‘আমি গান্ধীজির আদর্শ বুকে ধারণ করি’

Send
.
প্রকাশিত : ১৫:৪৮, ডিসেম্বর ২৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১৪, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৮

প্রতিভা মুৎসুদ্দির ১৯৩৫ সালের ১৬ই ডিসেম্বর চট্রগ্রামের রাউজানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন শিক্ষাবিদ এবং ভাষা সংগ্রামী। জীবনের অধিকাংশ সময় নির্যাতিত, নিপীড়িত ও পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য নানা রাজনৈতিক, সামাজিক আন্দোলন-সংগ্রামে নানাভাবে যুক্ত থেকেছেন। নির্মোহ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের এই মানুষটি নাম-যশ-খ্যাতি এবং প্রচার প্রপাগান্ডা এড়িয়ে চলেন। শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য ২০০২ সালে পেয়েছেন ২১শে পদক। ২০০৭ সালে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি ফেলোশিপ। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শ্যামল চন্দ্র নাথ

আপনার জন্ম ১৯৩৫ সালের১৬ই ডিসেম্বর। ১৬ই ডিসেম্বর তো আমাদের বিজয় দিবস। আপনার জীবনী পড়ে জেনেছি আপনি একজন বিজয়ী নারী। আপনার জন্মের সময়কার কথা জানতে চাই।

প্রতিভা মুৎসুদ্দি : আমার জন্ম রাউজানের পহাড়তলী গ্রামে। আমার বাবা কিরণ বিকাশ মুৎসুদ্দি একজন আইনজীবি ছিলেন। ঠিকই বলেছো। আমার জন্মদিনটি বেশ নাটকীয়। তখন আমাদের পরিবারে দুই দুইটি কন্যা সন্তান এসেছে। আমার মায়ের পেটে যখন আমি তখন সবাই ভাবছিলো এবার পুত্র সন্তান হবে। আমি যখন আমার আমার মায়ের গর্ভে তখন আমার ঠাকুরদা প্যারীলাল মুৎসুদ্দি স্বপ্নে দেখলে,ন তার মৃত জেঠা মহাশয় বাড়িতে এসেছেন। তিনি এই স্বপ্নের অর্থে দাঁড় করালেন যে, এবার তার বংশে পুত্র সন্তান আসছে। আমার জন্মের দিন তিনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকলেন যে, কখন আমার জন্ম হবে। কখন দেখবেন বংশধরের মুখ। তাও আবার পুত্র সন্তান। নবজাতকের কান্না শুনে সবাই তো খুশি। ধাত্রী এসে বকশিস চাইতেই ঠাকুরদা পকেটে হাত দিতেই ঠাকুরমা নাকি মহা বিরক্ত হয়েই বললেন, রেখে দাও তোমার বকশিস। ধুতির দোকানে আর যেতে হবে না, শাড়ি গহণার দোকানে যাও। ঠাকুরদার বিরাট আশা ভঙ্গ হলো। তখন ছিল শীতকাল। তিনি নাকি মনের কষ্টে লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন। আমি এসব মায়ের কাছেই শুনেছি। আর মাকেই প্রশ্ন করেছি— মেয়েরা কি মানুষ নয়?

পরে তো আপনার ঠাকুরদার সেই আফসোস কেটেছিল। এবং আপনার কাছে আরো জানতে চাই যে, কেমন কেটেছিল আপনার শৈশব?

প্রতিভা মুৎসুদ্দি : আমাদের পাঁচ বোন ও চার ভাইয়ের মধ্যে আমি তৃতীয়। আমার দুটো কি তিনটা জামা হলেই কেটে যেতো বছর। আমি খুব ডানপিটে স্বভারের ছিলাম। পড়ালেখার শুরুটা হয়েছে আমার দিদিদের হাত ধরেই। খুব আনন্দ সহকারে স্কুলে যেতাম আমি। ১৯৪৩ সালে বাবা হঠাৎ করে আমাদের পাঠিয়ে দিলেন গ্রামের বাড়িতে। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। বাবা শহরে আইনজীবি ছিলেন। বৌদ্ধ অধ্যুষিত সে গ্রামে অন্যান্য সংস্কার থাকলেও লেখাপড়ার ব্যাপারে খুব উৎসাহ ছিল সকলের। কিন্তু তখনও মেয়েদের অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যেতো। এটা ছিল আমার কাছে কষ্টের। আমি দেখেছি আমার পাশের বাড়ির এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে অল্প বয়সে, লেখাপড়া বেশি করতে পারে নাই। তাকে স্বামী মারে, শাশুড়ি মারে, শ্বশুর মারে—ওই মেয়ের কি কষ্ট। মার খেতে খেতে একদিন পালিয়ে নিজের বাড়ি চলে গেলো। তখনই আমি মনে সিদ্ধান্ত নিলাম আমাকে অনেক পড়ালেখা করতে হবে, বড় হতে হবে। কারো বোঝা হলে চলবে না।

ওই গ্রামে ছিল একটি মাত্র পাঠশালা। আমি প্রথমে পড়ি মহামুণি মডেল প্রাইমারি স্কুলে। আমার জেঠা মহাশয়, ভূবন মুৎসুদ্দি তিনিই ছিলেন ওই পাঠশালার প্রধান, তিনিই সহকারী। তার হাতে থাকতো সবসময় লম্বা এক বেত। আর তার হৃদয়ে ছিল অফুরন্ত স্নেহ মমতা। ক্লাসে তখন ঘন্টা পড়তো না। তিনি নামতা পড়াতেন সুর করে দুলে দুলে। কবিতাও পড়াতেন সেই একই কায়দায়। আমার ভালো লাগতো না। আমার জেঠতুতো বোনের মেয়ে আরতি, সে পড়তো অন্য এলাকায় মহামুণি এ্যাংলো পালি ইনস্টিটিউশনে। এরপর আমি সেখানে ভর্তি হলাম। ওর সাথে তখন চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে যাই। শিক্ষক হাজিরা খাতায় নাম তুলে নিলেন। আমার স্কুলে যাওয়া শুরু হলো পুরোদমে। যদি স্কুলটি শতবার্ষিকী পার করে দিয়েছে। এখনো বোধহয় সরকারি হয় নাই। খুব মনে পড়ে সেই ছোটবেলা শৈশব।

তখন তো মেয়েদের স্কুলে পড়া খুব কঠিন ছিল। তাও আবার ছেলে মেয়ে একসাথে। কি সমস্যার সম্মুখীন হতে হল আপনাকে?

প্রতিভা মুৎসুদ্দি : কঠিন তো হবেই। তবু দমে যাইনি কখনো। আমি খুব একরোখা ছিলাম ছোটবেলা থেকেই। সপ্তম শ্রেণী পাশ করার পর পাড়ার মুরুব্বিরা বাবাকে পরামর্শ দিলেন ছেলেদের সাথে লেখাপড়া ঠিক নয়। চরিত্র খারাপ হয়ে যাবে। যদিও বাবা তাদের কথায় কর্ণপাত করলেন। বাবা তাদের বিষয়টি একদম মানলেন না। আর আমি তো সব ক্লাস থেকেই মেধায় প্রথম-দ্বিতীয় হয়ে আসছি। তাই বাবা বললেন—মেয়ে আমার মেধার জোরে প্রথম-দ্বিতীয় হয়, তার পড়া বন্ধ করা উচিত হবে না। আমিও পড়া বন্ধ করলাম না।

এরপর আপনি যখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী তখন তো আপনাকে কেন্দ্র করে আপনার স্কুলে ছাত্রী সংসদ গঠন করা হয়। সেই সময়ের কথা শুনতে চাই।

প্রতিভা মুৎসুদ্দি : ১৯৪৮ সালে খরার কারণে কৃষকরা চট্রগ্রামের মাদাসার টেক খনন করতে গেলে তদানীন্তন ডেপুটি মেজিস্ট্রেটের নির্দেশে গুলি বর্ষণ করা হয়। এর ফলে ১৮ জন কৃষকের মৃত্যু ঘটে। সে এক ভয়াবহ ঘটনা। বহু কৃষক আহত হয়। তখন মাহবুব ভাইয়ের নেতৃত্বে (মাহবুব আলম চৌধুরী) চট্রগ্রাম শহরে তীব্র প্রতিবাদ মিছিল হয় এবং খুনিদের বিচার দাবি করা হয়।এই সংবাদ চারিদিকে তৎক্ষণাৎ ছড়িয়ে পড়ে। তখন এ সংবাদ আমাদের মহামণি এ্যাংলো পালি স্কুলে ছড়িয়ে পড়লে আমরা বিক্ষোভ দেখাই।এ মিছিলে আমি নেতৃত্ব দেওয়ায় আমি-সহ তিনজনকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়। আমার বাবা ছিলেন খুব রাগী। বাড়িতে গেলে বাবা আমাকে মাইর দেওয়া শুরু করেন। তখন আমার পড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। কিছুদিন পর বাবার রাগ খানিক কমলে বাবা আমাকে নিয়ে ডা. খাস্তগীর সরকারি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। সেখানে আমি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে যুক্ত ছিলাম। আমি দমে যাইনি।

১৯৫১ সালে আপনি মাধ্যমিক পাশ করলেন। ওই সময়ের এবং এর পরের কথা জানতে চাই।

প্রতিভা মুৎসুদ্দি : আমি ১৯৫২ সালেই মাধ্যমিক পাশ করি। এবং তখন আমি সরকারী বৃত্তি লাভ করি। এর ফলে যা হলো, আমার প্রতি আমার বাবার যা রাগ ছিল তা উবে যায়। বাবা খুব খুশি হন। অতঃপর বাবা খুব খুশি হয়ে আমাকে ভর্তি করে দিলেন চট্রগ্রাম সরকারী কলেজে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে আপনি সরাসরি অংশগ্রহণ করেন

প্রতিভা মুৎসুদ্দি : তুমি ঠিকই বলেছো। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সমগ্র চট্রগ্রাম জুড়ে ধর্মঘট চলছিল। আমরা একটি ট্রাক নিয়ে প্রতিবাদ মিছিল করতে করতে খাস্তগীর স্কুলে যাই। এরপর হালিমা আপার নেতৃত্বে আমরা চট্রগামের প্রায় সব স্কুল প্রদক্ষিণ করে আমাদের কলেজের সামনে বিক্ষোভ মিছিল করতে করতে চলে যাই। এরপর ওইদিন দুপুরে বের হয় ছাত্র জনতার বিশাল মিছিল। ওইদিন ঢাকায় ছাত্র হত্যার খবর আমাদের কাছে পৌঁছাতে সময়ও লাগেনি। ওই সময় চট্রগ্রামের লালদিঘী ময়দানে চলছিল শ্রমিক সভা। সেই শ্রমিক সভা সেইদিন জনসমুদ্রে পরিণত হতে সময় লাগেনি। অবশ্য, ওই সময়ে মাহবুব আলম চৌধুরী ছিলেন অসুস্থ। উনার জলবসন্ত রোগ হয়েছিল তখন। তার কাছে পৌঁছালো সেই সংবাদ। গুলি বর্ষণের মতন তার কলম থেকে বের হলো একটি কবিতা। ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’। ওই অমর কবিতা অনেক কষ্টে প্রেস থেকে উদ্ধার করে লালদীঘির ময়দানে পড়া হয়। তৎকালীন সরকার চেয়েছিল মাহবুব ভাইয়ের ওই কবিতা নসাৎ করে দিতে। কিন্তু তা পারেনি। আমাদের মানসপট তৈরি করে দিয়েছিলেন তিনি। আজও সেইসব দিনের কথা মনে পড়ে। ভুলে যাই কেমন করে! তিনি আমাদের মানসপটে সৃষ্টি করেছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের মন্ত্র।

আপনি তো ওই সময়ে ছাত্র ইউনিয়ন এবং বাম ধারার রাজনিতীর সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।

প্রতিভা মুৎসুদ্দি : আমি ছাত্র ইউনিয়ন করতাম। ছাত্র ইউনিয়ন এবং সমাজতন্ত্র তখন আমার ভিতর একাকার হয়ে গেছে। আমি সকল প্রতিবাদে, বিক্ষোভে সামিল থাকতাম। এরপর আমি ১৯৫৩ সালে সাধারণ বৃত্তিসহ আই.এ পাশ করি।

আপনার নাকি ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু পরে আপনি ভর্তি হলেন চট্রগ্রাম কলেজে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কারণ কি?

প্রতিভা মুৎসুদ্দি : আমার বাবা চান নি আমি ডাক্তারি পড়ি। ডাক্তারি পড়লে অনেক টাকা খরচ হয়ে যাবে। আমি তো জিদ ধরলাম আমি ডাক্তারি ছাড়া অন্য কিছুই পড়বো না। তিনি তখন বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে, পিসি যা বলে তাই হবে, তিনি আমাকে পিসির কাছে নিয়ে গেলেন। পিসি বললো ও অনার্সে পড়বে, শিক্ষকতা করবে। অগত্যা আর কি করার আমি চট্রগ্রাম কলেজেই অনার্সে ভর্তি হয়ে গেলাম। ঢাকায়ও তখন আসার সাহস পাইনি। কারণ ঢাকায় থাকার মতন কেউ ছিল না। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া হল না। তাই চট্রগ্রাম কলেজেই অর্থনীতি বিষয় নিয়ে পড়াশুনা শুরু করে দিই।

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের হয়ে আপনি তো প্রচার প্রচারণাও চালান। তাই নয় কি?

প্রতিভা মুৎসুদ্দি : হ্যাঁ, আমি প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছি। তখন আমি চট্রগ্রাম কলেজে পড়ি। ১৯৫৪ সালে পাকিস্থান সরকার নির্বাচন ঘোষণা করে। ওই নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট নিরকুংশ সংখ্যাগরিষ্টতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। এরপর আমি অনার্স পাশ করি। পাশ করার পরপরই ঢাকায় চলে  আসি। এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের থাকার কোনো হল ছিল না। তখন আমি ঢাকা হলে এটাস্ট থাকতাম।

বিক্ষোভ করতে গিয়ে আপনি তো একবার গ্রেফতারও হলেন। সেই সময়ের কথা বলবেন?

প্রতিভা মুৎসুদ্দি : তখন ১৯৫৫ সাল। ইস্কান্দর মির্জা তখন কেন্দ্রীয় সরকারের সরাষ্ট্র মন্ত্রী। দমন পীড়ন চলছে। কিন্তু ভাষা সংগ্রাম পরিষদ সিদ্ধান্ত নেন, আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার। ২১শে ফেব্রুয়ারি আমতলায় মিটিং। ছাত্রীদের পরীক্ষা তারা মিটিং এ যাবে না এটাই ঠিক হলো। আগের রাতে হলে হলে কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। সেইদিনও ১৪৪ ধারা জারি রেখেছে তৎকালীন সরকার। পুলিশ হলগুলি ঘিরে রেখেছে চলছে তল্লাশি, লাঠিচার্জ, গ্রেপ্তার। তবুও সেই দিনের ভোরবেলাতে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘শহীদ স্মৃতি অমর হোক’ শ্লোগান তুলে ভাঙে ভোরের নীরবতা। পুলিশ যতটা নির্দয় হলো আমারও ততটা সাহসী হয়ে উঠলাম। সকালে হলে বসেই শুনতে পাই মিডফোর্ড ও মেডিকেল কলেজের কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ খবরে আমাদের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। আমি ও কামরুন নাহার লাইলী একটা মিছিল নিয়ে এগিয়ে যেতেই দেখি রাস্তার দুধারে বন্দুকধারী মিলিটারী দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মাঝখান দিয়ে আমরা আমতলায় একত্রিত হলাম। এক ছাত্রনেতা আগুণঝরা বক্তব্য দিচ্ছিলেন। হঠাৎ শুরু হলো পুলিশের লাঠিচার্জ। যে যেদিকে পারছে ছুটছে। আমার গায়েও পড়লো কয়েক ঘা লাঠি। পড়ে গেলাম মাটিতে। দু’জন ছাত্র ধরাধরি করে আমাকে এগিয়ে দিল লাইব্রেরির বারান্দায়। আমরা কয়েকজন কোনরকমে ছাত্রী কমনরুমের দোতালায় গেলাম। সেখান থেকেই দেখতে পেলাম মিলিটারীরা মধুর ক্যান্টিন, কমার্স বিল্ডিং এবং একতলা থেকে ছাত্রদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ মেডিকেল কলেজের ভেতর ঢুকে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছে। আমরা মোট সাত-জন, কামরুন নাহার লাইলী, হোসনে আরা, ফরিদা বারি মালিক, লালয়া নূর-সহ আরো দুজন বেশ কয়েক ঘন্টা সেখানে গা ঢাকা দিয়ে পরে লাইব্রেরির দিকে যাই। লাইব্রেরিতে যেতে লাইব্রেরিয়ান ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আমাদের বই দিলেন। ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আমরা লাইব্রেরি থেকে বের হলেই ধরা পড়ে যাবো। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম বের হলে একসাথেই বের হবো। এরপর আমরা বের হয়ে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে পৌঁছাই তখন ওত পেতে ছিল মিলিটারীরা। তারা আমাদের ভ্যানে উঠতে বললো। আমরা তখন শ্লোগান দিতে লাগলাম। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, শহীদ স্মৃতি অমর হোক’। শ্লোগান শুনে যারা ক্যাম্পাসে আত্মগোপন করেছিল তারাও বেরিয়ে এলো। তাদেরও গ্রেফতার করা হলো। প্রথমে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো লালবাগ থানায়। শত শত ছাত্র ছাত্রী সবার নামে ওয়ারেন্ট জারী হলো। এরপর ওদিন রাত সবাইকে পাঠানো হলো কেন্দ্রিয় কারাগারে। পরেরদিন সকালে ছাত্রীরা আমাদের জন্য হোস্টেল থেকে কাপড়-চোপড় খাবার দাবার, বইপত্র পাঠিয়ে দিল। দুদিন পর খাবার পাঠানো বন্ধ হলো। ওইসময়ে হোস্টেলের সভাপতি তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির স্ত্রী মিসেস জেনকিন্স বললেন, ‘ওরা রাষ্ট্রদ্রোহী, ওদের কিছু পাঠানো যাবে না।’

এর দু-সপ্তাহপর আমরা ছাড়া পেলাম। এরপর ১৯৫৬ সালে তৎকালীন সরকার নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিলো পাকিস্থানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা। এরপর আর শহীদ দিবস পালন নিয়ে আর কোন বাধা রইলো না। এর আগে আমি ডাকসুর নির্বাচনে মহিলা সম্পাদিক নির্বাচিত হই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার পাঠ চুকিয়ে আপনি কোথায় গেলেন শিক্ষকতা করতে?

প্রতিভা মুৎসুদ্দি : আমি ময়মনসিংহ টিচার্চ ট্রেনিং কলেজে গেলাম বিএড ট্রেনিং নিতে। এরপর কক্সবাজার বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। তারপর জয়দেবপুর বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষাকা হিসেবে নিয়োগ পাই। তারপর চলে আসি ভারতেশ্বরী হোমসে, রণদা প্রসাদ সাহার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানে।

শুনেছি রণদা প্রসাদ সাহা আপনাকে মা বলে সম্বোধন করতেন।

প্রতিভা মুৎসুদ্দি : হ্যাঁ, উনি আমাকে মা বলে ডাকতেন। আমি তো প্রথমে ওই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে চাইনি। পরে অবশ্য রাজি হয়ে ওই প্রতিষ্ঠানে এলাম। আমাকে জয়া পতি খুব পছন্দ করতেন। এরপর রণদা প্রসাদ সাহা তো আমার হাতেই তার প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব দিয়ে দিলেন। এরপর থেকে এখানেই কেটে গেছে জীবনের বাকি সময়।

আপনার কাছে শেষ প্রশ্ন, আপনি নাকি গান্ধীজিকে আদর্শ বলে মানেন, আর এজন্যই আপনি নিরামিষ খান?

প্রতিভা মুৎসুদ্দি : আমি গান্ধীজির আদর্শ বুকে ধারন করি। আমার নিরামিষ খাদ্যঅভ্যাসের পিছন একটি কারণই লুকিয়ে আছে। ১৯৪৮ সালের ৩০শে জানুয়ারি গান্ধীজি নিহত হন। সে খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু গান্ধীজির হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই এবং অহিংস নীতির কথা সবাই জানতো। তাকে কেউ গুলি করে মারতে পারে সেটা ছিল কল্পনার অতীত। মহাত্মা গান্ধীর জন্য প্রতিদিনই শোকসভা হতো। গান্ধীজির আদর্শ বুকে ধারণ করি দেশ মানুষের সেবা করার ব্রত নিয়ে। সেই থেকে আমিও নিরামিষভোজী। গান্ধীর ওই কথাটি এখনো মনে বাজে— ‘সত্য ছাড়া কোন ঈশ্বর আছেন তা আমি অনুভব করি না, সত্যময় হবার যাত্রাপথে অহিংসা একটি অবলম্বন।’

//জেডএস//

লাইভ

টপ