানবন্দরের এই অভিজ্ঞতার কথাটিই মনে পড়ছিলো। মনে হচ্ছিলো তাই তো হবে। সাম্প্রদায়িক না হলে দূর দেশে এক মুসলমান দেখে আমার ভিতরে এমন আত্মীয়তার ভাব কেন জেগে উঠবে? তবে উক্ত মুসলমান ছেলেটিকে অবশ্য বলতে যাইনি যে, তাকে আমার আত্মীয়ের মতো মনে হচ্ছিল। বরং প্রিপেইড ট্যাক্সির পেমেন্ট স্লিপ নিয়ে সোজা বের হয়ে গেলাম ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে। ট্যাক্সি ড্রাইভার স্লিপ হাতে নিলো। আমরা তার পিছন পিছন ব্যাগগুলো টানতে টানতে গিয়ে হাজির হলাম ট্যাক্সির কাছে। চেহারা দেখে মনে হলো ওরকম ট্যাক্সি আমাদের ‘নসিমন’ ও ‘করিমন’ বানানো মিস্ত্রীরা সপ্তাহে দুইটা বানাতে পারে। সে সব আস্ফালন ওখানে না দেখিয়ে এবং ট্যাক্সির এই ছুরতের ওপর কোনো রকম নাখোশ ভাব না দেখিয়ে উঠে বসলাম ট্যাক্সিতে।

ট্যাক্সি ছুটলো ইমিগ্রেশনের দিকে। মাত্র তিন কিলোমিটারের মতো রাস্তা। আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড ধরে কিছুদূর গিয়ে বাঁক নিয়ে ভিআইপি রোড হয়ে আরজিটি রোডে গিয়ে গাড়ি থামলো। আমরা নেমে চতুর্দিকে তাকাচ্ছি। দেখছি একদিকে তিনতলা ভবনের গায়ে ইংরেজি ও হিন্দিতে লেখা ‘অফিস অব দি ডেপুটি কমিশনার, সাউথ আন্দামান ডিস্ট্রিক্ট’। সামনে আরেকটি অফিসের গায়ে লেখা ‘অফিস অব দি সুপার ইনটেন্ডেন্ট অব পুালিশ, সাউথ আন্দামান’। কিন্ত কোথাও দেখছিনা ইমিগ্রেশনের কোনো সাইন। আমাদের ইতি-উতি মারা চোখের চেহারা দেখে ড্রাইভার বুঝতে পারলো। একটি সরু রাস্তার দিকে আঙ্গুলে ইশারা করে ‘ওধার দেখো’ বলে সে তার গাড়ীর ধারে চলে গেলো। আমরা বাংলা কায়দার ঐ হিন্দি বাক্যের বদৌলতে ঠিকই খুঁজে পেলাম আমাদের ইমিগ্রেশন অফিস।

ইমিগ্রেশন অফিসের ভিতরে ঢুকে দেখলাম মোটামুটি বাংলাদেশি কায়দার এক অফিস। এয়ারপোর্টের কিংবা স্থলবন্দরের রাগী চোখের পুলিশি পোশাকের ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা কেউ নেই। কোনো হলূদ দাগের পিছনে আসামির কায়দায় দাঁড়িয়ে থাকা ইমিগ্রেশনপ্রার্থীর লাইন বা কিউও নেই। তিন-চারজন সাদা চামড়ার মানী লোক আর আমাদের ছাড়া আরো দুই জন বাংলাদেশী চেহারার গোবেচারা লোক পুরো ভাব নিয়ে চেয়ারে বসে অপেক্ষা করছে তাদের র‌্যাপ (Rap) অর্থাৎ ‘রেস্ট্রিক্টেড এরিয়া পারমিট’ পাওয়ার জন্য। দু’জন কর্মকর্তা অনেক চেষ্টা করছেন সংশ্লিষ্ট ট্যুরিস্টদের তথ্য অনলাইন পূরণ করতে। কিন্তু ইন্টারনেটের স্পিডের দুর্বলতার কারণে তথ্যের ছক সাবমিট হচ্ছে না। ওনারা বার বার চেষ্টা করছেন এবং বিশেষ করে সাদা চামড়ার মানী লোকগুলোর কাছে দেরীর জন্য ‘সরি’ বলে যাচ্ছেন। সেই সুযোগে পাশে বসা কালো চামড়ার দেশি আদমিরা মানে আমরাও সেই ‘সরি’র মধ্যে আমাদের আনুপাতিক শেয়ার আছে কল্পনা করছি এবং যথারীতি গদগদ অনুভব করছি।

এই অবসরে আমার সাম্প্রদায়িকতার অনুভব আবার একটু চাড়া দিয়ে উঠলো মনে হলো। এটা ছিল চামড়ার সাম্প্রদায়িকতা। পাশে বসা বাংলাদেশি চামড়ার দুজনের প্রতি তখন জানতে চাইলাম তাদের নিবাস কোথায়। দেখলাম একজন আন্দামানেরই লোক। তবে তার পূর্ব-পুরুষ বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের। সাথে বসা ছেলে-বয়সি অন্যজন তার ভাগ্নে। শেষোক্ত জন বেড়াতে যাবে মামার নীল আইল্যান্ডের বাড়িতে। বাংলাদেশী সেই ভাগ্নের র‌্যাপ সংগ্রহের জন্য ভাগ্নের সাথে মামার এখানে বসা। কথা হলো তাদের পুর্ব-পুরুষ নিয়ে। গোপালগঞ্জের উলপুরে তাদের বাড়ী ছিল। ১৯৪৭-এর পরে তার ঠাকুরদা ভারতে উদ্বাস্তু হিসেবে পাড়ি জমায়। ভারত সরকার ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার উদ্বাস্তুদের অনেককে জনপ্রতি ৩০ বিঘা সম্পত্তি দিয়ে এখানে হ্যাভলক ও নীল আইল্যান্ডে সেটেলমেন্ট করে দিয়েছিলো। সেই সময় তার পিতামহ এখানে বসতি গাড়ে। এই বর্ননা থেকে বোঝা যাচ্ছিল ভাগ্নেটি তার কোনো বোনের সহোদর বোনের সন্তান নয়। কোনো তুতো-বোনের সন্তান ভাগ্নেকে নিয়ে আসতে ভদ্রলোক কলকাতায় গিয়েছিলেন এবং এই অফিস থেকে র‌্যাপ সংগ্রহ করে তিনি ভাগ্নেকে নীল আইল্যান্ডে নিয়ে যাবেন। এর মধ্যে যে আত্মীয়তা বোধ দেখছিলাম তা কি এ পাশের সাদা চামড়াদের দেশে কল্পনায়ও সম্ভব? তপন রায়চৌধুরীর ‘বাঙালনামা’য় এবং শংকরের ‘যেখানে যেমন’ গ্রন্থে অনেক উদাহরণে পড়ে দেখেছি এই অসম্ভবের পরিমাণ।

কিছুক্ষণে দেখলাম ভদ্রলোকের এই আপনত্ব শুধু রক্তের মধ্যে সীমিত নয়, চামড়ায়ও ব্যাপৃত। তাই তো চামড়ায় চামড়ায় মিল দেখেই আমাদেরকে ভদ্রলোক সরাসরি আমান্ত্রণ জানালেন নীল আইল্যান্ডে তাদের সাথে যেতে এবং তাদের ঘরে আতিথ্য গ্রহণ করতে। এমন কি এ-ও বললেন যে, আমরা রাজি হলে তারা আমাদের জন্য একদিন পোর্টব্লেয়ার থেকে যাবেন, যাতে পরের দিন আমরা তাদের সাথে নীল আইল্যান্ডে যেতে পারি। প্রয়োজনে নীল আইল্যান্ডের টিকেট সংগ্রহেও তিনি আমাদের সাহায্য করবেন। চামড়ায় চামড়ায় এমন সাম্প্রদায়িকতার বন্ধন হতে পারে দেখে, চোখে প্রায় জল এসে যাচ্ছিল। আর ভাবছিলাম কলকাতার এয়ারপোর্টে সব কালো চামড়ার মানুষ। হরিদাসপুর বন্দরে সব কালো চামড়ার মানুষ অথচ তাদের চামড়ার সাথে আমার চামড়ার অতো উল্টো টান কেন? সেখানে সাম্প্রদায়িকতা মানে এক চামড়ার সম্প্রদায়গত ঐক্যের বোধ নয় কেন? এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার মতো এলেম আমার পেটের মধ্যে আমি খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

এরই মধ্যে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার কম্পিউটারে এলো ইন্টারনেটের স্পিড। আমাদের র‌্যাপগুলো ঝটপট প্রিন্ট হলো। র‌্যাপ নিয়ে বের হয়ে আশেপাশের দুয়েকটি ছবি তুলতে চাইলাম। পুলিশ সুপারইনটেন্ডেন্টের অফিসের দিকে ক্যামেরা তাক করতেই এক পুলিশ তেড়ে আসলো। আমরা বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি সব মিলিয়ে ‘সরি’ বললাম আর জানতে চাইলাম উল্টো দিকের ছবি তোলা যাবে কি-না। সেটা করতে বাঁধা নেই জেনে পাশের ডেপুটি কমিশনার অফিসের ছবি অপ্রয়োজনেও কয়েকটা বেশি তুললাম।

আন্দামানে এই ডেপুটি কমিশনার জাতীয় প্রসাশনিক ব্যবস্থা কিছুটা হালের বলেই হয়তো তাদের মধ্যে হম্বিতম্বি বা প্রভু গোছের ভাবসাব একটু কম। আন্দামানের প্রশাসন ব্যবস্থা ১৮৫৮ সালে শুরু হয়ছিল একজন জেল সুপারিনন্টেন্ডেন্টের অধীনে। ১৮৫৮ থেকে ১৮৭৪ সাল পর্যন্ত আন্দামানের প্রশাসনিক প্রধান ছিলো এই জেল সুপারইনটেন্ডেন্ট। অর্থাৎ বৃটিশ সরকারের নিকট ১৮৭৪ সাল পর্যন্ত পুরো আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের পরিচয়ই ছিল একটা জেলখানা রূপে। ১৮৭৪ সালে আন্দামানের শাসন ব্যবস্থা ন্যস্ত হয়েছিল একজন চিফ কমিশনারের হাতে। বলা যায় ১৮৭৪ সালে আন্দামানে সিভিল প্রশাসন শুরু হয়। এর পূর্ব পর্যন্ত এটি সাধারণ মানুষের বসতভূমি হিসেবে স্বীকৃতিই পায়নি বরং এর স্বীকৃতি ছিল একটি প্রাচীরবিহীন জেলখানা হিসেবে।

১৮৭৪ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত আন্দামানে একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল এবং পুরো দ্বীপ একজন প্রশাসকের অধীন ছিলো, যার পদবি ছিল চিফ কমিশনার। ১৯৭৪ সালে আন্দামানকে তিনটি জেলায় ভাগ করা হয়। প্রতিটি জেলার প্রশাসনের জন্য একজন করে ডেপুটি কমিশনার নিয়োগ করা হয়। তিনটি জেলা হলো সাউথ আন্দামান, নর্থ এন্ড মিডল আন্দামান এবং নিকোবর। তিন ডেপুটি কমিশনারের নিয়ন্ত্রক হিসেবে থাকেন চিফ কমিশনার। ১৯৮২ সালে চিফ কমিশনার পদ বিলুপ্ত করে তৈরি করা হয় একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদ। লেফটেন্যান্ট গভর্নর ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ শাসন করেন। অদ্যাবধি এই ব্যবস্থাই বহাল রয়েছে। এখনো আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ভারতের অঙ্গরাজ্য নয়, বরং ইউনিয়ন টেরিটরি হিসেবে স্বীকৃত। এখানে কোনো বিধান সভা নেই। লোকসভায় এখান থেকে একজন নির্বাচিত সদস্য থাকেন।

সুতারং আন্দামান নিকোবর প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ এক ইউনিট সাউথ আন্দামানের ডেপুটি কমিশনারের অফিস। সেই অফিসের সামনে স্বাধীনতার সাথে ছবি তুলে নিজেদেরকেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে ভাবতে হঠাৎ খেয়াল হলো এ গুরুত্ব বেশিক্ষণ ধরে রাখা যাবে না যে, কারণ এবার আর গাড়ি নেই। হয়, ট্রলি টানতে টানতে হাঁটতে হবে, না হয় লাইনের অটোতে অনুগ্রহের গরিব যাত্রী হয়ে উঠতে হবে। কিন্তু না। হঠাৎ দেখি প্রায় নিগ্রো-কালো এক অটোওয়ালা তার অটোখানায় কঠিন ব্রেক কষে সামনে হাজির। ‘কেধার যাইয়ে?’  তা, এধার ওধার কোনোধারই তো আমরা জানিনা। কী বলবো? ভাঙ্গা হিন্দিতে শুরু করে ইংরেজিতে সুইচ করে বললাম বিচের পাশে কোনো হোটেল যেতে চাই। পোর্টব্লেয়ারের পাশে যে বিচ হয় না, তা তো আমরা তখনো জানি না। যাই হোক, আমাদের সেই সদয় কুচকুচে সামাদের রঙের ড্রাইভার যা বোঝার তা বুঝে নিয়ে আমাদেরকে তুলে অটোরিক্সার ক্লাচে চাপ দিয়ে ভোঁ করে স্পিড তুলে দিলো। দুই তিন মিনিটের মধ্যেই রাস্তার দুপাশে সাইনবোর্ডে লেখা দেখতে লাগলাম—আবেরদিন বাজার। নামটা দেখেই ভিতরে একটা আলোড়িত শিহরণ অনুভব করলাম। আবেরদিনের যুদ্ধ ভারতের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে করুণ এক অধ্যায়। ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে ১৮৫৯ সালের মে মাসেই ব্রিটিশ শক্তির সাথে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল আন্দামানের মাটি এই আবেরদিনে।

এই যুদ্ধে এক পক্ষে ছিল তীর-ধনুকওয়ালা এই দ্বীপের আদিম জনগোষ্ঠী; আর অন্য পক্ষে ছিল বন্দুক ও রাইফেলে সজ্জিত ব্রিটিশ সৈন্য আর তাদের দ্বারা পোষ মানানো দেশিয় কয়েদিরা, যারা এই দ্বীপের জঙ্গল কেটেকুটে আদিম জনগোষ্ঠীদের চিরায়ত বাসস্থানের পরিধিকে সংকীর্ণ করে তুলছিল। জেল সুপার জে.পি. ওয়াকারের পৈশাচিক অত্যাচারে কয়েদিরা আন্দামানিজ আদিবাসীদের এই ক্ষতিসাধনে বাধ্য হয়েছিল। জে.পি. ওয়াকারের অধীনে কয়েদিদের সে অত্যাচারের বর্ণনা দিয়েছেন সঞ্জীব চট্টোপ্যাধ্যায়।

‘জঙ্গলের ভ্যাপসা গরমে প্রতিটি অপরাধীকে নয় ঘন্টা কাজ করতে হবে। কি কাজ? পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্ধর্ষ জঙ্গল কেটে সাফ। কি তার চেহারা! হাজার হাজার বছর ধরে বেড়ে ওঠা রেন ফরেস্ট। দুশো আড়াইশো ফুট উদ্ধত গাছ। এক একটার বাট্রেস রুটের উচ্চতাই হবে ৫০ ফুট। চারদিক দুর্ভেদ্য পরগাছা, কাঁটা ঝোপ, খোচা শিকড়। রক্তলোভী বিন্দু বিন্দু জোঁক। ঝাঁক ঝাঁক বালি মাছি। গাছ আর পরগাছায় এমন এক চন্দ্রাতপ তৈরী হয়ে আছে, গাছ কেটে ফেললেও ধড়াস করে পড়ে যাবার জায়গা নেই।

‘৯ ঘন্টা কাজ মানে ঘড়ির কাটা ঘুরে যেতে দেওয়া নয়। কাজ বেঁধে দেওয়া আছে। এতটা জঙ্গল তোমাকে পরিস্কার করতেই হবে। দিনের শেষে হিসেব মিলিয়ে হয় ছুটি না হয় শাস্তি। শাস্তিটা কী! মাঠের মাঝখানে বিশাল এক টিকটিকির মতো লোহার ফ্লাগিং ট্রায়াঙ্গল ওঁত পেতে বসে আছে। উলঙ্গ করে পেছন ফিরিয়ে বেঁধে মোটা বেত দিয়ে পাছার ওপর অভ্যস্ত হাতে একই যায়গায় সপাসপ ছ’ ঘা। ছ’ বার মারার প্রয়োজন হতোনা। তিন ঘায়েই চামড়া ফেটে দু ফাঁক। অজ্ঞান। একটু নুন জল ছিটিয়ে দিয়ে লকআপে।

‘দু বেলা খাওয়া জুটতো না। পরনে জুটতো লেংটি। এই বৃষ্টি এই রোদ। এই ভিজে যাওয়া। এই রোদে পুড়ে ঝলসে যাওয়া। ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, জন্ডিস। রোজই মৃত্যু। প্রতিদিন আত্মহত্যা। বাদাম, চুগলাম, গর্জন গাছে লতার ফাঁকে ঝুলছে মানুষ। এদিকে ওয়াকারের ছড়ি ঘুরছেই।’

কারণ ওয়াকারের তো চিন্তা নেই। ওদিকে মূল ভূখণ্ড থেকে ১৮৫৭ সালের পরাজিত হাজার হাজার বিদ্রোহীকে আন্দামানে পাঠানোর অপেক্ষায় রয়েছে। সুতরাং একদিকে মরবে, অন্যদিকে মূল ভূখণ্ড থেকে নতুন মনুষ্য শরীর পাঠানো হবে। নতুন যারা আসবে তারা এদের তুলনায় আরো তাগড়া। কারণ এখানে ২৮ বছরের নিচে এবং ৪০ বছরের ওপরে কাউকে পাঠানো হতো না। এদিকে মরতে থাকলেও ওদিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে এমন কয়েদি পাঠানো হতে লাগলো। ৪ মার্চ ১৮৫৮ তরিখে ২০০ নিয়ে জে.পি. ওয়াকার নিজে এসেছিলেন। ১৮৫৭ সালের এপ্রিলের মধ্যে আরো ২১৬ জন বিদ্রোহীকে এখানে পাঠানো হলো। জুনে এ সংখ্যা দাঁড়ালো ৭৭৩। তবে যারা মরে গেল বা পালিয়ে গেল বা পালানোর অপরাধে যাদের ফাঁসি দেয়া হলো তাদের বাদ দিয়ে জুনে ওয়াকারের হাতে রইলো ৪৮১ জন—এখানে খাওয়ানো পরানো আর কাজে লাগানোর জন্য যথেষ্ট ভালো সংখ্যা। তবে মূল ভূখন্ড থেকে ১৮৫৮ এর ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১৯৪০ জন কয়েদি আন্দামানে পাঠানো হয়েছিল। চলবে

আরো পড়ুন: কালাপানির কেচ্ছা ।। পর্ব ০২

//জেডএস//

লাইভ

টপ